📄 গাইরতমান্দ পুরুষই নারীর পছন্দ
গাইরতমন্দ পুরুষই নারীর পছন্দের শীর্ষে। সে-কাল থেকে নিয়ে একালে। তবে যেকোনো নারী নয়; যে নারীর নিজের গাইরত আছে, ব্যক্তিত্ব আছে, জ্ঞান, বুদ্ধি ও বিবেক আছে—এমন নারী তার জীবনে একজন গাইরতমন্দ পুরুষই চায়। কারণ, তার জীবনের সেফটি ও ইজ্জতের জন্য সে বাস্তবেই একজন গাইরতওয়ালা পুরুষের মুখাপেক্ষী। গাইরতহীন পুরুষ তো নিজের ইজ্জতই বোঝে না; স্ত্রীর ইজ্জত বুঝবে কোত্থেকে? গাইরতহীন পুরুষকে তো তার মতো আরেক গাইরতহীন নারীই পছন্দ করতে পারে!
জাহিলি যুগের নারীরাও খুব গাইরতওয়ালি হতেন। স্বামী হিসেবে গাইরতমন্দ পুরুষকেই পছন্দ করতেন। জি, এটা আমার কোনো কথা নয়; ইমাম আবু আলি কালি তাঁর বিখ্যাত কিতাব 'আল-আমালি'র মধ্যে উল্লেখ করেছেন। তিনি বিস্তারিতভাবে বলেছেন। আমি প্রয়োজন অনুসারে সংক্ষেপে উল্লেখ করছি—
ইসলামপূর্ব যুগ বলতে আমাদের মস্তিষ্কে আইয়ামে জাহিলিয়্যাতের এক অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়কাল ভেসে ওঠে। সেই অন্ধকার সময়েও নারীরা গাইরতমন্দ পুরুষকেই পছন্দ করত!
কুরাইশের সর্দার উতবা ইবনে রাবিআহর কন্যা হিন্দার কথা কে না জানে। রূপ-সৌন্দর্যে, জ্ঞান-বুদ্ধিতে গোটা আরবে তার মতো আরেকজন কন্যা মেলা ছিল ভার। তিনি ছিলেন কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান ইবনে হারব রা.-এর স্ত্রী। আবু সুফিয়ান রা. ছিলেন আবু জাহেলের পর মক্কার কাফেরদের নেতা। আজীবন ইসলামের বিরোধিতা করে গেছেন। অবশ্য মক্কা বিজয়ের পর স্বামী ও স্ত্রী দুজনেই সাচ্চা মুসলিম হয়ে গিয়েছিলেন। এজন্য তাঁদের নামোচ্চারণের পর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলতে হয়।
বদরের যুদ্ধে হিন্দার বাবা উতবা ইবনে রাবিআহ, চাচা শাইবাহ ইবনে রাবিআহ ও ছেলে ওয়ালিদ ইবনে রাবিআহকে মুসলমানরা হত্যা করেন। এরপর থেকে হিন্দা উন্মাদিনীর মতো হয়ে যান। প্রতিশোধের আগুন তার বুকে দাউ দাউ করে জ্বলে। তার বাবা উতবাকে হত্যা করেছিলেন নবিজি -এর চাচা হামযাহ ইবনে আবদুল মুত্তালিব রা.। উহুদের যুদ্ধে হিন্দা তার হাবশি গোলাম ওয়াহশির মাধ্যমে হামযাহকে হত্যা করান। এরপর হামযাহর নাক, কান, ঠোঁট কেটে মালা বানিয়ে গলায় পরেন! বুক ফেঁড়ে কলিজা বের করে চিবিয়ে খান। এভাবেই তিনি তার বুকের দহন মেটান!
এবার একটু পেছনে যাই। হিন্দা তখন সেয়ানা মেয়ে। বিয়ের বয়স হয়েছে। কথায় আছে, 'গাছে বরই পাকলে সবাই একটা ঢিল মারে'। হিন্দার ক্ষেত্রেও তা-ই হলো। তার মতো রূপসী ও বুদ্ধিমতী মেয়েকে বধূ হিসেবে বরণ করে নিতে কুরাইশের যুবকেরা পাগল। তারা উতবা ইবনে রাবিআহর কাছে প্রস্তাব পাঠাতে লাগল। একে একে দুই দুইবার বিয়ে হয় হিন্দার। দুটি বিয়ের কাহিনিই বলছি। তবে অতি সংক্ষেপে। দুটির সাথেই গাইরতের সম্পর্ক রয়েছে।
কুরাইশ বংশের যুবক ফাকিহ ইবনে মুগিরা মাখযুমির সাথে হিন্দার প্রথম বিয়ে হয়। কিন্তু সে বিয়ে বেশি দিন টেকেনি; ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। ফাকিহ ইবনে মুগিরার ঘরে বহু মানুষের যাতায়াত ছিল। ব্যাপারটা ভালো চোখে নিতে পারেননি ফাকিহ ইবনে মুগিরা; প্রচণ্ড গাইরতে লাগে তার। নিছক সন্দেহের বসে তিনি হিন্দাকে ব্যভিচারী বলে তালাক দিয়ে দেন!
