📘 গীবত ও তার ভয়াবহ ক্ষতি > 📄 গীবত থেকে বাঁচার জন্য সংকল্প ও হিম্মত

📄 গীবত থেকে বাঁচার জন্য সংকল্প ও হিম্মত


আমি আপনাদের সম্মুখে গীবত সম্পর্কে আলোকপাত করলাম। আপনারাও শুনলেন। কিন্তু শুধুমাত্র বলা ও শোনার দ্বারা কিছু হয় না। কিছু যদি হয় তা একমাত্র হিম্মত ও সংকল্পের দ্বারা হবে। যতক্ষণ হিম্মতের সাথে সামনে কদম বাড়ান না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব না। দৃঢ় সংকল্প করুন, ইনশাআল্লাহ আজ থেকে এই মুখ দিয়ে গীবতের কোনো শব্দ উচ্চারণ করবো না। যদি ভুলক্রমে কখনো কোনো শব্দ বের হয়ে যায়, সাথে সাথে তাওবা করে নিব। গীবতের সবচেয়ে কার্যকারী প্রতিকার হলো ক্ষমা চাওয়া। অর্থাৎ যার গীবত করেছি তাকে গিয়ে বলা যে, ভাই! আমি তো আপনার গীবত করে ফেলেছি, আমাকে মাফ করে দিন। আল্লাহর অনেক নেক বান্দা এভাবে ক্ষমা চেয়ে থাকেন। আর এভাবে ক্ষমা চাওয়ার সংকল্প করলে লোকলজ্জায় তখন গীবত করতে মনে চাইবে না।
গীবত থেকে বাঁচার উপায়
হাকিমুল উম্মত হযরত আশরাফ আলী থানভী রহ. বলেন, কিছু লোক আমার কাছে এসে বলে, আমি আপনার গীবত করেছিলাম। আমাকে মাফ করে দিন। আমি তাদের বলি, আমি মাফ করে দেব, তবে একটা শর্ত আছে। শর্ত হলো প্রথমে আমাকে বলুন, তুমি আমার সম্পর্কে কী গীবত করেছ? সেটা আমাকে বললে তোমাকে মাফ করে দিব।
হযরত আশরাফ আলী থানভী রহ. বলেন, এটা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো নিজের সংশোধন করা। কেননা, হতে পারে আমার অগোচরে যা বলা হয়েছে, প্রকৃতপক্ষে আমার মধ্যে সে দোষ রয়েছে। তারা আমাকে বললে, সে দোষের কথা আমার স্মরণে থাকবে। ফলে আল্লাহ চাইলে আমার সে দোষ থেকে বাঁচার তাওফিক হবে।
সুতরাং কখনো কারো গীবত হয়ে গেলে তার প্রতিকার এটাই যে, তার সামনে গিয়ে বলা যে, ভাই! আমি আপনার গীবত করে ফেলেছি, আমাকে মাফ করে দিন। সত্য কথা হলো এটা খুব সহজ কাজ নয়। গীবত করার পর সামনে গিয়ে বলা যে, 'আমি আপনার গীবত করেছি' এটা অত্যন্ত হিম্মতের কাজ। কিন্তু একবার বলতে পারলে মনের উপর ছুরি চালিয়ে দেয়া হবে। এটাই গীবতের প্রকৃত চিকিৎসা। দু'চারবার এভাবে করতে পারলে ইনশাআল্লাহ এই রোগ চিরতের খতম হয়ে যাবে।
বুযুর্গ আলেমগণ এর জন্য ব্যবস্থাও দিয়েছেন। যেমন, হযরত হাসান বসরী রহ. বলেন, মুখে কখনো অন্যের নিন্দা এসে গেলে সাথে সাথেই নিজের দোষসমূহের কথা স্মরণ করো। সম্পূর্ণ নির্দোষ কোনো লোক নেই। তোমার মধ্যেও অবশ্যই কোনো না কোনো দোষ আছে। ভাবতে থাকুন যে, আমার মধ্যেও তো এই এই দোষ আছে। এ অবস্থায় আমি অন্যের বদনাম কিভাবে করি? সাথে সাথে গীবতের ভয়ানক শান্তির কথাও ভাবতে থাকুন, একটা মাত্র কথা উচ্চারণ করবো, আর আখেরাতে তার জন্য কতইনা দুর্ভোগ পোহাতে হবে। পাশাপাশি আল্লাহর কাছে দুআও করা চাই যে, হে আল্লাহ! আমাকে এই রোগ থেকে মুক্তি দিন। যখনই কোনো মজলিসে কারো সম্পর্কে আলোচনা উঠতে শুরু করে, সাথে সাথে আল্লাহর অভিমুখে হয়ে দুআ করো যে, হে আল্লাহ! এই যে অনুচিত আলোচনা উঠতে যাচ্ছে তা থেকে আমাকে রক্ষা করুন। আমি যেন এ গুনাহে জড়িয়ে না পড়ি।

