📘 গাইরত > 📄 গাইরতহীন স্বামীর বেহায়া স্ত্রী

📄 গাইরতহীন স্বামীর বেহায়া স্ত্রী


লিফটে উঠেছি। হসপিটালের সপ্তম তলায় উঠার জন্য। এতটুকুন একটা কামরায় গাদাগাদি করে মানুষ উঠল প্রায় ডজনখানেক! একে অপরের মুখোমুখি। একজনের নাকের গরম শ্বাস আরেকজনের ওপর গিয়ে পড়ছে। এ রকম পরিস্থিতি আসলেই খুব উৎকণ্ঠার। কিন্তু প্রয়োজনের খাতিরে সকলেই কয়েকটা সেকেন্ড মানিয়ে নেয়। যার যার গন্তব্যের তলা এলেই হনহনিয়ে বেরিয়ে যায়; পেছনে ফিরে কেউই তাকায় না।
লিফটের সংকীর্ণ কামরায় সকলে পুরুষ হলে ব্যাপারটা ভিন্ন। সেখানে কোনো নারী হলে সকলেই একটু-আধটু অস্বস্তি বোধ করে। সেটা নারীর প্রতি পুরুষের একটা অতিরিক্ত সম্মানবোধের কারণে। কেন যেন লিফটের সংকীর্ণ পরিবেশে মায়ের জাত নারীদের কাউকে কোণঠাসা অবস্থায় দেখতে কোনো পুরুষের মন সায় দেয় না। কেমন যেন বেমানান লাগে। মায়ের জাত নারী; পুরুষদের সাথে এই ভ্যাপসা ও অস্বস্তিকর পরিবেশে কয়েক সেকেন্ডের জন্য হলেও উপস্থিতিটা অসম্মানের মনে হয়। মায়ের জাতের জন্য তো আরও বড় প্রশস্ত ও ধাক্কাধাক্কি মুক্ত পরিবেশ হওয়া উচিত।
এই অনুভূতি লিফটের সংকীর্ণ পরিবেশে পর্দাবৃতা মা ও বোনদের ক্ষেত্রে অনুভূত হয়। কিন্তু লিফটের এই গাদাগাদি ও সংকীর্ণ পরিবেশে কোনো নারী যদি বেপর্দা অবস্থায় উঠে, তাহলে কেমন লাগবে? তাও যদি সেই নারীর পেট বা পিঠ দৃশ্যমান হয়, তাহলে পরিবেশ ও পরিস্থিতিতিটা কেমন লাগবে—বলুন তো! নিশ্চয় অসুন্দর, অরুচিকর ও অস্বস্তিকর লাগবে। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, আজকাল লিফটের মতো সংকীর্ণ পরিবেশেও এমন বেহায়া নারীর উপস্থিতি দেখে পুরুষরা লজ্জায় কাঁচুমাচু করলেও এমন নারীর কোনো ভাবান্তর পরিলক্ষিত হয় না!
লিফটের সংকীর্ণ কামরায় গাদাগাদি করে আমরা বহু পুরুষ দাঁড়িয়ে ছিলাম। ইত্যবসরে একজন জেন্টলম্যান লিফটে সস্ত্রীক প্রবেশ করলেন। ভদ্রমহিলার আবরণ পাতলা ফিনফিনে শাড়ি এবং কোমর পর্যন্ত প্রায় অনাবৃত। সেইসাথে দামি পারফিউমের ঝাঁঝাল সুগন্ধ লিফটের আবদ্ধ ছোট্ট কামরায় সবাইকে বুঁদ করে ফেলছিল!
নির্লজ্জ নারীর একেবারে পাশে থাকা কয়েকজন দ্বীনদার কিংবা লজ্জাশীল ব্যক্তি অন্যদিকে তাকিয়ে অস্বস্তিকর মুহূর্তগুলো কাটাতে চাচ্ছিলেন। আবার কয়েকজন পুরুষের কামুক দৃষ্টি ঠিকই নারীর দিকে নিবদ্ধ ছিল!
আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, ওই বেহায়া নারীর গাইরতহীন স্বামীর সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপই ছিল না! পরপুরুষ যে তার স্ত্রীর উদাম পিঠ কামুক দর্শনে ধর্ষণ করছে, সেদিকে বেচারার কোনো খেয়াল নেই যেন! আর খেয়াল করবেই বা কীভাবে; সে তো স্ত্রীকে নিয়ে লিফটে উঠার আগেই পাবলিক প্লেসে আরও বহু পুরুষের দর্শনে ধর্ষণ করিয়ে এসেছে। তা ছাড়া এদের মতো গাইরতহীন পুরুষ স্ত্রীদেরকে রাস্তা-ঘাটে প্রদর্শন করে একপ্রকার আত্মিক তৃপ্তি অনুভব করে। এটাকেই আধুনিকতা মনে করে! স্ত্রীকে রাস্তাঘাটে পরপুরুষের দর্শনে ধর্ষণ করানোকেই উন্নতি, সভ্যতা, সুশীলতা জ্ঞান করে!
এমন গাইরতহীন পুরুষের সংখ্যা আমাদের সমাজে মোটেও কম নয়। এদের প্রায় সকলেই বা বেশির ভাগ বসবাস করে শহরে। উদام পেট ও পিঠওয়ালি স্ত্রীকে নিয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়ানো গাইরতহীন স্বামীরা শুধু লিফটের সংকীর্ণ কামরায় নয়; রাস্তাঘাটে, গাড়িতে, বাজারে, শপিংমলে, পাবলিক প্লেসে-সর্বত্র দেখা যায়। এমন বেপর্দা নারী তো অবশ্যই বেহায়া হয়। কিন্তু কথা এদেরকে নিয়ে নয়; কথা হলো এমন বেহায়া নারীর গাইরতহীন স্বামীকে নিয়ে! পুরুষ আবার গাইরতহীন হয় কীভাবে!
