📄 বেগারত স্বামীওয়ালি হে বোন!
যেসব বোন দ্বীনদার, কিন্তু তাদের স্বামী দ্বীনহীন; কিংবা কোনোরকম দ্বীনদার হলেও গাইরত নেই, সেইসব বোনের কষ্ট অনেক। আর যেসব বোন আগে দ্বীনদার ছিলেন না; কিন্তু এখন দ্বীনে ফিরে এসেছেন আর তাদের স্বামী সেই আগের মতোই দ্বীনহীন ও গাইরতহীন রয়ে গেছেন, সেইসব প্র্যাকটিসিং বোনদের কষ্ট যে কী, তা আল্লাহ ছাড়া কেউ বোঝার মতো না।
এদের প্রবলেমটা হচ্ছে, মিয়াঁ ও বিবি আগে দুজনেই অন্ধকারে ছিলেন। এখন মিয়াঁকে রেখে বিবি একাই আলোতে ফিরে আসায় যতসব বিপত্তি! অন্ধকারে নিমজ্জিত মিয়াঁ এখন আর আলোকিত বিবিকে সহ্যই করতে পারে না। সব সময় একটা বিরক্তিভাব দেখায়। কিছু বললেই রেগে যায়। আগে কত কেয়ার করত, কিছুদিন পরপরই ঘুরতে নিয়ে যেত, বাসার বারান্দায় বসে দুজনে কত সময় কাটাত। গল্প করত। ধোঁয়া উড়া চায়ের পেয়ালায় চুমুকের ফাঁকে ফাঁকে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করত।
কিন্তু এখন...। এখন সবই যেন দুঃস্বপ্ন। এখন হুজুরনি বউকে সময় দেওয়ার মতো সময়ই যেন মিয়ার নেই। এখন দিনের পর দিন, মাসের পর মাস যায়, একসাথে বসে চা আর খাওয়া হয় না! একসাথে বসে নিজেদের নিয়ে গল্প করা হয় না!
স্ত্রীর দ্বীনে ফেরার আগপর্যন্ত সবই ঠিক ছিল। কিন্তু যে-ই না স্ত্রী দ্বীনে ফিরল; ওয়েস্টার্ন ড্রেস পরা বাদ দিয়ে আপাদমস্তক কালো বোরকায় নিজেকে জড়িয়ে নিল; মাহরাম, নন-মাহরাম মেইন্টেইন করে চলতে শুরু করল, তখনই বাঁধল বিপত্তি!
এমন বিপদগ্রস্ত বোনদের উচিত স্বামীর পেছনে দাওয়াহর কাজ করা। আল্লাহ প্রদত্ত নারী জাতের স্বভাবসুলভ কোমলতা, নম্রতা, আদর ও সোহাগের গুণ দিয়ে স্বামীকে বোঝানোর চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকা। এভাবে চেষ্টা করে অনেক বোন কামিয়াব হয়েছেন বলে জানি। তবে এদের সংখ্যা খুব একটা বেশি না।
এমনই একজন বোন সম্পর্কে জানি। আমাদের সিলেটের তিনি। এখন থাকেন ব্রিটেনে। দেশে থাকতে রাজধানীর একটি কওমি মহিলা মাদরাসায় পড়েছেন। পাশাপাশি জেনারেল লাইনেও পড়েছেন। ভিকারুননিসা স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়ার পর মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটিতে একাউন্টিং নিয়ে অনার্স করেছেন। ইংরেজিতে যেমন যোগ্যতা রাখেন, আরবিতেও। তবে দুঃখের ব্যাপার যে, দাওরায়ে হাদিস শেষ করার আগেই তাকে ব্রিটেন চলে যেতে হয়। ব্রিটেনে গিয়েই দাওরা হাদিস শেষ করে আলেমা হন। আবার সেখানেও ভার্সিটিতে পড়ে একাউন্টিং এর ওপর মাস্টার্স কমপ্লিট করেন।
ব্রিটেন প্রবাসী ফুফাতো ভাইয়ের সাথে তার বিয়ে ঠিক হয়। কিন্তু ফুফাতো ভাই দ্বীনদার ছিলেন না বলে ওই বোনের বিয়েতে অমত ছিল। পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের চাপাচাপিতে শেষমেশ তিনি রাজি হন। বিয়েও হয়ে যায়। কিন্তু বরকে বিন্দুমাত্র পছন্দ করতে পারেননি তিনি। সেই দুঃখ তাকে কুড়ে কুড়ে খেতে লাগল। শেষমেশ সিদ্ধান্ত নিলেন-বিয়েই যখন করে ফেলেছেন, বরকে তো মেনে নিতেই হবে। ব্যস, দ্বীন সম্পর্কে সম্পূর্ণ বেখবর ইঞ্জিনিয়ার বরের পেছনে তিনি দাওয়াহর কাজ শুরু করে দিলেন। আল্লাহ তার মেহনত কবুল করলেন। অল্প সময়ের ব্যবধানে তার স্বামী দ্বীনে ফিরে এলেন। দেখতে তাকে মনে হয় আপাদমস্তক একজন হুজুর!
