📘 গাইরত > 📄 পুরুষের ক্ষেত্রে নারীর গাইরতের কারণ

📄 পুরুষের ক্ষেত্রে নারীর গাইরতের কারণ


শুধুই কি নারীর সংস্পর্শে পুরুষের সমস্যা? পুরুষের সংস্পর্শে কি নারীর সমস্যা নেই? শুধুই কি পুরুষ গাইরত দেখাবে নারীর ক্ষেত্রে, নারী কি গাইরত দেখাবে না পুরুষের ক্ষেত্রে? হ্যাঁ, অবশ্যই দেখাবে। সমস্যা কিন্তু দুই জায়গাতেই সমানে সমান। আগুনের মোমের পাশে নিলে যেমন মোম গলে; তেমনিভাবে মোমকে আগুনের পাশে নিলে গলে। নারী ও পুরুষের অবস্থা হলো আগুন ও মোমের মতো। সুতরাং এই দুই বস্তু কোনোটাকেই একটা আরেকটার পাশে নেওয়া যাবে না।
পুরুষকে নারীর সংস্পর্শে যেতে মানা করার মূল রহস্যটা হলো, নারীর মন বড় নরম ও তুলতুলে। তার মন সহজেই গলে যায়। বিশেষ করে গলে যাওয়ার উপলক্ষ্যটা যদি কোনো পুরুষ হয়। কারণ, পুরুষের প্রতি নারীর টান সহজাত প্রবৃত্তি। ব্যাপারটি বোঝাতে একটা হাদিসের ঘটনা বলি-
নবিজি -এর 'আনজাশা' নামে একজন হাবশি গোলাম সাহাবি ছিলেন। তিনি সুমিষ্ট স্বরে গান গেয়ে উট চালাতে পারদর্শী ছিলেন। আনজাশার উপনাম ছিল আবু মারিয়া। বিদায় হজের দিন নবিজির কাফেলার সাথে আনজাশাও ছিলেন। তিনি মহিলা যাত্রীদের বাহনে গান গেয়ে গেয়ে উট চালাতে লাগলেন। কিন্তু নবিজি তাঁকে গান গাইতে নিষেধ করে দিলেন। হাদিসে এসেছে-
عَنْ أَنَسٍ، أَنَّ الْبَرَاءَ بْنَ مَالِكٍ كَانَ يَحْدُو بِالرِّجَالِ، وَكَانَ أَنْجَشَةُ يَحْدُو بِالنِّسَاءِ، وَكَانَ حَسَنَ الصَّوْتِ، فَقَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم: يَا أَنْجَشَهُ، رُوَيْدَكَ سَوْقَكَ بِالْقَوَارِيرِ.
আনাস রা. থেকে বর্ণিত, বারা ইবনে মালিক রা. পুরুষ যাত্রীদের গান শুনিয়ে কাফেলা চালাতেন, আর আনজাশা মহিলা যাত্রীদের বাহন গান গেয়ে চালাতেন। তার কন্ঠস্বর ছিল সুমধুর। নবি বলেন, 'হে আনজাশা, আস্তে করো। তোমার যাত্রীরা যে কাচের শিশির মতো!'১
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, নবিজি বলেছেন: رفقا بالقوارير 'হে আনজাশা, কাচের শিশির সাথে একটু সহমর্মী হও।'২
জগদ্বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম নববি রহ. এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, 'নবিজি নারীদেরকে কাচের শিশির সাথে তুলনা করার কারণ হলো, নারীদের চিত্ত খুবই দুর্বল। কাচের শিশি যেভাবে দুর্বল হয় এবং সামান্য আঘাতে ভেঙে যায়, তেমনিভাবে নারীদের মনের দুর্বলতার কারণে খুব সহজেই ভেঙে যায়।'
