📄 হাকাম ইবনে হিশামের গাইরত
হাকাম ইবনে হিশাম ছিলেন আন্দালুসে উমাইয়া খিলাফতের অধীনস্থ কর্ডোবার আমির। ৭৯৬-৮২২ সাল পর্যন্ত তিনি শাসন পরিচালনা করেন। তাঁর কর্তৃত্বের পুরোটা সময় জুড়ে ছিল অস্থিতিশীলতা। তবুও শক্ত হাতে তিনি শাসন চালিয়ে যান। বেশ গাইরতমন্দ শাসক ছিলেন তিনি।
হাকামের শাসনামলে আব্বাস বিন নাসিহ জাযিরি নামে একজন কবি ছিলেন। ইনি আন্দালুসের আল-খাজরা তথা সবুজ উপদ্বীপে জন্মেছিলেন এবং হাকামের পক্ষ থেকে আল-খাজরার গভর্নর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তৎকালে কবিদের কাজই ছিল রাজা-বাদশাহদেরকে প্রশংসা করে হাদিয়া ও বকশিশ দ্বারা পকেট ভারি করা। আব্বাস বিন নাসিহ জাযিরিও ব্যতিক্রম ছিলেন না। তিনি কারণে-অকারণে হাকাম ইবনে হিশামের প্রশংসায় কাব্য রচনা করতেন।
ওয়াদি আল-হিজারাহ-বর্তমানে স্পেনের একটি শহর। মাদ্রিদ থেকে ৫৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এটির আরেক নাম আল-ফারাজ শহর। তবে এটি ওয়াদি আল-হিজারাহ তথা পাথুরে উপত্যকা নামেই বেশি পরিচিত। হেনারস নদীর তীরে অবস্থিত উপত্যকার নামানুসারে শহরের এই নাম এসেছে। স্প্যানিশরা পরবর্তীকালে আরবি নামের বিকৃতি সাধন করে নাম দেয়-গুয়াদালাজারা (Guadalajara)|
একবার কবি আব্বাস বিন নাসিহ জাযিরি আন্দালুসের সীমান্তসংলগ্ন এলাকা ওয়াদি আল-হিজারায় আগমন করেন। খ্রিষ্টানদের সীমান্তবর্তী অঞ্চল হওয়ায় এই এলাকায় প্রায়ই ক্রুশের পূজারিরা হামলা করত। মুসলমানদের বাড়িঘরে চালাত লুটতরাজ। নারীদেরকে বন্দি করে নিয়ে ইজ্জতহানি করত। প্রান্তিক অঞ্চল হওয়ায় এসব জুলুমের খবর অনেক সময় মুসলিম শাসকদের কর্ণগোচর হতো না।
কবি আব্বাস বিন নাসিহ ওয়াদি আল-হিজারায় ঘুরছিলেন। হঠাৎ তাঁর কানে এক নারীকণ্ঠের আহাজারি ভেসে এলো। তিনি শুনতে পেলেন-একজন দুঃখিনী নারী কলজে পোড়া আওয়াজে ফরিয়াদ করে বলছে, 'হে হাকাম, বাঁচাও! তুমি তো আমাদের কোনো খোঁজখবর নিলে না। আমরা বিধবা হলাম। আমাদের সন্তানরা এতিম হয়ে গেল!'
আব্বাস দ্রুতপদে এগিয়ে গেলেন ওই নারীর দিকে। দুঃখিনী নারীকে তার ফরিয়াদির কারণ জিজ্ঞেস করলেন। নারী বলল, 'আমরা একসঙ্গে দলবদ্ধভাবে গ্রাম থেকে ফিরছিলাম। পথিমধ্যে হঠাৎ আমাদের ওপর আক্রমণ করে খ্রিষ্টানদের অশ্বারোহী বাহিনী। তারা আমাদের পুরুষদেরকে হত্যা করে। আরও অনেককে বন্দি করে নিয়ে যায়!'
ওই মজলুম নারীর ফরিয়াদ শুনে বড় ব্যথিত হন কবি আব্বাস বিন নাসিহ। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করেই তিনি রচনা করেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা-
تململت في وادي الحجارة مسهرا... أراعي نجوما ما يردن تغورا إليك، أبا العاصي، نضيت مطيتي ... تسير بهم ساريا و مجرا تدارك نساء العالمين بنصرة ... فإنك أحرى أن تغيث وتنصرا
(কাব্যানুবাদ)
আমি অস্থির ও আকুল হয়ে পার করেছি বিনিদ্র রজনী, সারাটা রাতেও পাথুরে উপত্যকা পাড়ি দিতে পারিনি। তারাগুলোর দিকে শুধু তাকিয়ে রাতটা করলাম পার, উপত্যকাতেই ঘুরেফিরে একসময় আমি মানলাম হার! হে হাকাম, আপনার কাছে পৌঁছতে বাহন করেছি দুর্বল, আপনি শত্রুদের তাড়ান; শীঘ্রই বের হন নিয়ে সেনাদল। জগতের দুঃখিনী নারীদের বাঁচান; দাঁড়ান তাদের পাশে, আপনিই পারেন তাদের সহায় হতে, আগে কিংবা শেষে।
কবি আব্বাস বিন নাসিহ জাযিরির এই কবিতা থেকে বোঝা যায়, ওই নারীর আহাজারি শোনার পর তিনি দ্রুত ওয়াদি আল-হিজারাহ ত্যাগ করে কর্ডোভায় পৌঁছতে চেয়েছেন। কথায় আছে, অপেক্ষার প্রহর নাকি প্রলম্বিত হয়। ওয়াদি আল- হিজারাতেই তিনি বিনিদ্র রজনী পার করলেন বাহনের পিঠে সওয়ার হয়ে। পুরো রাত কাটিয়ে ফেললেন উপত্যকায়, তবুও সে রাতে উপত্যকা অতিক্রম করতে পারলেন না। তাই কষ্টে কবিতাটা শুরুই করলেন এই প্রসঙ্গ দিয়ে।
