📄 যে সমস্ত ক্ষেত্রে গীবত হারাম নয়
(১) অত্যাচারীর যুলুম প্রকাশ :
কোন মযলুম-নির্যাতিত ব্যক্তি যদি বিচার পাওয়ার আশায় সেই যালেমের অত্যাচারের কথা কোন বিচারক কিংবা ঐ পর্যায়ের লোকের সামনে আলোচনা করে, তবে তা গীবত হিসাবে গণ্য হবে না। কোনরূপ অতিরঞ্জিত ও মিথ্যারোপ না করে গীবতের উদ্দেশ্য ব্যতীত ঐ অত্যাচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে পারবে, এমনকি তার উপর বদ দু'আও করতে পারবে। তবে তাকে মাফ করে দেয়া অধিক উত্তম। মহান আল্লাহ্ বলেন,
لَا يُحِبُّ اللَّهُ الْجَهْرَ بِالسُّوْءِ مِنَ القَوْل إِلا مَنْ ظُلِم [النساء : ١٤٨].
“মন্দ কথার প্রকাশ ও প্রচার আল্লাহ্ পছন্দ করেন না; তবে যার প্রতি যুলুম করা হয়েছে সে ব্যতীত।”²
হাদীসে এসেছে,
عن أبي هريرة قال : قال رَجُلٌ : يَا رَسُولَ اللهِ، إِنَّ لِي جَارًا يُؤْذِيْنِي، فَقَالَ : انْطَلِقْ فَأَخْرِجْ مَتَاعَكَ إِلَى الطَّرِيقِ، فَانْطَلَقَ فَأَخْرَجَ مَتَاعَهُ، فَاجْتَمَعَ النَّاسُ عَلَيْهِ، فَقَالُوا : مَا شَأْنُكَ؟ قَالَ : لِي جَارٌ يُؤْذِينِي، فَذَكَرْتُ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ : انْطَلِقْ فَأَخْرِجْ مَتَاعَكَ إِلَى الطَّرِيقِ، فَجَعَلُوْا يَقُوْلُوْنَ : اَللَّهُمَّ الْعَنْهُ، اَللَّهُمَّ اخْزِهِ ، فَبَلَغَهُ، فَأَتَاهُ فَقَالَ : ارْجِعْ إلى مَنْزِلِكَ، فَوَاللَّهِ لَا أَوْذِيْكَ.
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, একদা জনৈক ব্যক্তি রাসূল ﷺ-কে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার এক প্রতিবেশী আমাকে কষ্ট দেয়। রাসূল ﷺ বলেন, “তুমি ফিরে গিয়ে তোমার বাড়ির সামগ্রী রাস্তায় বের করে রাখ”। ফলে সে বাড়ি ফিরে গিয়ে সব সামগ্রী বের করে রাস্তায় রাখে। অতঃপর সব মানুষ জমা হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করে যে, কি হয়েছে তোমার? তিনি বলেন, আমার প্রতিবেশী আমাকে কষ্ট দেয় একথা আমি রাসূল ﷺ-কে অবহিত করলে তিনি আমাকে বলেন, “ফিরে গিয়ে তোমার সামগ্রী রাস্তায় বের করে রাখ”। একথা শুনে সবাই বলতে শুরু করে যে, আল্লাহ্ তুমি তার উপর (ঐ পড়শীর) লা'নত কর, তাকে অপমানিত ও বেইজ্জত কর। অতঃপর এ. সংবাদ ঐ পড়শীর নিকট পৌঁছলে সে তার নিকট এসে বলে, ভাই! তুমি তোমার বাড়িতে ফিরে যাও, আল্লাহ্র কসম! আমি তোমাকে আর কখনো এরূপ কষ্ট দেব না।”¹
)২) ফতওয়া জানতে চাওয়া:
কোন বিষয়ে ফতওয়া জানতে গিয়ে যদি কারো দোষ-ত্রুটি ও অবস্থান বর্ণনা করতে হয়, তবে তা গীবতের শামিল হবে না। কেননা সে বিষয়টি স্পষ্ট করে না বললে ফতওয়া দানকারী সঠিক ফতওয়া দিতে পারবেন না। যেমন হাদীসে এসেছে,
عَنْ عَائِشَةَ أَنَّ هِنْدَ بِنْتَ عُتْبَةَ قَالَتْ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ أَبَا سُفْيَانَ رَجُلٌ شَحِيحٌ وَلَيْسَ يُعْطِينِي مَا يَكْفِينِي وَوَلَدِي إِلا مَا أَخَذْتُ مِنْهُ وَهُوَ لَا يَعْلَمُ فَقَالَ خُذِي مَا يَكْفِيكَ وَوَلَدَكِ بِالْمَعْرُوفِ.
“হিন্দা বিনতে উতবা একদা রাসূল ﷺ-কে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল ﷺ! আমার স্বামী আবু সুফিয়ান খুবই কৃপণ মানুষ, সে আমার ও আমার সন্তানাদির পূর্ণ খরচ দেয় না ফলে আমি তার অজান্তে তার মাল নিয়ে আমাদের প্রয়োজন মিটিয়ে থাকি। রাসূল ﷺ বললেন, তোমার ও তোমার সন্তানদের উত্তমূভাবে চলার জন্য যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই নিবে।”¹
(৩) কোন ব্যক্তির পরিচয় দিতে :
কোন ব্যক্তির পরিচয় দেয়ার সময় যদি শুধু নাম বলে পরিচয় দেয়া সম্ভব না হয়, তাহলে তার শারীরিক কিংবা চারিত্রিক কোন দোষ-ত্রুটি অথবা অবস্থা বর্ণনা করা বৈধ। যেমন- ল্যাংড়া-খোঁড়া, কানা-ট্যারা ইত্যাদি। তবে কিছু শর্তের ভিত্তিতে। যেমন- (১) শুধুমাত্র পরিচয় দেয়ার উদ্দেশ্যে হতে হবে, গীবতের উদ্দেশ্যে নয়। (২) যে বিষয়টি উল্লেখ করা হবে, তা সে যেন অপছন্দ না করে। (৩) তার পরিচয় দেয়ার জন্য এছাড়া বিকল্প কোন পথ পাওয়া না গেলে। কানা, ল্যাংড়া-খোঁড়া কিংবা ট্যারা ইত্যাদি ব্যবহার না করেই যদি পরিচয় দেয়া সম্ভব হয়, তাহলে তা উচ্চারণ করা বৈধ নয়। তুচ্ছ ও হীন করার উদ্দেশ্যে অনুরূপ বর্ণনা দেয়া নিষিদ্ধ। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন,
وَلَا تَنَابَزُوا بِالْأَلْقَابِ بِئْسَ الاِسْمُ الْفُسُوقُ بَعْدَ الإيمان [الحجرات: ١١]
“তোমরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ করো না এবং একে অপরকে মন্দ নামেও ডেকো না; ঈমানের পর মন্দ নাম অতি মন্দ।”²
(৪) মুসলিম সমাজকে সতর্ক করতে :
মুসলিম সমাজকে যাবতীয় ধর্মীয় ও বৈষয়িক বিষয়ে সতর্ক ও সাবধান করার উদ্দেশ্যে অন্যের কোন দোষ-ত্রুটি বর্ণনা করা গীবতের মত দোষের শামিল হবে না। আর এরূপ হুঁশিয়ারী বিভিন্নভাবে হতে পারে, যেমন- (ক) ইসলামী শরী'আতের অন্যতম মূল উৎস হাদীসে রাসূলকে বিশুদ্ধ অবস্থায় সংরক্ষণ করার উদ্দেশ্যে স্বার্থান্বেষী মিথ্যুক বর্ণনাকারীদের ব্যপারে সতর্ক করা জায়েয; বরং অবস্থা ভেদে ওয়াজিব। তবে এ ব্যাপারে যোগ্য হাদীস বিশারদ মুত্তাকী পরহেজগার আলেমগণের অধিকার রয়েছে, সাধারণ মানুষের নয়। বাহ্যিক দৃষ্টিতে যদিও গীবত বলে মনে হয় কিন্তু ইসলামী আক্বীদা-বিশ্বাস ও শরী'আতকে স্বচ্ছ এবং নিষ্কলুষ রাখার উদ্দেশ্যে গীবত হারাম হবে না; বরং সৎ আমল হিসাবেই গণ্য হবে ইনশাআল্লাহ্। যেমন ইমাম মুসলিম বলেন,
إِنَّ الإِسْنَادَ مِنْ الدِّيْنِ وَأَنَّ الرِّوَايَةَ لَا تَكُوْنُ إِلَّا عَنِ الثَّقَاتِ وَأَنَّ جَرْحَ الرُّوَاةِ بِمَا هُوَ فِيهِمْ جَائِزٌ بَلْ وَاجِبٌ وَأَنَّهُ لَيْسَ مِنَ الْغِيْبَةِ الْمُحَرَّمَةِ بَلْ مِنْ النَّبِ عَنْ الشَّرِيعَةِ الْمُكَرَّمَةِ. كما قالَ عَبْدُ اللَّهِ بْنَ الْمُبَارَكِ الْإِسْنَادُ مِنْ الدِّيْنِ وَلَوْلاَ الإِسْنَادُ لَقَالَ مَنْ شَاءَ مَا شَاءَ . وَقَالَ مُحَمَّدِ بْنِ سِيْرِينَ: إِنَّ هَذَا الْعِلْمَ دِيْنٌ فَانْظُرُوا عَمَّنْ تَأْخُذُوْنَ دِينَكُمْ.
