📄 ইসলামে গাইরতের এত গুরুত্ব কেন?
ইমাম আবু হামিদ গাজালি রহ. বলেন, 'কোনো কোনো আলেমের মতে, পুরুষ যদি দুর্বল আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন হয়, এর অনিবার্য ফলাফল হলো-সে তার স্ত্রী, কন্যা ও মাহরাম নারীদের সেফটির ক্ষেত্রে আত্মসম্মানের অভাব অনুভব করে, ইতর লোকদের থেকে অপমান সহ্য করে, নিচু মন-মানসিকতার অধিকারী হয়ে থাকে, যা কিনা মাহরাম নারীদের ক্ষেত্রে তার গাইরতকে একেবারে লোপ পাইয়ে দেয়। একজন পুরুষের মধ্যে যখন এই ব্যাপারটা দেখা দেয়, তখন বংশ পরিচয় নষ্ট হয়ে যায়। মানে নারী নষ্টা হয়ে গেলে বংশ পরিচয় আর ঠিক থাকে না। এজন্যই তো বলা হয়েছে, যে জাতির পুরুষদের গাইরত দুর্বল হয়ে যায়, সে জাতির নারীদের সতীত্ব দুর্বল হয়ে পড়ে। কেননা, পুরুষদের মধ্যে গাইরত সৃষ্টিই করা হয়েছে বংশপরিচয় রক্ষার জন্যে। সে হিসেবে বলতে হয়, যে জাতির পুরুষ গাইরত হারিয়েছে, সে জাতির নারী সতীত্ব হারিয়েছে।'১
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইজুদ্দিন ইবনে আবদুস সালাম রহ. বলেন, 'মাহরাম নারীদের ক্ষেত্রে গাইরত রাখার উদ্দেশ্য হলো, তাদেরকে এমন অশ্লীলতা থেকে বাঁচানো, যা দুনিয়ার লাঞ্ছনা ও আখেরাতের শাস্তি অবধারিত করে। গাইরত দুই প্রকার। ১. গোপন গাইরত। ২. প্রকাশ্য গাইরত। আর প্রকাশ্য গাইরত হলো যে, মাহরাম নারীদেরকে সাবধান করা এবং বেপর্দা চলাফেরা ইত্যাদি অশ্লীলতা থেকে বাঁচানো।'২
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, 'আল্লাহ তা'আলা আদম সন্তানের অন্তরে যে গাইরত সৃষ্টি করেছেন—তা তো সকলেরই জানা। আর এজন্যই তো একজন পুরুষ নিজে কোনো নারীর সাথে ব্যভিচার করাকে যতটা সহজভাবে মেনে নেয়, তার নিজের স্ত্রীর সাথে পরপুরুষ ব্যভিচার করলে সেটা ততটা সহজে মেনে নিতে পারে না!'৩
ইমাম ইবনুল কায়্যিম রহ. বলেন, 'দ্বীনের মূল হলো গাইরত। যার গাইরত নেই, তার দ্বীনও নেই। গাইরত অন্তরকে সুরক্ষিত রাখে, ফলে দেহের অঙ্গগুলোও সুরক্ষিত থাকে। আর তা অশ্লীলতা ও নোংরামি দূরে রাখে। গাইরতহীনতা অন্তর মেরে ফেলে। ফলে দেহের অঙ্গগুলোও মৃত্যুবরণ করে। এমতাবস্থায় অঙ্গগুলোর মধ্যে আর কোনো শক্তি বাকি থাকে না। মানুষের অন্তরে গাইরত হলো দেহে রোগ প্রতিরোধকারী শক্তির মতো; যা কিনা রোগ প্রতিরোধ করে এবং রোগের সাথে যুদ্ধ করে। এই রোগ প্রতিরোধকারী শক্তি যখন থাকে না, তখন রোগ সুযোগ পেয়ে যায় এবং দেহে জায়গা করে নেয়। আর তখনই ধ্বংস অনিবার্য হয়ে পড়ে।'১
ইমাম রাগিব ইস্পাহানি রহ. বলেছেন, 'আল্লাহ তা'আলা মানুষের মধ্যে গাইরতের শক্তিটা রেখেছেন শুধুমাত্র পুরুষের বীর্যের যথাযথ সংরক্ষণ ও বংশ পরিচয়কে হেফাজত করার কারণ হিসেবে। এজন্যই তো বলা হয়, যে জাতির পুরুষের মধ্যে গাইরত থাকে, সে জাতির নারীরা সতীসাধ্বী হয়।'২
যাহোক, গাইরত নিয়ে বইয়ে তো লম্বা-চওড়া বহু আলাপই তো করা হয়েছে; কিন্তু একটা আলাপ বাকি রয়ে গিয়েছিল, সেটা হলো-ইসলামে গাইরতের এত গুরুত্ব কী কারণে? পুরুষকে কেন তার নারীদের ব্যাপারে এত গাইরত তথা আত্মমর্যাদাবোধ রাখতেই হয়?