মেয়ের তালাকের খবর শুনে হিন্দার পিতা উতবা ইবনে রাবিআহ রাগান্বিত হন। মেয়ের সতীত্বের গ্যারান্টি নিতে তিনি ইয়ামানের একজন বিখ্যাত ভবিষ্যৎবক্তার নিকট বিচার পেশ করেন। ইয়ামানের সেই ভবিষ্যৎবক্তা হিন্দাকে নিষ্পাপ ঘোষণা করেন। শুধু তা-ই নয়; পরবর্তী বৈবাহিক জীবনে হিন্দার কোল আলোকিত করে জন্মানো পুত্রসন্তান মুআবিয়া ভবিষ্যতে বাদশাহ হবেন বলে সুসংবাদও দেন।
এসব শুনে ফাকিহ ইবনে মুগিরাহ হিন্দাকে ফেরত নিতে চান। কিন্তু হিন্দা বিনতে উতবা ফাকিহের ঘর করতে আর রাজি হননি। যে স্বামী স্ত্রীর চরিত্রে কালিমা লেপন করে তালাক দিয়ে দেয়, তার ঘরে আবারও ফিরে যাওয়ার মতো মেয়ে ছিলেন না হিন্দা।১
ফাকিহ ইবনে মুগিরাহর সাথে হিন্দার ঘর ভাঙনের খবর পেয়ে কুরাইশের অনেকেই হিন্দাকে বিয়ে করতে চাইলেন। হিন্দা এখন আর সেই আগের মতো চুপটি মেরে বসে থাকা কিশোরী না; তিনি এখন পরিণত বয়সের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন মা। আগের ঘরে তার একজন পুত্রসন্তান হয়েছে। তাই নিজের মতামত ছাড়া কাউকে বিয়ে করতে রাজি নন তিনি। বাবার কাছে যে বিয়ের পয়গাম আসতেই আছে—ব্যাপারটা আঁচ করতে পেরে হিন্দা অকপটে তার বাবাকে বললেন,
: আব্বাজান! আমি সমঝদার নারী; আমার ব্যাপারে আমি সিদ্ধান্ত নেওয়ার যোগ্যতা রাখি। হুট করে কারও সাথে আমার বিয়ে ঠিক করে ফেলবেন না; আমার কাছে আগে পাত্রদের অবস্থা পেশ করবেন।
: ঠিক আছে, মা।
একদিন উতবাহ ইবনে রাবিআহ বললেন, 'মা! আমার কাছে তোমাকে বিয়ে করার জন্য তোমার জাতি কুরাইশের দুজন যুবক প্রস্তাব পাঠিয়েছে। আমি তাদের কারোরই নাম বলব না তোমাকে; শুধু গুণাগুণ বলব।'
এরপর উতবা ইবনে রাবিআহ বললেন, 'প্রথমজন হলো সম্ভ্রান্ত ও অভিজাত বংশের। উত্তম সাহচর্যের অধিকারী। দানশীল। তুমি তার আনুগত্য করলে সেও তোমার আনুগত্য করবে। তোমার সিদ্ধান্তেরই সে অনুগামী হবে। তুমি তার ধনসম্পদ ব্যয় করতে পারবে। তার পরামর্শ ছাড়া নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে...।'
উতবা ইবনে রাবিআহ বললেন, 'আর অপরজন হলো সম্ভ্রান্ত ও অভিজাত বংশের। মজবুত রায়ের অধিকারী। নিজ কওমের কাছে সে বড় সম্মানী। পরিবার-পরিজনকে সে শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়, তাদের তাকে শিষ্টাচার শিক্ষা দিতে হয় না। তারা তার আনুগত্য করলে সে তাদের সাথে নম্র আচরণ করে। আর তাকে পরিত্যাগ করলে সে তাদের ব্যাপারে কঠিন আকার ধারণ করে। লোকটি মারাত্মক গাইরতমন্দ...।'
বাবার মুখ থেকে হিন্দা দুজনের কথা শোনার পর বললেন, 'আব্বাজান! প্রথম পুরুষটি হচ্ছে আত্মসম্মান বিক্রিকারী...। আর অপর পুরুষটিই হচ্ছে একজন সম্মানিতা নারীর স্বামী হওয়ার যোগ্য। আমি এই পুরুষকেই আমার জন্য পছন্দ করছি। তাকে পাওয়ার জন্য আমি উদগ্রীব।'১
সেই গাইরতমন্দ পুরুষটি আর কেউ নন; তিনিই হলেন আবু সুফিয়ান ইবনে হারব। ব্যস, আবু সুফিয়ানের সাথে হিন্দার বিয়ে হয়। আর তাদের ঘর আলোকিত করে জন্ম নেন নবিজির প্রসিদ্ধ সাহাবি, কাতিবে ওহি হজরত আমিরে মুআবিয়া রা.। যিনি পরবর্তীকালে সত্যিই বাদশাহ হয়েছিলেন। মানে উমাইয়া খিলাফতের প্রতিষ্ঠাতা প্রথম খলিফা ছিলেন। আবু সুফিয়ানকে স্বামী হিসেবে পছন্দ করেছিলেন হিন্দা শুধুমাত্র গাইরতের কারণে।
যদিও আমাদের আলোচনা এখানেই শেষ হওয়ার মতো, তবুও আরও কিছু কথা না বলে পারছি না। হিন্দার বিয়ে প্রসঙ্গে কিন্তু জানার মতো চমৎকার অনেক কিছুই আছে।