আপনি জেনে অবাক হবেন, এই গাইরতহীন পুরুষদের কেউ কেউ আবার লেবাসধারী হয়! মাথায় টুপি, মুখে দাড়ি ও গায়ে পাঞ্জাবি পরিহিত পুরোদস্তুর হুজুর টাইপের কাউকে তো বেহায়া-বেলাজ স্ত্রী কিংবা কন্যাদের নিয়ে পাবলিক প্লেসে ঘুরতে দেখা যায়! এরা নিজেরা দ্বীনের বেশভূষা ধরলেও স্ত্রী, কন্যা, জায়াদেরকে দ্বীনের বেশভূষা ধরাতে তো পারেইনি; উপরন্তু এদেরকে নিয়ে তারা রাস্তাঘাটে নির্লজ্জের মতো ঘুরতে বের হয়! ওই যে, দ্বীনকে দ্বীনের মতো গ্রহণ না করে প্রতীকরূপে গ্রহণ করলে যা হয় আরকি! অথচ, আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে বলেছেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ
'হে ইমানদারগণ, তোমরা তোমাদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন হতে বাঁচাও, যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর।'
বিপরীত দিকে এই সমাজে এমন পুরুষও আছে, যে-কিনা ব্যক্তিগতভাবে দ্বীনদার নয়; নামাজ-কালাম পড়ে না; দান-সাদাকাহ করে না; সুদ, ঘোষ, দুর্নীতিতে জড়িত, কিন্তু তার স্ত্রী কিংবা কন্যা বা জায়াদেরকে নিয়ে কোথাও বের হলে অবশ্যই পর্দাবৃতা করে বের হয়। কোনো পরপুরুষ তার স্ত্রী, কন্যা বা জায়ার প্রতি কুদৃষ্টি দিয়ে তাকাক— এটা তার মোটেও পছন্দ নয়।
তাহলে এই দ্বীনহীন পুরুষ আর একটু আগে উল্লিখিত লেবাসধারী দ্বীনদার পুরুষের মধ্যে পার্থক্য কোন জায়গায়—ধরতে পেরেছেন? পার্থক্য হলো গাইরত। একজন পুরুষ প্রতীকীভাবে দ্বীনদার হয়েও গাইরতহীন হলে তার ঘরের নারীদেরকে নিয়ে বাইরে বেপর্দা অবস্থায় বের হতে পারে। পক্ষান্তরে একজন পুরুষ দ্বীনহীন হয়েও গাইরতমন্দ হওয়ায় তার ঘরের নারীদেরকে নিয়ে বেপর্দা বের হতে পারে না।
উপর্যুক্ত কথাগুলো তো প্রযোজ্য এমন গাইরতহীন পুরুষের নির্লজ্জ স্ত্রী, কন্যা, জায়াদের ক্ষেত্রে; যারা নিজেরাই পর্দানশিন হয়ে চলাফেরা পছন্দ করে না। পাশাপাশি তাদের অভিভাবক পুরুষও গাইরতহীন বলে তাদেরকে এভাবে চলাফেরার সুযোগ করে দেয়। এই সমাজে এমনও গাইরতহীন পুরুষ আছে, যার স্ত্রী দ্বীন পালন করার যথাসাধ্য চেষ্টা করে; মাহরাম ও নন মাহরাম বাছবিচার করে চলতে চায়; পর্দা মেইন্টেইন করে চলতে চায়, কিন্তু গাইরতহীন পুরুষের জন্য সেটা সম্ভব হয় না; সে ইচ্ছায় হোক কিংবা অনিচ্ছায়; নিজের পর্দানশিন স্ত্রীকে পরিপূর্ণভাবে পর্দার সাথে চলতে সহায়ক ভূমিকা রাখে না।
এটাও আমাদের সমাজে অনেক বড় এক ব্যাধি। যে সকল নারী একটু বেশিই দ্বীন পালনে সচেষ্ট, তারা নিজেদের জায়গায় মজবুত থেকে পর্দা পালন করে যায়। কিন্তু যারা দ্বীন পালনে অত মজবুত নয়, তারা কিন্তু অনেক সময় পরিস্থিতির হাতে নিজেকে ছেড়ে দেয়! তো এমন স্ত্রীকে ঠিকঠাকমতো দ্বীন পালন করতে না দেওয়ার পেছনে কিন্তু ঘুরেফিরেই গাইরতহীন স্বামীর ভূমিকা রয়েছে।
নিয়তির কারণে কোনো প্র্যাক্টিসিং বোনের কপালে যদি এমন গাইরতহীন স্বামী পড়ে, তাহলে সেই বোনের কষ্ট আল্লাহ ছাড়া বোঝবার কেউ নেই! এমন ভুক্তভোগী বোনদের কেউ কেউ তার গাইরতহীন স্বামীর মধ্যে গাইরত সৃষ্টি করার জন্য দাওয়াহর কাজ করেন। নানানভাবে স্বামীকে বোঝাতে চেষ্টা করেন। আল্লাহর ইচ্ছায় তাদের কেউ সফল হন। কিন্তু যারা সফল হন না, তাদের কেউ আবার উপায়ান্তর না পেয়ে এই গাইরতহীন স্বামীকে নিয়েই দিনাতিপাত করেন।
