📘 গাফলতি ছাড়ুন 📄 ৬. জান্নাত-জাহান্নামের আলোচনার মাধ্যমে

📄 ৬. জান্নাত-জাহান্নামের আলোচনার মাধ্যমে


জান্নাত এমন এক আবাসস্থল, যার বাসিন্দারা কখনও মৃত্যুবরণ করবে না। যার ভবন ও ইমারত ও স্থাপনগুলো কখনও লয়প্রাপ্ত হবে না। যার যৌবন কখনও ফুরাবে না। যার সৌন্দর্য ও কল্যাণ কখনও শেষ হবে না। তার বাতাস হবে মৃদুমন্দ। তার পানীয়ের মিশ্রণ হবে তাসনীমের। জান্নাতের বাসিন্দারা আরহামুর রাহিমিনের রহমতের ছায়ায় বসবাস করবে। সর্বদা তাঁর দীদার লাভে ধন্য হবে। সেখানে তাদের প্রার্থনা হবে— سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ ‘পবিত্র তোমার সত্তা হে আল্লাহ্!’ অভিবাদন হবে— سَلَامٌ। আর প্রার্থনার সমাপ্তি হবে— الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ ‘সমস্ত প্রশংসা বিশ্বপ্রতিপালক আল্লাহ্ ﷺ-র জন্য’।

তারা থাকবে এমন নেয়ামতপূর্ণ জান্নাতে, যা কোনোদিন কোনো চক্ষু দেখেনি; কোনো কান যার কোনো বর্ণনা শোনেনি; এমনকি কোনো মানুষের অন্তরে যার ধারণাও উদয় হয়নি। এ জান্নাতকে আল্লাহ্ ﷺ সৃষ্টি করেছেন তাঁর অনুগত বান্দাদের জন্য। তারা শ্রেণীবদ্ধভাবে সেখানে স্থান করে নিবে। তাদেরকে মোহরাঙ্কিত বিশুদ্ধ পানীয় পান করানো হবে। আপনি তাদের মুখমন্ডলে স্বাচ্ছন্দ্যের সজীবতা দেখতে পাবেন।

– তারা সেখানে কী পান করবে?
তারা পান করবে— পানি, শরাব, দুধ ও মধু। তাদের শরাব দুনিয়ার শরাবের মতো নয়। সুস্বাদু, যা পানকারীদের জন্য সুপেয়।

– তারা সেখানে কীসের দ্বারা বেষ্টিত থাকবে?
বালক ও চিরশিশুদের দ্বারা বেষ্টিত থাকবে।

– তাদের স্ত্রী হবে কারা?
তাদের স্ত্রী হবে আনতনয়না হুরগণ। প্রবাল ও পদ্মরাগ সদৃশ রমণীগণ। কোনো জিন ও মানব ইতিপূর্বে যাদের স্পর্শ করেনি। তারা বার্ধক্য থেকে চিরমুক্ত। তাঁবুতে অবস্থানকারিণী হুরগণ।

– তাদের কাছে কারা প্রবেশ করবে?
তাদের কাছে প্রবেশ করবেন ফেরেশতাগণ। প্রত্যেক দরজা দিয়ে উত্তমরূপে প্রবেশ করবেন। অতঃপর তাদের সালাম দিবেন।

এমন বাড়ির মূল্যায়ন করা কীভাবে সম্ভব, যা স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা নিজ হাতে তৈরি করেছেন? এবং যাকে তাঁর প্রিয় বান্দাদের জন্য আবাসস্থল বানিয়েছেন?! যাকে তাঁর রহমত ও মহত্ত্ব দ্বারা পূর্ণ করেছেন! এবং যার নেয়ামতের বর্ণনা দিয়েছেন ‘আল ফাওযুল আযীম’ তথা মহাসফলতা বলে! যার মালিক হওয়া সবচেয়ে বড় মালিকানা; এবং যাকে তিনি পবিত্র রেখেছেন যাবতীয় দোষত্রুটি থেকে?!