হিন্দাকে বিয়ে করার জন্য উতবা ইবনে রাবিআহর কাছে আবু সুফিয়ানের পাশাপাশি অপর যে পুরুষ প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তিনি ছিলেন সুহাইল ইবনে আমর রা.। তখন অবশ্য তিনি মুশরিক ছিলেন। বেচারা হিন্দাকে একান্ত করে না পাওয়ার কারণে দিলে খুব চোট পেয়েছিলেন। ভগ্নহৃদয়ে একটি কবিতাও রচনা করেছিলেন। কম যাননি আবু সুফিয়ানও; তিনিও আরেকটি কবিতায় পাল্টা জবাব দিয়েছিলেন।১
ওদিকে কুরাইশের সুন্দরী ললনা হিন্দা বিনতে উতবার সাথে মুসাফির ইবনে আবু আমর নামি এক যুবকের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। এই যুবক দেখতে বেশ সুন্দর ও হ্যান্ডসাম ছিলেন। কাব্য প্রতিভাও ছিল তার। কিন্তু দরিদ্র ছিলেন। জ্ঞানগরিমা যা-ই থাক; কোনো পিতাই তার আদরের দুলালীকে গরিবের হাতে তুলে দেয় না—এটাই পৃথিবীর নিয়ম।
বাবা উতবা ইবনে রাবিআহ যে মুসাফির ইবনে আবু আমরকে মেনে নেবেন না—এটা খুব ভালো করে জানতেন হিন্দা। তিনি প্রেমিককে পাশের কোনো রাজ্যে গিয়ে কিছু সম্পদের মালিক হয়ে ফিরে আসতে বললেন। মুসাফির নিকটস্থ হিরা রাজ্যে নুমান ইবনুল মুনযিরের নিকট যাওয়ার কিছুদিন পর জানতে পারলেন—আবু সুফিয়ান ইবন হারব হিন্দাকে বিয়ে করেছেন।
মক্কা থেকে হিরায় গিয়ে একজন লোক মুসাফিরকে এই দুঃসংবাদটা দেয়। প্রিয়াকে হারানোর মনোবেদনা ও ডিপ্রেশনে মুসাফির অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার পেটে পানি জমে যায়। চিকিৎসক পানি বের করতে গিয়ে আগুন দ্বারা সেঁকা দেয়। এতে মারাত্মক কষ্ট হওয়ার কথা ছিল মুসাফিরের। কিন্তু মুসাফিরের ধৈর্য দেখে চিকিৎসক অবাক হয়ে গেলেন!
টুটাফাটা দিল নিয়ে মুসাফির নিজেই নিজেকে সম্বোধন করে নিম্নের চরণ দুটি আবৃত্তি করেছিলেন—
আলা ইন্না হিন্দান আছবাহাত মিনকা মুহর্রামান ... ওয়া আছবাহাত মিন আদনা হুমুতিহা হিমান ওয়া আছবাহাত কালমাছলুবি জাফনু ছিলাহু ... ইয়াক্বাল্লিবু বিলকাফফাইনি ক্বাওছান ওয়া আছহা
(কাব্যানুবাদ)
হে মুসাফির শুনো, হিন্দা তোমার জন্য নিষিদ্ধ হয়ে গেছে তার রক্ষকদের মধ্যে তুমিই হলে সবচেয়ে নিকৃষ্ট আর নিচু, তুমি তো সেই সেই খারাপ মানুষ, যে অস্ত্র কোষমুক্ত করে তির-ধনুক দু-হাত দিয়ে উল্টে-পাল্টে দেখে, নও তুমি উঁচু।১
টিকাঃ
১ তারিখু দিমাঙ্ক-তারাজিমুন-নিসা, ৪৪০-৪৪১; আল-ইকদুল ফারিদ, ৬/৮৯।
১ নাসরুদ-দুর ফিল মুহাযারাত: ৪/২৭, আবু সাদ আবি।
১ মাজমাউয-যাওয়ায়িদ: ৯/২৬৭-২৬৮।
১ আল-মুনাম্মাক ফি আখবারি কুরাইশ : ৩৭০; আলামুন-নিসা, ৫/২৪২।
📄 লজ্জাবতী নারীকেই পুরুষ পছন্দ করে
লজ্জা নারীর ভূষণ। লজ্জায় নারীকে সুন্দর দেখায়। পরপুরুষ দেখে ফেলার ভয়ে ঘরে গুটিশুটি মেরে বসে থাকাও চূড়ান্ত সীমার লজ্জা। শুধু ইসলামেই না; জাহিলি যুগেও লজ্জাবতী নারীদের পছন্দ করতেন গাইরতমন্দ পুরুষেরা। নারীর লজ্জাও ছিল তাদের গর্ব করার উপলক্ষ্য। যাদের কাব্যিক প্রতিভা থাকত, তারা তো কাব্যকলিতে সেটা প্রকাশ করতেন।
এ প্রসঙ্গে ইমাম ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'একবার সালিহ ইবনে হাসসান তার শিষ্যদের লক্ষ করে বললেন, তোমাদের এমন কোনো প্রণয়কাব্য জানা আছে, যেখানে স্বামী তার লজ্জাবতী স্ত্রীর প্রশংসা করেছে? তারা বললেন, হ্যাঁ, আরবের বিখ্যাত দানবীর হাতেম তায়ি তাঁর স্ত্রী মাবিয়্যাহ বিনতে উফাইরের লজ্জা নিয়ে একটি প্রণয়কাব্য লিখেছেন।
এরপর তারা একটি কবিতা আবৃত্তি করলেন। সালিহ বললেন, 'না; হয়নি।' তারা আরেকটি আবৃত্তি করলেন। সালিহ বললেন, 'তোমরা শুধুই ভুল করছো!' এরপর তিনি নিজেই জাহিলি যুগের আরব কবি আবু কাইস ইবনে আসলাতের একটি কবিতা আবৃত্তি করলেন-
