📄 গাইরতের বদহজম হওয়া ঠিক না
অতি গাইরতকে অন্য শব্দে 'গাইরতের বদহজম' বলা যায়। সত্য কথা বলতে কী; অনেক মানুষের গাইরতের আবার বদহজম হয়ে থাকে। এ ব্যাপারে একটা গল্প না বললেই নয়! গল্পটা একজন হুজুরের। লিখেছেন আরেকজন। ফেসবুকে এটা নিয়ে অনেক হাস্যরস হয়েছিল। ধার করা হলেও গল্পটা কিন্তু শিক্ষণীয়।
“সেদিন এক আলেমের বাসায় দাওয়াত খেলাম। নতুন বিয়ে করেছেন তিনি। স্ত্রীকে নিয়েই তার এখন সংসার। আমি যাচ্ছি আগেই জানিয়েছিলাম। সেজন্যে মেহমানদারি করতে হবে। সেসব কথা ভেবেই তিনি নিজেই রান্না করেছেন। ভালোই রান্না করেন মাওলানা সাহেব। মাশাআল্লাহ।
আমাকে খাওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে জিজ্ঞেস করলেন- 'খাবার কেমন হয়েছে? আপনি তো আমার রান্না এর আগেও একবার খেয়েছেন। আমার রান্না চিনেন খুব ভালো করে।' বললাম-'রান্না ভালো হয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ।'
আমাকে বলতে লাগলেন তখনই, 'আসলে ভাই কী না কী ভাবেন; আমি আমার স্ত্রীর রান্না কাউকে খাওয়াতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি না। আমার বউয়ের রান্না খেয়ে কেউ বলবে-ভাই আপনার বউয়ের রান্নাটা সেই! অনেক মজা হয়েছে। এই সেই। তারপর আমার বউ নিয়ে কিছু আলাপ, গুণকীর্তন। এসব কিছুই আমার ভালো লাগে না। লাগবেও না। এইজন্য আমি নিজেই রান্না করে আমার বন্ধু-বান্ধবদের খাওয়াই। তাই আপনার জন্য আমিই রান্না করেছি। বলতে পারেন এটা আমার গাইরত।'
তখন তাঁকে বললাম, 'এক মহিয়সীর গল্প পড়েছিলাম এমন একটা। তিনি তাঁর বুজুর্গ স্বামীর বন্ধুদের রান্না করে খাওয়াতেন না। এই ভেবে যে, তাঁরা তাঁকে নিয়ে আলোচনা করবে। আর এটা তাঁর ভালো লাগবে না। কারণ অন্য পুরুষরা কেন আমায় নিয়ে আলোচনা করবে?'
তিনি তৎক্ষণাৎ বলে উঠলেন, ‘সেই গল্পটা পড়েই আমি রান্না-বান্না শিখি এবং এই ইচ্ছা অন্তরে পোষণ করি।’ সুবহানআল্লাহ। একটা ছোট্ট গল্প বাস্তব জীবনে কতটা প্রভাব ফেলেছে। সেটাই আমি ভাবছি।”
গল্পটা যে ভাই লিখেছেন, তিনি ওই হুজুরের আসলে খুব প্রশংসা করেছেন। এটা তার সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত অনুভূতি। হ্যাঁ, এটা ওই হুজুরের গাইরত; তবে অতি গাইরত। ইসলামে এমন গাইরত নিষিদ্ধ। আল্লাহর রাসুল -এর সাহাবিরা ছিলেন উম্মাহর সবচেয়ে গাইরতমন্দ ব্যক্তি। তাঁদের স্ত্রীরাও রান্না করতেন। আবার তাঁরাও তাঁদের অন্যান্য সাহাবি ভাইদের দাওয়াত করে নিয়ে স্ত্রীর হাতের রান্না খাওয়াতেন। কোথায়, তাদের গাইরতে দেখি বাধা দিলো না! সিরাত ও ইতিহাসে এ রকম ভুরি ভুরি ঘটনা আছে। এখানে শুধুমাত্র একটি উল্লেখ করছি।
খন্দকের যুদ্ধকালে আল্লাহর রাসুল ও সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন ক্ষুধার্ত। তিনদিন পর্যন্ত কারও কিছু খাওয়া হয়নি। রাসুলুল্লাহ ﷺ পেটে পাথর বেঁধে রেখেছিলেন। আরও অনেক সাহাবির পেটে পাথর বাঁধা ছিল। জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা. নবিজি -এর ক্ষুধার্ত অবস্থা সইতে পারছিলেন না। একটা কিছু ব্যবস্থা করার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। অনুমতি নিয়ে বাড়িতে গেলেন।