– আপনি যদি প্রশ্ন করেন, তার মাটি কী?
তার মাটি মেশক ও জাফরান।

– যদি প্রশ্ন করেন তার ছাদ কী?
তার ছাদ দয়াময় আল্লাহ্ ﷺ-র আরশ।

– যদি প্রশ্ন করেন তার কক্ষগুলো কীসের?
তার কক্ষগুলো মণি-মুক্তা ও হীরা-জহরতের।

– যদি প্রশ্ন করেন তার ইট কীসের?
তার একটি ইট সুবর্ণের আরেকটি ইট রূপার।

– যদি প্রশ্ন করেন তার গাছগুলো কীসের?
তার প্রতিটি গাছের গোড়া সুবর্ণের।

– যদি প্রশ্ন করেন তার ফল কেমন?
তার ফল মাখনের চেয়েও নরম, মধুর চেয়েও মিষ্টি। তদ্রূপ তার নদীগুলো কখনও পরিবর্তিত হবে না; আর তার নারীগণ সদা পবিত্র।

আল্লাহ্ ﷺ পবিত্র কুরআনের বহু জায়গায় জান্নাত ও জাহান্নামের নেয়ামত সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। উদাহরণস্বরূপ কিছু আলোচনা নিম্নরূপ—

وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ يُدْخِلْهُ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا ۚ وَذَٰلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ
আর যে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের আদেশমতো চলে, তিনি তাকে জান্নাতসমূহে প্রবেশ করাবেন, যেগুলোর তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হবে স্রোতস্বিনী। তারা সেখানে চিরকাল থাকবে। আর তা হচ্ছে মহাসফলতা। [সূরা নিসা: ১৩]

وَبَشِّرِ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ أَنَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهারُ ۖ كُلَّمَا رُزِقُوا مِنْهَا مِن ثَمَرَةٍ رِّزْقًا ۙ قَالُوا هَذَا الَّذِي رُزِقْنَا مِن قَبْلُ ۖ وَأُتُوا بِهِ مُتَشَابِهًا ۖ وَلَهُمْ فِيهَا أَزْوَاجٌ مُّطَهَّرَةٌ ۖ وَهُمْ فِيهَا خَالِدُونَ
আর [হে নবী!] যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে, আপনি তাদেরকে এমন জান্নাতের সুসংবাদ দিন, যার পাদদেশে প্রবাহমান থাকবে নহরসমূহ। যখনই তারা খাবার হিসেবে কোনো ফল প্রাপ্ত হবে, তখনই তারা বলবে, এ তো অবিকল সে ফলই যা আমরা ইতিপূর্বেও লাভ করেছিলাম। বস্তুত, তাদেরকে একই প্রকৃতির ফল প্রদান করা হবে; এবং সেখানে তাদের জন্য থাকবে পবিত্র রমণীকুল। আর সেখানে তারা অবস্থান করবে অনন্তকাল। [সূরা বাকারা: ২৫]

যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম সম্পাদন করে, আমি সৎকর্মশীলদের পুরস্কার নষ্ট করি না। তাদেরই জন্য আছে বসবাসের জান্নাত। তাদের পাদদেশে প্রবাহিত হয় নহরসমূহ। তাদের তথায় স্বর্ণালংকারে অলংকৃত করা হবে এবং তারা পাতলা ও মোটা রেশমের সবুজ কাপড় পরিধান করবে এমন অবস্থায় যে, তারা সিংহাসনে সমাসীন হবে। চমৎকার প্রতিদান এবং কত উত্তম আশ্রয়। [সূরা কাহাফ : ৩০-৩১]

নেয়ামতের উদ্যানসমূহ। মুখোমুখি হয়ে আসবে আসীন। তাদেরকে ঘিরে ঘিরে পরিবেশন করা হবে সুস্বাদু পানপাত্র। সুস্বাদু, যা পানকারীদের জন্য সুস্বাদু। তাতে মাথা ব্যথার উপাদান নেই এবং তারা তা পান করে মাতালও হবে না। তাদের কাছে থাকবে আনতনয়না, আয়তলোচনা তরুণীগণ। যেন তারা সুরক্ষিত ডিম! [সূরা সাফফাত : ৪০-৪৯]

নিশ্চয় খোদাভীরুরা নিরাপদ স্থানে থাকবে; উদ্যানরাজি ও নির্ঝরিণীসমূহে। তারা পরিধান করবে চিকন ও পুরু রেশমিবস্ত্র, মুখোমুখি হয়ে বসবে। এরূপই হবে এবং আমি তাদেরকে আনতলোচনা স্ত্রী দেব। তারা সেখানে শান্ত মনে বিভিন্ন ফল-মূল আনতে বলবে। তারা সেখানে মৃত্যু আস্বাদন করবে না, প্রথম মৃত্যু ব্যতীত এবং আপনার পালনকর্তা তাদেরকে জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করবেন। আপনার পালনকর্তার কৃপায় এটাই মহা সাফল্য। [সূরা দুখান : ৫১-৫৭]

