📘 গাইরত > 📄 উমর ইবনুল খাত্তাবের গাইরত

📄 উমর ইবনুল খাত্তাবের গাইরত


রাসুল -এর সাহাবাদের মাঝে উমর রা. ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি অন্যায়ের ব্যাপারে কঠোর ছিলেন। তাঁর গাইরতও ছিল প্রচুর। এটা নবিজি খুব ভালো করে জানতেন। হাদিসে এসেছে-
قال رسول الله ﷺ : بَيْنَا أَنَا نَائِمُ رَأَيْتُنِي فِي الْجَنَّةِ فَإِذَا امْرَأَةٌ تَتَوَضَّأُ إِلَى جَانِبِ قَصْرٍ فَقُلْتُ لِمَنْ هَذَا الْقَصْرُ فَقَالُوا لِعُمَرَ بْنِ الْخَطَابِ فَذَكَرْتُ غَيْرَتَهُ فَوَلَّيْتُ مُدْبِرًا فَبَكَى عُمَرُ وقال: أَعَلَيْكَ أَغَارُ يَا رَسُولَ الله.
নবিজি বলেন, 'একদিন স্বপ্নে আমি জান্নাতে যাই। সেখানে খুব সুন্দর একটা অট্টালিকা দেখতে পাই। তার পাশে বসে একজন নারী অজু করছিল। আমি তাকে জিজ্ঞেস করি, এই অট্টালিকাটি কার জন্য? সে বলে, হজরত উমরের জন্য। তখন আমার মন চাচ্ছিল—একটু ঘুরে দেখি। কিন্তু উমরের গাইরতের কথা চিন্তা করে আমি বিরত থাকি।'
উমর রা. রাসুল ﷺ থেকে এই ঘটনা শুনে কেঁদে ফেলেন এবং বলেন, 'হে আল্লাহর রাসুল! আপনার ব্যাপারেও কি আমার গাইরত জেগে উঠবে!'১
এ হাদিস থেকে যে শিক্ষাটা পাওয়া যায় তা হলো, বড়োদের দায়িত্ব হচ্ছে, ছোটোদের আত্মসম্মানের দিকে খেয়াল রেখে পদক্ষেপ নেওয়া। কখনো এমন পদক্ষেপ নেওয়া উচিত হবে না, যা দ্বারা ছোটোদের আত্মসম্মানে আঘাত লাগে।
উমরের গাইরতকে স্বয়ং আল্লাহ তা'আলাও মূল্যায়ন করেছেন। ফলে নির্ধারণ করেছেন পর্দার বিধান। তখনও পর্দার বিধান না থাকায় নবিজি -এর ঘরে নানান কিসিমের লোক আসা-যাওয়া করতেন। এতে উমর রা.-এর খুব গাইরতে লাগত।
নবিজির ঘরে স্ত্রীদের সামনে সব ধরনের লোক আসা-যাওয়া করবে! ব্যাপারটা তিনি মোটেও মেনে নিতে পারতেন না।
এটার একটা বিহিত করতে হবে। যে-ই ভাবা সেই কাজ। তিনি রাসুল ﷺ-কে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল! আপনার স্ত্রীগণের নিকট ভালো-মন্দ সব ধরনের লোক প্রবেশ করে। অতএব আপনি যদি তাদেরকে পর্দা করার নির্দেশ দিতেন!... ব্যস, এরই পরিপ্রেক্ষিতে উম্মাহাতুল মুমিনিনদের পর্দা ফরজ করে সুরা আহযাবের ৫৩ নং আয়াতটি নাজিল হয়।'১
শুধু তাই নয়; নবিপত্নীগণ যাতে পর্দায় থাকেন-এটার জন্য অভিনব কৌশলের আশ্রয় গ্রহণ করেন উমর রা.। হাদিসে এসেছে-
عَنْ عَائِشَةَ، أَنَّ أَزْوَاجَ، رَسُولِ اللَّهِ ﷺ كُنَّ يَخْرُجْنَ بِاللَّيْلِ إِذَا تَبَرَّزْنَ إِلَى الْمَنَاصِعِ وَهُوَ صَعِيدٌ أَفْيَحُ وَكَانَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ يَقُولُ لِرَسُولِ اللَّهِ ﷺ احْجُبْ نِسَاءَكَ . فَلَمْ يَكُنْ رَسُولُ اللَّهِ يَفْعَلُ فَخَرَجَتْ سَوْدَةُ بِنْتُ زَمْعَةَ زَوْجُ النَّبِيِّ ﷺ لَيْلَةً مِنَ اللَّيَالِي عِشَاءً وَكَانَتِ امْرَأَةً طَوِيلَةٌ فَنَادَاهَا عُمَرُ أَلَا قَدْ عَرَفْنَاكِ يَا سَوْدَةُ . حِرْصًا عَلَى أَنْ يُنْزِلَ الْحِجَابَ . قَالَتْ عَائِشَةُ فَأَنْزَلَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ الْحِجَابَ .
আম্মাজান আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর স্ত্রীগণ প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার সময় রাতের বেলা প্রশস্ত ময়দানে বের হতেন। ওদিকে উমর ইবনু খাত্তাব রা. রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে বলতেন, আপনার স্ত্রীগণের প্রতি পর্দা বিধান করুন। কিন্তু রাসুলুল্লাহ ﷺ তা করেননি। কোনো এক রাতে এশার সময় নবিজির সহধর্মিণী আম্মাজান সাওদা বিনতে যামআ রা. বের হলেন। তিনি ছিলেন দীর্ঘাঙ্গী মহিলা। উমার তাঁকে ডাক দিয়ে বললেন, 'হে সাওদা! আমরা তোমাকে চিনে ফেলেছি।' পর্দার বিধান নাজিল হওয়ার প্রতি প্রবল আকাঙ্ক্ষায় তিনি এরূপ করলেন। আয়েশা বলেন, 'তখন আল্লাহ তা'আলা পর্দা-বিধি নাজিল করলেন।'২

