📘 গাইরত > 📄 যুবাইর ইবনুল আওয়ামের গাইরত

📄 যুবাইর ইবনুল আওয়ামের গাইরত


যুবাইর ইবনুল আওয়াম্ম রা.। রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর হাওয়ারি। নবিজির ফুফাতো ভাই। সাফিয়্যাহ বিনতে আবদুল মুত্তালিবের ছেলে। সিদ্দিকে আকবর রা.-এর মেয়েজামাই। জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজন সাহাবির অন্যতম। নবিজির ইনতিকালের পর ছিলেন খিলাফতে রাশেদার ছয় শুরা সদস্যের একজন। ইসলামের ইতিহাসে সর্বপ্রথম তরবারি কোষমুক্ত করার ফজিলতও তাঁর।১
বিয়ে করেন আবু বকর রা.-এর কন্যা আসমা বিনতে আবু বকর রা.-কে। বিয়ের সময় ছিলেন কপর্দকশূন্য। কিন্তু, স্ত্রীর বিষয়ে গাইরত ও আত্মমর্যাদার ক্ষেত্রে ছিলেন পরিপূর্ণ সচেতন। আসমা রা.-এর মুখ থেকেই শুনুন। আসমা বলেন :
যুবাইর যখন আমাকে বিয়ে করেন, তখন পৃথিবীতে তাঁর অর্থবিত্ত, গোলাম ও বাঁদি— কিছুই ছিল না। ছিল কেবল পানি টানার জন্য একটা উট আর তাঁর নিজের একটা ঘোড়া। আমি নিজেই ঘোড়াকে ঘাস খাওয়াতাম। উটে করে পানি আনতাম। পানির মশক সেলাই করতাম। আটা পিষতাম। কিন্তু আমি ভালো করে রুটি বানাতে পারতাম না। প্রতিবেশী আনসার নারীরা এসে রুটি বানিয়ে দিতেন। তাঁরা খুব ভালো মানুষ ছিলেন।
নবি ﷺ যুবাইরকে এক খণ্ড জমি দিয়েছিলেন। সেই জমি থেকে আমি খেজুরের আঁটির বোঝা মাথায় করে আনতাম। জমিটি ছিল আমাদের বাড়ি থেকে প্রায় দুই মাইল দূরে।
একদিন আমি খেজুরের আঁটির বোঝা মাথায় করে ফিরছি। পথিমধ্যে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সাথে দেখা। নবিজির সাথে কয়েকজন আনসারি সাহাবি ছিলেন। আমাকে দেখে নবিজি উট থামান। পেছনে উঠিয়ে নেওয়ার জন্য ডাক দেন। কিন্তু পুরুষদের সাথে যেতে আমার লজ্জা লাগছিল। নবিজি বুঝতে পারেন—আমি লজ্জা পাচ্ছি। ব্যস, চলে যান।
বাড়িতে ফিরে যুবাইরের সাথে সাক্ষাৎ হলো। বিস্তারিত খুলে বললাম তাঁকে। রাসূলুল্লাহ-এর সাথে পথে সাক্ষাৎ হয়েছিল। আমার মাথায় তখন খেজুরের আঁটির বোঝা। নবিজির সাথে কয়েকজন আনসারি সাহাবি ছিলেন। আমাকে পেছনে উঠিয়ে নেওয়ার জন্য নবিজি উট থামান। কিন্তু আমার লজ্জা লাগছিল আর আপনার গাইরতের উপলব্ধি মনে পড়ছিল।
যুবাইর ইবনুল আওয়াম রা. উত্তরে বলেন-কসম আল্লাহর, কষ্ট করে তোমার বোঝা বহনের চেয়ে নবিজির উটের পিঠে চড়া আমাকে বেশি কষ্ট দিত।
আসমা রা. বলেন, 'এরপর আবু বকর আমার জন্য একজন খাদেম পাঠান, যে ঘোড়া পালনের দায়িত্ব পালন করত। এতেই মনে হতো-আমাকে যেন আজাদ করে দেওয়া হয়েছে।'১
এখানে যে-ই ব্যাপারটা বুঝতে হবে সেটা হলো, একদিকে আসমা বিনতে আবু বকর সংসারের জন্য কী কষ্টই না করেছেন! তাঁকে মাথায় করে বোঝা টানতে হতো দুই মাইল। ওই সময় সুযোগ পেলে কে না একটুখানি আরাম চায়! এমন সময় নবি তাঁকে উটে বসিয়ে এগিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সাথে আরও পুরুষ থাকায় তিনি লজ্জায় উঠেননি; বরং স্বামীর গাইরতের কথাকে তিনি মাথায় রেখেছেন। কষ্টের ওপর তিনি গাইরতকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
প্রশ্ন আসতে পারে, একজন সাহাবিপত্নী হয়ে কীভাবে তিনি ঘরের বাইরে বের হতেন; কোনো সম্ভ্রান্ত ঘরের নারীরা তো এভাবে বেরোয় না; এটা নিম্নমানের ফ্যামিলির চিত্র! উত্তরে বলব, ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি রহ. এই হাদিসের ব্যাখ্যায় লিখেছেন-ঘটনাটি পর্দার আয়াত নাজিল হওয়ার আগের।