যাহোক, কিন্তু যেসব বোনেরা দাওয়াহ দেওয়ার মানসিকতা রাখেন না, কিংবা দিয়েও কাজ হয়নি, তারা এক সময় হাল ছেড়ে দেন; ব্যর্থ হয়ে মিছেমিছি নিজের মনকে প্রবোধ দেওয়ার জন্য বলেন, 'যার গাইরতবোধ নেই, তার তো পুরুষত্বই নেই। আর তাকে নিয়ে এত কিছু ভেবে কী লাভ? সে তো পরিবর্তন হওয়ার মতো লোক নয়। এখন শুধু দুআই একমাত্র সম্বল।' হ্যাঁ, দুআ অবশ্যই করতে হবে। তবে দাওয়াহর মেহনত অবশ্যই চালিয়ে যেতে হবে। হাল ছাড়া যাবে না।
📄 গাইরতহীন স্বামীর প্রতি স্ত্রীর চিঠি
এবার আসুন, আরেক উপায় বাতলিয়ে দিই। গাইরতহীন স্বামী যেসব দ্বীনদার বোনের কপালে পড়েছে, তারা এক কাজ করতে পারেন; মনের সব আকুতি মিশিয়ে প্রিয়তম স্বামীকে গাইরতের ব্যাপারে পত্র/চিরকুট লিখতে পারেন। মনের অনেক বেদনা এমন আছে, যা মুখে বলা যায় না কিংবা বলা গেলেও কাগজে-কলমে সেটা বহিঃপ্রকাশ করলে বেশি আবেদনময়ী হয়। আবার অনেক বোন এমন আছেন, যারা স্বামীকে নাসিহাহ করতে সাহস করতে পারেন না। তাদের জন্য চিঠি/চিরকুটই উত্তম পন্থা।
এই পরামর্শটা আমার মাথায় এমনি এমনি আসেনি; গাইরত নিয়ে লিখিত ছোট্ট একটি আরবি কিতাবে গাইরতহীন স্বামীর প্রতি তার দ্বীন-সচেতন স্ত্রীর একটি চিঠি পড়েছিলাম। পড়ে খুব ভালো লেগেছে। বেচারি ভুক্তভোগী মনের সব আকুতি মিশিয়েই চিঠি লিখেছে গাইরত সম্পর্কে গাফিল স্বামীর কাছে। এ চিঠিটি প্রকৃতপক্ষে প্রত্যেক গাইরতহীন স্বামীর দ্বীন-সচেতন স্ত্রীর মনের মণিকোঠায় লুক্কায়িত অস্ফুট বেদনারই বহিঃপ্রকাশ করে।
আমি এখানে চিঠিটির ভাবানুবাদ বাংলা অক্ষরে ফুটিয়ে তোলার যথাসাধ্য চেষ্টা করব। কিন্তু চিঠিটার বাস্তবিক আবেদন কতটুকু ফুটিয়ে তুলতে পারব—তা আল্লাহ মালুম।
باليه معصوم
গাইরত ২১
ভাগ্যবিড়ম্বিতা বোনটির নাম—আফিফা। সে তার নামের মতোই। আফিফা শব্দের অর্থ—পবিত্র ও সতীসাধ্বী নারী। বিয়ের আগে থেকেই সে দ্বীন পালনে সচেষ্ট একজন মেয়ে। কিন্তু বিয়ের পর সে আগের মতো তার দ্বীন পালন করতে পারছে না। ভাগ্যগুণে তার বিয়ে হয়েছে একজন গাইরতহীন পুরুষের সঙ্গে। যার মধ্যে দ্বীন তো নেই-ই; পুরুষের পৌরুষ গাইরতও নেই! আবার স্বামীটা বেশ রগচটাও। মুখে কিছু বলতে গেলে হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনাও আছে।
তাই বাধ্য হয়ে আফিফা ভিন্নপথ অবলম্বন করে। মনের সবটুকু আকুতি মিশিয়ে, দরদ ঢেলে, অশ্রুভেজা চোখের পাপড়িগুলো বাঁ হাতে মুছতে মুছতে স্বামীকে চিঠি লেখে—
প্রিয়তম স্বামী আমার।
হে পুরুষ, আমার কথাগুলো একটু শুনো৷ একটু মন দিয়েই শুনো তবে, হ্যাঁ?