তবে যারা দ্বীনের ব্যাপারে কম্প্রোমাইজ করার মন-মানসিকতা রাখেন না, তারা এমন গাইরতহীন স্বামীর ঘরই করেন না; ডিভোর্স দিয়ে দেন। বেশি নয়; আমার জানাশোনা এই সমাজেরই একটিমাত্র ঘটনা শেয়ার করছি-

টিকাঃ
¹ সুরা তাহরিম: ৬।

📘 গাইরত > 📄 গাইরতহীন স্বামীর ঘর থেকে পলায়ন

📄 গাইরতহীন স্বামীর ঘর থেকে পলায়ন


মেয়েটা কুরআনের হাফেজা। একটি কওমি মহিলা মাদরাসার ছাত্রী। দাওরায়ে হাদিস ক্লাসে পড়ত। কিছুদিন গেলেই সে একাডেমিকভাবে আলেমা হয়ে যাবে। হিফজ শেষ করে আলেমা হতে হতে সে পূর্ণ যৌবনা হয়ে গিয়েছিল। হাফেজা-আলেমা মেয়ে হিসেবে তার কদর ছিল অনেক। আমাদের দ্বীনি কমিউনিটিতে অনেক আলেমা মেয়ে পাওয়া গেলেও হাফেজা মেয়ে পাওয়া বেশ দুষ্কর।
হাফেজা-আলেমা মেয়েদের প্রতি আমাদের সমাজের মায়েদের আবার আদিখ্যেতা একটু বেশি। এমন মেয়েকে পুত্রবধূ বানাতে পারলে তারা মনে করেন দুনিয়াতেই জান্নাত জুটিয়ে ফেলেছেন! এর ব্যতিক্রম না আমার গর্ভধারিণী মাও; তিনিও তাঁর পরিচিত এক হাফেজা-আলেমা মেয়েকে পুত্রবধূ করার জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিলেন। অবশ্য সেই মেয়ের পরিবার মেয়েকে বিলেত বিয়ে দেওয়ার জন্য মান্নত করে রাখায় আমার মায়ের সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি!
যাকগে, মূল কাহিনিটাই বলি। তো দাওরায়ে হাদিস পড়ুয়া সেই হাফেজা-আলেমা মেয়েটিকে পুত্রবধূ করে নেওয়ার জন্য বড্ড শখ জাগল পার্শ্ববর্তী এলাকার এক মায়ের। তিনি দৌড়ে ছুটে এলেন মাদরাসায়। মেয়েটাকে দেখতে। পছন্দও হলো মেয়েকে। তার অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছিল, পারলে এখানেই মাদরাসায় মেয়েটিকে কবুল বলিয়ে উঠিয়ে নিয়ে যান পুত্রবধূ করে। অথচ, একবারও ভাবলেন না-তার বজ্জাত ছেলেটা আদৌ এই মেয়ের উপযুক্ত কি না!
ছেলের পরিবার ছিল অবস্থাপন্ন। গোয়াল ভরা গরু; পুকুর ভরা মাছ আর গোলা ভরা ধান। ফলে যা হওয়ার তা-ই হলো। এমন সম্বন্ধ হাতছাড়া করতে চায় না মেয়ের পরিবার। তারা একপায়ে খাড়া! অথচ, একবারও ভাবল না মেয়েটির কথা। তাদের এত শখের হাফেজা-আলেমা মেয়ের উপযুক্ত কি না ওই পাত্র! মেয়েরও তো একটা শখ আছে। স্বপ্ন আছে। কিন্তু লোভী অন্তরগুলো আসলে এসব বিবেক-বিবেচনা করার টাইম পায় না!
উভয় পক্ষ মিলে একটা দিন ঠিক করল। সেদিনই মেয়েটা বধূ হয়ে স্বামীর বাড়ি গিয়ে উঠল। মেয়েটার সব স্বপ্ন ফিকে হয়ে গেল বাসর রাতেই। নামাজ-কালাম তো নেই; নবপরিণীতা স্ত্রীর কাছে আসার সুন্নাহ তরিকারও কোনো বালাই নেই। এমনকি কোনো প্রকার রোমান্টিকতাও নেই! ক্ষুধার্ত নেকড়ে যেভাবে নিরীহ হরিণীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে—এরচেয়ে ব্যতিক্রম কিছু মনে হলো না।
যত দিন যেতে লাগল, মেয়েটার কাছে তত পরিষ্কার হতে লাগল যে, তার স্বামী একাই শুধু দ্বীনহীন না; এই বাড়ির সবগুলো লোকই দ্বীনহীন। দ্বীনের ছিটেফোঁটাও এদের মধ্যে নেই। আবার টাকার জোর থাকায় এদের গরিমার পারদটাও বেশ উঁচু। গরিব কাউকে গোনায় ধরতে চায় না। গরিব ঘরের মেয়ে বলে তাকেও অবজ্ঞার নজরে দেখে।
তবে এসব মোটেও গায়ে মাখেনি মেয়েটি। সামাজিক জাহালাতের কারণে এই সমাজের বেশির ভাগ মেয়েকেই এসব লাঞ্ছনা ও বঞ্চনা সেক্রিফাইস করতে হয়। সামনে আসবে শুভদিন—এমন একটা আশা নিয়ে মুখ বুজে সব সহ্য করতে হয়। কিন্তু বিপত্তি বাঁধল মেয়েটা যখন দেখল—তার স্বামীটা শুধু দ্বীনহীন-ই না; রীতিমতো গাইরতহীনও বটে!
