📄 গাইরতহীন পুরুষই হলো দাইয়ুস
স্ত্রী, কন্যা, জায়া, বোন ও মায়ের প্রতি গাইরতের প্রসঙ্গ এলেই যে শব্দটি অটোমেটিক সামনে চলে আসে তা হলো-'দাইয়ুস'। বলতে গেলে দাইয়ুস ও গাইরতহীন শব্দদুটো সমার্থবোধক।
প্রসিদ্ধ হাদিস-বিশারদ ইমাম তিবি রহ. বলেন, 'দাইয়ুস হলো যে তার পরিবারকে অন্যায় গর্হিত কাজ করতে দেখে, কিন্তু তা সত্ত্বেও তার গাইরতে বাধে না। তাদেরকে সেটা করা থেকে বাধা দেয় না। উল্টো সবকিছু মেনে নেয়।'১
প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস মোল্লা আলি কারি হানাফি বলেন, 'দাইয়ুস হলো ওই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের নারীদের ক্ষেত্রে ব্যভিচার কিংবা ব্যভিচারের পূর্ববর্তী সব অশ্লীলতা ও বেহায়াপনাকে সাপোর্ট করে।'২
জগদ্বিখ্যাত হাদিস বিশারদ ইমাম শামসুদ্দিন যাহাবি বলেছেন, 'দাইয়ুস হলো সেই ব্যক্তি, যে তার স্ত্রীর অশ্লীল কাজ সম্পর্কে অবগত। কিন্তু তার প্রতি ভালোবাসার কারণে এ ব্যাপারে সে উদাসীন থাকে। অথবা তার ওপর তার স্ত্রীর বৃহৎ ঋণ বা মোহরানার ভয়ে কিংবা ছোটো ছেলে-মেয়েদের কারণে সে স্ত্রীকে কিছুই বলে না এবং যার গাইরত বলতে কিছুই নেই।'৩
সুতরাং যে ব্যক্তি তার স্ত্রী, কন্যা, জায়া, বোন ও পরিবারের নারীদের অবাধ চলাফেরা, অশালীন জীবনযাপন ও পাপপূর্ণ জীবনাচার মেনে নেয় এবং তাদের এসব গর্হিত কাজ করা থেকে বাধা দেয় না-তাকে ইসলামের পরিভাষায় 'দাইয়ুস' বলা হয়। দাইয়ুস ব্যক্তি হতে পারে স্বামী, পিতা কিংবা ভাই অথবা যেকোনো পুরুষ অভিভাবক।
আফসোসজ্জনক হলেও সত্য যে, শুধু দ্বীনহীন কেন; অনেক দ্বীনদার পুরুষই জানেন না—তারা দাইয়ুস। তারা পরিবারের সদস্যদের পাপপূর্ণ চলাফেরায় বাধা দেন না, শালীনতা ও ভদ্রতার পথে আসার জন্য চেষ্টা করেন না। অথচ কী জঘন্য অন্যায় তারা করছেন, যদি বুঝতে পারতেন তাহলে বেহায়াপনা, পাপপূর্ণ জীবন মেনে নিতেন না। হাদিসে এসেছে—
ثَلَاثَةٌ قَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِمُ الْجَنَّةَ: مُدْمِنُ الْخَمْرِ، وَالْعَاقُ، وَالدَّيُّوتُ الَّذِي يُقِرُّ فِي أَهْلِهِ الْخَبْثَ.
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল ﷺ বলেছেন, তিন ব্যক্তির ওপর আল্লাহ তা'আলা জান্নাত হারাম করেছেন। ১. মদ্যপানে অভ্যস্ত ব্যক্তি। ২. পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান। ৩. দাইয়ুস অর্থাৎ ওই গাইরতহীন ব্যক্তি, যে তার পরিবারের মহিলাদের ক্ষেত্রে পাপাচার অর্থাৎ ব্যভিচার ইত্যাদিকে সমর্থন করে।'
আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত আরেক হাদিসে রাসুল ﷺ বলেন:
ثَلَاثَةٌ لَا يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ، وَلَا يَنْظُرُ اللَّهُ إِلَيْهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ: الْعَاقُ بِوَالِدَيْهِ، وَالْمَرْأَةُ الْمُتَرَجِلَةُ الْمُتَشَبِّهَةُ بِالرِّجَالِ، وَالدَّيُّوتُ.
