📄 ২. দোয়ার মাধ্যমে
দোয়া গাফলতি দূর করতে অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা রাখে। বিশেষত মানুষ যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে বর্ণিত মাসূর ও সহীহ দোয়া-দরুদের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে এ ব্যাপারে প্রার্থনা করে। যেমন—
আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী কারীম ﷺ এ বলে দোয়া করতেন—
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْعَجْزِ وَالْكَسَلِ وَالْجُبْنِ وَالْهَرَمِ وَالْبُخْلِ وَالْفَقْرِ وَالْقِلَّةِ وَالذِّلَّةِ وَالْمَسْكَنَةِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْفَقْرِ وَالْكُفْرِ وَالشِّرْكِ وَالنِّفَاقِ وَالسُّمْعَةِ وَالرِّيَاءِ.
হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে অক্ষমতা, অলসতা, কৃপণতা, বার্ধক্য, নির্দয়তা, গাফলতি, লাঞ্ছনা ও নিঃস্বতা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করি। আমি আপনার কাছে আরও আশ্রয় প্রার্থনা করি দরিদ্রতা, কুফরি, শিরক, নিফাক, সুখ্যাতি কামনা ও রিয়া থেকে। [সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং ১০২০, মুসতাদরাকে হাকেম, হাদীস নং ১৯৪৪]
📄 ৩. কিয়ামুল লাইলের মাধ্যমে
আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেছেন—
مَنْ قَامَ بِعَشْرِ آيَاتٍ لَمْ يُكْتَبْ مِنَ الْغَافِلِينَ وَمَنْ قَامَ بِمِائَةِ آيَةٍ كُتِبَ مِنَ الْقَانِتِينَ وَمَنْ قَامَ بِأَلْفِ آيَةٍ كُتِبَ مِنَ الْمُقَنْطِرِينَ.
যে ব্যক্তি [রাতের নামাজে] দশটি আয়াত তিলাওয়াত করবে, তাকে গাফেলদের তালিকায় লিপিবদ্ধ করা হবে না। আর যে ব্যক্তি [রাতের নামাজে] এক শত আয়াত তিলাওয়াত করবে, তাকে অনুগত বান্দাদের তালিকায় লিপিবদ্ধ করা হবে। আর যে ব্যক্তি [রাতের নামাজে] এক হাজার আয়াত তিলাওয়াত করবে, তাকে অফুরন্ত পুরস্কারপ্রাপ্তদের তালিকায় লিপিবদ্ধ করা হবে। [সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ১৩৯৮]
📄 ৪. কবর যিয়ারতের মাধ্যমে
যে সকল বিষয় মানুষ থেকে গাফলতি দূর করে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে কবর যিয়ারত করা। কবর যিয়ারত গাফেলদের চোখ থেকে গাফলতের পর্দা সরিয়ে দেয়। যেমন— আনাস ইবনে মালেক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রথমে কবর যিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলেন। পরবর্তীতে ইরশাদ করেছেন—
أَلَا إِنِّي قَدْ كُنْتُ نَهَيْتُكُمْ عَنْ زِيَارَةِ الْقُبُورِ فَزُورُوهَا فَإِنَّهَا تُرِقُّ الْقَلْبَ وَتُدْمِعُ الْعَيْنَ وَتُذَكِّرُ الْآخِرَةَ.
