📘 গাইরত > 📄 যুদ্ধের উদ্দীপনা সৃষ্টিতে গাইরত

📄 যুদ্ধের উদ্দীপনা সৃষ্টিতে গাইরত


জাহিলি যুগে আরবের একটি গোত্রের নাম ছিল ইয়াদ। সে সময় আলে নাসর নামে আরবে একটি শাসক রাজপরিবার ছিল। এরা কিসরা তথা পারস্য সাম্রাজ্যের অনুগত ছিল। আলে নাসর রাজপরিবারের সাথে ইয়াদ গোত্রের বিরোধ ছিল। এই বিরোধের জের ধরেই একবার ইয়াদ গোত্রের লোকেরা পারস্যের এক আজমি নববধূকে অপহরণ করে। নববধূ বিয়ের পর স্বামীর বাড়ি যাচ্ছিল।
ফলে স্বাভাবিকভাবেই পারস্য সাম্রাজ্য কর্তৃক আরবে তাদের অনুগত আলে নাসর রাজপরিবারের মাধ্যমে যুদ্ধ করে এই ঘটনার প্রতিশোধ নেওয়ার সম্ভাবনা ছিল।
কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, এটা নিয়ে ইয়াদ গোত্রের যেন কোনো ভাবান্তর ছিল না। আগাম বিপদ বুঝতে পেরে সজাগ হয়েছিলেন ইয়াদ গোত্রের নামকরা কবি লাকিত ইবনে ইয়ামুর ইয়াদি। তিনি কবিতা রচনার মাধ্যমে নিজ গোত্রকে সম্ভাব্য যুদ্ধ সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। কবিতার প্রথম দুটি চরণ হলো:
يا قوم لا تأمنوا إن كنتم غيرا .... على نسائكم كسرى وما جمعا .
(কাব্যানুবাদ)
হে জাতি, নারীদের ব্যাপারে যদি একটু গাইরত থাকে তোমাদের, তবে মোটেও নিশ্চিন্ত থেকো না পারস্যরাজ ও তার সৈন্যদলের।
(ব্যাখ্যা)
সে সময় শত্রুরা কোনো গোত্রের ওপর হামলা করলে পুরুষদের হত্যার পাশাপাশি নারীদেরকে বন্দি করে নিয়ে যৌনদাসী বানাত। এজন্য কবি লাকিত ইবনে ইয়ামুর ইয়াদি নিজ গোত্রের পুরুষদেরকে কিসরার প্রতিশোধমূলক হামলার ব্যাপারে সতর্ক করার জন্য নারীদের ইজ্জতের ব্যাপারটা উল্লেখ করেছেন। নারীদেরকে বেইজ্জতির শিকার হতে না দিতে গোত্রের পুরুষেরা আগাম মোকাবিলার প্রস্তুতি গ্রহণ করতে উদ্দীপক কাব্য রচনা করেছেন। কারণ, আইয়ামে জাহিলিয়াতেও আরবরা নিজেদের নারীদের ব্যাপারে খুব গাইরতমন্দ ছিল।১
শুধু তাই নয়; আইয়ামে জাহিলিয়াতে আরবদের ইতিহাস ঘাঁটাঘাঁটি করলে দেখা যায়, যুদ্ধের সময় তারা তাদের নারীদেরকে নিয়ে রণক্ষেত্রে হাজির হতো। যাতে করে পরাজিত হলে তাদের নারীদেরকে বন্দি করে যৌনদাসী বানানো হবে—এই ভয়ে তারা যেন রণক্ষেত্রে ছেড়ে না পালায়; নারীদের দিকে চেয়ে হলেও জীবন বাকি রেখে মরণপণ লড়াই করে! আহঃ, কী সেই গাইরত!২

টিকাঃ
১ প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ৩২।
২ প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ৩৩।

