📄 বিচারকের দরবারে স্বামীর গাইরত
রাই—প্রাচীন খোরাসানের একটি প্রসিদ্ধ শহর। যে শহরের দিকে সম্বন্ধ করে মুসলিম উম্মাহর অনেক বিদগ্ধ পণ্ডিতকে ‘রাযি’ বলা হয়। যেমন ইমাম ফখরুদ্দিন রাযি রহ.। এই রাই'র কাজি তথা বিচারপতি ছিলেন মুসা ইবনে ইসহাক। বিচারকার্যে তাঁর যশ-খ্যাতি ছিল গোটা খোরাসান জুড়ে।
২৮৬ হিজরি। মুসা ইবনে ইসহাকের আদালতে আগমন করল এক নারী। এসেই নিজ স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করল। মামলাটা ছিল মোহরানা সম্পর্কিত। গড়াতে লাগল মামলা। উকিল আর সাক্ষীর ঝাক্কিঝামেলা।
শুরু হলো আদালত। ওই নারীর নির্ধারিত উকিল নিজ মক্কেলের স্বামীর ওপর মোহর হিসেবে পাঁচশো স্বর্ণমুদ্রা দাবি করল। আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত স্বামী উল্লিখিত মোহর সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করল! বিচারপতি মুসা ইবনে ইসহাক উকিলকে সম্বোধন করে বললেন,
: তোমার সাক্ষীরা কোথায়?
: তাদেরকে আদালতেই উপস্থিত করে রেখেছি জনাব!
উকিল একজন সাক্ষীকে ডাক দিলো। সাক্ষী দাঁড়াল। সাক্ষীকে বাদী নারীর চেহারার দিকে তাকানোর আদেশ করল উকিল। যাতে সাক্ষ্য দানকালে নারীর দিকে ইঙ্গিত করতে পারে। সাক্ষ্যদানের জন্য প্রস্তুত হলো সাক্ষী। নারীকে বলল, ‘আপনিও দাঁড়ান!’
অবস্থা আঁচ করতে পেরে আঁতকে উঠল নারীর বিবাদী স্বামী। পরপুরুষ তার স্ত্রীর মুখ দেখবে—এটা কোনোভাবেই সে মেনে নিতে পারল না। তার গাইরতে চরম আঘাত হানল। উকিলকে সম্বোধন করে সে শশব্যস্ত কণ্ঠে বলে উঠল,
: আপনারা এইসব কী শুরু করলেন?
: সাক্ষী আপনার স্ত্রীর চেহারার দিকে তাকাবে। যাতে করে সে আপনার স্ত্রীকে খুব ভালো করে চিনতে পারে। এতে সমস্যা কীসের? এটা তো প্রয়োজনের তাগিদেই!
: মহামান্য বিচারক! আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমার স্ত্রী আমার ওপর মোহর বাবদ যা দাবি করছে, আমি তা মাথা পেতে স্বীকার করলাম। তবে আল্লাহর ওয়াস্তে সে যেন তার চেহারা উন্মোচন না করে!
স্বামীর কথায় বড় প্রভাবিত হলো স্ত্রী। সেও বলল, 'মহামান্য বিচারক মহোদয়! আমিও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমি আমার মোহর আমার স্বামীকে দান করে দিলাম। এবং ইহকাল ও পরকালে তাকে এর দায়ভার থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্তি দিয়ে দিলাম!'