এই প্রশ্নের জবাব তো ইতোমধ্যেই উম্মাহর বিদগ্ধ আলেমদের বয়ানে ফুটে উঠেছে। তাঁদের বয়ান থেকে যা ফুটে উঠেছে তার খোলাসা হলো, পুরুষ যদি তার নারীদের ব্যাপারে গাইরত না রাখে, তাহলে নারীরা নষ্টা হয়ে যেতে পারে। আর নারী নষ্টা হলে পুরো জাতিই ধ্বংস! এমতাবস্থায় বংশ পরিচয়টাও ঠিক থাকবে না। ব্যাপারটার বাস্তবতা বুঝতে হলে তাকাতে হবে পশ্চিমা দেশগুলোর দিকে।
পশ্চিমা দেশে পুরুষদের গাইরত নেই। তাই তাদের নারীরা 'ফ্রি মিক্সিং'র নামে পরপুরুষের বাহুলগ্না হয়ে থাকে। এতে করে তাদের পারিবারিক পবিত্র জীবনবাবস্থার পতন ঘটেছে। সন্তানের বংশ পরিচয় হারিয়ে গেছে। সেখানে সন্তানদের পরিচয় লেখা হয় মায়েদের নামে। কারণ, সন্তানের আসল বাবা কে-সেটা মাও জানে না!
একটা গল্প মনে পড়ল। আহমদ তৌফিক পাশা (১৮৪৫ – ১৯৩৬) ছিলেন উসমানি খিলাফতের শেষ উজিরে আজম। আহমেদ তৌফিক ওকদাই নামে তিনি বেশি পরিচিত। সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ ছাড়াও একাধিক উসমানি খলিফার সময়ে তিনি উজিরে আজমের পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। উপস্থিত বুদ্ধির জন্য তিনি বেশ খ্যাত ছিলেন। কোথায় কাকে কীভাবে লাজওয়াব করতে হয়—সেটা তাঁর খুব ভালো জানা ছিল।
উজির হওয়ার আগে আহমদ তৌফিক পাশা খিলাফতের একজন কূটনীতিক ছিলেন। খিলাফতের স্বার্থে বহু দেশেই তাঁকে যেতে হতো। একবার ইউরোপের কোনো এক দেশে কূটনীতিক কাজে গেলেন তিনি। সেখানে একজন ইউরোপীয় নেতা তাঁকে উপহাস করে বলল,
: আপনাদের দেশের নারীরা কেন বোরকা পরে ঘরে বসে থাকে; বাইরে পুরুষদের সাথে সমানতালে চলে না কেন?!
: কারণ, তারা একমাত্র তাদের স্বামী ছাড়া আর কারও দ্বারা গর্ভবতী হতে চায় না!