বাড়িতে এসে সহধর্মিণীকে বললেন, নবিজির ক্ষুধা দেখে আমার সহ্য হয়নি; খাবার কিছু আছে? বাড়িতে কিছু যব ও একটি বকরির বাচ্চা ছিল। জাবিরের স্ত্রী সেই যব বের করলেন। আর জাবির রা. বকরির বাচ্চাটা জবাই করলেন। তাঁর স্ত্রী যব পিষে রুটির জন্য খামির বানাতে লাগলেন আর জাবির বকরির বাচ্চাটার গোশত কেটে পাতিলে দিয়ে নবি ﷺ-এর কাছে চলে এলেন।
খাবার খুব কম থাকায় জাবির চাচ্ছিলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ একাই যান। তাঁর স্ত্রীও সতর্ক করে দিয়েছিলেন যাতে বেশি লোক নিয়ে না আসেন। স্বামী ঘর থেকে বের হওয়ার সময় সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, ‘দেখুন, রাসুলুল্লাহ ﷺ ও তাঁর সঙ্গীদের কাছে আমাকে যেন বেইজ্জত না করেন। অর্থাৎ আমাদের খাবার তো খুব কম। যদি বেশি লোক নিয়ে আসেন, আমরা তাদের তৃপ্তিভরে খাওয়াতে পারব না। সেটা আমাদের জন্য বড় লজ্জার কারণ হবে। তাই বুঝেশুনে মেহমান আনবেন।
জাবির রা. খন্দকের কাছে এসে বললেন, ‘আমার সামান্য কিছু খাবার আছে। হে আল্লাহর রাসুল, আপনি উঠুন এবং আপনার সঙ্গে দুই একজন লোকও নিয়ে আসুন।
কোনো বর্ণনায় আছে যে, তিনি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কানে কানে খাদ্যের পরিমাণ উল্লেখ করেছিলেন যে, তা একটি বকরির বাচ্চা ও এক সা পরিমাণ যব। কিন্তু নবিজি সেই সামান্য খাবার সবাই মিলে খেতে চাইলেন। তাই আনসার ও মুহাজির যারাই খন্দক খননের কাজে নিয়োজিত ছিলেন, সবাইকেই সঙ্গে যাওয়ার জন্য বললেন।
নবিজি সবাইকে ডেকে বললেন, 'হে পরিখা খননকারীগণ। জাবির তোমাদের জন্য ভোজের আয়োজন করেছে। তোমরা দ্রুত চলো।' তিনি তো সম্পূর্ণরূপে তাওয়াক্কুল করে অভ্যস্ত। বিশ্বাস ছিল আল্লাহ তা'আলার ওপর যথাযথ ভরসা করে খেলে এই সামান্য খাবারই সকলের জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবে। সেইসঙ্গে তিনি জাবির রা.-কেও এই বলে আশ্বস্ত করলেন যে, তুমি যাকে অল্প বলছো, প্রকৃতপক্ষে তা প্রচুর ও উত্তম খাবার।
শুধু তাই নয়; নবিজি খাদ্যে বরকত হওয়ার লক্ষ্যে জাবির রা.-কে বললেন, 'তুমি তোমার স্ত্রীকে বলো-আমি না আসা পর্যন্ত যেন চুলা থেকে হাঁড়ি ও রুটি না নামায়।' তারপর তিনি আনসার ও মুহাজিরদের নিয়ে জাবির রা.-এর বাড়িতে গিয়ে পৌঁছলেন। এত লোক দেখে জাবিরের স্ত্রীর চক্ষু তো চড়কগাছ! তিনি ভড়কে গেলেন। স্বামীকে নানা কথা বলে তিরস্কার করলেন।
এক বর্ণনায় আছে, জাবির রা. নিজেও খুব পেরেশান হয়ে পড়েছিলেন। তিনি বলেন, 'এতসংখ্যক লোক আসায় আমি যে কী পরিমাণ লজ্জাবোধ করছিলাম, তা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। মনে মনে বললাম, মাত্র এক সা যব ও একটি ছাগলছানা, অথচ মেহমান এত লোক! এখন কী হবে?'
