📄 সুলতান নুরুদ্দিন জেনগির গাইরত
সিরিয়ার শাসক ছিলেন সুলতান নুরুদ্দিন জেনগি (১১৪৬-১১৭৪ খ্রি.)। অবশ্য তিনি সেলজুকদের অধীনস্থ ছিলেন। আইয়ুবি পরিবার তখন সুলতান নুরুদ্দিন জেনগির অধীন ছিল। সালাহুদ্দিন আইয়ুবির চাচা আসাদুদ্দিন শেরেকুহ ছিলেন সুলতানের খুব ঘনিষ্ঠ।
সে সময় মিসরকে কেন্দ্র করে মুসলিম বিশ্বের একাংশ শিয়াদের ফাতেমি খিলাফত শাসন করত। তখন শেষ ফাতেমি খলিফা আজিদ লি-দীনিল্লাহ (১১৬০-১১৭১ খ্রি.) ছিলেন মসনদে সমাসীন। অবশ্য তার হাতে কোনো ক্ষমতা ছিল না। সব ক্ষমতা ছিল তার দুর্মতি উজিরে আজম শাওয়ারের হাতে।
ফাতেমি খিলাফত কুক্ষিগত করার জন্য গাদ্দার শাওয়ার বারবার ক্রুসেডারদের সাথে হাত মেলাত। আর খিলাফতকে রক্ষার জন্য খলিফা আজিদ লি-দীনিল্লাহ বারবার সুলতান নুরুদ্দিন জেনগির সহায়তা চাইতেন। সুলতানও আসাদুদ্দিন শেরেকুহকে সেনাপতি বানিয়ে সাহায্য করতেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ক্রুসেডারদের সাথে শেরেকুহর চুক্তিও হয়।
১১৬৮ খ্রিষ্টাব্দে চুক্তি ভঙ্গ করে জেরুজালেমের খ্রিষ্টান সম্রাট আমালরিক ক্রুসেডারদেরকে নিয়ে তৃতীয়বারের মতো মিশরে হানা দেন। তারা পাইকারি হারে হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে। মিশরের অলিগলিতে রক্তের বন্যা বয়ে যায়। তারা ধ্বংস করতে লাগে সবকিছু। তখন পুরো মিশরে কান্নার রোল ওঠে। জান বাঁচানোর ফরিয়াদে ভারি হয়ে উঠে মিশরের আকাশ-বাতাস। ক্রুসেডার সৈন্যদের হাতে ভূলুণ্ঠিত হতে থাকে মিসরীয় নারীদের ইজ্জত-আক্র। ফাতেমি খিলাফতের নড়বড়ে মসনদে সমাসীন খলিফা আজিদ লি-দীনিল্লাহ ভয়ে কুঁকড়ে ওঠেন।
খলিফা আজিদ সি-দীনিল্লাহ গোপন সূত্রে জানতে পারলেন— তাঁর বিশ্বাসঘাতক উজির শাওয়ার ক্রুসেডারদের প্রতিহত করা তো দূরের কথা; উল্টো তাদের সাথে সমঝোতা করার জন্য পত্র চালাচালি করছেন! মিশরের ভবিষ্যৎ তখন সম্পূর্ণ হুমকির মুখে। খলিফার উদ্বিগ্নতা দ্বিগুণ হতে থাকে।
এমন বিপজ্জনক মুহূর্তে বরাবরের মতো এবারেও তিনি সিরিয়ার সুলতান নুরুদ্দিন জেজির সাহায্য পাওয়ার গরজ অনুভব করলেন। এই মুহূর্তে শেরেকুহ ছাড়া বিকল্প কেউ নেই। কিন্তু আর কত সাহায্য চাইবেন! বারবার সাহায্য চাইতে তিনি কেমন যেন জড়তাবোধ করছিলেন।
পুরো মিশরের মতো ফাতেমি রাজপরিবারের হেরেমেও কান্নার রোল পড়ে যায়। সম্রাজ্ঞী, জেনানা ও শাহজাদিরা খিলাফত হারানোর ভয়ের চেয়ে, নিজেদের সম্ভ্রম হারানোর ভয়ে বেশি কাঁদতে শুরু করলেন। তারা তো চোখের সামনেই তাদের খলিফার দুর্বলতা ও অপরাগতা প্রত্যক্ষ করছিলেন। তারা বুঝতে পেরেছিলেন, আমালরিককে প্রতিহত না করলে, তাঁদের রাজ্য ও সম্ভ্রম—উভয়টা হারিয়ে জিল্লতির জিন্দেগি অতিবাহিত করতে হবে।
ফাতেমি হেরেমের নারীরা বুঝতে পারলেন—আমালরিকের মোকাবিলা করতে হলে সিরিয়ার জেনগি সিপাহসালার শেরেকুহর বিকল্প নেই। এমন ভাবনা থেকেই তারা খলিফাকে শেরেকুহর সাহায্য চেয়ে সুলতান নুরুদ্দিনের কাছে আবারও পত্র লিখতে অনুরোধ করলেন।
খলিফাও এ রকম চিন্তাভাবনা করছিলেন। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে বিলম্বিত হচ্ছিল তাঁর ভাবনা। এখন হেরেমের সম্রাজ্ঞী ও শাহজাদিদের অনুভূতি জানতে পেরে যেন একটা উসিলা খুঁজে পেলেন। কারণ, তিনি জানতেন—সুলতান নুরুদ্দিন তাঁর হেরেমের অসহায় নারীদের অনুভূতিকে কখনো অবমূল্যায়ন করতে পারবেন না। সুলতান নারীদের ব্যাপারে খুবই গাইরতমন্দ।