মেয়ে হাফেজা-আলেমা হওয়ায় দ্বীনের ব্যাপারে খুব সচেতন ছিল। শ্বশুরবাড়ির বৈরী পরিবেশেও সে হিমশিম খেয়ে হলেও দ্বীন রক্ষা করার চেষ্টা করে যেতে লাগল। কিন্তু সে যত দ্বীন রক্ষা করার চেষ্টা করে যাচ্ছিল, তত হিতে বিপরীত হতে শুরু করল! তার এই রক্ষণশীলতা মোটেও ভালো চোখে নিল না শাশুড়ি ও সে বাড়ির প্রতিটি সদস্য!
মেয়েটি তার দেবরদের সাথে পর্দা করার চেষ্টা করত বলে স্বামী ও শাশুড়ির মুখ থেকে রীতিমতো গালাগাল শুনতে হতো। শাশুড়ি বলত, মেয়েটা নাকি তার ছেলেদেরকে ভালো নজরে দেখতে পায় না; এজন্য দূরে দূরে থাকতে চায়! অথচ, সবগুলো দেবর ছিল বজ্জাত; আরও দশটা পরিবারের বেহায়া ভাবিদের মতো তার সাথেও কুরুচিপূর্ণ ভঙ্গিতে ইয়ার্কি মারতে চাইত!
দেবরদের উৎপাত এতটাই মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল যে, ছোটো দেবরটা তার বেডরুমে পর্যন্ত যখন-তখন ঢুকে যেত! গায়ে হাত দিয়ে ইয়ার্কি মারার চেষ্টা করত! এমনকি গোসলখানায় গেলে লুচ্চাটা উঁকিঝুঁকি দিতে চেষ্টা করত! শুনতে বিশ্রী শুনালেও বলতে বাধ্য হচ্ছি, সারাদিন টো টো কোম্পানির ম্যানেজারের মতো বেকার গাইরত ঘুরে বেড়ানো এই লুচ্চাটা একদিন মেয়েটাকে বলে, 'ভাবি! আজকে তো ভাইয়া বাসায় আসবে না; রুমের দরজাটা একটু খুলে রেখো, প্লিজ!'
কথাটা শোনার পর রীতিমতো গা শিউরে উঠল মেয়েটার। এ কী বলে লুচ্চাটা! মেয়ে সিদ্ধান্ত নিল—আর নয়; দেবরকে আর বাড়তে দেওয়া যাবে না; এখনই স্বামীকে জানাতে হবে তার ছোটো ভাইয়ের এসব কুকীর্তি।
স্বামী বাড়িতে এলে মেয়েটি স্বামীকে সব খুলে বলে। কিন্তু এখানেও হয় হিতে বিপরীত; বউয়ের মুখে ছোট ভাইয়ের বদনাম শুনে ঠাস করে বউয়ের গালে চড় বসিয়ে দেয় পাষণ্ড স্বামী! আর রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে বলে, 'তোর সাহস তো কম না; আমার কাছে আমারই ভাইয়ের নামে যা তা বলিস!'
ছেলের ঘরে রাগারাগি আর থাপ্পড়ের আওয়াজ শুনে দৌড়ে আসে শাশুড়ি। সাথে আসে তার নাইয়রী মেয়ে। শাশুড়ি এসে ছেলেকে জিজ্ঞেস করে—কী হয়েছে? ছেলে সব খুলে বলে। শুনে শাশুড়ি কালনাগিনীর মতো ফুঁসতে ফুঁসতে পুত্রবধূর চুলের মুঠো ধরে মারতে থাকে। মায়ের সাথে তাল দেয় তার নাইয়রী বড় মেয়েও! এক পর্যায়ে চুলের মুঠো ছেড়ে দিয়ে শাশুড়ি বলে, 'ছোটোলোকের বাচ্চা, তোর কত বড় সাহস; আমার ছেলের নামে বদনাম রটাস?!'
বাড়িতে স্বামীর বড়ো বোন নাইয়র এসেছে। সাথে তার স্বামীও। খাবারের টেবিলে জামাইয়ের সাথে শ্যালকের বউকেও ডাকা হলো। একসাথে মিলেমিশে খাওয়ার জন্য। মেয়েটি মনে মনে আল্লাহকে বলতে লাগল, 'ওগো আল্লাহ! এ কী পরীক্ষায় ফেললেন আমাকে!' সে ইতস্তত করতে লাগল। যাবে কীভাবে, আবার না গেলে যে নির্যাতন শুরু হবে, সেটাই বা সইবে কেমনে! হুজুরনি বউকে ইতস্তত করতে দেখে তার স্বামী নিজে উঠে গিয়ে এক ঝটকায় টান মেরে এনে ডাইনিং টেবিলে দুলাভাইয়ের পাশে বসিয়ে দিলো!
তো ডাইনিং টেবিলে শুরু হলো দুলাভাইয়ের আলগা পিরিতের আরেক নমুনা। বেচারা নিজের বউকে রেখে বেশ ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লেন শ্যালকের বউকে নিয়ে! নিজের পাতের মাছটা উঠিয়ে শ্যালকের বউয়ের পাতে দিতে দিতে আদিখ্যেতা দেখাতে শুরু করলেন। আলগা পিরিত দেখানোর পাশাপাশি এটা-ওটা গল্প করতে লাগলেন। অন্যদিকে টেবিলের নিচের দিকে বারবার শ্যালকের বউয়ের পায়ের সাথে নিজের পা দিয়ে গুঁতাগুঁতি করেই যাচ্ছিলেন। আর মেয়েটা লজ্জায় বারবার পা সরিয়ে নিচ্ছিল!