আমি তোমার পুরুষত্বকে সম্বোধন করে বলছি...তোমার পুরুষোচিত জেদকে লক্ষ করেই বলছি... আমার প্রতি তোমার হৃদয়ে জমানো ভালোবাসাকে সম্বোধন করেই বলছি... তোমার পৌরুষদীপ্ত দেহে বহমান প্রতিটি তপ্ত রক্তকণাকে সম্বোধন করে বলছি... তোমার তেজোদ্দীপ্ত অন্তরকে সম্বোধন করেই বলছি...পুরুষ হিসেবে তোমার প্রতিবাদী মনোভাবকেই সম্বোধন করে বলছি... তোমার বিবেক ও বিবেচনাকে সম্বোধন করে বলছি...
আমি জানি, তোমার ধন-সম্পদে কেউ হাত দিলে তুমি রেগে যাও। তোমার চাকরি হাতছাড়া হয়ে গেলেও তুমি দুশ্চিন্তার সাগরে নিমজ্জিত হও। তোমার মূল্যবান কিছু হারিয়ে ফেললেই তোমার আফসোস আর অনুশোচনার যেন অন্ত থাকে না।
আমার স্মরণ আছেঃ হ্যাঁ আমার এখনও স্মরণ আছে, আমাদের বাচ্চা যখন জানালার কাচ ভেঙে ফেলে, তখন তুমি উদ্ধত সিংহের মতো তর্জন-গর্জন করতে থাকো। আমার হাত থেকে বেখেয়ালে মেঝেতে পড়ে শরবতের গ্লাসটি ভেঙে গেলেও তুমি রেগে আগুন হয়ে যাও।
সকালের নাশতা এক-দুই ঘন্টা এদিক-সেদিক হয়ে গেলেই তোমার চেহারার রঙ পাল্টে যায়। গলার রগ ফুলিয়ে তুমি চিল্লাতে থাকো।
প্রিয় স্বামী আমার। হে পুরুষ।
তোমার এইসব অবস্থা এখনও আমার কল্পনায় জাগে। আমি তুলতে পারি না। কিন্তু তোমার কি মনে পড়ে না ওই লোকটির কথা, যে আমার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়েছিল। আমাকে উত্ত্যক্ত করতে চেয়েছিল।
হ্যাঁ, আমার প্রিয়তম। এটা আসলেই আশ্চর্যজনক। কিন্তু এরচেয়েও আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, সেদিন তোমার ইন্দ্রিয়ের ঠান্ডা ভাব। মুখ দিয়ে একটি 'রা'-ও বের না হওয়া। ওই বদমাইশ লোকটার সাথে নম্র কণ্ঠে কথা বলা৷ কসম আল্লাহর, এটা সত্যিই আশ্চর্যজনক।
ওগো প্রিয়, তুমি যখন আমাকে আদেশ করো-তোমার চাচাতো ভাইদের সামনে বের হতে; তাদের সাথে হ্যান্ডশেক করতে, তখন আমার বুকফেটে কান্না বের হয়। তুমি তো জানোই, তাদের সাথে আমার পর্দা করা জরুরি; তারা আমার জন্য মাহরাম না, কিন্তু তুমি সব সময়ই অহেতুক দাবি করে বসো-'আরে, এরা আমার চাচাতো ভাই।'
আমার তো এখনও মনে আছে, আমরা দুজন যখন দেশের বাইরে ট্যুরে বের হই, তখন তুমি আমাকে কী বলেছিলে। তুমি আমাকে আমার নেকাব খুলতে বলেছিলে। যুক্তি দিয়েছিলে-নেকাব না খুললে ইমিগ্রেশনের লোকেরা আমায় চিনবে না।
ওগো প্রিয়তম, তুমি তো জানো, আমার সব প্রশান্তি নিহিত আমার হিজাব-নেকাবের মধ্যেই। পরপুরুষদের থেকে আমার সতীত্ব বাঁচানো, আরু রক্ষা করা ও নিজের সেফটি এই হিজাব- নেকাবেই। তুমি কেন আমার ওপর ইনসাফ করলে না?।