অন্যদিকে যুবাইর ইবনুল আওয়াম্মের মন্তব্যটাও শোনার মতো। স্ত্রীর প্রিয়তমা স্ত্রীর কায়িক কষ্টে তিনিও কষ্ট পান। কিন্তু তাঁর গাইরত এতটাই বেশি ছিল যে, অন্য পুরুষদের সাথে দেখলে তিনি আরও কষ্ট পেতেন। পর্দার বিধান নাজিল না হলেও স্বামীর গাইরত তাঁর স্ত্রীকে গাইরে মাহরাম পুরুষদের সাথে চলতে বাধা দিয়েছে।
অবশ্য যুবাইর ইবনুল আওয়াম্মের গাইরতের ঘটনা শুধু এটিই নয়; আরও আছে। আসমা বিনতে আবু বকর রা.-কে ছাড়াও আরও বিয়ে করেছিলেন যুবাইর। তাঁর অর্থীদের সাথো ছিলেন আরবের রূপললনা আতিকা বিনতে যায়েদ রা.। আতিকাকে এশাখার বিয়ে করেছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকর রা.। আবদুল্লাহ তাঁকে কী যে আরজুবাদতেনতা আজও ইতিহাসে ভাস্বর। আবদুল্লাহর পর তাঁকে বিয়ে করেন উমর ইবনুল খাত্তাব রা.। উমরের পর তাঁকে বিয়ে করেন যুবাইর ইবনুল আওয়াম্ম রা.। যুবাইরের পর বিয়ে করেন মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর রা.।
আশ্চার্থজদক হলেও সত্য যে, কারও সাথেই আতিকার সংসার স্থায়ী হয়নি; স্বামীদের সংকল্পেই শাহাদাতবরণ করেছেন! যার সাথেই আতিকা ঘর বেঁধেছেন, তিনিই শহিদ হয়েছেন! এজন্য আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলতেন, 'কেউ যদি শহিদ হতে চায়, সে যেন আতিকা বিনতে যায়েদকে বিয়ে করে!'
যাহোক, আসল কথায় আসি। ইসলামের প্রাথমিককালে নারীরা মসজিদে যেতেন। জামাতে নামাজ পড়ার জন্যে। যুবাইর ইবনুল আওয়াম্মের স্ত্রী আতিকা বিনতে যায়দও মসজিদে যেতেন। এশার ওয়াক্তে তো অন্ধকার থাকতই; ফজরের সময়েও অন্ধকার থাকত। কারণ, নবিজি অনেক সময় ফজরের শুরু ওয়াক্তেই নামাজ আদায় করে নিতেন। দেখা যেত—নামাজ পড়ে বেরিয়ে আসার সময়ও আবছা অন্ধকার বিরাজ করত পরিবেশে।
আন্ধকারে স্ত্রী মসজিদে যাক—এটা মেনে নিতে পারতেন না যুবাইর ইবনুল আওয়াম্ম রা.। ব্যাপারটা তাঁর গাইরতে লাগত। আবার মানাও করতে পারতেন না, যেহেতু নবিজি সুযোগ দিয়েছেন। তাহলে কী করা? তিনি ভিন্ন ফন্দি আঁটলেন। কী সেই ফন্দি?
একবার অন্ধকারে নামাজ পড়তে বের হলেন আতিকা বিনতে যায়দ। এশা কিংবা ফজরের ওয়াক্ত হবে হয়তো। চুপি চুপি পিছু নিলেন যুবাইর ইবনুল আওয়াম্ম। হঠাৎ করে আতিকার গায়ের স্পর্শকাতর অঙ্গে হাত দিয়ে আবার অন্ধকারেই হাওয়া হয়ে গেলেন!
আতিকা কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। কে হাত দিয়ে দৌড় দিলো! ঘটনার আকস্মিকতায় ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলেন তিনি। লজ্জায়-শরমে তিনি ঘরে ফিরে এলেন।
কিন্তু তার আগেই ঘরে চলে এলেন যুবাইর ইবনুল আওয়াম্ম রা.। নামাজ না পড়েই আতিকাকে বিব্রতভাব নিয়ে ঘরে ফিরতে দেখে যুবাইর জিজ্ঞেস করলেন,
: কী হলো; নামাজ না পড়েই ঘরে ফিরে এলে যে!
: আর বলো না; কোন এক বদমাইশ লোক আমার গায়ে হাত দিয়ে দৌড়ে পালিয়েছে!১
যুবাইর ইবনুল আওয়াম মনে মনে হাসলেন। যে পলিসি এপ্লাই করেছিলেন তিনি, সেটা শতভাগ সাকসেসফুল! সাপও মরল; লাঠিও ভাঙল না।
উল্লেখ্য, তখন নারীদের জন্য মসজিদে যাওয়ার সুযোগ ছিল; তবে জরুরি ছিল না। কিন্তু নবিজি -এর বহু হাদিসে পাওয়া যায়, নারীর জন্য তার ঘরই মসজিদ। ঘরে নামাজ পড়া তার জন্য উত্তম। তাই ফিতনার দিক লক্ষ করে আলেমগণ এই হাদিসগুলোর ওপর আমল করেন; নারীর জন্য ঘরেই নামাজ পড়া উত্তম বলেন।

