📘 গীবত ভয়াবহ পরিনতি ও পরিত্রাণের উপায় > 📄 গীবতের অর্থ

📄 গীবতের অর্থ


গীবত একটি আরবী শব্দ, এর অর্থ বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে করেছেন। তবে তাতে শুধু শাব্দিক পার্থক্য দেখা যায় মৌলিক কোন ভিন্নতা নেই।

হাদীসের ভাষায় গীবতের অর্থ :
রাসূল ﷺ তাঁর সাহাবীদের লক্ষ্য করে বলেন,
أَتَدْرُونَ مَا الْغِيْبَةُ قَالُوا اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ قَالَ ذِكْرُكَ أَخَاكَ بِمَا يَكْرَهُ
قِيلَ أَفَرَأَيْتَ إِنْ كَانَ فِي أَخِي مَا أَقُولُ قَالَ إِنْ كَانَ فِيْهِ مَا تَقُوْلُ فَقَدْ
اغْتَبْتَهُ وَإِنْ لَمْ يَكُنْ فِيْهِ فَقَدْ بَهَنَّهُ.
“গীবত কি জিনিস তোমরা কি তা জানো? জবাবে তাঁরা বলেন, আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলই এ বিষয়ে ভাল জানেন। তিনি বলেন, তোমার অপর ভাইয়ের এমন কিছু বিষয় তার অগোচরে আলোচনা করা যা সে অপছন্দ করে রাসূল ﷺ-কে বলা হলো, হে আল্লাহর রাসূল ﷺ! তার সম্পর্কে আমি যা বলি তা যদি বাস্তবে তার মধ্যে বিদ্যমান থাকে তাহলেও কি গীবত হবে? রাসূল ﷺ বলেন, হ্যাঁ, তুমি যা বলো তা যদি সত্যই তার মধ্যে বিদ্যমান থাকে তাহলে তুমি তার গীবত করলে। আর যদি তার মধ্যে ঐ ত্রুটি বিদ্যমান না থাকে তাহলে তুমি তার প্রতি মিথ্যা অপবাদ দিলে।”¹

ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ্) বলেন, “গীবত হচ্ছে একজন মানুষের মধ্যে বিদ্যমান কোন দোষ-ত্রুটি অন্যের সামনে বর্ণনা ও আলোচনা করা যা প্রকাশিত হোক তা সে চায় না, সে দোষ-ত্রুটি তার শারীরিক হোক অথবা চারিত্রিক, দুনিয়াবী হোক অথবা দ্বীনি, সৃষ্টিগত হোক অথবা বৈশিষ্ট্যগত, ধন-সম্পদে হোক অথবা পিতা-পুত্রের ব্যাপারে, স্ত্রীর হোক অথবা খাদেমার (বুয়া), পোষাক-পরিচ্ছদে হোক অথবা চলাফেরায়, তার হাস্যোজ্জ্বল অথবা গাম্ভীর্যপূর্ণ চেহারার হোক ইত্যাদি বিষয় যা তার সাথে সম্পৃক্ত। আর এই আলোচনা ও বিবরণ মুখের ভাষায় হোক অথবা লেখনির মাধ্যমে অথবা ব্যঙ্গাকৃতি প্রকাশের মাধ্যমে হোক অথবা হাত, মাথা ও চক্ষুর ইশারার মাধ্যমে কিংবা যে কোন মাধ্যমে হোক।'

টিকাঃ
১. সহীহ্ মুসলিম, 'আল-বির ওয়াসিলাহ্ ওয়াল আদাব' অধ্যায়, 'গীবত হারাম' অনুচ্ছেদ, হা/৪৬৯০।

📘 গীবত ভয়াবহ পরিনতি ও পরিত্রাণের উপায় > 📄 মিথ্যা অপবাদের পরিণতি

📄 মিথ্যা অপবাদের পরিণতি


“গীবত, বুহতান ও ইষ্ক” এগুলি আরবী শব্দ। গীবত-এর অর্থ- ব্যক্তির মধ্যে বিদ্যমান কোন দোষ-ত্রুটির সমালোচনা করা। আর কোন ব্যক্তির এমন দোষ-ত্রুটি আলোচনা করা যা তার মধ্যে আসলেই বিদ্যমান নেই, এটাই হচ্ছে বুহতান বা মিথ্যা অপবাদ। ইষ্ক অর্থ চরম মিথ্যা। কোন বিষয় শুনে কোনরূপ যাচাই-বাছাই না করে অমনি সাথে সাথে তা বলে বেড়ানো। অর্থাৎ মিথ্যা অপবাদ বা ভিত্তিহীন বিষয়ের প্রচার ও প্রসার করা। বুহতান ও ইস্ক মূলতঃ মিথ্যার সাথেই সম্পৃক্ত।

