📘 গীবত ভয়াবহ পরিনতি ও পরিত্রাণের উপায় > 📄 গীবতকারীকে বাধা দেয়ার ফযীলত

📄 গীবতকারীকে বাধা দেয়ার ফযীলত


গীবতকারীকে তার গীবতে বাধা দিতে যদি সক্ষম না হয় কিংবা গীবতের ভয়াবহ পরিণতির কথা বলার পরও যদি না শোনে ও না মানে, তাহলে যে মজলিসে গীবত করা হচ্ছে সে মজলিস অবশ্যই ত্যাগ করবে। গীবতের মত অশ্লীল কথা ও কর্ম বর্জন করে চলা মুমিনদের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।
আল্লাহ্ তা'আলা বলেন,
وَالَّذِيْنَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ [المؤمنون: ٣]
“যারা অসার ক্রিয়াকলাপ থেকে বিরত থাকে (তারাই পরিত্রাণ প্রাপ্ত মুমিন)।”¹
"মায়মুন বিন সিয়াহ্ কারো গীবত করতেন না এবং তার সামনে অন্য কারো গীবত করারও সুযোগ কাউকে দিতেন না। গীবতকারীকে কঠিনভাবে বাধা দিতেন এবং বাধা না শুনলে সে মজলিস ছেড়ে উঠে যেতেন।”²
যারা গীবতে লিপ্ত হয়, তারাই তো গীবত সংক্রান্ত আল্লাহর আয়াতকে অস্বীকার করে এবং এর প্রতি ঠাট্টা-বিদ্রুপও করে। সুতরাং গীবতকারীগণও নিঃসন্দেহে আল্লাহর আয়াতকে অস্বীকার ও তার প্রতি ঠাট্টা- বিদ্রুপকারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।

নিজে গীবতের মত জঘন্য অপরাধ থেকে বেঁচে থাকলে যেমন আল্লাহর নিকট মর্যাদা লাভ করা যায়, তেমনিভাবে সমাজেও সম্মানিত ও মর্যাদাবান হওয়া যায়। কোন গীবতকারীকে বাধা দিলেও আল্লাহ্ তা'আলা দুনিয়া ও আখেরাতে সাহায্য-সহযোগিতা ও মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেন,
مَا مِنْ امْرِئٍ يَخْذُلُ امْرَاً مُسْلِمًا فِي مَوْضِعٍ تُنْتَهَكُ فِيْهِ حُرْمَتُهُ وَيُنْتَقَصُ فِيْهِ مِنْ عِرْضِهِ إِلَّا خَذَلَهُ اللَّهُ فِي مَوْطِنٍ يُحِبُّ فِيْهِ نُصْرَتَهُ وَمَا مِنْ امْرِئٍ يَنْصُرُ مُسْلِمًا فِي مَوْضِعٍ يُنْتَقَصُ فِيْهِ مِنْ عِرْضِهِ وَيُنْتَهَكُ فِيْهِ مِنْ حُرْمَتِهِ إِلَّا نَصَرَهُ اللَّهُ فِي مَوْطِنٍ يُحِبُّ نُصْرَتَهُ.
“যে ব্যক্তি কোন স্থানে কোন মুসলিমের মান-সম্মান এবং ইজ্জত ও সম্ভ্রম নষ্ট করে অর্থাৎ সম্মান ক্ষুণ্ণ করে, আল্লাহ্ তাকে ঐ স্থানে বেইজ্জত ও অপমানিত করেন যেস্থানে সে তার নিজের সাহায্য-সহযোগিতা পাওয়া পছন্দ করে বা আশা করে। অপরদিকে যে ব্যক্তি কোন মুসলিমের মান- সম্মান এবং ইজ্জত ও সম্ভ্রম রক্ষায় সাহায্য-সহযোগিতা করে বা সম্মান রক্ষা করে আল্লাহ্ তাকে সেই স্থানে সাহায্য-সহযোগিতা করেন যেখানে সে তার নিজের সাহায্য-সহযোগিতা পাওয়ার আশা করে।”¹ অপর এক হাদীসে এসেছে-
مَنْ حَمَى مُؤْمِنًا مِنْ مُنَافِقٍ أَرَاهُ قَالَ بَعَثَ اللَّهُ مَلَكًا يَحْمِي لَحْمَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ نَارِ جَهَنَّمَ وَمَنْ رَمَى مُسْلِمًا بِشَيْءٍ يُرِيدُ شَيْنَهُ بِهِ حَبَسَهُ اللَّهُ عَلَى حِسْرِ جَهَنَّمَ حَتَّى يَخْرُجَ مِمَّا قَالَ.
রাসূলে করীম ﷺ বলেন, “যে ব্যক্তি কোন মুমিনকে মুনাফিকের কুচক্র থেকে রক্ষা করে কিয়ামত দিবসে আল্লাহ্ তা'আলা ফিরিস্তা প্রেরণ করে তার শরীরকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন। আর যে ব্যক্তি দোষ-ত্রুটি বর্ণনার দ্বারা কোন মুসলিমকে কষ্ট দেয় আল্লাহ্ তা'আলা তাকে জাহান্নামের উপর কঠিন পুলসিরাতে আটকে রাখবেন যতক্ষণ পর্যন্ত সে তার কৃত অপরাধ থেকে মুক্ত হতে না পারবে।”²
অপর হাদীসে রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেন,
مَنْ رَدَّ عَنْ عِرْضِ أَخِيهِ رَدَّ اللَّهُ عَنْ وَجْهِهِ النَّارَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ .
“যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের সম্মান রক্ষার জন্য প্রতিরোধ করে আল্লাহ্ তা'আলা কিয়ামত দিবসে তাকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করবেন।”¹
রাসূল ﷺ আরো বলেন,
قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ ذَبَّ عَنْ لَحْمٍ أَخِيهِ فِي الْغِيْبَةِ كَانَ حَقًّا عَلَى اللَّهِ أَنْ يُعْتِقَهُ مِنْ النَّارِ .
আসমা বিনতে ইয়াযিদ হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল ﷺ বলেছেন “যে ব্যক্তি তার অপর ভাইয়ের গীবতকারীকে বাধা দেয় বা প্রতিরোধ করে তাকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব আল্লাহর উপর বর্তায়।”²
সুবহানাল্লাহ্! সমাজে শান্তি-শৃংখলা ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠা এবং মুসলিম মিল্লাতের মধ্যে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ বজায় রাখতে উৎসাহিত করার জন্যই আদর্শ সমাজ সংস্কারক মুহাম্মাদ ﷺ এ ধরনের লোভনীয় নির্দেশ দিয়েছেন। অপরদিকে কঠিন কথাও বলেছেন, মা আয়েশা (রাযিআল্লাহু আনহা) যখন ছাফিয়্যাহ্ (রাযিআল্লাহু আনহা)-এর ব্যাপারে রাসূল ﷺ-এর নিকট একটু খাটো বলে মন্তব্য করেছিলেন তখন রাসূল ﷺ বলেছিলেন তুমি এমন মারাত্মক কথা বলেছ, যা সমুদ্রের পানিতে মিশিয়ে দিলে সমুদ্র বরাবর হয়ে যাবে।³
অতএব যে ব্যক্তি এই লোভনীয় বিষয়টি লুফে নিতে পারবে এবং কঠিন হুঁশিয়ারী থেকে মুক্ত থাকতে পারবে, সেই তো দুনিয়া ও আখেরাতে লাভবান হবে এবং সুন্দর সমাজ গড়তে সহযোগিতা করবে।

টিকাঃ
১. সূরা মুমিনূন, আয়াত ৩।
২. তাফসীর কুরতুবী, ১৬/২৮৭।
১. আবু দাউদ, 'আল-আদাব' অধ্যায়, 'মান রাদ্দা আন মুসলিমীন গীবাতান' অনুচ্ছেদ, হা/৪২৪০, ৪৪৮৪।
২. আবু দাউদ, 'আল-আদাব' অধ্যায়, 'মান রাদ্দা আন মুসলিমীন গীবাতান' অনুচ্ছেদ, হা/৪২৩৯, ৪৮৮৩।
১. তিরমিযী, 'আল-বির ওয়াসিলাহ্' অধ্যায়, 'আয-যাব্বু আন ইরযেল মুসলিম' অনুচ্ছেদ, হা/১৮৫৪, ১৯৩১।
২. মুসনাদ আহমাদ, হা/২৪৩২৮।
৩. আবু দাউদ, 'আদব' অধ্যায়, 'গীবত' অনুচ্ছেদ, হা/৪২৩২।