ওহে! শুনে রাখো! আমি তোমাদেরকে কবর যিয়ারত থেকে নিষেধ করতাম। তারপর আমার কাছে স্পষ্ট হলো— কবর যিয়ারত অন্তরকে নরম করে, চোখকে অশ্রুসিক্ত করে, আখেরাতকে স্মরণ করিয়ে দেয়। অতএব, এখন তোমরা কবর যিয়ারত করো। [মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১৩০৭৯]
গাফেলদের ব্যাপারে প্রশ্নকারী কয়েকজন ব্যক্তির প্রতি আব্দুল আযীয বিন বায (রা)-এর যে সকল ওসিয়ত ছিল, তার মধ্যে অন্যতম ছিল— গাফেলদেরকে নিজেদের সঙ্গে কবর যিয়ারতে নিয়ে যাওয়া; এবং এ কাজটিকে তিনি ‘কল্যাণ ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে পরস্পরের প্রতি সহযোগিতা’ বলে গণ্য করেছেন।
📄 ৫. দুনিয়ার অবস্থা নিয়ে চিন্তা-ভাবনার মাধ্যমে
যে-ই দুনিয়ার অবস্থা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করবে, সে-ই দেখতে পাবে— দুনিয়ার সুখ-শান্তি ও ভোগ্য বিষয়গুলো স্থায়ী নয়। এখানকার আনন্দ-আহ্লাদ পঙ্কিলতায় দূষিত হয়। এখানে মানুষ সম্মান, স্থিতি ও স্বাচ্ছন্দ্যে থাকে; হঠাৎ বিপদ এসে আঘাত হানে। সুস্থ অবস্থার বিদায়ের পর অসুস্থতা ঘটে। ধনাঢ্যতার পর ফকিরিতে পরিণত হয়। ইজ্জত-সম্মানের পর লাঞ্ছনার শিকার হয়।
কখনও হঠাৎ মৃত্যু এসে যায়। কুটুম্বের মায়াজাল ছিন্ন করে বিদায় নিতে হয়। তারপর শুইয়ে দেওয়া হয় মাটির বালিশে। অতঃপর রেখে আসা হয় প্রতারণা জালে। দুনিয়ার সবচেয়ে বড় দোষ— সে নশ্বর; স্থায়ী নয়। প্রতিনিয়ত তার অবস্থায় পরিবর্তন হয়। এটিই তার ধ্বংসশীলতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। দুনিয়ার সুস্থতা অসুস্থতায়, অস্তিত্ব অনুপস্থিতিতে, যৌবন বার্ধক্যে, নেয়ামত দুর্দশায়, জীবন মৃত্যুতে, স্থাপনা ধ্বংসস্তূপে, ঐক্য ও একাত্মতা ফাটল ও বিচ্ছিন্নতায় পরিবর্তিত হয়।
হিন্দ বিনতে নুমান বলেন, আমি আমাদের দেখতাম, আমরাই মানুষের মাঝে সবচেয়ে বেশি সম্মানের অধিকারী; ক্ষমতা ও শক্তির দিক বিবেচনায় প্রবল। অতঃপর লক্ষ করলাম, সূর্য তখনও অস্ত যায়নি, এরই মধ্যে আমরা একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেলাম!...
এক ব্যক্তি তাকে তার নিজের ব্যাপারে কিছু বলতে অনুরোধ করল। তখন তিনি বললেন, আমরা এমন অবস্থায় দিন শুরু করেছি, যখন আমরাই শ্রেষ্ঠ। আরবের সবাই আমাদের পানে চেয়ে থাকত। অতঃপর আমরা এমন অবস্থায় সন্ধ্যায় উপনীত হলাম যে, সকল আরব আমাদের উপর দয়া করছে। [যাদুল মাআদ : ৪/১৭০]
অতএব, লক্ষ করুন, সকালে তাদের অবস্থা কেমন ছিল আর সন্ধ্যায় কী হয়ে গেল! এ ঘটনা অনেক বড় শিক্ষাপ্রাপ্তি ও উপদেশ লাভের মাধ্যম। কিন্তু আছে কি কোনো শিক্ষা গ্রহণকারী?!
এক ঈদুল আযহার দিন জাফর বারমাকীর মা উবাদা কিছু মানুষের কাছে গেলেন শরীর গরম করার জন্য ভেড়ার চামড়া আনতে। লোকজন তাকে জিজ্ঞাসা করল তার অতীত নেয়ামত সম্পর্কে। তখন তিনি বললেন, আমি অতীতে এমন ঈদের দিন সকাল করতাম, যখন আমার শিয়রের কাছে চার শ' পরিচারিকা দাঁড়িয়ে থাকত। [আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া : ১০/২৩৯]
লক্ষ করুন, আগের ঈদে ছিল তার এমন অবস্থা, আর পরবর্তী ঈদে তিনি শরীর গরম করার জন্য মানুষের কাছে ভেড়ার চামড়া চেয়ে বেড়াচ্ছেন।
এক নেককার ব্যক্তি বলেন, একদিন সকালে আমি কুফার একটি বাড়ির পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলাম। শুনতে পেলাম, ঘরের ভেতর থেকে এক যুবতী মেয়ে গাইছে—
أَلَا يَا دَارُ لَا يَدْخُلْكِ حُزْنٌ * وَلَا يَذْهَبْ بِبَاكِيكِ الزَّمَانُ
হে ঘর! তোমার ভেতর কখনও দুশ্চিন্তা-পেরেশানি প্রবেশ করবে না; যামানা তোমার অধিবাসীদের ছিনিয়ে নিতে পারবে না!