টিকাঃ
১ সহিহ বুখারি : ৩০০৩; সহিহ মুসলিম: ৪৪০৮।
১ সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৩৬৬; জামে তিরমিযি হাদিস : ৩০৯৭।
২ সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৫৪৮৪।

📘 গাইরত > 📄 উসমান ইবনে আফফানের গাইরত

📄 উসমান ইবনে আফফানের গাইরত


৩৫ হিজরি, ১৮ ই জিলহজ। কুফা, বসরা ও মিশর থেকে আগত বিদ্রোহীরা খলিফা উসমান ইবনে আফফান রা.-এর বাড়ি ঘেরাও করে আছে। তাঁকে শেষ করে দিতে তারা তৎপর হয়ে উঠেছে। কারণ, ইতোমধ্যেই বিভিন্ন জায়গা থেকে ইসলামি বাহিনী খলিফাকে রক্ষা করার জন্য রওনা হয়েছে- এই সংবাদে তারা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে উঠেছে।
বিদ্রোহীদের হাত থেকে খলিফাকে বাঁচাতে সাহাবায়ে কেরামের একটি দল খলিফার পাহারায় নিয়োজিত। কিন্তু খলিফা জানতেন-তিনি শহিদ হতে যাচ্ছেন। নবিজি ﷺ তাঁর পথপানে চেয়ে আছেন। তাই তিনি পাহারায় নিয়োজিত সবাইকে চলে যেতে নির্দেশ দিয়েছেন। সকলেই খলিফাকে বোঝাতে ব্যর্থ হলেন। কিন্তু খলিফা সবাইকে বরাবরের মতো অস্ত্র গুটিয়ে চলে যেতে বললেন। এমনকি তাঁর গোলামদেরকেও অস্ত্র কোষবদ্ধ করে নিতে বলেন। সেদিনই তিনি তার ২০ জন গোলামকে আজাদ করে দেন!
খলিফাকে বোঝাতে ব্যর্থ হয়ে প্রতিরক্ষা বাহিনীর লোকেরা আস্তে আস্তে চলে যেতে শুরু করে। এতে বিদ্রোহীরা সুযোগ পেয়ে যায়। তাদের একদল বাড়ির সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ করে। আরেকদল প্রাচীর ডিঙিয়ে ঘরে প্রবেশ করে।
বিদ্রোহীদের উপস্থিতি টের পেতেই খলিফাপত্নী নায়েলাহ বিনতে ফুরাফিসাহ উদ্বিগ্ন হয়ে যান। খলিফার জীবন নাশের ভয়ে তিনি উন্মাদিনীর মতো আচরণ করতে শুরু করেন। মাথার চুল এলোমেলো করে দৌড়ে ছুটে এসে বিদ্রোহীদের সামনে পথ আগলে ধরেন-যাতে ভয় পেয়ে তারা চলে যায়।
প্রিয়তমা স্ত্রীর এমন আচরণ দেখে খলিফার গাইরত ছলকে ওঠে। তিনি গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বলেন, 'ওগো! তোমার ওড়না মাথায় দাও; কসম আল্লাহর, আমার জীবনের চেয়েও তোমার চুলের সম্মান আমার কাছে অনেক বেশি!'১