যাহোক, কর্ডোভায় পৌঁছেই কবি আব্বাস বিন নাসিহ দ্রুত প্রবেশ করলেন আমির আবুল আস হাকাম ইবনে হিশামের রাজপ্রাসাদে। হাকামের সামনে কবিতাটি আবৃত্তি করলেন। তার কাছে সীমান্তের বাসিন্দাদের শত্রুভীতি উল্লেখ করলেন। নামসহ ওই মজলুম নারীর ফরিয়াদ শুনিয়ে দিলেন।
আব্বাস বিন নাসিহের মুখে এসব কথা শুনতেই পিলে চমকে উঠল হাকাম ইবনে হিশামের। তিনি রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠলেন। তার গাইরতে চোট লাগল। তৎক্ষণাৎ জিহাদ ঘোষণা করলেন। অবিলম্বে সেনাবাহিনীকে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে আদেশ করলেন। কর্ডোভার অলিতে-গলিতে বেজে উঠল জিহাদের ডংকা।
তিনদিনের মধ্যেই রণপ্রস্তুতি সম্পন্ন করে সেনাবহর নিয়ে পাথুরে উপত্যকার দিকে বেরিয়ে পড়লেন আমির হাকাম ইবনে হিশাম। সঙ্গে নিলেন কবি আব্বাস বিন নাসিহকে। উপত্যকায় এসে জিজ্ঞেস করলেন, কোনদিক থেকে দুশমনের অশ্বারোহী বাহিনী এসে হামলা করেছিল? একটি দিক দেখিয়ে দেওয়া হলো তাঁকে। তিনি সেদিকেই বাহিনী নিয়ে এগিয়ে গেলেন।
শত্রুদের ওই এলাকায় আক্রমণ করলেন। বলতে গেলে প্রলয়ঙ্কারী ঝড় বইয়ে দিলেন। সীমান্ত সংলগ্ন এলাকা পাড়ি দিয়ে অনেক ভেতরে গিয়ে একের পর এক বহু কেল্লা বিজয় করলেন। খ্রিষ্টান দুশমনদের বাড়িঘর মাটির সাথে মিশিয়ে দিলেন। বহুসংখ্যক শত্রুকে হত্যা করলেন। এরপর আবারও ফিরে এলেন পাথুরে উপত্যকায়।
এখানে এসে আদেশ করলেন নির্যাতিত ওই নারীকে তাঁর সামনে ডেকে আনতে। পাশাপাশি তিনি সেই অঞ্চলের বন্দি খ্রিষ্টানদেরকেও হাজির করতে আদেশ করলেন। কবি আব্বাসসহ কেউই বুঝতে পারছিলেন না-ওই নারীকে উপস্থিত করার পাশাপাশি যুদ্ধবন্দি খ্রিষ্টানদেরকেও হাজির করার কী মানে! কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই হাকাম বিন হিশাম সকলের মনের সব প্রশ্নের জবাব দিয়ে দেন।
নিপীড়িত ওই মুসলিম নারী ও যুদ্ধবন্দি খ্রিষ্টানদের উপস্থিত করা হলে সবার আগে বন্দিদের গর্দান উড়িয়ে দেওয়ার হুকুম জারি করেন হাকাম ইবন হিশাম। কথামতো সকল বন্দিকে হত্যা করা হয়। এরপর কবি আব্বাস বিন নাসিহ জাযিরিকে সম্বোধন করে হাকাম বললেন, ‘আব্বাস! এই নারীকে জিজ্ঞেস করো—হাকাম কি তাঁর ডাকে সাড়া দিয়েছে?
আব্বাস ওই মুসলিম নারীকে জিজ্ঞেস করলেন। নারী বেশ বুদ্ধিমতী ছিল। বেচারি বলল, ‘আল্লাহর শপথ করে বলছি, হাকাম আমাদের অন্তর প্রশান্ত করেছেন, দুশমনদের বেশ ক্ষতি করেছেন, দুঃখীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন; আল্লাহও যেন হাকামের পাশে থাকেন, তাঁকে সহায়তা করে সম্মানিত করেন।’
মুসলিম বোনের কথা শুনে খুশি হলেন কর্ডোবার আমির হাকাম বিন হিশাম। তাঁর চেহারায় খুশির আভা ঝিলিক খেলে গেল। তিনিও তখন কাব্যাকারে বললেন:
ألم تر يا عباس أني أجبتها ... على البعد أقتاد الخميس المظفرا فأدركت أوطارا وبردت غلة ... ونفست مكروبا وأغنيت معسرا
আব্বাস! তুমি কি দেখোনি আমি তার ডাকে সাড়া দিয়েছি, সুদূর কর্ডোভা থেকে নেতৃত্ব দিয়ে সেনাদল হাজির করেছি। আমি পূরণ করেছি তার মনোবাঞ্ছা; অন্তর প্রশান্ত করেছি, বিপদগ্রস্তের পাশে দাঁড়িয়েছি; দুঃখীর মুখে হাসি ফুটিয়েছি।
আব্বাস বিন নাসিহ বললেন, ‘আল্লাহ আপনাকে পুরো মুসলিম উম্মাহর পক্ষ থেকে উত্তম প্রতিদান দান করুন, হে মহামান্য!’ এরপর আব্বাস উঠে গিয়ে হাকামে ইবনে হিশামের দু-হাত চুম্বন করলেন। দায়িত্ব আদায় হয়েছে বলে হাকام বাহিনী নিয়ে ছুটলেন কর্ডোবার পথে।১
টিকাঃ