জবাবটা ছিল ‘যেমন কুকুর তেমন মুগুর’ স্টাইলের। জবাবটা শুনে ইউরোপীয় নেতা লাজওয়াব হতে বাধ্য হয়েছিলেন।১
টিকাঃ
১ ইহয়াউ উলুমিদ্দিন: ৩/১৬৮, ইমাম গাজালি।
২ শাজারাতুল মাআরিফ ওয়াল আহওয়াল: ২১১।
৩ মাজমুউল ফাতাওয়া : ১৫/৩২০।
১ আল-জাওয়াবুল কাফি: ৬৮, ইমাম ইবনুল কাইয়িম।
২ আয-যারিআহ ইলা মাকারিমিশ শারিআহু: ৩৪৭, ইমাম রাগিব ইস্পাহানি৷৷
১ আমার লিখিত ‘উসমানি খিলাফতের স্বর্ণকণিকা’, পৃষ্ঠা: ১৪৫।
📄 পরিবেশও মানুষকে গাইরতহীন বানায়
মানুষ সামাজিক জীব। তাই সমাজ ও পরিবেশ দ্বারা মানুষ প্রভাবিত হয়—কথাটা চিরন্তন সত্য। দেখা গেছে, একজন পুরুষ এক সময় খুবই গাইরতমন্দ ছিল, কিন্তু এখন সমাজ ও পরিবেশে প্রভাবিত হয়ে সে গাইরতহীন হয়ে গেছে! এই নৈতিক অধঃপতনটা সবচেয়ে বেশি লক্ষণীয় বিলেত প্রবাসী মুসলমানদের ক্ষেত্রে। তারা দেশে যথেষ্ট গাইরত সম্পন্ন থাকলেও পশ্চিমা দেশে যাওয়ার পর বেহায়া ও গাইরতহীন হয়ে যায়। অবশ্য সবাই নয়। অজপাড়া গাঁ থেকে শহরে এলেই বহু মানুষের দ্বীনদারি ও গাইরত লোপ পেয়ে যায়। গ্রামে থাকতে যার স্ত্রী, কন্যা ও বোনেরা শালীন পোশাক ছাড়া ঘর হতে বেরই হতো না; শহরে আসার পর তারা টাইটফিট জামা ছাড়া বাসা থেকে বেরই হয় না! আর তাদের অভিভাবক পুরুষ; যে কিনা আগে যথেষ্ট রক্ষণশীল ছিল, সেও এখন তা ‘সোসাইটি ম্যানেজ’ এর নামে মেনে নেয়!
এ ব্যাপারে লম্বা আলাপের আসলে দরকার নেই। বাস্তবতা কিন্তু সকলের চোখের সামনে। পরিবেশ ও পরিস্থিতি দ্বারা মানুষ যে কতটা প্রভাবিত হয়, সেটা বোঝাতে গিয়ে একজন হুজুরের গল্প বলি। গল্পটা ফেসবুকে পড়েছিলাম। গাইরত নিয়ে গ্রন্থনায় কাজে লাগবে—এই চিন্তা থেকে সেটা সংরক্ষণ করে রেখেছিলাম। গল্পটা হুবহু নকল করছি।
“একজন আলেমের কথা বলি। মফস্বলে থাকেন। সন্তানের চিকিৎসার জন্য ঢাকায় এলেন। সপ্তাহ খানেক থাকলেন প্রাইভেট ভার্সিটি এলাকায়। যতবারই বের হলেন; কিছু না কিছু অশ্লীল দৃশ্য চোখে পড়েছে। ছেলে-মেয়েরা কীভাবে তাদের জাস্ট ফ্রেন্ডদের সাথে গলাগলি করে—এসব সেখানে নিত্যই দেখা যায়।
ছেলে সুস্থ হওয়ার পর চলে এলেন গ্রামে। বাস থেকে নেমে গ্রামের সাব রাস্তায় স্ত্রী-সন্তানকে তুলে দিলেন এমন সিএনজিতে, যেখানে রয়েছে আরও চারজন পুরুষ। তিনি একবারও ভাবলেন না—তার স্ত্রী কীভাবে এই মানুষগুলোর সাথে ঘেঁষাঘেঁষি করে বসবে। স্ত্রী বেচারা নিজেই হতবাক। বুঝে উঠার আগেই গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে।
দিনভর কিছুই খেতে পারেননি। রাতে যখন মৌলভি বাসায় ফিরলেন; নিজেদের মধ্যে ঘটে গেল তুমুলকাণ্ড!