টিকাঃ
১ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/১৭৮; তারিখুল মাদিনাহ: ৪/১২৮৬, ইবনে শাব্বাহ; তাবাকাতে ইবনে সাদ: ৩/৫১; আনসাবুল আশরাফ: ৬/১৩৯; তারিখুত-তাবারি: ৪/২৪৪; সিয়ার: ২/৪৭৫; তারিখ দিমাশক: ৩৯/৩০১; মুজাবুদ-দাওয়াহ: ৩০, ইবনে আবিদ দুনইয়া।

📘 গাইরত > 📄 আলি ইবনে আবু তালিবের গাইরত

📄 আলি ইবনে আবু তালিবের গাইরত


আলি ইবনে আবু তালিব রা.। নবিজি ﷺ-এর চাচাতো ভাই ও জামাতা। ইসলামের চতুর্থ খলিফা। গাইরতের প্রশ্নে অন্য সাহাবিদের থেকে মোটেও ব্যতিক্রম ছিলেন না। নবিজির কলিজার টুকরো ফাতিমাতুয-যাহরার ক্ষেত্রে খুবই গাইরত দেখাতেন তিনি। ফাতিমাও সেটা জানতেন। এজন্য আলির গাইরতের খেলাপ কোনো কিছু করেননি কখনও।
একবার প্রিয়তমা স্ত্রী ফাতিমা রা.-কে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, : নারীর জন্য কল্যাণকর কী? : নারীর এমনভাবে থাকা যে, সে পুরুষদের দেখতে পাবে না; আবার পুরুষেরাও তাকে দেখতে পাবে না।১
একবার আলি রা. সেইসব গাইরতহীন পুরুষের প্রতি খুব খেপে যান, যারা তাদের নারীকে একাকী বাইরে বেরোতে দেয়। তিনি রাগতস্বরে বলেন, 'তোমাদের কি লজ্জা নেই? তোমরা সব গাইরত বিসর্জন দিয়ে ফেলেছো? তোমাদের অনেকেই তাদের স্ত্রীদেরকে পুরুষদের মাঝে দিব্যি চলাফেরা করার সুযোগ দেয়। সে পুরুষদের দিকে তাকায়, আর পুরুষেরাও তার দিকে তাকায়!'
আরেকবার তিনি গাইরতহীন পুরুষদের ওপর খুব গোস্বাভরা কণ্ঠে বলেন, 'আমি জানতে পেরেছি, তোমাদের নারীরা বাজারে অনারবি কাফিরদের ভিড়ে ঠ্যালাঠেলি করে চলে। জেনে রেখো, যার মধ্যে কোনো গাইরত নেই, তার মধ্যে কোনো কল্যাণও নেই!'২
প্রিয়তমা ফাতিমার সাথে আলি রা.-এর প্রেমময় খুনসুটির কথা পাওয়া যায় বিভিন্ন সূত্রে। তবে সূত্রগুলো অসমর্থিত। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ্বর কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রে তা পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হয়, এটা শিয়াদের সূত্র থেকে এসেছে। সত্য হোক বা মিথ্যা; ব্যাপারটা কিন্তু দারুণ!
একবার বাইরে থেকে ঘরে এলেন আলি ইবনে আবু তালিব রা.। এসে দেখলেন, প্রিয়তমা ফাতিমা মিসওয়াক করছেন। মিসওয়াকের ডালটি ছিল আরাক বৃক্ষের। আরবে এ বৃক্ষের ডালই মিসওয়াকের জন্য খুব ব্যবহৃত হতো। প্রিয়তমার সাথে একটু খুনসুটি করতে মন চাইল আলির। তিনি মিসওয়াক টাকে সম্বোধন করে কবিতা গাইতে লাগলেন—
ظَفِرْتَ يَا عُودَ الْأَرَاكِ بِتَغْرِهَا ... مَا خِفْتَ يَا عُودَ الْأَرَاكِ أَرَاكَا لَوْ كُنْتَ مِنْ أَهْلِ الْقِتَالِ قَتَلْتُكَ ... مَا فَازَ مِنِّي يَا سُوَاكُ سِوَاكَا
(কাব্যানুবাদ) হে আরাকের ডাল! প্রিয়ার দাঁত ছুঁয়ে বিজয়মালাটা ছিনিয়ে নিয়েছ তুমি, তোমার মধ্যে কোনোরূপ ভয়ভীতি নেই, সেটাই তো দেখতে পাচ্ছি আমি! যদি তুমি ময়দানে যুদ্ধের উপযুক্ত হতে, অবশ্যই যুদ্ধ করতাম তোমার সাথে। হে মিসওয়াক, বিজয়ী তো কেউ হয়নি; তুমিই হলে প্রথম, এ যে মোর মানহানি!