১ নাফহুত-তিব: ১/৩৪৩-৩৪৮, আহমাদ মাক্কারি তিলমিসানি; মাখতুতুর-রাবাত, পৃষ্ঠা: ১০৭-১০৮; আল-মুকতাতাফাত, পৃষ্ঠা: ৮৩।
📄 খলিফা মুতাসিম বিল্লাহর গাইরত
আব্বাসি খলিফা মুতাসিম বিল্লাহ (৮৩৩-৮৪২ খ্রি.) এর শাসনামলে আব্বাসি খিলাফতের সবচেয়ে কুখ্যাত ও জঘন্য বিদ্রোহী লোকটার নাম ছিল বাবাক খোররামদীন। আব্বাসি খিলাফত বহুবার অভিযান চালিয়েও তাকে শায়েস্তা করতে পারেনি; উল্টো আব্বাসি বাহিনী নাকানিচুবানি খেয়ে ফিরে এসেছে। শেষমেশ বাবাককে শায়েস্তা করার দায়িত্ব পড়ে আব্বাসি খিলাফতের নামজাদা সেনাপতি আফশিনের ঘাড়ে।
সেনাপতি আফশিন যখন আলবাজের পাহাড়ে বাবাক খোররামদীনের কেল্লা অবরোধ করেন, বাবাক তখন বেশ বেকায়দায় পড়ে। এমন বেকায়দায় পড়ে যে, রীতিমতো চোখে শর্ষে ফুল দেখতে লাগে। এতদিন নিজেকে অপরাজেয় জ্ঞান করলেও আফশিনের মতো ঠান্ডা মাথার খিলাড়ির একের পর এক খেলা দেখে সে বুঝতে পারে—বাঘের উপর টাগও আছে।
ধূর্ত বাবাক এবার কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার ফন্দি আঁটে। দেওয়ালে পিঠ লাগা অবস্থায় সে তৎকালীন বাইজেন্টাইন সম্রাট থিওফেলিস (৮২৯-৮৪২) এর কাছে পত্র লেখে এই মর্মে—
“আরবের বাদশাহ মুতাসিম তাঁর প্রায় সকল সৈন্য আমার বিরুদ্ধে প্রেরণ করে ফেলেছেন। তাঁর দেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চল রক্ষা করার মতো কোনো সৈন্য অবশিষ্ট নেই। এখন আপনি যদি গনিমত লাভ করতে চান, তাহলে অতি দ্রুত আপনি আপনার সাম্রাজ্যের নিকটবর্তী তাঁর সাম্রাজ্যভুক্ত অঞ্চলগুলোতে হামলা করে কবজা করুন। কেননা, এই মুহূর্তে আপনাকে বাধা দেওয়ার মতো কাউকে পাবেন না।”
বাবাকের এই পত্রের মূল উদ্দেশ্য ছিল, আব্বাসি খিলাফতকে বড় শত্রু দ্বারা আক্রান্ত করে, নিজেকে মুক্ত করা। স্বীয় বিপদকে হালকা করা। কিন্তু হায়, আহাম্মক বাইজেন্টাইন সম্রাট যদি একটু বুঝতেন! বাবাক আসলে ঠিক জায়গাতেই ঢিল ছুঁড়েছিল।
সম্রাট থিওফেলিস বাবাকের পত্র পড়েই উত্তেজিত হয়ে যান। দ্রুত একপলক সৈন্য প্রস্তুত করে নেন তিনি। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সীমান্তবর্তী মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে 'ইসপারটা' আক্রমণ করে বসেন। ইসপারটার অধিবাসীদের কোনোরূপ মানকতা ছাড়া অত্যন্ত নির্দয়ভাবে হত্যা করতে শুরু করে বাইজেন্টাইন বাহিনী। তাদের তলোয়ারের কোপ থেকে রেহাই পায়নি ইসপারটার আবালবৃদ্ধবনিতা।
বাইজেন্টাইন খ্রিষ্টান সৈন্যরা মুসলিম মা ও বোনদের সম্ভ্রম লুটে খেতে থাকে। তাদের গোঙানিতে কেঁদে ওঠে আসমান-জমিন। নির্যাতিত মুসলিমদের আর্তচিৎকারে ভারি হয়ে ওঠে ইসপারটার আকাশ-বাতাস। শুধু তাই নয়; খ্রিষ্টান সৈন্যরা মুসলিন মাত্রেদের শিশুসন্তানদের কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলে!
ইসপারটার নির্যাতিতাদের মধ্যে ছিলেন 'শুরাহ আলাবিয়্যা' নামের আরব বংশোদ্ভূত এক সম্ভ্রান্ত হাশিমি যুবতি। অন্যান্য নারীদের মতো তিনিও খ্রিষ্টান সৈন্যদের হাতে বন্দি হন। নচ্ছারদের হাতে বন্দি হয়ে তিনি নিজের ইজ্জতের ব্যাপারে শঙ্কিত হয়ে ওঠেন-এই বুঝি যাবে তার সম্ভ্রম! তিনি চিৎকার করে উঠলেন, 'হে মুতাসিম, বাঁচাও! হে মুতাসিম, বাঁচাও!'
হাশিমি যুবতির আর্তচিৎকার শুনে পৈশাচিক ভঙ্গিতে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে এক খ্রিষ্টান সৈন্য। সক্রোধে সে তেড়ে আসে যুবতির দিকে। তার খশখশে পঙ্কিলময় হাত দিয়ে যুবতির কোমল গালে সজোরে একটা চড় কষে দেয়। সেইসাথে উপহাস করে বলে, 'এত দূর থেকে মুতাসিম কি তোমার চিৎকার শুনতে পাবে? 'চপেটাঘাত সইতে পারেননি যুবতি; মুখ থুবড়ে লুটিয়ে পড়েন মাটিতে!