যারপরনাই আশ্চর্য হলেন বিচারক মুসা ইবনে ইসহাক। এতক্ষণ তিনি মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় গাইরতমন্দ স্বামী ও তার স্ত্রীর কাণ্ডকারখানা দেখে যাচ্ছিলেন। এবার বলে উঠলেন, 'আমি স্বামী-স্ত্রী উভয়ের গাইরত দেখে বেজায় আশ্চর্যবোধ করছি। এ ঘটনাটা মুসলিম উম্মাহর উত্তম চরিত্রের অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকবে।'১
উপরোল্লিখিত গাইরতের ঘটনাটা ইসলামি ইতিহাসে খুবই প্রসিদ্ধ। যুগে যুগে মুসলিম লেখক ও বক্তাগণ ইসলামে গাইরতের মর্যাদা বোঝাতে গিয়ে উল্লিখিত ঘটনাটাকেই সবচেয়ে বেশি তুলে ধরেন। এ ঘটনাটা উল্লেখ করে আরব স্কলার শাইখ ড. মুহাম্মাদ জুমআহ হালবুসিকে লিখতে দেখলাম, তিনি লিখছেন-
“আল্লাহু আকবার! আজকের দুনিয়ায় স্বামীদের এমন গাইরত কোথায়? কসম আল্লাহর, আমরা দোষ দিই না ওইসব যুবকদের, যারা রাস্তাঘাটে ও বিভিন্ন স্পটে বসে থাকে আর মেয়েলোকদের ডিস্টার্ব করে। মেয়েলোকেরা যদি পর্দাবৃতা হয়ে বের হতো, তাহলে যুবকেরা রাস্তাঘাটে বসে তাদেরকে উত্ত্যক্ত করত না। কিন্তু মেয়েরা এত সাজুগুজু করে বের হয়, মনে হয়—যেন তারা নববধূ; আজকেই তাদের বাসর হবে! পাতলা ফিনফিনে কাপড় পরে তারা বাইরে বের হয়। এমতাবস্থায় রাস্তার যুবকেরা কীভাবে না চেয়ে বসে থাকবে! কীভাবে মেয়েলোকদের দেখার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা না তাকিয়ে বসে থাকবে তারা!
সেসব অভিভাবক পুরুষদের ব্যাপারে আশ্চর্য হতেই হয়, যারা তাদের স্ত্রী ও কন্যাদের খুবই সাজুগুজু করে বাইরে বের হতে দেয়, অতঃপর রাস্তার ছেলেরা তাদের 'বিশ্বসুন্দরী ভাব' নিয়ে চলা স্ত্রী ও কন্যাদের দিকে তাকালে ঝগড়া করে! এখন ঝগড়া করতে হবে কেন, ভাই? রাস্তার ছেলে ও বদমাইশ লোকদের দেখতে দাও!
তুমি যখন তোমার স্ত্রী ও কন্যাদের সাজুগুজু করে শরীরের খাঁজভাঁজ দেখিয়ে দেখিয়ে রাস্তায় বের হতে দিয়েছ, তার মানে এইটা যে, তুমি বলছো— হে লোকসকল, সবাই আমার স্ত্রী ও কন্যার দিকে তাকাও! সবাই আমার সম্মান, শালীনতা ও সম্ভ্রান্ততার দিকে তাকাও!”