দশ বছরের সংসার জীবনে এটাই একমাত্র ঝামেলা, যা মনে হলে আজও নাকি বেচারা শিউরে ওঠেন। তিনি আমাকে পরে জানালেন যে, ভার্সিটির ছেলে-মেয়েদের তাৎক্ষণিক এসব অনৈতিক দৃশ্য (যদিও তিনি নিজের চোখ হেফাজত করার চেষ্টা করছেন) কিছু সময়ের জন্য তার ঈমানের গাইরত ধ্বংস করে দিয়েছে। ফলে তিনি স্ত্রীকে অন্য পুরুষের সাথে গাড়িতে তুলে দিচ্ছেন; অথচ বিষয়টা তার কাছে তখন স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল!”
📄 উম্মাহর গাইরতহীনতার মূল কারণগুলো কী?
পুরুষ মানুষ বলতেই গাইরতমন্দ হওয়ার কথা। গাইরত যে পুরুষের ফিতরাত তথা জন্মগত স্বভাব-সে কথা তো বইয়ের শুরুতেই বলে এসেছি। আর একজন মুমিন তো অবশ্যই গাইরতমন্দ হবে। গাইরত ব্যক্তিগত প্রেস্টিজের ব্যাপারই নয় শুধু; দ্বীন ও ঈমানের অংশ। এরপরেও বহু পুরুষের মধ্যে গাইরতের ঘাটতি যে থাকে, সেটার কারণ কী?
হিসেব করতে গেলে কারণ কিন্তু অনেক। সবগুলো তো উল্লেখ, করা সম্ভব নয়। তাই মৌলিক বড় কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেই ক্ষ্যান্ত করব ইনশাআল্লাহ।
এক. ঈমানি দুর্বলতা: মানুষের ঈমানে দুর্বলতা থাকলেই তখন সে শরিয়তের অন্যান্য আহকাম পালনে ঢিলেমির মতো গাইরত প্রদর্শনেও ঢিলেমি করে। আর আগেই উল্লেখ করেছি যে, হাদিসে বলা হয়েছে-'আল্লাহ গাইরত রাখেন, মুমিনও গাইরত রাখে।' সুতরাং যার মধ্যে গাইরত নেই, বুঝতে হবে তার ঈমানে দুর্বলতা আছে।
দুই. গুনাহের আধিক্যতা: ইমাম ইবনু কাইয়িমিল জাওযিয়্যাহ রহ. বলেন, 'বেশি বেশি গুনাহ মানুষের গাইরতের আগুনকে নিভিয়ে ফেলে। গাইরতের আগুন মানবদেহের জন্য খুবই জরুরি। এই আগুন দেহ থেকে সব ধরনের ময়লা ও নিন্দনীয় গুণাবলি জ্বালিয়ে দেয়।১
তিন. মূর্খতা: গাইরতের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা এবং এ সম্পর্কে নিজের দায়িত্বশীলতা সম্পর্কে মূর্খতার কারণেই মানুষ গাইরতহীন হয়। দাইয়ুস হয়। অথচ, একজন পুরুষ নিজের পরিবার-পরিজনের দায়িত্বশীল। কিয়ামতের দিন তাকে এ ব্যাপারে জবাবদিহি করা হবে।