হাদিস জগতের আরেক ব্যাখ্যাকার ইমাম কাজি ইয়াজ মালিকি বলেন, 'আনজাশা ছিলেন সুমধুর কণ্ঠের অধিকারী। তিনি নারীদের উটের বাহন চালাতেন গান গেয়ে গেয়ে। নবিজির ভয় ছিল—আনজাশার গানে নারীরা আবার ফিতনায় পড়ে যান কিনা। তাঁর গান নারীদের অন্তরে জায়গা করে নিতে পারে হয়তো। তাই তিনি আনজাশাকে এভাবে শ্রুতিমধুর কণ্ঠে গান গাইতে বারণ করেছেন। পুরুষের সুমধুর কণ্ঠে নারীর মন বিগলিত হয়ে যায় বলেই তো আরবরা বলে থাকে—গান হলো ব্যভিচারের মন্ত্র!'
এই হাদিসের অন্য ব্যাখ্যাও পাওয়া যায়। তবে উল্লিখিত ব্যাখ্যাটি বহু আলেম পছন্দ করেছেন। এই ব্যাখ্যার সমর্থনে আরেকটি হাদিস রয়েছে। সেটিও উল্লেখ করলে ব্যাপারটা ক্লিয়ার হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।
عن أنس بن مالك قال: كان البراء بن مالك رجلا حسن الصوت فكان يرجز لرسول الله ﷺ في بعض أسفاره فبينما هو يرجز إذ قارب النساء فقال له رسول الله ﷺ : إياك والقوارير. قال فأمسك : قال محمد : كره رسول الله ﷺ أن تسمع النساء صوته.
আনাস রা. থেকে বর্ণিত, বারা ইবনে মালিক রা. সুমধুর কণ্ঠের অধিকারী লোক ছিলেন। বিভিন্ন সফরে তিনি নবিজিকে গান (কবিতা) গেয়ে শোনাতেন। একবার তিনি গান গেয়ে গেয়ে কাফেলার নারীদের কাছাকাছি হয়ে গেলেন। তখন নবিজি তাঁকে সাবধান করে দিয়ে বললেন, 'বারা, কাচের শিশির মতো নারীদের থেকে নিজেকে বাঁচাও। এরপরই বারা নিজেকে সামলিয়ে নেন; আর সামনে বাড়েননি। হাদিসের বর্ণনাকারী মুহাম্মাদ বলেন, 'নবিজি পছন্দ করেননি যে, নারীরা তাঁর কণ্ঠস্বর শুনুক।'১
হাদিস থেকে স্পষ্ট বোঝা গেল, পুরুষের সুমধুর কণ্ঠও নারীর জন্য জন্য মারাত্মক ফিতনার কারণ। খোদ নবিজি তাঁর পুণ্যবতী পত্নীদের ক্ষেত্রেও পুরুষের সুমধুর কণ্ঠে ফিতনার ভয় করেছেন। এমতাবস্থায় আমি-আপনি কোন স্যার? পুরুষের জন্য যেমন নারীকণ্ঠ ফিতনার কারণ, তেমনিভাবে নারীর জন্য পুরুষকণ্ঠও ফিতনার কারণ।
জাহিলি যুগের একটা ঘটনা বলি। সে সময় হুতাইআহ নামে একজন লোক ছিলেন। খুব প্রজ্ঞার অধিকারী। যে-কারও সমালোচনায় বেশ পটু ছিলেন। একবার তার এলাকায় দুর্ভিক্ষ দেখা দিলো। তিনি গিয়ে আশ্রয় নিলেন বনু মাকলাদ ইবনে ইয়ারবু গোত্রে। হুতাইআহকে দেখে তো গোত্রের লোকেরা পেরেশান। তারা একে অপরের সাথে মিলিত হয়ে বলল, 'এই লোকটার জবান থেকে তো কেউ রেহাই পায় না। তাই আসো, আমরা লোকটাকে বলি, তিনি কী পছন্দ করেন, তাহলে আমরা সেটা করব, আর তিনি কী অপছন্দ করেন, তাহলে আমরা সেটা পরিহার করব।'
গোত্রের গণ্যমান্য লোকেরা এলো হুতাইআহর কাছে। এসে বলল, 'জনাব! আপনি গোটা আরববাসীর মধ্যে আমাদেরকে নির্বাচন করেছেন; বিপদের সময় আমাদের কাছে এসে আশ্রয় নিয়েছেন। সুতরাং আপনি আমাদেরকে আদেশ করুন আপনি যা পছন্দ করেন, আমরা তা করব; আর আপনি যা অপছন্দ করেন, তাও বলুন; আমরা তা পরিত্যাগ করে চলব।'