তুমি কি আমাকে আমাদের পারিবারিক ডাক্তারের সামনেও যেতে বলপ্রয়োগ করো না? অথচ, এই লোকটা আমার মাহরাম না।
স্বামী গো. তোমার এমন কাজে আমার অন্তর ফেটে চৌচির হয়ে যায়। তুমি যুক্তি দিয়ে বলো-এই ডাক্তার অনেক এক্সপার্ট। খুব যোগ্য। অথচ, তুমি কি জানো না যে, আমাদের মেয়েদের মধ্যেই এরচেয়েও ভালো ও যোগ্য ডাক্তার আছে?।
প্রিয় আমার। তোমার কি মনে আছে, মার্কেটের পাশে গাড়ি পার্ক করে আমাকে নামিয়ে দিলে তুমি, এরপর আমাকে বললে, 'যাও, তুমিই কেনাকাটা করে এমোঃ আমি তোমার জন্য গাড়িতেই ওয়েট করছি।'
গাইরত ২৩
প্রিয় জীবনসঙ্গী, আমি নারী মানুষ: পুরুষের অভিভাবকত্ব ও দায়িত্বশীলতার খুবই মুহতাজ আমি। আমার রুচি ও পছন্দের ব্যাপারে একজন সঙ্গীর খুব প্রয়োজন আমার।
প্রিয়তম, মনে করো ওই একাকিত্বের সময় আমার সাথে যদি খারাপ কিছু হয়ে যেত। যে পশুর সাথে পাহারাদার কুকুর থাকে না, তার ওপর তো নেকড়েরা হামলে পড়ে। ক্ষুধার্ত সিংহেরা ছিঁড়েখুঁড়ে খায়।
ওগো প্রিয়, তোমার কি মনে পড়ে, আমার অসুস্থ মাকে দেখার জন্য তোমার কাছে আমি আমার বাড়িতে যাওয়ার অনুমতি চেয়েছিলাম, তখন তুমি কোনো প্রকার রাখঢাক ছাড়াই বলেছিলে, 'আমার ভাইকে নিয়ে চলে যাও।'
সুবহানাল্লাহ। আমি তোমার বিয়ে করা বউ নাকি তোমার ভাইয়ের বউ! ভাবিকে নিয়ে যাবে দেবর। ইয়া আল্লাহ, তুমি কি নবিজির সেই হাদিস শোনোনি-'দেবর হলো মৃত্যুসম।' তোমার কি গাইরত নেই?!
আমার জানা বিশ্বাস করো, কথাগুলো একহাতে লিখছি আর আরেক হাতে চোখের পানি মুছে চলছি। কষ্টে বুকটা ফেটে যাচ্ছে। বলতে গেলে অনেক কথাই বলা যাবে। কিন্তু আমি আর বলতে চাই না। আমার বুকফাটা কথাগুলো পড়ে যদি তোমার মাঝে একটু হলেও গাইরত আসে, তাহলে রাত জেগে অশ্রুভেজা চোখে চিঠিটা লেখা আমার সার্থক হয়ে যাবে। -ইতি তোমার প্রিয়তমা স্ত্রী।
নোট : মাদরাসা পড়ুয়া সম্মানিত পাঠক-পাঠিকাগণ গাইরত শব্দের সাথে পরিচিত। এ যাবৎকালের আলোচনা থেকে তাদের বিরক্ত হওয়ার কথা নয়। কিন্তু জেনারেল পড়ুয়া প্রিয় পাঠক-পাঠিকাদের বিরক্তির ভয় করছি আমি। আর যদ্দুর ধারণা করি—আমার এ বইয়ের পাঠক-পাঠিকাদের বড় একটা অংশই হবেন জেনারেল পড়ুয়া ভাই-বোন। তারা ভ্রুকুঞ্চন করে বলতে পারেন-এই গাইরত জিনিসটা কী? আসুন, তাহলে এবার গাইরত শব্দের সাথেই পরিচয় করিয়ে দিই।
📄 গাইরত বলতে কী বোঝায়?