'তিন ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না। এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা তাদের দিকে রহমতের দৃষ্টিতে তাকাবেন না। ১. পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান। ২. পুরুষের সাদৃশ্য গ্রহণকারী নারী। ৩. দাইয়ুস।২
দাইয়ুস ব্যক্তি মূলত ফাসিক। কারণ সে কবিরা গুনাহে লিপ্ত। অনেকেই মনে করেন, এমন ব্যক্তির ইবাদত-বন্দেগি কবুল হয় না। ব্যাপারটা আসলে এমন নয়। ফতোয়ায় বলা হয়েছে—'যদি কোনো ব্যক্তির স্ত্রী পর্দা না করে তাহলে সে ব্যক্তির ওপর কর্তব্য হচ্ছে স্ত্রীকে পর্দা করার ওপর বাধ্য করা। কিন্তু তা না করে যদি সে স্ত্রীর বেপরোয়া, পাপপূর্ণ জীবনযাপন মেনে নেয় এবং সে ইবাদত-বন্দেগিও করে তাহলে এ অবস্থায় স্বামী গুনাহগার ও জাহান্নামি হবে। আর নামাজ ও ইবাদত গুনাহগারেরও কবুল হয়।১
সুতরাং ইবাদত-বন্দেগি পরিপূর্ণরূপে কবুল হওয়ার জন্য অবশ্যই দাইয়ুসের মন্দ গুণাবলি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তা নাহলে আল্লাহর কঠিন আজাবের সম্মুখীন হতে হবে। তবে কেউ দাইয়ুস হলে তাকে 'দাইয়ুস' বলে গালি দেওয়া যাবে না।২
নিজের একটা অভিজ্ঞতা শেয়ার করেই দাইয়ুসের প্রসঙ্গ শেষ করতে চাচ্ছি। জীবনপথে চলতে গিয়ে কত কিসিমের মানুষের সাথেই তো ওঠাবসা করতে হয়। এতে অভিজ্ঞতার ঝুলিটা বেশ পূর্ণই থাকে।
যার কথা বলতে চাচ্ছি, তিনি দ্বীনদার মানুষ। দাম্পত্য জীবনে খুব অসুখী। বিয়ের সময়ের এক ভুলের কারণে এখনও মাশুল দিয়ে যাচ্ছেন। বস্তুত বিয়ে করতে হয় খুব ভেবেচিন্তে। দেখেশুনে। নইলে আজীবন পস্তাতে হয়। আমাদের সমাজে বিয়ে করা যেমন কঠিন, পরে ছাড়াও কঠিন। আর বাচ্চা-কাচ্চা হয়ে গেলে তো মহা মুশকিল।
বিয়েটা করেছিলেন তিনি নিজের পছন্দের বাইরে। পরিবারের চাপে। আগে থেকেই তার পরিবার মেয়েটাকে ঠিকঠাক করে রাখে। তার অমত করার সুযোগ ছিল না। বিয়ের পরেই তিনি পড়েন বিপদে। মেয়ের স্বভাব-চরিত্র ভালো না। স্বামীর সাথে বাজে আচরণ তো করেই; ফ্যামিলির কাউকেই সহ্য করতে পারে না। স্বামীর আয়-রোজগার সব নিজের আয়ত্তে রাখতে চায়। স্মার্ট ফোনে ফেসবুক, ইমো ব্যবহার করে বহু পুরুষের সাথে পরকীয়া করে! এমনকি ওই ভাইয়ের নিকটাত্মীয়দের সাথেও পরকীয়ায় লিপ্ত হয়ে পড়ে!
দাম্পত্য জীবনে অসুখী মানুষগুলোর চেহারা সব সময় মলিন থাকে। এদের চেহারায় হাসি-ফুর্তি দেখা যায় খুবই কম। বিশেষ করে তাদের সামনে অন্য কেউ নিজের দাম্পত্য জীবনের সুখময় কিছু শেয়ার করলে তাদের বুকটা হাহাকার করে ওঠে। এজন্য এমন মানুষের সামনে নিজের দাম্পত্য জীবনের রোমান্টিক কিছু শেয়ার করতে নেই।
তো ওই ভাইয়ের চেহারাটাও সব সময় মলিন থাকত। একটা বাচ্চাও আছে তার। এ ব্যাপারে আমার কাছে পরামর্শ চাইলে ধৈর্যধারণ করে মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে জীবনটা কাটিয়ে দিতে বললাম। তিনি বলে উঠলেন, সবই হয়তো মানিয়ে নিতেন; কিন্তু উনার স্ত্রী যেহেতু পরপুরুষের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কে লিপ্ত, সেহেতু এমন স্ত্রীকে প্রশ্রয় দিলে তিনি আবার দাইয়ুস হয়ে যাবেন!
ভাইয়ের কথাটা শুনে আমি যেন আসমান থেকে পড়লাম! তাইতো, এ দিকটা তো আমি ভুলেও খেয়াল করিনি! এমন স্ত্রীকে রাখা মানে নিজে দাইয়ুস হওয়া! আর দাইয়ুস তো জান্নাতে যাবে না!