“নিশ্চয়ই হাদীস বর্ণনাকারীর পরম্পরা (ইসনাদ) দ্বীনের অংশ। আর হাদীস বর্ণনা নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী ব্যতীত গ্রহণযোগ্য হতে পারে না এবং বর্ণনাকারীর মধ্যে বিদ্যমান দোষ-ত্রুটির সমালোচনা করা জায়েয বরং ওয়াজিব। নিশ্চয়ই এটা হারামকৃত গীবতের শামিল নয়; বরং এটা ইসলামী শরী'আতকে পূত-পবিত্র ও স্বচ্ছ রাখার অন্যতম উপায়। যেমন আবদুল্লাহ্ ইবনুল মুবারক বলেন, “ইসনাদ হচ্ছে দ্বীনের অংশ। অতএব এই ইসনাদ না থাকলে মানুষ যার যা ইচ্ছা তাই বলত”। অনুরূপভাবে মুহাম্মাদ বিন সীরীন বলেন, “এই সনদ বিদ্যা হচ্ছে দ্বীন, অতএব তোমরা ভেবে চিন্তে দেখ যে, তোমরা তোমাদের দ্বীন কার নিকট থেকে গ্রহণ করবে।”¹
অনুরূপভাবে কাউকে উত্তম নসীহত করা অথবা কেউ কারো সাথে বিবাহের বিষয়ে কিছু জানতে চাইলে উপযুক্ত পরামর্শ দেয়া এবং ফাসেক ও বিদঅ'আতী হতে সতর্ক করা। যেমন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, যখন মু'আবিয়া ইবনু আবি সুফিয়ান ও আবু জাহাম ফাতেমা বিনতে কায়েসকে বিবাহের জন্য পায়গام দেন, তখন তিনি তার বিবাহের ব্যাপারে রাসূল ﷺ-এর নিকট জানতে চাইলে রাসূল ﷺ তাকে উত্তম পরামর্শ দেন।
فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَمَّا أَبُو جَهْمٍ فَلَا يَضَعُ عَصَاهُ عَنْ عَاتِقِهِ وَأَمَّا مُعَاوِيَةُ فَصُعْلُوْكَ لا مَالَ لَهُ انْكِحِيْ أُسَامَةَ بْنَ زَيْدٍ فَكَرِهْتُهُ ثُمَّ قَالَ انْكِحِي أَسَامَةَ فَنَكَحْتُهُ فَجَعَلَ اللَّهُ فِيْهِ خَيْرًا وَاعْتَبَطْتُ
“রাসূল ﷺ বলেন, আবু জাহাম কখনই নিজ কাঁধ থেকে লাঠি ফেলে না অর্থাৎ স্ত্রীকে মারধর করে আর মু'আবিয়া হচ্ছে নিঃস্ব ভবঘুরে তার কোন ধন-সম্পদ নেই। বরং তুমি উসামা বিন যায়েদকে বিবাহ করো। ফাতেমা বিনতে কায়েস বলেন, আমি তাকে অপছন্দ করলাম কিন্তু রাসূল ﷺ আবারও বললেন, তুমি উসামাকে বিবাহ করো। ফলে আমি তাকেই বিবাহ করলাম। বিবাহের পরে দেখলাম যে, আল্লাহ্ তা'আলা তার মধ্যে বহু কল্যাণ নিহিত রেখেছেন। ফলে আমি ঈর্ষাযোগ্য বহু কল্যাণ লাভ করে অনেক আনন্দিত হয়েছি।”¹
অপর হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল ﷺ বলেছেন,
حَقُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ سِتِّ قِيلَ مَا هُنَّ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ إِذَا لَقِيتَهُ فَسَلِّمْ عَلَيْهِ وَإِذَا دَعَاكَ فَأَجِبْهُ وَإِذَا اسْتَنْصَحَكَ فَانْصَحْ لَهُ وَإِذَا عَطَسَ فَحَمِدَ اللَّهَ فَسَمِّتْهُ وَإِذَا مَرِضَ فَعُدْهُ وَإِذَا مَاتَ فَاتَّبِعْهُ.
“এক মুসলিমের প্রতি অপর মুসলিমের ছয়টি হক বা অধিকার রয়েছে। বলা হলো যে, হে আল্লাহর রাসূল ﷺ! সেগুলি কি কি? তিনি বললেন, যখন তুমি তার সাথে সাক্ষাৎ করবে তখন তাকে সালাম বলবে, যখন তোমাকে দাওয়াত করবে, তখন তুমি তার ডাকে সাড়া দেবে, যখন তোমার নিকট কোন নসীহত বা উপদেশ চাইবে তখন তাকে সদুপদেশ দেবে, যখন হাঁচি দিয়ে আলহামদুলিল্লাহ্ বলবে, তখন তুমি ইয়ারহামুকাল্লাহ্ বলবে, পীড়িত হলে তাকে দেখতে যাবে এবং মারা গেলে তার জানাযায় শরীক হবে।”¹
(৫) ফাসাদ সৃষ্টিকারী ফাসেক ব্যক্তির সমালোচনা
সমাজে যাদের ফাসেকী ও বিভ্রান্তিকর কর্মকাণ্ড স্পষ্ট প্রকাশ পেয়েছে তাদের ঐসব প্রকাশিত বিষয় আলোচনা করা হারাম গীবতের শামিল হবে না। যেমন হাদীসে এসেছে,
عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا أَخْبَرَتْهُ قَالَتْ اسْتَأْذَنَ رَجُلٌ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ انْذَنُوا لَهُ بِئْسَ أَخُو الْعَشِيْرَةِ أَوْ ابْنُ الْعَشِيْرَةِ فَلَمَّا دَخَلَ أَلاَنَ لَهُ الْكَلَامَ قُلْتُ يَا رَسُوْلَ اللهِ قُلْتَ الَّذِي قُلْتَ ثُمَّ أَلَنْتَ لَهُ الْكَلَامَ قَالَ أَيْ عَائِشَةُ إِنَّ شَرَّ النَّاسِ مَنْ تَرَكَهُ النَّاسُ أَوْ وَدَعَهُ النَّاسُ الْقَاءَ فحشه.
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, উইয়াইনাহ্ বিন হিস্স্ন নামক জনৈক ব্যক্তি রাসূল ﷺ-এর সাক্ষাৎ করতে আসার অনুমতি চাইলে রাসূল ﷺ বলেন, "তাকে অনুমতি দাও, সেতো আসলে স্বগোত্রীয় নিকৃষ্ট ভাই অথবা ছেলে। অতঃপর সে যখন প্রবেশ করল তখন রাসূল ﷺ তার সাথে নম্রভাবে কথাবার্তা বললেন। আয়েশা (রাযিআল্লাহু আনহা) বলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল ﷺ! আপনি তার সম্পর্কে এমন মন্তব্য করলেন আবার তার সাথে বিনয়-নম্রতার সাথে আলাপও করলেন, তিনি বললেন, হে আয়েশা! নিশ্চয় নিকৃষ্ট মানুষ সে-ই যাকে মানুষ বর্জন করে চলে অথবা তার ফাহেশী অশ্লীলতা থেকে বাঁচার জন্য দূরে থাকে।”¹
(৬) গর্হিত কাজ দূর করতে সহযোগিতা চাওয়া :
কোন ব্যক্তির মধ্যে যদি ইসলামে নিষিদ্ধ গর্হিত কাজ পরিলক্ষিত হয়, তাহলে তার ঐ গর্হিত বিষয়টি দূর করার জন্য কোন বিচারক কিংবা যে তা দূর করতে সক্ষম এমন ব্যক্তির সাহায্যের প্রয়োজন হলে তার নিকট ঐ দোষের কথা উল্লেখ করা বৈধ। তবে কোন ভাবেই গীবতের উদ্দেশ্য থাকতে পারবে না। যেমন পূর্বে উল্লেখিত হিন্দার ঘটনা সম্বলিত হাদীস।
عَنْ عَائِشَةَ أَنَّ هِنْدَ بِنْتَ عُتْبَةَ قَالَتْ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ أَبَا سُفْيَانَ رَجُلٌ شَحِيْحٌ وَلَيْسَ يُعْطِينِي مَا يَكْفِيْنِي وَوَلَدِي إِلَّا مَا أَخَذْتُ مِنْهُ وَهُوَ لَا يَعْلَمُ فَقَالَ خُذِي مَا يَكْفِيكَ وَوَلَدَكِ بِالْمَعْرُوْفِ.