📘 গীবত ভয়াবহ পরিনতি ও পরিত্রাণের উপায় > 📄 গীবতে লিপ্ত হওয়ার কারণ ও পরিত্রাণের উপায়

📄 গীবতে লিপ্ত হওয়ার কারণ ও পরিত্রাণের উপায়


(১) শত্রুতা ও হিংসা-বিদ্বেষ :
দুনিয়াবী সামান্য কোন ব্যক্তিগত কারণ নিয়ে মানুষ শত্রুতে পরিণত হয়। অবশেষে এরই সূত্র ধরে গীবতে লিপ্ত হয়। তেমনিভাবে অন্যের প্রতি আল্লাহ্ প্রদত্ত নিয়ামতের ধ্বংস কামনা কল্পে মানুষ নিজে থেকেই গীবত চর্চা শুরু করে।
কোন মজলিসে যদি খ্যাতিমান কোন জনপ্রিয় ব্যক্তির সুনাম ও প্রশংসা করা হয় অথবা আল্লাহ্ প্রদত্ত কোন নেয়ামতের উল্লেখ করা হয় আর তা কোন হিংসুক ব্যক্তি শোনে তখন সে হিংসার বশবর্তী হয়ে ঐ সম্মানিত ব্যক্তির মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করার হীন উদ্দেশ্যে গীবতে লিপ্ত হয়। চিন্তা করে যে, অমুক ব্যক্তি এত ধন-সম্পদ, মান-মর্যাদার অধিকারী হয়ে গেছে আর আমি তার তুলনায় কিছুই পাইনি। আল্লাহ্ তাকে যা দান করেছেন তাতে সে পরিতৃপ্ত নয় এবং অন্যকে যা দান করেছেন তাতেও সে আল্লাহর ফায়সালার প্রতি সন্তুষ্ট নয়। সর্বদা মনের মধ্যে হিংসার আগুন জ্বালিয়েই রাখে। ফলে হিংসার বশবর্তী হয়ে ঐ নেয়ামত প্রাপ্ত ব্যক্তির নেয়ামতকে ক্ষুণ্ণ বা ধ্বংস করার জন্য কু-মতলব অন্তরে রেখে ছোট-খাট বিষয় নিয়ে অন্যের সামনে হিংসাত্মক কথা ও আচরণ পেশ করে থাকে যা স্পষ্ট গীবতের শামিল।
أَمْ يَحْسُدُوْنَ النَّاسَ عَلَى مَا آتَاهُمُ اللهُ مِنْ فَضْلِهِ [النساء: ٥٤]
“মহান আল্লাহ্ নিজ অনুগ্রহে মানুষকে যা দিয়েছেন সেজন্য কি তারা তাদের হিংসা করে?”।¹
এই গীবতের ফলে ঐ ব্যক্তির কোনই ক্ষতি হয় না; বরং সে তাকে দুনিয়া ও আখেরাতে আরো মর্যাদায় উন্নীত করে এবং নিজের পুণ্যের (নেকির) ঝুলি থেকে গীবতের পরিমাণ অনুযায়ী তাকে দিতে থাকে ও তার গোনাহের বোঝা নিজের কাঁধে চাঁপিয়ে নিতে থাকে, যা হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,
مَنْ كَانَتْ لَهُ مَظْلَمَةٌ لأَخِيهِ مِنْ عِرْضِهِ أَوْ شَيْءٍ فَلْيَتَحَلَّلْهُ مِنْهُ الْيَوْمَ قَبْلَ أَنْ لَا يَكُوْنَ دِينَارٌ وَلَا دِرْهَم ....
'যদি কোন ব্যক্তি অন্যের ইযযত নষ্ট কিংবা অন্য কিছু হরণ করে থাকে, তাহলে সে যেন ঐ দিন আসার পূর্বেই তা নিষ্পত্তি করে নেয়, যে দিন তার কোন দীনার ও দিরহাম কিছুই থাকবে না। অর্থাৎ কিয়ামতের দিন। কেননা সেদিন তার মাফ নেয়ার কোনই উপায় থাকবে না'।¹

পরিত্রাণের উপায় :
দুনিয়া ও আখেরাতে হিংসার মারাত্মক পরিণতির কথা সর্বদা মনে রাখতে হবে। একথাও স্মরণ রাখতে হবে যে, এই হিংসার কারণেই দুনিয়া ও আখেরাতে সে নিজে যেমন ছোট হচ্ছে, ঠিক তেমনিভাবে যার প্রতি হিংসা করা হচ্ছে তার মান-মর্যাদা অধিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আরও হুঁশিয়ার থাকতে হবে, যেন হিংসার বশবর্তী হয়ে জীবনে উপার্জিত সমস্ত নেকি বরবাদ না হয়ে যায়।
হিংসাকারী মূলতঃ দু'টি ঘৃণ্যতম পাপে লিপ্ত হয়। যথা- হিংসা ও গীবত। আর দু'টিরই পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ। এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল ﷺ বলেন,
لا تَحَاسَدُوا وَلَا تَنَاجَسُوا وَلَا تَبَاغَضُوا وَلَا تَدَابَرُوْا وَلَا يَبِعْ بَعْضُكُمْ عَلَى بَيْعِ بَعْضٍ وَكُوْنُوْا عِبَادَ اللَّهِ إِخْوَانًا الْمُسْلِمُ أَخُو الْمُسْلِمِ لَا يَظْلِمُهُ وَلَا يَخْذُلُهُ وَلَا يَحْقِرُهُ التَّقْوَى هَاهُنَا وَيُشِيرُ إِلَى صَدْرِهِ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ بِحَسْبِ امْرِئٍ مِنْ الشَّرِّ أَنْ يَحْقِرَ أَخَاهُ الْمُسْلِمَ كُلُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ حَرَامٌ دَمُهُ وَمَالُهُ وَعِرْضُهُ.
“তোমরা পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ ও অকল্যাণ কামনা করো না, পরস্পর ঘৃণা ও শত্রুতা পোষণ করো না এবং দোষ-ত্রুটিও তালাশ করে বেড়িও না। আর অন্যের বেচা-কেনার মধ্যে শরীক হয়ো না (কেনার উদ্দেশ্য ছাড়াই দাম বৃদ্ধি করো না। অর্থাৎ দালালী করো না); বরং আল্লাহ্র বান্দা হিসাবে সবাই ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যাও। একজন মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। অতএব ঐ ভাইয়ের প্রতি কোন ধরনের যুগ্ম অত্যাচার করবে না, সাহায্য-সহযোগিতাও বর্জন করবে না এবং তুচ্ছও মনে করবে না। অতঃপর স্বীয় বুকের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনবার বলেন, তাকওয়া এখানে। কোন ব্যক্তির খারাপ হওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে, সে তার মুসলিম ভাইকে তুচ্ছ মনে করবে। প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অপর মুসলিমের রক্ত, সম্পদ ও মান-সম্মান এবং ইজ্জত হরণ করা হারাম।”¹

(২) ক্রোধ ও প্রতিশোধ :
যদি কোন মানুষ তার সাথে কোন বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করে তাহলে তার অন্তরে ক্রোধের বীজ রোপিত হয়, ফলে দুনিয়াবী সামান্য কারণে রাগের বশবর্তী হয়ে প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য যেখানে-সেখানে তার বিরুদ্ধে সমালোচনা করতে গিয়ে গীবতে লিপ্ত হয়, ক্রোধ সংবরণ করতে পারে না। অথচ ক্রোধ সংবরণ করা মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

পরিত্রাণের উপায় :
ক্রোধ সংবরণ ও ক্ষমার উত্তম ফলাফলের কথা হৃদয়ে সর্বদা জাগ্রত রাখতে হবে। কেননা ক্রোধ সংবরণ ও মানুষকে ক্ষমা করতে পারলেই আল্লাহ্ দুনিয়াতে মান-সম্মান ও ইজ্জত বৃদ্ধি করবেন। ফলে আপোষে ভ্রাতৃত্ববোধ বৃদ্ধি পাবে, সুষ্ঠু সমাজ গড়তে সহযোগিতা করবে। শুধু এখানেই সীমিত নয়; বরং দয়াময় আল্লাহ্ তা'আলা পরকালে মহা সুখময় স্থান জান্নাত দান করবেন।