টিকাঃ
১ মিরকাতুল মাফাতিহ শারহে মিশকাতুল মাসাবিহ: ৬/২৩৯০, হাদিস: ৩৬৫৫।
২ প্রাগুক্ত।
৩ কিতাবুল কাবায়ির, পৃষ্ঠা: ১৩৭, ইমাম যাহাবি।
'মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ৫৩৭২।
২ মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ৬১৮০।
১ আপ কে মাসায়েল অওর উন কা হল: ৮/৬৮; ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া: ২৮/৯১।
২ মিরকাতুল মাফাতিহ: ৭/২২০; তাবয়িনুল হাকায়িক: ৩/৬৩৫; আল-বাহরুর রায়িক: ৫/৪৪; শামি-পুরারুল মুখতার: ৪/৭০।
📄 দ্বীনি ও দুনিয়াবি গাইরতের ভিন্নতা
মুসলমানের গাইরত দুই ধরনের হয়ে থাকে। প্রথম প্রকার হচ্ছে, দ্বীনি গাইরত। আল্লাহর হুকুম লঙ্ঘন হওয়ার দ্বারা মুমিনের ইমানে যে জযবা আসে, তাকে দ্বীনি গাইরত বলা হয়। নবি করিম ﷺ দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার পর, হজরত আবু বকর রা. খলিফা হন। ব্যক্তি হিসেবে তিনি খুব নরম দিলের মানুষ ছিলেন। এই সুযোগে আরব উপদ্বীপে রিদ্দাহর ফিতনা শুরু হয়। কাফের ও সুযোগ সন্ধানী দুর্বল ইমানের নওমুসলিমরা ইসলামের বিভিন্ন বিধান অস্বীকার করতে শুরু করে। অনেকেই তা পালনে শৈথিল্য প্রদর্শন করতে শুরু করে।
ইসলামের এমন ক্রান্তিলগ্নে নরম দিলের মানুষ হয়েও খলিফা আবু বকর রা. গারামা হয়ে যান। দপ করে তাঁর ঈমানি গহিরত জেগে ওঠে। তখন তিনি তাঁর সেই ঐতিহাসিক মন্তব্যটি করেন-
إنه قد انقطع الوحي وتم الدين أينقص وأنا حي ؟
'ওহি বন্ধ হয়ে গেছে। দ্বীনও পরিপূর্ণ হয়েছে। এরপরও আমি আবু বকর জীবিত থাকতে দ্বীনের ক্ষতিসাধন করা হবে, তা হতেই পারে না!'১
এরপরের ইতিহাস সকলেরই জানা। মুরতাদদের বিরুদ্ধে আবু বকর রা. জিহাদ ঘোষণা করেন। এমনকি যারা যাকাত আদায় করতেও গড়িমসি করত, তাদের বিরুদ্ধেও আস্ত্র শারূণ করেন। মিথ্যা নবুয়তের দাবিদার মুসাদ্জিায়া বাল্লাশা ও আসওয়াদ আলসিকে তিনিই খতমা করোল।
যাহোক, ঈমানি পাঙ্গুরাতেরা আর্মা হলো—ঈমানের কারণে কোলো মুমিনের আত্মমর্যাদারোর জেগে ওঠা। কেউ আল্লাহ, তাঁর রাসুল বা সাহাবিদের নিয়ে গালিস দিলে ভেতরে রাদি আত্মমর্যাদাবোধর রা জাগে, তবে সেই ব্যক্তি শীথানি৷ গাঙ্গুৰুত্বহীন।
একজন ব্যক্তির সামনে দ্বীনের অপব্যাখ্যা হওয়া সত্ত্বেও সে মুখে কুলুপ এঁটে রাখতে পারে না।
দ্বিতীয় প্রকার হচ্ছে, জাগতিক বিষয়ে গাইরত। যেমন নিজের স্ত্রী, কন্যা, জায়া, বোন, মা ও নিকটাত্মীয় নারীদের ক্ষেত্রে গাইরত দেখানো। আমাদের বক্ষ্যমাণ বইয়ে এই গাইরত নিয়েই আলাপ করা হয়েছে। এটাও আল্লাহ তা'আলার কাছে পছন্দনীয়। 'অবশ্য সেটা জায়েজ বা বৈধ বিষয়ে হতে হবে। নাজায়েজ বিষয়ে গাইরত দেখানোর অনুমোদন ইসলামে নেই। পরবর্তী পরিচ্ছেদে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলাপ করছি ইনশাআল্লাহ।
***
টিকাঃ
১ ফেলায়াতুর রুওয়াত: ৫/৩৯৭ জনালো আর লন।
📄 যেসব ব্যাপারে গাইরত দেখাতে নেই
ইসলামে গাইরত নন্দিত। কিন্তু অতি গাইরত নিন্দিত। ইসলাম গাইরতের গুরুত্বারোপ করে বলে মোটেও গাইরতের নামে বাড়াবাড়িকে প্রশ্রয় দেয় না। কিন্তু আফসোসজনক হলেও সত্য, এই সমাজের কিছু লোক এত বেশি গাইরত দেখায় যে, রীতিমতো তা বাড়াবাড়ির পর্যায়ে চলে যায়।