তাঁর স্ত্রী ছিলেন খুবই বুদ্ধিমতী। তিনি যখন জানতে পারলেন যে, নবিজিকে সবই জানানো হয়েছে, তখন তিনি আশ্বস্ত হয়ে গেলেন যে, তিনি জেনেশুনেই যখন এত লোক নিয়ে এসেছেন, তখন নিশ্চয়ই এর মধ্যে কোনো হিকমত আছে। পেরেশানির কোনো কারণ নেই। হয়তো তাঁর উপস্থিতির বরকতে এ সামান্য খাবারেই সকলের প্রয়োজন মিটে যাবে।
বাড়িতে পৌঁছে নবিজি ﷺ প্রথমে আটার খামিরায় ও গোশতের হাঁড়িতে খানিকটা থুতু দিলেন। সঙ্গে বরকতের জন্য দুআ করলেন। সেইসঙ্গে রুটি তৈরি করতে পারে এমন কোনো প্রতিবেশী মহিলাকে ডেকে আনার হুকুম করলেন।
নবিজির মুখের থুতু অন্যদের মতো নয়। তাঁর শরীরের ঘামেও তো ছিল মিশকের চেয়েও বেশি সুরভি। সুতরাং পবিত্র মুখের থুথুতে অমৃতের আস্বাদ ও প্রাণকাড়া সুরভি তো থাকবেই। তাই খাবারে থুতু দেওয়াতে খাবারের অমর্যাদা হয়নি; বরং তা স্বতন্ত্র মহিমা লাভ করেছে। পবিত্র মুখের সে থুতুর সঙ্গে ছিল দুআর মিলন। নুরুন আলা নুর। বরকত তখনই শুরু হয়ে গিয়েছিল। আটার খামিরা যদিও সামান্য, কিন্তু সে বরকতের কারণে রুটি তৈরিতে সাহায্যকারীর প্রয়োজন পড়েছিল।
সুতরাং রুটি তৈরি হতে থাকল। নবিজি নিজে তা বিতরণের দায়িত্ব নিলেন। তিনি রুটি টুকরো টুকরো করে তার উপর গোশত রাখতে থাকলেন। প্রত্যেকবার তা নেওয়ার পর হাঁড়ি ও চুলা ঢেকে রাখছিলেন আর তা সাহাবিদের দিকে এগিয়ে দিচ্ছিলেন। এভাবেই জাবির ও তাঁর স্ত্রীর রান্না করা খাবার খেয়ে সকলে পরিতৃপ্ত হয়ে গেলেন। তারপরও কিছু অবশিষ্ট থাকল। মানে আটার খামিরা ও হাঁড়ির গোশত আগে যেমন ছিল তেমনিই রয়ে গেল।
নবিজি জাবির রা.-এর স্ত্রীকে বললেন, 'তুমি এটি খাও এবং হাদিয়া দাও। মানুষ বড় ক্ষুধার্ত।' এক বর্ণনায় আছে, জাবির রা. বলেন, 'আমরা সারাটা দিন সেই খাবার নিজেরাও খেয়েছিলাম এবং মানুষের মধ্যেও বিতরণ করছিলাম।'১
টিকাঃ
১ সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪১০১।
📄 ইসলামে গাইরতের এত গুরুত্ব কেন?