গাইরত (غيرة) শব্দটি আরবি। এর শাব্দিক অর্থ—আন্তরিক পরিবর্তন বা অন্তরে জেগে ওঠা ক্রোধ।' তবে সাধারণত শাব্দিক অর্থে বাংলায় এটাকে আত্মগরিমা, আত্মাভিমান, আত্মসম্মানবোধ, আত্মমর্যাদাবোধ বলে। আর ইংরেজিতে 'প্রটেক্টিভ জেলাসি' বলে।
কোনো পরিভাষাই তো আর তার শাব্দিক অর্থে পুরোপুরি চেনাজানা যায় না; পারিভাষিক অর্থের প্রয়োজন হয়। তাই গাইরতের পারিভাষিক অর্থটা জেনে নিলেই ক্লিয়ার হয়ে যাবে।
প্রসিদ্ধ আরবি ভাষাবিদ নাহহাস বলেছেন, 'গাইরত হলো কোনো দায়িত্বশীল পুরুষের পক্ষ থেকে স্বীয় স্ত্রী কিংবা নিকটস্থ কন্যা-জায়াদেরকে রক্ষা করা এবং প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা, যাতে কোনো নন-মাহরাম পুরুষ তাদের কাছে ভিড়তে না পারে অথবা নারীরা নন মাহরাম পুরুষদের কাউকে দেখতে না পারে।'২
ইমাম জুরজানি বলেছেন, 'গাইরত হলো নিজের একান্ত অধিকারের ক্ষেত্রে অন্যের অংশীদারত্বকে অপছন্দ করা।'৩
কাজি ইয়াজ মালিকি গাইরতের পারিভাষিক পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন, 'স্বামী-স্ত্রী হলো একে-অপরের একান্তজন। এই ঐকান্তিকতার ক্ষেত্রে স্বামী বা স্ত্রীর অন্য নারী বা পুরুষের সাথে সংশ্লিষ্টতার কারণে অন্তরে যে পরিবর্তন ও ক্রোধের উদ্রেক হয়; স্বামীকে অন্য নারী থেকে ফিরিয়ে রাখা এবং স্ত্রীকে অন্য পুরুষ থেকে রক্ষার যে মানসিকতা—এটাই হলো গাইরত।'৪
কাজি ইয়াজ মালিকির এ পরিচয়টিকে আরেকটু সার্বিকভাবে দিয়েছেন হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি রহ. তাঁর জগদ্বিখ্যাত গ্রন্থনা ফাতহুল বারিতে। তিনি লেখেন, 'গাইরত হলো-যা কিছু একান্ত নিজের; তাতে অন্যের অংশীদারত্বের কারণে অন্তরের অবস্থার পরিবর্তন এবং ক্ষোভ জেগে ওঠা।'১
একজন মানুষের গাইরত কখন এবং কোথায় জাগ্রত হয়? এই প্রশ্নেরও উত্তর দিয়েছেন স্বয়ং ইবনে হাজার আসকালানি। গাইরতের পরিচয় শেষ করতে না করতেই তিনি বলেছেন, 'মানুষের মধ্যে এই গাইরত জাগ্রত হওয়ার বিষয়টি সবচেয়ে কঠিনভাবে ঘটে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে।'২
ইমাম নববি ও ইবনে হাজারের কথাকে সোজা কথায় বোঝাতে গেলে যা বলতে হয়, গাইরত মানে আত্মাভিমানবোধ, একান্ত নিজের কোনো বিষয়ে অন্যের হস্তক্ষেপজনিত মনোবেদনা এবং কারও নিরঙ্কুশ অধিকারে অন্যের ভাগ বসানোর দ্বারা সৃষ্ট মানসিক উত্তেজনা। কোনো স্বামী যদি তার স্ত্রীর প্রতি অন্যের আসক্তি বা কুদৃষ্টি দেখতে পায়, তখন তার ভেতর যে চিত্তচাঞ্চল্য ও ক্ষোভ সঞ্চার হয়, সেটাই গাইরত। এমনিভাবে কোনো স্ত্রী যদি তার স্বামীকে অন্য নারীতে আসক্ত দেখে বা তার স্বামীর প্রতি অন্য নারীর আকর্ষণ লক্ষ করে, তখন তার যে মানসিক উত্তেজনা ও বেদনাবোধ হয়, তাকেই গাইরত বলে। কারণ, তাতে স্বামীর বা স্ত্রীর একচ্ছত্র অধিকারে ভাগ বসানো হয়ে থাকে।