খলিফা আজিদ লি-দীনিল্লাহ ঝটপট পত্র লিখতে বসলেন। মিশরে ক্রুসেডার সম্রাট আমালরিকের রক্তপাত এবং ফাতেমি হেরেমের নারীদের সম্ভ্রমহানির আশঙ্কা ও কান্নার কথা উল্লেখপূর্বক শেরেকুহকে প্রেরণ করে সাহায্য চেয়ে সুলতান নুরুদ্দিন জেনগি বরাবর একটি পত্র লিখলেন। পত্রের শেষে তিনি লিখে দিলেন— “এটাই হলো আমার হেরেমের নারীদের একান্ত অনুভূতি। তারা আপনার কাছে ফরিয়াদ করছে, আপনি যেন সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়ে তাদেরকে উদ্ধার করেন।”
যথাসময়ে পত্র হস্তগত হয় সুলতান নুরুদ্দিন জেনগির। তিনি আদ্যোপান্ত চিঠিটা পড়লেন। পড়তে পড়তে চিঠির শেষাংশে ফাতেমি হেরেমের অসহায় নারীদের অনুভূতির ওপর তার চোখ দুটো আটকে গেল। এই অনুভূতির কথা তিনি শুধু চর্মচক্ষু দিয়েই পড়েননি; অন্তর্চক্ষু দিয়েও পড়লেন। ফাতিমিরা উবাইদি শিয়া কাফের। এরা গাইরত আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর শত্রু। দুশমনিতে ক্রুসেডারদের চেয়ে মোটেও এরা কম যায়নি। কিন্তু এখন সেইসব ভাববার সময় নয়।
ফাতেমি হেরেমের নারীদের অসহায়ত্ব গাইরত সম্পন্ন খলিফাকে একেবারে কুপোকাত করে ফেলল। শিয়া খলিফা আজিদ লি-দীনিল্লাহর অনুরোধ হয়তো ফিরিয়ে দেওয়া যায়; কিন্তু হেরেমের অসহায় নারীদের ফরিয়াদ তো আর ফিরিয়ে দেওয়া যায় না। অসহায় নারীদের ইজ্জত বাঁচানোর ডাকে তো অবশ্যই 'লাব্বাইক' বলতে হয়। এরচেয়ে বেশিকিছু চিন্তা না করে পত্রটি ভাঁজ করেই তিনি মিশরে সেনাভিযান পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত পাকাপোক্ত করে ফেলেন। এবারেও ডাক পড়ল সেনাপ্রধান শেরেকুহর।
শেরেকুহর নেতৃত্বে তৃতীয়বারের মতো জেনগি বাহিনী মিশর অভিমুখে রওনা হয়। শেরেকুহ মিশরের মাটিতে পা রাখতেই শাওয়ার আবারও রঙ বদলান। আমালরিকের সাথে মিত্রতা বদল করে শেরেকুহর সাথে স্থাপন করেন। শেরেকুহ ও শাওয়ার উভয়ে একত্রে ক্রুসেডারদের মিশরের বাইরে পাঠাতে লড়াই শুরু করেন।
শেরেকুহ ও শাওয়ারের যৌথ হামলার মুখে টিকতে না পেরে, আমালরিক ক্রুসেডার বাহিনী নিয়ে পিছু হটতে হটতে অবশেষে মিশর ত্যাগ করে। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে মিশর ক্রুসেডারদের নাপাক পদচারণা থেকে মুক্তি পায়। রাজনৈতিক স্বার্থে শাওয়ার শেরেকুহর সঙ্গে হাত মিলালেও গাদ্দারি করতে যে মোটেও বিলম্ব করবেন না-এটা শেরেকুহ জানতেন। তাই শাওয়ারকে হত্যা করে তার পাওনা মিটিয়ে দেন শেরেকুহ। কিছুদিন পর খলিফা আজিদ লি-দীনিল্লাহ মারা যান। মিশরে ফাতেমি খিলাফতের অবসান হয়। এবং সেখান থেকেই আইয়ুবি শাসনের সূচনা। ১
উল্লেখ্য, মুসলিম উম্মাহর শাসকদের গাইরতের ঝলক শুধু এটুকুই নয়; আরও আছে। লিখতে গেলে ঢাউস সাইজের একটি বইয়ের দরকার। আমার প্রকাশিতব্য 'একটি বোনের ডাক শোনে' বইয়ে বিস্তারিত আলাপ করেছি। এখানে সংক্ষেপে শুধুমাত্র কয়েকজন শাসকের গাইরতের নমুনা উল্লেখ করাই উদ্দেশ্য ছিল।
টিকাঃ
১ তারিখুল ইসলাম ওয়া ওয়াফায়াতুল মাশাহির ওয়াল আলাম : ১/২২৭, শামসুদ্দিন যাহাবি; আন-নুজুমুয যাহিরাহ ফি মুলুকিল মিসর ওয়াল কাহিরাহ : ৭/২১১, ইবনে তাগরি বারদি; মুফাররিজুল কুরুব ওয়া মুফাররিহুল কুলুব: ১/১৪৮, ইউসুফ বিন ইসমাইল নাবহানি।
📄 মুমিন তো গাইরতমান্দ হয়ে থাকে
আগেই বলে এসেছি, আল্লাহর গাইরত সবচেয়ে বেশি। এরপর রাসুলের। এরপর তাঁর সাহাবিদের। এরপর উম্মাহর মুমিনদের। মুমিনের মাঝে অবশ্যই গাইরাত থাকতে হবে। যে মুমিনের মধ্যে গাইরত নেই, সে মুমিন; তবে পরিপূর্ণ মুমিন নয়। গাইরতের সম্পর্কটা ঈমানের সাথে। ইসলামের সাথে। এরপর ব্যক্তিগত মান-ইজ্জতের সাথে। মুমিনের যে গাইরত থাকতে হয়, এটা স্বয়ং নবি কারিম ﷺ বলে গেছেন। হাদিসে এসেছে—
عن أبي هريرة رضي الله عنه، قال : قال رسول الله : إن الله يغار، وإن المؤمن يغار.
আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন, 'নিশ্চয় আল্লাহ তা আ'লার গাইরত আছে। নিশ্চয় মুমিনেরও গাইরত হয়ে থাকে।’১
অন্য হাদিসে নবিজি ﷺ মুমিনের গাইরতের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে দুই বা তিনবার উল্লেখ করেছেন। হাদিসটা হলো—
عن أبي هريرة أن رسول الله ﷺ قال : المؤمن المؤمن مرتين أو ثلاثا يغار يغار والله أشد غيرا.
আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল ﷺ বলেছেন, 'নিশ্চয় মুমিন গাইরতওয়ালা হবে, নিশ্চয় মুমিন গাইরতওয়ালা হবে, নিশ্চয় মুমিন গাইরতওয়ালা হবে।' চতুর্থবারে বলেছেন, 'আল্লাহ সবচেয়ে বেশি গাইরতবান।'২
একজন মুমিনের জীবনে গাইরতের গুরুত্ব এতটাই বেশি যে, ইমাম বুখারি রহ. পর্যন্ত 'বাবুল গাইরাহ' নামে আলাদা এক পরিচ্ছেদই রচনা করেছেন সহিহ বুখারি শরিফে।
উক্ত পরিচ্ছেদটি এনেছেন 'কিতাবুন নিকাহ' তথা বিবাহ অধ্যায়ের অধীনে। বোঝাতে চেয়েছেন-গাইরতের সম্পর্কটা বিবাহের সাথে; বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ স্বামী-স্ত্রীর মাঝে গাইরত থাকতে হয়।
আমার তো মনে হয়, বিবাহের সাথে গাইরতের শুধু সম্পর্কই নয়; গাইরত হলো বৈবাহিক জীবনের রূহ বা আত্মা। রূহ ছাড়া যেভাবে কোনো প্রাণী বাঁচতে পারে না, গাইরত ছাড়াও কোনো দাম্পত্যজীবন সুখের হতে পারে না। স্ত্রী যদি পরপুরুষের সাথে ভাব জমায় কিংবা স্বামী যদি পরনারীর সাথে ভাব জমায়, এমতাবস্থায় কারও যদি গাইরত জেগে না ওঠে, তাহলে তো বৈবাহিক জীবনের সুখ লাইফ সাপোর্টে!
মনে রাখতে হবে, পুরুষের গাইরত শুধুমাত্র তার স্ত্রীর ক্ষেত্রেই জড়িত নয়; বরং তার মা, বোন, কন্যা, নাতনি, ভাতিজি, ভাগ্নি, ফুফু, খালা, চাচি, দাদি, নানি; এক কথায় তার রক্তের সম্পর্কীয় সকল নারীলোকের সাথেই জড়িত। এদের কারও সাথেই নন-মাহরাম কারও সামান্যতম সংস্পর্শও কোনো পুরুষের গাইরত মেনে নেওয়ার কথা নয়।
আমাদের আলোচ্য গাইরত দ্বারা এটাই উদ্দেশ্য। অবশ্য গাইরত বলতে সাধারণত স্বামী-স্ত্রীর সাথে জড়িতটাই বোঝায়, তাই আমাদের লেখনীর বেশিরভাগই সেটাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে।
এই গাইরতই একজন পুরুষের কাছে ইসলামের আকাঙ্ক্ষিত চাহিদা। কিন্তু আফসোসের ব্যাপার, এখানে শুধু ঘাটতিই নয়; চরম সীমার খেয়ানতের পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে মুসলিম কমিউনিটির পুরুষেরা। শুধুমাত্র কিছু মজবুত দ্বীনদার লোক ছাড়া সমাজের বেশিরভাগ পুরুষ এই জায়গায় আটকা। এমনকি বহু লেবাসধারী দ্বীনদার পুরুষও জানেই না-দ্বীনের সাথে গাইরতের সম্পর্ক কতটুকু?
দেশের নামি-দামি এক অভিনেত্রীর একমাত্র অভিভাবক হলেন তার নানা। বেচারার মুখের দাড়ি, মাথার টুপি আর গায়ের পাঞ্জাবি দেখলে মনে হয়, যেন ফেরেশতা চরিত্রের এক বুজুর্গ। কিন্তু নাতনিকে সেই তিনিই মিডিয়ায় আসতে উৎসাহ যুগিয়েছেন! এমনকি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অর্ধ উলঙ্গ নাতনির সাথে তিনিও নাচানাচি করেছেন!
