📄 মুসলিম শাসকদের গাইরতের ঝলক
আজ মুসলিম উম্মাহ যে ক্রান্তিলগ্ন পাড়ি দিয়ে যাচ্ছে, এক সময় সেটা ছিল না; আমাদের একটা সোনালি অতীত ছিল। তখন পৃথিবীটা আমাদের পদতলে এসে ঠাঁই নিয়েছিল। গোটা দুনিয়াতেই ছিল মুসলিম উম্মাহর দাপট। উমাইয়া, আব্বাসি, উসমানি—বড় তিনটি খিলাফত ছাড়াও অসংখ্য ছোটো-বড়ো ইসলামি সাম্রাজ্যের প্রতাপে থরথর করে কাঁপত কাফেররা।
দুনিয়ার কোনো প্রান্তে কোনো মুসলিমের গায়ে হাত তুলতে সাতপাঁচ ভাবতে হতো কাফেরদের। আজকের মতো মুসলিম বোনদের ইজ্জত অত সস্তা ছিল না। মুসলিম বোনদের কারও গায়ে 'ফুলের টোকা' দিতেও সাহস করতে পারত না কোনো কাফের।
দুনিয়ার কোনো প্রান্তে কোনো কাফেরের বাচ্চা উম্মাহর কোনো বোনের গায়ে হাত দিলে সেই বোন সময়ের প্রতাপশালী মুসলিম শাসকের নাম ধরে আর্তচিৎকার করে উঠতেন। দুনিয়ার অপর প্রান্ত হতে একটিমাত্র বোনের ডাক শুনে এ প্রান্ত থেকে গাইরতসম্পন্ন মুসলিম শাসক ‘লাব্বাইক’ বলে সাড়া দিতেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে।
এরপর...। এরপর যা ঘটত, তা ইতিহাস। গাইরতসম্পন্ন মুসলিম শাসক রীতিমতো বইয়ে দিতেন ছোটখাটো কোনো কিয়ামত। দুনিয়াবাসীকে দেখিয়ে দিতেন—মুসলিম উম্মাহর গাইরত, শৌর্যবীর্য, ক্ষমতা, প্রভাব, প্রতিপত্তি ও দাপট।
সিন্ধুর উপকূলে জলদস্যুদের কবলে পড়ে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের নাম ধরে এক আরব নারী আর্তচিৎকার করলে মুহাম্মাদ বিন কাসিম এগিয়ে এসে সিন্ধু বিজয় করেন।
স্পেনের ভিজিগথিক রাজা রডারিকের হেরেমে লালিত খ্রিষ্টান কিশোরী কন্যা ফ্লোরিডার কান্নার খবর শুনে জিব্রালটার প্রণালি পাড়ি দিয়ে গিয়ে তারিক বিন যিয়াদ স্পেন বিজয় করেন।
ইস্পারটা শহরে খলিফা মুতাসিম বিল্লাহর নাম ধরে এক হাশিমী নারী ফরিয়াদ করলে দুনিয়া কাঁপিয়ে ছুটে যান খলিফা মুতাসিম। আঘাত করেন বাইজেন্টাইনদের একেবারে অন্তরে। আমাদের দাপট ও প্রতাপের এসব গৌরবগাথা তো বহু। কয়টাই বা উল্লেখ করা যায়!
উম্মাহর ওই গাইরতমন্দ শাসকগণই মূলত 'মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি' কথাটির প্রকৃষ্ট উদাহরণ। উম্মাহর বোনদের ইজ্জত বাঁচাতে তাঁরা প্রয়োজনে জীবন বাজি রাখতেন! পৃথিবীর যেকোনো দিগন্ত থেকে মজলুম বোনের আর্তনাদ শুনলেই জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে তাঁরা দুনিয়া তোলপাড় করে মারমার রবে এগিয়ে যেতেন সেই বোনকে উদ্ধার করতে। এভাবেই তাঁরা পরিচয় দিতেন গাইরতের, উম্মাহবোধের। জানান দিতেন শোণিত চেতনা, বদ্ধমূল ইমান ও তেজোদীপ্ত পুরুষত্বের।
আজ মুসলিম উম্মাহ নিঃস্ব, অসহায়। তাদের কিছুই নেই। পশ্চিমা রাজনীতির সূক্ষ্ম চালে তাদের দ্বীন রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। দেশে দেশে জাতীয়তাবাদের দেওয়াল তুলে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে উম্মাহর ভ্রাতৃত্ববোধ। এভাবেই বৈশ্বিক পরিসরে তাদেরকে একটি অকর্ম, অথর্ব, হীনমন্য, বিকলাঙ্গ ও মেরুদণ্ডহীন জাতিতে রূপান্তরিত করা হয়েছে।
তাইতো আজ দুনিয়ার দিকে দিকে মুসলিম উম্মাহ নির্যাতিত, নিপীড়িত, নিষ্পেষিত, লাঞ্ছিত ও বঞ্চিত। উম্মাহর মুসলিম বোনদের ইজ্জত ভূলুণ্ঠিত। পৃথিবীর এখানে-ওখানে জালিমশাহীর কারাগারে উম্মাহর সম্ভ্রমহারা বোনদের ফরিয়াদ কানে বাজলেও এই উম্মাহর মধ্যে কোনো মুহাম্মাদ বিন কাসিম নেই! কিছুই করতে পারে না উম্মাহ! আর কিছু করবেই বা কীভাবে; এই উম্মাহ তো হলো কফিনে শোয়ানো একটি লাশমাত্র!