এক আরব কবি বলেছেন :
إِنَّ الرِّجَالَ النَّاظِرِينَ إِلَى النِّسَا ... مِثْلُ الْكِلابِ تَطُوفُ بِاللُّحْمَانِ إِنْ لَمْ تَصُنْ تِلْكَ اللَّحُومَ أُسُودُهَا ... أُكِلَتْ بِلا عِوَضٍ وَلَا أَثْمَانِ (কাব্যানুবাদ)
নারীদের দিকে যারা তাকায়, তারা তো এমন কুকুর যে কুকুরেরা গোশতের চারিপাশে করে ঘুরঘুর, গোশতগুলো যদি তুমি না করতে পারো হেফাজত তবে তা কোনো মূল্য ছাড়াই কুকুর খাবে আলবত।
টিকাঃ
১ তারিখু বাগদাদ: ১৫/৩৫, খতিব আবু বকর বাগদাদি; আল-মুন্তাযাম ফি তারিখিল মুলুকি ওয়াল উমাম: ১২/৪০৩, ইমাম ইবনুল জাওযি।
📄 গাইরতহীন মেয়ের করুণ পরিণতি
ঘটনাটি মিসরের। মেয়েটি বিবাহিতা। অনার্স শেষে করেছে মাত্র। এখন সে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা ও অনুবাদ অনুষদে মাস্টার্স কমপ্লিট করতে চায়। কিন্তু বিপত্তি আসে তার স্বামী থেকে। বেচারা চরম মাত্রার গাইরতমন্দ মানুষ ছিলেন।
কারণ, মাস্টার্সের থিসিস পেপার রেডি করতে গিয়ে তাকে লম্বা একটা সময় পুরুষ ডক্টরদের সাথে ব্যয় করতে হবে। একজন দ্বীনদার স্বামী হিসেবে তার গাইরত এটা মেনে নিতে পারেনি। বিধায় খুব শক্তভাবে তিনি স্ত্রীর মাস্টার্স কম্পলিট করার ব্যাপারে বাধা দিলেন।
মেয়ের মা ছিলেন বেশ কূট বুদ্ধিমতী। তিনি মেয়েকে পরামর্শ দিলেন, এই গোঁড়া টাইপের লোকটাকে ডিভোর্স দিতে। মেয়েকে তিনি এটাও বললেন, মাস্টার্সের সার্টিফিকেট অর্জন হয়ে গেলে তার হাত ধরার জন্য কতশত ছেলে এগিয়ে আসবে। পাত্রের আর অভাব হবে না! বিশেষ করে মেয়ে যখন সুন্দরী। বয়সেও বেশি নয়; বিশ বছর মাত্র!
লোভী মা শুধু মুখেই বলল না; স্বামীর ঘর ছাড়া করে মেয়েটাকে নিয়েও এলো! সংসার দরকার নেই; মেয়ের মাস্টার্স করা লাগবে! আসলে মেয়ের বয়স ও অভিজ্ঞতা কম থাকায় মায়ের বোঝা উচিত ছিল। কিন্তু রক্ষক যখন ভক্ষক, তখন আর কীই-বা করার আছে! আসলে অনেক মেয়ের সংসার নষ্টের পেছনে কূট বুদ্ধিমতী মায়ের অবদান থাকে।
কয়েক বছর পরের কথা। এই দাম্ভিক মা, ডিভোর্সি মেয়ে ও তার বোনকে মিশরের একটি অনলাইন মেট্রিমনিতে বারবার পাত্রের সন্ধান চেয়ে সিভি ড্রপ করতে দেখা গেছে! কিন্তু কেউই সাড়া দেয়নি।
শেষমেশ মেয়েটি পরিবারের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। এক সময় অধৈর্য হয়ে প্রথমে গর্ভধারিণী মা-ই মেয়ের পাশ থেকে সরে যায়!'