টিকাঃ
১ মুসনাদুল বাজ্জার: ৫২৬, হাদিদের সনদ যয়িফ।
২ যাওয়াইদু মুসনাদে আহমাদ: ২/৩৪৩; শারহুস-সুন্নাহ: ৯/২৭০।

📘 গাইরত > 📄 যুবাইর ইবনুল আওয়ামের গাইরত

📄 যুবাইর ইবনুল আওয়ামের গাইরত


যুবাইর ইবনুল আওয়াম্ম রা.। রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর হাওয়ারি। নবিজির ফুফাতো ভাই। সাফিয়্যাহ বিনতে আবদুল মুত্তালিবের ছেলে। সিদ্দিকে আকবর রা.-এর মেয়েজামাই। জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজন সাহাবির অন্যতম। নবিজির ইনতিকালের পর ছিলেন খিলাফতে রাশেদার ছয় শুরা সদস্যের একজন। ইসলামের ইতিহাসে সর্বপ্রথম তরবারি কোষমুক্ত করার ফজিলতও তাঁর।১
বিয়ে করেন আবু বকর রা.-এর কন্যা আসমা বিনতে আবু বকর রা.-কে। বিয়ের সময় ছিলেন কপর্দকশূন্য। কিন্তু, স্ত্রীর বিষয়ে গাইরত ও আত্মমর্যাদার ক্ষেত্রে ছিলেন পরিপূর্ণ সচেতন। আসমা রা.-এর মুখ থেকেই শুনুন। আসমা বলেন :
যুবাইর যখন আমাকে বিয়ে করেন, তখন পৃথিবীতে তাঁর অর্থবিত্ত, গোলাম ও বাঁদি— কিছুই ছিল না। ছিল কেবল পানি টানার জন্য একটা উট আর তাঁর নিজের একটা ঘোড়া। আমি নিজেই ঘোড়াকে ঘাস খাওয়াতাম। উটে করে পানি আনতাম। পানির মশক সেলাই করতাম। আটা পিষতাম। কিন্তু আমি ভালো করে রুটি বানাতে পারতাম না। প্রতিবেশী আনসার নারীরা এসে রুটি বানিয়ে দিতেন। তাঁরা খুব ভালো মানুষ ছিলেন।
নবি ﷺ যুবাইরকে এক খণ্ড জমি দিয়েছিলেন। সেই জমি থেকে আমি খেজুরের আঁটির বোঝা মাথায় করে আনতাম। জমিটি ছিল আমাদের বাড়ি থেকে প্রায় দুই মাইল দূরে।
একদিন আমি খেজুরের আঁটির বোঝা মাথায় করে ফিরছি। পথিমধ্যে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সাথে দেখা। নবিজির সাথে কয়েকজন আনসারি সাহাবি ছিলেন। আমাকে দেখে নবিজি উট থামান। পেছনে উঠিয়ে নেওয়ার জন্য ডাক দেন। কিন্তু পুরুষদের সাথে যেতে আমার লজ্জা লাগছিল। নবিজি বুঝতে পারেন—আমি লজ্জা পাচ্ছি। ব্যস, চলে যান।
বাড়িতে ফিরে যুবাইরের সাথে সাক্ষাৎ হলো। বিস্তারিত খুলে বললাম তাঁকে। রাসূলুল্লাহ-এর সাথে পথে সাক্ষাৎ হয়েছিল। আমার মাথায় তখন খেজুরের আঁটির বোঝা। নবিজির সাথে কয়েকজন আনসারি সাহাবি ছিলেন। আমাকে পেছনে উঠিয়ে নেওয়ার জন্য নবিজি উট থামান। কিন্তু আমার লজ্জা লাগছিল আর আপনার গাইরতের উপলব্ধি মনে পড়ছিল।
যুবাইর ইবনুল আওয়াম রা. উত্তরে বলেন-কসম আল্লাহর, কষ্ট করে তোমার বোঝা বহনের চেয়ে নবিজির উটের পিঠে চড়া আমাকে বেশি কষ্ট দিত।