ইসপারটার পর বাইজেন্টাইনরা আক্রমণ চালায় আরসামোসাতা শহরে। কিছু বুঝে উঠার আগেই শহরবাসী নিজেদেরকে শত্রুর মুখে আবিষ্কার করে! শহরে অবস্থানরত অল্প কয়েকজন আব্বাসি প্রতিরোধ যোদ্ধাকে শহিদ করা হয়। পুরুষদের পাইকারি হারে হত্যা করার পাশাপাশি নারীদেরকেও ধর্ষণের পরে হত্যা করে বদমাইশ বাইজেন্টাইন সেনারা। ইসপারটার মতো তারা আরসামোসাতা শহরকেও লুটপাট করে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়।
সবশেষে পালা আসে মালাতিয়াহ শহরের। এটি ছিল ইসপারটার পার্শ্ববর্তী সীমান্তবর্তী এলাকা এবং খলিফা মুতাসিম বিল্লাহর জন্মস্থান। বুনো খ্রিষ্টানরা ইসপারটার মতো এখানেও পৈশাচিক উল্লাসে মেতে ওঠে। মুসলিমদের রক্তের বন্যা বয়ে যায় মালাতিয়াহর অলিগলিতে।
হাফিজ ইমাদুদ্দিন ইবনে কাসির বলেন, “বাইজেন্টাইন সম্রাট এক হাজার মহিলাকে বন্দি করে। তার সামনে যেসকল মুসলমানকে উপস্থিত করা হয়, সবার চোখ উপড়িয়ে নেয় সে! নাক ও কান কেটে ফেলে! অতর্কিত হামলায় সীমান্তবর্তী সব অঞ্চলের মুসলমানরা চিৎকার, চ্যাঁচামেচি আর শোরগোল শুরু করে দেয়। আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে উঠে তাদের বুকফাটা কান্নায়। মসজিদে ঢুকে এবং রাস্তায় বেরিয়ে তারা ফরিয়াদ শুরু করে।”
তখন রাজপ্রাসাদের খাস কামরায় বসে পানি পান করছিলেন খলিফা মুতাসিম। তাঁকে কিছুটা চিন্তিত মনে হচ্ছিল। ঠিক তখনই তাঁর চিন্তায় ছন্দপতন ঘটিয়ে অনুমতি পূর্বক কামরায় প্রবেশ করেন ইব্রাহিম বিন মাহদি। দরবারে প্রবেশ করেই তিনি কোনো প্রকার ভূমিকা ছাড়াই কাব্যাকারে সীমান্তবর্তী অঞ্চল ইসপারটা ও মালাতিয়ায় বাইজেন্টাইন সম্রাটের রক্তপাতের কথা তুলে ধরলেন।
ইবরাহিম বিন মাহদি খলিফাকে জিহাদের মাধ্যমে প্রতিশোধের জন্য উত্তেজিত করতে থাকলেন। খলিফাও এক প্রকার শান্তশিষ্ট ভাবে ইবরাহিম বিন মাহদির কাব্যিক কথাগুলো শুনে যাচ্ছিলেন। বলতে বলতে ইবরাহিম বিন মাহদি এক সময় বললেন, 'মহামান্য সুলতান! আমি শুরাহ আলাবিয়্যাহ নাম্নী একজন হাশিমি যুবতিকে এই বলে ফরিয়াদ করতে শুনেছি—হে মুতাসিম, বাঁচাও! হে মুতাসিম, বাঁচাও!’
কথাটা শুনতেই খলিফার গাইরতের বাতিটা দপ করে জ্বলে উঠল। নিজেকে আর তিনি ধরে রাখতে পারলেন না; হাতের পানপাত্র ছুড়ে মারলেন মেঝেতে। রাগে অগ্নিমূর্তি ধারণ করে তৎক্ষণাৎ বলে উঠলেন— 'লাব্বাইক! লাব্বাইক!'
জিহাদের শাহি ফরমান জারি করলেন খলিফা। বাগদাদের মিনারে মিনারে ঘোষকরা হাঁকাল জিহাদের আজান। মুহূর্তের মধ্যেই বেজে উঠল দামামা, কাড়ানাকাড়া, রণসঙ্গীত। বাগদাদবাসী বুঝতে পারল-কোনো বিরাট অভিযানে বের হতে যাচ্ছেন খলিফা। ঘরে ঘরে শুরু হলো মুজাহিদ বাহিনীর জন্য দুআ-আল্লাহ যেন তাদের বিজয় দান করেন।
আল্লাহর রাস্তায় শাহাদাতবরণের তামান্না নিয়ে খলিফা মুতাসিম বিল্লাহ রণসাজে সজ্জিত হলেন। লশকর নিয়ে বেরিয়ে পড়বেন-তার আগে খিলাফতের কাজি ও সাক্ষীদের ডেকে পাঠালেন। তাদেরকে সাক্ষী রাখলেন এই মর্মে, তিনি যেসব ভূসম্পত্তির মালিক, তার এক তৃতীয়াংশ আল্লাহর রাস্তায় সাদাকাহ, আরেক তৃতীয়াংশ তাঁর সন্তানদের জন্য, অপর তৃতীয়াংশ তাঁর গোলামদের জন্য। এরপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের কোন শহরটি সবচেয়ে মজবুত ও মূল্যবান?'