এখানেই শেষ নয়। সন্ধ্যার পর বাসায় বসল লুডু খেলার আসর। স্বামী, বড় ননদ (নাইয়রী মেয়ে), তার জামাই আর ঘরের বউ। মানে আমাদের আলোচিত পুত্রবধূ হাফেজা-আলেমা মেয়েটা! মেয়েটা এখানেও খেলতে রাজি ছিল না। কিন্তু জামাই মানে বড় ননদের স্বামী জোর করে টেনে এনে খেলতে বসায়। আর টেনেহিঁচড়ে নিয়ে আসার দৃশ্য প্রত্যক্ষ করছিল তার গাইরতহীন স্বামী! খেলতে বসে সকলেই লুডুর গুটি নিয়ে ব্যস্ত, আর জামাই ব্যস্ত শ্যালকের বউকে নিয়ে। লুডুর গুটি সরানোর ফাঁকে ফাঁকে সে মেয়েটির কোমরে স্পর্শ করতে শুরু করে! কখনো বাহু দিয়ে অশালীন কিছু করার চেষ্টা করে!
এক পর্যায়ে মেয়েটি সহ্য করতে না পেরে খেলা ভঙ্গ করে দিয়ে উঠে চলে যায়। এরপরই সে জীবনের কঠিন সিদ্ধান্তটা নিয়ে নেয়, যা কিনা সব মেয়ে সহজে নিতে পারে না। সে সিদ্ধান্ত নেয়—এই বাড়িতে আর থাকা যাবে না। এই বাড়ির প্রতিটি সদস্য জাহিল, দ্বীনহীন, লুচ্চা, বদমাইশ। তবে সবচেয়ে বড় দ্বীনহীন হলো তার স্বামী। শুধু দ্বীনহীন-ই না; চরম পর্যায়ের গাইরতহীন সে। এই লোকটার ঘর করা যাবে না। ঘর করতে গেলে দ্বীন পুরোটাই মাটি হবে।
এরপর কয়েক দিন কেটে যায়। মেয়েটা শুধু সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। যেকোনোভাবে সে নিজেকে এই জাহান্নাম থেকে মুক্ত করতে চায়। এতে যে যা বলার বলুক। মা-বাবা ঘরে জায়গা দিক বা না-দিক; তাতে তার কিছু যায় আসে না। তাকে তো তার দ্বীন রক্ষা করতেই হবে। একদিন রাতের বেলা সুযোগ পেতেই ঘর থেকে বেরিয়ে সে পলায়ন করে...।
বাগিচা থেকে একটি সুন্দর ফুল ছিঁড়ে ঘ্রাণ শুঁকে কিছুক্ষণ পর সেটা ছুড়ে ফেলে দিলে যেমন মানুষ পরিত্যক্ত সেই ফুলটা আর হাতে নেয় না, তেমনিভাবে আমাদের এই জাহিলি সমাজে একটা মেয়ের বিয়ে হওয়ার পর ডিভোর্স হলে তাকে আর কেউ বিয়ে করতে চায় না! সকলেই ভার্জিন বিয়ে করতে চায়! এমতাবস্থায় অল্প দিনের সুখের পর মেয়েটি দীর্ঘস্থায়ী এক দুঃখের সাগরে নিমজ্জিত হয়।
ভাগ্যবিড়ম্বিতা এই মেয়েকে আর কেউ সহজে বিয়ে করতে চাইবে না। শুধুমাত্র অভিভাবকের লোভের কারণে একটা মেয়ের জীবনটাই নষ্ট হয়ে গেল!
আশা করি এবার ভালোমতো বুঝতে পেরেছেন, কেন রাসুলুল্লাহ এক হাদিসে দেবরকে মৃত্যুসম বলেছিলেন? হাদিসটি হলো—
عَنْ عُقْبَةَ بْنِ عَامِرٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَالَ : إِيَّاكُمْ وَالدُّخُولَ عَلَى النِّسَاءِ فَقَالَ رَجُلٌ مِنَ الْأَنْصَارِ : يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَفَرَأَيْتَ الحَمْوَ قَالَ : الحَمْدُ المَوْتُ.
উকবা ইবনে আমির রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল ﷺ বলেছেন, 'তোমরা নারীদের কাছে যাওয়া থেকে নিজেদেরকে বাঁচাও।' তখন একজন আনসারি ব্যক্তি বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! দেবরের ব্যাপারে আপনি কী বলেন? রাসুল ﷺ বললেন, 'দেবর তো মৃত্যুসম!'১
মৃত্যু যেভাবে মানুষের দুনিয়ার সম্পর্ক নষ্ট করে দেয়, দেবরও সেভাবে ভাই ও ভাবির সম্পর্ক নষ্ট করে দেয়। একই ঘরে বসবাস করার কারণে এবং ভাবির সাথে দেবরের সংস্পর্শতার সুযোগে দেবর-ভাবির সম্পর্কটা নরমাল হয়ে যায়। আর এখান থেকেই সব সমস্যা তৈরি হয়। এই সমাজের কতশত সংসার ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে শুধুমাত্র দেবর- ভাবির হারাম সম্পর্কের কারণে।

টিকাঃ
১ সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫১৩২।

📘 গাইরত > 📄 বেগারত স্বামীওয়ালি হে বোন!

📄 বেগারত স্বামীওয়ালি হে বোন!


