📄 ইসলামী শরী'আতে গীবত ও নামীমাত্র বিধান
গীবত ও নামীমাহ্ হারাম :
ইসলামী শরী'আতের বিধান অনুযায়ী গীবত ও নামীমাহ্ কবীরা গোনাহের অন্তর্ভুক্ত যা মূলতঃ হারাম। এ ব্যাপারে কুরআন ও সহীহ্ হাদীসে স্পষ্ট দলীল-প্রমাণ বিদ্যমান রয়েছে এবং বিশিষ্ট সাহাবাগণের আছার তথা উক্তিও রয়েছে, সেই সাথে মুসলিম উম্মতও একমত হয়েছে।
আল্লাহ্ তা'আলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوْا اجْتَنِبُوا كَثِيْرًا مِّنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَعْتَب بَّعْضُكُم بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فكَرِهْتُمُوهُ وَاتَّقُوا اللهَ إِنَّ اللهَ تَوَّابٌ رَّحِيمٌ [الحجرات: ١٢]
“তোমরা একে অপরের পিছনে গীবত বা পরনিন্দা করো না। তোমাদের মধ্যে কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে চাইবে? বস্তুত তোমরা তো এটাকে ঘৃণ্যই মনে কর। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, আল্লাহ্ তাওবা কবুলকারী পরম দয়ালু”।¹
আল্লাহ্ তা'আলা গীবতের তুলনা করেছেন মৃত ভাইয়ের গোস্ত খাওয়ার সাথে। এর কারণ হচ্ছে, মৃত ব্যক্তি তার গোন্ত ভক্ষণ করা হচ্ছে কি না সে সম্পর্কে যেমন কিছুই জানতে পারে না, ঠিক তেমনিভাবে জীবিত ব্যক্তি যার গীবত করা হয় সেও তার গীবত সম্পর্কে জানে না। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, “আল্লাহ্ তা'আলা এরূপ দৃষ্টান্ত দিয়েছেন এজন্য যে, মৃতের গোস্ত খাওয়া যেমন স্পষ্ট হারাম ও অপছন্দনীয়, তেমনিভাবে অন্যের গীবত করাও ইসলামী শরী'আতে স্পষ্ট হারাম ও অন্তরের কাছেও ঘৃণিত।”²
এ প্রসঙ্গে রাসূল ﷺ বলেন,
فَإِنَّ دِمَاءَكُمْ وَأَمْوَالَكُمْ وَأَعْرَاضَكُمْ حَرَامٌ عَلَيْكُمْ إِلَى أَنْ تَلْقَوْا رَبَّكُمْ تَعَالَى كَحُرْمَةِ يَوْمِكُمْ هَذَا فِي شَهْرِكُمْ هَذَا فِي بَلَدِكُمْ هَذَا .
“নিশ্চয়ই তোমাদের রবের সাথে সাক্ষাৎ করা পর্যন্ত (ক্বিয়ামত পর্যন্ত) তোমাদের এই শহরে, এই মাসে এই দিনের ন্যায় তোমাদের রক্ত, সম্পদ ও তোমাদের মান-সম্মান, ইজ্জত ও সম্ভ্রম হারাম।” অর্থাৎ রক্তপাত, সম্পদ লুণ্ঠন ও মান-সম্মান হরণ করা হারাম।¹ অপর হাদীসে এই অপরাধকে হত্যা, সম্পদ লুণ্ঠন ও ছিনতাই-এর শামিল করা হয়েছে।
রাসূল ﷺ বলেন,
كُلُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ حَرَامٌ دَمُهُ وَمَالُهُ وَعِرْضُهُ.