ইসলামে নিন্দিত গাইরত বলতে যা শরিয়তের সীমা লঙ্ঘন করে, বিবেক-বুদ্ধিও যা সাপোর্ট করে না, এমনকি যা সন্দেহ ও কুধারণা পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেয়। অথচ, সন্দেহ পোষণকারীর এ ব্যাপারে কোনো প্রকার শরিঈ দলিল নেই, বাস্তবতা নেই। গাইরতের নামে এমন অতি গাইরতই আল্লাহ তা'আলা অপছন্দ করেন। এমন অতি গাইরত মূলত ভালোবাসা ও আস্থা নষ্ট করে দেয়।১
বর্ণিত আছে, হজরত সুলাইমান আলাইহিস সালাম তাঁর ছেলেকে নসিয়ত করতে গিয়ে বলেছেন, 'হে আমার পুত্র! তোমার স্ত্রীর ব্যাপারে প্রয়োজনের অতিরিক্ত গাইরত দেখাতে যেয়ো না। এতে শুধু তোমার কারণে বেচারির প্রতি কুধারণা জন্মাবে মানুষের মনে। যদিও বেচারি নির্দোষ।'২
হজরত আলি ইবনে আবু তালিব রা. বলতেন, 'তোমার স্ত্রীর ওপর বেশি বেশি গাইরত দেখাতে যেয়ো না। এতে করে শুধু তোমার কারণেই বেচারিকে খারাপ ট্যাগ দেওয়া হতে পারে।'৩
শাইখ সাইয়িদ সাবিক বলেন, 'পুরুষের জন্য যেমন তার স্ত্রীর ব্যাপারে গাইরত রাখা জরুরি, তেমনিভাবে গাইরতের ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষা করাও জরুরি। কোনোভাবেই গাইরতের নামে স্ত্রীর ব্যাপারে কুধারণা করার সুযোগ নেই। গাইরতের নাম ভাঙিয়ে স্বামী মোটেও স্ত্রীর সব ধরনের ছোটো-বড়ো কার্যকলাপের অনুসন্ধান করতে যাবে না। স্ত্রীর সব দোষত্রুটি হিসেব করতে পারবে না। কেননা, এটা দাম্পত্য জীবনের সম্পর্কটাই নষ্ট করে দেয় এবং আল্লাহ যে বন্ধন অটুট রাখতে বলেছেন, তা ছিন্ন করে দেয়।'১
এজন্য অযথা গাইরত দেখাতে হাদিসে মানা এসেছে-
عن جابر بن عتيك، أن نبي الله ﷺ كان يقول: من الغيرة ما يحب الله ومنها ما يبغض الله، فأما التي يحبها الله فالغيرة في الريبة، وأما الغيرة التي يبغضها الله فالغيرة في غير ريبة.
জাবির ইবনে আতিক থেকে বর্ণিত, নবি ﷺ বলতেন, 'কিছু গাইরত এমন আছে—যা আল্লাহ পছন্দ করেন, আবার কিছু গাইরত এমন আছে—যা আল্লাহ অপছন্দ করেন। আল্লাহ যে গাইরত পছন্দ করেন—তা হচ্ছে মূলত যেক্ষেত্রে সন্দেহ করা যায়, পক্ষান্তরে আল্লাহ যে গাইরত অপছন্দ করেন—তা হচ্ছে মূলত যেক্ষেত্রে সন্দেহ করা যায় না।'২
ভারতবর্ষের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস শাইখ শামসুল হক আজিমাবাদি রহ. ব্যাপারটা বেশ খোলাসা করেছেন। তিনি বলেছেন, 'একজন পুরুষ যখন তার মাহরাম নারীদের বেপর্দা হয়ে চলাফেরা করা বা এ রকম শরিয়তের গর্হিত কিছু করতে দেখবে, তখন তার মধ্যে যে আত্মসম্মানবোধ আসবে, তা-ই হলো সন্দেহের ক্ষেত্রে গাইরত। এটাই আল্লাহ তা'আলা পছন্দ করেন। আর একজন পুরুষ যখন তার বাবার মৃত্যুর পর মাকে কোনো পুরুষের সাথে বিয়ে দিতে আত্মসম্মানবোধ করবে, তা-ই হলো সন্দেহ করা যায় না—এমন বিষয়ে গাইরত। কেননা, আল্লাহ যা বৈধ করেছেন, তাতে গাইরত দেখাতে নেই। আর আল্লাহ যা অবৈধ করেছেন, তাতেই গাইরত দেখাতে হয়।