যেসব বোন দ্বীনদার, কিন্তু তাদের স্বামী দ্বীনহীন; কিংবা কোনোরকম দ্বীনদার হলেও গাইরত নেই, সেইসব বোনের কষ্ট অনেক। আর যেসব বোন আগে দ্বীনদার ছিলেন না; কিন্তু এখন দ্বীনে ফিরে এসেছেন আর তাদের স্বামী সেই আগের মতোই দ্বীনহীন ও গাইরতহীন রয়ে গেছেন, সেইসব প্র্যাকটিসিং বোনদের কষ্ট যে কী, তা আল্লাহ ছাড়া কেউ বোঝার মতো না।
এদের প্রবলেমটা হচ্ছে, মিয়াঁ ও বিবি আগে দুজনেই অন্ধকারে ছিলেন। এখন মিয়াঁকে রেখে বিবি একাই আলোতে ফিরে আসায় যতসব বিপত্তি! অন্ধকারে নিমজ্জিত মিয়াঁ এখন আর আলোকিত বিবিকে সহ্যই করতে পারে না। সব সময় একটা বিরক্তিভাব দেখায়। কিছু বললেই রেগে যায়। আগে কত কেয়ার করত, কিছুদিন পরপরই ঘুরতে নিয়ে যেত, বাসার বারান্দায় বসে দুজনে কত সময় কাটাত। গল্প করত। ধোঁয়া উড়া চায়ের পেয়ালায় চুমুকের ফাঁকে ফাঁকে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করত।
কিন্তু এখন...। এখন সবই যেন দুঃস্বপ্ন। এখন হুজুরনি বউকে সময় দেওয়ার মতো সময়ই যেন মিয়ার নেই। এখন দিনের পর দিন, মাসের পর মাস যায়, একসাথে বসে চা আর খাওয়া হয় না! একসাথে বসে নিজেদের নিয়ে গল্প করা হয় না!
স্ত্রীর দ্বীনে ফেরার আগপর্যন্ত সবই ঠিক ছিল। কিন্তু যে-ই না স্ত্রী দ্বীনে ফিরল; ওয়েস্টার্ন ড্রেস পরা বাদ দিয়ে আপাদমস্তক কালো বোরকায় নিজেকে জড়িয়ে নিল; মাহরাম, নন-মাহরাম মেইন্টেইন করে চলতে শুরু করল, তখনই বাঁধল বিপত্তি!
এমন বিপদগ্রস্ত বোনদের উচিত স্বামীর পেছনে দাওয়াহর কাজ করা। আল্লাহ প্রদত্ত নারী জাতের স্বভাবসুলভ কোমলতা, নম্রতা, আদর ও সোহাগের গুণ দিয়ে স্বামীকে বোঝানোর চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকা। এভাবে চেষ্টা করে অনেক বোন কামিয়াব হয়েছেন বলে জানি। তবে এদের সংখ্যা খুব একটা বেশি না।
এমনই একজন বোন সম্পর্কে জানি। আমাদের সিলেটের তিনি। এখন থাকেন ব্রিটেনে। দেশে থাকতে রাজধানীর একটি কওমি মহিলা মাদরাসায় পড়েছেন। পাশাপাশি জেনারেল লাইনেও পড়েছেন। ভিকারুননিসা স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়ার পর মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটিতে একাউন্টিং নিয়ে অনার্স করেছেন। ইংরেজিতে যেমন যোগ্যতা রাখেন, আরবিতেও। তবে দুঃখের ব্যাপার যে, দাওরায়ে হাদিস শেষ করার আগেই তাকে ব্রিটেন চলে যেতে হয়। ব্রিটেনে গিয়েই দাওরা হাদিস শেষ করে আলেমা হন। আবার সেখানেও ভার্সিটিতে পড়ে একাউন্টিং এর ওপর মাস্টার্স কমপ্লিট করেন।
ব্রিটেন প্রবাসী ফুফাতো ভাইয়ের সাথে তার বিয়ে ঠিক হয়। কিন্তু ফুফাতো ভাই দ্বীনদার ছিলেন না বলে ওই বোনের বিয়েতে অমত ছিল। পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের চাপাচাপিতে শেষমেশ তিনি রাজি হন। বিয়েও হয়ে যায়। কিন্তু বরকে বিন্দুমাত্র পছন্দ করতে পারেননি তিনি। সেই দুঃখ তাকে কুড়ে কুড়ে খেতে লাগল। শেষমেশ সিদ্ধান্ত নিলেন-বিয়েই যখন করে ফেলেছেন, বরকে তো মেনে নিতেই হবে। ব্যস, দ্বীন সম্পর্কে সম্পূর্ণ বেখবর ইঞ্জিনিয়ার বরের পেছনে তিনি দাওয়াহর কাজ শুরু করে দিলেন। আল্লাহ তার মেহনত কবুল করলেন। অল্প সময়ের ব্যবধানে তার স্বামী দ্বীনে ফিরে এলেন। দেখতে তাকে মনে হয় আপাদমস্তক একজন হুজুর!