হুতাইআহ বললেন, 'আপনারা আমার সাথে খুব বেশি বেশি দেখাসাক্ষাৎ করতে আসবেন না, এতে আপনারা আমাকে বিরক্ত করে ছাড়বেন। আবার দেখাসাক্ষাৎ একেবারে কমও করবেন না, এতে করে আপনারা আমাকে ভয় পেতে শুরু করবেন।
আমি যে ঘরে থাকি সে ঘরের আঙিনায় তোমরা আড্ডা বসাবে না। আর তোমাদের যুবকদের গান আমার মেয়েদেরকে শোনাবে না। কেননা, গান হলো ব্যভিচারের মন্ত্র।'
এরপর হুতাইআহ সে গোত্রে বউ-বাচ্চা নিয়ে অবস্থান করতে লাগলেন। এদিকে গোত্রের লোকেরা তাদের ছেলেদের একত্রিত করে শাসিয়ে বলল, 'খবরদার! তোমাদের মা তালাক হয়ে যাবে এবং তোমাদের শক্ত পিটুনি দেব, যদি তোমাদের কেউ হুতাইআহ আমাদের মাঝে অবস্থান করা পর্যন্ত গান গায়!'১
'গান ব্যভিচারের মন্ত্র'। কথাটা ঠিক। বাস্তবেও তা-ই হচ্ছে। এ ব্যাপারে রাখঢাক ছাড়াই একটু কথা বলি-
দ্বীনহীন নারী কণ্ঠশিল্পী ও পুরুষ কণ্ঠশিল্পী এবং তাদের ভক্ত ও ফ্যানদের কথা এখানে বলা উদ্দেশ্য না। ওরা তো যাপিত জীবনে দ্বীন প্র্যাকটিস করে না। এমতাবস্থায় কেউ তাদের কণ্ঠের পাগল হওয়া না-হওয়া নিয়ে আলাপ করা মানে অপলাপ বৈ কিছু নয়। এখানে ইসলামি কণ্ঠশিল্পী ও নারী ফিতনা নিয়েই কিছু বলতে চাই।
ইসলামি কণ্ঠশিল্পীদের ভক্ত ও ফ্যান-ফলোয়ারদের বড় একটা অংশ কিন্তু নেকাবি- হিজাবি বোনেরা! শিল্পীদের সুললিত কণ্ঠে বিগলিত হয়ে কত কত দ্বীনি আপু ফিদা হয়ে যাচ্ছেন! নিজ নিজ পছন্দের ইসলামি কণ্ঠশিল্পীদের ফেসবুক পেইজ আর ইউটিউব চ্যানেল ফ্যাভারিট করে কিংবা সাবস্ক্রাইব করে নিয়মিত গজল শুনছেন আর কণ্ঠের মূর্ছনায় নিজেকে হারিয়ে ফেলছেন!
কত দ্বীনি সিস্টার আছেন, নির্দিষ্ট একজন নাশিদ শিল্পীর একান্ত ভক্ত তিনি। ওই শিল্পীর জন্য দিওয়ানা। স্বপ্নে শিল্পীকে নিজের প্রেমিক পুরুষ বানিয়ে দিন গুজরান করছেন। ভবিষ্যতে তাকে স্বামী হিসেবে জল্পনা-কল্পনা করছেন। এজন্য বারবার বিয়ের প্রস্তাবও ফিরিয়ে দিচ্ছেন। কোনো পুরুষকেই আর ভাল্লাগে না! অথচ, বেচারা নাশিদ শিল্পীর এদিকে কোনো খবরই নেই! বেচারা হয়তো প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য বউ- বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে সুখেই দিনাতিপাত করছেন! অথবা অবিবাহিত হলে কোনো একদিন হঠাৎ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিয়ের অনুষ্ঠানে দুলহা সেজে ছবি পোস্ট করে কতশত দ্বীনি সিস্টার ভক্তের মন ভাঙছেন!