উত্তর এলো-আম্মুরিয়া। ইসলামের সূচনালগ্ন থেকে নিয়ে এখনও পর্যন্ত আম্মুরিয়াতে কোনো মুসলিম শাসক হানা দেননি। এটি ছিল বাইজেন্টাইন রাজবংশের শাসকের জন্মস্থান এবং সেই সময়ে বাইজেন্টাইনের বৃহত্তম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর মধ্যে একটি। এটাই হলো খ্রিষ্টানদের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি। তাদের কাছে নাকি এটি কনস্ট্যান্টিনোপলের চেয়েও বেশি সম্মানের। ব্যস, খলিফা বুঝে গেলেন— তাঁকে রওনা হতে হবে আম্মুরিয়া পানে। সেটা গুঁড়িয়ে দিয়ে ভেঙে ফেলতে হবে বাইজেন্টাইনদের সব দম্ভ। এরপর দুনিয়া কাঁপিয়ে আব্বাসি বাহিনী গিয়ে হামলা করে আম্মুরিয়ায়। শুধুমাত্র প্রতিশোধ নিতে হাশিমি যুবতিকে আঘাতের। অবশেষে বিজয়কেতন উড়িয়ে ফেরে।১
টিকাঃ
১ ইসপারটা-এটি বর্তমান তুরস্কের একটি প্রদেশ।
১ মুরুজুয যাহাব ওয়া মাআদিনুল জাওহার: ২/৩৫০, আল-মাসউদি; আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ১০/২৯৬, ইবনে কাসির; তারিখু বাগদাদ : ৩/৩৪৪, খতিব বাগদাদি; আল-আইয়াম ম্যাগাজিন: সংখা-৮৮৭২, বৃহস্পতিবার, ১৩ জুলাই, ২০১৩; তারিখুত তাবারি: ৭/১৪১-২৮৪, ইমাম মুহাম্মদ বিন জারির আত তাবারি; ফাতহু আম্মুরিয়া : ১-৯, শাইখ নাসির বিন মুহাম্মদ বিন আহমদ; ওয়া মুতাসিমাহ: ১-১৩, আবুল হাসান আলি নদবি।
📄 সুলতান নুরুদ্দিন জেনগির গাইরত
সিরিয়ার শাসক ছিলেন সুলতান নুরুদ্দিন জেনগি (১১৪৬-১১৭৪ খ্রি.)। অবশ্য তিনি সেলজুকদের অধীনস্থ ছিলেন। আইয়ুবি পরিবার তখন সুলতান নুরুদ্দিন জেনগির অধীন ছিল। সালাহুদ্দিন আইয়ুবির চাচা আসাদুদ্দিন শেরেকুহ ছিলেন সুলতানের খুব ঘনিষ্ঠ।
সে সময় মিসরকে কেন্দ্র করে মুসলিম বিশ্বের একাংশ শিয়াদের ফাতেমি খিলাফত শাসন করত। তখন শেষ ফাতেমি খলিফা আজিদ লি-দীনিল্লাহ (১১৬০-১১৭১ খ্রি.) ছিলেন মসনদে সমাসীন। অবশ্য তার হাতে কোনো ক্ষমতা ছিল না। সব ক্ষমতা ছিল তার দুর্মতি উজিরে আজম শাওয়ারের হাতে।
ফাতেমি খিলাফত কুক্ষিগত করার জন্য গাদ্দার শাওয়ার বারবার ক্রুসেডারদের সাথে হাত মেলাত। আর খিলাফতকে রক্ষার জন্য খলিফা আজিদ লি-দীনিল্লাহ বারবার সুলতান নুরুদ্দিন জেনগির সহায়তা চাইতেন। সুলতানও আসাদুদ্দিন শেরেকুহকে সেনাপতি বানিয়ে সাহায্য করতেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ক্রুসেডারদের সাথে শেরেকুহর চুক্তিও হয়।
১১৬৮ খ্রিষ্টাব্দে চুক্তি ভঙ্গ করে জেরুজালেমের খ্রিষ্টান সম্রাট আমালরিক ক্রুসেডারদেরকে নিয়ে তৃতীয়বারের মতো মিশরে হানা দেন। তারা পাইকারি হারে হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে। মিশরের অলিগলিতে রক্তের বন্যা বয়ে যায়। তারা ধ্বংস করতে লাগে সবকিছু। তখন পুরো মিশরে কান্নার রোল ওঠে। জান বাঁচানোর ফরিয়াদে ভারি হয়ে উঠে মিশরের আকাশ-বাতাস। ক্রুসেডার সৈন্যদের হাতে ভূলুণ্ঠিত হতে থাকে মিসরীয় নারীদের ইজ্জত-আক্র। ফাতেমি খিলাফতের নড়বড়ে মসনদে সমাসীন খলিফা আজিদ লি-দীনিল্লাহ ভয়ে কুঁকড়ে ওঠেন।
খলিফা আজিদ সি-দীনিল্লাহ গোপন সূত্রে জানতে পারলেন— তাঁর বিশ্বাসঘাতক উজির শাওয়ার ক্রুসেডারদের প্রতিহত করা তো দূরের কথা; উল্টো তাদের সাথে সমঝোতা করার জন্য পত্র চালাচালি করছেন! মিশরের ভবিষ্যৎ তখন সম্পূর্ণ হুমকির মুখে। খলিফার উদ্বিগ্নতা দ্বিগুণ হতে থাকে।
এমন বিপজ্জনক মুহূর্তে বরাবরের মতো এবারেও তিনি সিরিয়ার সুলতান নুরুদ্দিন জেজির সাহায্য পাওয়ার গরজ অনুভব করলেন। এই মুহূর্তে শেরেকুহ ছাড়া বিকল্প কেউ নেই। কিন্তু আর কত সাহায্য চাইবেন! বারবার সাহায্য চাইতে তিনি কেমন যেন জড়তাবোধ করছিলেন।
পুরো মিশরের মতো ফাতেমি রাজপরিবারের হেরেমেও কান্নার রোল পড়ে যায়। সম্রাজ্ঞী, জেনানা ও শাহজাদিরা খিলাফত হারানোর ভয়ের চেয়ে, নিজেদের সম্ভ্রম হারানোর ভয়ে বেশি কাঁদতে শুরু করলেন। তারা তো চোখের সামনেই তাদের খলিফার দুর্বলতা ও অপরাগতা প্রত্যক্ষ করছিলেন। তারা বুঝতে পেরেছিলেন, আমালরিককে প্রতিহত না করলে, তাঁদের রাজ্য ও সম্ভ্রম—উভয়টা হারিয়ে জিল্লতির জিন্দেগি অতিবাহিত করতে হবে।
ফাতেমি হেরেমের নারীরা বুঝতে পারলেন—আমালরিকের মোকাবিলা করতে হলে সিরিয়ার জেনগি সিপাহসালার শেরেকুহর বিকল্প নেই। এমন ভাবনা থেকেই তারা খলিফাকে শেরেকুহর সাহায্য চেয়ে সুলতান নুরুদ্দিনের কাছে আবারও পত্র লিখতে অনুরোধ করলেন।