টিকাঃ
১ আহমদ ফাতহি নামের এক মিসরীয় অনলাইন এক্টিভিস্টের লেখনী থেকে চয়িত।
📄 মুসলিম শাসকদের গাইরতের ঝলক
আজ মুসলিম উম্মাহ যে ক্রান্তিলগ্ন পাড়ি দিয়ে যাচ্ছে, এক সময় সেটা ছিল না; আমাদের একটা সোনালি অতীত ছিল। তখন পৃথিবীটা আমাদের পদতলে এসে ঠাঁই নিয়েছিল। গোটা দুনিয়াতেই ছিল মুসলিম উম্মাহর দাপট। উমাইয়া, আব্বাসি, উসমানি—বড় তিনটি খিলাফত ছাড়াও অসংখ্য ছোটো-বড়ো ইসলামি সাম্রাজ্যের প্রতাপে থরথর করে কাঁপত কাফেররা।
দুনিয়ার কোনো প্রান্তে কোনো মুসলিমের গায়ে হাত তুলতে সাতপাঁচ ভাবতে হতো কাফেরদের। আজকের মতো মুসলিম বোনদের ইজ্জত অত সস্তা ছিল না। মুসলিম বোনদের কারও গায়ে 'ফুলের টোকা' দিতেও সাহস করতে পারত না কোনো কাফের।
দুনিয়ার কোনো প্রান্তে কোনো কাফেরের বাচ্চা উম্মাহর কোনো বোনের গায়ে হাত দিলে সেই বোন সময়ের প্রতাপশালী মুসলিম শাসকের নাম ধরে আর্তচিৎকার করে উঠতেন। দুনিয়ার অপর প্রান্ত হতে একটিমাত্র বোনের ডাক শুনে এ প্রান্ত থেকে গাইরতসম্পন্ন মুসলিম শাসক ‘লাব্বাইক’ বলে সাড়া দিতেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে।
এরপর...। এরপর যা ঘটত, তা ইতিহাস। গাইরতসম্পন্ন মুসলিম শাসক রীতিমতো বইয়ে দিতেন ছোটখাটো কোনো কিয়ামত। দুনিয়াবাসীকে দেখিয়ে দিতেন—মুসলিম উম্মাহর গাইরত, শৌর্যবীর্য, ক্ষমতা, প্রভাব, প্রতিপত্তি ও দাপট।
সিন্ধুর উপকূলে জলদস্যুদের কবলে পড়ে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের নাম ধরে এক আরব নারী আর্তচিৎকার করলে মুহাম্মাদ বিন কাসিম এগিয়ে এসে সিন্ধু বিজয় করেন।
স্পেনের ভিজিগথিক রাজা রডারিকের হেরেমে লালিত খ্রিষ্টান কিশোরী কন্যা ফ্লোরিডার কান্নার খবর শুনে জিব্রালটার প্রণালি পাড়ি দিয়ে গিয়ে তারিক বিন যিয়াদ স্পেন বিজয় করেন।
ইস্পারটা শহরে খলিফা মুতাসিম বিল্লাহর নাম ধরে এক হাশিমী নারী ফরিয়াদ করলে দুনিয়া কাঁপিয়ে ছুটে যান খলিফা মুতাসিম। আঘাত করেন বাইজেন্টাইনদের একেবারে অন্তরে। আমাদের দাপট ও প্রতাপের এসব গৌরবগাথা তো বহু। কয়টাই বা উল্লেখ করা যায়!
উম্মাহর ওই গাইরতমন্দ শাসকগণই মূলত 'মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি' কথাটির প্রকৃষ্ট উদাহরণ। উম্মাহর বোনদের ইজ্জত বাঁচাতে তাঁরা প্রয়োজনে জীবন বাজি রাখতেন! পৃথিবীর যেকোনো দিগন্ত থেকে মজলুম বোনের আর্তনাদ শুনলেই জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে তাঁরা দুনিয়া তোলপাড় করে মারমার রবে এগিয়ে যেতেন সেই বোনকে উদ্ধার করতে। এভাবেই তাঁরা পরিচয় দিতেন গাইরতের, উম্মাহবোধের। জানান দিতেন শোণিত চেতনা, বদ্ধমূল ইমান ও তেজোদীপ্ত পুরুষত্বের।
আজ মুসলিম উম্মাহ নিঃস্ব, অসহায়। তাদের কিছুই নেই। পশ্চিমা রাজনীতির সূক্ষ্ম চালে তাদের দ্বীন রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। দেশে দেশে জাতীয়তাবাদের দেওয়াল তুলে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে উম্মাহর ভ্রাতৃত্ববোধ। এভাবেই বৈশ্বিক পরিসরে তাদেরকে একটি অকর্ম, অথর্ব, হীনমন্য, বিকলাঙ্গ ও মেরুদণ্ডহীন জাতিতে রূপান্তরিত করা হয়েছে।
তাইতো আজ দুনিয়ার দিকে দিকে মুসলিম উম্মাহ নির্যাতিত, নিপীড়িত, নিষ্পেষিত, লাঞ্ছিত ও বঞ্চিত। উম্মাহর মুসলিম বোনদের ইজ্জত ভূলুণ্ঠিত। পৃথিবীর এখানে-ওখানে জালিমশাহীর কারাগারে উম্মাহর সম্ভ্রমহারা বোনদের ফরিয়াদ কানে বাজলেও এই উম্মাহর মধ্যে কোনো মুহাম্মাদ বিন কাসিম নেই! কিছুই করতে পারে না উম্মাহ! আর কিছু করবেই বা কীভাবে; এই উম্মাহ তো হলো কফিনে শোয়ানো একটি লাশমাত্র!