📘 গাইরত > 📄 জাহিলি যুগে অতিমাত্রার গাইরত

📄 জাহিলি যুগে অতিমাত্রার গাইরত


জাহিলি যুগের পুরুষদের মধ্যে শুধু গাইরতই ছিল না; যা ছিল সেটাকে 'অতিমাত্রার গাইরত' বলতে হয়। তাদের কারও গাইরত তো এমন মারাত্মক ছিল, যা কিনা রীতিমতো পাগলামো আখ্যা দেওয়া যায়। তাদের কেউ কেউ নিজের কন্যাদেরকে বিয়ে পর্যন্ত দিত না—পরপুরুষের হাত লাগার ভয়ে!’
আরবি ভাষা ও সাহিত্যের প্রথিতযশা পণ্ডিত আবুল আব্বাস মুবাররিদ ‘আল-কামিল ফিল লুগাহ ওয়াল আদাব’ কিতাবে উল্লেখ করেছেন, আইয়ামে জাহিলিয়াতের সময়ে আরবের একজন লোক ছিল যুল ইসবা উদওয়ানি নামে। বেচারার চারজন কন্যাসন্তান ছিল। সকলেই সেয়ানা। বিয়ের উপযুক্ত। লোকটা ছিল চরম পর্যায়ের গাইরতওয়ালা। পরপুরুষের ছোঁয়া লাগবে তার কন্যাদের গায়ে—এটা সে মেনে নিতে পারেনি। তাই কাউকেই বিয়ে না দিয়ে ঘরেই আইবুড়ো বানিয়ে রেখেছিল!
বাবার এই অতিমাত্রার গাইরত দেখে মেয়েরা সরাসরি মুখ ফুটে কিছু বলতে পারত না ঠিকই; কিন্তু নিজেদের মধ্যে বিয়ে নিয়ে জল্পনা-কল্পনা করত। আলাপ-সালাপ করত। মেয়েরা নিজেদের মধ্যে কী আলাপ করে—এটা জানার জন্য বেচারা একদিন মেয়েদের ঘরে আড়ি পাতল। আড়ি পেতে বেচারা যা শুনল, তাতে সে মোটেও প্রস্তুত ছিল না! কিন্তু কী শুনল বেচারা?
তার আইবুড়ো মেয়েরা নিজেদের মধ্যে আলাপচারিতা করছে বিয়ে নিয়ে! বিয়ের ব্যাপারে কার মনে কী আছে—সে কথা একে অপরের কাছ থেকে জানতে চাচ্ছে! এমনকি তারা এটাও তাগিদ দিচ্ছে যে, কেউ যেন মনের খবর গোপন না করে।
প্রথমেই এলো বড় মেয়ের পালা। বেচারি একটি কবিতা আবৃত্তি করে নিজের মনের মণিকোঠায় লুক্কায়িত বাসনা ফুটিয়ে তুলল—
ألا ليت زوجي من أناس ذوي غنى ... حديث الشباب طيب النشر والذكر لصوق بأكباد النساء كأنه ... خليفة جان لا يقيم على هجر
(কাব্যানুবাদ)
হায়, আমার স্বামী যদি হতো এমন এক ধনী পুরুষ যে এক নওজোয়ান, সুগন্ধময়, সকলেই তার ফানা; এমন প্রেমিক, যে নারীদের অন্তরে করে সদা বাস, যেন সে জিনের প্রতিনিধি, স্ত্রীকে ছাড়া ঘুমায় না।১
এরপর দ্বিতীয়, তারপর তৃতীয়, সবশেষে চতুর্থ মেয়ে নিজেদের মনোবাসনা ব্যক্ত করে কবিতার মাধ্যমে। বড় মেয়ের কবিতা থেকে এটাই প্রকাশ পায় যে, সে তার জীবনসঙ্গী হিসেবে অন্যান্য গুণের সাথে ধনী যুবক চায়। দ্বিতীয় মেয়ের কথা থেকে প্রকাশ পায়, সে সর্দার গোছের পুরুষকে পছন্দ করে। আর তৃতীয় মেয়ের কথা থেকে বোঝা যায়, সে তার চাচাতো ভাইকে ভালোবাসে।