তো আশা করি বুঝতে পেরেছেন, গাইরত শব্দের আবেদন ও ব্যাপকতা কতটুকু? বাংলা ভাষায় যে গাইরতের অর্থ নেওয়া হয় আত্মসম্মান বা আত্মাভিমান কিংবা আত্মমর্যাদাবোধ, তা গাইরতের প্রতিশব্দ হিসেবে মোটামুটি উপযুক্ত হলেও 'গাইরত' শব্দের সম্পূর্ণ প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না। আত্মসম্মান বা আত্মমর্যাদাবোধ তো মানুষের অনেক ক্ষেত্রেই হয়ে তাকে। কিন্তু শরিয়ার পরিভাষায় নিজের মাহরাম নারীদের বেলায় নন-মাহরাম পুরুষের সামান্য সংশ্লিষ্টতা কেন্দ্র করে পুরুষের অন্তর্জগতে যে ভাব, অনুভূতি ও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়, এটাকেই গাইরত বলে। এই ব্যাপক অর্থকে বাংলা আত্মসম্মানবোধ কিংবা আত্মমর্যাদাবোধ অথবা আত্মাভিমান শব্দাবলি সম্পূর্ণভাবে ধারণ করতে পারে না।
গাইরতের শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থের টানাপোড়েনে পড়ে এখনও যদি কেউ ঠিকমতো গাইরত শব্দের অর্থ বুঝতে না পারেন, তার জন্য আসলে এসব শাব্দিক-পারিভাষিক অর্থ বলা বেমানান। তাকে একটা উদাহরণ দিয়েই বুঝিয়ে দিতে হবে। সেই উদাহরণটাই এখানে দিচ্ছি-
যেমন ধরুন আপনি আপনার স্ত্রী (কন্যা অথবা মা কিংবা বোন বা মাহরাম কোনো নারীও হতে পারে)-কে নিয়ে কোথাও যেতে বের হয়েছেন। একটা সিএনজির পেছনে আপনারা দুইজন বসেছেন। এখনও পেছনে একটা সিট খালি। আপনি বসেছেন সিএনজির ভেতরে একেবারে ডান পাশে। এরপর আপনার স্ত্রী। তো কোথাকার একজন অপরিচিত পুরুষ যাত্রী আপনার স্ত্রীর পাশে বসে গেল। এতে করে আপনার মনের মধ্যে একটা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হলো। কোথাকার একজন অপরিচিত যাত্রী আপনার স্ত্রীর পাশে বসবে কেন—এমন একটা অস্ফুট প্রশ্ন আপনার মনোজগতের সবকিছু ওলট-পালট করে দিচ্ছে। ব্যাপারটা আপনি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না।
তো আপনি কী করলেন; আপনি উঠে সিটের মাঝখানে বসলেন আর আপনার স্ত্রীকে দিলেন ডানপাশে। এতে করে পরপুরুষ যাত্রীর পাশে আপনিই থাকলেন, আপনার স্ত্রীকে থাকতে হলো না। আপনার স্ত্রীর পাশে একজন পরপুরুষের বসাকে কেন্দ্র করে গোপনে আপনার মনোজগতে এই যা কিছু ঘটে গেল, এটাই হলো গাইরত।
তবে এখানেও কথা আছে। আপনি যদি সত্যিই গাইরতমন্দ পুরুষ হন, তাহলে আপনি অবশ্যই আগে থেকে সতর্কতা অবলম্বন করবেন। সিএনজিতে উঠার সময়েই আপনার স্ত্রীকে একেবারে ডান পাশে কোণায় বসিয়ে আপনি তার পাশে সিটের মাঝামাঝি বসবেন। যাতে করে অন্য কোনো যাত্রী এসে আপনার পাশেই বাম পাশের সিটে বসে। আপনার স্ত্রী ও পরপুরুষের মাঝে আপনিই বাধা হয়ে থাকেন।