চার. বিজাতীয় কালচার অনুসরণ: বিজাতীয় কাফেরদের নোংরা কালচার অনুসরণ করতে গিয়েও মানুষ গাইরতহীন হয়ে থাকে। অথচ, ইসলাম বিজাতীয় কাফেরদের অসভ্যতা অনুসরণ না করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। হাদিসে বলা হয়েছে, 'যে ব্যক্তি কোনো জাতির সাদৃশ্য গ্রহণ করবে, কিয়ামতের দিন সে তারই অনুগামী হবে।'১
পাঁচ. খারাপ মিডিয়ার প্রভাব: রেডিও, টেলিভিশন, পত্র-পত্রিকা, ইন্টারনেট ইত্যাদির কুপ্রভাব রয়েছে মানুষদের মধ্যে। এইসব মিডিয়ার অশ্লীলতাই ঈমানদারদের দামি সম্পদ গাইরতকে হরণ করেছে।
ছয়. অশ্লীলতার ব্যাপকতা: সমাজে নীতি ও নৈতিকতা বিবর্জিত কর্মকাণ্ড, অশ্লীলতা ও বেহায়াপনার ছড়াছড়ির কারণে গাইরত ধংস হয়ে গেছে। অথচ, হাদিসে বলা হয়েছে, ভালো কাজের আদেশ দিতে আর মন্দকাজ থেকে বারণ করতে। এটা করা হলে সমাজ নষ্ট হতো না। গাইরতও লোপ পেত না।
টিকাঃ
১ আল-জাওয়াবুল কাফি: ৬৯, ইমাম ইবনুল কাইয়িম।
১ সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪০৩১। হাদিসটি সহিহ।
📄 দ্বীনদার মেয়ে বিয়ে করা গাইরতের দাবি
একজন পুরুষের কাছে গাইরতের দাবি হলো, বিয়ে করার সময় যে কাউকে বিয়ে করে ঘরের বউ করে আনবে না; বরং বউ করে আনবে একজন দ্বীনদার মেয়েকে। বউ যদি দ্বীনদার হয়, তাহলে স্বামীর আর অত গাইরত রাখতে হবে না। বউ যখন দ্বীনহীন হবে, তখনই তো স্বামীকে গাইরত দেখাতে হবে।
তাছাড়া নিজের অনাগত সন্তানদের ধর্মীয়, নৈতিক ও উত্তম আখলাকের জীবন কল্পনা করতে হলেও তাদেরকে একজন দ্বীনদার উত্তম মা উপহার দেওয়ার দরকার আছে। দ্বীনহীন ও খারাপ মায়ের ঘরে তো ভালো সন্তান আশা করা যায় না। দ্বীন দেখে যে বিয়ে করতে হবে, এ ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ বলেছেন:
عَن أَبي هُرَيْرَةَ رضي الله عنه، عَنِ النَّبِيِّ ﷺ ، قَالَ: تُنْكَحُ المَرْأَةُ لأَرْبَعِ : لِمَالِهَا، وَلِحَسَبِهَا، وَلِجَمَالِهَا، وَلِدِينِهَا، فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاكَ.