অবশ্য চতুর্থ মেয়ে প্রথমে কিছু বলা থেকে বিরত থাকে। সে কিছুই বলতে চায় না। তার পেটে কী আছে—সেটা বের করতে না পারলে বাকি বোনদের গোপন মনোভাব তার সামনে প্রকাশ হয়ে পড়েছে যে! তাই বোনেরাও নাছোড়বান্দা। তাদের পিড়াপীড়িতে শেষমেশ সে মুখ খুলতে বাধ্য হয়। সে যা বলে তা রীতিমতো বিস্ফোরক! সে বলে, ‘আইবুড়ো হয়ে বসে থাকার চেয়ে শুকনো কাঠের মতো একজন স্বামীও ভালো!’
কন্যাদের মনোভাব বুঝতে পেরে বাবা তার গাইরতের মাথা খেয়ে হলেও মেয়েদের বিয়ের ব্যবস্থা করে। আড়ি পেতে মেয়েদের মনোভাব বুঝতে না পারলে লোকটা তার আজিব গাইরতের কারণে মেয়েদেরকে আজীবন বিয়ে বঞ্চিতা রেখে দিত!২
এরচেয়েও পিলে চমকানোর মতো খবর হলো, আইয়ামে জাহিলিয়াতে কোনো কোনো লোক তার কন্যাসন্তানকে এজন্যই জীবন্ত মাটিতে পুঁতে ফেলত যে, বড় হয়ে এই মেয়ে না জানি কারও সাথে কুকর্ম ঘটিয়ে ফেলে! তাই আগেভাগেই অতি সতর্কতাস্বরূপ কন্যাকে মাটিতে চাপা দিয়ে বাবা তার অতি গাইরতের বহিঃপ্রকাশ ঘটাত!
বোঝা গেল, আইয়ামে জাহিলিয়াতে আরবের মুশরিকদের কন্যাসন্তান জীবন্ত দাফন করার পেছনে শুধু দারিদ্র্যের ভয়ই ছিল না; ছিল গাইরতের প্রশ্নও। আর বাস্তবেও ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, আরবে কন্যাসন্তান জীবন্ত মাটিতে পুঁতে ফেলার পেছনে রয়েছে তাদের অতিমাত্রার গাইরত।
আরবের রাবিআহ গোত্রই প্রথম কন্যাসন্তান দাফন করার প্রথা শুরু করে। এ গোত্রেরই সর্দারের কন্যাকে অপহরণ করে নিয়ে যায় অন্য গোত্রের একজন পুরুষ। সম্ভবত প্রেমঘটিত কারণে হবে। যুদ্ধে না গিয়ে সর্দার সন্ধির পথ বেছে নেন। কন্যাকে ছাড় দেওয়া হয় দুটির যেকোনো একটি পথ বেছে নিতে হবে। হয়তো বাবার কাছে ফিরে আসতে হবে। নয়তো অপহরণকারী পুরুষের কাছে থাকতে হবে।
সবাইকে অবাক করে দিয়ে মেয়েটি অপহরণকারীকেই বেছে নিল! এই গ্লানি সহ্য করতে পারলেন না মেয়ের গাইরতমন্দ সর্দার বাবা। এরপর থেকেই তিনি তার রাবিআহ গোত্রে কন্যাসন্তান জীবিত দাফন করার রীতি চালু করেন! আস্তে আস্তে এই ঘৃণ্য প্রথা গোটা আরবে ছড়িয়ে পড়ে।১
যাহোক, এমন গাইরত নিছক মূর্খতা ও অমানবিকতা। এজন্য ইসলাম এসে এসব জাহিলি প্রথা নিষিদ্ধ করে দিয়েছে এবং যৌক্তিক, বাস্তবসম্মত ও প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে গাইরতের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছে।২