“প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অপর মুসলিমের রক্ত, সম্পদ ও সম্মান নষ্ট করা হারাম।”²
গীবত করার অর্থই হচ্ছে, মানুষের মান-সম্মান ও ইজ্জত লুণ্ঠন করা। অতএব এটাও স্পষ্ট হারামের শামিল।
টিকাঃ
১. সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত ১২।
২. তাফসীর কুরতুবী, ১৬/২৮৬।
১. মুসনাদ আহমাদ হা/১৯৫২৩; সহীহ্ মুসলিম, 'আল-কাসামাহ্ ওয়াল মুহারেবীন...' অধ্যায়, 'তাগলীয তাহরীমুদ-দিমাআ ওয়াল আ'রায ওয়াল আমওয়াল' অনুচ্ছেদ, হা/৩১৭৯।
২. সহীহ্ মুসলিম, 'কিতাবুল বিত্র ওয়াসিলাহ্ ওয়াল আদাব', 'বাবু তাহরীমু যুলমিল মুসলিমি', হা/৪৬৫০।
📄 গীবত শ্রবণ করাও হারাম
গীবতে লিপ্ত হওয়া যেমন ইসলামী শরী'আতে হারাম, তেমনিভাবে গীবত শ্রবণ করাও হারাম হিসাবে গণ্য করা হয়েছে। গীবতকারীকে প্রথমতঃ গীবতের ভয়াবহ পরিণতি ও জান্নাতের লোভ এবং জাহান্নামের ভয় দেখিয়ে উত্তম কৌশলে গীবত থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করতে হবে। এরপরও যদি সে গীবতে লিপ্ত থাকে, তাহলে ঐ মজলিস ছেড়ে উঠে যেতে হবে।
আল্লাহ্ তা'আলা বলেন,
وَإِذَا رَأَيْتَ الَّذِيْنَ يَخُوضُوْنَ فِي آيَاتِنَا فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ حَتَّى يَخُوضُوا فِي حَدِيْثٍ غَيْرِهِ وَإِمَّا يُنْسِيَنَّكَ الشَّيْطَانُ فَلَا تَقْعُدْ بَعْدَ الذِّكْرَى مَعَ الْقَوْمِ الظَّالِمِيْنَ [الأنعام: ٦٨]
“যখন আপনি তাদেরকে দেখেন, যারা আমার আয়াতসমূহ সম্বন্ধে উপহাসমূলক আলোচনায় মগ্ন হয়, তখন তাদের নিকট হতে সরে যান যে পর্যন্ত তারা অন্য প্রসংগে প্রবৃত্ত না হয়। আর শয়তান যদি আপনাকে ভ্রমে ফেলে তবে স্মরণ হওয়ার পরে যালিম সম্প্রদায়ের সাথে বসবেন না।”¹
আল্লাহ্ তা'আলা এ প্রসঙ্গে আরো বলেন,
وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ إِنَّ السَّمْعَ وَالبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْؤُولاً [الإسراء: ٣٦]
“যে বিষয়ে তোমাদের জ্ঞান নেই তার অনুসরণ করো না; নিশ্চয়ই কর্ণ, চক্ষু ও হৃদয় এদের প্রত্যেকটি সম্পর্কে জবাবদিহি করা হবে।”²
আল্লাহ্ তা'আলা অন্যত্র বলেন,
وَإِذَا سَمِعُوا اللَّعْوَ أَعْرَضُوا عَنْهُ وَقَالُوْا لَنَا أَعْمَالُنَا وَلَكُمْ أَعْمَالُكُمْ سَلَامٌ عَلَيْكُمْ لَا نَبْتَغِيُّ الْجَاهِلِينَ [القصص: ٥٥].