আসমা রা. বলেন, 'এরপর আবু বকর আমার জন্য একজন খাদেম পাঠান, যে ঘোড়া পালনের দায়িত্ব পালন করত। এতেই মনে হতো-আমাকে যেন আজাদ করে দেওয়া হয়েছে।'১
এখানে যে-ই ব্যাপারটা বুঝতে হবে সেটা হলো, একদিকে আসমা বিনতে আবু বকর সংসারের জন্য কী কষ্টই না করেছেন! তাঁকে মাথায় করে বোঝা টানতে হতো দুই মাইল। ওই সময় সুযোগ পেলে কে না একটুখানি আরাম চায়! এমন সময় নবি তাঁকে উটে বসিয়ে এগিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সাথে আরও পুরুষ থাকায় তিনি লজ্জায় উঠেননি; বরং স্বামীর গাইরতের কথাকে তিনি মাথায় রেখেছেন। কষ্টের ওপর তিনি গাইরতকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
প্রশ্ন আসতে পারে, একজন সাহাবিপত্নী হয়ে কীভাবে তিনি ঘরের বাইরে বের হতেন; কোনো সম্ভ্রান্ত ঘরের নারীরা তো এভাবে বেরোয় না; এটা নিম্নমানের ফ্যামিলির চিত্র! উত্তরে বলব, ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি রহ. এই হাদিসের ব্যাখ্যায় লিখেছেন-ঘটনাটি পর্দার আয়াত নাজিল হওয়ার আগের।
অন্যদিকে যুবাইর ইবনুল আওয়াম্মের মন্তব্যটাও শোনার মতো। স্ত্রীর প্রিয়তমা স্ত্রীর কায়িক কষ্টে তিনিও কষ্ট পান। কিন্তু তাঁর গাইরত এতটাই বেশি ছিল যে, অন্য পুরুষদের সাথে দেখলে তিনি আরও কষ্ট পেতেন। পর্দার বিধান নাজিল না হলেও স্বামীর গাইরত তাঁর স্ত্রীকে গাইরে মাহরাম পুরুষদের সাথে চলতে বাধা দিয়েছে।
অবশ্য যুবাইর ইবনুল আওয়াম্মের গাইরতের ঘটনা শুধু এটিই নয়; আরও আছে। আসমা বিনতে আবু বকর রা.-কে ছাড়াও আরও বিয়ে করেছিলেন যুবাইর। তাঁর অর্থীদের সাথো ছিলেন আরবের রূপললনা আতিকা বিনতে যায়েদ রা.। আতিকাকে এশাখার বিয়ে করেছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকর রা.। আবদুল্লাহ তাঁকে কী যে আরজুবাদতেনতা আজও ইতিহাসে ভাস্বর। আবদুল্লাহর পর তাঁকে বিয়ে করেন উমর ইবনুল খাত্তাব রা.। উমরের পর তাঁকে বিয়ে করেন যুবাইর ইবনুল আওয়াম্ম রা.। যুবাইরের পর বিয়ে করেন মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর রা.।
আশ্চার্থজদক হলেও সত্য যে, কারও সাথেই আতিকার সংসার স্থায়ী হয়নি; স্বামীদের সংকল্পেই শাহাদাতবরণ করেছেন! যার সাথেই আতিকা ঘর বেঁধেছেন, তিনিই শহিদ হয়েছেন! এজন্য আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলতেন, 'কেউ যদি শহিদ হতে চায়, সে যেন আতিকা বিনতে যায়েদকে বিয়ে করে!'