টিকাঃ
১. সূরা নিসা, আয়াত ৫৪।
১. সহীহ বুখারী, 'কিতাবুল মাযালেম', হা/২১৯৯।
১. সহীহ্ মুসলিম, 'আল-বির ওয়াসসিলাহ্ ওয়াল আদাব' অধ্যায়, 'তাহরীমু যুলমিল মুসলিমে' অনুচ্ছেদ, হা/৬৪৫০।

📘 গীবত ভয়াবহ পরিনতি ও পরিত্রাণের উপায় > 📄 ক্রোধ সংবরণকারীর মর্যাদা

📄 ক্রোধ সংবরণকারীর মর্যাদা


ক্ষমা করা মুমিনের মহৎ গুণ এবং এই ক্ষমার ফলে আল্লাহ্ দুনিয়া ও আখেরাতে মান-সম্মান বৃদ্ধি করে থাকেন। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন,
وَسَارِعُوا إِلى مَغْفِرَةٍ مِّن رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِيْنَ الَّذِينَ يُنفِقُوْنَ فِي السَّرَّاءِ وَالضَّرَّاء وَالْكَاظِمِينَ الغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ وَاللهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ [آل عمران: ١٣٣ - ١٣٤]
“তোমরা দ্রুত অগ্রসর হও তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে এবং সেই জান্নাতের দিকে যার বিস্তৃতি আসমান ও যমীনের ন্যায়, যা প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে মুত্তাকীদের জন্য, যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল তথা সর্বাবস্থায় ব্যয় করে এবং যারা ক্রোধ সংবরণকারী ও মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল, আর আল্লাহ্ সৎকর্মপরায়ণদেরকে ভালবাসেন।”¹
যে ব্যক্তি রাগের বশবর্তী হয়ে গীবত করল সে তো তার ক্রোধ সংবরণ করল না। ক্ষমা করতেও শিখল না।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,
مَنْ كَظَمَ غَيْظًا وَهُوَ قَادِرٌ عَلَى أَنْ يُنْفِذَهُ دَعَاهُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ عَلَى رُءُوسِ الْخَلَائِقِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حَتَّى يُخَيِّرَهُ اللَّهُ مِنْ الْحُوْرِ الْعِيْنِ مَا شَاءَ.
“যে ব্যক্তি প্রতিশোধ গ্রহণ ও শক্তি প্রয়োগের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও নিজের ক্রোধ সংবরণ করে, আল্লাহ্ তা'আলা তাকে সম্মান দেয়ার জন্য ক্বিয়ামত দিবসে সকল মানুষের সামনের কাতারে আহ্বান করবেন এমনকি তাকে জান্নাতের হুরদের মধ্য হতে ইচ্ছামত গ্রহণ করার এখতিয়ার দিবেন।”¹
অপর হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
مَا نَقَصَتْ صَدَقَةٌ مِنْ مَالٍ وَمَا زَادَ اللهُ عَبْدًا بِعَفْوِ إِلَّا عِرًّا وَمَا تَوَاضَعَ أَحَدٌ لِلَّهِ إِلَّا رَفَعَهُ اللَّهُ.
“সাদাকার কারণে মাল কোন অংশে কমে না এবং ক্ষমার কারণে আল্লাহ্ তা'আলা বান্দার সম্মান বৃদ্ধি করেন। আর কোন বান্দা যখন আল্লাহ্র সন্তুষ্টির জন্য অনুগত হয়, তখন আল্লাহ্ তা'আলা তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে থাকেন।”²
অতএব মহান আল্লাহর নিকট এত বড় সম্মানিত পুরস্কারের কথা কি বিবেকবানদের মনে আনন্দ ও উৎসাহের সৃষ্টি করবে না? বিপরীতে মানুষের গীবত চর্চায় লিপ্ত হওয়ার কারণে প্রতি মুহূর্তে পুণ্য হারাচ্ছে এবং অন্যের গোনাহের বোঝা নিজ কাঁধে এসে অর্পিত হচ্ছে তা কি ভেবে দেখবে না? আমাদের ভাবা দরকার যে, জীবনের একটি দিনও কি আমরা গীবতের মত জঘন্য পাপ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পেরেছি?

(৩) নিজের মর্যাদা বৃদ্ধির আশায় তিরস্কার :
বহু মানুষ এমন রয়েছে যারা নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করে অপর মুসলিম ভাইকে হীন ও তুচ্ছ ভেবে তার দোষ-ত্রুটি ও অবস্থান নিয়ে প্রত্যেক মজলিসেই তিরস্কার ও উপহাস করে থাকে। যেমন এরূপ বলে যে, আরে অমুকতো গর্ধব, তার কোন বোধ-শক্তি নেই। আসলে নিজের প্রশংসা করা এবং জ্ঞান-বিবেক ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেয়ার জন্যই এরূপ বলে থাকে। আবার বলে যে, কারো সম্পর্কে সমালোচনা করা আমার অভ্যাস নেই অথবা আমি কারো গীবত করাও পছন্দ করি না। এতে তার অন্তরের অস্বচ্ছতাই প্রমাণিত হয়। অথচ তিরস্কার করে মানুষকে হীন ও ছোট করা ইসলামে হারাম। যদি সে সত্যই কম জ্ঞানের ও বুঝের অধিকারী হয়ে থাকে, তাহলে তো স্পষ্ট গীবতে লিপ্ত হয়ে গেল আর যদি এর বিপরীত হয়, তাহলে তো মিথ্যা অপবাদ দেয়া হলো। এ দু'টোই চরম অপরাধ। এ ধরনের জঘন্য অন্যায় ত্যাগ করা অবশ্য জরুরী

পরিত্রাণের উপায় :
নিজের জ্ঞানের পরিধি প্রকাশ করে মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য অন্যের যে সমস্ত দোষ-ত্রুটির কথা মানুষের সামনে বর্ণনা করা বৈধ নয় সেগুলি উপহাস ও তিরস্কারবশতঃ উল্লেখ করা থেকে সাবধান হতে হবে এবং নিজেকে অত্যাচারীদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে রক্ষা করতে হবে। সেই সাথে আল্লাহর অসন্তুষ্টি থেকেও নিজেকে বিরত রাখতে হবে।
মানুষ অনেক ক্ষেত্রে খুবই নগণ্য ভেবে এমন কথা উচ্চারণ করে থাকে যাতে কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহর অসন্তুষ্টি নিশ্চিত হয়ে যায়। যা নিম্নোক্ত হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত হয়।
عَنْ بِلاَلِ بْنِ الْحَارِثِ الْمُزَنِيُّ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّ الرَّجُلَ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ مِنْ رِضْوَانِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ مَا يَظُنُّ أَنْ تَبْلُغَ مَا بَلَغَتْ يَكْتُبُ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ لَهُ بِهَا رِضْوَانَهُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ مِنْ سَخَطِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ مَا يَظُنُّ أَنْ تَبْلُغَ مَا بَلَغَتْ يَكْتُبُ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ بِهَا عَلَيْهِ سَخَطَهُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ. قَالَ فَكَانَ عَلْقَمَةُ يَقُوْلُ كَمْ مِنْ كَلامٍ قَدْ مَنَعَنِيْهِ حَدِيثُ بِلالِ بْنِ الْحَارِثِ.
বিলাল ইবনুল হারিস আল-মুযানী (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল ﷺ বলেছেন, 'মানুষ আল্লাহ্র সন্তুষ্টির এমন কোন কথা উচ্চারণ করে যেটাকে সে বড় পুণ্যের কথা মনে করে না, কিন্তু আল্লাহ্ তা'আলা এরই বিনিময়ে কিয়ামত পর্যন্ত স্বীয় সন্তুষ্টি তার জন্য লিখে দেন। পক্ষান্তরে সে কোন সময় আল্লাহর অসন্তুষ্টির এমন কথা উচ্চারণ করে যেটাকে সে তেমন কোন বড় গোনাহের কথা বলে মনে করে না, কিন্তু এরই কারণে আল্লাহ্ তা'আলা কিয়ামত পর্যন্ত তার জন্য স্বীয় অসন্তুষ্টি লিখে দেন।
আলক্বামা (রাঃ) বলতেন, বিলাল ইবনুল হারিস আল-মুযানী (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত এই হাদীসটির শিক্ষা আমাকে বহু কথা হতে বিরত রেখেছে।”¹
অপরদিকে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِّنْ قَوْمٍ عَسَى أَنْ يَكُونُوا خَيْرًا مِّنْهُمْ وَلَا نِسَاءٌ مِّن نِّسَاءٍ عَسَى أَنْ يَكُنَّ خَيْرًا مِّنْهُنَّ وَلَا تَلْمِزُوا أَنفُسَكُمْ وَلَا تَنَابَزُوا بالألقابِ بِئْسَ الاِسْمُ الْفُسُوقُ بَعْدَ الإِيْمَانِ وَمَن لَّمْ يَتُبْ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ [الحجرات: ١١]
“হে মুমিনগণ! কোন সম্প্রদায় (পুরুষ) যেন অপর কোন সম্প্রদায়কে উপহাস না করে; কেননা যাকে উপহাস করা হয় সে উপহাসকারী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে এবং কোন নারীও যেন অপর কোন নারীকে উপহাস না করে; কেননা যাকে উপহাস করা হয় সে উপহাসকারীনি অপেক্ষা উত্তম হতে পারে। আর তোমরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ করোনা এবং তোমরা একে অপরকে মন্দ নামেও ডেকো না; ঈমানের পর মন্দ নাম অতি মন্দ। যারা তাওবা করে ফিরে না আসে তারাই যালিম।”²
আল্লাহ্ তা'আলা আরও বলেন,
فَلا تُزَكُوْا أَنْفُسَكُمْ هُوَ أَعْلَمُ بِمَن اتَّقى
[النجم: ۳۲] “অতএব তোমরা নিজেদের আত্মপ্রশংসা করো না, তিনিই (আল্লাহ্) অধিক জানেন প্রকৃত মুত্তাকী কে।”³