“তারা যখন অসার অশ্লীল বাক্য শ্রবণ করে তখন তারা তা উপেক্ষা করে এড়িয়ে চলে এবং বলে, আমাদের কাজের ফল আমাদের জন্য এবং তোমাদের কাজের ফল তোমাদের জন্য। তোমাদের প্রতি সালাম। আমরা অজ্ঞদের সঙ্গ চাই না।”³
টিকাঃ
১. সূরা আল-আন'আম, আয়াত ৬৮।
২. সূরা বানী ইসরাঈল, আয়াত ৩৬।
৩. সূরা আল-কাসাস, আয়াত ৫৫।
📄 গীবতকারীকে বাধা দেয়ার ফযীলত
গীবতকারীকে তার গীবতে বাধা দিতে যদি সক্ষম না হয় কিংবা গীবতের ভয়াবহ পরিণতির কথা বলার পরও যদি না শোনে ও না মানে, তাহলে যে মজলিসে গীবত করা হচ্ছে সে মজলিস অবশ্যই ত্যাগ করবে। গীবতের মত অশ্লীল কথা ও কর্ম বর্জন করে চলা মুমিনদের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।
আল্লাহ্ তা'আলা বলেন,
وَالَّذِيْنَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ [المؤمنون: ٣]
“যারা অসার ক্রিয়াকলাপ থেকে বিরত থাকে (তারাই পরিত্রাণ প্রাপ্ত মুমিন)।”¹
"মায়মুন বিন সিয়াহ্ কারো গীবত করতেন না এবং তার সামনে অন্য কারো গীবত করারও সুযোগ কাউকে দিতেন না। গীবতকারীকে কঠিনভাবে বাধা দিতেন এবং বাধা না শুনলে সে মজলিস ছেড়ে উঠে যেতেন।”²
যারা গীবতে লিপ্ত হয়, তারাই তো গীবত সংক্রান্ত আল্লাহর আয়াতকে অস্বীকার করে এবং এর প্রতি ঠাট্টা-বিদ্রুপও করে। সুতরাং গীবতকারীগণও নিঃসন্দেহে আল্লাহর আয়াতকে অস্বীকার ও তার প্রতি ঠাট্টা- বিদ্রুপকারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।
নিজে গীবতের মত জঘন্য অপরাধ থেকে বেঁচে থাকলে যেমন আল্লাহর নিকট মর্যাদা লাভ করা যায়, তেমনিভাবে সমাজেও সম্মানিত ও মর্যাদাবান হওয়া যায়। কোন গীবতকারীকে বাধা দিলেও আল্লাহ্ তা'আলা দুনিয়া ও আখেরাতে সাহায্য-সহযোগিতা ও মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেন,
مَا مِنْ امْرِئٍ يَخْذُلُ امْرَاً مُسْلِمًا فِي مَوْضِعٍ تُنْتَهَكُ فِيْهِ حُرْمَتُهُ وَيُنْتَقَصُ فِيْهِ مِنْ عِرْضِهِ إِلَّا خَذَلَهُ اللَّهُ فِي مَوْطِنٍ يُحِبُّ فِيْهِ نُصْرَتَهُ وَمَا مِنْ امْرِئٍ يَنْصُرُ مُسْلِمًا فِي مَوْضِعٍ يُنْتَقَصُ فِيْهِ مِنْ عِرْضِهِ وَيُنْتَهَكُ فِيْهِ مِنْ حُرْمَتِهِ إِلَّا نَصَرَهُ اللَّهُ فِي مَوْطِنٍ يُحِبُّ نُصْرَتَهُ.
“যে ব্যক্তি কোন স্থানে কোন মুসলিমের মান-সম্মান এবং ইজ্জত ও সম্ভ্রম নষ্ট করে অর্থাৎ সম্মান ক্ষুণ্ণ করে, আল্লাহ্ তাকে ঐ স্থানে বেইজ্জত ও অপমানিত করেন যেস্থানে সে তার নিজের সাহায্য-সহযোগিতা পাওয়া পছন্দ করে বা আশা করে। অপরদিকে যে ব্যক্তি কোন মুসলিমের মান- সম্মান এবং ইজ্জত ও সম্ভ্রম রক্ষায় সাহায্য-সহযোগিতা করে বা সম্মান রক্ষা করে আল্লাহ্ তাকে সেই স্থানে সাহায্য-সহযোগিতা করেন যেখানে সে তার নিজের সাহায্য-সহযোগিতা পাওয়ার আশা করে।”¹ অপর এক হাদীসে এসেছে-
مَنْ حَمَى مُؤْمِنًا مِنْ مُنَافِقٍ أَرَاهُ قَالَ بَعَثَ اللَّهُ مَلَكًا يَحْمِي لَحْمَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ نَارِ جَهَنَّمَ وَمَنْ رَمَى مُسْلِمًا بِشَيْءٍ يُرِيدُ شَيْنَهُ بِهِ حَبَسَهُ اللَّهُ عَلَى حِسْرِ جَهَنَّمَ حَتَّى يَخْرُجَ مِمَّا قَالَ.