📘 গীবত ও তার ভয়াবহ ক্ষতি > 📄 গীবতের কাফফারা

📄 গীবতের কাফফারা


এক বর্ণনায় আছে, কখনো কারো গীবত হয়ে গেলে তার কাফফারা হলো- তার জন্য দুআ ও এস্তেগফার করা। মনে করুন, আজ এক ব্যক্তির হুঁশ হলো যে, সে এ যাবৎকাল উদাসিনতার মধ্যে ডুবে ছিল। ফলে তার দ্বারা বহু লোকের গীবত হয়ে গেছে। কত লোকের গীবত করেছে তা নির্দিষ্ট করে বলাও মুশকিল। এখন সে দৃঢ় সংকল্প করলো যে, ভবিষ্যতে ইনশাআল্লাহ আর কারো গীবত করবো না। কিন্তু যাদের গীবত হয়ে গেছে তাদের কোথায় খুঁজে বেড়াবে এবং তাদের থেকে ক্ষমা লাভের উপায় কী হবে? এখন তার উপায় হলো, তাদের জন্য দুআ ও এস্তেগফার করা।¹

টিকাঃ
¹ মিশকাত শরীফ: ৪৮৭৭

📘 গীবত ও তার ভয়াবহ ক্ষতি > 📄 বান্দার হক নষ্ট করলে করণীয়

📄 বান্দার হক নষ্ট করলে করণীয়


হাকিমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ. ও আমার পিতা হযরত মুফতি মুহাম্মাদ শফী রহ. এ ব্যাপারে এক অভূতপূর্ব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। তাঁরা এ বিষয়ে চিঠি লিখে নিজেদের ভক্ত-অনুসারীদের ও সংশ্লিষ্ট সকলের কাছে পাঠিয়েছিলেন। তাতে লেখা ছিল, জানা নেই সারা জীবনে আপনার কত রকম হক আমার দ্বারা নষ্ট হয়েছে এবং কত রকম ভুল-ত্রুটি আমার দ্বারা হয়ে গেছে। আমি সাধারণভাবে সবগুলোর ব্যাপারে আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে ক্ষমা করে দিবেন। কী বিস্ময়কর আল্লাহভীতি! আশা করা যায় এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা তাদের সমস্ত বান্দার হক ক্ষমা করে দিবেন।
যারা মারা গেছে অথবা জীবিত থাকলেও কোথায় আছে জানা নেই কিংবা জানা থাকলেও তাদের সাথে যোগাযোগের কোন মাধ্যম নেই। এরকম কোনো ব্যক্তির হক নষ্ট করা হলে- সে ক্ষেত্রে হযরত হাসান বসরী রহ. কর্তৃক প্রদত্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। তিনি বলেন, যার গীবত করা হয়েছে বা যার হক নষ্ট করা হয়েছে, তার জন্য প্রাণভরে দুআ করুন। হে আল্লাহ! আমি তাদের যে গীবত করেছি সে গীবতকে তাদের মর্যাদা বৃদ্ধির কারণ বানিয়ে দিন এবং তার মাধ্যমে তাদের দ্বীন ও দুনিয়ার উন্নতি দান করুন। সেই সঙ্গে তাদের জন্য এস্তেগফার করুন যে, হে আল্লাহ! তাদের জীবনের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দিন। এটা গীবত প্রতিকারের এক উত্তম ব্যবস্থা।
আমরাও যদি এ ধরনের চিঠি লেখে সংশ্লিষ্ট সকলের কাছে পাঠিয়ে দেই, তাহলে সমস্যা কোথায়? তাতে কি আমি নিচু হয়ে যাব? আমার মান-সম্মান নষ্ট হয়ে যাবে? এ ধরনের কিছুই হবে না। অথচ অসম্ভব নয় যে, তার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা আমার ক্ষমার উপায় করে দিবেন।