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রাযিআল্লাহু আনহা) বর্ণনা করেন, হিন্দা বিনতে উতবা একদা রাসূল ﷺ-কে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল ﷺ! আমার স্বামী আবু সুফিয়ান খুবই কৃপণ মানুষ, সে আমার ও আমার সন্তানাদির পূর্ণ খরচ দেয় না। ফলে আমি তার অজান্তে তার মাল নিয়ে আমাদের প্রয়োজন মিটিয়ে থাকি। রাসূল ﷺ বলেন, তোমার ও তোমার সন্তানদের উত্তমভাবে চলার জন্য যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই নিবে।”²
বিভিন্ন দলীল প্রমাণাদির আলোকে আলেমগণ উল্লেখিত ছয়টি ক্ষেত্রে গীবত হারামের শামিল হবে না বলে বর্ণনা করেন।³
টিকাঃ
১. সহীহ্ মুসলিম, মুকাদ্দামাহ।
২. সূরা নিসা, আয়াত ১৪৮।
১. আল-আদাবুল মুফরাদ, 'প্রতিবেশীর অভিযোগ' অনুচ্ছেদ, হা/১২৪।
১. সহীহ্ বুখারী, 'আন-নাফাকাতু' অধ্যায়, 'ইযা লাম ইউনফিকির রাজুলু' অনুচ্ছেদ, হা/৪৯৪৫; সহীহ্ মুসলিম, 'আল-আকযিয়্যাহ' অধ্যায়, 'কাযিয়্যাতু হিন্দা' অনুচ্ছেদ, হা/৩২৩৩।
২. সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত ১১।
১. সহীহ মুসলিম, মুকাদ্দামাহ, 'নিশ্চয় ইসনাদ দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত' অনুচ্ছেদ।
১. সহীহ্ মুসলিম, 'তালাক' অধ্যায়, 'আল-মুতাল্লাকাতু ছালাছান লা নাফাকাতা লাহা' অনুচ্ছেদ, হা/২৭০৯।
১. সহীহ্ মুসলিম, 'সালাম' অধ্যায়, 'মিন হাক্কিল মুসলিমি লিলমুসলিমে রাদ্দুস সালাম' অনুচ্ছেদ, হা/৪০২৩।
১. সহীহ্ বুখারী, 'আদব' অধ্যায়, 'ফাসাদ ও সংশয় সৃষ্টিকারীর গীবত করা বৈধ' অনুচ্ছেদ, হা/৫৫৯৪।
২. সহীহ্ বুখারী, 'আনফাকাত' অধ্যায়, 'ইযা লাম ইউনফিকির রাজুলু' অনুচ্ছেদ, হা/৪৯৪৫; সহীহ্ মুসলিম, 'আল-আকযিয়্যাহ' অধ্যায়, 'কাযিয়্যাতু হিন্দা' অনুচ্ছেদ, হা/৩২৩৩।
৩. ফাতহুল বারী, ১৭/২১২, 'আল-আদাব' অধ্যায়, 'মা ইয়াজুযু মিন যিকরিন্ নাস' অনুচ্ছেদ; ইমাম নববী, আল-আযকার, পৃ. ৫৪০; রিয়াযুছ ছালেহীন, বাবু মা ইউবাহু মিনাল গীবাহ্।
📄 এক নজরে পরিত্রাণের উপায় সমূহ
গীবত ও নামীমাহ্ নিঃসন্দেহে মহা পাপের অন্তর্ভুক্ত। আর এই মহা পাপ থেকে বাঁচতে হলে এর ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে অবহিত হতে হবে। সেই সাথে তা থেকে বাঁচার জন্য মনের মধ্যে অনুভূতিও সৃষ্টি করতে হবে এবং সেই অনুভূতি অনুযায়ী আমল করতে হবে।
(১) তাকওয়া : সর্বাবস্থায় মনের মধ্যে তাকওয়া তথা আল্লাহভীতি শক্তিশালী করতে হবে। কেননা একমাত্র এ তাকওয়াই মানুষকে সর্ব প্রকার নাফরমানী ও গোনাহের কাজ থেকে রক্ষা করতে পারে। মানুষ যখনই কোন পাপ কিংবা কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করতে যায়, তখনই যদি অন্তরে আল্লাহভীতির প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে তাহলেই সে ঐ পাপ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম হবে। যেমন জনৈক ব্যক্তি তার চাচাতো বোনের সাথে যেনার সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্নের পর নীচে থেকে যখন ঐ মহিলা বলল, ভাই! তুমি আল্লাহকে ভয় কর, আমার সতীত্বের বন্ধন ছিন্ন করো না। তখন তিনি কেবলমাত্র আল্লাহর ভয়েই ঐ জঘন্য অপকর্ম থেকে বিরত হয়েছিলেন; শুধুমাত্র আল্লাহর ভয় ছাড়া আর কোন ভয় তার সামনে ছিল না।¹
আল্লাহ্ তা'আলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُوْنَ [آل عمران: ۱۰۲] .
“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় কর এবং পূর্ণ মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।”²
রাসূলে করীম ﷺ বলেন,
اتَّقِ اللهِ حَيْثُمَا كُنْتَ وَأَتْبِعُ السَّيِّئَةَ الْحَسَنَةَ تَمْحُهَا وَخَالِقِ النَّاسَ بِخُلُقٍ حَسَن
"তুমি যেখানেই থাকো না কেন আল্লাহকে ভয় করবে আর গোনাহের কাজে লিপ্ত হয়ে গেলে সাথে সাথেই নেকির কাজ করবে যেন ঐ গোনাহ্ মোচন হয়ে যায়। আর মানুষের সাথে উত্তম আচরণ করবে।”¹
(২) ভাষা নিয়ন্ত্রণ : মুখে যা আসবে তা-ই বললে চলবে না বরং প্রত্যেকটি কথা হিসাব করে যথাস্থানে ব্যবহার করতে হবে। একথাও স্মরণ রাখতে হবে যে, মানুষের প্রতিটি কথাই রেকর্ড হয়ে থাকছে । আল্লাহ্ তা'আলা বলেন,
مَا يَلْفِظُ مِن قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ [ق: ۱۸] .
“সে যে কথাই উচ্চারণ করে, তাই লিপিবদ্ধ করার জন্যে তার কাছে সদা প্রস্তুত প্রহরী রয়েছে।”²
সাবধান থাকতে হবে যেন এই কথার কারণে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হতে না হয়। রাসূল ﷺ বলেন,
مَنْ يَضْمَنْ لِي مَا بَيْنَ لَحْيَيْهِ وَمَا بَيْنَ رِجْلَيْهِ أَضْمَنْ لَهُ الْجَنَّةَ.
“যে ব্যক্তি আমার জন্য তার দুই চোয়ালের ও দুই পায়ের মধ্যস্থিত বিষয়ের (জিহ্বা ও যৌনাঙ্গের) যামিন হবে, আমি তার জন্য জান্নাতের যামিন হব।”³ সুতরাং ভাষা ও যৌনাঙ্গকে সর্ব প্রকার ব্যভিচার থেকে হেফাযত করতে হবে।
অপর এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে,
عَنْ عُقْبَةَ بْنِ عَامِرٍ قَالَ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا النَّجَاةُ قَالَ أَمْسِكْ عَلَيْكَ لِسَانَكَ وَلْيَسَعْكَ بَيْتُكَ وَابْكِ عَلَى خَطِيئَتِكَ.