খলিফাও এ রকম চিন্তাভাবনা করছিলেন। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে বিলম্বিত হচ্ছিল তাঁর ভাবনা। এখন হেরেমের সম্রাজ্ঞী ও শাহজাদিদের অনুভূতি জানতে পেরে যেন একটা উসিলা খুঁজে পেলেন। কারণ, তিনি জানতেন—সুলতান নুরুদ্দিন তাঁর হেরেমের অসহায় নারীদের অনুভূতিকে কখনো অবমূল্যায়ন করতে পারবেন না। সুলতান নারীদের ব্যাপারে খুবই গাইরতমন্দ।
খলিফা আজিদ লি-দীনিল্লাহ ঝটপট পত্র লিখতে বসলেন। মিশরে ক্রুসেডার সম্রাট আমালরিকের রক্তপাত এবং ফাতেমি হেরেমের নারীদের সম্ভ্রমহানির আশঙ্কা ও কান্নার কথা উল্লেখপূর্বক শেরেকুহকে প্রেরণ করে সাহায্য চেয়ে সুলতান নুরুদ্দিন জেনগি বরাবর একটি পত্র লিখলেন। পত্রের শেষে তিনি লিখে দিলেন— “এটাই হলো আমার হেরেমের নারীদের একান্ত অনুভূতি। তারা আপনার কাছে ফরিয়াদ করছে, আপনি যেন সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়ে তাদেরকে উদ্ধার করেন।”
যথাসময়ে পত্র হস্তগত হয় সুলতান নুরুদ্দিন জেনগির। তিনি আদ্যোপান্ত চিঠিটা পড়লেন। পড়তে পড়তে চিঠির শেষাংশে ফাতেমি হেরেমের অসহায় নারীদের অনুভূতির ওপর তার চোখ দুটো আটকে গেল। এই অনুভূতির কথা তিনি শুধু চর্মচক্ষু দিয়েই পড়েননি; অন্তর্চক্ষু দিয়েও পড়লেন। ফাতিমিরা উবাইদি শিয়া কাফের। এরা গাইরত আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর শত্রু। দুশমনিতে ক্রুসেডারদের চেয়ে মোটেও এরা কম যায়নি। কিন্তু এখন সেইসব ভাববার সময় নয়।
ফাতেমি হেরেমের নারীদের অসহায়ত্ব গাইরত সম্পন্ন খলিফাকে একেবারে কুপোকাত করে ফেলল। শিয়া খলিফা আজিদ লি-দীনিল্লাহর অনুরোধ হয়তো ফিরিয়ে দেওয়া যায়; কিন্তু হেরেমের অসহায় নারীদের ফরিয়াদ তো আর ফিরিয়ে দেওয়া যায় না। অসহায় নারীদের ইজ্জত বাঁচানোর ডাকে তো অবশ্যই 'লাব্বাইক' বলতে হয়। এরচেয়ে বেশিকিছু চিন্তা না করে পত্রটি ভাঁজ করেই তিনি মিশরে সেনাভিযান পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত পাকাপোক্ত করে ফেলেন। এবারেও ডাক পড়ল সেনাপ্রধান শেরেকুহর।
শেরেকুহর নেতৃত্বে তৃতীয়বারের মতো জেনগি বাহিনী মিশর অভিমুখে রওনা হয়। শেরেকুহ মিশরের মাটিতে পা রাখতেই শাওয়ার আবারও রঙ বদলান। আমালরিকের সাথে মিত্রতা বদল করে শেরেকুহর সাথে স্থাপন করেন। শেরেকুহ ও শাওয়ার উভয়ে একত্রে ক্রুসেডারদের মিশরের বাইরে পাঠাতে লড়াই শুরু করেন।
শেরেকুহ ও শাওয়ারের যৌথ হামলার মুখে টিকতে না পেরে, আমালরিক ক্রুসেডার বাহিনী নিয়ে পিছু হটতে হটতে অবশেষে মিশর ত্যাগ করে। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে মিশর ক্রুসেডারদের নাপাক পদচারণা থেকে মুক্তি পায়। রাজনৈতিক স্বার্থে শাওয়ার শেরেকুহর সঙ্গে হাত মিলালেও গাদ্দারি করতে যে মোটেও বিলম্ব করবেন না-এটা শেরেকুহ জানতেন। তাই শাওয়ারকে হত্যা করে তার পাওনা মিটিয়ে দেন শেরেকুহ। কিছুদিন পর খলিফা আজিদ লি-দীনিল্লাহ মারা যান। মিশরে ফাতেমি খিলাফতের অবসান হয়। এবং সেখান থেকেই আইয়ুবি শাসনের সূচনা। ১
উল্লেখ্য, মুসলিম উম্মাহর শাসকদের গাইরতের ঝলক শুধু এটুকুই নয়; আরও আছে। লিখতে গেলে ঢাউস সাইজের একটি বইয়ের দরকার। আমার প্রকাশিতব্য 'একটি বোনের ডাক শোনে' বইয়ে বিস্তারিত আলাপ করেছি। এখানে সংক্ষেপে শুধুমাত্র কয়েকজন শাসকের গাইরতের নমুনা উল্লেখ করাই উদ্দেশ্য ছিল।
টিকাঃ
১ তারিখুল ইসলাম ওয়া ওয়াফায়াতুল মাশাহির ওয়াল আলাম : ১/২২৭, শামসুদ্দিন যাহাবি; আন-নুজুমুয যাহিরাহ ফি মুলুকিল মিসর ওয়াল কাহিরাহ : ৭/২১১, ইবনে তাগরি বারদি; মুফাররিজুল কুরুব ওয়া মুফাররিহুল কুলুব: ১/১৪৮, ইউসুফ বিন ইসমাইল নাবহানি।
📄 মুমিন তো গাইরতমান্দ হয়ে থাকে
আগেই বলে এসেছি, আল্লাহর গাইরত সবচেয়ে বেশি। এরপর রাসুলের। এরপর তাঁর সাহাবিদের। এরপর উম্মাহর মুমিনদের। মুমিনের মাঝে অবশ্যই গাইরাত থাকতে হবে। যে মুমিনের মধ্যে গাইরত নেই, সে মুমিন; তবে পরিপূর্ণ মুমিন নয়। গাইরতের সম্পর্কটা ঈমানের সাথে। ইসলামের সাথে। এরপর ব্যক্তিগত মান-ইজ্জতের সাথে। মুমিনের যে গাইরত থাকতে হয়, এটা স্বয়ং নবি কারিম ﷺ বলে গেছেন। হাদিসে এসেছে—
عن أبي هريرة رضي الله عنه، قال : قال رسول الله : إن الله يغار، وإن المؤمن يغار.
আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন, 'নিশ্চয় আল্লাহ তা আ'লার গাইরত আছে। নিশ্চয় মুমিনেরও গাইরত হয়ে থাকে।’১
অন্য হাদিসে নবিজি ﷺ মুমিনের গাইরতের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে দুই বা তিনবার উল্লেখ করেছেন। হাদিসটা হলো—
عن أبي هريرة أن رسول الله ﷺ قال : المؤمن المؤمن مرتين أو ثلاثا يغار يغار والله أشد غيرا.
আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল ﷺ বলেছেন, 'নিশ্চয় মুমিন গাইরতওয়ালা হবে, নিশ্চয় মুমিন গাইরতওয়ালা হবে, নিশ্চয় মুমিন গাইরতওয়ালা হবে।' চতুর্থবারে বলেছেন, 'আল্লাহ সবচেয়ে বেশি গাইরতবান।'২
একজন মুমিনের জীবনে গাইরতের গুরুত্ব এতটাই বেশি যে, ইমাম বুখারি রহ. পর্যন্ত 'বাবুল গাইরাহ' নামে আলাদা এক পরিচ্ছেদই রচনা করেছেন সহিহ বুখারি শরিফে।
উক্ত পরিচ্ছেদটি এনেছেন 'কিতাবুন নিকাহ' তথা বিবাহ অধ্যায়ের অধীনে। বোঝাতে চেয়েছেন-গাইরতের সম্পর্কটা বিবাহের সাথে; বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ স্বামী-স্ত্রীর মাঝে গাইরত থাকতে হয়।
আমার তো মনে হয়, বিবাহের সাথে গাইরতের শুধু সম্পর্কই নয়; গাইরত হলো বৈবাহিক জীবনের রূহ বা আত্মা। রূহ ছাড়া যেভাবে কোনো প্রাণী বাঁচতে পারে না, গাইরত ছাড়াও কোনো দাম্পত্যজীবন সুখের হতে পারে না। স্ত্রী যদি পরপুরুষের সাথে ভাব জমায় কিংবা স্বামী যদি পরনারীর সাথে ভাব জমায়, এমতাবস্থায় কারও যদি গাইরত জেগে না ওঠে, তাহলে তো বৈবাহিক জীবনের সুখ লাইফ সাপোর্টে!
মনে রাখতে হবে, পুরুষের গাইরত শুধুমাত্র তার স্ত্রীর ক্ষেত্রেই জড়িত নয়; বরং তার মা, বোন, কন্যা, নাতনি, ভাতিজি, ভাগ্নি, ফুফু, খালা, চাচি, দাদি, নানি; এক কথায় তার রক্তের সম্পর্কীয় সকল নারীলোকের সাথেই জড়িত। এদের কারও সাথেই নন-মাহরাম কারও সামান্যতম সংস্পর্শও কোনো পুরুষের গাইরত মেনে নেওয়ার কথা নয়।
আমাদের আলোচ্য গাইরত দ্বারা এটাই উদ্দেশ্য। অবশ্য গাইরত বলতে সাধারণত স্বামী-স্ত্রীর সাথে জড়িতটাই বোঝায়, তাই আমাদের লেখনীর বেশিরভাগই সেটাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে।
এই গাইরতই একজন পুরুষের কাছে ইসলামের আকাঙ্ক্ষিত চাহিদা। কিন্তু আফসোসের ব্যাপার, এখানে শুধু ঘাটতিই নয়; চরম সীমার খেয়ানতের পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে মুসলিম কমিউনিটির পুরুষেরা। শুধুমাত্র কিছু মজবুত দ্বীনদার লোক ছাড়া সমাজের বেশিরভাগ পুরুষ এই জায়গায় আটকা। এমনকি বহু লেবাসধারী দ্বীনদার পুরুষও জানেই না-দ্বীনের সাথে গাইরতের সম্পর্ক কতটুকু?
দেশের নামি-দামি এক অভিনেত্রীর একমাত্র অভিভাবক হলেন তার নানা। বেচারার মুখের দাড়ি, মাথার টুপি আর গায়ের পাঞ্জাবি দেখলে মনে হয়, যেন ফেরেশতা চরিত্রের এক বুজুর্গ। কিন্তু নাতনিকে সেই তিনিই মিডিয়ায় আসতে উৎসাহ যুগিয়েছেন! এমনকি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অর্ধ উলঙ্গ নাতনির সাথে তিনিও নাচানাচি করেছেন!
ইসলামি ফাউন্ডেশনের একজন সাবেক ডিজিকে দেখলে মনে হতো, কুরআন-কিতাব পড়ুয়া আলেম। বেশভূষায় রীতিমতো দরবেশ মনে হতো। কিন্তু তার বেপর্দা-বেলাজ মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে নাচন-কোঁদনের আয়োজন করলেন তিনিই এবং বসে থেকে উপভোগও করলেন! এই হলো লেবাসধারীদের দ্বীনের হালত!
অনেক মসজিদের সভাপতি কিংবা সেক্রেটারির স্ত্রী-কন্যাদের অবস্থা বড়োই করুণ হয়। মসজিদের উন্নতির জন্য তাদের চিন্তার শেষ নেই। ওদিকে ফ্যামিলিতে স্ত্রী ও কন্যাদের দ্বীনি উন্নতির ন্যূনতম কোনো চিন্তাই নেই! ওয়াড্রোব থেকে ইস্ত্রি করা পাজামা আর পাঞ্জাবিটা পরে আতর লাগিয়ে তারা যখন জুমা পড়তে মসজিদে আসেন, তখন স্ত্রী সাজুগুজু করে মার্কেট করতে বেরিয়ে যায়! আর মেয়ে বয়ফ্রেন্ডের সাথে কোনো পার্কে মিট করার জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকে!
একজন মুমিন পুরুষ কীভাবে এটা সহ্য করতে পারে—তার স্ত্রী, বা কন্যা, অথবা বোন সাজুগুজু করে বেপর্দা হয়ে মার্কেটে যাবে, পার্কে বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে অন্তরঙ্গ মুহূর্ত কাটাবে, ট্যুরের নাম করে অন্য পুরুষের সাথে ঘুরতে বেরিয়ে পড়বে, ছেলে বন্ধুদের সাথে চিল করবে, নানা ইভেন্টে অংশ নেবে, অর্ধনগ্ন হয়ে নাগিনি ড্যান্সের সাথে হলি উদযাপন করবে! আবার এসব কিছুর ভিডিও ধারণ করে অনলাইনে শেয়ার করবে!