ইমাম আবু হামিদ গাজালি রহ. বলেন, 'কোনো কোনো আলেমের মতে, পুরুষ যদি দুর্বল আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন হয়, এর অনিবার্য ফলাফল হলো-সে তার স্ত্রী, কন্যা ও মাহরাম নারীদের সেফটির ক্ষেত্রে আত্মসম্মানের অভাব অনুভব করে, ইতর লোকদের থেকে অপমান সহ্য করে, নিচু মন-মানসিকতার অধিকারী হয়ে থাকে, যা কিনা মাহরাম নারীদের ক্ষেত্রে তার গাইরতকে একেবারে লোপ পাইয়ে দেয়। একজন পুরুষের মধ্যে যখন এই ব্যাপারটা দেখা দেয়, তখন বংশ পরিচয় নষ্ট হয়ে যায়। মানে নারী নষ্টা হয়ে গেলে বংশ পরিচয় আর ঠিক থাকে না। এজন্যই তো বলা হয়েছে, যে জাতির পুরুষদের গাইরত দুর্বল হয়ে যায়, সে জাতির নারীদের সতীত্ব দুর্বল হয়ে পড়ে। কেননা, পুরুষদের মধ্যে গাইরত সৃষ্টিই করা হয়েছে বংশপরিচয় রক্ষার জন্যে। সে হিসেবে বলতে হয়, যে জাতির পুরুষ গাইরত হারিয়েছে, সে জাতির নারী সতীত্ব হারিয়েছে।'১
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইজুদ্দিন ইবনে আবদুস সালাম রহ. বলেন, 'মাহরাম নারীদের ক্ষেত্রে গাইরত রাখার উদ্দেশ্য হলো, তাদেরকে এমন অশ্লীলতা থেকে বাঁচানো, যা দুনিয়ার লাঞ্ছনা ও আখেরাতের শাস্তি অবধারিত করে। গাইরত দুই প্রকার। ১. গোপন গাইরত। ২. প্রকাশ্য গাইরত। আর প্রকাশ্য গাইরত হলো যে, মাহরাম নারীদেরকে সাবধান করা এবং বেপর্দা চলাফেরা ইত্যাদি অশ্লীলতা থেকে বাঁচানো।'২
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, 'আল্লাহ তা'আলা আদম সন্তানের অন্তরে যে গাইরত সৃষ্টি করেছেন—তা তো সকলেরই জানা। আর এজন্যই তো একজন পুরুষ নিজে কোনো নারীর সাথে ব্যভিচার করাকে যতটা সহজভাবে মেনে নেয়, তার নিজের স্ত্রীর সাথে পরপুরুষ ব্যভিচার করলে সেটা ততটা সহজে মেনে নিতে পারে না!'৩
ইমাম ইবনুল কায়্যিম রহ. বলেন, 'দ্বীনের মূল হলো গাইরত। যার গাইরত নেই, তার দ্বীনও নেই। গাইরত অন্তরকে সুরক্ষিত রাখে, ফলে দেহের অঙ্গগুলোও সুরক্ষিত থাকে। আর তা অশ্লীলতা ও নোংরামি দূরে রাখে। গাইরতহীনতা অন্তর মেরে ফেলে। ফলে দেহের অঙ্গগুলোও মৃত্যুবরণ করে। এমতাবস্থায় অঙ্গগুলোর মধ্যে আর কোনো শক্তি বাকি থাকে না। মানুষের অন্তরে গাইরত হলো দেহে রোগ প্রতিরোধকারী শক্তির মতো; যা কিনা রোগ প্রতিরোধ করে এবং রোগের সাথে যুদ্ধ করে। এই রোগ প্রতিরোধকারী শক্তি যখন থাকে না, তখন রোগ সুযোগ পেয়ে যায় এবং দেহে জায়গা করে নেয়। আর তখনই ধ্বংস অনিবার্য হয়ে পড়ে।'১
ইমাম রাগিব ইস্পাহানি রহ. বলেছেন, 'আল্লাহ তা'আলা মানুষের মধ্যে গাইরতের শক্তিটা রেখেছেন শুধুমাত্র পুরুষের বীর্যের যথাযথ সংরক্ষণ ও বংশ পরিচয়কে হেফাজত করার কারণ হিসেবে। এজন্যই তো বলা হয়, যে জাতির পুরুষের মধ্যে গাইরত থাকে, সে জাতির নারীরা সতীসাধ্বী হয়।'২
যাহোক, গাইরত নিয়ে বইয়ে তো লম্বা-চওড়া বহু আলাপই তো করা হয়েছে; কিন্তু একটা আলাপ বাকি রয়ে গিয়েছিল, সেটা হলো-ইসলামে গাইরতের এত গুরুত্ব কী কারণে? পুরুষকে কেন তার নারীদের ব্যাপারে এত গাইরত তথা আত্মমর্যাদাবোধ রাখতেই হয়?
