📄 পরিবেশও মানুষকে গাইরতহীন বানায়
মানুষ সামাজিক জীব। তাই সমাজ ও পরিবেশ দ্বারা মানুষ প্রভাবিত হয়—কথাটা চিরন্তন সত্য। দেখা গেছে, একজন পুরুষ এক সময় খুবই গাইরতমন্দ ছিল, কিন্তু এখন সমাজ ও পরিবেশে প্রভাবিত হয়ে সে গাইরতহীন হয়ে গেছে! এই নৈতিক অধঃপতনটা সবচেয়ে বেশি লক্ষণীয় বিলেত প্রবাসী মুসলমানদের ক্ষেত্রে। তারা দেশে যথেষ্ট গাইরত সম্পন্ন থাকলেও পশ্চিমা দেশে যাওয়ার পর বেহায়া ও গাইরতহীন হয়ে যায়। অবশ্য সবাই নয়। অজপাড়া গাঁ থেকে শহরে এলেই বহু মানুষের দ্বীনদারি ও গাইরত লোপ পেয়ে যায়। গ্রামে থাকতে যার স্ত্রী, কন্যা ও বোনেরা শালীন পোশাক ছাড়া ঘর হতে বেরই হতো না; শহরে আসার পর তারা টাইটফিট জামা ছাড়া বাসা থেকে বেরই হয় না! আর তাদের অভিভাবক পুরুষ; যে কিনা আগে যথেষ্ট রক্ষণশীল ছিল, সেও এখন তা ‘সোসাইটি ম্যানেজ’ এর নামে মেনে নেয়!
এ ব্যাপারে লম্বা আলাপের আসলে দরকার নেই। বাস্তবতা কিন্তু সকলের চোখের সামনে। পরিবেশ ও পরিস্থিতি দ্বারা মানুষ যে কতটা প্রভাবিত হয়, সেটা বোঝাতে গিয়ে একজন হুজুরের গল্প বলি। গল্পটা ফেসবুকে পড়েছিলাম। গাইরত নিয়ে গ্রন্থনায় কাজে লাগবে—এই চিন্তা থেকে সেটা সংরক্ষণ করে রেখেছিলাম। গল্পটা হুবহু নকল করছি।
“একজন আলেমের কথা বলি। মফস্বলে থাকেন। সন্তানের চিকিৎসার জন্য ঢাকায় এলেন। সপ্তাহ খানেক থাকলেন প্রাইভেট ভার্সিটি এলাকায়। যতবারই বের হলেন; কিছু না কিছু অশ্লীল দৃশ্য চোখে পড়েছে। ছেলে-মেয়েরা কীভাবে তাদের জাস্ট ফ্রেন্ডদের সাথে গলাগলি করে—এসব সেখানে নিত্যই দেখা যায়।
ছেলে সুস্থ হওয়ার পর চলে এলেন গ্রামে। বাস থেকে নেমে গ্রামের সাব রাস্তায় স্ত্রী-সন্তানকে তুলে দিলেন এমন সিএনজিতে, যেখানে রয়েছে আরও চারজন পুরুষ। তিনি একবারও ভাবলেন না—তার স্ত্রী কীভাবে এই মানুষগুলোর সাথে ঘেঁষাঘেঁষি করে বসবে। স্ত্রী বেচারা নিজেই হতবাক। বুঝে উঠার আগেই গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে।
দিনভর কিছুই খেতে পারেননি। রাতে যখন মৌলভি বাসায় ফিরলেন; নিজেদের মধ্যে ঘটে গেল তুমুলকাণ্ড!