টিকাঃ
১ প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ৩৪।
১ কবিতাটির চরণগুলোতে বেশ ভিন্নতা রয়েছে। সবগুলোর বিবেচনায় কাব্যানুবাদ করার চেষ্টা করেছি।
২ আল-কামিল ফিল-লুগাহ ওয়াল আদাব: ১১১, মুবাররিদ।
১ বুলুগুল আরাব: ১/১৪০, আলুসি।
২ প্রাগুক্ত।

📘 গাইরত > 📄 ভারতের সিপাহি বিপ্লব ও গাইরত

📄 ভারতের সিপাহি বিপ্লব ও গাইরত


ভারত উপমহাদেশের ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লবের কথা তো সকলেরই জানা। ইংরেজদের বিরুদ্ধে মোঘল সালতানাতের সিপাহিরা বিপ্লব ঘটিয়েছিল। কিন্তু কিছু গাদ্দারের কারণে সেই বিপ্লব বেহাত হয়। ইংরেজরা তখন সরাসরি দিল্লি আক্রমণ করে। এর আগে তাদের ঘাঁটি ছিল পশ্চিমবঙ্গে। সেখান থেকেই মূলত ইংরেজরা গোটা মোঘল সালতানাত পরিচালনা করত। মোঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর (১৮৩৭-১৮৫৭ খ্রি.) ছিলেন তাদের খেলনার পুতুল।
সিপাহি বিপ্লব ঘটার পর ইংরেজরা সর্বশক্তি ব্যয় করে তা নস্যাৎ করে। দিল্লি আক্রমণ করে তাদের দখলে নেয়। সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে বন্দি করার মধ্য দিয়ে মোঘল শাসনের পতন ঘটায়। দিল্লির গলিতে গলিতে তারা যে নারকীয় তাণ্ডবে মেতে উঠে, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। তারা সাতাশ হাজারেরও বেশি মুসলমান হত্যা করে। হাজার হাজার নারীকে ধরে ধর্ষণ করে। সব মসজিদ, মাদরাসা ধ্বংস করে। কয়েক দিনের মধ্যে দিল্লি হয়ে উঠে মৃত্যুপুরী!
দিল্লির রাস্তাঘাট ভরে যায় লাশ আর লাশে! পচে ফেটে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পরিবেশ দূষিত করে ফেলে। এমনকি কোনো কোনো ইংরেজ লেখক স্বীকার করেছেন যে, খোদ ইংরেজরাও পরবর্তী কয়েক দিন পর্যন্ত দিল্লির রাস্তা দিয়ে চলাফেরা বন্ধ করে দিয়েছিল—শুধুমাত্র লাশের উৎকট গন্ধ আর বীভৎস আকৃতি না দেখার জন্য!
ভারতের প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন আল্লামা ফজলে হক খায়রাবাদি রহ. লিখেছেন, 'ইংরেজ সৈন্যরা মুসলিম নারীদের এত বেশি ধর্ষণ করে যে, নারীরা ইজ্জত বাঁচানোর জন্য দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পলায়ন করত। অনেকেই পানিতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করত! কেউ কেউ গলায় ফাঁস লাগিয়ে মরত!'
সে সময়ের টাইমস অফ ইন্ডিয়ার প্রতিনিধি লিখেছিলেন, তিনি দিল্লির রাস্তায় চলাফেরা বাদ দিয়ে ফেলেছেন গতকালের একটা ঘটনা প্রত্যক্ষ করার পর। তিনি দিল্লির রাস্তায় চলতে গিয়ে বেশ কয়েকজন নারী ও পুরুষের লাশ পড়ে থাকতে দেখেছেন। কয়েকজন পুরুষ তাদের চৌদ্দজন পর্দানশিন স্ত্রী ও কন্যাকে নিজ হাতে হত্যা করেছে ইংরেজ সৈন্যদের পাশবিক নির্যাতনের ভয়ে। এরপর তারা নিজেরাও নারীদের পাশে আত্মহত্যা করে মারা গেছে!১
আঃ, কী বীভৎস ঘটনা! কী লোমহর্ষক! এরা ওইসব নারী ও কন্যার স্বামী ও বাবা। শুধুমাত্র শ্লীলতাহানির ভয়ে তারা নারীদেরকে আগে হত্যা করল। এরপর নিজেরাও আত্মহত্যা করে মারা গেল! কী আজিব গাইরত! এমন পরিস্থিতিতে এ রকম হত্যাকাণ্ড ইসলাম সমর্থন করে কি না, সেটা ভিন্ন কথা। কিন্তু আমাদের দেখতে হবে—ওই পুরুষদের গাইরত কী পরিমাণ ছিল!