সেই হিসেবে বলতে হয়, আপনার বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করবেন অথবা আপনার বিধবা মা নতুন স্বামীর সঙ্গে সংসার করবেন কিংবা আপনার স্বামী দ্বীনি প্রয়োজনে চারিত্রিক পরিশুদ্ধি রক্ষার্থে দ্বিতীয়াকে ঘরে আনবেন, কিন্তু এতে আপনি ইগোর অজুহাত দিয়ে বাধ সাধলেন-এটা নিষিদ্ধ গাইরত। কারণ, আল্লাহ যা বৈধ করেছেন, সে ব্যাপারে আপনার নেতিবাচক মানসিকতা লালন করার কোনোই অধিকার নেই। শরিয়াহর কোনো বিধানের ব্যাপারে অন্তরে সামান্য অপছন্দনীয়তা থাকলেও ব্যক্তির ঈমান থাকবে না। ব্যাপারটা খুবই স্পর্শকাতর। বোঝা উচিত।
অনেকে আবার বিধবা বা ডিভোর্সি মেয়েকে বিয়ে করাকেও গাইরতের খেলাপ মনে করেন! তারা মনে করেন, আরেক বেটার শয্যাসঙ্গিনীকে আমি কেন বিয়ে করতে যাব?! আমার এক আত্মীয়ের একটা ঘটনা মনে পড়ল। তাকে তার মা তার মামাতো বোনকে বিয়ে করতে বলেছিলেন। ঘটনাচক্রে ওই মামাতো বোন ছিল ডিভোর্সি। তো বেচারা তার মাকে মুখের ওপর বলে দিলো, 'আরেক বেটার ছোঁয়া-ধরা বউকে আমি কেন বিয়ে করব; দুনিয়াতে কি মেয়েদের আকাল পড়েছে?!' ছেলের জবাবে মা আর কিছু বলার সাহস করেননি।
বিধবা কিংবা ডিভোর্সি নারীকে বিয়ে করা গাইরতের খেলাপ-ব্যাপারটা বোঝাতে গিয়ে অনেকেই আনসারি সাহাবি হজরত সাদ ইবনে উবাদাহ রা.-এর ঘটনা টেনে আনেন। তিনি কোনো বিধবা বা ডিভোর্সি নারীকে বিয়ে করেননি গাইরতের কারণে। বিষয়টা আমি এই বইয়ে আলোচনা করে এসেছি।
অতি গাইরতবান ওইসব ভাইদের বলতে হয়, সাদ ইবনে উবাদা রা.-এর এই গাইরত ছিল ইসলামের পূর্বে; আইয়ামে জাহিলিয়াতের সময়। ইসলামের পরেও তিনি এমন আজব গাইরত প্রদর্শন করেছেন-এমনটা কেউ প্রমাণ দেখাতে পারবেন না।
আর দেখালেও অসুবিধা কী; আল্লাহ তা আ'লার পর সৃষ্টির সবচেয়ে বড় গাইরতমন্দ ব্যক্তি ছিলেন পেয়ারা রাসুল। আম্মাজান আয়েশা রা. ছাড়া তাঁর সকল পত্নীই ছিলেন বিধবা কিংবা ডিভোর্সি। তাঁর প্রথম স্ত্রী আম্মাজান খাদিজা রা. ছিলেন বিধবা ও বয়স্কা। সাদ ইবনে উবাদা রা.-কে অতি গাইরতমন্দ বলতে হবে। তাঁর ব্যাপারটা ভিন্ন। ব্যতিক্রম কিছু লোক তো থাকেনই। আমাদের আদর্শ তো আল্লাহর রাসুল।
> ফাবাইলুল গাইরাহ আলান-নিসা: ১১৯, হাম্মাদাহ মুহাম্মাদ মুহাম্মাদ ইসমাইল।
ইসলাম সাপোর্ট করে এবং আল্লাহও পছন্দ করেন—এমন গাইরতের উদাহরণ বুঝতে হলে আমাদের বাপ-দাদাদের সময়ে ফিরে যেতে হবে। সে সময় এখনকার মতো এত বেহায়াপনা ও গাইরতহীনতা ছিল না। আমাদের বাপ-দাদাদের মধ্যে যথেষ্ট গাইরত ছিল। আমাদের মা ও দাদিরা কোথাও যেতে হলে অবশ্যই ঢিলেঢালা বোরকা পরতেন। মাথাটা পর্যন্ত সম্পূর্ণ জালি করা থাকত। চোখ দুটো পর্যন্ত দেখা যেত না। তো আগেকার সময়ে বিয়ে-শাদি হতো কাছাকাছি এলাকায়। রিক্সায়, টাঙ্গায়, নৌকায় বা গরুর গাড়িতে যাওয়া-আসার প্রচলন ছিল। তো আমাদের বাপ-দাদারা করতেন কী; আমাদের মা-দাদিদেরকে রিকশায় বা টাঙ্গায় কিংবা নৌকায় অথবা গরুর গাড়িতে বসিয়ে একটা শাড়ি কিংবা চাদর দিয়ে চারিদিক বেষ্টন করে আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে নিয়ে যেতেন। যাতে পরপুরুষ কোনোভাবেই দৃশ্যমান না হয়। আজ সেই গাইরত জানুঘরে ছাড়া পাওয়া অসম্ভব!