এরপর আমি আবার একদিন ওই ঘরের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলাম। তখন ঘরের দরজায় দুর্যোগ-দুর্বিপাক ও বিষন্নতার স্পষ্ট ছাপ লক্ষ করলাম। আমি লোকজনকে জিজ্ঞাসা করলাম, এদের কী হয়েছে? লোকজন জানাল, ঘরের কর্তা মৃত্যুবরণ করেছেন। আমি ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়ালাম। কড়া নাড়লাম। বললাম, একদিন আমি এ ঘরের ভেতর থেকে এক যুবতী মেয়ের কণ্ঠে শুনেছিলাম, সে বলছিল— হে ঘর! তোমার ভেতর কখনও দুশ্চিন্তা-পেরেশানি প্রবেশ করবে না; যামানা তোমার অধিবাসীদের ছিনিয়ে নিতে পারবে না! ঘরের ভেতর থেকে একজন নারী কেঁদে উঠলেন। অতঃপর বললেন, হে আল্লাহর বান্দা! নিঃসন্দেহে আল্লাহ ﷺ পরিবর্তন করেন; কিন্তু তিনি নিজে পরিবর্তন হন না। মৃত্যুই সকল সৃষ্টির চূড়ান্ত ফায়সালা। এরপর আমি তাদের কাছ থেকে ফিরে এলাম। তবে, আল্লাহর কসম! কাঁদতে কাঁদতে। [আল ই’তিবার লি ইবনি আবিদদুনিয়া : ৩৫]
নুমান ইবনে বাশীর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবূ বকর সিদ্দীক (রা) আমাকে ইয়ামানে পাঠান। এ সফরে একদিন আমরা পথ চলছিলাম। এক সময় আমরা এমন একটি গ্রামের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলাম, যার ঘর-বাড়ি ও স্থাপনাগুলো আমাদের বিস্মিত করল। আমাদের কেউ কেউ বলল, যদি আমরা এ গ্রামে প্রবেশ করতাম তাহলে এর বিচিত্র ফলমূল ও স্বাদ গ্রহণ করতে পারতাম!
এরপর আমরা তাতে প্রবেশ করলাম। আমি জীবনে যত গ্রাম দেখেছি, তার মধ্যে সৌন্দর্যের বিবেচনায় এটি সবচেয়ে বেশি সৌন্দর্যের অধিকারী। ওই গ্রামে এক সময় আমরা একটি সাদা প্রাসাদ দেখতে পেলাম। তার পাশে বৃক্ষরাজি আছে। পাশেই এক যুবতীর হাতে ছিল দফ। সে তা বাজাচ্ছিল আর গাইছিল—
হে হিংসুকের দল! তোমরা বিষন্নতায় মরো! আমরা এমনই থাকব যতদিন বেঁচে থাকি!