ইসলামি শিল্পী গোষ্ঠীগুলোর এমন কোনো শিল্পী নেই, যার অসংখ্য-অগণিত মেয়েভক্ত নেই। এতে শিল্পী সেটা জানেন বা না-জানেন। শিল্পী গোষ্ঠীগুলোর ফ্যান-ফলোয়ারদের বড় একটা অংশ হলো দ্বীনি সিস্টারগং। কোনো কোনো সিস্টার তো এমন যে, তার প্রিয় শিল্পীর গজল শুনতে শুনতে ঘুমোতে যান। জাগার পরও আবার শোনেন। এভাবে দিনদিন ক্রাশ খাইতে থাকেন। সখীদের কাছেও তার ক্রাশের কথা জানান। শুধু তা-ই নয়; গোপনে প্রিয় শিল্পীর আইডি বা পেইজে গিয়ে নক করে নিজের ভালোলাগার কথাও জানান। ব্যস, বাকিটুকু ইতিহাস!
ইতিহাসের অংশ হিসেবে যখন কোনো স্ক্যান্ডাল ফাঁস হয়, তখন সকলেই শিল্পীকে ধুয়ে দেয়। তুলাধুনা করে। শুধুমাত্র নটকে নিয়েই কথা বলে। কিন্তু কেউই নটিকে নিয়ে কথা বলে না। আলগোছ পাশ কেটে যায়। অথচ, এসব শিল্পীর নষ্টামির পেছনে নটিদের ভূমিকা মোটেও কম না। সব জেনে-বুঝেই তারা প্রথমে ভক্ত হয়। তারপর গোপনে প্রেম করে। পরকীয়া করে। এমনকি বিয়ে করে। তাদের বিয়ে করার জন্য কি আর কোনো পুরুষ নেই? নষ্ট শিল্পীদের দুই দিনের বউ হওয়ার জন্য তারা এত কাঙালিনী কেন?
আসলে সমস্যা হলো, মেয়েরা সুমধুর কণ্ঠের পাগল। কণ্ঠশিল্পী দেখলেই বিগলিত হয়ে পড়ে। জল্পনা-কল্পনা করতে শুরু করে। সুযোগ করে ভাব জমাতে চায়। এটা তাদের একটা মারাত্মক সমস্যা। অবশ্য সব মেয়েরা এমন নয়। তারা বোঝে না, জীবন-সংসার করার জন্য এই কণ্ঠশিল্প মোটেও কাজ দেবে না; কাজ দেবে একজন পুরুষের গুণ, চরিত্র, কর্ম ও ব্যক্তিত্ব। এসব কণ্ঠশিল্পীর প্রেমিকা বা বউ হয়ে তারা কখনো স্ত্রীর মর্যাদা পাবে না। বদচরিত্রের শিল্পীর কাছে তারা মধুমক্ষিকা হয়েই থাকবে শুধু!
দ্বীনি বোনদের গাইরত রাখা উচিত। আবেগের মুখে লাগাম পরানো দরকার। কোনো শিল্পীর কণ্ঠস্বরের পেছনে পড়ে নিজেকে বরবাদ করার কী দরকার! শিল্পীকেও বরবাদ করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করারও কী দরকার! কোনো কাপুরুষকে নিজের আবেগ ও সরলতা নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে দিতে হবে কেন? প্রয়োজনে ভেবেচিন্তে সৎ, কর্মঠ, যোগ্য, চরিত্রবান, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও দ্বীনদার কোনো ছেলেকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পাওয়ার জন্য দুআর আমল চালিয়ে যাওয়া উচিত। ইনশাআল্লাহ, আল্লাহ ঠকাবেন না। তিনি কাউকে ঠকান না।
এসব আলতু-ফালতু কণ্ঠশিল্পী ও স্টারদের নিয়ে আকাশকুসুম স্বপ্ন দেখা বোকামি বৈ কিছু নয়। আবেগের রঙিন ফানুস না উড়িয়ে; বাস্তবতার পাখনায় উড়া শিখতে হবে। আবেগ দিয়ে জীবন চলে না; জীবন চলে বাস্তবতা দিয়ে—এটা বুঝতে চেষ্টা করতে হবে। যে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে সুখে রাখবে, সেই স্বামীই তো জীবনের প্রকৃত স্টার।