আবু হুরাইরাহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবি বলেছেন, 'চারটি গুণ দেখে নারীকে বিবাহ করা হয়; তার ধন-সম্পদ, তার বংশ-মর্যাদা, তার রূপ-সৌন্দর্য এবং তার দ্বীন-ধর্ম দেখে। তুমি দ্বীনদার পাত্রী লাভ করে সফলকাম হও।'১
আরেক হাদিসে নবিজি বলেন:
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ قَالَ الدُّنْيَا مَتَاعٌ وَخَيْرُ مَتَاعِ الدُّنْيَا الْمَرْأَةُ الصَّالِحَةُ
আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. থেকে বর্ণিত, নবি বলেন, 'দুনিয়া পুরোটাই উপভোগ্য বস্তু। আর দুনিয়ার উপভোগ্য বস্তুসমূহের মধ্যে সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ বস্তু হলো পুণ্যময়ী বধূ।'২
চারটি গুণের মধ্যে দ্বীনদার হওয়ার গুণটি কেবল যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ তা-ই নয়, এ গুণ যার নেই তার মধ্যে অন্যান্য গুণ যতই থাক না কেন; ইসলামের দৃষ্টিতে বিয়ের জন্য সে অগ্রাধিকারযোগ্য মেয়ে নয়। রাসুলুল্লাহ -এর হাদিস অনুযায়ী তো দ্বীনদারির গুণবঞ্চিতা নারী বিয়ে করাই উচিত নয়। হাদিসে পাওয়া যায়-
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ : لَا تَزَوَّجُوا النِّسَاءَ لِحُسْنِهِنَّ، فَعَسَى حُسْنُهُنَّ أَنْ يُرْدِيَهُنَّ، وَلَا تَزَوَّجُوهُنَّ لِأَمْوَالِهِنَّ، فَعَسَى أَمْوَالُهُنَّ أَنْ تُطْغِيَهُنَّ، وَلَكِنْ تَزَوَّجُوهُنَّ عَلَى الدِّينِ، وَلَأَمَةٌ خَرْمَاءُ سَوْدَاءُ ذَاتُ دِينٍ أَفْضَلُ
আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. থেকে বর্ণিত, নবিজি ﷺ বলেছেন, ‘তোমরা স্ত্রীদের কেবল তাদের রূপ-সৌন্দর্য দেখেই বিয়ে করো না। কেননা এরূপ সৌন্দর্যই অনেক সময় তাদের ধ্বংসের কারণ হতে পারে। তাদের ধন-সম্পদের লোভে পড়েও বিয়ে করবে না। কেননা, এই ধন-সম্পদ তাদের বিদ্রোহী ও অনমনীয় বানাতে পারে; বরং তাদের দ্বীনদারির গুণ দেখেই তবে বিয়ে করবে। বস্তুত বিয়ের জন্য একজন দ্বীনদার স্বল্পাগম দাসীও কিন্তু অনেক ভালো।’১
সে হিসেবে আলেমগণ বলেন, নবিজি ﷺ-এর এ নির্দেশের মূলকথা হলো— দ্বীনদারীরা গুণসম্পন্না মেয়ে পাওয়া গেলেই যেন তাকে স্ত্রীরূপে বরণ করা হয়। দ্বীনদার নারী বাদ দিয়ে অপর কোনো গুণসম্পন্না মেয়েকে বিয়ে করতে আগ্রহী হওয়া পুরুষের জন্য উচিত নয়।
ইমাম আবু হামিদ গাজালি রহ. বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ ﷺ দ্বীনদার নারী বিয়ে করার ব্যাপারে এত প্রলুব্ধ করার কারণ হলো, দ্বীনদার স্ত্রী তার স্বামীকে দ্বীনের ওপর চলতে সাহায্য করবে। কিন্তু স্ত্রী যদি দ্বীনদার না হয়, তাহলে সে দ্বীন রেখে অন্য কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকবে এবং স্বামীকে উদ্বিগ্ন করবে।’২
কিন্তু আফসোসজনক হলেও সত্য যে, এই জায়গায় এসে শুধু দ্বীনহীন-ই না; বহু দ্বীনদার পুরুষ পর্যন্ত হোঁচট খান। রূপ-লাবণ্য কিংবা দুনিয়াবি কোনো স্বার্থ প্রাধান্য দিতে গিয়ে তারা দ্বীনকে গৌণ করে ফেলেন! এরপর বৈবাহিক জীবনে স্ত্রীর দীনহীনতার কারণে সীমাহীন বিপদের সম্মুখীন হন। স্ত্রীর আচার-আচরণ ও চলাফেরা রীতিমতো স্বামীর গাইরত নিয়ে টান দেয়!