এরপর আমরা পানি ভর্তি একটি পুকুর দেখতে পেলাম। তার পাশেই বিভিন্ন প্রকার পশুপাখীতে পূর্ণ বিরাট এক আখড়া। উট, ঘোড়া, গরু, হাতি ইত্যাদি সবই আছে তাতে। তারপর দেখলাম একটি বৃত্তাকার প্রাসাদ। আমি আমার সাথিদের বললাম, যদি আমরা আমাদের বাহনগুলো কোথাও রাখতে পারতাম, তাহলে এ দৃশ্য দেখে চোখ জুড়িয়ে নিতে পারতাম। মনোবাঞ্ছা কিছুটা পূরণ করে নিতে পারতাম। যাইহোক, আমরা এক স্থানে আমাদের বাহনগুলো রাখলাম। এরই মধ্যে সাদা প্রাসাদের দিক থেকে একটি দল এগিয়ে আসতে লাগল। তাদের সকলের কাছে ছিল চাদর। তারা সেগুলো আমাদের জন্য বিছিয়ে দিল। তারপর আমাদের সামনে বিভিন্ন রকম খাবার ও রঙ-বেরঙের পানীয় পরিবেশন করল। আমরা কিছুক্ষণ বিশ্রাম করলাম এবং প্রাণবন্ত হলাম। এরপর আমরা রওয়ানা করার জন্য উদ্যোগী হলাম। এমন সময় একদল লোক এসে আমাদের বলল, এ গ্রামের সরদার আপনাদের সালাম জানিয়েছেন এবং বলেছেন— আমার পক্ষ থেকে কোনো ত্রুটি হয়ে থাকলে সে জন্য আমাকে অপারগ মনে করবেন এবং ক্ষমা করবেন। আমি আমাদের একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে ব্যস্ত আছি। এরপর আমরা তাদের জন্য দোয়া করলাম। তারা অবশিষ্ট খাদ্যগুলো আমাদের দিতে চাইল। সে খাবার দিয়ে আমরা আমাদের সফর পূর্ণ করলাম। এরপর আমি আমার সফর শেষ করলাম এবং ফিরে এলাম।
তারপর কেটে গেল কিছু কাল। এক সময় মুয়াবিয়া (রা) আবার আমাকে দায়িত্ব দিয়ে পাঠালেন। আমি আমার সাথিদের সেই গ্রাম ও গ্রামের অধিবাসীদের কথা জানালাম। আমার কথা শুনে আমার এক সাথী বললেন, এ রাস্তাটা কি সেদিকেই গেছে না? এ পথ দিয়ে কি আমরা সেখানে পৌঁছাতে পারব? আমরা সেখানে পৌঁছে দেখি, সবকিছু ভেঙে-চুরমার-বিধ্বস্ত ও বিরান হয়ে আছে। প্রাসাদটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে শুধু কয়েকটি চিহ্ন বহন করে চলছে। পুকুরটিতে পানি নেই এক ফোঁটাও। আর আস্তাবলটি শূন্য, প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। আমরা তখনও বিস্মিত অবস্থায় সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম। এমন সময় সাদা প্রাসাদটির এক কোণ থেকে একজন বৃদ্ধা উদয় হলেন। তাকে দেখে আমি আমার এক গোলামকে বললাম, তুমি তার কাছে যাও। গোলামটি তার কাছ থেকে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে ফিরে এল। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, কী হয়েছে তোমার? সে বলল, আমি তার কাছে গেলাম। গিয়ে দেখি সে একজন বৃদ্ধ মহিলা। সম্পূর্ণ অন্ধ। সে আমাকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে দিল। সে আমার উপস্থিতির টের পেয়ে বলল, তোমাকে যে সহীহ-সালামতে পৌঁছিয়েছেন তার দোহাই দিয়ে বলছি, আমাকে কবরে যাওয়া পর্যন্ত থাকতে দাও। অতঃপর বৃদ্ধ মহিলাটি বলল, এবার তোমার কিছু জানার থাকলে বলো।
আমি তাকে বললাম, তোমার পিতা-মাতা কোথায়? মহিলা জওয়াব দিল, তারা মারা গেছে। তাদের পর কেবল আমি একাই রয়ে গেছি। আমি তাকে বললাম, তোমার কি মনে আছে সে সময়ের কথা, যখন তোমাদের এখানে একটি বিয়ের অনুষ্ঠান হচ্ছিল? এবং সেখানে একটি মেয়ে দফ বাজিয়ে গাইছিল— হে হিংসুকদের দল! তোমরা বিষণ্ণতায় মরো! আমরা এমনই থাকব যতদিন বেঁচে থাকি! এবার সে ফুঁসিয়ে উঠল। কাঁদতে শুরু করল। চোখ থেকে অশ্রুর বন্যা বইতে লাগল। অতঃপর বলল, আল্লাহর কসম! আমি সেই বছর, সেই মাস, সেই দিন এবং সেই অনুষ্ঠানের কথা খুব ভালোভাবেই মনে করতে পারছি। যে গাইছিল সে ছিল আমার বোন। আর আমিই সেই দফ বাজাচ্ছিলাম। আমাদের সাথে কথা বলতে বলতে মহিলাটি কিছুটা ঝুঁকে পড়ল। মৃদু নড়াচড়া করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল। [আল-ই‘তিবার লি ইবনি আবিদদুনইয়া: ৪৭]