দশ বছরের সংসার জীবনে এটাই একমাত্র ঝামেলা, যা মনে হলে আজও নাকি বেচারা শিউরে ওঠেন। তিনি আমাকে পরে জানালেন যে, ভার্সিটির ছেলে-মেয়েদের তাৎক্ষণিক এসব অনৈতিক দৃশ্য (যদিও তিনি নিজের চোখ হেফাজত করার চেষ্টা করছেন) কিছু সময়ের জন্য তার ঈমানের গাইরত ধ্বংস করে দিয়েছে। ফলে তিনি স্ত্রীকে অন্য পুরুষের সাথে গাড়িতে তুলে দিচ্ছেন; অথচ বিষয়টা তার কাছে তখন স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল!”
📄 উম্মাহর গাইরতহীনতার মূল কারণগুলো কী?
পুরুষ মানুষ বলতেই গাইরতমন্দ হওয়ার কথা। গাইরত যে পুরুষের ফিতরাত তথা জন্মগত স্বভাব-সে কথা তো বইয়ের শুরুতেই বলে এসেছি। আর একজন মুমিন তো অবশ্যই গাইরতমন্দ হবে। গাইরত ব্যক্তিগত প্রেস্টিজের ব্যাপারই নয় শুধু; দ্বীন ও ঈমানের অংশ। এরপরেও বহু পুরুষের মধ্যে গাইরতের ঘাটতি যে থাকে, সেটার কারণ কী?
হিসেব করতে গেলে কারণ কিন্তু অনেক। সবগুলো তো উল্লেখ, করা সম্ভব নয়। তাই মৌলিক বড় কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেই ক্ষ্যান্ত করব ইনশাআল্লাহ।
এক. ঈমানি দুর্বলতা: মানুষের ঈমানে দুর্বলতা থাকলেই তখন সে শরিয়তের অন্যান্য আহকাম পালনে ঢিলেমির মতো গাইরত প্রদর্শনেও ঢিলেমি করে। আর আগেই উল্লেখ করেছি যে, হাদিসে বলা হয়েছে-'আল্লাহ গাইরত রাখেন, মুমিনও গাইরত রাখে।' সুতরাং যার মধ্যে গাইরত নেই, বুঝতে হবে তার ঈমানে দুর্বলতা আছে।
দুই. গুনাহের আধিক্যতা: ইমাম ইবনু কাইয়িমিল জাওযিয়্যাহ রহ. বলেন, 'বেশি বেশি গুনাহ মানুষের গাইরতের আগুনকে নিভিয়ে ফেলে। গাইরতের আগুন মানবদেহের জন্য খুবই জরুরি। এই আগুন দেহ থেকে সব ধরনের ময়লা ও নিন্দনীয় গুণাবলি জ্বালিয়ে দেয়।১
তিন. মূর্খতা: গাইরতের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা এবং এ সম্পর্কে নিজের দায়িত্বশীলতা সম্পর্কে মূর্খতার কারণেই মানুষ গাইরতহীন হয়। দাইয়ুস হয়। অথচ, একজন পুরুষ নিজের পরিবার-পরিজনের দায়িত্বশীল। কিয়ামতের দিন তাকে এ ব্যাপারে জবাবদিহি করা হবে।
চার. বিজাতীয় কালচার অনুসরণ: বিজাতীয় কাফেরদের নোংরা কালচার অনুসরণ করতে গিয়েও মানুষ গাইরতহীন হয়ে থাকে। অথচ, ইসলাম বিজাতীয় কাফেরদের অসভ্যতা অনুসরণ না করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। হাদিসে বলা হয়েছে, 'যে ব্যক্তি কোনো জাতির সাদৃশ্য গ্রহণ করবে, কিয়ামতের দিন সে তারই অনুগামী হবে।'১