টিকাঃ
১ তারিখুল ইসলাম ফিল হিন্দ : ৪৪, আবদুল মুনইম নামির।

📘 গাইরত > 📄 গাইরত : পুরুষের দায়িত্বশীল হওয়ার কারণ

📄 গাইরত : পুরুষের দায়িত্বশীল হওয়ার কারণ


মানুষ সামাজিক জীব। আর একটা সমাজ গড়ে ওঠে কিছু পরিবারকে কেন্দ্র করে। আর একটা পরিবার গড়ে ওঠে একজন অভিভাবককে কেন্দ্র করে। ফলে একটি পরিবারের অভিভাবক ঠিক, তো পরিবার ঠিক। পরিবার ঠিক তো সমাজ ঠিক, সমাজ ঠিক তো রাষ্ট্র ঠিক। দেখা যায়, একজন অভিভাবকের ওপর শুধু একটি পরিবার নয়; বরং সমাজ ও রাষ্ট্র পর্যন্ত নির্ভরশীল। ফলে প্রশ্ন আসে, একটা পরিবারের অভিভাবকত্বের জায়গাটা যেহেতু এতটাই গুরুত্বপূর্ণ, তাহলে কে হবে অভিভাবক; পুরুষ নাকি নারী?
জি, ইসলামই এই প্রশ্নের সমাধান দিয়েছে। ইসলাম যেহেতু একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন-বিধান; ব্যক্তিজীবন থেকে নিয়ে পারিবারিক জীবন; সামাজিক জীবন; রাষ্ট্রীয় জীবন; এমনকি আন্তর্জাতিক জীবনেরও ফরমুলা রয়েছে ইসলামে, তাই ইসলাম অভিভাবকত্বের জায়গাটাও ঠিক করে দিয়েছে। ইসলাম বলেছে, অভিভাবকত্বের বাগডোর গ্রহণ করবে পুরুষ; নারী নয়। আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে বলেন :
الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ
'পুরুষগণ নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল'।১
নারীর হাতে কর্তৃত্ব না দেওয়ার একটা কারণ তো হলো, পুরুষের তুলনায় নারীর দ্বীনও অর্ধেক, জ্ঞান-বুদ্ধিও অর্ধেক। মাসের একটা নির্দিষ্ট সময়ে নারী সালাত আদায় করতে পারে না। আবার গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল সমস্যায় পুরুষের মতো নারী সমাধান দিতে পারে না। পুরুষের তুলনায় নারীর যে জ্ঞান-বুদ্ধি অর্ধেক কম-এটা হাদিসের কথা। আমাদের সকলেরই জানা।
বিশ্বাস না হলে এমন ফ্যামিলির দিকে তাকান, যে ফ্যামিলি চলে নারীর কথায়। সেই ফ্যামিলিতে আপনি কোনো নীতি, নৈতিকতা বা কল্যাণ দেখতে পাবেন না। বলতে পারেন, বিশ্বের অনেক দেশের রাষ্ট্রপ্রধান তো নারী, তাহলে ওইসব দেশ কীভাবে চলে? আমি বলব, ওইসব দেশ শুধু ওই একক নারীর কথায় চলে না; চলে মূলত মন্ত্রীপরিষদের কথায়। মন্ত্রীপরিষদ ছাড়া শুধু এক নারীর হাতে চালিত দেশ কোথাও পাবেন না। এটা পসিবল না।
যাক, এবার মূল কথায় আসি। নারীর ওপর পুরুষের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের অন্য কারণটা হলো—গাইরত বা আত্মমর্যাদাবোধ। পুরুষের মতো নারীর কখনো গাইরত হয় না। গাইরত পুরুষের ফিতরাত বা মজ্জাগত স্বভাব। গাইরতই পুরুষের পুরুষত্বের মূল। পুরুষ তার স্বভাবগত গাইরতের কারণেই অধীনস্থ নারীকে হেফাজত করবে। প্রয়োজনে জীবন বাজি রাখবে। পুরুষের কাছে নারী ফুলের মতো। পুরুষ একটি ফুলকে বাঁচাবে বলে যুদ্ধ করতে পারে। এ ব্যাপারে সামনে কিছু ঐতিহাসিক বাস্তবতা তুলে ধরব ইনশাআল্লাহ।
