📄 ‘গীবত’ যিনা থেকেও জঘন্য পাপ
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ وَ جَابِرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَا ، قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : الْغِيْبَةُ أَشَدُّ مِنَ الزِّنَا، قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ وَكَيْفَ الْغِيْبَةُ أَشَدُّ مِنَ الزِّنَا ؟ قَالَ : إِنَّ الرَّجُلَ لَيَزْنِي فَيَتُوبُ ، فَيَتُوبُ اللَّهُ عَلَيْهِ ، وَفِي رِوَايَةٍ : فَيَتُوبُ فَيَغْفِرُ اللَّهُ لَهُ، وَإِنَّ صَاحِبَ الْغِيْبَةِ لَا يُغْفَرُ لَهُ حَتَّى يَغْفِرَهَا لَهُ صَاحِبُهُ
অর্থ: হযরত আবু সাঈদ ও জাবির রাযি. থেকে বর্ণিত, তারা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: 'গীবত' যিনার চেয়েও জঘন্যতম অপরাধ। সাহাবাগণ জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! 'গীবত' কীভাবে যিনার চেয়ে মারাত্মক? তিনি বললেন, কোনো ব্যক্তি যিনা করার পর তাওবাহ করলে আল্লাহ তার তাওবাহ কবুল করেন। পক্ষান্তরে, গীবতকারীকে যতক্ষণ পর্যন্ত যার গীবত করা হয়েছে সে ক্ষমা না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে ক্ষমা করা হবে না। (মিশকাত-৪৮৭৪, বায়হাকী-৫/৩০৬, তাবারাণী-৬/৩৪৮, হাদীসের শব্দাবলী মিশকাতের)
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসে গীবতকে 'যিনা-ব্যভিচার' থেকেও মারাত্মক বলার কারণ হলো- কোনো মানুষ 'যিনা-ব্যভিচারকে' হালাল মনে করে না; বরং কোনো মুসলমান যখন এই পাপে লিপ্ত হয়, তখন সে হারাম ও গুনাহ মনে করেই তা করে থাকে। পক্ষান্তরে, 'গীবত' অকাট্যভাবে হারাম হওয়া সত্ত্বেও গীবতকারী এটাকে হারাম মনে করে না; বরং হালাল মনে করে অহরহ গীবত করতে থাকে। আর হারাম জিনিসকে হালাল মনে করা কুফরী। এ কারণে 'গীবতকে' যিনা থেকেও মারাত্মক বলা হয়েছে।
তাছাড়া 'গীবত' দ্বারা বান্দার হক নষ্ট হয়। আর কেউ বান্দার হক নষ্ট করলে যতক্ষণ না বান্দা তাকে ক্ষমা করবে, ততক্ষণ আল্লাহও তাকে ক্ষমা করবেন না। 'গীবত' দ্বারা বান্দার হক নষ্ট হওয়ার কারণ হলো, এর দ্বারা চরমভাবে তার সম্মানহানী ঘটে। ফলে তার হক নষ্ট হয়। এজন্য হাদীসে 'গীবতকে' যিনা থেকেও মারাত্মক বলা হয়েছে।
📄 গীবতকারীকে জার পথে আটকে দেয়া হবে
এক হাদীসে এসেছ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন; এমন অনেক গীবতকারী আছে, যারা আপাতদৃষ্টিতে খুব ভালো আমলী। যেমন, নামায পড়ে, রোযা রাখে, আরো অনেক ইবাদত-বন্দেগী করে। কিন্তু ক্বিয়ামতের দিন তাদেরকে পুলসিরাতে আটকে দেয়া হবে। সকলে জানেন, জাহান্নামের উপর একটা সেতু আছে, যাকে পুলসিরাত বলা হয়। সেটা সকলেরই পার হতে হবে। জান্নাতীরাও সেটা পার হয়ে জান্নাতে দাখেল হবে। আর (আল্লাহ মাফ করুন) যারা জাহান্নামী হবে, তাদেরকে ঐ সেতুর উপর থেকেই জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। আর যারা মানুষের গীবত করে তাদেরকে ঐ সেতুর গোড়ায় আটকে দেয়া হবে। তাদেরকে বলা হবে, যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা গীবতের কাফফারা আদায় না করবে, সামনে যেতে পারবে না। অর্থাৎ যাদের গীবত করেছে তাদের থেকে ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে। তারা ক্ষমা না করা পর্যন্ত জান্নাতে যেতে পারবে না।