পাঁচ. খারাপ মিডিয়ার প্রভাব: রেডিও, টেলিভিশন, পত্র-পত্রিকা, ইন্টারনেট ইত্যাদির কুপ্রভাব রয়েছে মানুষদের মধ্যে। এইসব মিডিয়ার অশ্লীলতাই ঈমানদারদের দামি সম্পদ গাইরতকে হরণ করেছে।
ছয়. অশ্লীলতার ব্যাপকতা: সমাজে নীতি ও নৈতিকতা বিবর্জিত কর্মকাণ্ড, অশ্লীলতা ও বেহায়াপনার ছড়াছড়ির কারণে গাইরত ধংস হয়ে গেছে। অথচ, হাদিসে বলা হয়েছে, ভালো কাজের আদেশ দিতে আর মন্দকাজ থেকে বারণ করতে। এটা করা হলে সমাজ নষ্ট হতো না। গাইরতও লোপ পেত না।
টিকাঃ
১ আল-জাওয়াবুল কাফি: ৬৯, ইমাম ইবনুল কাইয়িম।
১ সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪০৩১। হাদিসটি সহিহ।
📄 দ্বীনদার মেয়ে বিয়ে করা গাইরতের দাবি
একজন পুরুষের কাছে গাইরতের দাবি হলো, বিয়ে করার সময় যে কাউকে বিয়ে করে ঘরের বউ করে আনবে না; বরং বউ করে আনবে একজন দ্বীনদার মেয়েকে। বউ যদি দ্বীনদার হয়, তাহলে স্বামীর আর অত গাইরত রাখতে হবে না। বউ যখন দ্বীনহীন হবে, তখনই তো স্বামীকে গাইরত দেখাতে হবে।
তাছাড়া নিজের অনাগত সন্তানদের ধর্মীয়, নৈতিক ও উত্তম আখলাকের জীবন কল্পনা করতে হলেও তাদেরকে একজন দ্বীনদার উত্তম মা উপহার দেওয়ার দরকার আছে। দ্বীনহীন ও খারাপ মায়ের ঘরে তো ভালো সন্তান আশা করা যায় না। দ্বীন দেখে যে বিয়ে করতে হবে, এ ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ বলেছেন:
عَن أَبي هُرَيْرَةَ رضي الله عنه، عَنِ النَّبِيِّ ﷺ ، قَالَ: تُنْكَحُ المَرْأَةُ لأَرْبَعِ : لِمَالِهَا، وَلِحَسَبِهَا، وَلِجَمَالِهَا، وَلِدِينِهَا، فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاكَ.
আবু হুরাইরাহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবি বলেছেন, 'চারটি গুণ দেখে নারীকে বিবাহ করা হয়; তার ধন-সম্পদ, তার বংশ-মর্যাদা, তার রূপ-সৌন্দর্য এবং তার দ্বীন-ধর্ম দেখে। তুমি দ্বীনদার পাত্রী লাভ করে সফলকাম হও।'১
আরেক হাদিসে নবিজি বলেন:
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ قَالَ الدُّنْيَا مَتَاعٌ وَخَيْرُ مَتَاعِ الدُّنْيَا الْمَرْأَةُ الصَّالِحَةُ
আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. থেকে বর্ণিত, নবি বলেন, 'দুনিয়া পুরোটাই উপভোগ্য বস্তু। আর দুনিয়ার উপভোগ্য বস্তুসমূহের মধ্যে সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ বস্তু হলো পুণ্যময়ী বধূ।'২