ইসলামি ফাউন্ডেশনের একজন সাবেক ডিজিকে দেখলে মনে হতো, কুরআন-কিতাব পড়ুয়া আলেম। বেশভূষায় রীতিমতো দরবেশ মনে হতো। কিন্তু তার বেপর্দা-বেলাজ মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে নাচন-কোঁদনের আয়োজন করলেন তিনিই এবং বসে থেকে উপভোগও করলেন! এই হলো লেবাসধারীদের দ্বীনের হালত!
অনেক মসজিদের সভাপতি কিংবা সেক্রেটারির স্ত্রী-কন্যাদের অবস্থা বড়োই করুণ হয়। মসজিদের উন্নতির জন্য তাদের চিন্তার শেষ নেই। ওদিকে ফ্যামিলিতে স্ত্রী ও কন্যাদের দ্বীনি উন্নতির ন্যূনতম কোনো চিন্তাই নেই! ওয়াড্রোব থেকে ইস্ত্রি করা পাজামা আর পাঞ্জাবিটা পরে আতর লাগিয়ে তারা যখন জুমা পড়তে মসজিদে আসেন, তখন স্ত্রী সাজুগুজু করে মার্কেট করতে বেরিয়ে যায়! আর মেয়ে বয়ফ্রেন্ডের সাথে কোনো পার্কে মিট করার জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকে!
একজন মুমিন পুরুষ কীভাবে এটা সহ্য করতে পারে—তার স্ত্রী, বা কন্যা, অথবা বোন সাজুগুজু করে বেপর্দা হয়ে মার্কেটে যাবে, পার্কে বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে অন্তরঙ্গ মুহূর্ত কাটাবে, ট্যুরের নাম করে অন্য পুরুষের সাথে ঘুরতে বেরিয়ে পড়বে, ছেলে বন্ধুদের সাথে চিল করবে, নানা ইভেন্টে অংশ নেবে, অর্ধনগ্ন হয়ে নাগিনি ড্যান্সের সাথে হলি উদযাপন করবে! আবার এসব কিছুর ভিডিও ধারণ করে অনলাইনে শেয়ার করবে!
গাইরতহীনতা অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে যে, সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিউয়ের মাধ্যমে সামান্য কয়টা টাকা কামানোর ধান্দায় বহু পুরুষ তার বউকে রীতিমতো 'অনলাইন ব্যাভিচারিণী' বানিয়ে ছাড়ছে! এটাকে তারা নাম দিয়েছে—'কাপল ব্লগ'! আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, সোশ্যাল মিডিয়ায় এই কাপল ব্লগ আবার বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে! শিক্ষিত এলিট শ্রেণি থেকে নিয়ে অশিক্ষিত টোকাইরাও এখন কাপল ব্লগ বানায়! টোকাইদের কাপল ব্লগে গিয়ে আবার শিক্ষিত শ্রেণি ভালো লাগার কমেন্টও করে!
স্বামী-স্ত্রী বেডরুমে একান্তভাবে যা করে, গাইরতহীন কাপল ব্লগাররা সোশ্যাল মিডিয়ায় তা-ই করে! অত্যন্ত নোংরাভাবে স্ত্রীকে ধরে টানাটানি, জড়াজড়ি, মারামারি, ইয়ার্কি, চুমাচুমি—সবই করে তারা। এসব করতে গিয়ে অনেক সময় স্ত্রীকে একবার ওল্টায়, তো আরেকবার পাল্টায়! মিডিয়ায় আবার সেই দৃশ্য দেখে সারা দুনিয়ার লাখো-কোটি মানুষ। নিজের স্ত্রীকে উল্টিয়ে-পাল্টিয়ে উঁচুনিচু অঙ্গগুলো দেখাচ্ছে সারা দুনিয়াবাসীকে—এর চেয়ে গাইরতহীন পুরুষ আর কেউ হতে পারে?!
সেই ভিডিওর কমেন্টবক্সে আবার অনেক অসভ্য লোক মন্তব্য করছে—ওয়াও.. সেক্সি.. আরও কত কী যা ভাষায় প্রকাশ করার মত না! কাপল ব্লগার স্বামী আবার সেগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ছে। তবুও তার গাইরতে একটুও আঘাত হানছে না! ছিঃ! এমন পুরুষ তো স্বামী হওয়ার যোগ্যতাই রাখে না! এমন স্বামীর স্ত্রীও গাইরতহীন। স্ত্রীর অভিভাবকরাও গাইরতহীন। তাদের মেয়েকে নিয়ে জামাইয়ের এমন অসভ্যতা দেখেও তারা মেয়েকে এই জামাইয়ের কাছে রাখে কী করে!
আফসোস! ইমানের গাইরত কতটা তলানিতে গেলে একজন মুমিন অভিভাবক এসব দেখেও না দেখার ভান করে! লাইফের এঞ্জয় মনে করে! আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে—মনে করে! এদের অবস্থাদৃষ্টে তো মনে হয়, স্ত্রী ও কন্যা যদি বেডরুমে পরপুরুষকে নিয়েও আসে, তবুও তাদের কোনো ভাবান্তর হবে না! নবিজির সাহাবি যেখানে এক কোপে কল্লা ফেলে দিতে চেয়েছেন, তারা সেখানে নির্বিকার! ধিক ওইসব পুরুষদের!