টিকাঃ
১ সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৮০৯; আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ১২৭৬।
২ প্রাগুক্ত।
১ মুস্তাদরাক হাকিম, হাদিস: ৫২৭৩। ইমাম হাকিম নিশাপুরি হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন। ইমাম যাহাবি সমমত পোষণ করেছেন।
১ আল-আগানি: ২/১৭১, ইমাম আবুল ফারাজ ইস্পাহানি।

📘 গাইরত > 📄 গাইরত যখন হজের পথে বাধা

📄 গাইরত যখন হজের পথে বাধা


আরবের এই লোকটির নাম ছিল আশজায়ি। তার গাইরত এত বেশি ছিল যে, হজে আগত লোকেরা তার স্ত্রীকে দেখে ফেলবে—এজন্য বেচারা তার স্ত্রীকে হজে যেতে রুখে দিয়েছিলেন!
এটা যদিও শরিয়তে গ্রহণযোগ্য না, তবুও ঘটনা থেকে লোকটির স্ত্রীর ব্যাপারে সীমাহীন প্রায় গাইরত অনুভব করা যায়।
বেচারার এমন কঠিন পদক্ষেপের অবশ্য কারণ আছে। হজের সময় নারী ও পুরুষ হাজিদের ভিড় দেখে বেচারা ভড়কে যান। এরপর মন্তব্য করেন, ‘যে ব্যক্তি এই ভিড়ের মধ্যে তার স্ত্রীকে প্রবেশ করায়, সে পাগল ছাড়া কেউ নয়!’
এরপরই তিনি তার বাহনজন্তুর মুখ ফিরিয়ে দেন নিজ অঞ্চলের দিকে। এবং হজ না করেই চলে আসেন! আসার পথে কবিতা আবৃত্তি করেন :
وليس بحر من يوسط زوجة ... له بين أهل الموسم المتقصد وفيهم رجال كالبدور وجوههم ... فمن بين ذي طرف كثير وأمر
হজের ভিড়ে যে তার স্ত্রীকে নিয়ে আসে, মোটেও কোনো সম্মানী লোক নয় সে। হাজিদের মধ্যে আছে সুন্দর পুরুষ চাঁদবদন, কত দৃষ্টিপাতকারী ও শ্মশ্রুবিহীন তরুণ।১