উকবাহ্ ইবনু আমের (রাঃ) বলেন, আমি রাসূল ﷺ-কে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল ﷺ! কিভাবে নাজাত পাওয়া যাবে? তিনি বললেন, তুমি তোমার জিহ্বা তথা ভাষাকে নিয়ন্ত্রণ করবে, নিজ বাড়িকে যথেষ্ট মনে করবে (বাড়িতে বেশী বেশী অবস্থান করবে) এবং তোমার গোনাহের কারণে বেশী বেশী ক্রন্দন করবে।”¹
রাসূলুল্লাহ্ ﷺ আরও বলেন,
وَهَلْ يَكُبُّ النَّاسَ فِي النَّارِ عَلَى وُجُوهِهِمْ إِلا حَصَائِدُ أَلْسِنَتِهِمْ.
“মানুষের জিহ্বার কর্মফলই মানুষকে তার মুখের ভরে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে।”²
(৩) আল্লাহর নিকট জবাবদিহিতার ভয় :
প্রতিটি কথা ও কর্ম মহান আল্লাহর নিকট অতি নিপুণ ও সূক্ষ্মভাবে রেকর্ড হচ্ছে এবং এই রেকর্ডভুক্ত সকল আমল পরকালে মহান আল্লাহর দরবারে প্রকাশ করা হবে এবং এ ব্যাপারে জবাবদিহিও করা হবে। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন,
وَوُضِعَ الْكِتَابُ فَتَرَى المُجْرِمِيْنَ مُشْفِقِيْنَ مِمَّا فِيهِ وَيَقُولُوْنَ يَا وَيْلَتَنَا مَالِ هَذَا الْكِتَابِ لا يُغَادِرُ صَغِيْرَهُ وَلا كَبيرة إلا أحْصَاهَا وَوَجَدُوا مَا عَمِلُوا حَاضِراً وَلَا يَظْلِمُ رَبُّكَ أَحَداً [الكهف: ٤٩].
"আর আমলনামা সামনে রাখা হবে; অতঃপর এতে যা রয়েছে তার কারণে আপনি অপরাধীদেরকে ভীত-সন্ত্রস্ত দেখবেন। তারা বলবে, হায় আফসোস! এ কেমন আমলনামা, এ যে ছোট-বড় কোন কিছুই বাদ দেয়নি, সবই এতে লিপিবদ্ধ রয়েছে। তারা তাদের সমস্ত কৃতকর্মকে সামনে উপস্থিত পাবে। আর আপনার পালনকর্তা কারও প্রতি যুলুম করবেন না।¹
আল্লাহ্ তা'আলা আরও বলেন,
إِنَّ إِلَيْنَا إِيَابَهُمْ، ثُمَّ إِنَّ عَلَيْنَا حِسَابَهُمْ [الغاشية: ٢٥ - ٢٦].
“নিশ্চয়ই তাদের প্রত্যাবর্তন আমারই নিকট। অতঃপর তাদের হিসাব- নিকাশ আমারই দায়িত্বে।”²
আল্লাহ্ তা'আলা অন্যত্র বলেন,
زَعَمَ الَّذِيْنَ كَفَرُوا أَن لَّن يُبْعَثُوا قُلْ بَلَى وَرَبِّي لَتُبْعَتُنَّ ثُمَّ لَتُنَبَّؤُنَّ بِمَا عَمِلْتُمْ وَذَلِكَ عَلَى اللهِ يَسِيرٌ [التغابن: ٧ ]
“কাফেরগণ ধারণা করেছিল যে, তাদের কখনই পুনরুত্থান হবে না, আপনি বলুন, হ্যাঁ, আল্লাহর কসম! তোমরা অবশ্যই পুনরুত্থিত হবে অতঃপর তোমাদের আমল সমূহ অবশ্যই অবহিত করানো হবে। আর এটা আল্লাহর পক্ষে খুবই সহজ।”³
(৪) আল্লাহর অসন্তোষ থেকে নিজেকে হেফাযত করা :
যে সমস্ত কথা ও কর্ম মানুষকে আল্লাহর অসন্তুষ্টির দিকে ধাবিত করে সে সমস্ত কথা ও কর্ম সার্বিকভাবে বর্জন করে চলার দৃঢ় সংকল্প করতে হবে। কেননা মানুষের দুনিয়া ও আখেরাতের যাবতীয় সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য আল্লাহর সন্তুষ্টির উপরই নির্ভর করে।
রাসূল ﷺ বলেন,
مَنِ الْتَمَسَ رِضَا اللهِ بِسَخَطِ النَّاسِ كَفَاهُ اللَّهُ مُؤْنَةَ النَّاسِ وَمَنِ الْتَمَسَ رِضَا النَّاسِ بِسَخَطِ اللَّهِ وَكَلَهُ اللَّهُ إِلَى النَّاسِ.
“যে ব্যক্তি মানুষের অসন্তুষ্টিতেও আল্লাহর সন্তুষ্টি তালাশ করে আল্লাহ্ তা'আলা তার জন্য সার্বিক বিষয়ে যথেষ্ট হয়ে যান। আর যে ব্যক্তি আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে মানুষের সন্তুষ্টি তালাশ করে আল্লাহ্ তা'আলা তাকে মানুষের উপরই নির্ভরশীল করে দেন।”¹ একথা স্মরণ রাখতে হবে যে, বান্দার প্রতি আল্লাহর অসন্তুষ্টি আসার অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে গীবত।
(৫) আত্মসমালোচনা বা নিজের ত্রুটির প্রতি খেয়াল করা :
অন্যের ত্রুটি তালাশ করতে গিয়ে সময় নষ্ট না করে নিজের দোষ-ত্রুটি খুঁজে বের করে তা সংশোধন করার কাজে মনোনিবেশ করাই সচেতন ও বুদ্ধিমানের কাজ। নিজের ত্রুটি চিহ্নিত করে তা থেকে পরিশুদ্ধ হতে পারলেই সামাজিক মান-মর্যাদা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ সম্ভব।
সাবধান! নিজেকে রোগাক্রান্ত করে অন্য সঙ্গীর আরোগ্য অন্বেষণ করবেন না এবং নিজের অন্তরকে কলুষিত করে বাহ্যিক সৌন্দর্য প্রকাশের চেষ্টাও করবেন না। যে নিজেকে ধোঁকা দেয় সে কখনও অপরের জন্য হিতাকাঙ্খী হতে পারে না। কারণ যার মধ্যে নিজের নফসের জন্য কোন কল্যাণের চিন্তা নেই তার মধ্যে অপরের জন্যও কোন মঙ্গল থাকতে পারে না।
(৬) চরিত্র ধ্বংসের ভয় করা :
কোন ধরনের কথা ও আচরণ দ্বারা যেন কোন ক্রমেই উন্নত চরিত্র বিনষ্ট না হয়, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। আর গীবতের মত হারামে লিপ্ত হওয়া উন্নত চরিত্র নষ্টের অন্যতম কারণ।
(৭) বিপদ মুহূর্তে মূল সম্বল হারানোর ভয় :
দুনিয়ার জীবনে উপার্জিত পরকালীন পাথেয় নেকির সম্বল কিয়ামতের ময়দানে কঠিন বিভীষিকাময় অবস্থায় যেন এই জঘন্য অপরাধের কারণে অন্যকে দিয়ে দিতে না হয়, সেই ভয় সর্বদা অন্তরে জাগ্রত রাখা। রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেন,
مَنْ كَانَتْ لَهُ مَظْلَمَةٌ لِأَخِيهِ مِنْ عِرْضِهِ أَوْ شَيْءٍ فَلْيَتَحَلَّلَهُ مِنْهُ الْيَوْمَ قَبْلَ أَنْ لَا يَكُوْنَ دِينَارٌ وَلَا دِرْهَمْ إِنْ كَانَ لَهُ عَمَلٌ صَالِحٌ أُخِذَ مِنْهُ بِقَدْرِ مَظْلَمَتِهِ وَإِنْ لَمْ تَكُنْ لَهُ حَسَنَاتٌ أُخِذَ مِنْ سَيِّئَاتِ صَاحِيهِ فَحُمِلَ عَلَيْهِ.