নিঃসন্দেহে দুনিয়ার ভালোবাসা দুনিয়াদারকে আগুনে নিক্ষেপ করে। আর দুনিয়াবিমুখতা ব্যক্তিকে জান্নাতে নিয়ে চলে। দুনিয়া শয়তানের মদ। যে এ মদে মাতাল হয়, মৃত্যু পর্যন্ত তার হুঁশ ফিরে না। হুঁশ ফিরে জীবন-মৃত্যুর মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে দুনিয়া-আখেরাত উভয় জগতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে! দুনিয়াতে সবাই মেহমান। দুনিয়ার ধন-সম্পদ ধার করা বস্তু। মেহমানকে চলে যেতে হয়, আর ধার করা বস্তু ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
দুনিয়ার মহব্বত সকল পাপের মূল। কারণ, দুনিয়ার মহব্বত দুনিয়াকে বড় করে দেখতে শেখায়; অথচ আল্লাহ ﷺ-র কাছে তা নিতান্তই নগণ্য; অতি তুচ্ছ। এ দুনিয়া আল্লাহ ﷺ-র কাছে অপছন্দনীয় ও অভিশপ্ত। আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি—
أَلَا إِنَّ الدُّنْيَا مَلْعُونَةٌ مَلْعُونٌ مَا فِيهَا إِلَّا ذِكْرُ اللَّهِ وَمَا وَالَاهُ وَعَالِمٌ أَوْ مُتَعَلِّمٌ.
জেনে রেখো! দুনিয়া অভিশপ্ত। দুনিয়ার সকল জিনিস অভিশপ্ত। তবে আল্লাহর যিকির ও তার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ অন্যান্য আমল এবং আলেম ও ইলম অন্বেষণকারী ব্যতীত। [সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৩২২, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৪১১১]
দুনিয়ার ভালোবাসা আখেরাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। দুনিয়া ও আখেরাত দুই সতীনীর মতো। একটি খুশি হলে অপরটি অবশ্যই অসন্তুষ্ট হয়। দুনিয়ার ভালোবাসা বান্দার মাঝে ও বান্দার জন্য আখেরাতে উপকারী বিষয়ের মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই দুনিয়া লাভের জন্য মেহনত করা মানুষের জন্য অনেক বড় গাফলতির পরিচায়ক; এবং এটি আখেরাতকেও ধ্বংস করে দেয়। অথচ মানব জানে, দুনিয়ার শেষ পরিণতি ধ্বংস। দুনিয়ার উপমা পেশ করতে গিয়ে ইউনুস ইবনে আবদুল আ‘লা বলেন, [পার্থিব জীবনের উপমা হচ্ছে] একজন ঘুমন্ত ব্যক্তির ন্যায়, যে ঘুমিয়ে তার পছন্দনীয় ও অপছন্দনীয় বিভিন্ন বিষয় দেখল; এরই মধ্যে সে জেগে উঠল। সেই জেগে ওঠাই হচ্ছে মৃত্যু।
অতএব, বান্দার উচিত, এ ধোঁকাপূর্ণ দুনিয়া সম্পর্কে সর্বদা সতর্ক থাকা। এর আনন্দ দুশ্চিন্তায় পরিণত হবে; এর সুস্থতা ও নির্মলতা পঙ্কিলতায় পর্যবসিত হবে। অতএব, সৃষ্টিকর্তা যদি এ দুনিয়া সম্পর্কে কোনো সংবাদ না-ও দিতেন, এর কোনো উপমা বর্ণনা না-ও করতেন, তবুও নিদ্রিতের জাগ্রত হওয়া এবং গাফেলের সতর্ক হওয়া উচিত ছিল; তবে এখন কী করা উচিত, যখন তিনি আমাদের স্পষ্টরূপে বর্ণনা করে দিয়েছেন যে, তাঁর কাছে এ দুনিয়া একটি মশার পাখার সমানও মূল্য রাখে না?! এরপরও কি ধোঁকাগ্রস্তরা মনে করবে— এ দুনিয়া চিরস্থায়ী?!