আজ পাকিস্তানের ড. আফিয়া সিদ্দিকি, ইরাকের ফাতিমা ও নূর, বসনিয়ার নুসরেতা, ভারতের সাদিয়া মুবিন, কাশ্মীরের নাফিসা উমর, সিরিয়ার হাদা, ফিলিস্তিনের আনহার-আদদীক ও উইঘুরের মিহিরগুল তুরসুনসহ পৃথিবীর দিকে দিকে মজলুম বোনদের বুকফাটা আহাজারি শুনতে পায় উম্মাহ, কিন্তু কিছুই করতে পারে না! কারণ, এই উম্মাহর দ্বীনকে ব্যক্তিজীবনে সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে আর রাষ্ট্রকে দ্বীন থেকে আলগা করে নেওয়া হয়েছে। ভ্রাতৃত্বঘাতী জাতীয়তাবোধের বীজ বপন করে দেওয়ার মাধ্যমে উম্মাহবোধ তথা মুসলিম হিসেবে একজাতিসত্ত্বাবোধকে টুটি টিপে মেরে ফেলা হয়েছে।
ফলে ওই সকল মজলুম বোনদেরকে পাকিস্তানি, ইরাকি, বসনিয়ান, ভারতীয়, ফিলিস্তিনি, তুর্কিস্তানি ইত্যাদি দেশীয় বা জাতীয় ভেবে এবং তাদের ওপর কৃত জুলুমকে তাদের নিজেদের দেশীয় বা জাতীয় সমস্যা মনে করে উম্মাহ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছে!
এই বোনদের প্রত্যেকেই মুসলিমদের জন্য প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও সংকীর্ণ হয়ে যাওয়া এই পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের বাসিন্দা। তাঁদের অন্তর বিদীর্ণকারী আহাজারি গোটা মুসলিম বিশ্বে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে, যা তাঁরা সাম্রাজ্যবাদী জালিমের কারাগার থেকে করেছেন। আহাজারির মাধ্যমে তারা উম্মাহর ঘুমন্ত বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছেন। যদিও মেরুদণ্ডহীন উম্মাহর গাইরতহীন শাসকরা তাদের আর্তনাদে সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা রাখেনি!’