“কেউ যদি কোন ভাইয়ের মান-সম্মান অথবা অন্য কিছু নষ্টের মাধ্যমে যুলুম করে থাকে, তাহলে সে যেন তা ঐদিন আসার পূর্বেই নিষ্পত্তি করে নেয়, যেদিন তার কোন দীনার ও দিরহাম কিছুই থাকবে না। যদি তা দুনিয়ায় নিষ্পত্তি না করে তাহলে কিয়ামত দিবসে ঐ অত্যাচারের পরিমাণ অনুযায়ী তার সৎ আমল নিয়ে মাযলুমকে দেয়া হবে। আর যদি কোন সৎ আমল না থাকে, তাহলে ঐ অত্যাচারিত ব্যক্তির গোনাহ্ নিয়ে তার কাঁধে চাপিয়ে দেয়া হবে।”¹
অনুরূপভাবে হাসান বাছরী (রাহেমাহুল্লাহ্) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, “জনৈক ব্যক্তি তাঁকে বলেন, অমুক ব্যক্তি আপনার গীবত করেছে, একথা শুনে তিনি এক ঝুড়ি আধা কাঁচা-পাকা খেজুর গীবতকারীর নিকট উপহার পাঠান এবং বলেন, আমি জানতে পারলাম যে, আপনি আমাকে অনেক নেকি উপহার দিয়েছেন। এর প্রতিদান স্বরূপ এ উপহারটুকু আপনার নিকট প্রেরণ করলাম। তবে ওযর পেশ করছি এই জন্য যে, আমি এর বিনিময় পরিপূর্ণভাবে দিতে সক্ষম হচ্ছি না।”²
(৮) অন্যের প্রতি যুলুম না করা :
অন্যের গীবতে লিপ্ত হওয়া নিঃসন্দেহে বড় ধরনের যুলুম। এই অত্যাচারের কারণে পরকালে অত্যাচারিত ব্যক্তির গোনাহের বোঝা নিজের কাঁধে আসবে এবং নিজের নেকি সমূহ তাকে দিয়ে দিতে হবে, যা পূর্বে উল্লেখিত হয়েছে। অতএব মহা বিপদ মুহূর্তে নিজের নেকির সম্বল যেন এই গীবতের কারণে হারিয়ে না যায়, সেদিকে অবশ্যই সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। রাসূল ﷺ বলেন,
الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُوْنَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ.
“প্রকৃত মুসলিম সেই যার হাত ও মুখের অত্যাচার থেকে অপর মুসলিমগণ নিরাপদে থাকে।”¹
(৯) নিজে যেমন ভাল ব্যবহার পেতে চাই, অপরের সাথে অনুরূপ ভাল ব্যবহার করা :
বহু মানুষ এমন রয়েছে যারা শুধু একাই মানুষের নিকট থেকে উত্তম আচরণ ও সম্মান পেতে চায়। কিন্তু অন্যকে ভাল আচরণ ও সম্মান দেয়ার কথা মোটেই চিন্তা করে না। এটা বড় অন্যায়, নিজে সম্মান পেতে হলে অন্যকে সম্মান দিতে হবে, অপরের সাহায্য পাওয়ার আশা করলে অন্যকেও অবশ্যই সাহায্য করতে হবে। তবেই তো নিজের নফসের উপর ইনছাফ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। রাসূল ﷺ বলেন,
لا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبُّ لأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ.
“নিজের জন্য যা পছন্দ করে তা অন্যের জন্যও পছন্দ না করা পর্যন্ত তোমাদের মধ্যে কেউ পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না।”²
অতএব নিজের কোন বিষয় নিয়ে মানুষ গীবতে লিপ্ত হোক এটা যেমন অপছন্দ করবে, ঠিক তেমনিভাবে অন্যের গীবতে লিপ্ত হওয়াকেও ঘৃণা করবে।
(১০) সৎ সঙ্গী গ্রহণ :
ভাল-মন্দ পথে পরিচালিত হওয়ার ক্ষেত্রে সঙ্গীর প্রভাব যথেষ্ট পরিলক্ষিত হয়। এজন্যই তো বলা হয় 'সৎ সঙ্গে স্বর্গ বাস অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ'। অতএব সঙ্গী যদি ভাল আচরণের হয় তাহলে সে গীবতের মত জঘন্য পাপ ও এর ভয়াবহ পরিণতি থেকে সঙ্গীকে অবশ্যই রক্ষা করার চেষ্টা করবে। এজন্যই রাসূল ﷺ বলেন,
مَثَلُ الْجَلِيسِ الصَّالِحِ وَالسَّوْءِ كَحَامِلِ الْمِسْكِ وَنَافِخِ الْكِيْرِ فَحَامِلُ الْمِسْكِ إِمَّا أَنْ يُحْذِيَكَ وَإِمَّا أَنْ تَبْتَاعَ مِنْهُ وَإِمَّا أَنْ تَجِدَ مِنْهُ رِيحًا طَيِّبَةً وَنَافِخُ الْكِيْرِ إِمَّا أَنْ يُحْرِقَ ثِيَابَكَ وَإِمَّا أَنْ تَجِدَ رِيحًا خَبِيثَةً.
“সৎ সঙ্গীর দৃষ্টান্ত হচ্ছে (মিস্ক) আতর বহনকারীর ন্যায় আর অসৎ সঙ্গীর দৃষ্টান্ত হচ্ছে কামারশালার (হাফরের) ন্যায়। অতএব (মিস্ক) আতর বহনকারী হয়ত তোমাকে একটু আতর (লাগিয়ে) দিবে অথবা তুমি একটু খরিদ করে নেবে, তাও যদি না হয় তাহলে অন্ততঃ একটু সুগন্ধি লাভ করতে পারবে। আর কামারশালার অবস্থা হচ্ছে এমন যে, তাতে তোমার কাপড় পুড়ে যাবে অথবা তুমি ঐ আগুন ও কয়লার দুর্গন্ধ পাবে।”¹
(১১) হিংসা ও পরশ্রীকাতরতা বর্জন :
অন্যের ধন-সম্পদ ও মান-মর্যাদা দেখে হিংসা ও পরশ্রীকাতরতা বর্জন করতে হবে। কেননা এর ফলে নেকি ও পুণ্য নষ্ট হয় এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি নেমে আসে। পক্ষান্তরে যার হিংসা করা হয় তার কোনই ক্ষতি হয় না। যা ইতিপূর্বে আলোচিত হয়েছে। এই পরশ্রীকাতরতা মহিলাদের মধ্যে বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়ে থাকে।
(১২) মরণের স্মরণ :
মৃত্যুর ভীষণ ব্যথাদায়ক যন্ত্রণা ও কবরের ভয়াবহ আযাবের প্রতি ঈমান রেখে তা থেকে বাঁচার জন্য প্রাণপন চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। কেননা গীবতের কারণেও মৃত্যুর শাস্তি কঠিন হবে।
(১৩) পরকালের পাথেয় সংগ্রহ:
বিভীষিকাময় কিয়ামত দিবসে আসল সম্বল হবে নিজের সৎ আমল। অতএব এই সম্বল যেন কোন খারাপ আমলের দ্বারা নষ্ট হয়ে না যায় সেদিকে সজাগ থাকতে হবে। আর সৎ আমল নষ্ট করার অন্যতম উপায় হচ্ছে গীবত।
(১৪) সালাফে সালেহীনের বাণী ও আমল থেকে শিক্ষা গ্রহণ :
এ মর্মে বহু দৃষ্টান্ত বিদ্যমান রয়েছে, তন্মধ্যে মাত্র দু'একটি উল্লেখ করা হল- যেমন- উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) বলেন, “তোমরা মানুষের সমালোচনা করা হতে সাবধান থাকবে। কেননা এটা হচ্ছে বড় মারাত্মক ব্যাধি। আর বেশী বেশী আল্লাহর যিকির করবে। কেননা এটা হচ্ছে রোগ নিরাময়ক মহৌষধ।”¹
আলী ইবনুল হুসাইন (রহঃ) জনৈক ব্যক্তিকে গীবতে লিপ্ত দেখে বলেন, “গীবতের বিষয়ে তুমি সাবধান থাকবে। কেননা এই গীবত হচ্ছে মানবরূপী কুকুরের তরকারী (খাদ্য)।”²
আবু আছেম বলেন, “গীবতের ভয়াবহ পরিণতির কথা আমি যখন জানতে পেরেছি তখন থেকে আর কখনই কারো গীবতে লিপ্ত হইনি”।¹