তবে কথায় আছে, ‘মেঘ দেখে তুই করিসনে ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে’। মুসলিম সমাজের এতসব দ্বীনহীন ও গাইরতহীন পুরুষের ভিড়েও আল্লাহর এমনকিছু বান্দা আজও বেঁচে আছেন, যাদের গাইরত দেখলে অবাক লাগে।
আমার এক উস্তাদের মুখ থেকে শুনেছি। লোকটা মুসল্লি ছিলেন। একসময় সপরিবারে আমেরিকা প্রবাসী ছিলেন। এখন পরিবার সেখানে রেখে, মার্কিন নাগরিকত্ব ক্যানসেল করে দেশে স্থায়ী হয়েছেন। এখানে আরেকটি বিয়ে করে দ্বিতীয় সংসারে বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে সুখেই দিনাতিপাত করছেন। তাকে দেখলে মনে হয় না, আমেরিকায় যে তার আরেক সংসার আছে!
উস্তাদ একদিন লোকটিকে জিজ্ঞেস করলেন, আমেরিকায় সবকিছু ফেলে রেখে দেশে এসে কেন থিতু হলেন? জবাবে লোকটা যা বলেছিলেন, তা আমেরিকার গ্রিনকার্ডের স্বপ্নচারী যেকোনো মুমিনের জন্য ভাবনার বিষয়। লোকটি বললেন—বউ পরকীয়ায় জড়িত; অফিসের কলিগদের সাথে নিয়মিত লং ড্রাইভে যায়। মেয়ে নাইটক্লাবে নাচানাচি করে বয়ফ্রেন্ডের সাথে মদ খেয়ে সেখানেই বুঁদ হয়ে পড়ে থাকে। আর ছেলে তার বেডরুমে গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে ঘুমায়!
অনেক চেষ্টা করেও এদেরকে দ্বীনে আনতে পারেননি তিনি। নিজের ভুল নিজেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন বলে সময় থাকতে থাকতেই ওদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে দেশে এসে আরেক সংসার শুরু করেছেন। যাতে এই সন্তানগুলো মরলে পরে তার নাজাতের উসিলা হয়। কিন্তু ভয়ে আছেন, তার যে বয়স; তাতে এই বাচ্চাগুলোকে দ্বীন শিখিয়ে মানুষ করে যেতে পারবেন কিনা!
টিকাঃ
১ সহিহ বুখারি : ৫২২৩; সহিহ মুসলিম: ২৭৬১।
২ সহিহ মুসলিম: ২৭৬১; মুসনাদে আহমাদ: ৭৯৩৪।
📄 সোশ্যাল মিডিয়ায় বেগাইরতির রকমফের
ইন্টারনেট প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশাল বড় দুনিয়াটা হাতের মুঠোয় চলে আসাতে মানুষ অনেক কিছুই পেয়েছে ঠিক; তবে হারিয়েছেও অনেক কিছু। সময় অপচয় ছাড়াও মানুষ সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটা হারিয়েছে তা হলো হায়া ও গাইরত৷ দেখা গেছে, ইন্টারনেটের এই সহজলভ্যতা না থাকলে অনেক মানুষেরই বেহায়ামি ও গাইরতহীনতার বহিঃপ্রকাশ ঘটত না।
যাদের দ্বীন নিয়ে কোনো চিন্তা নেই, তাদের আবার গাইরতহীনতার কী আছে? ব্যাঙের আবার শীত কীসের! পুরোটা সোশ্যালমিডিয়ায়ই তো দ্বীনহীন নট-নটিদের ফষ্টিনষ্টির ছড়াছড়ি। তাদের নিয়ে কথা বলে লাভ নেই। আমাদের কথা দ্বীনদার যারা সোশ্যাল মিডিয়ায় জেনে হোক বা না জেনে গাইরতহীনতা প্রদর্শন করছেন, তাদের নিয়ে।
আজকাল ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্বীনের বেশে গাইরতহীনতার মহাপ্রদর্শন দেখা যায়। অনেক দ্বীনদার ভাই ও বোন জুব্বা ও বোরকা পরে দ্বীনি কাপল ব্লগ করে যাচ্ছেন! আমেরিকার হাসনাত আবদুল্লাহ ও উন্মে আবদুল্লাহর দ্বীনি লেবাসে ফষ্টিনষ্টি দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে অনেকেই এই খাতায় নিজেদের নাম লিখিয়েছেন!
অনেক দ্বীনদার ভাই পাঞ্জাবি-জুব্বা পরে তাদের আপাদমস্তক ঢাকা আহলিয়ার সাথে বিমান থেকে নিয়ে রিক্সায়, রেস্টুরেন্টে, পার্কে, পর্যটনকেন্দ্রে বসে ছবি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করছেন। কেউ কেউ দুজনের বাচ্চাকে হাত ধরাধরি করে স্কুলে বা মাদরাসায় নিয়ে যাওয়ার পিকচারও আপলোড করছেন! কেউ তো বিয়ের দিনের ছবিও শেয়ার করছেন!
বিয়ের স্মৃতি শেয়ার করতে অনেকেই আবেগের কাছে পরাজিত হয়ে যান। দেখা গেছে, অনেক দ্বীনদার ভাই-বোন তাদের বিয়ের দিনের স্মৃতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অবলীলায় শেয়ার দিয়ে যান। আমার খুব কাছের বন্ধু। দ্বীন প্র্যাকটিস করার চেষ্টা করেন। নামাজ-কালাম পড়েন। আলেমদের সাথে ওঠা-বসা করেন। কিন্তু তার বিয়ের স্মৃতি ফেসবুকে শেয়ার করতে গিয়ে কাবিন নামায় নবপরিণীতা বধূর মেহেদিরাঙা হাতে সাইন করার দৃশ্যটা কাভার পিকচারে দিয়ে দিলেন!