এই প্রশ্নের জবাব তো ইতোমধ্যেই উম্মাহর বিদগ্ধ আলেমদের বয়ানে ফুটে উঠেছে। তাঁদের বয়ান থেকে যা ফুটে উঠেছে তার খোলাসা হলো, পুরুষ যদি তার নারীদের ব্যাপারে গাইরত না রাখে, তাহলে নারীরা নষ্টা হয়ে যেতে পারে। আর নারী নষ্টা হলে পুরো জাতিই ধ্বংস! এমতাবস্থায় বংশ পরিচয়টাও ঠিক থাকবে না। ব্যাপারটার বাস্তবতা বুঝতে হলে তাকাতে হবে পশ্চিমা দেশগুলোর দিকে।
পশ্চিমা দেশে পুরুষদের গাইরত নেই। তাই তাদের নারীরা 'ফ্রি মিক্সিং'র নামে পরপুরুষের বাহুলগ্না হয়ে থাকে। এতে করে তাদের পারিবারিক পবিত্র জীবনবাবস্থার পতন ঘটেছে। সন্তানের বংশ পরিচয় হারিয়ে গেছে। সেখানে সন্তানদের পরিচয় লেখা হয় মায়েদের নামে। কারণ, সন্তানের আসল বাবা কে-সেটা মাও জানে না!
একটা গল্প মনে পড়ল। আহমদ তৌফিক পাশা (১৮৪৫ – ১৯৩৬) ছিলেন উসমানি খিলাফতের শেষ উজিরে আজম। আহমেদ তৌফিক ওকদাই নামে তিনি বেশি পরিচিত। সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ ছাড়াও একাধিক উসমানি খলিফার সময়ে তিনি উজিরে আজমের পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। উপস্থিত বুদ্ধির জন্য তিনি বেশ খ্যাত ছিলেন। কোথায় কাকে কীভাবে লাজওয়াব করতে হয়—সেটা তাঁর খুব ভালো জানা ছিল।
উজির হওয়ার আগে আহমদ তৌফিক পাশা খিলাফতের একজন কূটনীতিক ছিলেন। খিলাফতের স্বার্থে বহু দেশেই তাঁকে যেতে হতো। একবার ইউরোপের কোনো এক দেশে কূটনীতিক কাজে গেলেন তিনি। সেখানে একজন ইউরোপীয় নেতা তাঁকে উপহাস করে বলল,
: আপনাদের দেশের নারীরা কেন বোরকা পরে ঘরে বসে থাকে; বাইরে পুরুষদের সাথে সমানতালে চলে না কেন?!
: কারণ, তারা একমাত্র তাদের স্বামী ছাড়া আর কারও দ্বারা গর্ভবতী হতে চায় না!