টিকাঃ
১ কথাগুলো আমার প্রকাশিতব্য 'একটি বোনের ডাক শোনে' বই থেকে ঈষৎ পরিমার্জন করে নেওয়া। বইটি হুদহুদ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হবে ইনশাআল্লাহ।
📄 নারীর ইজ্জতহানিতে সাহাবির গাইরত
হিজরতের আগে মদিনার নাম ছিল ইয়াসরিব। নবিজি হিজরত করে আসার পর এর নাম রাখেন-মদিনা। মদিনা ছিল ইহুদি অধ্যুষিত এলাকা। এখানে বনু কাইনুকা, বনু নাজির ও বনু কুরাইজা নামে বড় বড় তিনটি ইহুদি গোত্র বসবাস করত।
গোটা মদিনার সমাজনীতি, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে এদের দাপট ছিল। এজন্য হিজরতের পর প্রথমে এদের সাথে সমঝোতা করতে বাধ্য হয়েছিলেন নবিজি। কিন্তু এদের চুক্তিভঙ্গ ও কূটচালের কারণে বাধ্য হয়েই নবিজি এদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছিলেন। একে একে সবাইকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন মদিনা থেকে। প্রথমেই যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতে হয়েছিল নবিজিকে, তারা হলো বনু কাইনুকা।
মদিনায় বেশ কয়েকটি বাজার ছিল। একটি বাজার ছিল বনু কাইনুকার মহল্লায়। বেচাবিক্রির ও সওদাপাতির জন্য মদিনার মুসলিম ও মুশরিকরাও ওই বাজারে যেতেন। মুসলিম নারীরাও যেতেন। তখনও পর্দার বিধান আসেনি।
সেদিন একজন নারী সাহাবি বনু কাইনুকার বাজারে গেলেন। কিছু পণ্য নিয়ে। বিক্রি করবেন বলে। এক ইহুদি স্বর্ণকারের কাছে বসলেন তিনি। বসে বসে একটি হার খরিদ করার জন্য দরদাম করতে লাগলেন।
সুযোগ পেয়ে গেল বজ্জাত ইহুদিরা। তারা তাঁকে নিয়ে হাসি তামাশায় মেতে উঠল। তাঁর মুখ থেকে পর্দা সরিয়ে উন্মুক্ত করতে চাইল। তাঁর রূপ-সৌন্দর্য অবলোকন করে তাদের অসুস্থ মন তৃপ্ত করার পাশাপাশি তাঁকে লাঞ্ছিতও করতে চেয়েছিল তারা। আর এটাই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য।
গাইব্রতওয়ালি ওই নারী সাহাবি সেই নাজুক পরিস্থিতিতেও নিজের ইজ্জত-রক্ষার ব্যাপারে খুবই সচেতন ছিলেন। তিনি বারবার তাঁর ঘোমটা টেনে ধরতে লাগলেন। দুর্মাতি ইহুদিরা এদিক দিয়ে তেমন সুবিধা করতে না পেরে অন্য ফন্দি আঁটতে লাগল। তাদের মধ্য থেকে কোনো এক কুলাঙ্গার চুপিসারে ওই নারী সাহাবির পেছনে গিয়ে ওত পেতে বসে রইল।
ওই মহিলা সাহাবি বসা ছিলেন। কুলাঙ্গারটা মহিলার পেছন দিকের কাপড়ের একটা অংশ পিঠের সঙ্গে বেঁধে রাখল। অথচ, তিনি সম্পূর্ণ বেখবর। এত কিছু ঘটে গেল— মোটেও টের পেলেন না। তিনি দিব্যি হারের দরদাম করে যেতে থাকলেন।
কিছুক্ষণ পর। মহিলা সাহাবি উঠতে গেলেন। অমনি তাঁর দেহের নিম্নাংশ দিগম্বর হয়ে গেল! উন্মুক্ত হয়ে গেল তাঁর লজ্জাস্থান! কুলাঙ্গার ইহুদিরা এমনই এক অবস্থার প্রতীক্ষায় ছিল। মহিলা সাহাবিকে উলঙ্গ হয়ে যেতে দেখে তারা হাসতে হাসতে লুটোপুটি খেতে লাগল। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছিল, যেন একপাল হায়েনার মাঝখানে অসহায় অবলা এক হরিণী!