ছবিটা আমার চোখে পড়ল। বাড়িতে যাওয়ার পর রেস্টুরেন্টে চা পান করার ফাঁকে তাকে বললাম, 'ভাই! আপনার স্ত্রীর মেহেদিরাঙা হাতখানা কেন সারা দুনিয়ার ছেলেরা দেখবে?' ব্যস, আমার কথার অর্থ তিনি বুঝতে পারলেন। সাথে সাথে পকেট থেকে মোবাইলটা টেনে বের করে কাভার পিকচারটা ডিলেট করলেন। জি, এটাই গাইরত। অবশ্য সেটা এমনি এমনি হয়নি; রীতিমতো গুঁতা দেওয়ার পর হয়েছে।
ইন্টারনেটের এই যুগে এসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে দ্বীনি কমিউনিটিতেও আসলেই গাইরতের উপলব্ধিতে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। অনেকেই স্ত্রীর পর্দাবৃতা ছবি শেয়ার না করলেও বেখেয়ালে স্ত্রীর সাথে নিজেদের ঘরোয়া খুনসুটি লিখে যাচ্ছেন। মেয়েদের গ্রুপের কোনো লেখা শেয়ার হয়ে নিউজফিডে এলে দেখা যায়, সেখানেও একই অবস্থা। বোনেরা তাদের ঘরোয়া খুনসুটির নানান ফিরিস্তি লিখে যাচ্ছেন।
ইসলামিক লেখক-লেখিকাদের জন্য ফেসবুক তো পুরাই বিপজ্জনক। শক্তভাবে যদি ফ্রেন্ডলিস্ট ও কমেন্টবক্স নিয়ন্ত্রণ না করা হয়, তখন 'দাওয়াহ' ও 'জ্ঞান আহরণের নামে ভয়াবহ ফিতনা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। নারীরা কমেন্ট করেন পুরুষদের পোস্টে; পুরুষরা কমেন্ট করেন নারীদের পোস্টে। কেউ কেউ ইনবক্সেও লেখার প্রশংসা করতে যান। একান্ত দরকার ছাড়া এসব করা আসলে গাইরতের খেলাপ।
একজন গাইরতমন্দ পুরুষ তার স্ত্রীর কমেন্টে অপর পুরুষের লাভ রিয়েক্ট আর গদগদ কমেন্ট কখনোই হজম করতে পারেন না। একজন গাইরতওয়ালি নারী তাঁর স্বামীর কমেন্টে অপর নারীর লাভ রিয়েক্ট আর প্রশংসা হজম করতে পারেন না। যে স্বামী তার স্ত্রীর এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না, তিনি গাইরতহীন। যে স্ত্রী তাঁর স্বামীর এসব নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না, তিনিও গাইরতহীন।
একবার ফেসবুকে এক ভাই আক্ষেপ ভরা একটা পোস্ট লিখেছিলেন। পাঠকগণ কীভাবে তাকে ছোটো করে তার স্ত্রীকে শ্রেষ্ঠ লেখিকা প্রমাণের জন্য বিশ্লেষণ শুরু করেছেন-তা দেখে আক্ষেপ ভরা এক লেখা লিখেছিলেন। যিনি লিখেছেন, তিনি অন্য পুরুষের প্রশংসা চাননি। যিনি প্রশংসা করেছেন, তিনি অতকিছু ভাবেননি। কিন্তু স্বামী হিসেবে তার গাইরতে লেগেছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা তাদেরকে নিয়ে, যাদের মধ্যে গাইরতের উপলব্ধিই নেই!
একবার ফেসবুকে এক হুজুরের গাইরতের একটা অভাবনীয় দৃশ্য সবার নজর কাড়ে। ওই হুজুর তার স্ত্রী কিংবা কন্যাকে নিয়ে শহরে এসেছিলেন কোনো প্রয়োজনে। জঠরজ্বালা নিবারণ করার জন্য একটি রেস্টুরেন্টে ঢুকলেন। মহিলাদের কেবিনে বসলেন। কেবিনের দরজা ছিল ঝাপসা কাচের গ্লাস। বাহির থেকে ভেতরের কাউকে স্পষ্ট দেখা যায় না; হালকা ঝাপসা মানবমূর্তি দেখা যায়। তবুও ওই হুজুর করলেন কী; নিজের লাল রুমালখানা গা থেকে খুলে ঝাপসা কাচের গ্লাসের ওপরে ছড়িয়ে দিলেন—যাতে ঝাপসা আকারে হলেও বাইরে থেকে কিছুই দেখা না যায়! ছবিটা এখনও ফেসবুকে পাওয়া যায়।
অপরদিকে আরেক অকালপক্ক হুজুর তার বিয়ে করা নববধূকে নিয়ে পার্কে ঘুরতে গিয়ে লাইভ করতে লাগলেন। বোরকা পরা হলেও তার স্ত্রীর হাত ও চোখ দেখাচ্ছিল। স্বামীর লাইভ চলাকালীন তিনি ঘাড়ের উপর দিয়ে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছিলেন। লাইভ ভিডিওতে একজন কমেন্ট করল, ‘ভাই! এভাবে ভাবিকে দেখিয়ে লাভ কী; আপনার গাইরত নেই?’ তো ওই হুজুর রিপ্লাই দিলেন, ‘এত পরহেজগার হলে আনফ্রেন্ড করে চলে যান; আপনাকে তো আমি ভিডিওটা দেখতে বাধ্য করিনি!’