আবু হুরায়রা (রা.)-র সূত্রে বর্ণিত দীর্ঘ এক হাদীসের এক পর্যায়ে তিনি বলেন— আমি প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! কী দিয়ে প্রাণী সৃষ্টি করা হয়েছে? তিনি বললেন, পানি দিয়ে। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, কী দিয়ে জান্নাত তৈরি করা হয়েছে? তিনি বললেন, সোনা-রূপার ইট দিয়ে। একটি রূপার ইট, তারপর একটি সোনার ইট— এভাবে গাঁথা হয়েছে। এর গাঁথুনির উপকরণ সুগন্ধি মৃগনাভি এবং কঙ্করসমূহ মণি-মুক্তার আর মাটি হচ্ছে জাফরান। জান্নাতে প্রবেশকারী লোক অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দে থাকবে। কোনো দুঃখ-কষ্ট ও অভাব-অনটন তাকে স্পর্শ করবে না। সে অনন্তকাল এতে অবস্থান করবে। কখনও মৃত্যুবরণ করবে না। না তার পরনের পোশাক পুরাতন হবে আর না তার যৌবন শেষ হবে। [সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৫২৬]

আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন— জান্নাতের প্রাসাদগুলো এমন হবে যে, এর ভিতর থেকে বাহিরের সবকিছু দেখা যাবে এবং এর বাহির থেকে ভিতরের সবকিছু দেখা যাবে। এক বেদুঈন উঠে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল, ইয়া রাসূলুল্লাহ! এসব প্রাসাদ কাদের জন্য? তিনি বললেন, যারা উত্তম ও সুমধুর কথা বলে, ক্ষুধার্তকে খাবার দেয়, প্রায়ই রোযা রাখে এবং লোকেরা রাতে ঘুমিয়ে থাকাবস্থায় জাগ্রত থেকে আল্লাহর জন্য নামায আদায় করে, তাদের জন্য। [সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৫২৭]

আবদুল্লাহ ইবনে কাইস তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, নবীজী (সা.) ইরশাদ করেছেন— জান্নাতে দু'টি বাগান আছে; যার সকল পাত্রসমূহ ও অন্যান্য সামগ্রী রূপা দিয়ে নির্মিত এবং আরও দু'টি বাগান আছে, যার পাত্রসমূহ ও এতে যা কিছু আছে সবই স্বর্ণ দিয়ে নির্মিত। আর 'আদন' নামক জান্নাতে মানুষ ও তাদের পালনকর্তার সাক্ষাতের মাঝে মহাপরাক্রমশালীর গৌরবের চাদর ছাড়া আর কিছুই অন্তরাল থাকবে না। [সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৫২৮]

উবাদা ইবনে সামেত (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবীজী (সা.) ইরশাদ করেছেন— জান্নাতের একশটি স্তর রয়েছে। প্রতি দুই স্তরের মাঝে আসমান-জমিনের সমান ব্যবধান বর্তমান। ফিরদাউস হচ্ছে সবচেয়ে উঁচু স্তরের জান্নাত। সেখান থেকে জান্নাতের চারটি ঝর্ণা প্রবাহিত হয় এবং এর উপরেই [আল্লাহর] আরশ স্থাপিত। অতএব, তোমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনার সময় ফিরদাউসের প্রার্থনাই করো। [সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৫৩৫]

আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবীজী (সা.) ইরশাদ করেছেন— কিয়ামতের দিন যে দলটি সর্বপ্রথম জান্নাতে প্রবেশ করবে, তাদের মুখমন্ডল হবে পূর্ণিমার রাতের চাঁদের মতো উজ্জ্বল, আর দ্বিতীয় দলের মুখমন্ডল হবে আকাশে মুক্তার ন্যায় ঝলমলে তারকার মতো উজ্জ্বল। তাদের মধ্যে প্রত্যেক পুরুষের জন্য দু'জন করে স্ত্রী থাকবে এবং প্রত্যেক স্ত্রীর সত্তরজোড়া জামা থাকবে। এই জামার ভিতর দিয়েও তাদের পায়ের জংঘার অস্থিমজ্জা দেখা যাবে। [সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৫৩৫]

আল্লাহ (সুব.) জান্নাতবাসীদের আর্থিক ও শারীরিক উভয় প্রকার নেয়ামত দান করবেন। তাদের আত্মারও নেয়ামতপ্রাপ্তি হবে, শরীরও নেয়ামতপ্রাপ্ত হবে। চিরকাল তারা এ নেয়ামতে থাকবে। সেখানে তাদের কোনো কষ্ট হবে না। তারা দুঃখী হবে না। অতএব, জান্নাতের এ সকল নেয়ামত নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলে এর ফলে গাফলতি দূর হয়ে যাবে। [ইনশাআল্লাহ]