আজ পাকিস্তানের ড. আফিয়া সিদ্দিকি, ইরাকের ফাতিমা ও নূর, বসনিয়ার নুসরেতা, ভারতের সাদিয়া মুবিন, কাশ্মীরের নাফিসা উমর, সিরিয়ার হাদা, ফিলিস্তিনের আনহার-আদদীক ও উইঘুরের মিহিরগুল তুরসুনসহ পৃথিবীর দিকে দিকে মজলুম বোনদের বুকফাটা আহাজারি শুনতে পায় উম্মাহ, কিন্তু কিছুই করতে পারে না! কারণ, এই উম্মাহর দ্বীনকে ব্যক্তিজীবনে সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে আর রাষ্ট্রকে দ্বীন থেকে আলগা করে নেওয়া হয়েছে। ভ্রাতৃত্বঘাতী জাতীয়তাবোধের বীজ বপন করে দেওয়ার মাধ্যমে উম্মাহবোধ তথা মুসলিম হিসেবে একজাতিসত্ত্বাবোধকে টুটি টিপে মেরে ফেলা হয়েছে।
ফলে ওই সকল মজলুম বোনদেরকে পাকিস্তানি, ইরাকি, বসনিয়ান, ভারতীয়, ফিলিস্তিনি, তুর্কিস্তানি ইত্যাদি দেশীয় বা জাতীয় ভেবে এবং তাদের ওপর কৃত জুলুমকে তাদের নিজেদের দেশীয় বা জাতীয় সমস্যা মনে করে উম্মাহ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছে!
এই বোনদের প্রত্যেকেই মুসলিমদের জন্য প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও সংকীর্ণ হয়ে যাওয়া এই পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের বাসিন্দা। তাঁদের অন্তর বিদীর্ণকারী আহাজারি গোটা মুসলিম বিশ্বে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে, যা তাঁরা সাম্রাজ্যবাদী জালিমের কারাগার থেকে করেছেন। আহাজারির মাধ্যমে তারা উম্মাহর ঘুমন্ত বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছেন। যদিও মেরুদণ্ডহীন উম্মাহর গাইরতহীন শাসকরা তাদের আর্তনাদে সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা রাখেনি!’
টিকাঃ
১ কথাগুলো আমার প্রকাশিতব্য 'একটি বোনের ডাক শোনে' বই থেকে ঈষৎ পরিমার্জন করে নেওয়া। বইটি হুদহুদ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হবে ইনশাআল্লাহ।
📄 নারীর ইজ্জতহানিতে সাহাবির গাইরত
হিজরতের আগে মদিনার নাম ছিল ইয়াসরিব। নবিজি হিজরত করে আসার পর এর নাম রাখেন-মদিনা। মদিনা ছিল ইহুদি অধ্যুষিত এলাকা। এখানে বনু কাইনুকা, বনু নাজির ও বনু কুরাইজা নামে বড় বড় তিনটি ইহুদি গোত্র বসবাস করত।
গোটা মদিনার সমাজনীতি, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে এদের দাপট ছিল। এজন্য হিজরতের পর প্রথমে এদের সাথে সমঝোতা করতে বাধ্য হয়েছিলেন নবিজি। কিন্তু এদের চুক্তিভঙ্গ ও কূটচালের কারণে বাধ্য হয়েই নবিজি এদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছিলেন। একে একে সবাইকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন মদিনা থেকে। প্রথমেই যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতে হয়েছিল নবিজিকে, তারা হলো বনু কাইনুকা।
মদিনায় বেশ কয়েকটি বাজার ছিল। একটি বাজার ছিল বনু কাইনুকার মহল্লায়। বেচাবিক্রির ও সওদাপাতির জন্য মদিনার মুসলিম ও মুশরিকরাও ওই বাজারে যেতেন। মুসলিম নারীরাও যেতেন। তখনও পর্দার বিধান আসেনি।
সেদিন একজন নারী সাহাবি বনু কাইনুকার বাজারে গেলেন। কিছু পণ্য নিয়ে। বিক্রি করবেন বলে। এক ইহুদি স্বর্ণকারের কাছে বসলেন তিনি। বসে বসে একটি হার খরিদ করার জন্য দরদাম করতে লাগলেন।
সুযোগ পেয়ে গেল বজ্জাত ইহুদিরা। তারা তাঁকে নিয়ে হাসি তামাশায় মেতে উঠল। তাঁর মুখ থেকে পর্দা সরিয়ে উন্মুক্ত করতে চাইল। তাঁর রূপ-সৌন্দর্য অবলোকন করে তাদের অসুস্থ মন তৃপ্ত করার পাশাপাশি তাঁকে লাঞ্ছিতও করতে চেয়েছিল তারা। আর এটাই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য।
গাইব্রতওয়ালি ওই নারী সাহাবি সেই নাজুক পরিস্থিতিতেও নিজের ইজ্জত-রক্ষার ব্যাপারে খুবই সচেতন ছিলেন। তিনি বারবার তাঁর ঘোমটা টেনে ধরতে লাগলেন। দুর্মাতি ইহুদিরা এদিক দিয়ে তেমন সুবিধা করতে না পেরে অন্য ফন্দি আঁটতে লাগল। তাদের মধ্য থেকে কোনো এক কুলাঙ্গার চুপিসারে ওই নারী সাহাবির পেছনে গিয়ে ওত পেতে বসে রইল।
ওই মহিলা সাহাবি বসা ছিলেন। কুলাঙ্গারটা মহিলার পেছন দিকের কাপড়ের একটা অংশ পিঠের সঙ্গে বেঁধে রাখল। অথচ, তিনি সম্পূর্ণ বেখবর। এত কিছু ঘটে গেল— মোটেও টের পেলেন না। তিনি দিব্যি হারের দরদাম করে যেতে থাকলেন।
কিছুক্ষণ পর। মহিলা সাহাবি উঠতে গেলেন। অমনি তাঁর দেহের নিম্নাংশ দিগম্বর হয়ে গেল! উন্মুক্ত হয়ে গেল তাঁর লজ্জাস্থান! কুলাঙ্গার ইহুদিরা এমনই এক অবস্থার প্রতীক্ষায় ছিল। মহিলা সাহাবিকে উলঙ্গ হয়ে যেতে দেখে তারা হাসতে হাসতে লুটোপুটি খেতে লাগল। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছিল, যেন একপাল হায়েনার মাঝখানে অসহায় অবলা এক হরিণী!