রাসূলে করীম ﷺ বলেন, “যে ব্যক্তি কোন মুমিনকে মুনাফিকের কুচক্র থেকে রক্ষা করে কিয়ামত দিবসে আল্লাহ্ তা'আলা ফিরিস্তা প্রেরণ করে তার শরীরকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন। আর যে ব্যক্তি দোষ-ত্রুটি বর্ণনার দ্বারা কোন মুসলিমকে কষ্ট দেয় আল্লাহ্ তা'আলা তাকে জাহান্নামের উপর কঠিন পুলসিরাতে আটকে রাখবেন যতক্ষণ পর্যন্ত সে তার কৃত অপরাধ থেকে মুক্ত হতে না পারবে।”²
অপর হাদীসে রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেন,
مَنْ رَدَّ عَنْ عِرْضِ أَخِيهِ رَدَّ اللَّهُ عَنْ وَجْهِهِ النَّارَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ .
“যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের সম্মান রক্ষার জন্য প্রতিরোধ করে আল্লাহ্ তা'আলা কিয়ামত দিবসে তাকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করবেন।”¹
রাসূল ﷺ আরো বলেন,
قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ ذَبَّ عَنْ لَحْمٍ أَخِيهِ فِي الْغِيْبَةِ كَانَ حَقًّا عَلَى اللَّهِ أَنْ يُعْتِقَهُ مِنْ النَّارِ .
আসমা বিনতে ইয়াযিদ হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল ﷺ বলেছেন “যে ব্যক্তি তার অপর ভাইয়ের গীবতকারীকে বাধা দেয় বা প্রতিরোধ করে তাকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব আল্লাহর উপর বর্তায়।”²
সুবহানাল্লাহ্! সমাজে শান্তি-শৃংখলা ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠা এবং মুসলিম মিল্লাতের মধ্যে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ বজায় রাখতে উৎসাহিত করার জন্যই আদর্শ সমাজ সংস্কারক মুহাম্মাদ ﷺ এ ধরনের লোভনীয় নির্দেশ দিয়েছেন। অপরদিকে কঠিন কথাও বলেছেন, মা আয়েশা (রাযিআল্লাহু আনহা) যখন ছাফিয়্যাহ্ (রাযিআল্লাহু আনহা)-এর ব্যাপারে রাসূল ﷺ-এর নিকট একটু খাটো বলে মন্তব্য করেছিলেন তখন রাসূল ﷺ বলেছিলেন তুমি এমন মারাত্মক কথা বলেছ, যা সমুদ্রের পানিতে মিশিয়ে দিলে সমুদ্র বরাবর হয়ে যাবে।³
অতএব যে ব্যক্তি এই লোভনীয় বিষয়টি লুফে নিতে পারবে এবং কঠিন হুঁশিয়ারী থেকে মুক্ত থাকতে পারবে, সেই তো দুনিয়া ও আখেরাতে লাভবান হবে এবং সুন্দর সমাজ গড়তে সহযোগিতা করবে।
টিকাঃ
১. সূরা মুমিনূন, আয়াত ৩।
২. তাফসীর কুরতুবী, ১৬/২৮৭।