يكرمها جاراتها فيزرنها ... وتعتل عن إيانهن فتعذر وليس لها أن تستهين بجارة ... ولكنها منهن تحيا وتخفر
(কাব্যানুবাদ)
তাকে তার প্রতিবেশিনীরা সম্মান করে তার সাথে সাক্ষাতে যায় নিয়মিত, কিন্তু সে কখনো তাদের কাছে যায় না ওজর-আপত্তি করে হয়ে বিনয়াবনত। প্রতিবেশিনীদের সে করে না তুচ্ছজ্ঞান, আসলে তার আছে লজ্জা চির অম্লান।১
(ব্যাখ্যা) আবু কাইস ইবনে আসলাت ছিলেন জাহিলি যুগে মদিনার প্রসিদ্ধ আউস গোত্রের শাখাগোত্র বনু ওয়াইলের একজন নেতৃস্থানীয় লোক। যুদ্ধে তাঁকে সালিশ মানা হতো। তিনি একত্ববাদী ছিলেন। ইসলামপূর্ব যুগে তিনি মূর্তিপূজা করতেন না। তাঁরই ছেলে হলেন বিখ্যাত সাহাবি উকবা ইবনে আবু কাইস রা.।
আবু কাইসের স্ত্রী ছিলেন খুবই লাজুক। প্রতিবেশিনীদের কাছে সম্মানিতা হওয়ায় তারা নিয়মিত তার ঘরে আসত। কিন্তু লজ্জার কারণে তিনি কখনো তাদের ঘরে যেতেন না। স্ত্রীর এই গুণ ভালো লাগল আবু কাইসের। তাই কবিতার মাধ্যমে স্ত্রীর গুণ গাইলেন। আবার স্ত্রীর প্রতি সুপ্ত ভালোবাসারও বহিঃপ্রকাশ ঘটালেন।
ঘরের বউয়ের লজ্জাবতী হওয়া, সতীসাধ্বী হওয়া, পর্দা-আব্রুর মধ্যে থাকা, স্বামীর অজান্তেও চরিত্র ঠিক রাখা; খেয়ানত না করা—এসব শুধু ইসলামের নির্দেশ নয়; এসব নীতি ও নৈতিকতার কথা। ইসলাম যেহেতু নীতি ও নৈতিকতার জীবনব্যবস্থা, তাই এসব ব্যাপারে খুবই গুরুত্বারোপ করেছে।
যেকোনো কালে, যেকোনো সমাজে, যেকোন ধর্মে এইসব গুণ ছিল প্রশংসনীয়। এমনকি আইয়ামে জাহিলিয়াতের ঘোর তমসাচ্ছন্ন সমাজেও এসব গুণ নারীদের মাঝে বিদ্যমান ছিল। এমন গুণান্বিতা বধূরাই ছিল সেই অন্ধকার যুগেও স্বامীদের ভালোবাসার নারী। তাইতো সেই যুগের কবিদের কবিতায় এমন নারীর প্রশংসা ফুটে ওঠে। কবি আলকামা ইবনে আবদাহ ফাহল বলেন:
منعمة لا يستطاع كلامها ... على بابها من أن تزار رقيب إذا غاب عنها البعل لم تفش سره ... وترضي إياب البعل حين يؤوب
(কাব্যানুবাদ) বধূ আমার কতই-না ভালো; সতীসাধ্বী নারী, এমনই এক বধূকে নিয়ে আমি জীবন দিচ্ছি পাড়ি।
দরজায় দাঁড়িয়ে তার সাথে কথা বলা বিষম দায়, না জানি কেউ দেখে ফেলে সেখানে দাঁড়িয়ে ঠায়! স্বামী দূরে গেলে সে স্বামীর গোপনীয়তা করে না ফাঁস স্বামীকে সন্তুষ্ট করে সে যখনই স্বামী ফিরে থেকে পরবাস।১
জাহিলি যুগে নারীদের অতিশয় লাজুকতা ও পর্দাবৃতা থাকা নিয়ে কত কবিতাই বা আর বলা যায়! সে যুগের নামকরা কবি সাবিত ইবনে আউস আজদি, যিনি 'শানফারা আজদি' নামে পরিচিত, তার একটি কবিতায় নিজ জীবনসঙ্গিনীকে নিয়ে প্রশংসা করেছেন এভাবে—
لَقَد أَعْجَبَتْنِي لَا سُقُوطاً قِنَاعُهَا ... إِذَا مَا مَشَتْ وَلَا بِذَاتِ تَلَفَّتِ أميمة لا يُخْزى نَثَاها حَلِيلُها ... إذا ذُكِرَ النسوانُ عَفَّتْ وَجَلَّتِ إذا هُوَ أَمسى آبَ قُرَّةَ عَيْنِهِ ... مَابَ السَعِيدِ لَم يَسَل أَينَ ظَلَّتِ (কাব্যানুবাদ)
তাকে ভালোবাসি এজন্য, পড়ে না মাথার ওড়না তার, চলতে গিয়েও এদিক-ওদিক তাকায় না তো আর। সে স্বল্পবয়সী মা, স্বামীকে নিয়ে মন্তব্য করে না কদাচিৎ, ভালো হোক কিংবা মন্দ; যাতে স্বামী তার হয় না লাঞ্ছিত। তার সামনে যখন নারীরা স্বামীদের করে নানান আলাপ, সে তখন চুপ থাকে, সম্মানিতা বেশে, করে না প্রলাপ। সৌভাগ্যবান স্বামী যখন ফিরে আসে তার জুড়িয়ে নয়ন, বধূকে জিজ্ঞাসে না সে এতদিন কোথায় করেছে শয়ন!২
(ব্যাখ্যা)