মিথ্যা অপবাদের কারণে উম্মুল মুমিনীন জননী আয়েশা (রাযিআল্লাহু আনহা) এবং রাসূল ﷺ ও উপস্থিত সাহাবীদের মাঝে কি চরম পরিস্থিতি বিরাজ করছিল তা কি আমরা কখনও ভেবে দেখেছি? এরূপ গুঞ্জনের কারণে মদীনার আকাশ-বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠেছিল। বাণী মুস্তালিক যুদ্ধে রাসূল ﷺ-এর স্ত্রীদের মধ্য হতে সাথে ছিলেন মা আয়েশা (রাযিআল্লাহু আনহা)। পথিমধ্যে তাঁর হার হারিয়ে যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবদুল্লাহ্ বিন উবাই বিন সালূল মা আয়েশা (রাযিআল্লাহু আনহা)-এর প্রতি যেনার যে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছিল সে কারণে রাসূল ﷺ ভীষণ অস্থির হয়ে পড়েন। এমনকি মধুর সম্পর্ক আস্তে আস্তে কমিয়ে দিতে থাকেন। অথচ মা আয়েশা (রাযিআল্লাহু আনহা) তখনও এ বিষয়ে কিছুই অবগত ছিলেন না। পরে যখন তাঁর প্রতি মিথ্যা অপবাদের কথা উম্মে মিসতাহ্র নিকট হতে অবহিত হলেন, তখন তিনিও পাগল প্রায় হয়ে পড়লেন। বাঘের গলায় হাড় বিধলে যেমন অস্থির হয়ে ছুটাছুটি করতে থাকে, তিনিও তেমনিভাবে নিজেকে পূত-পবিত্র প্রমাণিত করার জন্য পেরেশান হয়ে গেলেন। অশ্রু জলে পবিত্র বুক ভিজতে থাকে এবং দুঃখে ও শোকে একাধিক রাত্রি বিনিদ্র অবস্থায় কাটাতে থাকেন। একদা রাসূল ﷺ তাঁর নিকট এসে বলেন, হে আয়েশা! তোমার ব্যাপারে এরূপ শুনছি। অতএব তুমি যদি এ বিষয়ে সত্যই নির্দোষ হয়ে থাকো তাহলে মহান আল্লাহ্ তোমাকে পূত-পবিত্র ঘোষণা করবেন। আর যদি তুমি অপরাধী হয়েই থাকো তাহলে আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাও এবং তাওবা কর। কেননা আল্লাহই একমাত্র তাওবা কবুলকারী। একথা শুনে মা আয়েশা (রাযিআল্লাহু আনহা) দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল ﷺ আমি অল্প বয়সী মেয়ে, কুরআন মাজীদও বেশী পড়তে পারি না। আল্লাহর কসম! আমি জানতে পারলরাম যে, আপনারা এ বিষয়ে অনেক কিছু শুনেছেন যা আপনাদের অন্তরে বসে গেছে এবং বিশ্বাসও করে ফেলেছেন। অতএব আমি যদি বলি, এ বিষয়ে আমি সম্পূর্ণ পবিত্র তাহলে আপনারা তা বিশ্বাস করবেন না। আর যদি আপনাদেরকে বলি যে, যা শুনছেন তা সত্য, তাহলে মহান আল্লাহ্ জানেন আমি এ বিষয়ে সম্পূর্ণ মুক্ত। অতঃপর একমাস পর মহান আল্লাহ্ তাঁর পবিত্রতার সমর্থনে দশটি আয়াত নাযিল করে বিষয়টির নিষ্পত্তি করেন।' ফলে মদীনার মেঘাচ্ছন্ন আকাশ ও অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ আস্তে আস্তে পরিস্কার হয়ে উঠল এবং সেই কপোট মিথ্যুকদের মুখোশ উন্মোচিত হল। এই অপবাদের ঘটনা সহীহ্ আল-বুখারীসহ বিভিন্ন তাফসীর গ্রন্থে বিস্তারিত উল্লেখিত হয়েছে।²
উক্ত অপবাদের কারণে মিসতাহ্ বিন আছাছাহ্, হাসান বিন ছাবেত ও হামনাহ্ বিনতে জাহাশকে দণ্ডায়িত করা হয়েছিল, প্রত্যেককে আশিটি করে বেত্রাঘাত করা হয়। যদিও এই মিথ্যা অপবাদ ছড়ানোর মূল হোতা ছিল আবদুল্লাহ্ বিন উবাই বিন সালূল, তবুও তার উপর দণ্ডারোপ করা হয়নি।' কারণ হিসাবে উল্লেখ করা হয় যে, দুনিয়াতে শাস্তির বিধান কায়েম করলে হয়ত পরকালীন শাস্তি হালকা হয়ে আসতে পারে। আর মহান আল্লাহ তার জন্য পরকালে কঠিন শাস্তির ওয়াদা করেছেন।