জীবনে এমনভাবে বেইজ্জত হতে হয়নি ওই নারী সাহাবিকে। এই বেইজ্জতির আগে তাঁর মরে যাওয়াই ভালো ছিল। সীমাহীন লজ্জায় তিনি নিজেকে খুবই অসহায় হিসেবে আবিষ্কার করলেন। নিজের ইজ্জত ভূলুণ্ঠিত হতে দেখে তিনি আর্তনাদ করে ওঠলেন।
ইহুদিদের বাজারে এক নারী সাহাবির আর্তনাদে সাড়া দিয়ে কোত্থেকে এক সাহাবি দৌড়ে ছুটে এলেন। এসেই তিনি নারীকে চিৎকারের কারণ জিজ্ঞেস করলেন। নারী সাহাবি সব খুলে বললেন। শুনে তো ওই মুসলিম ব্যক্তির মাথায় রক্ত চড়ে গেল! তাঁর মাথায় খুন চেপে বসল। তিনি ঘৃণ্য এই ঘটনার মূল হোতা কুলাঙ্গার ইহুদিকে হত্যা করে তাঁর তপ্ত খুন ঠান্ডা করলেন।
বাকিটা পুরোই ইতিহাস। এ রকম কোনো দাঙ্গারই যেন অপেক্ষায় ছিল ইহুদিরা। সেই সুযোগ এসে যেতেই গোটা বনু কাইনুকা ফুঁসে উঠল। তারা হই হই রই রই করে হাতিয়ার নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল ওই সাহাবির ওপর। কুপিয়ে কুপিয়ে তাঁকে শহিদ করে দিলো।
ইহুদিদের হাতে একজন সাহাবিকে হত্যার শিকার হতে দেখে মুসলমানেরাও আর বসে রইলেন না; তারা ফুঁসে ওঠলেন। অন্যান্য মুসলমানদেরকে জড়ো করতে তারা ডাকাডাকি আরম্ভ করলেন। খবর পেয়ে প্রতিশোধস্পৃহায় ধেয়ে এলো বাকি মুসলমানেরা। ব্যস, শুরু হলো ইহুদি-মুসলিমদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ!
ঘটনাটি দ্বিতীয় হিজরির শাওয়াল মাসের মাঝামাঝি সময়ের। রমজানে সংঘটিত বদর যুদ্ধের পর। মদিনার মাটিতে এটাই ছিল সবচেয়ে মারাত্মক ঘটনা। ইহুদি-মুসলিমদের মধ্যে প্রকাশ্য রক্তপাত। কেননা, বনু কাইনুকার ইহুদিগোষ্ঠী মিলে একজন মুসলিমকে হত্যা করেছে। আর তা-ও তাদের পক্ষ থেকে জঘন্য একটি অপরাধকে কেন্দ্র করে!
মুসলমানদের সাথে কৃত চুক্তি লঙ্ঘনের এরচেয়ে বড় আর কোনো আলামত হতে পারে কী?
ইহুদিদের দুঃসাহসপূর্ণ এই ঘটনার খবর মদিনার ইসলামি রাষ্ট্রনায়ক নবি মুহাম্মাদ ﷺ-এর কানে গিয়ে পৌঁছায়। শুনতেই তিনি ক্ষোভে ফুঁসে উঠলেন। ইসলামি রাষ্ট্রেই একজন মুসলিম বোনকে লাঞ্ছিত করার মতো ধৃষ্টতা দেখিয়েছে চুক্তিবদ্ধ ইহুদিরা!
এখানেই শেষ নয়; এর জের ধরে সকলে মিলে হত্যা করেছে একজন মুসলিমকে! সাহস তো কম নয় ইহুদিদের! বেশ বড় হয়ে গেছে তাদের বুকের পাটা! ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে লাগাতার ষড়যন্ত্র ও অপ্রীতিকর মন্তব্যের পর এখন তারা রক্তপাতে পৌঁছে গেছে! তার মানে এদেরকে ঢিল দেওয়ার সুযোগে এরা তাদের অপরাধের শেষ সীমায় এসে পৌঁছেছে!