১. আবু দাউদ, 'আল-আদাব' অধ্যায়, 'মান রাদ্দা আন মুসলিমীন গীবাতান' অনুচ্ছেদ, হা/৪২৪০, ৪৪৮৪।
২. আবু দাউদ, 'আল-আদাব' অধ্যায়, 'মান রাদ্দা আন মুসলিমীন গীবাতান' অনুচ্ছেদ, হা/৪২৩৯, ৪৮৮৩।
১. তিরমিযী, 'আল-বির ওয়াসিলাহ্' অধ্যায়, 'আয-যাব্বু আন ইরযেল মুসলিম' অনুচ্ছেদ, হা/১৮৫৪, ১৯৩১।
২. মুসনাদ আহমাদ, হা/২৪৩২৮।
৩. আবু দাউদ, 'আদব' অধ্যায়, 'গীবত' অনুচ্ছেদ, হা/৪২৩২।
📄 গীবতে লিপ্ত হওয়ার কারণ ও পরিত্রাণের উপায়
(১) শত্রুতা ও হিংসা-বিদ্বেষ :
দুনিয়াবী সামান্য কোন ব্যক্তিগত কারণ নিয়ে মানুষ শত্রুতে পরিণত হয়। অবশেষে এরই সূত্র ধরে গীবতে লিপ্ত হয়। তেমনিভাবে অন্যের প্রতি আল্লাহ্ প্রদত্ত নিয়ামতের ধ্বংস কামনা কল্পে মানুষ নিজে থেকেই গীবত চর্চা শুরু করে।
কোন মজলিসে যদি খ্যাতিমান কোন জনপ্রিয় ব্যক্তির সুনাম ও প্রশংসা করা হয় অথবা আল্লাহ্ প্রদত্ত কোন নেয়ামতের উল্লেখ করা হয় আর তা কোন হিংসুক ব্যক্তি শোনে তখন সে হিংসার বশবর্তী হয়ে ঐ সম্মানিত ব্যক্তির মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করার হীন উদ্দেশ্যে গীবতে লিপ্ত হয়। চিন্তা করে যে, অমুক ব্যক্তি এত ধন-সম্পদ, মান-মর্যাদার অধিকারী হয়ে গেছে আর আমি তার তুলনায় কিছুই পাইনি। আল্লাহ্ তাকে যা দান করেছেন তাতে সে পরিতৃপ্ত নয় এবং অন্যকে যা দান করেছেন তাতেও সে আল্লাহর ফায়সালার প্রতি সন্তুষ্ট নয়। সর্বদা মনের মধ্যে হিংসার আগুন জ্বালিয়েই রাখে। ফলে হিংসার বশবর্তী হয়ে ঐ নেয়ামত প্রাপ্ত ব্যক্তির নেয়ামতকে ক্ষুণ্ণ বা ধ্বংস করার জন্য কু-মতলব অন্তরে রেখে ছোট-খাট বিষয় নিয়ে অন্যের সামনে হিংসাত্মক কথা ও আচরণ পেশ করে থাকে যা স্পষ্ট গীবতের শামিল।
أَمْ يَحْسُدُوْنَ النَّاسَ عَلَى مَا آتَاهُمُ اللهُ مِنْ فَضْلِهِ [النساء: ٥٤]
“মহান আল্লাহ্ নিজ অনুগ্রহে মানুষকে যা দিয়েছেন সেজন্য কি তারা তাদের হিংসা করে?”।¹
এই গীবতের ফলে ঐ ব্যক্তির কোনই ক্ষতি হয় না; বরং সে তাকে দুনিয়া ও আখেরাতে আরো মর্যাদায় উন্নীত করে এবং নিজের পুণ্যের (নেকির) ঝুলি থেকে গীবতের পরিমাণ অনুযায়ী তাকে দিতে থাকে ও তার গোনাহের বোঝা নিজের কাঁধে চাঁপিয়ে নিতে থাকে, যা হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,
مَنْ كَانَتْ لَهُ مَظْلَمَةٌ لأَخِيهِ مِنْ عِرْضِهِ أَوْ شَيْءٍ فَلْيَتَحَلَّلْهُ مِنْهُ الْيَوْمَ قَبْلَ أَنْ لَا يَكُوْنَ دِينَارٌ وَلَا دِرْهَم ....