ইসলাম সাপোর্ট করে না এবং আল্লাহও পছন্দ করেন না—এমন অতি গাইরতের উদাহরণ হলো, আমাদের অঞ্চলে একজন মৌলভি ছিলেন। কাঁচা ঘর ছিল তার। খড়ের উপর খড়ের চালা ছিল। খড়ের চালা বছরে একবার পরিবর্তন করতে হয়। নইলে বৃষ্টিতে ভিজে পচে যায়। ওই মৌলভি সাহেব ছিলেন অতি গাইরতমন্দ। বছরান্তে একবার কামলা ডেকে আনতেন খড়ের চালা পাল্টানোর জন্যে। কামলা যখন ছাদের উপর উঠে নষ্ট খড়ের চালা আগে ফেলে দিত, তখন পুরো ঘর উদোম হয়ে যেত। এমতাবস্থায় মওলবি সাহেব তার বিবিকে নিয়ে পড়তেন বিপাকে। কামলা যাতে ছাদের বিবিকে দেখতে না পায়—এজন্য তিনি করতেন কী; বিবিকে ঘরের এক কোণে বসিয়ে একটা মোটা কাঁথা দিয়ে সারাটা দিন ঢেকে রাখতেন। বেচারিকে কাঁথার ভেতরেই গরমে দমবন্ধ অবস্থায় সারাটা দিন পাড়ি দিতে হতো!
মৌলভীর ওই আচরণ আসলে গাইরত না; ওটা অতি গাইরত। ইসলাম এমন গাইরত সাপোর্ট করে না। মৌলভি সাহেব চাইলে বিবিকে অন্য ঘরে বা বাড়িতেও পাঠিয়ে দিতে পারতেন। তবুও এত কষ্ট দিতে হতো না।
আবদুল্লাহ ইবনে শাদ্দাদ রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘গাইরত দুই প্রকার। একপ্রকার গাইরত যা পুরুষের পরিবার-পরিজনকে সংশোধন করে। আর আরেক প্রকার গাইরত হলো যা পুরুষকে জাহান্নামে প্রবেশ করিয়ে ছাড়ে।’
১ ইলালুল কুলুব: ২/৩৫৬, ইমাম খারাইতি।
টিকাঃ
১ রাওজাতুল মুহিস্পিন: ২৯৬, ইমাম ইবনু কাইয়িমিল জাওযিয়্যাহ; শুআবুল ইমান: ২/২৪৯, ইমাম বাইহাকি।
২. আদ-দুররুল মানসুর: ৫/৬৪৯, ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতি।
৩ ইতয়াউ উলুমিদ্দিন: ২/৪৬, ইমাম গাজালি।
১ ফিকহুস সুন্নাহ: ২/১৮৭, শাইখ সাইয়িদ সাবিক।
২ সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৬৫৯; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২৩৭৪৭; সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ২৫৫৮। হাদিসটি হাসান।
৩ নাইলুল আওতার : ৭/২৮৬, ইমাম শাওকানি।
📄 গাইরতের বদহজম হওয়া ঠিক না
অতি গাইরতকে অন্য শব্দে 'গাইরতের বদহজম' বলা যায়। সত্য কথা বলতে কী; অনেক মানুষের গাইরতের আবার বদহজম হয়ে থাকে। এ ব্যাপারে একটা গল্প না বললেই নয়! গল্পটা একজন হুজুরের। লিখেছেন আরেকজন। ফেসবুকে এটা নিয়ে অনেক হাস্যরস হয়েছিল। ধার করা হলেও গল্পটা কিন্তু শিক্ষণীয়।
“সেদিন এক আলেমের বাসায় দাওয়াত খেলাম। নতুন বিয়ে করেছেন তিনি। স্ত্রীকে নিয়েই তার এখন সংসার। আমি যাচ্ছি আগেই জানিয়েছিলাম। সেজন্যে মেহমানদারি করতে হবে। সেসব কথা ভেবেই তিনি নিজেই রান্না করেছেন। ভালোই রান্না করেন মাওলানা সাহেব। মাশাআল্লাহ।
আমাকে খাওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে জিজ্ঞেস করলেন- 'খাবার কেমন হয়েছে? আপনি তো আমার রান্না এর আগেও একবার খেয়েছেন। আমার রান্না চিনেন খুব ভালো করে।' বললাম-'রান্না ভালো হয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ।'
আমাকে বলতে লাগলেন তখনই, 'আসলে ভাই কী না কী ভাবেন; আমি আমার স্ত্রীর রান্না কাউকে খাওয়াতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি না। আমার বউয়ের রান্না খেয়ে কেউ বলবে-ভাই আপনার বউয়ের রান্নাটা সেই! অনেক মজা হয়েছে। এই সেই। তারপর আমার বউ নিয়ে কিছু আলাপ, গুণকীর্তন। এসব কিছুই আমার ভালো লাগে না। লাগবেও না। এইজন্য আমি নিজেই রান্না করে আমার বন্ধু-বান্ধবদের খাওয়াই। তাই আপনার জন্য আমিই রান্না করেছি। বলতে পারেন এটা আমার গাইরত।'
তখন তাঁকে বললাম, 'এক মহিয়সীর গল্প পড়েছিলাম এমন একটা। তিনি তাঁর বুজুর্গ স্বামীর বন্ধুদের রান্না করে খাওয়াতেন না। এই ভেবে যে, তাঁরা তাঁকে নিয়ে আলোচনা করবে। আর এটা তাঁর ভালো লাগবে না। কারণ অন্য পুরুষরা কেন আমায় নিয়ে আলোচনা করবে?'