টিকাঃ
১ সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৪১, হাফিজ শামসুদ্দিন যাহাবি।
১ সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২২৪।
১ স্মৃতিলাল কুলুনী: ২৬৬, মুহাম্মাদ ইসমাঈল আযহার খারাইতী।

📘 গাইরত > 📄 আবদুল্লাহ ইবনে উমরের গাইরত

📄 আবদুল্লাহ ইবনে উমরের গাইরত


নবিজির কনিষ্ঠ সাহাবিদের একজন ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.। নবিজির সুন্নাহর খুব বেশি অনুসরণ করতেন তিনি। এতে কোনোরূপ এদিক-সেদিক করা পছন্দ করতেন না। দরবেশ কিসিমের এই সাহাবিও ছিলেন প্রচণ্ড গাইরতমন্দ। শুনবেন তাঁর গাইরতের কাহিনি? তাহলে শুনুন—
একবার আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. শুনতে পেলেন তাঁর স্ত্রী দেওয়ালের এপাশ থেকে ওপাশে একজন ব্যক্তির সাথে আলাপ করছেন। ওপাশের ওই লোক ছিলেন তাঁর স্ত্রীর আত্মীয়। তবুও ইবনে উমরের গাইরত সেটা বরদাশ করতে পারল না। রাগে ফেটে পড়লেন তিনি। এরপর কয়েকটি ছড়ি একত্র করে আচ্ছামতো ঘা লাগালেন স্ত্রীকে!১
ইবনে উমরের এই ঘটনায় রয়েছে সেইসব গাইরতহীন পুরুষের জন্য শিক্ষা, যারা তাদের স্ত্রীদের দিয়ে চাকরি করায়। স্ত্রীরা প্রতিদিন খুবই সাজুগুজু করে অফিসে পুরুষ কলিগের পাশে বসে ধোঁয়া উড়া কফির পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে রঙ্গেরসে চুটিয়ে গল্প জমায়!
এতে শিক্ষা রয়েছে সেইসব গাইরতহীন স্বামীর জন্য, যারা তাদের স্ত্রীকে দিয়ে কোনো মেগাশপে সেলসম্যানের চাকরি করায়। যারা পেশার খাতিরে শপে আগত কাস্টমারদের সাথে মুখে কথার খই ফুটায় আর আটা ময়দা মাখা চেহারা দেখিয়ে কাস্টমারকে ফিতনায় ফেলতে চায়। এইসব স্বামীর সাথে নবিজির সাহাবি ইবনে উমরের যোজন যোজন দূরত্ব!