চারটি গুণের মধ্যে দ্বীনদার হওয়ার গুণটি কেবল যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ তা-ই নয়, এ গুণ যার নেই তার মধ্যে অন্যান্য গুণ যতই থাক না কেন; ইসলামের দৃষ্টিতে বিয়ের জন্য সে অগ্রাধিকারযোগ্য মেয়ে নয়। রাসুলুল্লাহ -এর হাদিস অনুযায়ী তো দ্বীনদারির গুণবঞ্চিতা নারী বিয়ে করাই উচিত নয়। হাদিসে পাওয়া যায়-
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ : لَا تَزَوَّجُوا النِّسَاءَ لِحُسْنِهِنَّ، فَعَسَى حُسْنُهُنَّ أَنْ يُرْدِيَهُنَّ، وَلَا تَزَوَّجُوهُنَّ لِأَمْوَالِهِنَّ، فَعَسَى أَمْوَالُهُنَّ أَنْ تُطْغِيَهُنَّ، وَلَكِنْ تَزَوَّجُوهُنَّ عَلَى الدِّينِ، وَلَأَمَةٌ خَرْمَاءُ سَوْدَاءُ ذَاتُ دِينٍ أَفْضَلُ
আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. থেকে বর্ণিত, নবিজি ﷺ বলেছেন, ‘তোমরা স্ত্রীদের কেবল তাদের রূপ-সৌন্দর্য দেখেই বিয়ে করো না। কেননা এরূপ সৌন্দর্যই অনেক সময় তাদের ধ্বংসের কারণ হতে পারে। তাদের ধন-সম্পদের লোভে পড়েও বিয়ে করবে না। কেননা, এই ধন-সম্পদ তাদের বিদ্রোহী ও অনমনীয় বানাতে পারে; বরং তাদের দ্বীনদারির গুণ দেখেই তবে বিয়ে করবে। বস্তুত বিয়ের জন্য একজন দ্বীনদার স্বল্পাগম দাসীও কিন্তু অনেক ভালো।’১
সে হিসেবে আলেমগণ বলেন, নবিজি ﷺ-এর এ নির্দেশের মূলকথা হলো— দ্বীনদারীরা গুণসম্পন্না মেয়ে পাওয়া গেলেই যেন তাকে স্ত্রীরূপে বরণ করা হয়। দ্বীনদার নারী বাদ দিয়ে অপর কোনো গুণসম্পন্না মেয়েকে বিয়ে করতে আগ্রহী হওয়া পুরুষের জন্য উচিত নয়।
ইমাম আবু হামিদ গাজালি রহ. বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ ﷺ দ্বীনদার নারী বিয়ে করার ব্যাপারে এত প্রলুব্ধ করার কারণ হলো, দ্বীনদার স্ত্রী তার স্বামীকে দ্বীনের ওপর চলতে সাহায্য করবে। কিন্তু স্ত্রী যদি দ্বীনদার না হয়, তাহলে সে দ্বীন রেখে অন্য কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকবে এবং স্বামীকে উদ্বিগ্ন করবে।’২
কিন্তু আফসোসজনক হলেও সত্য যে, এই জায়গায় এসে শুধু দ্বীনহীন-ই না; বহু দ্বীনদার পুরুষ পর্যন্ত হোঁচট খান। রূপ-লাবণ্য কিংবা দুনিয়াবি কোনো স্বার্থ প্রাধান্য দিতে গিয়ে তারা দ্বীনকে গৌণ করে ফেলেন! এরপর বৈবাহিক জীবনে স্ত্রীর দীনহীনতার কারণে সীমাহীন বিপদের সম্মুখীন হন। স্ত্রীর আচার-আচরণ ও চলাফেরা রীতিমতো স্বামীর গাইরত নিয়ে টান দেয়!
কিন্তু কেন; এ রকম লোক তো বাজারে গাভী কিনতে গেলে দেখেশুনে সেই গাভীটিই কেনে, যেটি উন্নত জাতের; বেশি বেশি দুধ দেয় এবং হৃষ্টপুষ্ট বাচ্চা জন্ম দেয়। বিয়ে করার সময় তার অনাগত সন্তানের জন্য কেমন মা দরকার, সেটা কি সে বোঝে না?!