যাহোক, সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ফিতনা থেকে বাঁচার একমাত্র পন্থা হলো সেটা, যেটা যুবাইর ইবনুল আওয়াম্ম রা.-এর স্ত্রী আসমা বিনতে আবু বকর রা. গ্রহণ করেছিলেন। স্বামী গাইরতের সাথে স্ত্রীকে রক্ষা করবেন; আর স্ত্রী স্বামীর গাইরতের দাবি রক্ষা করবেন।
📄 গাইরতহীন পুরুষই হলো দাইয়ুস
স্ত্রী, কন্যা, জায়া, বোন ও মায়ের প্রতি গাইরতের প্রসঙ্গ এলেই যে শব্দটি অটোমেটিক সামনে চলে আসে তা হলো-'দাইয়ুস'। বলতে গেলে দাইয়ুস ও গাইরতহীন শব্দদুটো সমার্থবোধক।
প্রসিদ্ধ হাদিস-বিশারদ ইমাম তিবি রহ. বলেন, 'দাইয়ুস হলো যে তার পরিবারকে অন্যায় গর্হিত কাজ করতে দেখে, কিন্তু তা সত্ত্বেও তার গাইরতে বাধে না। তাদেরকে সেটা করা থেকে বাধা দেয় না। উল্টো সবকিছু মেনে নেয়।'১
প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস মোল্লা আলি কারি হানাফি বলেন, 'দাইয়ুস হলো ওই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের নারীদের ক্ষেত্রে ব্যভিচার কিংবা ব্যভিচারের পূর্ববর্তী সব অশ্লীলতা ও বেহায়াপনাকে সাপোর্ট করে।'২
জগদ্বিখ্যাত হাদিস বিশারদ ইমাম শামসুদ্দিন যাহাবি বলেছেন, 'দাইয়ুস হলো সেই ব্যক্তি, যে তার স্ত্রীর অশ্লীল কাজ সম্পর্কে অবগত। কিন্তু তার প্রতি ভালোবাসার কারণে এ ব্যাপারে সে উদাসীন থাকে। অথবা তার ওপর তার স্ত্রীর বৃহৎ ঋণ বা মোহরানার ভয়ে কিংবা ছোটো ছেলে-মেয়েদের কারণে সে স্ত্রীকে কিছুই বলে না এবং যার গাইরত বলতে কিছুই নেই।'৩
সুতরাং যে ব্যক্তি তার স্ত্রী, কন্যা, জায়া, বোন ও পরিবারের নারীদের অবাধ চলাফেরা, অশালীন জীবনযাপন ও পাপপূর্ণ জীবনাচার মেনে নেয় এবং তাদের এসব গর্হিত কাজ করা থেকে বাধা দেয় না-তাকে ইসলামের পরিভাষায় 'দাইয়ুস' বলা হয়। দাইয়ুস ব্যক্তি হতে পারে স্বামী, পিতা কিংবা ভাই অথবা যেকোনো পুরুষ অভিভাবক।
আফসোসজ্জনক হলেও সত্য যে, শুধু দ্বীনহীন কেন; অনেক দ্বীনদার পুরুষই জানেন না—তারা দাইয়ুস। তারা পরিবারের সদস্যদের পাপপূর্ণ চলাফেরায় বাধা দেন না, শালীনতা ও ভদ্রতার পথে আসার জন্য চেষ্টা করেন না। অথচ কী জঘন্য অন্যায় তারা করছেন, যদি বুঝতে পারতেন তাহলে বেহায়াপনা, পাপপূর্ণ জীবন মেনে নিতেন না। হাদিসে এসেছে—
ثَلَاثَةٌ قَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِمُ الْجَنَّةَ: مُدْمِنُ الْخَمْرِ، وَالْعَاقُ، وَالدَّيُّوتُ الَّذِي يُقِرُّ فِي أَهْلِهِ الْخَبْثَ.
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল ﷺ বলেছেন, তিন ব্যক্তির ওপর আল্লাহ তা'আলা জান্নাত হারাম করেছেন। ১. মদ্যপানে অভ্যস্ত ব্যক্তি। ২. পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান। ৩. দাইয়ুস অর্থাৎ ওই গাইরতহীন ব্যক্তি, যে তার পরিবারের মহিলাদের ক্ষেত্রে পাপাচার অর্থাৎ ব্যভিচার ইত্যাদিকে সমর্থন করে।'
আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত আরেক হাদিসে রাসুল ﷺ বলেন:
ثَلَاثَةٌ لَا يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ، وَلَا يَنْظُرُ اللَّهُ إِلَيْهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ: الْعَاقُ بِوَالِدَيْهِ، وَالْمَرْأَةُ الْمُتَرَجِلَةُ الْمُتَشَبِّهَةُ بِالرِّجَالِ، وَالدَّيُّوتُ.