জীবনে এমনভাবে বেইজ্জত হতে হয়নি ওই নারী সাহাবিকে। এই বেইজ্জতির আগে তাঁর মরে যাওয়াই ভালো ছিল। সীমাহীন লজ্জায় তিনি নিজেকে খুবই অসহায় হিসেবে আবিষ্কার করলেন। নিজের ইজ্জত ভূলুণ্ঠিত হতে দেখে তিনি আর্তনাদ করে ওঠলেন।
ইহুদিদের বাজারে এক নারী সাহাবির আর্তনাদে সাড়া দিয়ে কোত্থেকে এক সাহাবি দৌড়ে ছুটে এলেন। এসেই তিনি নারীকে চিৎকারের কারণ জিজ্ঞেস করলেন। নারী সাহাবি সব খুলে বললেন। শুনে তো ওই মুসলিম ব্যক্তির মাথায় রক্ত চড়ে গেল! তাঁর মাথায় খুন চেপে বসল। তিনি ঘৃণ্য এই ঘটনার মূল হোতা কুলাঙ্গার ইহুদিকে হত্যা করে তাঁর তপ্ত খুন ঠান্ডা করলেন।
বাকিটা পুরোই ইতিহাস। এ রকম কোনো দাঙ্গারই যেন অপেক্ষায় ছিল ইহুদিরা। সেই সুযোগ এসে যেতেই গোটা বনু কাইনুকা ফুঁসে উঠল। তারা হই হই রই রই করে হাতিয়ার নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল ওই সাহাবির ওপর। কুপিয়ে কুপিয়ে তাঁকে শহিদ করে দিলো।
ইহুদিদের হাতে একজন সাহাবিকে হত্যার শিকার হতে দেখে মুসলমানেরাও আর বসে রইলেন না; তারা ফুঁসে ওঠলেন। অন্যান্য মুসলমানদেরকে জড়ো করতে তারা ডাকাডাকি আরম্ভ করলেন। খবর পেয়ে প্রতিশোধস্পৃহায় ধেয়ে এলো বাকি মুসলমানেরা। ব্যস, শুরু হলো ইহুদি-মুসলিমদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ!
ঘটনাটি দ্বিতীয় হিজরির শাওয়াল মাসের মাঝামাঝি সময়ের। রমজানে সংঘটিত বদর যুদ্ধের পর। মদিনার মাটিতে এটাই ছিল সবচেয়ে মারাত্মক ঘটনা। ইহুদি-মুসলিমদের মধ্যে প্রকাশ্য রক্তপাত। কেননা, বনু কাইনুকার ইহুদিগোষ্ঠী মিলে একজন মুসলিমকে হত্যা করেছে। আর তা-ও তাদের পক্ষ থেকে জঘন্য একটি অপরাধকে কেন্দ্র করে!
মুসলমানদের সাথে কৃত চুক্তি লঙ্ঘনের এরচেয়ে বড় আর কোনো আলামত হতে পারে কী?
ইহুদিদের দুঃসাহসপূর্ণ এই ঘটনার খবর মদিনার ইসলামি রাষ্ট্রনায়ক নবি মুহাম্মাদ ﷺ-এর কানে গিয়ে পৌঁছায়। শুনতেই তিনি ক্ষোভে ফুঁসে উঠলেন। ইসলামি রাষ্ট্রেই একজন মুসলিম বোনকে লাঞ্ছিত করার মতো ধৃষ্টতা দেখিয়েছে চুক্তিবদ্ধ ইহুদিরা!
এখানেই শেষ নয়; এর জের ধরে সকলে মিলে হত্যা করেছে একজন মুসলিমকে! সাহস তো কম নয় ইহুদিদের! বেশ বড় হয়ে গেছে তাদের বুকের পাটা! ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে লাগাতার ষড়যন্ত্র ও অপ্রীতিকর মন্তব্যের পর এখন তারা রক্তপাতে পৌঁছে গেছে! তার মানে এদেরকে ঢিল দেওয়ার সুযোগে এরা তাদের অপরাধের শেষ সীমায় এসে পৌঁছেছে!