না, এটা হতে পারে না; এখনই এদেরকে শায়েস্তা করতে হবে। উচিত শিক্ষা দিতে হবে। ইসলামি রাষ্ট্রের শান্তি ও শৃঙ্খলার জন্য মারাত্মক হুমকি ইহুদিদের দুষ্ট এই গোষ্ঠীকে সবার আগে মদিনা থেকে তাড়িয়ে দিতে হবে। ইসলামি রাষ্ট্রের সীমানা থেকে বের করে আগাছা সাফ করতেই হবে। নইলে অদূর ভবিষ্যতে এরা আরও জঘন্য হয়ে উঠবে। মদিনার ইসলামি সার্বভৌমত্বের জন্য হবে একটা অসহ্য বিষফোঁড়া। জাতে তো এরা বনি ইসরাইল; মানব ইতিহাসের সবচেয়ে দুষ্ট জাতি। নবি রাসুলদের হত্যাকারী। তাঁদের সাথে বেয়াদবির সাক্ষর স্থাপনকারী। আল্লাহর অভিশাপ নিয়ে বেঁচে থাকা এক অসভ্য জাতি।
সাহাবাদেরকে অবিলম্বে বনু কাইনুকার দুর্গ ঘেরাও করার হুকুম দিলেন রাসুল ﷺ। হুকুম পেতেই রণসাজে সজ্জিত হয়ে গেলেন সাহাবায়ে কেরام। আবু লুবাবা ইবনুল মুনজির রা.-কে মদিনার গভর্নর সাব্যস্ত করে হামজা রা.-এর হাতে যুদ্ধের পতাকা দিয়ে সাতশো মুজাহিদ নিয়ে বনু কাইনুকার বসতি অভিমুখে রওনা হয়ে গেলেন সাহাবায়ে কেরام।
কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, এতদিন যাবৎ হম্বিতম্বি করা এবং বীরত্ব ও বাহাদুরির ফাঁকা বুলি আওড়িয়ে আসা বনু কাইনুকার ইহুদিরা মুসলিমদের আগমনের খবর পেতেই চোখে সরষে ফুল দেখতে আরম্ভ করল। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে তারা দুর্গে প্রবেশ করে ফটক লাগিয়ে দিলো!
মুজাহিদ-বাহিনী বনু কাইনুকার দুর্গ অবরোধ করে নিলেন। লাগাতার ১৫ দিন অবরোধ অব্যাহত রইল। অবরোধ চলাকালেই জিলকদের চাঁদ উদিত হয়ে গেল। এর ভেতরে ভীতু ইহুদিদের বাইরে বের হওয়ার নামগন্ধ পর্যন্ত দেখা গেল না! অথচ, এই এদেরই হুমকি-ধামকিতে মদিনায় মুসলিমদের টিকে থাকা দায় ছিল!
দীর্ঘ অবরোধের কবলে পড়ে ইহুদিরা মানবেতর জীবনাযাপন করতে থাকল। ভয় ও আতঙ্ক গ্রাস করে নিল তাদেরকে। বাধ্য হয়ে তারা রাসুল-এর ফয়সালা মাথা পেতে মেনে নিতে রাজি হলো। রাসুল বনু কাইনুকার পুরুষ, নারী ও সন্তানদের পিছমোড়া করে বাঁধার নির্দেশ দিলেন। আদেশানুসারে তাদেরকে পিছমোড়া করে বেঁধে নেওয়া হলো। এরপর তাদেরকে লাঞ্ছিত অবস্থায় মদিনা থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হলো।১
টিকাঃ
১ উন্মুনুল আসার: ১/২৯৫, ইমাম ইবনে সায়্যিদিন নাস; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া : ৪/৩, ইমাম ইবনে কাসির; কিতাবুল মাগাজি: ১/১৭৬, ইমাম ওয়াকিদি; যাদুল মাআদ: ২/৭১-৯১, ইবনে কাইয়িমিল জাওজিয়্যাহ; আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ : ১/৫০৩-৫৫৫, ইবনে হিশাম হিময়ারি; আত-তাবাকাতুল কুবরা : ২/২৯, ইমাম ইবনে সাদ জুহরি; আর-রাহিকুল মাখতুম : ২০৩, সাফিউর রহমান মুবারকপুরি।
📄 হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের গাইরত
দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র আজকের শ্রীলঙ্কাকে সে সময় 'জাজিরাতুল ইয়াকুত' বলা হতো। আরব সাগর হয়ে ভারত মহাসাগর যাওয়ার পথে জাজিরাতুল ইয়াকুতের কূলঘেঁষেই আসা-যাওয়া করত আরবদের বাণিজ্যিক জাহাজ। বাণিজ্যিক সূত্রে আরব বণিকেরা 여기 নোঙর করত। এখানেই কাটাত বহুদিন। প্রলম্বিত এ সফরে তারা স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়েই দূরদেশের উদ্দেশে তুলত জাহাজের পাল। স্বদেশে ফিরে আসতে লেগে যেত মাসের পর মাস, কিংবা বছরের পর বছর। কারও বা আর ফিরে আসা হতো না; বাধা হয়ে দাঁড়াত মৃত্যু।
জাজিরাতুল ইয়াকুতে আরব বণিকদের অনেকেই মৃত্যুবরণ করেন। তাদের পরিবার-পরিজন সেখানেই থেকে যায়। এখানকার রাজা তখন পরলোকগত বণিকদের স্ত্রী ও সন্তানদের স্বদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। সাথে উমাইয়া খিলাফতের খলিফা ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিক এবং খিলাফত কর্তৃক নিযুক্ত ইরাকের শাসক হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের জন্য হীরা, জহরত, মণি-মুক্তাসহ প্রচুর দামি দামি উপঢৌকনাদি প্রেরণ করেন।
তৎকালীন বিশ্বের পরাশক্তি ছিল উমাইয়া খিলাফত। অর্ধ পৃথিবী জুড়ে যার সীমানা ছিল বিস্তৃত! এসব উপঢৌকন প্রেরণের মানে খিলাফতের সাথে বন্ধুপ্রতীম সম্পর্ক স্থাপন করা। মন জয় করা। স্বয়ং বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য যেখানে উমাইয়া খিলাফতকে প্রণাম ঠুকে, সেখানে জাজিরাতুল ইয়াকুতের মতো সমুদ্রবেষ্টিত ছোট্ট একটি দ্বীপ রাজ্যের উমাইয়া খিলাফতের মন জয় না করে উপায় আছে!