কিন্তু কেন; এ রকম লোক তো বাজারে গাভী কিনতে গেলে দেখেশুনে সেই গাভীটিই কেনে, যেটি উন্নত জাতের; বেশি বেশি দুধ দেয় এবং হৃষ্টপুষ্ট বাচ্চা জন্ম দেয়। বিয়ে করার সময় তার অনাগত সন্তানের জন্য কেমন মা দরকার, সেটা কি সে বোঝে না?!
ফল খাওয়ার আশায় চারা কিনতে গেলেও তো মানুষ উন্নত প্রজাতির, দ্রুত বর্ধনশীল, বাম্পার ফলনের চারাগাছ দেখেশুনে কিনে নিয়ে আসে। আবার সেটা রোপণ করার সময়েও দেখেশুনে উপযোগী জায়গায় রোপণ করে। কিন্তু নিজের জীবনসঙ্গিনী নির্বাচন করতে এবং সন্তানদের একজন মা উপহার দিতে দেখেশুনে ভালো কোনো মেয়েকে বিয়ে করবে না?! অথচ, কথায় আছে 'ফলেই গাছের পরিচয়'।
বিবাহকারী ব্যক্তির উদাহরণ তো চারা রোপনকারী ব্যক্তির মতো। যেমন চারা রোপণ করা হয়, ফল আসে তেমন। এমতাবস্থায় দ্বীনহীন মেয়ে বিয়ে করে সুন্দর, সুখময়, উত্তম ও দ্বীনদারি দাম্পত্য জীবনের আশা করা যায় কীভাবে! কোনো দ্বীনদার মানুষের গাইরত এটা সায় দেয় কীভাবে যে, সে তার জীবনসঙ্গিনী বানাবে কোনো দ্বীনহীন মেয়েকে!
উসমান ইবনে আবুল আস সাকাফি তার সন্তানদের নসিয়ত করে বলেন, 'আমি তোমাদেরকে মা উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রেও সম্মানিত করেছি। তোমাদের ধনসম্পদ কামানোর পেশাতেও ভালো পন্থা অবলম্বন করেছি। আমি সাকিফ গোত্রের কোনো লোকের গাছের ছায়া গ্রহণ করে তার মান-ইজ্জত নিয়ে টানাটানি করিনি। বিবাহেচ্ছুক ব্যক্তির উদাহরণ হলো চারা রোপনকারীর ন্যায়। সুতরাং এমন ব্যক্তিকে দেখতে হবে- সে কোথায় তার চারাটি রোপণ করছে। নষ্ট মূল যতই সময় যাক; খুব কমই ফল দেয়।'
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. যখন আবুল আস সাকাফির এই কথাগুলো শোনেন, তখন এতটাই পছন্দ করেন যে, তিনি তাঁর গোলামকে বলেন, 'হে গোলাম! আমার জন্য এই কথাগুলো লিখে দাও.”
টিকাঃ
১ সহিহ বুখারি: ৫০৯০, সহিহ মুসলিম: ১৪৬৬, সুনানে নাসায়ি: ৩২৩০, সুনানে আবু দাউদ: ২০৪৭, সুয়ানে ইবনে মাজাহ: ১৮৫৮, মুসনাদে আহমদ: ৯২৩৭, সুনানে দারেমি: ২১৭০।
২ সহিহ মুসলিম, হাদিস ৩৭১৬।
১ সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৮৫৯; মুজাম তাবরানি, হাদিস : ১৪৬৪৭; সুনানে বাইহাকি, হাদিস : ১৩৮৫১। হাদিসটির সনদ যয়িফ।
২ ইতহাফুস-সাদাতিল মুত্তাকিন : ৫/৩৪০, ইমাম মুরতাজা যাবিদি。
> ফাযাইলুল গাইরাহ আলান-নিসা, পৃষ্ঠা: ১১৬, হাম্মাদাহ মুহাম্মাদ মুহাম্মাদ ইসমাইল।