টিকাঃ
১ রাওজাতুল মুহিব্বিন: ২৯৯, ইবনু কাইয়িমি জাওযিয়্যাহ।

📘 গাইরত > 📄 মুআজ ইবনে জাবালের গাইরত

📄 মুআজ ইবনে জাবালের গাইরত


নবিজির সাহাবি হজরত মুআজ ইবনে জাবাল রা. ছিলেন মূলত ইয়ামানের লোক। সেখান থেকে হিজরত করে মদিনায় আসেন। পরবর্তীকালে খিলাফতে রাশেদার সময় ইয়ামানের গভর্নর ছিলেন। ইসলামি ইতিহাসে তাঁর অবদান আজও স্বর্ণাক্ষরে লিখিত। তাঁর গাইরতের এক আজিব ঘটনা পাওয়া যায়।
একদিন মুআজ ইবনে জাবাল রা. ও তাঁর স্ত্রী দুজন একসঙ্গে বসে আপেল খাচ্ছিলেন। দুজনের হাতে আলাদা আলাদা দুটি আপেল ছিল। ইত্যবসরে তাঁদের কাছে আগমন করে তাঁদের গোলাম। তাঁর স্ত্রী করলেন কী; নিজ হাতের ভক্ষণকৃত আপেলটাই গোলামকে দিয়ে দিলেন!
বিষয়টি সিরিয়াসলি নিলেন মুআজ ইবনে জাবাল রা.। স্ত্রীর মুখের লালা যে আপেলে লেগে রয়েছে, সেই আপেল কেন সে গোলামকে দেবে! ব্যস, সাথে সাথে উঠে তিনি স্ত্রীকে বেদম পেটাতে লাগলেন!'
আরেকদিনের ঘটনা। বাইরে থেকে ফিরে এলেন মুআজ ইবনে জাবাল রা.। এসে দেখেন—তাঁর স্ত্রী পর্দার ফাঁক দিয়ে বাইরে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছেন। এটাও সহজে নিতে পারলেন না তিনি। এটাও তাঁর গাইরতে আঘাত হানল। স্ত্রীকে ধরে সেদিনও তিনি পেটালেন।২

টিকাঃ
১ রাওজাতুল মুহিব্বিন: ২৯৯, ইমাম ইবনু কাইয়িমিল জাওযিয়্যাহ।
২ প্রাগুক্ত।

📘 গাইরত > 📄 এক আনসারি সাহাবির গাইরত

📄 এক আনসারি সাহাবির গাইরত


তিনি মদিনার আনসারদের অন্তর্ভুক্ত একজন সাহাবি ছিলেন। সবেমাত্র বিয়ে করেছেন। খন্দক যুদ্ধের সময় ছিল তখন। তিনি নবিজি -এর সাথে খন্দকের যুদ্ধে চলে যান। দীর্ঘ সময় নিয়ে অন্য সাহাবিদের সাথে তিনিও পরিখা খনন করেন।
বাড়িতে নববধূ রেখে এসেছেন। তার পায়ের নূপুর আর হাতের চুড়ির রিনিঝিনি মধুর আওয়াজ কানে বাজছিল তাঁর। বাড়িতে যেতে মনটাও আঁকুপাঁকু করছিল। এক সময় নবিজি -এর কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে বাড়ির পথ ধরলেন।
বাড়িতে এসে দেখেন—তাঁর নববধূ ঘরের দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। ঘরের বাইরে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আনসারি সাহাবির গাইরত টগবগ করে উথলে উঠতে লাগল। বউ থাকবে ঘরের ভেতরে; দরজায় দাঁড়িয়ে কেন! বাহিরের লোকের চোখে পড়বে নিশ্চয়!
বর্শা হাতে তেড়ে গেলেন নববধূর দিকে। আঘাত করে রাগ হজম করার জন্য। নববধূও বুঝতে পারলেন স্বামীর মনোভাব। তিনি চেঁচিয়ে বলে উঠলেন, 'আপনি তাড়াহুড়ো করবেন না; শান্ত হোন, আগে ঘরে ঢুকে দেখুন-ঘরে কী!'
আনসারি সাহাবি কোনোরকম রাগ কন্ট্রোল করে ঘরে ঢুকলেন। ঢুকেই তিনি যা দেখলেন, তাতে তাঁর চক্ষু ছানাবড়া! বিছানার ওপর একটি বিষধর সাপ গোল বৃত্ত পাকিয়ে বসে আছে!১

টিকাঃ
১ মুয়াত্তা ইমাম মালিক: ৫/১৪২৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00