না, এটা হতে পারে না; এখনই এদেরকে শায়েস্তা করতে হবে। উচিত শিক্ষা দিতে হবে। ইসলামি রাষ্ট্রের শান্তি ও শৃঙ্খলার জন্য মারাত্মক হুমকি ইহুদিদের দুষ্ট এই গোষ্ঠীকে সবার আগে মদিনা থেকে তাড়িয়ে দিতে হবে। ইসলামি রাষ্ট্রের সীমানা থেকে বের করে আগাছা সাফ করতেই হবে। নইলে অদূর ভবিষ্যতে এরা আরও জঘন্য হয়ে উঠবে। মদিনার ইসলামি সার্বভৌমত্বের জন্য হবে একটা অসহ্য বিষফোঁড়া। জাতে তো এরা বনি ইসরাইল; মানব ইতিহাসের সবচেয়ে দুষ্ট জাতি। নবি রাসুলদের হত্যাকারী। তাঁদের সাথে বেয়াদবির সাক্ষর স্থাপনকারী। আল্লাহর অভিশাপ নিয়ে বেঁচে থাকা এক অসভ্য জাতি।
সাহাবাদেরকে অবিলম্বে বনু কাইনুকার দুর্গ ঘেরাও করার হুকুম দিলেন রাসুল ﷺ। হুকুম পেতেই রণসাজে সজ্জিত হয়ে গেলেন সাহাবায়ে কেরام। আবু লুবাবা ইবনুল মুনজির রা.-কে মদিনার গভর্নর সাব্যস্ত করে হামজা রা.-এর হাতে যুদ্ধের পতাকা দিয়ে সাতশো মুজাহিদ নিয়ে বনু কাইনুকার বসতি অভিমুখে রওনা হয়ে গেলেন সাহাবায়ে কেরام।
কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, এতদিন যাবৎ হম্বিতম্বি করা এবং বীরত্ব ও বাহাদুরির ফাঁকা বুলি আওড়িয়ে আসা বনু কাইনুকার ইহুদিরা মুসলিমদের আগমনের খবর পেতেই চোখে সরষে ফুল দেখতে আরম্ভ করল। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে তারা দুর্গে প্রবেশ করে ফটক লাগিয়ে দিলো!
মুজাহিদ-বাহিনী বনু কাইনুকার দুর্গ অবরোধ করে নিলেন। লাগাতার ১৫ দিন অবরোধ অব্যাহত রইল। অবরোধ চলাকালেই জিলকদের চাঁদ উদিত হয়ে গেল। এর ভেতরে ভীতু ইহুদিদের বাইরে বের হওয়ার নামগন্ধ পর্যন্ত দেখা গেল না! অথচ, এই এদেরই হুমকি-ধামকিতে মদিনায় মুসলিমদের টিকে থাকা দায় ছিল!
দীর্ঘ অবরোধের কবলে পড়ে ইহুদিরা মানবেতর জীবনাযাপন করতে থাকল। ভয় ও আতঙ্ক গ্রাস করে নিল তাদেরকে। বাধ্য হয়ে তারা রাসুল-এর ফয়সালা মাথা পেতে মেনে নিতে রাজি হলো। রাসুল বনু কাইনুকার পুরুষ, নারী ও সন্তানদের পিছমোড়া করে বাঁধার নির্দেশ দিলেন। আদেশানুসারে তাদেরকে পিছমোড়া করে বেঁধে নেওয়া হলো। এরপর তাদেরকে লাঞ্ছিত অবস্থায় মদিনা থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হলো।১
টিকাঃ
১ উন্মুনুল আসার: ১/২৯৫, ইমাম ইবনে সায়্যিদিন নাস; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া : ৪/৩, ইমাম ইবনে কাসির; কিতাবুল মাগাজি: ১/১৭৬, ইমাম ওয়াকিদি; যাদুল মাআদ: ২/৭১-৯১, ইবনে কাইয়িমিল জাওজিয়্যাহ; আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ : ১/৫০৩-৫৫৫, ইবনে হিশাম হিময়ারি; আত-তাবাকাতুল কুবরা : ২/২৯, ইমাম ইবনে সাদ জুহরি; আর-রাহিকুল মাখতুম : ২০৩, সাফিউর রহমান মুবারকপুরি।