টিকাঃ
১ মুহাযারাতুল উদাবা : ১/৪২৬।

📘 গাইরত > 📄 বিচারকের দরবারে স্বামীর গাইরত

📄 বিচারকের দরবারে স্বামীর গাইরত


রাই—প্রাচীন খোরাসানের একটি প্রসিদ্ধ শহর। যে শহরের দিকে সম্বন্ধ করে মুসলিম উম্মাহর অনেক বিদগ্ধ পণ্ডিতকে ‘রাযি’ বলা হয়। যেমন ইমাম ফখরুদ্দিন রাযি রহ.। এই রাই'র কাজি তথা বিচারপতি ছিলেন মুসা ইবনে ইসহাক। বিচারকার্যে তাঁর যশ-খ্যাতি ছিল গোটা খোরাসান জুড়ে।
২৮৬ হিজরি। মুসা ইবনে ইসহাকের আদালতে আগমন করল এক নারী। এসেই নিজ স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করল। মামলাটা ছিল মোহরানা সম্পর্কিত। গড়াতে লাগল মামলা। উকিল আর সাক্ষীর ঝাক্কিঝামেলা।
শুরু হলো আদালত। ওই নারীর নির্ধারিত উকিল নিজ মক্কেলের স্বামীর ওপর মোহর হিসেবে পাঁচশো স্বর্ণমুদ্রা দাবি করল। আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত স্বামী উল্লিখিত মোহর সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করল! বিচারপতি মুসা ইবনে ইসহাক উকিলকে সম্বোধন করে বললেন,
: তোমার সাক্ষীরা কোথায়?
: তাদেরকে আদালতেই উপস্থিত করে রেখেছি জনাব!
উকিল একজন সাক্ষীকে ডাক দিলো। সাক্ষী দাঁড়াল। সাক্ষীকে বাদী নারীর চেহারার দিকে তাকানোর আদেশ করল উকিল। যাতে সাক্ষ্য দানকালে নারীর দিকে ইঙ্গিত করতে পারে। সাক্ষ্যদানের জন্য প্রস্তুত হলো সাক্ষী। নারীকে বলল, ‘আপনিও দাঁড়ান!’
অবস্থা আঁচ করতে পেরে আঁতকে উঠল নারীর বিবাদী স্বামী। পরপুরুষ তার স্ত্রীর মুখ দেখবে—এটা কোনোভাবেই সে মেনে নিতে পারল না। তার গাইরতে চরম আঘাত হানল। উকিলকে সম্বোধন করে সে শশব্যস্ত কণ্ঠে বলে উঠল,
: আপনারা এইসব কী শুরু করলেন?
: সাক্ষী আপনার স্ত্রীর চেহারার দিকে তাকাবে। যাতে করে সে আপনার স্ত্রীকে খুব ভালো করে চিনতে পারে। এতে সমস্যা কীসের? এটা তো প্রয়োজনের তাগিদেই!
: মহামান্য বিচারক! আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমার স্ত্রী আমার ওপর মোহর বাবদ যা দাবি করছে, আমি তা মাথা পেতে স্বীকার করলাম। তবে আল্লাহর ওয়াস্তে সে যেন তার চেহারা উন্মোচন না করে!
স্বামীর কথায় বড় প্রভাবিত হলো স্ত্রী। সেও বলল, 'মহামান্য বিচারক মহোদয়! আমিও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমি আমার মোহর আমার স্বামীকে দান করে দিলাম। এবং ইহকাল ও পরকালে তাকে এর দায়ভার থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্তি দিয়ে দিলাম!'
যারপরনাই আশ্চর্য হলেন বিচারক মুসা ইবনে ইসহাক। এতক্ষণ তিনি মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় গাইরতমন্দ স্বামী ও তার স্ত্রীর কাণ্ডকারখানা দেখে যাচ্ছিলেন। এবার বলে উঠলেন, 'আমি স্বামী-স্ত্রী উভয়ের গাইরত দেখে বেজায় আশ্চর্যবোধ করছি। এ ঘটনাটা মুসলিম উম্মাহর উত্তম চরিত্রের অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকবে।'১
উপরোল্লিখিত গাইরতের ঘটনাটা ইসলামি ইতিহাসে খুবই প্রসিদ্ধ। যুগে যুগে মুসলিম লেখক ও বক্তাগণ ইসলামে গাইরতের মর্যাদা বোঝাতে গিয়ে উল্লিখিত ঘটনাটাকেই সবচেয়ে বেশি তুলে ধরেন। এ ঘটনাটা উল্লেখ করে আরব স্কলার শাইখ ড. মুহাম্মাদ জুমআহ হালবুসিকে লিখতে দেখলাম, তিনি লিখছেন-
“আল্লাহু আকবার! আজকের দুনিয়ায় স্বামীদের এমন গাইরত কোথায়? কসম আল্লাহর, আমরা দোষ দিই না ওইসব যুবকদের, যারা রাস্তাঘাটে ও বিভিন্ন স্পটে বসে থাকে আর মেয়েলোকদের ডিস্টার্ব করে। মেয়েলোকেরা যদি পর্দাবৃতা হয়ে বের হতো, তাহলে যুবকেরা রাস্তাঘাটে বসে তাদেরকে উত্ত্যক্ত করত না। কিন্তু মেয়েরা এত সাজুগুজু করে বের হয়, মনে হয়—যেন তারা নববধূ; আজকেই তাদের বাসর হবে! পাতলা ফিনফিনে কাপড় পরে তারা বাইরে বের হয়। এমতাবস্থায় রাস্তার যুবকেরা কীভাবে না চেয়ে বসে থাকবে! কীভাবে মেয়েলোকদের দেখার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা না তাকিয়ে বসে থাকবে তারা!
সেসব অভিভাবক পুরুষদের ব্যাপারে আশ্চর্য হতেই হয়, যারা তাদের স্ত্রী ও কন্যাদের খুবই সাজুগুজু করে বাইরে বের হতে দেয়, অতঃপর রাস্তার ছেলেরা তাদের 'বিশ্বসুন্দরী ভাব' নিয়ে চলা স্ত্রী ও কন্যাদের দিকে তাকালে ঝগড়া করে! এখন ঝগড়া করতে হবে কেন, ভাই? রাস্তার ছেলে ও বদমাইশ লোকদের দেখতে দাও!
তুমি যখন তোমার স্ত্রী ও কন্যাদের সাজুগুজু করে শরীরের খাঁজভাঁজ দেখিয়ে দেখিয়ে রাস্তায় বের হতে দিয়েছ, তার মানে এইটা যে, তুমি বলছো— হে লোকসকল, সবাই আমার স্ত্রী ও কন্যার দিকে তাকাও! সবাই আমার সম্মান, শালীনতা ও সম্ভ্রান্ততার দিকে তাকাও!”
এক আরব কবি বলেছেন :
إِنَّ الرِّجَالَ النَّاظِرِينَ إِلَى النِّسَا ... مِثْلُ الْكِلابِ تَطُوفُ بِاللُّحْمَانِ إِنْ لَمْ تَصُنْ تِلْكَ اللَّحُومَ أُسُودُهَا ... أُكِلَتْ بِلا عِوَضٍ وَلَا أَثْمَانِ (কাব্যানুবাদ)
নারীদের দিকে যারা তাকায়, তারা তো এমন কুকুর যে কুকুরেরা গোশতের চারিপাশে করে ঘুরঘুর, গোশতগুলো যদি তুমি না করতে পারো হেফাজত তবে তা কোনো মূল্য ছাড়াই কুকুর খাবে আলবত।