ফল খাওয়ার আশায় চারা কিনতে গেলেও তো মানুষ উন্নত প্রজাতির, দ্রুত বর্ধনশীল, বাম্পার ফলনের চারাগাছ দেখেশুনে কিনে নিয়ে আসে। আবার সেটা রোপণ করার সময়েও দেখেশুনে উপযোগী জায়গায় রোপণ করে। কিন্তু নিজের জীবনসঙ্গিনী নির্বাচন করতে এবং সন্তানদের একজন মা উপহার দিতে দেখেশুনে ভালো কোনো মেয়েকে বিয়ে করবে না?! অথচ, কথায় আছে 'ফলেই গাছের পরিচয়'।
বিবাহকারী ব্যক্তির উদাহরণ তো চারা রোপনকারী ব্যক্তির মতো। যেমন চারা রোপণ করা হয়, ফল আসে তেমন। এমতাবস্থায় দ্বীনহীন মেয়ে বিয়ে করে সুন্দর, সুখময়, উত্তম ও দ্বীনদারি দাম্পত্য জীবনের আশা করা যায় কীভাবে! কোনো দ্বীনদার মানুষের গাইরত এটা সায় দেয় কীভাবে যে, সে তার জীবনসঙ্গিনী বানাবে কোনো দ্বীনহীন মেয়েকে!
উসমান ইবনে আবুল আস সাকাফি তার সন্তানদের নসিয়ত করে বলেন, 'আমি তোমাদেরকে মা উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রেও সম্মানিত করেছি। তোমাদের ধনসম্পদ কামানোর পেশাতেও ভালো পন্থা অবলম্বন করেছি। আমি সাকিফ গোত্রের কোনো লোকের গাছের ছায়া গ্রহণ করে তার মান-ইজ্জত নিয়ে টানাটানি করিনি। বিবাহেচ্ছুক ব্যক্তির উদাহরণ হলো চারা রোপনকারীর ন্যায়। সুতরাং এমন ব্যক্তিকে দেখতে হবে- সে কোথায় তার চারাটি রোপণ করছে। নষ্ট মূল যতই সময় যাক; খুব কমই ফল দেয়।'
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. যখন আবুল আস সাকাফির এই কথাগুলো শোনেন, তখন এতটাই পছন্দ করেন যে, তিনি তাঁর গোলামকে বলেন, 'হে গোলাম! আমার জন্য এই কথাগুলো লিখে দাও.”
টিকাঃ
১ সহিহ বুখারি: ৫০৯০, সহিহ মুসলিম: ১৪৬৬, সুনানে নাসায়ি: ৩২৩০, সুনানে আবু দাউদ: ২০৪৭, সুয়ানে ইবনে মাজাহ: ১৮৫৮, মুসনাদে আহমদ: ৯২৩৭, সুনানে দারেমি: ২১৭০।
২ সহিহ মুসলিম, হাদিস ৩৭১৬।
১ সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৮৫৯; মুজাম তাবরানি, হাদিস : ১৪৬৪৭; সুনানে বাইহাকি, হাদিস : ১৩৮৫১। হাদিসটির সনদ যয়িফ।
২ ইতহাফুস-সাদাতিল মুত্তাকিন : ৫/৩৪০, ইমাম মুরতাজা যাবিদি。
> ফাযাইলুল গাইরাহ আলান-নিসা, পৃষ্ঠা: ১১৬, হাম্মাদাহ মুহাম্মাদ মুহাম্মাদ ইসমাইল।
📄 গাইরতহীন পুরুষ চতুষ্পদ জন্তুর চেয়েও নিকৃষ্ট
মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত। মানে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। মানুষ এতটাই সম্মানীয় যে, অন্য কোনো জীবের সাথে মানুষের তুলনা করা মানায় না। এটা করতে সুস্থ বিবেক ও রুচি সায় দেয় না। তবুও কথা থেকেই যায়।
ইবনুল মুকাফফা তাঁর 'কালিলা ওয়া দিমনাহ' কিতাবে উল্লেখ করেছেন—একজন দার্শনিক বলেছেন, 'সৃষ্টির জীবদের স্বভাব বৈচিত্র্যপূর্ণ। আল্লাহ তা'আলা পৃথিবীতে যতসব প্রাণী সৃষ্টি করেছেন, চারপেয়ে হোক, বা দুপেয়ে, কিংবা দুই ডানাওয়ালা; মানুষের চেয়ে উত্তম ও সম্মানীয় কাউকে সৃষ্টি করেননি। কিন্তু মানুষের মধ্যে ভালো ও মন্দ উভয় শ্রেণি আছে। অথচ, জীবজন্তু ও পাখির মধ্যে এমনও প্রাণী আছে, যে মানুষের চেয়েও বেশি কৃতজ্ঞ ও সম্মান রক্ষাকারী।'
মানে হলো, কোনো কোনো প্রাণী নির্দিষ্ট কোনো গুণের ক্ষেত্রে কিছু মানুষের চেয়েও উত্তম হয়ে থাকে। এটা কোনো আষাঢ়ে গল্প নয়; খোদ আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনেও বলেছেন, 'কাফেরররা চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায়; বরং তারচেয়েও অধম!'
সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হয়েও যেসব মানুষ বিশেষ ক্ষেত্রে কিছু জন্তু-জানোয়ার থেকেও অধম, সেই বিশেষ গুণাবলিসমূহেরে মধ্যে অন্যতম হলো—'গাইরত' তথা আত্মমর্যাদাবোধ। কিছু প্রাণীর ঠিকই গাইরত আছে; কিন্তু কিছু মানুষের মধ্যে তা নেই!
বানরদের মধ্যেও স্বামী-স্ত্রী আছে। কোনো বানরীর সাথে অপর কোনো বানর মিলিত হলে স্বামী বানরের প্রচণ্ড গাইরত হয়। হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি রহ. তাঁর জগদ্বিখ্যাত গ্রন্থ ফাতহুল বারিতে এ ব্যাপারে একটি আশ্চর্যজনক ঘটনা উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন—
আমর ইবনে মাইমুন বলেন, 'জাহিলি যুগের কথা। তখন আমি ইয়েমেনে ছিলাম। একবার আমার পরিবারের ছাগলের পাল চরাচ্ছিলাম। আচানক আমি দেখতে পেলাম, একটা বড় বানর আরেকটি বানরীকে নিয়ে এলো। এরপর বড় বানরটা বানরীর হাতকে বালিশ বানিয়ে শুয়ে পড়ল। ওদিকে আরেকটা ছোটো বানর কোত্থেকে এসে বানরীকে চিমটি কেটে চলে গেল। তো বানরী আস্তে করে তার হাতটা বড় বানরের গালের নিচ থেকে বের করে ওই ছোটো বানরের পিছু নিল। কিছুদূর গিয়েই বানরী ছোটো বানরের সাথে সঙ্গমে মেতে উঠল। এরপর বানরী আবারও বড় বানরের কাছে চলে এলো।
বড় বানর তখন ঘুমিয়ে ছিল। কিছুই দেখতে পায়নি। বানরী এসে অত্যন্ত চুপিসারে আস্তে করে আবারও তার হাতটা বড় বানরের গালের নিচে রাখতেই বড় বানর ঘুম থেকে জেগে উঠল। কিছু একটা যেন আঁচ করতে পারল সে। বানরীর গায়ের গন্ধ শুঁকলো। এরপরেই সে চিৎকার আর চ্যাঁচামেচি জুড়ে দিলো। বড় বানরের চিৎকারে আশেপাশে থেকে বহু বানর এসে ভিড় করল। অন্যান্য বানরকে আসতে দেখে বড় বানরটি চিৎকার করতে থাকল আর হাত দিয়ে বানরীর দিকে কী যেন ইশারা করতে লাগল।
ব্যাস, বানরগুলো ডানে-বাঁয়ে ছড়িয়ে পড়ল। একটু পরেই তারা ওই ছোটো বানরটাকে নিয়ে এলো। সবাই মিলে একটা গর্ত খুঁড়ল। এরপর ছোটো বানরটাকে গর্তে ফেলে পাথর দিয়ে আঘাত করতে থাকল। এক সময় ছোটো বানরটা মারাই গেল। আমি জীবনের প্রথম বনি আদম ছাড়া অন্য কোনো জীবের মধ্যে রজমের শাস্তি দেখতে পেলাম.”