📄 নিকৃষ্টতম সুদ হলো গীবত করা
এক হাদীসে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটাও বলেছেন যে, সুদ এতটা মারত্মক গুনাহ যে তার মধ্যে অগনিত খারাবী ও গুনাহের সমষ্টি বিদ্যমান। যার সর্বনিম্ন স্তর হলো, যেন কেউ তার নিজ মায়ের সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হল। সুদ সম্পর্কে এমন কঠিন সতর্কবাণী উচ্চারিত হয়েছে- যা অন্য কোন গুনাহ সম্পর্কে হয়নি। অথচ গীবত সেই সুদেরই নিকৃষ্টতম স্তর। এক হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
إِنَّ مِنْ أَرْبَيَ الرِّبَا الْاِسْتِطَالَةَ فِي عِرْضِ الْمُسْلِمِ بِغَيْرِ حَقٍ
'সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্টতম সুদ হলো অন্যায়ভাবে মুসলিম ভাইয়ের ইজ্জতহানী করা' অর্থাৎ গীবত করা। (আবু দাউদ-৪৮৭৬)
📄 গীবত করা আর মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়া সমান
এক বর্ণনায় এসেছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যামানায় দু'জন মহিলা রোযা রাখা অবস্থায় কথাবার্তায় লিপ্ত ছিল, কথার এক পর্যায়ে তারা অন্যের গীবত শুরু করে দিল। কিছুক্ষণ পর এক ব্যক্তি এসে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অবহিত করলো যে, দু'জন মহিলা রোযা রেখেছিল, এখন তাদের অবস্থা খুবই খারাপ। পিপাসায় তারা মরণাপন্ন। সম্ভবত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওহী মারফত জেনেছিলেন যে, তারা কারো গীবতে লিপ্ত হয়েছিল। তাই তিনি বললেন, তাদেরকে আমার নিকট নিয়ে এসো।
তাদের দু'জনকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট উপস্থিত করা হল। তিনি দেখলেন বাস্তবিকই তারা মুমূর্ষু অবস্থায় পৌঁছে গেছে। তিনি একটা পাত্র আনতে বললেন, পাত্র আনা হলে তিনি তাদের এক মহিলাকে ঐ পাত্রে বমি করতে বললেন। সে বমি করতে শুরু করলো, দেখা গেল বমির সাথে পেটের ভেতর থেকে রক্ত ও গোশতের টুকরা বের হচ্ছে। তারপর অন্যজনকে বমি করতে বললেন। সেও বমি করলে দেখা গেল তাতে রক্ত ও গোশতের টুকরা রয়েছে। সেই রক্ত ও গোশতের টুকরায় পাত্রটি ভরে গেল। এরপর নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এসব হলো তোমাদের ভাই-বোনদের রক্ত ও গোশত, যা তোমরা রোযা অবস্থায় খেয়েছ।'
অর্থাৎ তোমরা রোযা অবস্থায় জায়েয খাবার থেকে তো বিরত রয়েছ, কিন্তু হারাম খাবার তথা গীবতের মাধ্যমে মুসলিম ভাই-বোনদের রক্ত-গোশত খাওয়া থেকে বিরত থাকনি। ফলে তোমাদের এ অবস্থা হয়েছে। তারপর বললেন, সাবধান! ভবিষ্যতে কখনো অন্যের গীবত করবে না। এ ঘটনায় আল্লাহ তায়ালা গীবতকে প্রত্যক্ষভাবে দেখিয়ে দিয়েছেন যে, গীবত আসলে কি জিনিস এবং তার পরিণাম কতটা ভয়াবহ।
আসল কথা হচ্ছে, আমাদের রুচিবোধ বিকৃত হয়ে গেছে। আমাদের অনুভূতি নষ্ট হয়ে গেছে। তাই গুনাহের কদর্যতা আমরা বুঝতে পারছি না। আল্লাহ তায়ালা যাদেরকে সুস্থ অনুভূতি ও শুদ্ধ রুচিবোধ দান করেছেন, তারা তা ঠিকই উপলব্ধি করতে পারে, এমনকি আল্লাহ তাদেরকে তা চাক্ষুস দেখিয়েও দেন।