তিনি তৎক্ষণাৎ বলে উঠলেন, ‘সেই গল্পটা পড়েই আমি রান্না-বান্না শিখি এবং এই ইচ্ছা অন্তরে পোষণ করি।’ সুবহানআল্লাহ। একটা ছোট্ট গল্প বাস্তব জীবনে কতটা প্রভাব ফেলেছে। সেটাই আমি ভাবছি।”
গল্পটা যে ভাই লিখেছেন, তিনি ওই হুজুরের আসলে খুব প্রশংসা করেছেন। এটা তার সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত অনুভূতি। হ্যাঁ, এটা ওই হুজুরের গাইরত; তবে অতি গাইরত। ইসলামে এমন গাইরত নিষিদ্ধ। আল্লাহর রাসুল -এর সাহাবিরা ছিলেন উম্মাহর সবচেয়ে গাইরতমন্দ ব্যক্তি। তাঁদের স্ত্রীরাও রান্না করতেন। আবার তাঁরাও তাঁদের অন্যান্য সাহাবি ভাইদের দাওয়াত করে নিয়ে স্ত্রীর হাতের রান্না খাওয়াতেন। কোথায়, তাদের গাইরতে দেখি বাধা দিলো না! সিরাত ও ইতিহাসে এ রকম ভুরি ভুরি ঘটনা আছে। এখানে শুধুমাত্র একটি উল্লেখ করছি।
খন্দকের যুদ্ধকালে আল্লাহর রাসুল ও সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন ক্ষুধার্ত। তিনদিন পর্যন্ত কারও কিছু খাওয়া হয়নি। রাসুলুল্লাহ ﷺ পেটে পাথর বেঁধে রেখেছিলেন। আরও অনেক সাহাবির পেটে পাথর বাঁধা ছিল। জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা. নবিজি -এর ক্ষুধার্ত অবস্থা সইতে পারছিলেন না। একটা কিছু ব্যবস্থা করার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। অনুমতি নিয়ে বাড়িতে গেলেন।
বাড়িতে এসে সহধর্মিণীকে বললেন, নবিজির ক্ষুধা দেখে আমার সহ্য হয়নি; খাবার কিছু আছে? বাড়িতে কিছু যব ও একটি বকরির বাচ্চা ছিল। জাবিরের স্ত্রী সেই যব বের করলেন। আর জাবির রা. বকরির বাচ্চাটা জবাই করলেন। তাঁর স্ত্রী যব পিষে রুটির জন্য খামির বানাতে লাগলেন আর জাবির বকরির বাচ্চাটার গোশত কেটে পাতিলে দিয়ে নবি ﷺ-এর কাছে চলে এলেন।
খাবার খুব কম থাকায় জাবির চাচ্ছিলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ একাই যান। তাঁর স্ত্রীও সতর্ক করে দিয়েছিলেন যাতে বেশি লোক নিয়ে না আসেন। স্বামী ঘর থেকে বের হওয়ার সময় সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, ‘দেখুন, রাসুলুল্লাহ ﷺ ও তাঁর সঙ্গীদের কাছে আমাকে যেন বেইজ্জত না করেন। অর্থাৎ আমাদের খাবার তো খুব কম। যদি বেশি লোক নিয়ে আসেন, আমরা তাদের তৃপ্তিভরে খাওয়াতে পারব না। সেটা আমাদের জন্য বড় লজ্জার কারণ হবে। তাই বুঝেশুনে মেহমান আনবেন।
জাবির রা. খন্দকের কাছে এসে বললেন, ‘আমার সামান্য কিছু খাবার আছে। হে আল্লাহর রাসুল, আপনি উঠুন এবং আপনার সঙ্গে দুই একজন লোকও নিয়ে আসুন।
কোনো বর্ণনায় আছে যে, তিনি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কানে কানে খাদ্যের পরিমাণ উল্লেখ করেছিলেন যে, তা একটি বকরির বাচ্চা ও এক সা পরিমাণ যব। কিন্তু নবিজি সেই সামান্য খাবার সবাই মিলে খেতে চাইলেন। তাই আনসার ও মুহাজির যারাই খন্দক খননের কাজে নিয়োজিত ছিলেন, সবাইকেই সঙ্গে যাওয়ার জন্য বললেন।