একটা বানর, যে কিনা অবলা প্রাণী; স্বীয় সঙ্গিনী বানরীর সাথে আরেক বানরের মিলন সহ্য করতে পারেনি। গাইরতে লেগেছে তার। চিৎকার করে স্বজাতি বানরদের জড়ো করে নালিশ দায়ের করল। আর অন্যান্য বানরেরাও এই গর্হিত কাজ মেনে নিতে পারেনি; রজম করে অপরাধী বানরটাকে মেরে ফেলল!
অথচ এই গাঠরতটুকু অনেক বনি আদমের মধ্যেও নেই। সমাজের অশিক্ষিত ও মূর্খ মানুষদের কথা আপাতত রাখেন; বহু তথাকথিত শিক্ষিত, সভ্য, এলিট শ্রেণির পুরুষ এমন আছে, যার স্ত্রী প্রকাশ্যে পরপুরুষের সাথে ফিজিক্যালি পরকীয়ায় লিপ্ত, কিন্তু গাল্পতহীন স্বামী তা দেখেও না দেখার ভান করে। কেউ কেউ তো বাসায় এসে হাতেনাতে ধরে ও মুখে কলুপ এঁটে স্ত্রীকে নিয়ে দিব্যি সংসার করে যাচ্ছে।
জীবজন্তুর এই গাইরত শুধুমাত্র বানরের মধ্যেই নয়; আরও প্রাণীর মধ্যে পাওয়া যায়। আরবি সাহিত্য ও অলংকারশাস্ত্রের প্রবাদপুরুষ ইমাম জাহিয় মোরগের গুণাবলি উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন, 'মোরগ খুব গাইরতবান হয়ে থাকে। তার সঙ্গিনী মুরগীকে অন্য মোরগ থেকে সব সময় বাঁচিয়ে রাখে।'১
সাত/আট মাসের গর্ভবতী উটনিকে আরবিতে 'শাওল' বলে। এই সময়ে উটনীর ওলানে দুধ পরিপূর্ণ হয়ে যায় এবং ফুলে স্ফীত হয়ে ওঠে। তো গোয়ালঘরে দড়িতে বাঁধা অবস্থায়ও সঙ্গী উট তার সঙ্গিনী এই গর্ভবতী উটনিকে আড়াল করে রাখার চেষ্টা করে! গাইরতের উদাহরণ হিসেবে আরবরা এটাকে প্রবাদবাক্য হিসেবে ব্যবহার করে।২
যাহোক, এটা হলো কিছু জীবজন্তুর গাইরতের সামান্য নমুনামাত্র। প্রাণীজগতের খোঁজখবর নিলে এ রকম আরও বহু নজির পাওয়া যাবে। বোঝার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট বলে মনে করি।
তো দেখা যায়, জ্ঞান, বিবেক ও বুদ্ধিহীন প্রাণী হয়েও তার মধ্যে গাইরত থাকে; সঙ্গিনীর সাথে অন্য কারও মিশ্রণ মেনে নিতে পারে না, তাহলে যেসব জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন পুরুষ আধুনিকতা, স্বাধীনতা ও অধিকারের নামে অবলীলায় নিজের স্ত্রীকে পরপুরুষের সাথে মিশতে দেয়, তারা কোন লেভেলের?