টিকাঃ
১. সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৩৩-১৩৪।
১. মুসনাদ আহমাদ, হা/১৫০৮৪; আবু দাউদ, 'আল-আদাব' অধ্যায়, 'মান কাযামা গায়যান' অনুচ্ছেদ হা/৪১৪৭; ইবনু মাজাহ্, 'আয-যুহদ' অধ্যায়, 'আল-হুল্ম' অনুচ্ছেদ, হা/৪১৭৬, শায়খ আলবানী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। দ্র. সহীহ্ ও যঈফ ইবনু মাজাহ, হা/৪২৮৬।
২. সহীহ্ মুসলিম, 'আল-বির ওয়াসসিলাহ' অধ্যায়, 'ইস্তেহ্বাবুল আফবি ওয়াত তাওয়াযুঈ' অনুচ্ছেদ হা/৪৬৮৯।
১. মুসনাদ আহমাদ, হা/১৫২৯১।
২. সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত ১১।
৩. সূরা আন-নাজম, আয়াত ৩২।

📘 গীবত ভয়াবহ পরিনতি ও পরিত্রাণের উপায় > 📄 গীবত ও নামীমাত্র ভয়াবহ পরিণতি

📄 গীবত ও নামীমাত্র ভয়াবহ পরিণতি


গীবত ও নামীমাত্র মত জঘন্য ও ঘৃণ্যতম অপরাধে লিপ্ত হওয়ার ফলে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও ভালবাসা নষ্ট এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়, বিশ্বস্ততা ও নির্ভরযোগ্যতা হ্রাস পায়, সাহায্য-সহযোগিতার মনোভাব হারিয়ে যায়, মিথ্যা ও কপটতা বৃদ্ধি পায়, মুসলিম ঐক্যে ফাটল ধরে, সামাজিক শান্তি ও শৃংখলা বিঘ্নিত হয়। ফলে সমাজে দুরাচার ও অনাচার বিস্তৃত হয় এবং শান্তি ও নিরাপত্তা লোপ পায়। শুধু এখানেই সীমিত নয়; বরং এই চরিত্রের অধিকারীগণ নিঃসন্দেহে পরকালে লাঞ্ছিত, অপমানিত ও কঠিন শাস্তির সম্মুখীনও হবেন। গীবত ও নামীমার ভয়াবহ পরিণতির বিবরণ পবিত্র কুরআন ও সহীহ্ হাদীসে বিভিন্নভাবে বর্ণিত হয়েছে। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা বলেন,
وَيْلٌ لِّكُلِّ هُمَزَةٍ لمَزَةٍ [الهمزة: ١].
“যারা পশ্চাতে ও সম্মুখে লোকের অধিক নিন্দা করে একের কথা অন্যের নিকট লাগিয়ে বেড়ায় তাদের প্রত্যেকের জন্যই দুর্ভোগ ও কঠিন শাস্তি ”।¹ আর এই পরনিন্দা যেমন কথা ও কলমের মাধ্যমে হয়ে থাকে, ঠিক তেমনিভাবে কর্ম ও অঙ্গভঙ্গির দ্বারাও হতে পারে। আল্লাহ্ তা'আলা আরও বলেন,
لا تُطِعْ كُلَّ حَلافٍ مَّهَيْن هَمَّازٍ مَّشَاءٍ بِنَمِيمٍ [القلم: ١٠ - ١١]
“যে অধিক শপথ করে, যে লাঞ্ছিত, আপনি তার আনুগত্য করবেন না। যে পশ্চাতে নিন্দা করে, একের কথা অপরের নিকট লাগিয়ে বেড়ায়।”²