ওয়াল্লাহি, এটাই ইসলামের স্পিরিট। এজন্য স্বভাবগতভাবেই গাইরতসম্পন্ন পুরুষজাতিকে ইসলাম নারীজাতির অভিভাবকত্বের দায়িত্ব তুলে দিয়েছে। হ্যাঁ, কোনো পুরুষের মধ্যে যদি কাঙ্ক্ষিত গাইরত পাওয়া না যায়, সেটার কারণ ভিন্ন; সেই পুরুষ আসলে তার ফিতরাতকে বিসর্জন দিয়েছে। নন-ইসলামিক শিক্ষা, দীক্ষা, চিন্তা, চেতনা, সভ্যতা ও সংস্কৃতির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মূলত সে গাইরতহীন পুরুষে কনভার্ট হয়েছে। এমন কনভার্টেড পুরুষকে আসলে ইসলাম নারীজাতির দায়িত্ব দেয়নি; দিয়েছে মূলত গাইরতওয়ালা পুরুষকেই।১
ইমাম শামসুদ্দিন ইবনুল কাইয়িম রহ. বলেন, 'মেয়েদের ব্যাপারে নারীদের তুলনায় পুরুষেরাই অধিক গাইরতবান হয়ে থাকে। ফলে কন্যাসন্তানের ওপর বাবার তুলনায় মায়ের গাইরত বেশি হয় না। অনেক মা তার মেয়ের জীবন নষ্ট করতে সহায়তা করে। জ্ঞান-বুদ্ধির স্বল্পতা হেতু, দ্রুত প্রবঞ্চিত হওয়ার সুযোগে এবং তুলনামূলক গাইরতে দুর্বলতা থাকার কারণে মা কন্যাকে ভুল পথে পা বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। কিন্তু এই সমস্যাটা বাবার মধ্যে পাওয়া যায় না। আর এজন্যই ইসলামি শরিয়ত কন্যার বিয়ে-শাদির দায়িত্ব বাবার ঘাড়ে রেখেছে; মায়ের ঘাড়ে রাখেনি। ইসলামি শরিয়তের সৌন্দর্যের অন্যতম দিক হলো, কন্যা যতদিন পর্যন্ত লালনপালন ও আদরযত্নের মুখাপেক্ষী থাকবে, ততদিন পর্যন্ত সে মায়ের দায়িত্বেই থাকবে। কিন্তু যেদিন থেকে সে বড় হয়ে যাবে এবং যুবকদের আগ্রহের বস্তুতে পরিণত হবে, সেদিন থেকে সে এমন কোনো দায়িত্বশীলের মুখাপেক্ষী, যে তার ব্যাপারে অধিক গাইরতমন্দ হবে এবং তার ভালো-মন্দ বেশি বুঝবে। আর সে ব্যক্তিটাই হলো বাবা।”
শাইখ সাইদ আলি আহমাদ সাদ বলেন, 'এজন্যই তো দেখা যায়— পুরুষের স্বভাবেই গাইরত বিদ্যমান থাকে। সে যতই পাপীতাপী হোক না কেন; নিজের স্ত্রী, কন্যা, বোনকে বেহায়ামি করতে দেখলে সহ্য করতে পারে না; রাগের আতিশয্যে অনেক সময় খুন পর্যন্ত করে ফেলে! কিন্তু নারীর মধ্যে এই স্বভাব দেখা যায় না; তার মধ্যে ঢিল ও ছাড় দেওয়ার মানসিকতা প্রাধান্য পায়।'২

টিকাঃ
১ সুরা নিসা: ৩৪।
১ ফাযাইলুল গাইরাহ আলান-নিসা: ১৭, হাম্মাদাহ মুহাম্মাদ মুহাম্মাদ ইসমাইল।
১ আল-জাওয়াবুল কাফি : ৬৮, ইমাম ইবনুল কাইয়িম; যাদুল মাআদ : ৫/৪২৩, ইমাম ইবনুল কাইয়িম।
২ যাহিরাতু যাফিল গাইরাহ, পৃষ্ঠা : ২১, সাইদ আলি আহমদ সাদ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00