টিকাঃ
১. ইমাম নববী, আল-আযকার পৃ. ৫৩৪।
১. সূরা নূর, আয়াত ১১-২০।
২. সহীহ্ আল-বুখারী, 'কিতাবুল মাগাযী', 'হাদীদুল ইষ্ক' অনুচ্ছেদ।

📘 গীবত ভয়াবহ পরিনতি ও পরিত্রাণের উপায় > 📄 মিথ্যুকের ভয়াবহ পরিণতি

📄 মিথ্যুকের ভয়াবহ পরিণতি


একজন কপট মিথ্যুক মুহূর্তের মধ্যে যেভাবে পরিবেশ কলুষিত করতে পারে, অপরদিকে একজন মুমিন চব্বিশ ঘণ্টাতেও সত্য দ্বারা পরিবেশ উজ্জ্বল করতে সক্ষম হয় না।

কোন কপট মিথ্যুক যদি ক্বিয়ামত দিবসে মিথ্যার ভয়াবহ শাস্তির কথা চিন্তা করত, তাহলে এ চিন্তাই তাকে এ ধরনের জঘন্য চরিত্র থেকে বিরত রাখত।
সামুরাহ বিন জুনদুব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, দীর্ঘ হাদীছে নবী কারীম ﷺ মিথ্যুকের চরম ভয়াবহ শাস্তির কথা আমাদেরকে বলে গিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমরা চলতে থাকলাম অতঃপর চিত হয়ে (মাথার পিছন ভরে) পড়ে আছে এমন এক লোকের নিকট উপস্থিত হলাম। আর অপর একজন তার পার্শ্বেই লোহার হুঁক বা আঁকড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সেই বড়শি কশে (ওষ্ঠাধরে) অর্থাৎ ঠোঁটের কোণে বাধিয়ে মাথার পিছন দিকে টেনে নিয়ে আসছে। ঠিক অনুরূপভাবে নাকের ছিদ্রে ও চোখে আঁকড়া বাধিয়ে পিছনের দিকে টেনে নিয়ে আসছে। অতঃপর কাত করে ফেলে প্রথম পার্শ্বের মতই দ্বিতীয় পার্শ্বেও করা হচ্ছে।
দ্বিতীয় কশের কাজ শেষ হতে হতেই প্রথম কশ ঠিক হয়ে যাচ্ছে এবং প্রথম কশের ন্যায় আযাব দিচ্ছে। (এভাবে এক পার্শ্বের পর অপর পার্শ্বে কিয়ামত পর্যন্ত হতে থাকবে) হাদীসের শেষাংশে এসেছে। যার কশে এবং নাকের ছিদ্রে ও চোখে লোহার হুঁক বাধিয়ে মাথার পিছনের দিকে টেনে নেয়া হচ্ছিল সে এমন ব্যক্তি যে সকালে বাড়ি হতে বের হয়েই মিথ্যা কথা বলত। ফলে সেই মিথ্যা মহাশূন্য পর্যন্ত পৌঁছে যেত।' অর্থাৎ পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে যায়।

টিকাঃ
১. ছফিউর রহমান মুবারকপুরী, আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৩৩২।