📘 গীবত ও তার ভয়াবহ ক্ষতি > 📄 ক্ষমা চাওয়া ও ক্ষমা করার ফযীলত

📄 ক্ষমা চাওয়া ও ক্ষমা করার ফযীলত


হাদীস শরীফে এসেছে, কেউ যদি কারো কাছে ক্ষমা চায় ও সত্যিকারভাবে অনুতপ্ত হয়, আর তার ক্ষমাপ্রার্থনা ও লজ্জা-অনুতাপ দেখে সেই ব্যক্তি তাকে ক্ষমা করে দেয়, তবে আল্লাহ তায়ালা যেদিন ক্ষমালাভের প্রয়োজন সর্বাপেক্ষা বেশি হবে, সেই কিয়ামতের দিন এই ক্ষমাকারীকেও ক্ষমা করে দিবেন। পক্ষান্তরে, কেউ যদি অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে, কিন্তু সেই লোক তাকে ক্ষমা করতে অস্বীকার করে, তাহলে আল্লাহ তায়ালা বলে দেন যে, যেদিন ক্ষমালাভের প্রয়োজন সর্বাপেক্ষা বেশি হবে, সেই কিয়ামতের দিন আমিও তাকে ক্ষমা করবো না। আমার বান্দাকে যখন তুমি ক্ষমা করনি, তখন তোমাকে আমি কিভাবে ক্ষমা করি? সুতরাং ব্যাপারটা খুবই বিপজ্জনক। কেউ লজ্জিত-অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চাইলে, তাকে অবশ্যই ক্ষমা করা উচিত। ক্ষমা চেয়ে সে নিজ দায়িত্ব আদায় করে ফেলেছে। সে দায়মুক্ত হয়ে গেছে, তাতে দ্বিতীয় ব্যক্তি তাকে ক্ষমা করুক বা না করুক। কাজেই বান্দার হক নষ্ট করা হলে সে ব্যাপারে ক্ষমাপ্রার্থনা করতে লজ্জাবোধ করা উচিত নয়। বরং সর্বদা ক্ষমা চাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত এবং সাথীদেরও উচিত খুশি মনে তাকে মাফ করে দেওয়া।
আল্লাহর জন্য কাউকে ক্ষমা করে দেয়ার ফযীলত
হযরত আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
مَا نَقَصَتْ صَدَقَةٌ مِنْ مَالٍ, وَمَا زَادَ اللَّهُ عَبْدًا بِعَفُو إِلَّا عِزَّا, وَمَا تَوَاضَعَ أَحَدٌ لِلَّهِ إِلا رَفَعَهُ اللهُ
অর্থাৎ, দান-সদকা করলে সম্পদের ঘাটতি হয় না (বরং আল্লাহ আরো বৃদ্ধি করে দেন)। যে ব্যক্তি অন্যকে ক্ষমা করে দেয় আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন। আর যে কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে বিনীত হলে আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। (মুসলিম-৬৭৫৭, ইফা.-৬৩৫৬, তিরমিযী-২০২৯, আহমাদ-৭১৬৫, ৮৭৮২, মালিক-১৮৮৫, দারিমী-১৬৭৬, বায়হাকী-২১০৯০, তারগীব-৮৫৮, জামি'-৫৮০৯, ইবনে খুযাইমাহ-২৪৩৮, হাদীসের শব্দাবলী মুসলিমের)
ব্যাখ্যা: এখানে মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি গুণের কথা বলা হয়েছে- (১). মুমিন কখনো কার্পণ্য করবে না, বরং উদার মনে আল্লাহর রাস্তায় খরচ করবে। আর কৃপণ ব্যক্তি কখনো আল্লাহর ওলী হতে পারে না এবং সমাজের নেতৃত্বও দিতে পারে না। (২). মুমিন সর্বদা মানুষের সাথে আন্তরিকতাপূর্ণ আচরণ করবে। সাধারণ কোনো ভুল-ত্রুটি হলে তা নিয়ে বাড়াবাড়ি করবে না এবং ফিতনা-ফাসাদও সৃষ্টি করবে না; বরং সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করবে। আলোচ্য হাদীসে বলা হয়েছে, অন্যকে ক্ষমা করলে আল্লাহও তাকে ক্ষমা করে দিবেন। (৩). প্রকৃত মুমিন কখনো ক্ষমতা ও পদের বড়াই করবে না; বরং সর্বদা নিজেকে উম্মতের খাদেম মনে করবে। এতে আল্লাহ তার মর্যাদা আরো বৃদ্ধি করে দিবেন।
প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ক্ষমা প্রার্থনা
একদা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে দাঁড়িয়ে উপস্থিত সাহাবীদের লক্ষ্য করে বললেন, আজ আমি নিজেকে তোমাদের হাতে সমার্পণ করছি। আমার দ্বারা যদি কেউ কোন কষ্ট পেয়ে থাক বা আমি কারো জান-মালের কোন ক্ষতি করে থাকি, তাহলে আজ আমি তোমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। কেউ প্রতিশোধ নিতে চাইলে নিতে পারো। আর যতি ক্ষমা করতে চাও করতে পার। যাতে কিয়ামতের দিন আমার উপর তোমাদের কারো কোন হক বাকি না থাকে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00