জাজিরাতুল ইয়াকুতের সমুদ্রকূলে আটটি জাহাজ নোঙর করে রাখা হয় রাজার নির্দেশে। এগুলোর কয়েকটিতে মৃত আরব বণিকদের স্ত্রী ও সন্তানদের উঠানো হয়। আরও কয়েকটি বোঝাই করা হয় চোখ ধাঁধানো উপঢৌকনাদি দিয়ে। সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে রাজার অনুমতি আসে। নাবিক ও মাল্লারা একযোগে জাহাজগুলোর পাল তোলে। গন্তব্য—ভারত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে আরব সাগর হয়ে হাজ্জাজের ইরাক। বাতাসের ঠেলায় সাগরের বুক চিরে জাহাজগুলো আস্তে আস্তে এগোতে থাকে।
পালতোলা জাহাজগুলো তখন ভারত মহাসাগরের ঠিক মাঝখানে। আচমকা শুরু হয় ঝড়-তুফান! ভয়ংকর গর্জনে সমুদ্রের রাশি রাশি ঢেউ আঘাত করতে থাকে জাহাজে। যাত্রীদের তো পিলে চমকে ওঠে! জাহাজগুলোর দিক ঠিক রাখতে ব্যর্থ হয় নাবিকেরা। তবুও বাঁচার আশায় শেষ চেষ্টাটুকু করে যায়। কিন্তু আর কত? একসময় তারা হার মানে। প্রবল বাতাসের ঝাপটায় দুলতে দুলতে জাহাজগুলো সিন্ধুর দেবল (১) বন্দরে এসে আছড়ে পড়ে।
কথায় আছে, 'যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই রাত হয়'। জাহাজগুলো সিন্ধুর জলদস্যুদের কবলে পড়ে। অনায়াসে শিকার হাতের মুঠোয় আসতে দেখে তারা তো বেজায় খুশি। একযোগে তারা জাহাজগুলোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। দীর্ঘক্ষণ ঝড়ো হাওয়ার সাথে লড়াই করে অসাড় দেহের মাল্লা-মাঝিরা তখন নির্বিকার। নিজেদেরকে ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেওয়া ছাড়া তাদের করার আর কিছুই ছিল না। সবগুলো জাহাজে কান্নার রোল ওঠে। নির্দয় দস্যুরা নাবিক, মাল্লা ও বণিকদের হত্যা করে। জাহাজগুলোর সব মালামাল ও উপঢৌকনাদি লুট করে।
দস্যুরা মৃত বণিকদের বিধবা স্ত্রী ও সন্তানদের বন্দি করে নিয়ে যায়। ভাগ্যবিড়ম্বিতা এইসব বন্দিনীদের মধ্যে আরবের 'ইয়ারবু' গোত্রের অত্যন্ত সম্মানিতা একজন নারী ছিলেন। জীবন খোয়ানোর ভয় কেটে গেলেও এবার জলদস্যুদের হাতে ইজ্জত খোয়ানোর ভয়ে তিনি আর্তচিৎকার করে ওঠেন। 'হায় হাজ্জাজ, বাঁচাও! হায় হাজ্জাজ, বাঁচাও!' বলে তিনি আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে তোলেন।
জলদস্যুদের খপ্পর থেকে কোনোরকম জান নিয়ে বাঁচতে পারেন একজন আরব বণিক। তিনি অন্য আরেকটি ব্যবসায়িক জাহাজে চড়ে চলেন ইরাক পানে। ভারত মহাসাগর হয়ে আরব সাগর পাড়ি দিয়ে পৌঁছান ইরাকে। হাজ্জাজ বিন ইউসুফের দরবারে। অত্যন্ত ভীতবিহ্বল হয়ে, বিচলিত চিত্তে তিনি পুরো লোমহর্ষক ঘটনা বর্ণনা করেন হাজ্জাজের সামনে।
ইতিহাসের রক্তখেকো কুখ্যাত হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ক্ষেত্রে খুবই নির্দয় হলেও নিরীহ-নিপীড়িতদের ক্ষেত্রে ছিলেন খুবই সদয়। অন্তর বিদীর্ণকারী এই দুঃসংবাদ শুনতেই তিনি রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠেন!
পলাতক আরব বণিক তখনও তার কথা সম্পূর্ণ করতে পারেননি। হাজ্জাজের অগ্নিমূর্তি-ধারণ কথায় বাধ সেধে ফেলেছিল। সুযোগ পেতেই বণিক আবারও কথা চালিয়ে যেতে লাগলেন। বলতে বলতে যখন তিনি বললেন-'জলদস্যুদের হাতে ইজ্জত খোয়ানোর ভয়ে ইয়ারবু গোত্রের একজন সম্ভ্রান্ত নারী হায় হাজ্জাজ, বাঁচাও! হায় হাজ্জাজ, বাঁচাও! বলে ফরিয়াদ করেছে', সাথে সাথে হাজ্জাজের গাইরত ছলকে ওঠে। তিনি সম্পূর্ণরূপে নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। মসনদ ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে যান! তৎক্ষণাৎ তিনি বজ্রকঠিন কণ্ঠে বলে উঠলেন, 'আমি হাজির, হে বোন! আমি হাজির!'