নবিজি সবাইকে ডেকে বললেন, 'হে পরিখা খননকারীগণ। জাবির তোমাদের জন্য ভোজের আয়োজন করেছে। তোমরা দ্রুত চলো।' তিনি তো সম্পূর্ণরূপে তাওয়াক্কুল করে অভ্যস্ত। বিশ্বাস ছিল আল্লাহ তা'আলার ওপর যথাযথ ভরসা করে খেলে এই সামান্য খাবারই সকলের জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবে। সেইসঙ্গে তিনি জাবির রা.-কেও এই বলে আশ্বস্ত করলেন যে, তুমি যাকে অল্প বলছো, প্রকৃতপক্ষে তা প্রচুর ও উত্তম খাবার।
শুধু তাই নয়; নবিজি খাদ্যে বরকত হওয়ার লক্ষ্যে জাবির রা.-কে বললেন, 'তুমি তোমার স্ত্রীকে বলো-আমি না আসা পর্যন্ত যেন চুলা থেকে হাঁড়ি ও রুটি না নামায়।' তারপর তিনি আনসার ও মুহাজিরদের নিয়ে জাবির রা.-এর বাড়িতে গিয়ে পৌঁছলেন। এত লোক দেখে জাবিরের স্ত্রীর চক্ষু তো চড়কগাছ! তিনি ভড়কে গেলেন। স্বামীকে নানা কথা বলে তিরস্কার করলেন।
এক বর্ণনায় আছে, জাবির রা. নিজেও খুব পেরেশান হয়ে পড়েছিলেন। তিনি বলেন, 'এতসংখ্যক লোক আসায় আমি যে কী পরিমাণ লজ্জাবোধ করছিলাম, তা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। মনে মনে বললাম, মাত্র এক সা যব ও একটি ছাগলছানা, অথচ মেহমান এত লোক! এখন কী হবে?'
তাঁর স্ত্রী ছিলেন খুবই বুদ্ধিমতী। তিনি যখন জানতে পারলেন যে, নবিজিকে সবই জানানো হয়েছে, তখন তিনি আশ্বস্ত হয়ে গেলেন যে, তিনি জেনেশুনেই যখন এত লোক নিয়ে এসেছেন, তখন নিশ্চয়ই এর মধ্যে কোনো হিকমত আছে। পেরেশানির কোনো কারণ নেই। হয়তো তাঁর উপস্থিতির বরকতে এ সামান্য খাবারেই সকলের প্রয়োজন মিটে যাবে।
বাড়িতে পৌঁছে নবিজি ﷺ প্রথমে আটার খামিরায় ও গোশতের হাঁড়িতে খানিকটা থুতু দিলেন। সঙ্গে বরকতের জন্য দুআ করলেন। সেইসঙ্গে রুটি তৈরি করতে পারে এমন কোনো প্রতিবেশী মহিলাকে ডেকে আনার হুকুম করলেন।
নবিজির মুখের থুতু অন্যদের মতো নয়। তাঁর শরীরের ঘামেও তো ছিল মিশকের চেয়েও বেশি সুরভি। সুতরাং পবিত্র মুখের থুথুতে অমৃতের আস্বাদ ও প্রাণকাড়া সুরভি তো থাকবেই। তাই খাবারে থুতু দেওয়াতে খাবারের অমর্যাদা হয়নি; বরং তা স্বতন্ত্র মহিমা লাভ করেছে। পবিত্র মুখের সে থুতুর সঙ্গে ছিল দুআর মিলন। নুরুন আলা নুর। বরকত তখনই শুরু হয়ে গিয়েছিল। আটার খামিরা যদিও সামান্য, কিন্তু সে বরকতের কারণে রুটি তৈরিতে সাহায্যকারীর প্রয়োজন পড়েছিল।
সুতরাং রুটি তৈরি হতে থাকল। নবিজি নিজে তা বিতরণের দায়িত্ব নিলেন। তিনি রুটি টুকরো টুকরো করে তার উপর গোশত রাখতে থাকলেন। প্রত্যেকবার তা নেওয়ার পর হাঁড়ি ও চুলা ঢেকে রাখছিলেন আর তা সাহাবিদের দিকে এগিয়ে দিচ্ছিলেন। এভাবেই জাবির ও তাঁর স্ত্রীর রান্না করা খাবার খেয়ে সকলে পরিতৃপ্ত হয়ে গেলেন। তারপরও কিছু অবশিষ্ট থাকল। মানে আটার খামিরা ও হাঁড়ির গোশত আগে যেমন ছিল তেমনিই রয়ে গেল।
নবিজি জাবির রা.-এর স্ত্রীকে বললেন, 'তুমি এটি খাও এবং হাদিয়া দাও। মানুষ বড় ক্ষুধার্ত।' এক বর্ণনায় আছে, জাবির রা. বলেন, 'আমরা সারাটা দিন সেই খাবার নিজেরাও খেয়েছিলাম এবং মানুষের মধ্যেও বিতরণ করছিলাম।'১
টিকাঃ
১ সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪১০১।