যাহোক, আসল কথায় আসি। ইসলামের প্রাথমিককালে নারীরা মসজিদে যেতেন। জামাতে নামাজ পড়ার জন্যে। যুবাইর ইবনুল আওয়াম্মের স্ত্রী আতিকা বিনতে যায়দও মসজিদে যেতেন। এশার ওয়াক্তে তো অন্ধকার থাকতই; ফজরের সময়েও অন্ধকার থাকত। কারণ, নবিজি অনেক সময় ফজরের শুরু ওয়াক্তেই নামাজ আদায় করে নিতেন। দেখা যেত—নামাজ পড়ে বেরিয়ে আসার সময়ও আবছা অন্ধকার বিরাজ করত পরিবেশে।
আন্ধকারে স্ত্রী মসজিদে যাক—এটা মেনে নিতে পারতেন না যুবাইর ইবনুল আওয়াম্ম রা.। ব্যাপারটা তাঁর গাইরতে লাগত। আবার মানাও করতে পারতেন না, যেহেতু নবিজি সুযোগ দিয়েছেন। তাহলে কী করা? তিনি ভিন্ন ফন্দি আঁটলেন। কী সেই ফন্দি?
একবার অন্ধকারে নামাজ পড়তে বের হলেন আতিকা বিনতে যায়দ। এশা কিংবা ফজরের ওয়াক্ত হবে হয়তো। চুপি চুপি পিছু নিলেন যুবাইর ইবনুল আওয়াম্ম। হঠাৎ করে আতিকার গায়ের স্পর্শকাতর অঙ্গে হাত দিয়ে আবার অন্ধকারেই হাওয়া হয়ে গেলেন!
আতিকা কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। কে হাত দিয়ে দৌড় দিলো! ঘটনার আকস্মিকতায় ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলেন তিনি। লজ্জায়-শরমে তিনি ঘরে ফিরে এলেন।
কিন্তু তার আগেই ঘরে চলে এলেন যুবাইর ইবনুল আওয়াম্ম রা.। নামাজ না পড়েই আতিকাকে বিব্রতভাব নিয়ে ঘরে ফিরতে দেখে যুবাইর জিজ্ঞেস করলেন,
: কী হলো; নামাজ না পড়েই ঘরে ফিরে এলে যে!
: আর বলো না; কোন এক বদমাইশ লোক আমার গায়ে হাত দিয়ে দৌড়ে পালিয়েছে!১
যুবাইর ইবনুল আওয়াম মনে মনে হাসলেন। যে পলিসি এপ্লাই করেছিলেন তিনি, সেটা শতভাগ সাকসেসফুল! সাপও মরল; লাঠিও ভাঙল না।
উল্লেখ্য, তখন নারীদের জন্য মসজিদে যাওয়ার সুযোগ ছিল; তবে জরুরি ছিল না। কিন্তু নবিজি -এর বহু হাদিসে পাওয়া যায়, নারীর জন্য তার ঘরই মসজিদ। ঘরে নামাজ পড়া তার জন্য উত্তম। তাই ফিতনার দিক লক্ষ করে আলেমগণ এই হাদিসগুলোর ওপর আমল করেন; নারীর জন্য ঘরেই নামাজ পড়া উত্তম বলেন।

টিকাঃ
১ সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৪১, হাফিজ শামসুদ্দিন যাহাবি।
১ সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২২৪।
১ স্মৃতিলাল কুলুনী: ২৬৬, মুহাম্মাদ ইসমাঈল আযহার খারাইতী।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00