হাজ্জাজ বেসামাল। তাঁর দেহের শিরা-উপশিরাগুলোতে বহমান গাইরতের রক্ত কণিকাগুলো দ্রুতবেগে ছোটাছুটি করছে। এ তপ্ত খুন ঠান্ডা করতে না পারলে হাজ্জাজের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। বনু ইয়ারবুর ওই বোনটির ডাকে সাড়া দিয়ে হাজ্জাজকে অবশ্যই প্রকৃত ভাইয়ের পরিচয় দিতে হবে! আর যাই হোক; এই একটি বোনের ডাকে সাড়া দিয়ে সবাইকেই জলদস্যুদের কবল থেকে মুক্ত করতেই হবে! নইলে যে বনু উমাইয়ার আত্মসম্মান বলতে কিছুই থাকবে না। খিলাফতের কোনো মূল্যই থাকবে না। কী দরকার এই বিশাল ইসলামি সাম্রাজ্য দিয়ে, যে সাম্রাজ্য একটি বোনের ডাকে সাড়া দিতে পারে না?
হাজ্জাজ বিন ইউসুফ সিন্ধুর ব্রাহ্মণ রাজ্য বংশের শেষ হিন্দু রাজা দাহির (৬৬৩- ৭১২) এর নিকট অত্যন্ত কড়া ভাষায় চিঠি লেখেন। চিঠিতে তিনিও দাহিরের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবিসহ লুণ্ঠিত মালামাল, নারী, শিশু ও মাল্লামাঝিদের ফেরত পাঠাতে আদেশ করেন। কিছুদিন পর দাহিরের পক্ষ থেকে উত্তর এলো- 'আমি কিছুই জানি না। এদেরকে জলদস্যুরা ছিনতাই করে নিয়ে গেছে।
এতে ক্ষুব্ধ হয়ে হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ খলিফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিকের অনুমতি নিয়ে রাজা দাহিরের বিরুদ্ধে পরপর ৩টি সামরিক অভিযান চালান। প্রথম দুটি অভিযান চালান পর্যায়ক্রমে উবাইদুল্লাহ ও বুদাইলের নেতৃত্বে। এ দুটি অভিযান ব্যর্থ হওয়ার পর মুহাম্মাদ বিন কাসিমের নেতৃত্বে ৭১২ সালে পুনরায় সামরিক অভিযান চালানো হয়।
মুহাম্মাদ বিন কাসিম জুলাইয়ের ২ তারিখে সিন্ধু বিজয় করেন। তাঁর সৈন্যসংখ্যা ছিল মাত্র ৬ হাজার। সংখ্যায় কম হলেও সৈন্যরা ছিল দক্ষ, অভিজ্ঞ, সাহসী ও বিচক্ষণ। তাছাড়া অভিযানে ভারতীয় জাঠ ও মেঠ সম্প্রদায় মুসলমানদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করে। তারাও ছিল বলিষ্ঠ ও সাহসী। তারা রাজার দ্বারা অত্যাচারিত ও সিগৃহীত ছিল। মুহাম্মাদ বিন কাসিম একে একে দেবল, মেরুন, সেহোরান, ব্রাহ্মণ্যবাদ, আলোর, মুলতান প্রভৃতি জয় করেন। এই প্রথমবারের মতো ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকা মুসলমানদের অধিকার আসে।
ভারতের কোনো কোনো ইতিহাসবিদ মুহাম্মাদ বিন কাসিমের সিন্ধু অভিযান প্রসঙ্গে বলেন, বিধর্মীদের অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তাদের ধর্মান্তরিত করাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। মানুষকে ধর্মান্তর করার লক্ষ্যে মুহাম্মাদ বিন কাসিম ভারতে অভিযান চালান—এটা সঠিক নয়; বরং এ অঞ্চলের মানুষ মুসলমানদের আচার-ব্যবহার, সততা, নিষ্ঠা ও উদারতায় মুগ্ধ হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। আর সিন্ধু অভিযানের প্রত্যক্ষ কারণ হলো, মুসলমানদের জাহাজবহর লুণ্ঠিত হওয়া এবং যাত্রী ও সম্পদ অপহৃত হওয়া। এছাড়াও আরও কিছু কারণ ছিল।১
টিকাঃ
১ বর্তমান পাকিস্তানের করাচিই ছিল তৎকালীন দেবল বন্দর।
১ হিস্টরি অব ইন্ডিয়া এ্যাজ বাই ইট্স অউন হিস্টরিয়ানস: ১/১২৪ ও ১৮৩ এলিয়ট ও ডউলিয়াম; আল-কামিল ফিত তারিখ: ৪/২৮৭, ইমাম ইবনুল আসির; হিস্টরি অব মুসলিম সিভিলাইজেশন ইন ইন্ডিয়া এ্যান্ড পাকিস্তান: ১, এস, এম, ইকরাম; ক্বাদাতু ফাতহি বিলাদিস সিন্দ ওয়া আফগানিস্তান: ২০১, মাহমুদ শিত খাত্তাব; বিলাদুল হিন্দ ফিল আসরিল ইসলামি : ১০, ইসামুদ্দিন আবদুর রাউফ ফাকি; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া : ৬/১৮৯, ইবনে কাসি; এ শর্ট হিস্টরি অব দি মুসলিম রুল ইন ইন্ডিয়া: ৩৫-৩৬, ইশ্বরী প্রাসাদ; ফুতুহুল বুলদান: ২/৫৩৪, ইমাম বালাজুরি।
📄 হাকাম ইবনে হিশামের গাইরত