স্ত্রীর মাথায় ঘোমটা থাকে সব সময়। নিজের আব্রু মেইন্টেইন করে চলে সে। হাঁটার সময়ও সে আনতনয়না হয়ে চলে, যাতে পরপুরুষের ওপর দৃষ্টি না পড়ে। স্বামীর ব্যাপারে অন্যান্য নারীদের সঙ্গে সে ভালো-মন্দ কিছুই আলাপ করে না; চুপচাপ অন্যদের কথা শুধু শুনে যায়। তার চোখের শীতলতা হলো তার স্বামী। স্বামী দূরে থাকলে সে চরিত্রের হেফাজত করে। স্ত্রী যে সতীসাধ্বী—এটা খুব ভালো করে জানে তার স্বামী। এজন্য দূরের সফর থেকে ফিরে স্ত্রীকে মোটেও জিজ্ঞেস করে না—স্বামীর বর্তমানে কোথায় সময় যাপন করেছে সে?
টিকাঃ
১ রাওজাতুল মুহিব্বীন: ২৩৯, ইবনুল কাইয়িম, দারুল কুতুবিল ইলমিইয়াহ।
১ আল-মুফাযযালিয়্যাত, পৃষ্ঠা: ৩৯১।
২ আল-মুফাযযালিয়্যাত, পৃষ্ঠা: ১০৮।
📄 স্বর্ণযুগের স্ত্রী-পাগল স্বামীর গাইরত
উম্মাহর স্বর্ণালি যুগের মনীষীরা এতটাই গাইরতমন্দ ছিলেন যে, তারা চাইতেন— তাদের বউয়েরা লজ্জাবতী হোক। নিজেদেরকে সব সময় আড়ালে রাখুক। কেবল নিজের স্বামীকেই প্রাণভরে ভালোবাসুক। স্বামী ছাড়া আর কারও সামনে তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না হোক। বস্তুত, তাদের প্রিয়তমা পত্নীরা তাদের আশানুরূপ ছিলেন। আর তাইতো তারা প্রণয়কাব্য রচনা করে প্রেয়সী বউদের প্রশংসায় প্রণয়কাব্য গাইতেন।
এমনই একজন ছিলেন খালিদ ইবনে ইয়াজিদ ইবনে মুআবিয়া। নবিজি ﷺ-এর সাহাবি মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান রা.-এর নাতি। দামেশকেই জন্মেছেন, দামেশকেই দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন। হিমসের শাসনকর্তা ছিলেন। এবং তিনিই হিমসের প্রসিদ্ধ 'জামে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ' নামক মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা।
কবি মানুষ ছিলেন তিনি। আর কবিরা তাদের কবিতায় কাল্পনিক প্রিয়তমাদের উদ্দেশ্য করে কত কিছুই না লেখে! সেই জায়গায় কবিদের যদি বাস্তবিকই কোনো প্রিয়া থাকে, তাহলে তো উপায় নেই; সারাটা দুনিয়া তারা আবদ্ধ করে ফেলে এক প্রিয়ার মধ্যেই! দিন-রাত তারা তাদের কবিতায় এক প্রিয়াকে নিয়েই কাটিয়ে দেয়। যদিও বাস্তবতা বিবর্জিত কবিতার পঙক্তিমালা প্রেমের মরা লোকগুলো ছাড়া সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন লোকেরা ছুড়ে ফেলে দেয়!
খালিদ ইবনে ইয়াযিদেরও একজন প্রিয়তমা ছিলেন। তিনি আর কেউ নন, তিনি তাঁর স্ত্রী। স্ত্রীকে তিনি পাগলের মতো ভালোবাসতেন। আর সেটা কবিতার মাধ্যমে ফুটিয়েও তুলতেন। তার কবিতা পড়ে স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার গভীরতা অনুভব করত সকলেই। এমনকি উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান (৬৮৫-৭০৫ খ্রি.) এর মতো ব্যক্তিও! কাল থেকে কালান্তরে সেই প্রণয়কাব্যগুলো আজও স্ত্রীর প্রতি খালিদের প্রেমের জীবন্ত সাক্ষী হয়ে আছে।
খালিদ ইবনে ইয়াযিদের স্ত্রীর নাম ছিল রামলাহ বিনতে যুবাইর ইবনুল আওয়াম। নবিজি -এর ফুফাতো ভাই যুবাইর ইবনুল আওয়াম্ম রা.-এর কন্যা। আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর রা. ও উরওয়া ইবনে যুবাইর রা.-এর আদরের বোন।
সেই সময়ের নারীরা স্বাস্থ্যবতী হতেন। তাদের পায়ের গোড়ালি পুরুষ্টু হতো। গায়ে অন্যান্য অলংকার পরার পাশাপাশি পায়েও তারা নূপুর পরতেন। আর ফর্সা রঙের পুরুষ্ট পায়ের নারীরা নূপুর পরলে খুব সুন্দর দেখায়। তো সেই সময়ের নারীদের মতো খালিদ ইবনে ইয়াযিদের স্ত্রী কিন্তু পায়ে নূপুর এবং হাতে সোনা বা রুপার বালা পরে বাইরে বের হতেন না - না জানি কোনো পরপুরুষের চোখে সেটা পড়ে যায়!