📘 গীবত ভয়াবহ পরিনতি ও পরিত্রাণের উপায় > 📄 গীবতের প্রকার

📄 গীবতের প্রকার


ইমাম নববীর উপরোক্ত সংজ্ঞায় গীবতের প্রকারভেদ অনুমান করা যায়। যথা- (১) সৃষ্টিগত শারীরিক গঠন বা অবয়বের গীবত। (২) চারিত্রিক আচার-আচরণের গীবত। (৩) বংশের গীবত। (৪) পোষাক-পরিচ্ছদের গীবত। (৫) পরোক্ষ গীবত।

অন্তরের গীবত :
কথা ও ইঙ্গিতের দ্বারা গীবত যেমন হারাম, তেমনিভাবে মনে মনে গীবত করাও হারাম। আর অন্তরের গীবত হয় অন্যের প্রতি মনে মনে কুধারণার মাধ্যমে। এজন্য আল্লাহ্ তা'আলা এরূপ ধারণা করতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيْرًا مِّنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ (الحجرات: ۱۲)
“হে মু'মিনগণ! তোমরা বেশী বেশী ধারণা করা থেকে বিরত থাকো, নিশ্চয়ই কিছু কিছু ধারণা গোনাহ্...”।² রাসূল ﷺ বলেন,
إِيَّاكُمْ وَالظَّنَّ فَإِنَّ الظَّنَّ أَكْذَبُ الْحَدِيثِ .
“তোমরা ধারণা করার বিষয়ে সতর্কতা ও সাবধানতা অবলম্বন করবে। কেননা ধারণা করে যা বলা হয় তা-ই অধিক বড় মিথ্যা।”¹

মৃত ব্যক্তির গীবত :
জীবিত মানুষের গীবত করা যেমন হারাম তেমনিভাবে মৃত মানুষেরও গীবত হারাম। মায়েয বিন মালেক আল-আসলামী (রাঃ) পরকালীন আযাব থেকে বাঁচার জন্য যখন নিজের যেনার অপরাধের কথা রাসূল ﷺ-এর সামনে স্বীকারোক্তি দিলেন, তখন তিনি তাকে যেনার শাস্তি হিসাবে রজমের (পাথর মেরে হত্যার) নির্দেশ দেন। ফলে তাকে রজম করা হলে সাহাবীদের মধ্য হতে দু'জন ব্যক্তি তার প্রতি ব্যঙ্গ করে একে অপরকে বলাবলি করে যে, দেখ! তাকে কুকুরের ন্যায় রজম করা হয়েছে। একথা শুনে রাসূল ﷺ চুপ থাকলেন। অতঃপর কিছুক্ষণ সময় পথ চলার পর একটি মৃত গাধার দুর্গন্ধময় লাশের পাশ দিয়ে অতিক্রমকালে ঐ দুই ব্যক্তিকে ডেকে বলেন, যাও এই মরা গাধার গোস্ত খাও, তারা বলে, হে আল্লাহর রাসূল ﷺ! কেউ কি এই গাধার পচা দুর্গন্ধময় গোস্ত খায়? রাসূল ﷺ বলেন, কিছুক্ষণ পূর্বেই তোমাদের ভাইয়ের সম্মানের ব্যাপারে সমালোচনায় লিপ্ত হয়েছিলে। তাতো এই গোস্ত ভক্ষণের চেয়েও মারাত্মক কঠিন ছিল। আল্লাহর কসম! সেতো এখন জান্নাতের নহর সমূহে আনন্দে বিরাজ করছে।²

টিকাঃ
১. সহীহ্ আল বুখারী ও সহীহ্ মুসলিম।
২. আবু দাউদ, 'কিতাবুল হুদুদ', 'রজমে মায়েয' অনুচ্ছেদ।
১. সহীহ্ আল-বুখারী, 'কিতাবুল জানাইয', 'বাবু মা কিলা ফী আওলাদিল মুশরেকিন'।
* বিস্তারিত দ্রষ্টব্য : লেখক কর্তৃক অনূদিত আযহারী আহমাদ মাহমূদ প্রণীত "মিথ্যা” ইসলামিক সেন্টার, ছানাইয়া কাদীমা, রিয়াদ কর্তৃক প্রকাশিত।
২. সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত ১২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00