জবাবটা ছিল ‘যেমন কুকুর তেমন মুগুর’ স্টাইলের। জবাবটা শুনে ইউরোপীয় নেতা লাজওয়াব হতে বাধ্য হয়েছিলেন।১
টিকাঃ
১ ইহয়াউ উলুমিদ্দিন: ৩/১৬৮, ইমাম গাজালি।
২ শাজারাতুল মাআরিফ ওয়াল আহওয়াল: ২১১।
৩ মাজমুউল ফাতাওয়া : ১৫/৩২০।
১ আল-জাওয়াবুল কাফি: ৬৮, ইমাম ইবনুল কাইয়িম।
২ আয-যারিআহ ইলা মাকারিমিশ শারিআহু: ৩৪৭, ইমাম রাগিব ইস্পাহানি৷৷
১ আমার লিখিত ‘উসমানি খিলাফতের স্বর্ণকণিকা’, পৃষ্ঠা: ১৪৫।
📄 পরিবেশও মানুষকে গাইরতহীন বানায়
মানুষ সামাজিক জীব। তাই সমাজ ও পরিবেশ দ্বারা মানুষ প্রভাবিত হয়—কথাটা চিরন্তন সত্য। দেখা গেছে, একজন পুরুষ এক সময় খুবই গাইরতমন্দ ছিল, কিন্তু এখন সমাজ ও পরিবেশে প্রভাবিত হয়ে সে গাইরতহীন হয়ে গেছে! এই নৈতিক অধঃপতনটা সবচেয়ে বেশি লক্ষণীয় বিলেত প্রবাসী মুসলমানদের ক্ষেত্রে। তারা দেশে যথেষ্ট গাইরত সম্পন্ন থাকলেও পশ্চিমা দেশে যাওয়ার পর বেহায়া ও গাইরতহীন হয়ে যায়। অবশ্য সবাই নয়। অজপাড়া গাঁ থেকে শহরে এলেই বহু মানুষের দ্বীনদারি ও গাইরত লোপ পেয়ে যায়। গ্রামে থাকতে যার স্ত্রী, কন্যা ও বোনেরা শালীন পোশাক ছাড়া ঘর হতে বেরই হতো না; শহরে আসার পর তারা টাইটফিট জামা ছাড়া বাসা থেকে বেরই হয় না! আর তাদের অভিভাবক পুরুষ; যে কিনা আগে যথেষ্ট রক্ষণশীল ছিল, সেও এখন তা ‘সোসাইটি ম্যানেজ’ এর নামে মেনে নেয়!
এ ব্যাপারে লম্বা আলাপের আসলে দরকার নেই। বাস্তবতা কিন্তু সকলের চোখের সামনে। পরিবেশ ও পরিস্থিতি দ্বারা মানুষ যে কতটা প্রভাবিত হয়, সেটা বোঝাতে গিয়ে একজন হুজুরের গল্প বলি। গল্পটা ফেসবুকে পড়েছিলাম। গাইরত নিয়ে গ্রন্থনায় কাজে লাগবে—এই চিন্তা থেকে সেটা সংরক্ষণ করে রেখেছিলাম। গল্পটা হুবহু নকল করছি।
“একজন আলেমের কথা বলি। মফস্বলে থাকেন। সন্তানের চিকিৎসার জন্য ঢাকায় এলেন। সপ্তাহ খানেক থাকলেন প্রাইভেট ভার্সিটি এলাকায়। যতবারই বের হলেন; কিছু না কিছু অশ্লীল দৃশ্য চোখে পড়েছে। ছেলে-মেয়েরা কীভাবে তাদের জাস্ট ফ্রেন্ডদের সাথে গলাগলি করে—এসব সেখানে নিত্যই দেখা যায়।
ছেলে সুস্থ হওয়ার পর চলে এলেন গ্রামে। বাস থেকে নেমে গ্রামের সাব রাস্তায় স্ত্রী-সন্তানকে তুলে দিলেন এমন সিএনজিতে, যেখানে রয়েছে আরও চারজন পুরুষ। তিনি একবারও ভাবলেন না—তার স্ত্রী কীভাবে এই মানুষগুলোর সাথে ঘেঁষাঘেঁষি করে বসবে। স্ত্রী বেচারা নিজেই হতবাক। বুঝে উঠার আগেই গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে।
দিনভর কিছুই খেতে পারেননি। রাতে যখন মৌলভি বাসায় ফিরলেন; নিজেদের মধ্যে ঘটে গেল তুমুলকাণ্ড!
দশ বছরের সংসার জীবনে এটাই একমাত্র ঝামেলা, যা মনে হলে আজও নাকি বেচারা শিউরে ওঠেন। তিনি আমাকে পরে জানালেন যে, ভার্সিটির ছেলে-মেয়েদের তাৎক্ষণিক এসব অনৈতিক দৃশ্য (যদিও তিনি নিজের চোখ হেফাজত করার চেষ্টা করছেন) কিছু সময়ের জন্য তার ঈমানের গাইরত ধ্বংস করে দিয়েছে। ফলে তিনি স্ত্রীকে অন্য পুরুষের সাথে গাড়িতে তুলে দিচ্ছেন; অথচ বিষয়টা তার কাছে তখন স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল!”