এমন লজ্জাবতী ও রক্ষণশীল দ্বীনদার স্ত্রী পেয়ে খালিদ ইবনে ইয়াজিদ নিজের কপালকে চন-কপাল মনে করতেন। প্রেয়সীকে নিয়ে প্রণয়কাব্য লিখতেন। প্রিয়তমা স্ত্রীর প্রশংসা করে তার লিখিত একটি কবিতার কিছু পঙক্তি আজও রঙ ছড়ায় যুগ হতে যুগান্তরে -
تجول خلاخيل النساء ولا أرى ... لرملة خلخالاً يحول ولا قلبا أقلّوا علي اللوم فيها فإنني ... تخيرتها منهم زبيرية قلبا أحب بني العوام طراً لحبها ... ومن أجلها أحببت أخوالها كلبا
(কাব্যানুবাদ) সব নারীরাই তো চলে পায়ে পরে নূপুর এটাই তো শুধু চোখে পড়ে দিনদুপুর, রামলাহর হাতে নেই কোনো বালা রুপোর; নূপুর পরেও সে করে না তো ঘুরঘুর! রামলাহকে নিয়ে কম করো দোষত্রুটি, যুবাইরের কন্যা সে, আর বংশও খাঁটি। আওয়াম্মের গোষ্ঠীকে যাব ভালোবেসে, রামলাহর কারণে; এ গোষ্ঠীর মেয়ে সে। ওর মাতুলগোষ্ঠী কালবকে বাসি ভালো, রামলাহই মোর জীবন, নয়নের আলো।'
(ব্যাখ্যা)
খালিদ ইবনে ইয়াজিদ আসলে যুবাইর ইবনুল আওয়াম্মের বাবা আওয়াম্মের গোষ্ঠীকে ভালো চোখে দেখতেন না। এই আওয়াম্ম হলেন আবদুল মুত্তালিবের মেয়ের জামাই। রাসুল -এর ফুফু সাফিয়্যাহ বিনতে আবদুল মুত্তালিবের স্বামী। বনুল আওয়াম্ম কুরাইশের গোষ্ঠীগুলোর মধ্য থেকে একটি গোষ্ঠী ছিল। কী অভিজাত ও সম্ভ্রান্ত বংশ; তবুও খালিদ ইবনে ইয়াজিদ এই বংশকে পছন্দ করতেন না।
পছন্দ না করার কারণ খুব সম্ভব এটা যে, খালিদের বাবা ইয়াজিদ ইবনে মুআবিয়ার কট্টর বিরোধী ছিলেন রামলাহর ভাই হজরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর রা.। মক্কা-মদিনা ও ইরাক জুড়ে আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শামের উমাইয়া শাসনের বিরুদ্ধে। এই উমাইয়াদের হাতেই শহিদ হয়েছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর। সে এক তিক্ত ইতিহাস। অনেকেরই জানা আছে।
কিন্তু চরম নিন্দনীয় ব্যক্তি আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর রা.-এর বোন রামলাহকে বধূ বানানোর পর শত্রুও বন্ধু হয়ে গেল! ঘৃণা ভালোবাসায় রূপ নিলো। স্ত্রীর ভালোবাসার কারণে শ্বশুর আওয়াম্মের গোষ্ঠীকে পর্যন্ত ভালোবাসতে বাধ্য হলেন। শুধু তাই নয়; স্ত্রীর মাতুলালয়ের গোষ্ঠী বনু কালবকেও ভালোবাসতে শুরু করলেন। প্রিয়তমার ভালোবাসা কী না করে!
পুরুষ তার শখের নারীর জন্য কতকিছুই না করে—এ কথাটির জ্বলন্ত উদাহরণ হলেন খালিদ ইবনে ইয়াযিদ। জি, রামলাহ বিনতে আওয়াম্মু বাস্তবেই খালিদের শখের নারী ছিলেন। তার প্রেমে পড়েই খালিদ তাঁকে বিয়ে করেছিলেন। সে এক রোমান্টিক কাহিনি। চলুন সেটা একটু জেনে আসা যাক। এত কিছু যখন বলে ফেলেছি, এটার আর রাখঢাক করে লাভ কী!
খালিদ ইবনে ইয়াজিদ ছিলেন উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের প্রিয়পাত্র। খালিদের জ্ঞান-বুদ্ধি ও কাব্যপ্রতিভার গুণমুগ্ধ ছিলেন খলিফা।
একবার দামেশক থেকে হজে গেলেন খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান। সাথে ছিলেন খালিদ ইবনে ইয়াযিদ। খালিদ কাবাঘরের তাওয়াফ করছিলেন। হঠাৎ তাঁর দৃষ্টি পড়ল রামলাহ বিনতে যুবাইরের ওপর। রামলাহর রূপ-সৌন্দর্য্যে খালিদ সেখানেই কুপোকাত হয়ে গেলেন! এক পলকেই রামলাহকে মনের মণিকোঠায় জায়গা করে দিলেন খালিদ!