টিকাঃ
১ তারিখু বাগদাদ: ১৫/৩৫, খতিব আবু বকর বাগদাদি; আল-মুন্তাযাম ফি তারিখিল মুলুকি ওয়াল উমাম: ১২/৪০৩, ইমাম ইবনুল জাওযি।

📘 গাইরত > 📄 গাইরতহীন মেয়ের করুণ পরিণতি

📄 গাইরতহীন মেয়ের করুণ পরিণতি


ঘটনাটি মিসরের। মেয়েটি বিবাহিতা। অনার্স শেষে করেছে মাত্র। এখন সে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা ও অনুবাদ অনুষদে মাস্টার্স কমপ্লিট করতে চায়। কিন্তু বিপত্তি আসে তার স্বামী থেকে। বেচারা চরম মাত্রার গাইরতমন্দ মানুষ ছিলেন।
কারণ, মাস্টার্সের থিসিস পেপার রেডি করতে গিয়ে তাকে লম্বা একটা সময় পুরুষ ডক্টরদের সাথে ব্যয় করতে হবে। একজন দ্বীনদার স্বামী হিসেবে তার গাইরত এটা মেনে নিতে পারেনি। বিধায় খুব শক্তভাবে তিনি স্ত্রীর মাস্টার্স কম্পলিট করার ব্যাপারে বাধা দিলেন।
মেয়ের মা ছিলেন বেশ কূট বুদ্ধিমতী। তিনি মেয়েকে পরামর্শ দিলেন, এই গোঁড়া টাইপের লোকটাকে ডিভোর্স দিতে। মেয়েকে তিনি এটাও বললেন, মাস্টার্সের সার্টিফিকেট অর্জন হয়ে গেলে তার হাত ধরার জন্য কতশত ছেলে এগিয়ে আসবে। পাত্রের আর অভাব হবে না! বিশেষ করে মেয়ে যখন সুন্দরী। বয়সেও বেশি নয়; বিশ বছর মাত্র!
লোভী মা শুধু মুখেই বলল না; স্বামীর ঘর ছাড়া করে মেয়েটাকে নিয়েও এলো! সংসার দরকার নেই; মেয়ের মাস্টার্স করা লাগবে! আসলে মেয়ের বয়স ও অভিজ্ঞতা কম থাকায় মায়ের বোঝা উচিত ছিল। কিন্তু রক্ষক যখন ভক্ষক, তখন আর কীই-বা করার আছে! আসলে অনেক মেয়ের সংসার নষ্টের পেছনে কূট বুদ্ধিমতী মায়ের অবদান থাকে।
কয়েক বছর পরের কথা। এই দাম্ভিক মা, ডিভোর্সি মেয়ে ও তার বোনকে মিশরের একটি অনলাইন মেট্রিমনিতে বারবার পাত্রের সন্ধান চেয়ে সিভি ড্রপ করতে দেখা গেছে! কিন্তু কেউই সাড়া দেয়নি।
শেষমেশ মেয়েটি পরিবারের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। এক সময় অধৈর্য হয়ে প্রথমে গর্ভধারিণী মা-ই মেয়ের পাশ থেকে সরে যায়!'

টিকাঃ
১ আহমদ ফাতহি নামের এক মিসরীয় অনলাইন এক্টিভিস্টের লেখনী থেকে চয়িত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00