📄 উম্মাহর গাইরতহীনতার মূল কারণগুলো কী?
পুরুষ মানুষ বলতেই গাইরতমন্দ হওয়ার কথা। গাইরত যে পুরুষের ফিতরাত তথা জন্মগত স্বভাব-সে কথা তো বইয়ের শুরুতেই বলে এসেছি। আর একজন মুমিন তো অবশ্যই গাইরতমন্দ হবে। গাইরত ব্যক্তিগত প্রেস্টিজের ব্যাপারই নয় শুধু; দ্বীন ও ঈমানের অংশ। এরপরেও বহু পুরুষের মধ্যে গাইরতের ঘাটতি যে থাকে, সেটার কারণ কী?
হিসেব করতে গেলে কারণ কিন্তু অনেক। সবগুলো তো উল্লেখ, করা সম্ভব নয়। তাই মৌলিক বড় কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেই ক্ষ্যান্ত করব ইনশাআল্লাহ।
এক. ঈমানি দুর্বলতা: মানুষের ঈমানে দুর্বলতা থাকলেই তখন সে শরিয়তের অন্যান্য আহকাম পালনে ঢিলেমির মতো গাইরত প্রদর্শনেও ঢিলেমি করে। আর আগেই উল্লেখ করেছি যে, হাদিসে বলা হয়েছে-'আল্লাহ গাইরত রাখেন, মুমিনও গাইরত রাখে।' সুতরাং যার মধ্যে গাইরত নেই, বুঝতে হবে তার ঈমানে দুর্বলতা আছে।
দুই. গুনাহের আধিক্যতা: ইমাম ইবনু কাইয়িমিল জাওযিয়্যাহ রহ. বলেন, 'বেশি বেশি গুনাহ মানুষের গাইরতের আগুনকে নিভিয়ে ফেলে। গাইরতের আগুন মানবদেহের জন্য খুবই জরুরি। এই আগুন দেহ থেকে সব ধরনের ময়লা ও নিন্দনীয় গুণাবলি জ্বালিয়ে দেয়।১
তিন. মূর্খতা: গাইরতের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা এবং এ সম্পর্কে নিজের দায়িত্বশীলতা সম্পর্কে মূর্খতার কারণেই মানুষ গাইরতহীন হয়। দাইয়ুস হয়। অথচ, একজন পুরুষ নিজের পরিবার-পরিজনের দায়িত্বশীল। কিয়ামতের দিন তাকে এ ব্যাপারে জবাবদিহি করা হবে।
চার. বিজাতীয় কালচার অনুসরণ: বিজাতীয় কাফেরদের নোংরা কালচার অনুসরণ করতে গিয়েও মানুষ গাইরতহীন হয়ে থাকে। অথচ, ইসলাম বিজাতীয় কাফেরদের অসভ্যতা অনুসরণ না করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। হাদিসে বলা হয়েছে, 'যে ব্যক্তি কোনো জাতির সাদৃশ্য গ্রহণ করবে, কিয়ামতের দিন সে তারই অনুগামী হবে।'১
পাঁচ. খারাপ মিডিয়ার প্রভাব: রেডিও, টেলিভিশন, পত্র-পত্রিকা, ইন্টারনেট ইত্যাদির কুপ্রভাব রয়েছে মানুষদের মধ্যে। এইসব মিডিয়ার অশ্লীলতাই ঈমানদারদের দামি সম্পদ গাইরতকে হরণ করেছে।
ছয়. অশ্লীলতার ব্যাপকতা: সমাজে নীতি ও নৈতিকতা বিবর্জিত কর্মকাণ্ড, অশ্লীলতা ও বেহায়াপনার ছড়াছড়ির কারণে গাইরত ধংস হয়ে গেছে। অথচ, হাদিসে বলা হয়েছে, ভালো কাজের আদেশ দিতে আর মন্দকাজ থেকে বারণ করতে। এটা করা হলে সমাজ নষ্ট হতো না। গাইরতও লোপ পেত না।
টিকাঃ
১ আল-জাওয়াবুল কাফি: ৬৯, ইমাম ইবনুল কাইয়িম।
১ সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪০৩১। হাদিসটি সহিহ।