তথাকথিত এইসব শিক্ষিত এলিটদের থেকে তো প্রাচীনকালের গ্রাম্য বেদুইনরা আরও বেশি আত্মমর্যাদাশীল ছিল। এক বেদুইন তার দুশ্চরিত্রা বউয়ের ব্যাপারে গাইরতের বহিঃপ্রকাশ এভাবেই কবিতার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছে—
سأترك حبها من غير بغض ... ولكن كثرة الشركاء فيه إذا وقع الذباب على طعام ... رفعت يدي ونفسي تشتهيه وتجتنب الأسود ورود ماء ... إذا كان الكلاب ولغن فيه
(কাব্যানুবাদ)
বউয়ের ভালোবাসা ছাড়ব আমি, নেই কোনো বিদ্বেষ, এখন তার মাঝে অংশীদারের যে নেই কোনো শেষ! খাবারে যখন মাছি বসে, আমি হাত দিই না তো তায়, যদিও বা আমার মন খাবারটা খাইতে খুব করে চায়! সিংহেরা সেই পানির ঘাটে নামে না পান করতে জল, যেথায় জিহ্বার লালা ফেলে মুখ লাগায় কুকুরের দল।১
কবিতাটির ব্যাখ্যার আসলে কোনো দরকার নেই। কবিতাটা খুবই স্পষ্ট। স্ত্রী যেসব পুরুষের সাথে পরকীয়ায় জড়িত, বেদুইন লোকটা সেইসব পুরুষকে কুকুর হিসেবে চিত্রিত করেছে। নিজের স্ত্রীকে কুকুরের জিহ্বার লালা মিশ্রিত উচ্ছিষ্ট বলতে চেয়েছে। আর নিজেকে একজন সিংহ বলে প্রমাণ করতে চেয়েছে। আমাদের এই সমাজে এমন কুকুরের অভাব না থাকলেও; এমন সিংহের কিন্তু অভাব রয়েছে ঠিকই!
প্রিয় পাঠক/পাঠিকা! আমরা কিন্তু 'গাইরত' নিয়ে আমাদের যাত্রাপথের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে উপনীত হয়েছি। এবারে বিদায়ের পালা। ঘড়ির কাটা রাত ১ টা ছুঁই ছুঁই। আমাকে ক্ষ্যান্ত করতে হবে। তারপর খেতে হবে। ক্ষুধায় পেটে চু চু করছে। এরপর শুতে হবে। বাদ ফজর আবার গাড়িতে চেপে যেতে হবে দূর বহুদূর। ব্যস্ততম কর্মজীবনের ফাঁকেই আমাদেরকে লিখতে হয়। তাই শেষ করার জন্য তড়িঘড়ি করছি।
গাইরতহীন হে ভাই! শেষের এই পরিচ্ছেদটা কেন বইয়ের একদম শেষে উল্লেখ করলাম—জানেন? শুধুমাত্র এজন্যে যে, আপনি যাতে চিন্তা করতে পারেন—সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হয়েও কোথায় আপনি আর কোথায় আল্লাহর সৃষ্টি কিছু অবলা প্রাণী! গাইরত বিসর্জন দিয়ে আপনি নিজেকে কোন স্তরে নামিয়েছেন—তা একটু ভাববেন শুধু। যদি একটু চিন্তা করতে পারেন, তবে এতেই আমার কষ্ট সফল হবে ইনশাআল্লাহ। ভালো থাকবেন। আমার জন্য দুআ করবেন। মাআস সালাম।
টিকাঃ
¹ সূরা ফুরকান: ৪৪|
> ফাতহুল বারি; ৭/১৯৬, ইবনে হাজার আসকালানি。
১ ফাযাইলুল গাইরাহ আলান-নিসা, পৃষ্ঠা: ৭৬, হাম্মাদাহ মুহাম্মাদ মুহাম্মাদ ইসমাইল।
২ হায়াতুল হাইওয়ান: ২/২৮৭, ইমাম কামালুদ্দিন দামিরি。
১ ফাযাইলুল গাইরাহ আলান-নিসা, পৃষ্ঠা: ৭৯, হাম্মাদাহ মুহাম্মাদ মুহাম্মাদ ইসমাইল।