(১) কবরে শাস্তি ভোগ :
ইমাম বুখারী তার 'আল-আদাবুল মুফরাদ' নামক গ্রন্থে বর্ণনা করেন,
عن جابر بن عبد الله قال : كُنَّا مَعَ رَسُوْلِ اللهِ صلى الله عليه وسلم فَأَتَى عَلَى قَبْرَيْنِ يُعَذِّبُ صَاحِبَاهُمَا، فَقَالَ : إِنَّهُمَا لَا يُعَذِّبَانِ فِي كَبِيرٍ، وَبَلَى، أَمَّا أَحَدُهُمَا فَكَانَ يَغْتَابُ النَّاسَ، وَأَمَّا الآخَرُ فَكَانَ لَا يَتَأَنَّى مِنَ الْبَوْلِ.
জাবের ইবনু আবদুল্লাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা একদা রাসূল ﷺ-এর সাথে ছিলাম, অতঃপর এমন দুই কবরের নিকট আসলেন যে দুই কবরবাসীকে আযাব দেয়া হচ্ছিল, অতঃপর তিনি বললেন, এই দুই কবরবাসীকে আযাব দেয়া হচ্ছে। তবে তাদের ধারণা অনুযায়ী কবীরাহ্ গোনাহের কারণে আযাব দেয়া হচ্ছে না। কিন্তু তা মূলতঃ কবীরাহ্ গোনাহ্ ছিল। তাদের মধ্যে একজন মানুষের গীবত করে বেড়াত আর অপর জন পেশাব নিজের গায়ে ছিটে পড়াকে অপছন্দ করত না বা এ ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করত না।”¹
অনুরূপভাবে ইমাম বুখারী তাঁর সহীহ্ 'আল-বুখারীতে” “গীবত” অনুচ্ছেদে এবং 'আল-আদাব' অধ্যায়ে এই আয়াতের
وَلَا يَعْتَبْ بَعْضُكُم بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ تَوَّابٌ رَّحِيمٌ [الحجرات: ١٢]
“তোমরা একে অপরের পিছনে গীবত ও পরনিন্দা করো না। তোমাদের মধ্যে কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে চাইবে? বস্তুত তোমরা তো এটাকে ঘৃণ্যই মনে করবে।”² ব্যাখ্যায় গীবত ও নামীমাৰ্কে এক পর্যায়ভুক্ত করে গীবতকেও কবরে আযাব ভোগের কারণ হিসাবে হাদীস উল্লেখ করেন।³
অন্য হাদীসে গীবতকে কবর আযাবের কারণ হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে,
عَنْ أَبِي بَكْرَةً قَالَ كُنْتُ أَمْشِي مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَمَرَّ عَلَى قَبْرَيْنِ فَقَالَ مَنْ يَأْتِينِي بِجَرِيدَةِ نَحْلٍ قَالَ فَاسْتَبَقْتُ أَنَا وَرَجُلٌ آخَرُ فَجِئْنَا بِعَسِيْبٍ فَشَقَّهُ بِاثْنَيْنِ فَجَعَلَ عَلَى هَذَا وَاحِدَةً وَعَلَى هَذَا وَاحِدَةً ثُمَّ قَالَ أَمَا إِنَّهُ سَيُخَفِّفُ عَنْهُمَا مَا كَانَ فِيْهِمَا مِنْ بُلُولَتِهِمَا شَيْءٌ ثُمَّ قَالَ إِنَّهُمَا لَيُعَذِّبَانِ فِي الْغِيْبَةِ وَالْبَوْلِ.
আবু বাকরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি একদা রাসূল ﷺ-এর সাথে চলছিলাম। অতঃপর তিনি দুই কবরের পাশ দিয়ে অতিক্রম করেন এবং বলেন, কে এমন আছো যে, আমাকে খেজুরের একটি তাজা ডাল এনে দিবে? ফলে আমি ও অপর এক ব্যক্তি দৌড়ে গিয়ে একটি খেজুরের ডাল এনে দিলাম। তিনি ঐ ডালটি মাঝ বরাবর ফেঁড়ে দ্বিখণ্ডিত করলেন এবং ঐ দুই কবরের উপর দুই অংশ রেখে দিলেন এবং বললেন, “এই ডাল দু'টি যতক্ষণ কাঁচা থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত এই কবরবাসীর আযাব হালকা করা হবে। অতঃপর বললেন, গীবতে লিপ্ত হওয়ার কারণে এবং পেশাবে সতর্কতা অবলম্বন না করার কারণে তাদের কবরে আযাব হচ্ছে।”¹
নামীমাহ্ প্রসঙ্গেও বহুল প্রসিদ্ধ হাদীস,
عَنِ ابْنِ عَبَّاسِ قَالَ مَرَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِقَبْرَيْنِ فَقَالَ إِنَّهُمَا لَيُعَذِّبَانِ وَمَا يُعَذِّبَانِ فِي كَبِيرٍ أَمَّا أَحَدُهُمَا فَكَانَ لَا يَسْتَتِرُ مِنْ الْبَوْلِ وَأَمَّا الْآخَرُ فَكَانَ يَمْشِي بِالنَّمِيمَةِ
একদা নবী করীম ﷺ দুই কবরের পাশে দিয়ে অতিক্রমকালে বলেন, “এই দুই কবরবাসীকে আযাব দেয়া হচ্ছে তবে তাদের ধারণা অনুযায়ী কবীরা গোনাহের কারণে নয়। আযাবের কারণ হিসাবে তিনি উল্লেখ করেন যে, তাদের মধ্যে একজন পেশাবের সময় সতর্কতা অবলম্বন করত না। অর্থাৎ পেশাব করার সময় নিজ শরীরে ছিটে আসত কিন্তু এ ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন করত না। আর দ্বিতীয়জন একের কথা অপরের নিকট লাগিয়ে বেড়াত অর্থাৎ চুগলখোরী করত।”²

(২) পরকালে শাস্তি ভোগ :
রাসূল ﷺ যখন মে'রাজে গমন করেন তখন জিবরীল ফেরেস্তা তাঁকে জান্নাত ও জাহান্নামবাসীদের অবস্থা দেখিয়ে নিয়ে আসেন। তন্মধ্যে নিম্নোক্ত হাদীসটি উল্লেখযোগ্য।
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكِ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمَّا عُرِجَ بي مَرَرْتُ بِقَوْمٍ لَهُمْ أَظْفَارٌ مِنْ نُحَاسٍ يَخْمُشُوْنَ وُجُوهَهُمْ وَصُدُورَهُمْ فَقُلْتُ مَنْ هَؤُلاَءِ يَا جِبْرِيلُ قَالَ هَؤُلاءِ الَّذِينَ يَأْكُلُوْنَ لُحُوْمَ النَّاسِ وَيَقَعُوْنَ فِي أَعْرَاضِهِمْ.
আনাস বিন মালেক (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল ﷺ বলেছেন, “যখন আমাকে ঊর্ধ্বাকাশে (মেরাজে) নিয়ে যাওয়া হয় তখন আমি এমন এক দল লোকের পাশ দিয়ে অতিক্রম করি যে, তারা তাদের হাতে পিতলের নখ দিয়ে নিজ চেহারা ও বুক আঁচড়াচ্ছে বা খামচাচ্ছে। আমি বললাম, হে জিবরীল! এরা কারা? জবাবে তিনি বললেন, এরা (মানুষের গীবত করে) মানুষের গোস্ত ভক্ষণ করত এবং মানুষের মান-সম্মান ও ইজ্জত নষ্টের কাজে লিপ্ত হত।”¹

(৩) জান্নাতে প্রবেশাধিকার থেকে বঞ্চিত :
হাদীসে এসেছে, জনৈক ব্যক্তি একের কথা অপরের নিকট লাগিয়ে বেড়াত এ খবর বিশিষ্ট সাহাবী হুযায়ফা (রাঃ)-এর নিকট পৌঁছলে তিনি বলেন,
سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ نَمَّامٌ
"আমি রাসূল ﷺ-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, “চুগলখোর (অর্থাৎ একের কথা অপরের নিকট লাগিয়ে বেড়ানো ব্যক্তি) জান্নাতে প্রবেশ করবে না”।² অর্থাৎ আড়ালে নিন্দা ও লাগানি-ভাঙ্গানি ব্যক্তি জান্নাতে যেতে পারবে না।

(৪) দুনিয়া ও আখেরাতে নিজের ত্রুটি প্রকাশ :
যে ব্যক্তি দুনিয়ায় গীবতের মাধ্যমে অন্য ভাইয়ের ত্রুটি প্রকাশ করে আল্লাহ্ তা'আলাও দুনিয়া ও আখেরাতে তার ত্রুটি প্রকাশ করে থাকেন। আসলে যেমন কর্ম তেমন ফল। সে যেমন অন্যের ত্রুটি বর্ণনা করে কষ্ট দিয়েছে, তেমনিভাবে আল্লাহ্ তা'আলা তারও ত্রুটি প্রকাশ করে তাকে কষ্ট দিবেন। আর মহান আল্লাহ্ কারো প্রতি কোন প্রকার যুলুম করেন না।
এরূপ যুলুম করা হারাম। হাদীসে কুদসীতে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহ্ তা'আলা বলেন,
إِنِّي حَرَّمْتُ الظُّلْمَ عَلَى نَفْسِي وَجَعَلْتُهُ بَيْنَكُمْ مُحَرَّمًا فَلَا تَظَالَمُوا .
“আমি আমার নফসের উপর যুলমকে হারাম করেছি এবং তোমাদের মধ্যেও যুলমকে হারাম করেছি। অতএব তোমরা পরস্পর যুলুম করো না।”¹
কোন মুসলিমের গীবত করলে কিংবা দোষ-ত্রুটি অনুসন্ধান করে বেড়ালে আল্লাহ্ তা'আলা তাকে দুনিয়ায় লাঞ্ছিত করেন। রাসূল ﷺ বলেন,
وَلَا تَتَّبِعُوْا عَوْرَاتِهِمْ فَإِنَّهُ مَنِ اتَّبَعَ عَوْرَاتِهِمْ يَتَّبِعُ اللَّهُ عَوْرَتَهُ وَمَنْ يَتَّبِعْ اللهُ عَوْرَتَهُ يَفْضَحْهُ فِي بَيْتِهِ.
“তোমরা মুসলিমদের অযথা দোষ-ত্রুটি তালাশ করে বেড়িও না। কেননা যে ব্যক্তি কোন মুসলিমের দোষ-ত্রুটি তালাশ করে মহান আল্লাহ্ তার দোষ তালাশ করেন। আর আল্লাহ্ তা'আলা যার ত্রুটি তালাশ করেন তাকে তার নিজ ঘরেও লাঞ্ছিত ও অপমানিত করেন।”²
অপর হাদীসে এসেছে, দুনিয়ায় কোন মুসলিমের দোষ-ত্রুটি গোপন রাখলে আল্লাহ্ তা'আলাও দুনিয়া ও পরকালে তার দোষ-ত্রুটি গোপন রাখেন। রাসূল ﷺ বলেন,
مَنْ سَتَرَ مُسْلِمًا فِي الدُّنْيَا سَتَرَهُ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ فِي الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ.
“যে ব্যক্তি দুনিয়ায় কোন মুসলিমের দোষণীয় বিষয় গোপন রাখে আল্লাহ্ তা'আলা দুনিয়া ও আখেরাতে তার ত্রুটি গোপন করেন”।¹ এর বিপরীত অর্থ হল, যে ব্যক্তি দুনিয়ায় কোন মুসলিমের ত্রুটি গোপন করে না আল্লাহ্ তা'আলাও দুনিয়া ও আখেরাতে তার কোন ত্রুটি গোপন করেন না। অর্থাৎ উভয় জগতে সে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হবে। আল্লাহ্ আমাদেরকে এরূপ অবস্থা থেকে হেফাযত করুন।