গাইরতহীনতা অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে যে, সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিউয়ের মাধ্যমে সামান্য কয়টা টাকা কামানোর ধান্দায় বহু পুরুষ তার বউকে রীতিমতো 'অনলাইন ব্যাভিচারিণী' বানিয়ে ছাড়ছে! এটাকে তারা নাম দিয়েছে—'কাপল ব্লগ'! আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, সোশ্যাল মিডিয়ায় এই কাপল ব্লগ আবার বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে! শিক্ষিত এলিট শ্রেণি থেকে নিয়ে অশিক্ষিত টোকাইরাও এখন কাপল ব্লগ বানায়! টোকাইদের কাপল ব্লগে গিয়ে আবার শিক্ষিত শ্রেণি ভালো লাগার কমেন্টও করে!
স্বামী-স্ত্রী বেডরুমে একান্তভাবে যা করে, গাইরতহীন কাপল ব্লগাররা সোশ্যাল মিডিয়ায় তা-ই করে! অত্যন্ত নোংরাভাবে স্ত্রীকে ধরে টানাটানি, জড়াজড়ি, মারামারি, ইয়ার্কি, চুমাচুমি—সবই করে তারা। এসব করতে গিয়ে অনেক সময় স্ত্রীকে একবার ওল্টায়, তো আরেকবার পাল্টায়! মিডিয়ায় আবার সেই দৃশ্য দেখে সারা দুনিয়ার লাখো-কোটি মানুষ। নিজের স্ত্রীকে উল্টিয়ে-পাল্টিয়ে উঁচুনিচু অঙ্গগুলো দেখাচ্ছে সারা দুনিয়াবাসীকে—এর চেয়ে গাইরতহীন পুরুষ আর কেউ হতে পারে?!
সেই ভিডিওর কমেন্টবক্সে আবার অনেক অসভ্য লোক মন্তব্য করছে—ওয়াও.. সেক্সি.. আরও কত কী যা ভাষায় প্রকাশ করার মত না! কাপল ব্লগার স্বামী আবার সেগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ছে। তবুও তার গাইরতে একটুও আঘাত হানছে না! ছিঃ! এমন পুরুষ তো স্বামী হওয়ার যোগ্যতাই রাখে না! এমন স্বামীর স্ত্রীও গাইরতহীন। স্ত্রীর অভিভাবকরাও গাইরতহীন। তাদের মেয়েকে নিয়ে জামাইয়ের এমন অসভ্যতা দেখেও তারা মেয়েকে এই জামাইয়ের কাছে রাখে কী করে!
আফসোস! ইমানের গাইরত কতটা তলানিতে গেলে একজন মুমিন অভিভাবক এসব দেখেও না দেখার ভান করে! লাইফের এঞ্জয় মনে করে! আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে—মনে করে! এদের অবস্থাদৃষ্টে তো মনে হয়, স্ত্রী ও কন্যা যদি বেডরুমে পরপুরুষকে নিয়েও আসে, তবুও তাদের কোনো ভাবান্তর হবে না! নবিজির সাহাবি যেখানে এক কোপে কল্লা ফেলে দিতে চেয়েছেন, তারা সেখানে নির্বিকার! ধিক ওইসব পুরুষদের!
তবে কথায় আছে, ‘মেঘ দেখে তুই করিসনে ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে’। মুসলিম সমাজের এতসব দ্বীনহীন ও গাইরতহীন পুরুষের ভিড়েও আল্লাহর এমনকিছু বান্দা আজও বেঁচে আছেন, যাদের গাইরত দেখলে অবাক লাগে।
আমার এক উস্তাদের মুখ থেকে শুনেছি। লোকটা মুসল্লি ছিলেন। একসময় সপরিবারে আমেরিকা প্রবাসী ছিলেন। এখন পরিবার সেখানে রেখে, মার্কিন নাগরিকত্ব ক্যানসেল করে দেশে স্থায়ী হয়েছেন। এখানে আরেকটি বিয়ে করে দ্বিতীয় সংসারে বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে সুখেই দিনাতিপাত করছেন। তাকে দেখলে মনে হয় না, আমেরিকায় যে তার আরেক সংসার আছে!
উস্তাদ একদিন লোকটিকে জিজ্ঞেস করলেন, আমেরিকায় সবকিছু ফেলে রেখে দেশে এসে কেন থিতু হলেন? জবাবে লোকটা যা বলেছিলেন, তা আমেরিকার গ্রিনকার্ডের স্বপ্নচারী যেকোনো মুমিনের জন্য ভাবনার বিষয়। লোকটি বললেন—বউ পরকীয়ায় জড়িত; অফিসের কলিগদের সাথে নিয়মিত লং ড্রাইভে যায়। মেয়ে নাইটক্লাবে নাচানাচি করে বয়ফ্রেন্ডের সাথে মদ খেয়ে সেখানেই বুঁদ হয়ে পড়ে থাকে। আর ছেলে তার বেডরুমে গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে ঘুমায়!
অনেক চেষ্টা করেও এদেরকে দ্বীনে আনতে পারেননি তিনি। নিজের ভুল নিজেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন বলে সময় থাকতে থাকতেই ওদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে দেশে এসে আরেক সংসার শুরু করেছেন। যাতে এই সন্তানগুলো মরলে পরে তার নাজাতের উসিলা হয়। কিন্তু ভয়ে আছেন, তার যে বয়স; তাতে এই বাচ্চাগুলোকে দ্বীন শিখিয়ে মানুষ করে যেতে পারবেন কিনা!
টিকাঃ
১ সহিহ বুখারি : ৫২২৩; সহিহ মুসলিম: ২৭৬১।
২ সহিহ মুসলিম: ২৭৬১; মুসনাদে আহমাদ: ৭৯৩৪।