অনুরূপভাবে মায়মুন ইবনে সিয়াহ্-এর অবস্থা দেখুন, "মায়মুন ইবনে সিয়াহ্ কারো গীবত করতেন না এবং তার সামনে অন্য কারো গীবত করারও সুযোগ কাউকে দিতেন না। তিনি গীবতকারীকে কঠিনভাবে প্রতিহত করতেন এবং বাধা না শুনলে উক্ত মজলিস ছেড়ে উঠে যেতেন।”²
জনৈক ব্যক্তি হাসান বাছরী (রাহেমাহুল্লাহ্)-কে বলেন, “আপনি আমার গীবত করেছেন, জবাবে তিনি বলেন, আপনার মর্যাদা আমার নিকট ঐভাবে পৌঁছেনি যে, আমি আমার নেকিতে আপনাকে অংশীদার করব?”³ অর্থাৎ গীবত করলে নিজের পুণ্য দিয়ে তা পরিশোধ করতে হবে অতএব নিজের নেকি অন্য কাউকে দিতে চাই না।
ইবনুল মুবারক (রাহিমাহুল্লাহ্) বলেন, “আমি যদি কারো গীবতে লিপ্ত হতাম তাহলে আমার পিতা-মাতারই গীবত করতাম। কেননা তারা দু'জনই আমার নেকি পাওয়ার অধিক হকদার।”⁴
(১৫) খালেছ অন্তরে তাওবা করা :
গীবতের মত মহা পাপে লিপ্ত হয়ে পড়লে তা থেকে মুক্তি পেতে অবশ্যই তাওবা করতে হবে। কৃত অন্যায়ের জন্য যেমন তাওবা করতে হয়। তেমনিভাবে ভাল আমল বেশী বেশী করতে না পারার কারণেও তাওবা করা দরকার। আর শুধু মুখে তাওবা-আস্তাগফিরুল্লাহ্ বললেই পরিপূর্ণ তাওবা হবে না; বরং কুরআন-সুন্নাহর আলোকে বর্ণিত শর্তাবলী পালনের মাধ্যমে তাওবা হতে হবে।
টিকাঃ
১. সহীহ্ মুসলিম, 'আয-যিক্র ওয়াদ দু'আ' অধ্যায়, 'কিস্সাতু আসহাবিল গার আছ ছালাছাহ' অনুচ্ছেদ, হা/৪৯২৬।
২. সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১০২।
১. তিরমিযী, 'আল-বিরর ওয়াসসিলাহ' অধ্যায়, 'মা জাআ ফি মুআশারাতিন নাস' অনুচ্ছেদ, হা/১৯১০।
২. সূরা কাফ ১৮।
৩. সহীহ আল-বুখারী, 'রাকায়েক' অধ্যায়, 'হিফযুল লিসান' অনুচ্ছেদ, হা/৫৯৯৩।
১. তিরমিযী, 'আযযুহৃদু আন রাসূলিল্লাহ অধ্যায়, 'মা জাআ ফী হিফযিল লিসান' অনুচ্ছেদ, হা/২৩৩০।
২. তিরমিযী, 'আল-ঈমান আন রাসূলিল্লাহ' অধ্যায়, 'মা জাআ ফি হরমাতিস সালাত' অনুচ্ছেদ, হা/২৫৪১।
১. সূরা কাহাফ ৪৯।
২. সূরা গাশিয়াহ্ ২৫-২৬।
৩. সূরা তাগাবুন, আয়াত ৭।
১. তিরমিযী, 'আয-যুহৃদ' অধ্যায়, 'মা জাআ ফি হিফযিল লিসান' অনুচ্ছেদ, হা/২৪১৪, ২৩৩৮।
১. সহীহ্ আল-বুখারী, 'আল-মাযালেম ওয়াল গাস্ব' অধ্যায়, 'মান কানাত লাহু মাযলামাতুন ইন্দার রাজুলি' অনুচ্ছেদ, হা/২২৬৯।
২. ইহইয়া উলূমিদ দ্বীন, 'নামীমাহ্' অনুচ্ছেদ।
১. সহীহ্ আল-বুখারী, 'কিতাবুল ঈমান', 'বাবু আল-মুসলিমু মান সালিমাল মুসলিমূনা' হা/৯; সহীহ্ মুসলিম, 'কিতাবুল ঈমান', 'বাবু আল-মুসলিমু মান সালিমাল মুসলিমূনা' হা/৫৮।
২. সহীহ্ আল-বুখারী, 'আল-ঈমান' অধ্যায়, 'মিনাল ঈমানি আন ইউহিব্বা মা ইউহিব্বা' অনুচ্ছেদ, হা/১২; সহীহ্ মুসলিম, 'আল-ঈমান' অধ্যায়, 'আদ-দলীলু আলা আন্না মিন খেছালিল ঈমানি' অনুচ্ছেদ, হা/৬৪।
১. সহীহ আল-বুখারী, 'আল-বুয়ুঈ' অধ্যায়, 'ফিল আত্তার ও বায়ঈল মিস্ক' অনুচ্ছেদ, হা/১৯৫৯; সহীহ্ মুসলিম, 'আল-বির ওয়াসসিলাহ্ ওয়াল আদাব' অধ্যায়, 'ইস্তিহ্বাব মুজালাসাতিস সালিহীন' অনুচ্ছেদ, হা/৪৭৬২।
১. তাফসীর কুরতুবী, ১৬/২৮৭।
২. প্রাগুক্ত, ১৬/২৮৮।
১. তাফসীর কুরতুবী, ১৬/২৮৭।
২. তদেব।
৩. ইমাম নববী, আল-আযকার।
৪. তদেব।
📄 তাওবার শর্তাবলী
তাওবার জন্য উলামায়ে কেরাম কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ শর্তারোপ করেছেন। সেই শর্তাবলী পালন করা ব্যতীত মহান আল্লাহর নিকট তাওবা গৃহীত হওয়ার আশা করা যায় না। উল্লেখযোগ্য শর্তসমূহ নিম্নে বর্ণিত হল :
১. গোনাহের কাজ বর্জন করা :
আল্লাহর সর্ব প্রকার নাফরমানী বর্জন করা। যে গোনাহের কাজে লিপ্ত হয়েছে তা থেকে নিজকে পুরোপুরিভাবে বিরত থাকা।
২. অতীত অপরাধের কারণে আত্মানুশোচনা করা :
এই অনুশোচনা ব্যতীত কোন ব্যক্তির তাওবা সঠিক রূপ লাভ করতে পারে না। যে ব্যক্তি তাওবা করে অথচ কৃত অন্যায়ের প্রতি অনুতপ্ত হয় না, তাতে এটাই প্রমাণিত হয় যে, সে ঐ খারাপ ও গর্হিত কর্মের প্রতি সন্তুষ্ট রয়েছে। কেননা হাদীসে এই অনুশোচনা ও অনুতপ্ত হওয়াকেই তাওবা বলা হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, “কৃতকর্মের প্রতি প্রকৃত অনুশোচনাই হচ্ছে তাওবা”।¹
উলামায়ে কেরাম বলেন, এই অনুতাপ ও অনুশোচনার লক্ষণ হচ্ছে, সর্বদা আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করা ও সেই অপরাধের কথা অন্যের নিকট প্রকাশ না করা।
৩. অতীত পাপকার্য পুনরায় না করার দৃঢ় সংকল্প করা :
জীবনে যত বাধাই আসুক, যত যুলম-নির্যাতন হোক না কেন কোনক্রমেই অতীত পাপ কর্ম পুনরায় না করার দৃঢ় সংকল্প করা। তবে মুমিনের চরম শত্রু অভিশপ্ত শয়তানের কুমন্ত্রণায় পড়ে যদি দ্বিতীয় বার সেই পাপে লিপ্ত হয়েই যায়, তাহলে পরম করুণাময় মহান আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হয়ে পুনরায় দৃঢ় সংকল্পের সাথে তাওবা করতে হবে। আশা করা যায় যে, আল্লাহ তার তাওবা কবুল করতে পারেন। হাদীসে কুদসীতে রাসূল ﷺ বলেন, 'আল্লাহ বলেন, আমার কোন বান্দা গোনাহ করার পর যখন বলে, হে আল্লাহ! তুমি আমার গোনাহ মাফ কর। তখন মহান আল্লাহ পাক বলেন, আমার বান্দা গোনাহ করে কিন্তু এ বিশ্বাস রাখে যে, তার রব্ব (প্রতিপালক) আছেন, তিনি এই গোনাহ মাফ করেন আবার চাইলে এই গোনাহের কারণে পাকড়াও করেন। এভাবে সে পাপ করতে থাকে এবং তাওবাও করতে থাকে। তৃতীয় কিংবা চতুর্থবারে আল্লাহ বলেন, 'তোমার যা খুশী করতে থাক, আমি তোমাকে মাফ করে দিয়েছি'।' অর্থাৎ যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি পাপের কারণে অনুতপ্ত হয়ে তাওবা করতে থাকবে, আমি ততক্ষণ মাফ করতে থাকব। এ হচ্ছে মহান আল্লাহর বিশেষ রহমতের কথা।
অতি সতর্কতার সাথে বিশেষভাবে স্মরণ রাখা দরকার যে, কোনক্রমেই যেন একই পাপ কার্য বার বার সংঘটিত না হয় এবং মনে এ আশাও যেন না থাকে যে, গোনাহ্ করতে থাকি পরে কোন এক সময় তাওবা করে নেব। কেননা পাপ করার পর তা থেকে তাওবা করার সুযোগ নাও মিলতে পারে।