(৫) অন্যের পাপের বোঝা নিজ ঘাড়ে চাপে :
পরনিন্দা ও গীবত করা নিঃসন্দেহে যুলুম ও অত্যাচারের শামিল। যার নিন্দা ও গীবত করা হয় সে-ই মূলতঃ অত্যাচারিত হয়। এরূপ যুলুম করা হারাম। এ ধরনের অত্যাচারীকে আল্লাহ্ মাফ করেন না, যতক্ষণ ঐ অত্যাচারিত বান্দা ক্ষমা না করে। আর দুনিয়ায় নিষ্পত্তি করতে না পারলে পরকালে নিজের নেকি তাকে দিয়ে ও তার গোনাহের বোঝা নিয়ে নিষ্পত্তি করতে হবে। রাসূল ﷺ বলেন,
مَنْ كَانَتْ لَهُ مَظْلَمَةٌ لِأَخِيهِ مِنْ عِرْضِهِ أَوْ شَيْءٍ فَلْيَتَحَلَّلَهُ مِنْهُ الْيَوْمَ قَبْلَ أَنْ لاَ يَكُوْنَ دِينَارٌ وَلَا دِرْهَمْ إِنْ كَانَ لَهُ عَمَلٌ صَالِحٌ أُخِذَ مِنْهُ بِقَدْرِ مَظْلَمَتِهِ وَإِنْ لَمْ تَكُنْ لَهُ حَسَنَاتٌ أُخِذَ مِنْ سَيِّئَاتِ صَاحِبِهِ فَحُمِلَ عَلَيْهِ.
“কেউ যদি কোন ভাইয়ের মান-সম্মান অথবা অন্য কিছু নষ্টের মাধ্যমে যুলুম করে থাকে, তাহলে সে যেন তা ঐদিন আসার পূর্বেই নিষ্পত্তি করে নেয়, যেইদিন তার কোন দীনার ও দিরহাম কিছুই থাকবে না। যদি তা দুনিয়ায় নিষ্পত্তি না করে তাহলে কিয়ামত দিবসে ঐ অত্যাচারের পরিমাণ অনুযায়ী তার সৎ আমল নিয়ে মাযলুমকে দেয়া হবে। আর যদি কোন সৎ আমল না থাকে, তাহলে ঐ অত্যাচারিত ব্যক্তির গোনাহ্ নিয়ে তার কাঁধে চাপিয়ে দেয়া হবে।”¹

(৬) সমাজে ভাঙ্গন ও হিংসা-বিদ্বেষ বিস্তার :
গীবত ও নামীমাহর মত জঘন্য অপরাধে লিপ্ত হওয়ার কারণে দুনিয়াতে শান্তিপূর্ণ মুসলিম সমাজের ঐক্যে ফাটল ধরে, পারস্পরিক সুসম্পর্ক নষ্ট হয়, হিংসা-বিদ্বেষ ও কলহ-দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পায়, শান্তি-শৃংখলা বিঘ্নিত হয়, একে অপরের প্রতি বিশ্বস্ততা ও নির্ভরযোগ্যতা হারায় এবং নিজেদের অন্তরে শত্রুতা ও হিংসার বিষাক্ত বীজ রোপিত হয়। এসবই শান্তিপূর্ণ ইসলাম ধর্মে নিষিদ্ধ। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُوْنَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُوْنَ [الحجرات: ١٠]
“নিশ্চয়ই মুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই। সুতরাং তোমরা ভাইদের মধ্যে শান্তি স্থাপন কর আর আল্লাহকে ভয় কর তাহলে সম্ভবত তোমরা অনুগ্রহ প্রাপ্ত হবে।”²
রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেন,
تَرَى الْمُؤْمِنِينَ فِي تَرَاحُمِهِمْ وَتَوَادِّهِمْ وَتَعَاطَفِهِمْ كَمَثَلِ الْجَسَدِ إِذَا اشْتَكَى عُضْوًا تَدَاعَى لَهُ سَائِرُ جَسَدِهِ بِالسَّهَرِ وَالْحُمَّى.
“একে অন্যের প্রতি দয়া প্রদর্শনে, সম্প্রীতি, ভালবাসা, মায়া-মমতায় এবং একের সাহায্যে অন্যের ছুটে আসায় ইমানদারগণকে তুমি একটি দেহের সমতুল্য দেখবে। দেহের কোন অঙ্গে ব্যথা হলে যেমন গোটা দেহটাই অনিদ্রা এবং জ্বরে তার শরীক হয়ে যায়। (ঈমানদার সমাজের অবস্থাও তদ্রূপ)।”¹
অন্যত্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
لا تَحَاسَدُوا وَلَا تَنَاجَسُوا وَلَا تَبَاغَضُوا وَلَا تَدَابَرُوْا وَلَا يَبِعْ بَعْضُكُمْ عَلَى بَيْعِ بَعْضٍ وَكُونُوا عِبَادَ اللَّهِ إِخْوَانًا الْمُسْلِمُ أَخُو الْمُسْلِمِ لَا يَظْلِمُهُ وَلَا يَخْذُلُهُ وَلاَ يَحْقِرُهُ التَّقْوَى هَاهُنَا وَيُشِيرُ إِلَى صَدْرِهِ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ بِحَسْبٍ امْرِئٍ مِنْ الشَّرِّ أَنْ يَحْقِرَ أَخَاهُ الْمُسْلِمَ كُلُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ حَرَامٌ دَمُهُ وَمَالُهُ وَعِرْضُهُ.
“তোমরা পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ ও অকল্যাণ কামনা করো না, পরস্পর ঘৃণা ও শত্রুতা পোষণ করো না এবং দোষ-ত্রুটিও তালাশ করে বেড়িও না। আর অন্যের বেচা-কেনার মধ্যে শরীক হয়ো না (কেনার উদ্দেশ্য ছাড়ாய் দাম বৃদ্ধি করো না অর্থাৎ দালালী করো না); বরং আল্লাহর বান্দা হিসাবে সবাই ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যাও। একজন মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। অতএব ঐ ভাইয়ের প্রতি কোন ধরনের যুলুম-অত্যাচার করবে না, সাহায্য-সহযোগিতাও বর্জন করবে না এবং তুচ্ছও মনে করবে না। অতঃপর স্বীয় বুকের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনবার বলেন, তাকওয়া এখানে। কোন ব্যক্তির খারাপ হওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট হবে যে, সে তার মুসলিম ভাইকে তুচ্ছ মনে করবে। প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অপর মুসলিমের রক্ত, সম্পদ, মান-সম্মান এবং ইজ্জত হরণ করা হারাম।”²
অতএব সমাজে শান্তি-শৃংখলা ফিরিয়ে আনতে হলে এ ধরনের কু- অভ্যাস অবশ্যই বর্জন করতে হবে।