হাকাম ইবনে হিশাম ছিলেন আন্দালুসে উমাইয়া খিলাফতের অধীনস্থ কর্ডোবার আমির। ৭৯৬-৮২২ সাল পর্যন্ত তিনি শাসন পরিচালনা করেন। তাঁর কর্তৃত্বের পুরোটা সময় জুড়ে ছিল অস্থিতিশীলতা। তবুও শক্ত হাতে তিনি শাসন চালিয়ে যান। বেশ গাইরতমন্দ শাসক ছিলেন তিনি।
হাকামের শাসনামলে আব্বাস বিন নাসিহ জাযিরি নামে একজন কবি ছিলেন। ইনি আন্দালুসের আল-খাজরা তথা সবুজ উপদ্বীপে জন্মেছিলেন এবং হাকামের পক্ষ থেকে আল-খাজরার গভর্নর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তৎকালে কবিদের কাজই ছিল রাজা-বাদশাহদেরকে প্রশংসা করে হাদিয়া ও বকশিশ দ্বারা পকেট ভারি করা। আব্বাস বিন নাসিহ জাযিরিও ব্যতিক্রম ছিলেন না। তিনি কারণে-অকারণে হাকাম ইবনে হিশামের প্রশংসায় কাব্য রচনা করতেন।
ওয়াদি আল-হিজারাহ-বর্তমানে স্পেনের একটি শহর। মাদ্রিদ থেকে ৫৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এটির আরেক নাম আল-ফারাজ শহর। তবে এটি ওয়াদি আল-হিজারাহ তথা পাথুরে উপত্যকা নামেই বেশি পরিচিত। হেনারস নদীর তীরে অবস্থিত উপত্যকার নামানুসারে শহরের এই নাম এসেছে। স্প্যানিশরা পরবর্তীকালে আরবি নামের বিকৃতি সাধন করে নাম দেয়-গুয়াদালাজারা (Guadalajara)|
একবার কবি আব্বাস বিন নাসিহ জাযিরি আন্দালুসের সীমান্তসংলগ্ন এলাকা ওয়াদি আল-হিজারায় আগমন করেন। খ্রিষ্টানদের সীমান্তবর্তী অঞ্চল হওয়ায় এই এলাকায় প্রায়ই ক্রুশের পূজারিরা হামলা করত। মুসলমানদের বাড়িঘরে চালাত লুটতরাজ। নারীদেরকে বন্দি করে নিয়ে ইজ্জতহানি করত। প্রান্তিক অঞ্চল হওয়ায় এসব জুলুমের খবর অনেক সময় মুসলিম শাসকদের কর্ণগোচর হতো না।
কবি আব্বাস বিন নাসিহ ওয়াদি আল-হিজারায় ঘুরছিলেন। হঠাৎ তাঁর কানে এক নারীকণ্ঠের আহাজারি ভেসে এলো। তিনি শুনতে পেলেন-একজন দুঃখিনী নারী কলজে পোড়া আওয়াজে ফরিয়াদ করে বলছে, 'হে হাকাম, বাঁচাও! তুমি তো আমাদের কোনো খোঁজখবর নিলে না। আমরা বিধবা হলাম। আমাদের সন্তানরা এতিম হয়ে গেল!'
আব্বাস দ্রুতপদে এগিয়ে গেলেন ওই নারীর দিকে। দুঃখিনী নারীকে তার ফরিয়াদির কারণ জিজ্ঞেস করলেন। নারী বলল, 'আমরা একসঙ্গে দলবদ্ধভাবে গ্রাম থেকে ফিরছিলাম। পথিমধ্যে হঠাৎ আমাদের ওপর আক্রমণ করে খ্রিষ্টানদের অশ্বারোহী বাহিনী। তারা আমাদের পুরুষদেরকে হত্যা করে। আরও অনেককে বন্দি করে নিয়ে যায়!'
ওই মজলুম নারীর ফরিয়াদ শুনে বড় ব্যথিত হন কবি আব্বাস বিন নাসিহ। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করেই তিনি রচনা করেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা-
تململت في وادي الحجارة مسهرا... أراعي نجوما ما يردن تغورا إليك، أبا العاصي، نضيت مطيتي ... تسير بهم ساريا و مجرا تدارك نساء العالمين بنصرة ... فإنك أحرى أن تغيث وتنصرا
(কাব্যানুবাদ)
আমি অস্থির ও আকুল হয়ে পার করেছি বিনিদ্র রজনী, সারাটা রাতেও পাথুরে উপত্যকা পাড়ি দিতে পারিনি। তারাগুলোর দিকে শুধু তাকিয়ে রাতটা করলাম পার, উপত্যকাতেই ঘুরেফিরে একসময় আমি মানলাম হার! হে হাকাম, আপনার কাছে পৌঁছতে বাহন করেছি দুর্বল, আপনি শত্রুদের তাড়ান; শীঘ্রই বের হন নিয়ে সেনাদল। জগতের দুঃখিনী নারীদের বাঁচান; দাঁড়ান তাদের পাশে, আপনিই পারেন তাদের সহায় হতে, আগে কিংবা শেষে।
কবি আব্বাস বিন নাসিহ জাযিরির এই কবিতা থেকে বোঝা যায়, ওই নারীর আহাজারি শোনার পর তিনি দ্রুত ওয়াদি আল-হিজারাহ ত্যাগ করে কর্ডোভায় পৌঁছতে চেয়েছেন। কথায় আছে, অপেক্ষার প্রহর নাকি প্রলম্বিত হয়। ওয়াদি আল- হিজারাতেই তিনি বিনিদ্র রজনী পার করলেন বাহনের পিঠে সওয়ার হয়ে। পুরো রাত কাটিয়ে ফেললেন উপত্যকায়, তবুও সে রাতে উপত্যকা অতিক্রম করতে পারলেন না। তাই কষ্টে কবিতাটা শুরুই করলেন এই প্রসঙ্গ দিয়ে।