হজ শেষ হলো। খলিফা দামেশক ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করলেন। কিন্তু খালিদ ইবনে ইয়াযিদের তো দামেশক যাওয়ার নামগন্ধ নেই! ব্যাপার কী; খালিদ কেন মক্কা ছাড়তে নারাজ! সন্দেহ হলো খলিফার। তিনি খালিদ ইবনে ইয়াযিদের দিকে জিজ্ঞাসু নেত্রে অনেকক্ষণ চেয়ে রইলেন। খালিদও চেয়ে রইলেন। খালিদের চোখের ভাষা থেকে কিছু একটা আন্দাজ করতে পারলেন খলিফা। তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
: কী হলো খালিদ, মক্কা ছাড়তে মন চাচ্ছে না কেন?
: আমিরুল মুমিনিন, তাওয়াফ করার সময় আমি রামলাহ বিনতে যুবাইরকে দেখেছি। তার রূপ-সৌন্দর্য আমাকে হতবুদ্ধি করে ফেলেছে! আল্লাহর কসম, আমি আপনার কাছে ব্যাপারটা প্রকাশ করতাম না। কিন্তু করার কারণ হলো, রামলাহকে দেখার পর আমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে! আমার দু-চোখের পাতা এক করতে পারি না! তাই মক্কা ছেড়ে যেতে আমার মন সায় দিচ্ছে না!
খালিদ ইবনে ইয়াজিদকে যে প্রেমের রোগে ধরেছে, এটা খুব ভালো করেই বুঝতে পারলেন খলিফা। তিনি তাজ্জব জাহির করে বললেন,
: কী আশ্চর্য; আমার ধারণাই ছিল না যে, তোমার মতো মানুষকেও প্রেম কুপোকাত করে ফেলবে!
: বরং আপনার আশ্চর্যের চেয়েও আমি বেশি আশ্চর্যান্বিত! আমি তো সব সময় বলতাম-দুই শ্রেণির মানুষকেই প্রেম কাবু করতে পারে। একশ্রেণি হলো কবি। এরা সব সময় নারীদের নিয়ে চিন্তা করে; প্রণয়কাব্য রচনা করে। ফলে অন্তর দুর্বল হয়ে নারীর প্রতি এদের আসক্তি সৃষ্টি হয়। অন্তরকে তারা আর নিজেদের কব্জায় রাখতে পারে না। আরেক শ্রেণি হলো বেদুইন। বেদুইন পুরুষ সারাদিন তার স্ত্রীর আঁচলতলে থাকে। ফলে নারীর প্রতি তার এক আলাদা মোহ সৃষ্টি হয়। সেই মোহের কাছেই সে পরাজিত থাকে। আমার বিষয় যেটা সেটা হচ্ছে, রামলাহ আমাকে এতটাই কাবু করে ফেলেছে যে, তার সৌন্দর্য আমার ও কাবাঘরের মাঝখানে দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
: তোমার অবস্থা এতদূর গড়িয়ে গেছে তাহলে!
: আল্লাহর কসম, এর আগে এই রোগ কখনো আমাকে ধরেনি।
মুচকি হাসলেন খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান। এরপর তিনি নিজে দায়িত্ব নিয়ে প্রস্তাব পাঠালেন রামলাহ বিনতে যুবাইরের অভিভাবকদের কাছে। খালিদ তখন বিবাহিত ছিলেন। কুরাইশ ও আজদ বংশীয় দুজন স্ত্রী ছিল তাঁর। খালিদের পাঠানো প্রস্তাবে রাজি হলেন রামলাহ। তবে শর্ত দিলেন, খালিদকে আগে তাঁর দুই স্ত্রীকেই তালাক দিতে হবে!
রামলাহরও গাইরত আছে কিন্তু; কবুল বলার আগেই সতীনদের হবু স্বামীর ঘরছাড়া করার প্রস্তাব দিলেন! অগত্যা বাধ্য হয়ে খালিদ তাঁর দুই স্ত্রীকেই তালাক দিলেন। এরপর বিয়ে করলেন তাঁর চোখের ঘুম কেড়ে নেওয়া মানবী রামলাহ বিনতে যুবাইরকে।
টিকাঃ
* তারিখু মাদিনাতি দিমাশক। ৬৯/১২৮, ইমাম ইবনে আসাকির।
📄 আল্লাহ তা’আলারও গাইরত আছে
গাইরত শুধু বান্দার গুণ নয়; এটি আল্লাহ তা'আলারও গুণ। আল্লাহও প্রচণ্ড গাইরতের অধিকারী। বরং স্রষ্টা হিসেবে তাঁর মাঝে সৃষ্টির চেয়েও বেশি গাইরত বিদ্যমান। এটি আমার কথা নয়; নবিজি -এর কথা। শুনুন তাহলে-
عن عبد الله بن مسعود قال : قال رسول الله ﷺ : ليس شيء أغير من الله، من أجل ذلك حرم الفواحش ما ظهر منها وما بطن.