(৭) সৎসাহস হারায় ও আম্র বিল মা'রুফের দরজা বন্ধ হয় :
গীবতকারী সব সময় ভীত ও কলুষিত নিয়তের অধিকারী হয়ে থাকে। সে কখনই স্বচ্ছ নিয়তে সৎ সাহসী হয়ে সুন্দর ভাষা ও উত্তম আদর্শ নিয়ে কোন মানুষের ত্রুটির কথা সরাসরি সামনে বলার সৎ সাহস রাখে না । অথচ আল্লাহ্ তা'আলা বলেন,
كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُوْنَ بِاللهِ وَلَوْ آمَنَ أَهْلُ الكِتَابِ لكَانَ خَيْرًا لَّهُم مِّنْهُمُ الْمُؤْمِنُوْنَ وَأَكْثَرُهُمُ الْفَاسِقُونَ [آل عمران: ۱۱۰ ]
“তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানবজাতির জন্য তোমাদের আর্বিভাব হয়েছে; তোমরা সৎকার্যের নির্দেশ দান কর, অসৎকার্যে নিষেধ কর এবং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর।”¹
আল্লাহ্ তা'আলা আরও বলেন,
وَلَتَكُن مِّنكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُوْنَ إِلى الخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَن الْمُنكَرِ وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ [آل عمران : ١٠٤]
“তোমাদের মধ্যে এমন একদল হোক যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে এবং সৎকাজের নির্দেশ দিবে ও অসৎ কাজে নিষেধ করবে; এরাই তো সফলকাম।”²
যদি সাহসী হয়ে দোষী ব্যক্তির সামনে এসে সৎ উদ্দেশ্যে ও তাকে সংশোধনের আশায় দোষ-ত্রুটি উল্লেখ করা হত, তাহলে হয়তো সে নিজের গোনাহ্ ও ত্রুটির কথা অনুভব করতে পারত এবং সংশোধন হওয়ারও আশা করা যেত। সেই সাথে ঐ সাহসী ব্যক্তির 'আমর বিল মা'রুফ ও নাহী আনিল মুনকার' অর্থাৎ সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের গুরু দায়িত্ব পালিত হত। ফলে সে আল্লাহ্র নিকট প্রশংসিত হত এবং উত্তম প্রতিদানও লাভ করত। তা না করে ঐ কথাগুলি তার আড়ালে আলোচনা করলে আল্লাহ্র নিকট গোনাহগার হবে এবং এ অপরাধটি নিজের ভাইয়ের গোশত ভক্ষণ করার শামিল হবে। আবার কোনভাবে যদি ঐ ব্যক্তির নিকট খবর পৌঁছে যায় যে, অমুক ব্যক্তি এরূপ সমালোচনা করেছে এবং কোন সময় যদি মোকাবেলার সম্মুখীন হয় তাহলে সে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে এ বলে অস্বীকারও করতে পারে যে, আমি একথা বলিনি। ফলে চতুর্দিক থেকে গোনাহের হকদার হয়ে গেল। আল্লাহ্ আমাদেরকে হেফাযত করুন।

(৮) মুনাফিকী চরিত্র প্রকাশ পায় :
মুনাফিকের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, মুখে ঈমানের দাবী করা আর অন্তরে এর বিপরীত উদ্দেশ্য গোপন রাখা। যারা এরূপ করে তাদের অন্তর ঈমানে সিক্ত হয় না। ফলে তারা অন্যের গীবত ও দোষ চর্চায় লিপ্ত হয়। রাসূল ﷺ বলেন,
يَا مَعْشَرَ مَنْ آمَنَ بِلِسَانِهِ وَلَمْ يَدْخُلُ الإِيْمَانُ قَلْبَهُ لَا تَعْتَابُوا الْمُسْلِمِينَ وَلَا تَتَّبِعُوْا عَوْرَاتِهِمْ فَإِنَّهُ مَنِ اتَّبَعَ عَوْرَاتِهِمْ يَتَّبِعُ اللَّهُ عَوْرَتَهُ وَمَنْ يَتَّبِعْ اللهُ عَوْرَتَهُ يَفْضَحْهُ فِي بَيْتِهِ.
“হে ঐ সকল লোক, যারা মুখে ঈমান এনেছ অথচ তোমাদের অন্তরে ঈমান প্রবেশ করেনি! তোমরা মুসলিমদের গীবতে লিপ্ত হয়ো না এবং অযথা দোষ-ত্রুটি তালাশ করে বেড়িও না। কেননা যে ব্যক্তি কোন মুসলিমের দোষ-ত্রুটি তালাশ করে, মহান আল্লাহ্ তার দোষ তালাশ করেন। আর আল্লাহ্ তা'আলা যার ত্রুটি তালাশ করেন তাকে তার নিজ ঘরেও লাঞ্ছিত ও অপমানিত করেন।”¹
অপর হাদীসে রাসূল ﷺ বলেন,
الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُスْلِمُوْنَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ وَالْمُهَاجِرُ مَنْ هَجَرَ مَا نَهَى اللَّهُ عَنْهُ.
“প্রকৃত মুসলিম হচ্ছে সেই যার হাত ও মুখের অত্যাচার থেকে অপর মুসলিম নিরাপদে থাকে। আর প্রকৃত মুহাজির হচ্ছে সেই যে আল্লাহ কর্তৃক নিষিদ্ধ বিষয় সমূহ বর্জন করে চলে।”¹

(৯) ঈমানে অপূর্ণতা আসে:
কোন গীবতকারীর ঘৃণিত বিষয় তার অগোচরে আলোচনা করা হোক তা কি সে পছন্দ করবে? তা কখনই পছন্দ করবে না। তবে সে অন্যের বিষয় অগোচরে আলোচনা করা কিভাবে এত পছন্দ করে? নিজের জন্য যা পছন্দ করে না তা অন্যের জন্য কেন পছন্দ করছে? অথচ হাদীসে বলা হচ্ছে,
لا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبُّ لأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ.
“নিজের নফসের জন্য যা পছন্দ করে তা অন্য ভাইয়ের জন্যও পছন্দ না করা পর্যন্ত তোমাদের মধ্যে কেউ পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না।”²

(১০) গীবতকারীর দুর্গন্ধ দুনিয়াব্যাপী ছড়িয়ে যায়:
গীবতকারী আল্লাহর নিকট এতই ঘৃণিত যে, এই অপরাধের কারণে তার দুর্গন্ধে দুনিয়ার বায়ু কলুষিত হয়ে যায়, যা হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।
عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ قَالَ كُنَّا مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَارْتَفَعَتْ رِيحُ حِيفَةٍ مُنْتِنَةٍ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَتَدْرُونَ مَا هَذِهِ الرِّيْحُ هَذِهِ رِيْحُ الَّذِيْنَ يَغْتَابُوْنَ الْمُؤْمِنِينَ.
“জাবের বিন আবদুল্লাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা একদা নবী করীম ﷺ-এর সাথে ছিলাম এমতাবস্থায় হঠাৎ করে মৃত লাশের দুর্গন্ধময় বাতাস প্রবাহিত হল। তখন রাসূল ﷺ বললেন, তোমরা কি জানো এটা কিসের দুর্গন্ধময় বাতাস? যারা মুমিনদের গীবতে লিপ্ত হয় এটা তাদের দুর্গন্ধময় বাতাস।”¹

(১১) মৃত জানোয়ারের গোস্ত ভক্ষণ :
বিবেকবান সচেতন ও জ্ঞান বিকৃত হয়নি এমন কোন মানুষ কখনই মৃত জানোয়ারের গোস্ত ভক্ষণ করতে রাজী হবে না একথা ঠিক তবে ঐ সমস্ত জ্ঞানী লোকেরাই প্রতিনিয়ত গীবতের মাধ্যমে মৃত প্রাণীর পচা গোস্ত খেয়ে নিজ উদর পূর্তি করে চলেছে, যা শরী'আতের দলীল দ্বারা প্রমাণিত।
وعن عبد الله بن مسعود رضي الله عنه قال كُنَّا عِنْدَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَامَ رَجُلٌ فَوَقَعَ فِيْهِ رَجُلٌ مِنْ بَعْدِهِ فَقَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم تُخَلِّلْ فَقَالَ وَمِمَّا أَتَخَلُّلُ مَا أَكَلْتُ لَحْمًا قَالَ إِنَّكَ أَكَلْتَ لَحْمَ أَخِيكَ.
আবদুল্লাহ্ বিন মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আমরা একদা রাসূল ﷺ-এর নিকট ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি সেখান থেকে উঠে চলে গেলে ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে অপর এক ব্যক্তি কিছু সমালোচনায় লিপ্ত হয়। ফলে রাসূল ﷺ তাকে বলেন, তুমি তোমার দাঁত খেলাল কর। সে ব্যক্তি বলে, আমি তো গোস্ত খাইনি, কেন দাঁত খেলাল করব? রাসূল ﷺ বলেন, তুমি তো এই মাত্র তোমার ভাইয়ের গোস্ত ভক্ষণ করলে।”²
وعن عمرو بن العاص رضي الله عنه أنَّهُ مَرَّ عَلَى بَغَلٍ مَيِّتٍ فَقَالَ لِبَعْضٍ أَصْحَابِهِ لأَنْ يَأْكُلَ الرَّجُلُ مِنْ هَذَا حَتَّى يَمْلأَ بَطَنَهُ خَيْرٌ لَّهُ مِنْ انْ يَأْكُلَ لَحْمَ رَجُلٍ مُسْلِمٍ.
আম্র ইবনুল আছ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি একদা একটি মৃত খচ্চরের পাশ দিয়ে অতিক্রমকালে তাঁর সঙ্গী-সাথীদের বলেন, কোন মুসলিম ব্যক্তির গোন্ত ভক্ষণ করার (গীবত করার) চেয়ে এই মৃত জানোয়ারের গোস্ত খেয়ে মানুষের উদর পূর্তি করা অনেক উত্তম।”¹ সুবহানাল্লাহ্! কত মারাত্মক হুঁশিয়ারী।