যাহোক, কিন্তু যেসব বোনেরা দাওয়াহ দেওয়ার মানসিকতা রাখেন না, কিংবা দিয়েও কাজ হয়নি, তারা এক সময় হাল ছেড়ে দেন; ব্যর্থ হয়ে মিছেমিছি নিজের মনকে প্রবোধ দেওয়ার জন্য বলেন, 'যার গাইরতবোধ নেই, তার তো পুরুষত্বই নেই। আর তাকে নিয়ে এত কিছু ভেবে কী লাভ? সে তো পরিবর্তন হওয়ার মতো লোক নয়। এখন শুধু দুআই একমাত্র সম্বল।' হ্যাঁ, দুআ অবশ্যই করতে হবে। তবে দাওয়াহর মেহনত অবশ্যই চালিয়ে যেতে হবে। হাল ছাড়া যাবে না।

📘 গাইরত > 📄 গাইরতহীন স্বামীর প্রতি স্ত্রীর চিঠি

📄 গাইরতহীন স্বামীর প্রতি স্ত্রীর চিঠি


এবার আসুন, আরেক উপায় বাতলিয়ে দিই। গাইরতহীন স্বামী যেসব দ্বীনদার বোনের কপালে পড়েছে, তারা এক কাজ করতে পারেন; মনের সব আকুতি মিশিয়ে প্রিয়তম স্বামীকে গাইরতের ব্যাপারে পত্র/চিরকুট লিখতে পারেন। মনের অনেক বেদনা এমন আছে, যা মুখে বলা যায় না কিংবা বলা গেলেও কাগজে-কলমে সেটা বহিঃপ্রকাশ করলে বেশি আবেদনময়ী হয়। আবার অনেক বোন এমন আছেন, যারা স্বামীকে নাসিহাহ করতে সাহস করতে পারেন না। তাদের জন্য চিঠি/চিরকুটই উত্তম পন্থা।
এই পরামর্শটা আমার মাথায় এমনি এমনি আসেনি; গাইরত নিয়ে লিখিত ছোট্ট একটি আরবি কিতাবে গাইরতহীন স্বামীর প্রতি তার দ্বীন-সচেতন স্ত্রীর একটি চিঠি পড়েছিলাম। পড়ে খুব ভালো লেগেছে। বেচারি ভুক্তভোগী মনের সব আকুতি মিশিয়েই চিঠি লিখেছে গাইরত সম্পর্কে গাফিল স্বামীর কাছে। এ চিঠিটি প্রকৃতপক্ষে প্রত্যেক গাইরতহীন স্বামীর দ্বীন-সচেতন স্ত্রীর মনের মণিকোঠায় লুক্কায়িত অস্ফুট বেদনারই বহিঃপ্রকাশ করে।
আমি এখানে চিঠিটির ভাবানুবাদ বাংলা অক্ষরে ফুটিয়ে তোলার যথাসাধ্য চেষ্টা করব। কিন্তু চিঠিটার বাস্তবিক আবেদন কতটুকু ফুটিয়ে তুলতে পারব—তা আল্লাহ মালুম।
باليه معصوم
গাইরত ২১
ভাগ্যবিড়ম্বিতা বোনটির নাম—আফিফা। সে তার নামের মতোই। আফিফা শব্দের অর্থ—পবিত্র ও সতীসাধ্বী নারী। বিয়ের আগে থেকেই সে দ্বীন পালনে সচেষ্ট একজন মেয়ে। কিন্তু বিয়ের পর সে আগের মতো তার দ্বীন পালন করতে পারছে না। ভাগ্যগুণে তার বিয়ে হয়েছে একজন গাইরতহীন পুরুষের সঙ্গে। যার মধ্যে দ্বীন তো নেই-ই; পুরুষের পৌরুষ গাইরতও নেই! আবার স্বামীটা বেশ রগচটাও। মুখে কিছু বলতে গেলে হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনাও আছে।
তাই বাধ্য হয়ে আফিফা ভিন্নপথ অবলম্বন করে। মনের সবটুকু আকুতি মিশিয়ে, দরদ ঢেলে, অশ্রুভেজা চোখের পাপড়িগুলো বাঁ হাতে মুছতে মুছতে স্বামীকে চিঠি লেখে—
প্রিয়তম স্বামী আমার।
হে পুরুষ, আমার কথাগুলো একটু শুনো৷ একটু মন দিয়েই শুনো তবে, হ্যাঁ?
আমি তোমার পুরুষত্বকে সম্বোধন করে বলছি...তোমার পুরুষোচিত জেদকে লক্ষ করেই বলছি... আমার প্রতি তোমার হৃদয়ে জমানো ভালোবাসাকে সম্বোধন করেই বলছি... তোমার পৌরুষদীপ্ত দেহে বহমান প্রতিটি তপ্ত রক্তকণাকে সম্বোধন করে বলছি... তোমার তেজোদ্দীপ্ত অন্তরকে সম্বোধন করেই বলছি...পুরুষ হিসেবে তোমার প্রতিবাদী মনোভাবকেই সম্বোধন করে বলছি... তোমার বিবেক ও বিবেচনাকে সম্বোধন করে বলছি...