পক্ষান্তরে যারা আল্লাহর আযাবের ভয়ে এবং অসংখ্য নেয়ামতের আশায় বার বার গোনাহে লিপ্ত না হয়, মহান আল্লাহ তাদের জন্য বিশেষ পুরস্কারের কথা ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ পাক বলেন,
وَالَّذِيْنَ إِذا فَعَلُوا فَاحِشَةً أَوْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللَّهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِدُنُوبِهِمْ وَمَنْ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا اللهُ وَلَمْ يُصِرُّوا عَلَى مَا فَعَلُوْا وَهُمْ يَعْلَمُوْنَ، أَوْلَئِكَ جَزَاؤُهُم مَّغْفِرَةٌ مِّن رَّبِّهِمْ وَجَنَّاتٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَنِعْمَ أَجْرُ العَامِلِينَ [آل عمران: ١٣٥ - ١٣٦]
'তারা কখনও কখনও অশ্লীল কাজ করে ফেললে কিংবা কোন মন্দ কাজে জড়িত হয়ে নিজের উপর যুলুম করে ফেললে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং স্বীয় পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আল্লাহ ছাড়া আর কে পাপ ক্ষমা করবেন? (তিনি ব্যতীত ক্ষমা করার কেউ নেই) তারা নিজের কৃতকর্মের জন্য হঠকারিতা প্রদর্শন করে না এবং জেনে শুনে তা-ই করতে থাকে না। তাদেরই জন্য প্রতিদান হল তাদের পালনকর্তার ক্ষমা ও জান্নাত, যার তলদেশে প্রবাহিত হচ্ছে নহরসমূহ, যেখানে তারা থাকবে অনন্ত কাল। যারা সৎ কাজ করে তাদের জন্য কতইনা চমৎকার প্রতিদান”।¹
উপরোক্ত শর্তসমূহ একান্তই আল্লাহ ও বান্দার সাথে সম্পৃক্ত। তবে হক্কুল ইবাদ (বান্দার অধিকার) নষ্টের কারণে তাওবার জন্য উক্ত শর্তসমূহের সাথে অন্য আরেকটি শর্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে।
৪. অন্যায়ভাবে নষ্টকৃত সম্পদ ও সম্মান মালিকের নিকট ফিরিয়ে দেয়া :
উলামায়ে কেরাম বলেন, অন্যের সম্পদ জবর-দখল কিংবা চুরি করে থাকলে বা যে কোন উপায়ে আত্মসাৎ করলে তা সেই মালিককে প্রকাশ্যে হোক বা অপ্রকাশ্যে হোক ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। কোন ক্রমেই যদি প্রকৃত মালিককে খুঁজে বের করা সম্ভব না হয়, তাহলে সমপরিমাণ অর্থ-সম্পদ তার পক্ষ থেকে সাদাক্বাহ করে দিবে এবং তার জন্য বেশী বেশী দু'আ করবে।
অপরাধ যদি এমন বিষয় হয় যা বাস্তবে ফেরৎ দেওয়া সম্ভব নয়, যেমন গীবত করা কিংবা পরস্পরের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে অপপ্রচার করা ইত্যাদি। এমতাবস্থায় ফেৎনা সৃষ্টির ভয় না থাকলে সরাসরি তার নিকট বিষয়টি উল্লেখপূর্বক ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। কেননা এটা বান্দার হক্ব। সুতরাং বান্দা ক্ষমা না করলে আল্লাহও ক্ষমা করবেন না।²
তবে ফেৎনা সৃষ্টির ভয় থাকলে তাকে অবহিত না করেই সে ব্যক্তির অগোচরে তার জন্য অধিক পরিমাণে দু'আ ও ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। যেসব স্থানে ঐ ব্যক্তির গীবত ও দোষচর্চা করা হয়েছে, সেসব স্থানে খালেছ অন্তরে সুনাম ও ভাল গুণাবলীর কথা আলোচনা করতে হবে, তাহলে আশা করা যায়, আল্লাহ তাকে মাফ করতে পারেন। তবে অতি উত্তম হল এ ধরনের জঘণ্য পাপে লিপ্ত না হওয়া।
অনুরূপভাবে বান্দার ধন-সম্পদ, মান-সম্মান ইত্যাদি অন্যায়ভাবে নষ্ট করলে আল্লাহ ক্ষমা করবেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত উক্ত ব্যক্তি ক্ষমা না করে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,
مَنْ كَانَتْ لَهُ مَظْلَمَةٌ لأَخِيهِ مِنْ عِرْضِهِ أَوْ شَيْءٍ فَلْيَتَحَلَّلَهُ مِنْهُ الْيَوْمَ قَبْلَ أَنْ لا يَكُوْنَ دِينَارٍ وَلَا دِرْهَم ....
'যদি কোন ব্যক্তি অন্যের ইযযত নষ্ট কিংবা অন্য কিছু হরণ করে থাকে, তাহলে সে যেন ঐ দিন আসার পূর্বেই তা নিষ্পত্তি করে নেয়, যে দিন তার কোন দীনার-দিরহাম কিছুই থাকবে না। অর্থাৎ ক্বিয়ামতের দিন। কেননা সে দিন তার মাফ নেওয়ার কোনই উপায় থাকবে না'।¹*
উল্লেখিত আলোচনার আলোকে আল্লাহ্ যেন আমাদেরকে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও জাতীয় চরিত্র সংশোধনের তাওফীক দান করেন এবং পরকালীন ভীষণ শাস্তি থেকে হেফাযত করেন- আমীন!
টিকাঃ
১. ইবনু মাজাহ, হা/৪২৫২। হাদীছটি শায়খ নাছিরুদ্দীন আলবানী ছহীহ বলেছেন। দ্র. ছহীহ আল-জামিউছ ছগীর, হা/৬৬৭৮।
১. সহীহ মুসলিম, 'কিতাবুত তাওবা', হা/২৭৫৮।
১. সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৩৫-১৩৬।
২. বায়হাক্বী, মিশকাত, হা/৪৮৭৪।
১. সহীহ্ আল-বুখারী, 'কিতাবুল মাযালেম', হা/২১৯৯।
* এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে লেখকের "কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে তাওবা" নামক বইটি পড়ুন।
📄 কতিপয় জরুরী দু'আ
দুশ্চিন্তা ও মুসীবতের দু'আ
لا إِلَهَ إِلا اللهُ الْعَظِيمُ الْحَلِيمُ لا إِلَهَ إِلا اللَّهُ رَبُّ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَرَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ.
“আল্লাহ্ ছাড়া সত্য কোন উপাস্য নেই। তিনি সুমহান মহাসহিষ্ণু। আল্লাহ্ ব্যতীত সত্য কোন উপাস্য নেই। তিনি আকাশ ও যমীনের পালনকর্তা এবং সুমহান আরশের অধিপতি।”¹
কোন মানুষ যদি দুশ্চিন্তা ও দুর্ভাবনায় পতিত হয় অতঃপর নিম্নলিখিত দু'আটি পাঠ করে, তবে আল্লাহ্ তার দুশ্চিন্তা ও দুর্ভাবনাকে দূর করে তা আনন্দ ও খুশি দ্বারা পরিবর্তন করে দিবেন।
اللَّهُمَّ إِنِّي عَبْدُكَ وَابْنُ عَبْدِكَ وَابْنُ أَمَتِكَ نَاصِيَتِي بِيَدِكَ مَاضٍ فِيَّ حُكْمُكَ عَدْلٌ فِيَّ قَضَاؤُكَ أَسْأَلُكَ بِكُلِّ اسْمٍ هُوَ لَكَ سَمَّيْتَ بِهِ نَفْسَكَ أَوْ عَلَّمْتَهُ أَحَدًا مِنْ خَلْقِكَ أَوْ أَنْزَلْتَهُ فِي كِتَابِكَ أَوِ اسْتَأْثَرْتَ بِهِ فِي عِلْمِ الْغَيْبِ عِنْدَكَ أَنْ تَجْعَلَ الْقُرْآنَ رَبِيعَ قَلْبِي وَنُورَ صَدْرِي وَجِلاءَ حُزْنِي وَذَهَابَ هَمِّي.