তদ্রূপ জাহান্নামীদের জন্য আল্লাহ (সুব.) যেসব যন্ত্রণাদায়ক আযাব ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছেন, তা নিয়ে ভাবলেও গাফলতি দূর হয়ে যাবে। একটি বড় পাথর জাহান্নামের পাড় থেকে নিচে ছেড়ে দিলে সত্তর বছর যাবত তা নিচে পড়তে থাকবে। বান্দার উচিত, জাহান্নামীদের অবস্থা নিয়ে চিন্তা করা, যাদের পাগুলো বাঁধা কপালের সাথে। তাদের চেহারা কালো হয়ে যাবে গুনাহের অন্ধকারে। তারা জাহান্নামের পার্শ্বদেশ ও মধ্যস্থল থেকে চিৎকার করে করে বলবে— হে আমাদের মালিক! আপনার ওয়াদা [শাস্তি] আমাদের উপর সত্যরূপে বাস্তবায়িত হয়েছে। হে মালিক! আমাদের চামড়া জ্বলে গেছে। মালিক! আমাদের এখান থেকে বের করুন। আমরা আর কখনও অবাধ্যতায় ফিরে যাব না।

তখন তাদেরকে বলা হবে— না; না; অসম্ভব। এ লাঞ্ছনার আবাস থেকে তোমাদের কোনো মুক্তি নেই। তোমরা ধিকৃত অবস্থায় এখানেই পড়ে থাকো এবং আমার সাথে কোনো কথা বলো না। তখন তারা হতাশ হয়ে যাবে। আল্লাহর আদেশের অবাধ্যতার কারণে আফসোস-অনুশোচনা করতে থাকবে। কিন্তু তাদের সেদিনের সেই আফসোস ও অনুশোচনা তাদের কোনো উপকার করবে না; সেখান থেকে তাদের মুক্তি দিতেও পারবে না। বরং তাদেরকে জাহান্নামের আগুনে উপুড় করে ফেলা হবে। তারা চিৎকার করে বিলাপ করবে, আফসোস করবে। তাদেরকে অন্তহীন দুর্ভোগে নিক্ষেপ করা হবে। তাদের মাথার উপর ফুটন্ত পানি ঢেলে দেওয়া হবে। ফলে তাদের চামড়া ও তাদের পেটে যা কিছু থাকবে, তা ঝলসে যাবে। তাদের জন্য থাকবে লৌহ নির্মিত হাতুড়ি।

পিপাসায় তাদের কলজে ফেটে যাবে। চোখের মণি গলে গাল দিয়ে বেড়ে পড়বে। গালের গোশত খসে খসে পড়বে। তারা সেখানে মৃত্যু কামনা করবে, কিন্তু মরবে না। অগ্নিকুন্ডের আকার হবে বৃহদাকার প্রাসাদসম। অতএব, সে স্ফুলিঙ্গের নিক্ষেপ কেমন হবে?! কেমন হবে সেই আগুনের স্ফুলিঙ্গ?!

এ আগুন দুনিয়ার আগুনের তুলনায় সত্তর গুণ বেশি উত্তপ্ত হবে। কাফের তা অতি কষ্টে চুষে পান করবে। কিন্তু গলার ভিতরে প্রবেশ করতে পারবে না। সেখানে সে মৃত্যু কামনা করবে এবং সবদিক থেকে মৃত্যু তার কাছে আগমন করবে কিন্তু সে মরবে না। তাদের জামা হবে দাহ্য আলকাতরার এবং তাদের মুখমন্ডল আগুন আচ্ছন্ন করে রাখবে। তাদের জন্য থাকবে উপরের দিক থেকে আগুনের আচ্ছাদন এবং নিচের দিক থেকেও আগুনের আচ্ছাদন।

আল্লাহ (সুব.) পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন—

لَهُم مِّن جَهَنَّمَ مِهَادٌ وَمِن فَوْقِهِمْ غَوَاشٍ ۚ وَكَذَلِكَ نَجْزِي الظَّالِمِينَ
তাদের জন্য রয়েছে নরকীয় শয্যা এবং উপর থেকে চাদর। আমি এমনিভাবে জালিমদের শাস্তি প্রদান করি। [সুরা আরাফ: ৪১]

তারা কি জানে না, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতা করে, তার জন্য নির্ধারিত রয়েছে জাহান্নাম; সে সেখানে চিরকাল থাকবে। আর এটাই মহা-অপমান। [সুরা তাওবা : ৬৩]