'যদি কোন ব্যক্তি অন্যের ইযযত নষ্ট কিংবা অন্য কিছু হরণ করে থাকে, তাহলে সে যেন ঐ দিন আসার পূর্বেই তা নিষ্পত্তি করে নেয়, যে দিন তার কোন দীনার ও দিরহাম কিছুই থাকবে না। অর্থাৎ কিয়ামতের দিন। কেননা সেদিন তার মাফ নেয়ার কোনই উপায় থাকবে না'।¹
পরিত্রাণের উপায় :
দুনিয়া ও আখেরাতে হিংসার মারাত্মক পরিণতির কথা সর্বদা মনে রাখতে হবে। একথাও স্মরণ রাখতে হবে যে, এই হিংসার কারণেই দুনিয়া ও আখেরাতে সে নিজে যেমন ছোট হচ্ছে, ঠিক তেমনিভাবে যার প্রতি হিংসা করা হচ্ছে তার মান-মর্যাদা অধিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আরও হুঁশিয়ার থাকতে হবে, যেন হিংসার বশবর্তী হয়ে জীবনে উপার্জিত সমস্ত নেকি বরবাদ না হয়ে যায়।
হিংসাকারী মূলতঃ দু'টি ঘৃণ্যতম পাপে লিপ্ত হয়। যথা- হিংসা ও গীবত। আর দু'টিরই পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ। এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল ﷺ বলেন,
لا تَحَاسَدُوا وَلَا تَنَاجَسُوا وَلَا تَبَاغَضُوا وَلَا تَدَابَرُوْا وَلَا يَبِعْ بَعْضُكُمْ عَلَى بَيْعِ بَعْضٍ وَكُوْنُوْا عِبَادَ اللَّهِ إِخْوَانًا الْمُسْلِمُ أَخُو الْمُسْلِمِ لَا يَظْلِمُهُ وَلَا يَخْذُلُهُ وَلَا يَحْقِرُهُ التَّقْوَى هَاهُنَا وَيُشِيرُ إِلَى صَدْرِهِ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ بِحَسْبِ امْرِئٍ مِنْ الشَّرِّ أَنْ يَحْقِرَ أَخَاهُ الْمُسْلِمَ كُلُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ حَرَامٌ دَمُهُ وَمَالُهُ وَعِرْضُهُ.
“তোমরা পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ ও অকল্যাণ কামনা করো না, পরস্পর ঘৃণা ও শত্রুতা পোষণ করো না এবং দোষ-ত্রুটিও তালাশ করে বেড়িও না। আর অন্যের বেচা-কেনার মধ্যে শরীক হয়ো না (কেনার উদ্দেশ্য ছাড়াই দাম বৃদ্ধি করো না। অর্থাৎ দালালী করো না); বরং আল্লাহ্র বান্দা হিসাবে সবাই ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যাও। একজন মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। অতএব ঐ ভাইয়ের প্রতি কোন ধরনের যুগ্ম অত্যাচার করবে না, সাহায্য-সহযোগিতাও বর্জন করবে না এবং তুচ্ছও মনে করবে না। অতঃপর স্বীয় বুকের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনবার বলেন, তাকওয়া এখানে। কোন ব্যক্তির খারাপ হওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে, সে তার মুসলিম ভাইকে তুচ্ছ মনে করবে। প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অপর মুসলিমের রক্ত, সম্পদ ও মান-সম্মান এবং ইজ্জত হরণ করা হারাম।”¹
(২) ক্রোধ ও প্রতিশোধ :
যদি কোন মানুষ তার সাথে কোন বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করে তাহলে তার অন্তরে ক্রোধের বীজ রোপিত হয়, ফলে দুনিয়াবী সামান্য কারণে রাগের বশবর্তী হয়ে প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য যেখানে-সেখানে তার বিরুদ্ধে সমালোচনা করতে গিয়ে গীবতে লিপ্ত হয়, ক্রোধ সংবরণ করতে পারে না। অথচ ক্রোধ সংবরণ করা মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
পরিত্রাণের উপায় :
ক্রোধ সংবরণ ও ক্ষমার উত্তম ফলাফলের কথা হৃদয়ে সর্বদা জাগ্রত রাখতে হবে। কেননা ক্রোধ সংবরণ ও মানুষকে ক্ষমা করতে পারলেই আল্লাহ্ দুনিয়াতে মান-সম্মান ও ইজ্জত বৃদ্ধি করবেন। ফলে আপোষে ভ্রাতৃত্ববোধ বৃদ্ধি পাবে, সুষ্ঠু সমাজ গড়তে সহযোগিতা করবে। শুধু এখানেই সীমিত নয়; বরং দয়াময় আল্লাহ্ তা'আলা পরকালে মহা সুখময় স্থান জান্নাত দান করবেন।
টিকাঃ
১. সূরা নিসা, আয়াত ৫৪।
১. সহীহ বুখারী, 'কিতাবুল মাযালেম', হা/২১৯৯।
১. সহীহ্ মুসলিম, 'আল-বির ওয়াসসিলাহ্ ওয়াল আদাব' অধ্যায়, 'তাহরীমু যুলমিল মুসলিমে' অনুচ্ছেদ, হা/৬৪৫০।