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল বলেছেন, আল্লাহর চেয়ে বেশি গাইরতওয়ালা আর কেউ নেই। এজন্যই তিনি প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সব খারাপ কর্ম হারাম করেছেন।১
বুঝলাম-আল্লাহই বেশি গাইরতমন্দ, কিন্তু খারাপ কর্ম হারাম হওয়ার সাথে এর সম্পর্কটা কী? উত্তর হলো, খারাপ কর্মের সাথেই আল্লাহর গাইরতের সম্পর্ক। আল্লাহর গাইরতের বহিঃপ্রকাশ ঘটে হারাম কাজের ক্ষেত্রে। মানে আল্লাহ যেসব কাজ বান্দাদের জন্য হারাম সাব্যস্ত করেছেন, বান্দা সেসব কাজের কোনোটা করলে আল্লাহ খুব গাইরত অনুভব করেন। নিষেধ করা সত্ত্বেও বান্দা কোনো হারাম কাজ করলে আল্লাহর জন্য সেটা মেনে নেওয়া কষ্টকর। হাদিসে এসেছে-
عن أبي هريرة رضي الله عنه قال رسول الله ﷺ : إن الله تبارك وتعالي يغار وإن المؤمن يغار وغيرة الله أن يأتي المؤمن ما حرم عليه.
আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, নবি বলেন, 'নিশ্চয় আল্লাহ তা আ'লার গাইরত আছে। আল্লাহর গাইরত হলো-মুমিন যেন হারাম কোনো কাজে লিপ্ত না হয়।”
এ হাদিসে বলা হয়েছে, আল্লাহ তা'আলা যা নিষিদ্ধ করেছেন তাতে কেউ লিপ্ত হলে আল্লাহ তা'আলা গাইরতবোধ করেন। অর্থাৎ তিনি নারাজ হন। এটা এ কারণে যে, আল্লাহ তা'আলা প্রজ্ঞাময়। তিনি সর্বজ্ঞ ও দয়াময়। তিনি মানুষের জন্য যা ফরজ ও ওয়াজিব করেন, তার ভেতর তাদের দ্বীন-দুনিয়ার প্রভূত কল্যাণ নিহিত থাকে। যা হারাম করেন, তার মধ্যে নিহিত থাকে তাদের দুনিয়া ও আখেরাতের প্রকৃত ক্ষতি। আদেশ-নিষেধ করার ভেতর তাঁর নিজের কোনো লাভ-ক্ষতি নেই। তিনি কোনো কিছু ফরজ এজন্য করেন না যে, বান্দা তা পালন করলে তাঁর নিজের কোনো লাভ হবে। আর যা নিষেধ করেন তাও এজন্য নয় যে, বান্দা তা পালন না করলে আল্লাহর ক্ষতি হবে। সমস্ত সৃষ্টি মিলেও যদি আল্লাহর অবাধ্যতা করে এবং পাপাচারে লিপ্ত হয়, তাতে আল্লাহর রাজত্বে কোনো কিছু কমবে না। আর সমস্ত সৃষ্টি মিলে আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্য করলে তাতে আল্লাহর রাজত্বে এক কণাও বাড়বে না। তিনি আদেশ-নিষেধ করেন কেবলই বান্দার স্বার্থে।
তো আল্লাহ তা'আলা যখন কোনো কিছু হারাম করেন, তখন বান্দা কীভাবে সেই জিনিসে লিপ্ত হয়? বান্দার জানা আছে-আল্লাহ সব দেখেন, তিনি তার হারাম কাজে লিপ্ত হওয়া দেখছেন। আল্লাহ সর্বশক্তিমান। তাঁর শাস্তি অতি কঠিন। এ কাজের জন্য তিনি তাকে শাস্তিদান করবেন। তা সত্ত্বেও মানুষ কীভাবে আল্লাহর নিষিদ্ধ কাজ করতে পারে? তা করতে পারে তখনই, যখন সে কোনো কিছুকে পরোয়া করে না। যখন সে আল্লাহর শাস্তির ভয় করে না। যখন আখেরাতের তুলনায় দুনিয়ার জীবনই তার কাছে আসল মনে হয়। যখন শরিয়তের বিধানাবলি পালনের বিপরীতে নিজ খেয়াল-খুশিমতো চলাকেই বেছে নেয়। এটা মারাত্মক ভুল ও চরম ধৃষ্টতা। তাই আল্লাহর গাইরত হয়। এজন্য তাঁর পক্ষ থেকে শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে।
মনে রাখা চাই, আল্লাহ তা আ'লার কোনো স্ত্রী, কন্যা নেই। তিনি এসব থেকে পূত-পবিত্র। তবুও তাঁর গাইরত রয়েছে। এটা তাঁর বিশেষ গুণ। আর হ্যাঁ, প্রকৃত অর্থে গাইরত শব্দটি কেবল মানুষের জন্যই প্রযোজ্য। আল্লাহর জন্য এ শব্দটি ব্যবহৃত হয় রূপকার্থে। সেক্ষেত্রে আল্লাহর গাইরতের অর্থ হবে-অসন্তোষ ও শাস্তিদান।
টিকাঃ
১ সহিহ বুখারি : ৪২৮৯।
১ সহিহ বুখারি: ৫২২৩; মুসনাদে আহমাদ: ১৫৮৭৬; জামে তিরমিজি: ৩১৫৪।