আমি জানি, তোমার ধন-সম্পদে কেউ হাত দিলে তুমি রেগে যাও। তোমার চাকরি হাতছাড়া হয়ে গেলেও তুমি দুশ্চিন্তার সাগরে নিমজ্জিত হও। তোমার মূল্যবান কিছু হারিয়ে ফেললেই তোমার আফসোস আর অনুশোচনার যেন অন্ত থাকে না।
আমার স্মরণ আছেঃ হ্যাঁ আমার এখনও স্মরণ আছে, আমাদের বাচ্চা যখন জানালার কাচ ভেঙে ফেলে, তখন তুমি উদ্ধত সিংহের মতো তর্জন-গর্জন করতে থাকো। আমার হাত থেকে বেখেয়ালে মেঝেতে পড়ে শরবতের গ্লাসটি ভেঙে গেলেও তুমি রেগে আগুন হয়ে যাও।
সকালের নাশতা এক-দুই ঘন্টা এদিক-সেদিক হয়ে গেলেই তোমার চেহারার রঙ পাল্টে যায়। গলার রগ ফুলিয়ে তুমি চিল্লাতে থাকো।
প্রিয় স্বামী আমার। হে পুরুষ।
তোমার এইসব অবস্থা এখনও আমার কল্পনায় জাগে। আমি তুলতে পারি না। কিন্তু তোমার কি মনে পড়ে না ওই লোকটির কথা, যে আমার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়েছিল। আমাকে উত্ত্যক্ত করতে চেয়েছিল।
হ্যাঁ, আমার প্রিয়তম। এটা আসলেই আশ্চর্যজনক। কিন্তু এরচেয়েও আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, সেদিন তোমার ইন্দ্রিয়ের ঠান্ডা ভাব। মুখ দিয়ে একটি 'রা'-ও বের না হওয়া। ওই বদমাইশ লোকটার সাথে নম্র কণ্ঠে কথা বলা৷ কসম আল্লাহর, এটা সত্যিই আশ্চর্যজনক।
ওগো প্রিয়, তুমি যখন আমাকে আদেশ করো-তোমার চাচাতো ভাইদের সামনে বের হতে; তাদের সাথে হ্যান্ডশেক করতে, তখন আমার বুকফেটে কান্না বের হয়। তুমি তো জানোই, তাদের সাথে আমার পর্দা করা জরুরি; তারা আমার জন্য মাহরাম না, কিন্তু তুমি সব সময়ই অহেতুক দাবি করে বসো-'আরে, এরা আমার চাচাতো ভাই।'
আমার তো এখনও মনে আছে, আমরা দুজন যখন দেশের বাইরে ট্যুরে বের হই, তখন তুমি আমাকে কী বলেছিলে। তুমি আমাকে আমার নেকাব খুলতে বলেছিলে। যুক্তি দিয়েছিলে-নেকাব না খুললে ইমিগ্রেশনের লোকেরা আমায় চিনবে না।
ওগো প্রিয়তম, তুমি তো জানো, আমার সব প্রশান্তি নিহিত আমার হিজাব-নেকাবের মধ্যেই। পরপুরুষদের থেকে আমার সতীত্ব বাঁচানো, আরু রক্ষা করা ও নিজের সেফটি এই হিজাব- নেকাবেই। তুমি কেন আমার ওপর ইনসাফ করলে না?।
তুমি কি আমাকে আমাদের পারিবারিক ডাক্তারের সামনেও যেতে বলপ্রয়োগ করো না? অথচ, এই লোকটা আমার মাহরাম না।
স্বামী গো. তোমার এমন কাজে আমার অন্তর ফেটে চৌচির হয়ে যায়। তুমি যুক্তি দিয়ে বলো-এই ডাক্তার অনেক এক্সপার্ট। খুব যোগ্য। অথচ, তুমি কি জানো না যে, আমাদের মেয়েদের মধ্যেই এরচেয়েও ভালো ও যোগ্য ডাক্তার আছে?।
প্রিয় আমার। তোমার কি মনে আছে, মার্কেটের পাশে গাড়ি পার্ক করে আমাকে নামিয়ে দিলে তুমি, এরপর আমাকে বললে, 'যাও, তুমিই কেনাকাটা করে এমোঃ আমি তোমার জন্য গাড়িতেই ওয়েট করছি।'
গাইরত ২৩
প্রিয় জীবনসঙ্গী, আমি নারী মানুষ: পুরুষের অভিভাবকত্ব ও দায়িত্বশীলতার খুবই মুহতাজ আমি। আমার রুচি ও পছন্দের ব্যাপারে একজন সঙ্গীর খুব প্রয়োজন আমার।
প্রিয়তম, মনে করো ওই একাকিত্বের সময় আমার সাথে যদি খারাপ কিছু হয়ে যেত। যে পশুর সাথে পাহারাদার কুকুর থাকে না, তার ওপর তো নেকড়েরা হামলে পড়ে। ক্ষুধার্ত সিংহেরা ছিঁড়েখুঁড়ে খায়।
ওগো প্রিয়, তোমার কি মনে পড়ে, আমার অসুস্থ মাকে দেখার জন্য তোমার কাছে আমি আমার বাড়িতে যাওয়ার অনুমতি চেয়েছিলাম, তখন তুমি কোনো প্রকার রাখঢাক ছাড়াই বলেছিলে, 'আমার ভাইকে নিয়ে চলে যাও।'
সুবহানাল্লাহ। আমি তোমার বিয়ে করা বউ নাকি তোমার ভাইয়ের বউ! ভাবিকে নিয়ে যাবে দেবর। ইয়া আল্লাহ, তুমি কি নবিজির সেই হাদিস শোনোনি-'দেবর হলো মৃত্যুসম।' তোমার কি গাইরত নেই?!
আমার জানা বিশ্বাস করো, কথাগুলো একহাতে লিখছি আর আরেক হাতে চোখের পানি মুছে চলছি। কষ্টে বুকটা ফেটে যাচ্ছে। বলতে গেলে অনেক কথাই বলা যাবে। কিন্তু আমি আর বলতে চাই না। আমার বুকফাটা কথাগুলো পড়ে যদি তোমার মাঝে একটু হলেও গাইরত আসে, তাহলে রাত জেগে অশ্রুভেজা চোখে চিঠিটা লেখা আমার সার্থক হয়ে যাবে। -ইতি তোমার প্রিয়তমা স্ত্রী।
নোট : মাদরাসা পড়ুয়া সম্মানিত পাঠক-পাঠিকাগণ গাইরত শব্দের সাথে পরিচিত। এ যাবৎকালের আলোচনা থেকে তাদের বিরক্ত হওয়ার কথা নয়। কিন্তু জেনারেল পড়ুয়া প্রিয় পাঠক-পাঠিকাদের বিরক্তির ভয় করছি আমি। আর যদ্দুর ধারণা করি—আমার এ বইয়ের পাঠক-পাঠিকাদের বড় একটা অংশই হবেন জেনারেল পড়ুয়া ভাই-বোন। তারা ভ্রুকুঞ্চন করে বলতে পারেন-এই গাইরত জিনিসটা কী? আসুন, তাহলে এবার গাইরত শব্দের সাথেই পরিচয় করিয়ে দিই।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00