“হে আল্লাহ্! আমি আপনার বান্দা, আপনারই এক বান্দার সন্তান এবং এক বান্দীর ছেলে। আমার সর্বস্ব আপনার হাতে, আমার ব্যাপারে আপনার হুকুম কার্যকর, আমার প্রতি আপনার ফায়সালা ইনসাফপূর্ণ। আমি প্রার্থনা করছি, আপনার সেই সকল প্রতিটি নামের মাধ্যমে যা দ্বারা আপনি নিজের নাম রেখেছেন অথবা সৃষ্টিকুলের কাউকে আপনি তা জানিয়েছেন অথবা আপনার কিতাবে উহা নাযিল করেছেন অথবা আপনার অদৃশ্য জ্ঞানে উহা সঞ্চিত করে রেখেছেন। আমি প্রার্থনা করছি যে, কুরআনকে আমার অন্তরের প্রশান্তি ও বক্ষের জ্যোতি স্বরূপ করে দিন এবং আমার সকল দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনা দূর হওয়া ও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা অপসারণ হওয়ার মাধ্যম বানিয়ে দিন।”¹
ঋণ পরিশোধের দু'আ
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوْذُ بِكَ مِنْ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ وَأَعُوْذُ بِكَ مِنَ الْعَجْزِ وَالْكَسَلِ وَأَعُوْذُ بِكَ مِنْ الْجُبْنِ وَالْبُخْلِ وَأَعُوْذُ بِكَ مِنْ غَلَبَةِ الدَّيْنِ وَقَهْرِ الرِّجَالِ
“হে আল্লাহ্! আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি দুশ্চিন্তা ও দুর্ভাবনা থেকে, অপারগতা ও অলসতা থেকে, কৃপণতা ও কাপুরুষতা থেকে, ঋণের ভার ও মানুষের অত্যাচার থেকে।”²
ক্ষমা প্রার্থণার প্রধান দু'আ
اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لا إله إلا أَنْتَ، خَلَقْتَنِي وَأَنا عَبْدُكَ، وَأَنا عَلَى عَهْدِكَ، وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ، أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ، أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ، وَأَبُوْءُ بِذَنْبِي، فَاغْفِرْ لِي فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ
“হে আল্লাহ্ তুমি আমার প্রভু প্রতিপালক, তুমি ছাড়া ইবাদতযোগ্য কোন ইলাহ্ নেই, তুমি আমাকে সৃষ্টি করেছো এবং আমি তোমার বান্দা। আমি সাধ্যানুযায়ী তোমার সাথে কৃত ওয়াদা-অঙ্গীকার রক্ষা করছি। আমার কৃতকর্মের অনিষ্ট থেকে তোমার কাছে আশ্রয় কামনা করছি। আমার প্রতি তোমার নেয়া'মত স্বীকার করছি এবং তোমার দরবারে আমার পাপকর্মেরও স্বীকারোক্তি দিচ্ছি। সুতরাং তুমি আমায় ক্ষমা কর। কেননা তুমি ছাড়া পাপরাশী কেহই ক্ষমা করতে পারে না।” এই দু'আটি কেউ সকালে পড়ে সন্ধ্যার পূর্বে ইন্তেকাল করলে এবং সন্ধ্যায় পড়ে সকাল হওয়ার পূর্বে ইন্তেকাল করলে সে জান্নাতী হবে”।¹
يا حَيُّ يَا قَيُّومُ بِرَحْمَتِكَ اسْتَغِيْثُ فَاصْلِحْ لِي شَانِي كُلُّهُ وَلَا تَكِلْنِي إِلَى نَفْسِي طرفة عين .
'হে চিরঞ্জীব, চিরস্থায়ী! তোমার রহমতের দ্বারা আমি ফরিয়াদ ও সাহায্য প্রার্থনা করছি। সুতরাং আমার সকল অবস্থা সংশোধন করে দাও এবং এক পলকের জন্য হলেও আমাকে আমার নিজের উপর ছেড়ে দিও না'।²
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوْذُ بِكَ مِنْ الْعَجْزِ وَالْكَسَلِ وَالْجُبْنِ وَالْبُخْلِ وَالْهَرَمِ وَعَذَابِ الْقَبْرِ اللَّهُمَّ آتِ نَفْسِي تَقْوَاهَا وَزَكَهَا أَنْتَ خَيْرُ مَنْ زَكَاهَا أَنْتَ وَلِيُّهَا وَمَوْلاهَا اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عِلْمٍ لَا يَنْفَعُ وَمِنْ قَلْبٍ لَا يَخْشَعُ وَمِنْ نَفْسٍ لَا تَسْبَعُ وَمِنْ دَعْوَةٍ لَا يُسْتَجَابُ لَهَا .
“হে আল্লাহ্! আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি অপারগতা ও অলসতা থেকে, কাপুরুষতা ও ভীরুতা এবং কৃপণতা ও অতি বার্ধক্যতা থেকে এবং কবরের আযাব থেকে। হে আল্লাহ্! আপনি আমার নক্সকে তাকওয়া ও পবিত্রতা এবং স্বচ্ছতা দান করুন। কেননা কেবলমাত্র আপনি নফসের পবিত্রতা দানকারী এবং অভিভাবক ও পরিচালক। হে আল্লাহ্! যে ইল্ল্ম কোন উপকারে আসে না সে ইল্ম থেকে আপনার নিকট পানাহ্ চাই এবং যে হৃদয় আপনার ভয়ে ভীত হয় না, যে আত্মা পরিতৃপ্ত হয় না এবং যে দু'আ কবুল করা হয় না, তা থেকে আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি”।³
اللهم إني أسألُكَ العَافِيةَ فِي الدُّنْيا والآخِرَةِ، اللهمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ العَفْوَ والعَافِيَةُ فِي دِينِي وَدُنْيَايَ وَأهْلِي ومالي اللهمَّ اسْتُرْ عَوْرَاتِي وَآمِنْ رَوْعَاتِي اللهمَّ احْفَظْنِي مِنْ بَيْنَ يَدَيَّ وَمِنْ خَلْفِي، وَعَنْ يَمِينِي، وَعَنْ شِمَالِي، وَمِنْ فَوْقِي، وَأَعُوذُ بِعَظَمَتِكَ انْ اغْتَالَ مِنْ تَحْتِي
“হে আল্লাহ্! আমি তোমার কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের নিরাপত্তা কামনা করছি। হে আল্লাহ্! আমি প্রার্থনা করছি তোমার কাছে ক্ষমার এবং আমার দ্বীন, দুনিয়া, পরিবার-পরিজন এবং সম্পদের নিরাপত্তা। হে আল্লাহ! আমার গোপন বিষয় সমূহ (দোষ-ত্রুটি) ঢেকে রাখ এবং আমাকে ভয়- ভীতি থেকে নিরাপদ রাখ। হে আল্লাহ্! তুমি আমাকে হেফাযত কর আমার সম্মুখ থেকে, পিছন থেকে, ডান দিক থেকে, বাম দিক থেকে এবং উপর দিক থেকে। আর তোমার মাহাত্ম্যের অসীলা দিয়ে তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি নিম্ন দিক থেকে মাটি ধসে আমার আকস্মিক মৃত্যু থেকে।”¹
اللهم فَاطِرَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ، عَالِمُ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ، رَبَّ كُلِّ شَيْءٍ وَمَلِيْكَهُ، أَشْهَدُ أَنْ لا إله إلا أَنْتَ، أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ نَفْسِي، وَشَرِّ الشَّيْطَانِ وَشِرْكِهِ، وَإِنْ اقْتَرِفَ عَلَى نَفْسِي سُوْءٌ، أَوْ أَجُرُّهُ إِلَى مُسْلِمٍ.
“হে আল্লাহ্! তুমি আসমান-যমীনের সৃষ্টিকর্তা, তুমি প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সবকিছুই জান। তুমি সকল বস্তুর প্রভু ও মালিক, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তুমি ছাড়া প্রকৃত সত্য কোন মা'বূদ নেই। আমি আমার আত্মার অনিষ্ট থেকে তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি এবং শয়তান ও তার শিরকের অনিষ্ট থেকে। আর আশ্রয় কামনা করছি নিজের উপর অন্যায় করা থেকে বা সে অন্যায় কোন মুসলিমের উপর চাপিয়ে দেয়া থেকে।”²
টিকাঃ
১. তিরমিযী।
১. মুসনাদ আহমাদ।
২. আবু দাউদ, তিরমিযী, হা/৩৪২৪।
১. সহীহ্ আল-বুখারী।
২. মুসনাদ আহমাদ, তিরমিযী, হা/৩৫২৪।
৩. সহীহ মুসলিম।
১. আবু দাউদ, হা/৫০৭৪; ইবনু মাজাহ, হা/৩৮৭১।
২. আবু দাউদ, তিরমিযী, হা/৩৫২৯; সিলসিলা ছহীহাহ হা/২৭৬৩।