তাদের পেছনে রয়েছে জাহান্নাম। তাতে পুঁজ মিশানো পানি পান করানো হবে। জোর করে তা পান করবে; এবং গলার ভিতর প্রবেশ করতে পারবে না। সব দিক থেকে তার কাছে মৃত্যু আগমন করবে কিন্তু সে মরবে না। তার পশ্চাতেও রয়েছে কঠোর আযাব। [সুরা ইবরাহীম : ১৬-১৭]

তাদের আবাসস্থল হচ্ছে জাহান্নাম। যখনই নির্বাপিত হওয়ার উপক্রম হবে তখনই আমি তাদের জন্য আগুন আরও বৃদ্ধি করে দিব। [সুরা বনী ইসরাঈল : ৯৭]

আগুন তাদের মুখমণ্ডল দগ্ধ করবে এবং তারা তাতে বীভৎস আকার ধারণ করবে। [সুরা মুমিনুন : ১০৪]

আর যারা অবিশ্বাসী হয়েছে, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন। তাদেরকে মৃত্যুর আদেশও দেওয়া হবে না যে তারা মরে যাবে এবং তাদের থেকে তার শাস্তিও লাঘব করা হবে না। আমি প্রত্যেক অকৃতজ্ঞকে এভাবেই শাস্তি দিয়ে থাকি। সেখানে তারা আর্ত চিৎকার করে বলবে, হে আমাদের পালনকর্তা! বের করুন আমাদেরকে, আমরা সৎকাজ করব, পূর্বে যা করতাম, তা করব না। [আল্লাহ বলবেন] আমি কি তোমাদেরকে এতটা বয়স দিইনি, যাতে যা চিন্তা করার বিষয় চিন্তা করতে পারতে? উপরন্তু তোমাদের কাছে সতর্ককারীও আগমন করেছিল। অতএব, [আজ জাহান্নামে] স্বাদ আস্বাদন করো। জালিমদের জন্য কোনো সাহায্যকারী নেই। [সুরা ফাতির : ৩৬-৩৭]

অতএব যারা কাফের, তাদের জন্য আগুনের পোশাক তৈরি করা হয়েছে। তাদের মাথার উপর ফুটন্ত পানি ঢেলে দেওয়া হবে। ফলে তাদের পেটে যা আছে, তা এবং চর্ম গলে বের হয়ে যাবে। তাদের জন্য আছে লোহার হাতুড়ি। তারা যখনই যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে জাহান্নাম থেকে বের হতে চাইবে, তখনই তাদেরকে তাতে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। বলা হবে, দহন শাস্তি আস্বাদন করো। [সুরা হজ্জ : ১৯-২২]

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন— যেদিন জাহান্নামকে উপস্থিত করা হবে, সেদিন তার সত্তর হাজার লাগাম থাকবে। প্রতিটি লাগামের জন্য নিয়োজিত থাকবে সত্তর হাজার ফেরেশতা। তারা সেগুলো ধরে তাকে টানতে থাকবে। [সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৮৪৩]

আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন— কেয়ামতের দিন জাহান্নাম থেকে একটি গর্দান [মাথা] বের হবে। এর দু’টি চোখ থাকবে যা দিয়ে সে দেখবে, দু’টি কান থাকবে যা দিয়ে সে শুনবে এবং একটি জিহ্বা থাকবে যা দিয়ে সে কথা বলবে। সে বলবে, তিন ধরনের লোকের জন্য আমাকে নিয়োজিত করা হয়েছে। [১] প্রতিটি অবাধ্য জালিমের জন্য। [২] আল্লাহ তায়ালার সাথে অন্য কোনো কিছুকে যে ব্যক্তি ইলাহ বলে ডাকে তার জন্য। [৩] ছবি নির্মাতাদের জন্য। [সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৫৭৪]

আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন— তোমাদের এই আগুন যা তোমরা প্রজ্জ্বলিত করো, তা জাহান্নামের আগুনের উত্তাপের সত্তর ভাগের এক ভাগ। সাহাবীগণ আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! এ আগুনই তো জাহান্নামীদের আযাবের জন্য যথেষ্ট ছিল। তিনি বললেন, এটাকে উনসত্তর গুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং প্রতিটি অংশের উত্তাপ এর সমান হবে। [সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৫৭৫]

এ সকল শারীরিক আযাব ছাড়াও সেখানে থাকবে আরও বিভিন্ন ধরনের মানসিক শাস্তি। যখনই কোনো দল তাতে প্রবেশ করবে, তখন অপর দলকে অভিশাপ দিবে। ফেরেশতারা তাদের তিরস্কার ও ভর্ৎসনা করবে— দুনিয়ার জীবনে তাদের শিথিলতা ও কমতির কারণে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px