'তিন ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না। এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা তাদের দিকে রহমতের দৃষ্টিতে তাকাবেন না। ১. পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান। ২. পুরুষের সাদৃশ্য গ্রহণকারী নারী। ৩. দাইয়ুস।২
দাইয়ুস ব্যক্তি মূলত ফাসিক। কারণ সে কবিরা গুনাহে লিপ্ত। অনেকেই মনে করেন, এমন ব্যক্তির ইবাদত-বন্দেগি কবুল হয় না। ব্যাপারটা আসলে এমন নয়। ফতোয়ায় বলা হয়েছে—'যদি কোনো ব্যক্তির স্ত্রী পর্দা না করে তাহলে সে ব্যক্তির ওপর কর্তব্য হচ্ছে স্ত্রীকে পর্দা করার ওপর বাধ্য করা। কিন্তু তা না করে যদি সে স্ত্রীর বেপরোয়া, পাপপূর্ণ জীবনযাপন মেনে নেয় এবং সে ইবাদত-বন্দেগিও করে তাহলে এ অবস্থায় স্বামী গুনাহগার ও জাহান্নামি হবে। আর নামাজ ও ইবাদত গুনাহগারেরও কবুল হয়।১
সুতরাং ইবাদত-বন্দেগি পরিপূর্ণরূপে কবুল হওয়ার জন্য অবশ্যই দাইয়ুসের মন্দ গুণাবলি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তা নাহলে আল্লাহর কঠিন আজাবের সম্মুখীন হতে হবে। তবে কেউ দাইয়ুস হলে তাকে 'দাইয়ুস' বলে গালি দেওয়া যাবে না।২
নিজের একটা অভিজ্ঞতা শেয়ার করেই দাইয়ুসের প্রসঙ্গ শেষ করতে চাচ্ছি। জীবনপথে চলতে গিয়ে কত কিসিমের মানুষের সাথেই তো ওঠাবসা করতে হয়। এতে অভিজ্ঞতার ঝুলিটা বেশ পূর্ণই থাকে।
যার কথা বলতে চাচ্ছি, তিনি দ্বীনদার মানুষ। দাম্পত্য জীবনে খুব অসুখী। বিয়ের সময়ের এক ভুলের কারণে এখনও মাশুল দিয়ে যাচ্ছেন। বস্তুত বিয়ে করতে হয় খুব ভেবেচিন্তে। দেখেশুনে। নইলে আজীবন পস্তাতে হয়। আমাদের সমাজে বিয়ে করা যেমন কঠিন, পরে ছাড়াও কঠিন। আর বাচ্চা-কাচ্চা হয়ে গেলে তো মহা মুশকিল।
বিয়েটা করেছিলেন তিনি নিজের পছন্দের বাইরে। পরিবারের চাপে। আগে থেকেই তার পরিবার মেয়েটাকে ঠিকঠাক করে রাখে। তার অমত করার সুযোগ ছিল না। বিয়ের পরেই তিনি পড়েন বিপদে। মেয়ের স্বভাব-চরিত্র ভালো না। স্বামীর সাথে বাজে আচরণ তো করেই; ফ্যামিলির কাউকেই সহ্য করতে পারে না। স্বামীর আয়-রোজগার সব নিজের আয়ত্তে রাখতে চায়। স্মার্ট ফোনে ফেসবুক, ইমো ব্যবহার করে বহু পুরুষের সাথে পরকীয়া করে! এমনকি ওই ভাইয়ের নিকটাত্মীয়দের সাথেও পরকীয়ায় লিপ্ত হয়ে পড়ে!
দাম্পত্য জীবনে অসুখী মানুষগুলোর চেহারা সব সময় মলিন থাকে। এদের চেহারায় হাসি-ফুর্তি দেখা যায় খুবই কম। বিশেষ করে তাদের সামনে অন্য কেউ নিজের দাম্পত্য জীবনের সুখময় কিছু শেয়ার করলে তাদের বুকটা হাহাকার করে ওঠে। এজন্য এমন মানুষের সামনে নিজের দাম্পত্য জীবনের রোমান্টিক কিছু শেয়ার করতে নেই।
তো ওই ভাইয়ের চেহারাটাও সব সময় মলিন থাকত। একটা বাচ্চাও আছে তার। এ ব্যাপারে আমার কাছে পরামর্শ চাইলে ধৈর্যধারণ করে মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে জীবনটা কাটিয়ে দিতে বললাম। তিনি বলে উঠলেন, সবই হয়তো মানিয়ে নিতেন; কিন্তু উনার স্ত্রী যেহেতু পরপুরুষের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কে লিপ্ত, সেহেতু এমন স্ত্রীকে প্রশ্রয় দিলে তিনি আবার দাইয়ুস হয়ে যাবেন!
ভাইয়ের কথাটা শুনে আমি যেন আসমান থেকে পড়লাম! তাইতো, এ দিকটা তো আমি ভুলেও খেয়াল করিনি! এমন স্ত্রীকে রাখা মানে নিজে দাইয়ুস হওয়া! আর দাইয়ুস তো জান্নাতে যাবে না!
টিকাঃ
১ মিরকাতুল মাফাতিহ শারহে মিশকাতুল মাসাবিহ: ৬/২৩৯০, হাদিস: ৩৬৫৫।
২ প্রাগুক্ত।
৩ কিতাবুল কাবায়ির, পৃষ্ঠা: ১৩৭, ইমাম যাহাবি।
'মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ৫৩৭২।
২ মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ৬১৮০।
১ আপ কে মাসায়েল অওর উন কা হল: ৮/৬৮; ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া: ২৮/৯১।
২ মিরকাতুল মাফাতিহ: ৭/২২০; তাবয়িনুল হাকায়িক: ৩/৬৩৫; আল-বাহরুর রায়িক: ৫/৪৪; শামি-পুরারুল মুখতার: ৪/৭০।