কেউ কেউ তো আরও একটু বেশিই গাইরতমন্দ হন। স্ত্রী কিংবা মেয়ে বা বোনকে নিয়ে সিএনজির পেছনের সিটে বসেন আর দুইজনের জায়গায় তিনজনের ভাড়া দেন। যাতে পেছনের সিটে ড্রাইভার আর কোনো যাত্রী না উঠায়। পেছনের তিন সিটের রাজ্য একমাত্র নিজেদের দখলেই থাকে। প্রাইভেট গাড়ি কিংবা পুরো সিএনজি ভাড়া করতে না পারলে ন্যূনতম এটাই করা যায়। দুইজনের ভাড়া দিতে পারলে তিনজনের ভাড়াটাও অবশ্যই আপনি দিতে পারবেন। আপনার গাইরতের কাছে নিশ্চয়ই টাকাটা বড় কিছু নয়! আর যাদের পয়সা আছে, তারা তো প্রাইভেট গাড়ি রিজার্ভ নিয়ে থাকেন।
টিকাঃ
১ আন-নিহায়া ফি গারিবিল হাদিস ওয়াল আসার: ৩/৪০১।
২ আওদাতুল হিজাব: ৩/১১৪, ড. শাইখ ইসমাইল মুকাদ্দিম।
৩ তারিফাত: ২১।
৪ মাশারিকুল আনওয়ার: ২/১৪১, কাজি ইয়াজ মালিকি।
১ ফাতহুল বারি: ৯/২৬৪, ইবনে হাজার আসকালনি
২ প্রাগুক্ত।
📄 দূরসম্পর্কের নারীর ক্ষেত্রেও গাইরত
জাহিলি যুগে শুধুমাত্র নিজের রক্ত সম্পর্কীয় কোনো নারীর ইজ্জত-আব্রু রক্ষার জন্যই পুরুষের গাইরত জেগে উঠত না; বরং রক্তের সম্পর্কের বাইরের কোনো নারীর শ্লীলতাহানি ঘটলেও সে যুগের পুরুষদের গাইরত জেগে উঠত।
বর্ণিত আছে, আরবের খাসআম গোত্রের একজন নারী ছিল খুবই সুন্দরী ও রূপসী। সুলাইক নামক এক বদমাইশ লোক সেই নারীর পাশ দিয়ে গমন করার সময় একাকী সুন্দরী নারীর ওপর তার বদনজর পড়ে। এত সুন্দর নারী দেখে সে আর নিজেকে সামলাতে পারেনি; সে নারীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। জোরজবরদস্তি করে নারীকে ধর্ষণ করে নিজের পশুলিপ্সা চরিতার্থ করে।
খাসআম গোত্রের একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি ছিলেন আনাস বিন মুদরিকাহ। তারই গোত্রের একজন নারীর বেইজ্জতি তিনি মেনে নিতে পারেননি। তিনি ধর্ষককে ধরে এক কোপে মস্তক বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন! এরপর সেই হত্যার রক্তপণ তিনি নিজের গাঁটের পয়সা দিয়ে পরিশোধ করে দেন। এ প্রসঙ্গেই আনাস বিন মুদরিকাহ কবিতা আবৃত্তি করেন :
إني وقتلي سليكا ثم أعقله .... كالثور يضرب لما عافت البقر
(কাব্যানুবাদ) বদমাইশ সুলাইককে হত্যা করেছি, দিয়েছি আমি রক্তপণ এর ফলে, ষাঁড়কে প্রহার করে আগে নামানো হয় গাভীরা নামতে না চাইলে জলে।
(ব্যাখ্যা)
রাখাল গরুর পালকে পানি পান করানোর জন্য পানির ঘাটে নিয়ে আসে। তখন বিশাল পানি দেখে প্রথমে গাভী পা বাড়াতে চায় না। এমতাবস্থায় ষাঁড়ের গায়ে আঘাত করে আগে পানিতে নামতে বাধ্য করা হয়। যাতে ষাঁড়ের দেখাদেখি গাভী পানিতে নামে। কিন্তু গাভীকে আঘাত করা হয় না। কেননা, গাভী দুধেল হয়ে থাকে।
কবিতার মাধ্যমে ইলিয়াস বিন মুদরিকাহ বোঝাতে চেয়েছেন, তার গোত্রীয় নারী ও সুলাইক নামক পুরুষ যে কুকর্ম করেছে, তাতে অপরাধ একমাত্র সুলাইকের। নারীর কোনো অপরাধ ছিল না। সুলাইক তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করেছে। এজন্য শাস্তি দিতে গিয়ে নারীকে বাদ দিয়ে তিনি কেবলমাত্র সুলাইকের মস্তক বিচ্ছিন্ন করেছেন।১
টিকাঃ
১ ফাযাইলুল গাইরাহ আলান-নিসা: ৩১, হাম্মাদাহ মুহাম্মাদ মুহাম্মাদ ইসমাইল।