(১২) গীবত ও নামীমাৰ্কারী নিকৃষ্ট মানুষ :
গীবত ও নামীমাতে লিপ্ত ব্যক্তিরা হচ্ছে আল্লাহর নিকৃষ্ট বান্দা। এরা মানুষের সৌহার্দ্যপূর্ণ ভ্রাতৃত্ববোধ নষ্ট করে শান্তিপূর্ণ সমাজে বিশৃংখলা সৃষ্টি করে বেড়ায়। এই মর্মে হাদীস বর্ণিত হয়েছে, রাসূল ﷺ বলেন,
خِيَارُ عِبَادِ اللَّهِ الَّذِينَ إِذَا رُءُوا ذُكِرَ اللَّهُ وَشِرَارُ عِبَادِ اللَّهِ الْمَشَاءُوْنَ بالنَّمِيمَةِ الْمُفَرِّقُونَ بَيْنَ الأَحِبَّةِ الْبَاغُوْنَ الْبُرَاءَ الْعَنَتَ.
"আল্লাহর উত্তম বান্দাগণ হচ্ছেন এমন যে, তাদেরকে দেখা মাত্রই আল্লাহর কথা (আল্লাহকে) স্মরণ হয়। আর আল্লাহর নিকৃষ্ট বান্দারা হচ্ছে এমন যে, তারা শুধু চোগলখোরী করে এবং ভালবাসা ও বন্ধুত্বের বন্ধন ছিন্ন করে বেড়ায়। আর পূত-পবিত্র স্বচ্ছ মানুষদের কলংকিত ও লজ্জিত করার জন্য সর্বদা ব্যস্ত থাকে।”²

(১৩) মানবরূপী মিথ্যুক শয়তান থেকে সাবধানতা অবলম্বন:
নিজেদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির জন্য শয়তান মানুষের রূপ ধরে এসে খুব সুন্দরভাবে মিথ্যা কথা বর্ণনা করে। যেমন সহীহ্ মুসলিমের মুকাদ্দামাতে বর্ণিত হয়েছে যে, “নিশ্চয়ই শয়তান মানুষের রূপ ধরে কোন সম্প্রদায়ের নিকট এসে মুখরোচক বানোয়াট ও মিথ্যা কথা বলে চলে যায়। ফলে তাদের মধ্যে বিভেদের সৃষ্টি হয়। অবশেষে তাদের মধ্যে কেউ বলে যে, জনৈক ব্যক্তি এসব কথা বলে গেল তার চেহারা চেনা কিন্তু নাম তো জানি না।”¹

টিকাঃ
১. শায়খ আলবানী (রহঃ) হাদীছটিকে হাসান বলেছেন। দ্র. সিলসিলা সহীহাহ্, অধ্যায় নং ৬৫৮, ২/২৬৩।
২. সূরা লুকমান, আয়াত ১৮।
১. সূরা আল-হুমাযাহ, আয়াত ১।
২. সূরা আল-কালাম, আয়াত ১০-১১।
১. আল-আদাবুল মুফরাদ, 'আল-গীবত' অনুচ্ছেদ, হা/৭৩৫, হাদীছ ছহীহ; আবু দাউদ, হা/২০।
২. সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত ১২।
৩. সহীহ্ আল-বুখারী, 'আল-আদাব' অধ্যায়, 'আল-গীবত' অনুচ্ছেদ, হা/৫৫৯২।
১. মুসনাদ আহমাদ, হা/১৯৫১৬।
২. সহীহ্ বুখারী, 'আল-আদাব' অধ্যায়, 'গীবত' অনুচ্ছেদ, হা/২১১, ৫৫৯২, ১২৭৩; সহীহ মুসলিম, 'আত- তাহারাহ' অধ্যায়, 'আদ-দালীলু আলা নাজাসাতিল বাওলি ওয়া উজুবিল ইস্তিবরা মিনহু' অনুচ্ছেদ, হা/৪৩৯।
১. মুসনাদ আহমাদ, হা/১২৮৬১; আবু দাউদ, 'আল-আদাব' অধ্যায়, 'গীবত' অনুচ্ছেদ, হা/৪২৩৫।
২. সহীহ্ মুসলিম, 'আল-ঈমান' অধ্যায়, 'বায়ানু গিলাযি তাহরীমুন্ নামীমাহ' অনুচ্ছেদ, হা/১৫১।
১. সহীহ্ মুসলিম, 'আল-বির ওয়াসসিলাহ্ ওয়াল আদাব' অধ্যায়, 'তাহরীমুয যুল্ম' অনুচ্ছেদ, হা/৪৬৭৪।
২. আবু দাউদ, 'আল-আদাব' অধ্যায়, 'গীবত' অনুচ্ছেদ, হা/৪২৩৬; মুসনাদ আহমাদ, তিরমিযী ।
১. মুসনাদ আহমাদ, হা/১৬৩৪৬।
১. সহীহ্ আল-বুখারী, 'আল-মাযালেম ওয়াল গাস্ব' অধ্যায়, 'মান কানাত লাহু মাযলামাতুন ইন্দার রাজুলি' অনুচ্ছেদ, হা/২২৬৯।
২. সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত ১০।
১. সহীহ্ আল-বুখারী, 'আল-আদাব' অধ্যায়, 'রাহমাতুন্নাসি ওয়াল বাহায়িমি' অনুচ্ছেদ; সহীহ্ মুসিলম, 'আল-বির ওয়াসসিলাহ্ ওয়াল আদাব' অধ্যায়, 'তারাহুমিল মুমিনীন ওয়া তা'আতুফিহিম' অনুচ্ছেদ।
২. সহীহ্ মুসলিম, 'আল-বির ওয়াসসিলাহ্ ওয়াল আদাব' অধ্যায়, 'তাহরীমু যুলমিল মুসলিমি' অনুচ্ছেদ হা/৬৪৫০।
১. সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১১০।
২. সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১০৪।
১. আবু দাউদ, 'আল-আদাব' অধ্যায়, 'গীবত' অনুচ্ছেদ, হা/৪২৩৬; মুসনাদ আহমাদ ও তিরমিযী।
১. সহীহ্ বুখারী, 'আল-ঈমান' অধ্যায়, 'আল-মুসলিমু মান সালিমাল মুসলিমূনা মিন লিসানিহি ওয়া ইয়াদিহী, অনুচ্ছেদ, হা/৯; সহীহ মুসলিম, 'আল-ঈমান' অধ্যায়, 'বায়ানু তাফাযুলিল ইসলাম' অনুচ্ছেদ, হা/৫৭।
২. সহীহ্ আল-বুখারী, 'আল-ঈমান' অধ্যায়, 'মিনাল ঈমানি আন ইউহিব্বা লিআখিহি' অনুচ্ছেদ, হা/১২; সহীহ মুসলিম, 'আল-ঈমান' অধ্যায়, 'আদ-দালীলু আলা আন্না মিন খিছালিল' অনুচ্ছেদ, হা/৬৪।
১. মুসনাদ আহমাদ, হা/১৪২৫৭; আল-আদাবুল মুফরাদ, হা/৭৫৪।
২. সহীহ্ আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/২৮৩৭।
১. সহীহ্ আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, 'আল-আদাব' অধ্যায়, 'আত-তারগীবু ফিল হায়া' অনুচ্ছেদ, হা/২৮৩৮।
২. মুসনাদ আহমাদ, হা/১৭৩১২; সহীহ আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/২৮২৪।
১. সহীহ্ মুসলিম, মুকাদ্দামাহ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00