যাহোক, কর্ডোভায় পৌঁছেই কবি আব্বাস বিন নাসিহ দ্রুত প্রবেশ করলেন আমির আবুল আস হাকাম ইবনে হিশামের রাজপ্রাসাদে। হাকামের সামনে কবিতাটি আবৃত্তি করলেন। তার কাছে সীমান্তের বাসিন্দাদের শত্রুভীতি উল্লেখ করলেন। নামসহ ওই মজলুম নারীর ফরিয়াদ শুনিয়ে দিলেন।
আব্বাস বিন নাসিহের মুখে এসব কথা শুনতেই পিলে চমকে উঠল হাকাম ইবনে হিশামের। তিনি রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠলেন। তার গাইরতে চোট লাগল। তৎক্ষণাৎ জিহাদ ঘোষণা করলেন। অবিলম্বে সেনাবাহিনীকে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে আদেশ করলেন। কর্ডোভার অলিতে-গলিতে বেজে উঠল জিহাদের ডংকা।
তিনদিনের মধ্যেই রণপ্রস্তুতি সম্পন্ন করে সেনাবহর নিয়ে পাথুরে উপত্যকার দিকে বেরিয়ে পড়লেন আমির হাকাম ইবনে হিশাম। সঙ্গে নিলেন কবি আব্বাস বিন নাসিহকে। উপত্যকায় এসে জিজ্ঞেস করলেন, কোনদিক থেকে দুশমনের অশ্বারোহী বাহিনী এসে হামলা করেছিল? একটি দিক দেখিয়ে দেওয়া হলো তাঁকে। তিনি সেদিকেই বাহিনী নিয়ে এগিয়ে গেলেন।
শত্রুদের ওই এলাকায় আক্রমণ করলেন। বলতে গেলে প্রলয়ঙ্কারী ঝড় বইয়ে দিলেন। সীমান্ত সংলগ্ন এলাকা পাড়ি দিয়ে অনেক ভেতরে গিয়ে একের পর এক বহু কেল্লা বিজয় করলেন। খ্রিষ্টান দুশমনদের বাড়িঘর মাটির সাথে মিশিয়ে দিলেন। বহুসংখ্যক শত্রুকে হত্যা করলেন। এরপর আবারও ফিরে এলেন পাথুরে উপত্যকায়।
এখানে এসে আদেশ করলেন নির্যাতিত ওই নারীকে তাঁর সামনে ডেকে আনতে। পাশাপাশি তিনি সেই অঞ্চলের বন্দি খ্রিষ্টানদেরকেও হাজির করতে আদেশ করলেন। কবি আব্বাসসহ কেউই বুঝতে পারছিলেন না-ওই নারীকে উপস্থিত করার পাশাপাশি যুদ্ধবন্দি খ্রিষ্টানদেরকেও হাজির করার কী মানে! কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই হাকাম বিন হিশাম সকলের মনের সব প্রশ্নের জবাব দিয়ে দেন।
নিপীড়িত ওই মুসলিম নারী ও যুদ্ধবন্দি খ্রিষ্টানদের উপস্থিত করা হলে সবার আগে বন্দিদের গর্দান উড়িয়ে দেওয়ার হুকুম জারি করেন হাকাম ইবন হিশাম। কথামতো সকল বন্দিকে হত্যা করা হয়। এরপর কবি আব্বাস বিন নাসিহ জাযিরিকে সম্বোধন করে হাকাম বললেন, ‘আব্বাস! এই নারীকে জিজ্ঞেস করো—হাকাম কি তাঁর ডাকে সাড়া দিয়েছে?
আব্বাস ওই মুসলিম নারীকে জিজ্ঞেস করলেন। নারী বেশ বুদ্ধিমতী ছিল। বেচারি বলল, ‘আল্লাহর শপথ করে বলছি, হাকাম আমাদের অন্তর প্রশান্ত করেছেন, দুশমনদের বেশ ক্ষতি করেছেন, দুঃখীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন; আল্লাহও যেন হাকামের পাশে থাকেন, তাঁকে সহায়তা করে সম্মানিত করেন।’
মুসলিম বোনের কথা শুনে খুশি হলেন কর্ডোবার আমির হাকাম বিন হিশাম। তাঁর চেহারায় খুশির আভা ঝিলিক খেলে গেল। তিনিও তখন কাব্যাকারে বললেন:
ألم تر يا عباس أني أجبتها ... على البعد أقتاد الخميس المظفرا فأدركت أوطارا وبردت غلة ... ونفست مكروبا وأغنيت معسرا
আব্বাস! তুমি কি দেখোনি আমি তার ডাকে সাড়া দিয়েছি, সুদূর কর্ডোভা থেকে নেতৃত্ব দিয়ে সেনাদল হাজির করেছি। আমি পূরণ করেছি তার মনোবাঞ্ছা; অন্তর প্রশান্ত করেছি, বিপদগ্রস্তের পাশে দাঁড়িয়েছি; দুঃখীর মুখে হাসি ফুটিয়েছি।
আব্বাস বিন নাসিহ বললেন, ‘আল্লাহ আপনাকে পুরো মুসলিম উম্মাহর পক্ষ থেকে উত্তম প্রতিদান দান করুন, হে মহামান্য!’ এরপর আব্বাস উঠে গিয়ে হাকামে ইবনে হিশামের দু-হাত চুম্বন করলেন। দায়িত্ব আদায় হয়েছে বলে হাকام বাহিনী নিয়ে ছুটলেন কর্ডোবার পথে।১
টিকাঃ
১ নাফহুত-তিব: ১/৩৪৩-৩৪৮, আহমাদ মাক্কারি তিলমিসানি; মাখতুতুর-রাবাত, পৃষ্ঠা: ১০৭-১০৮; আল-মুকতাতাফাত, পৃষ্ঠা: ৮৩।