📄 ৬. আমলের তারতীব, ক্রমবিন্যাস ও স্তর নিরূপণে গাফলতি কেবল এগুলোর মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়
শরয়ী ইবাদতসমূহের সাওয়াব ও প্রতিদান বিভিন্ন দিক ও প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। সেগুলোর কোনো কোনোটি সাধারণভাবে উত্তম। কোনো কোনোটি সময় বিবেচনায় উত্তম। আবার কোনো কোনোটি স্থানের বিবেচনায় উত্তম। পবিত্র কুরআনের তিলাওয়াত সাধারণভাবে একটি উত্তম ইবাদত। তবে মসজিদে প্রবেশের সময় ‘মসজিদে প্রবেশের দো’য়া’ কুরআন তিলাওয়াতের উপর প্রাধান্য পাবে। তদ্রুপ মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় তার নির্ধারিত দো'য়া কুরআন তিলাওয়াতের উপর প্রাধান্য পাবে। তেমনিভাবে সকাল-সন্ধ্যায় পাঠ করার সুন্নাত ও মা'ছুর দো'য়া-যিকির নির্দিষ্ট স্থানে কুরআন তিলাওয়াতের উপর প্রাধান্য পাবে।
ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু [নফল] রোযা তেমন রাখতেন না। তিনি বলতেন, 'আমি রোযা রাখলে নামাযে দুর্বলতা চলে আসে। আমার কাছে [নফল] রোযার তুলনায় [নফল] নামায অধিক প্রিয়।' তিনি প্রতি মাসে তিনটি রোযা রাখতেন। [আল মু'জামুল কাবীর লিত্-তবারানী : ৮৮৬৯]
সাধারণত যে সকল আমলের উপকার নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তার উপকার অতিক্রমকারী ও সর্বব্যাপী হয়, তা ওই সকল আমলের চেয়ে উত্তম, যার উপকার কেবল আমলকারীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। সুতরাং, উপকারী ইলম শিক্ষা দেওয়া নফল নামায-রোযা থেকে উত্তম হবে— যদি নফল নামায-রোযা ইলম শিক্ষা দেওয়া থেকে বিরত রাখে। খুব কম মানুষই এ ব্যাপারে সতর্ক হয়। ফলে শয়তান এ সুযোগটাকে লুফে নেয়। অতঃপর বনী আদমকে উত্তম আমল থেকে বিমুখ করে অনুত্তম আমল বা সাধারণ কোনো আমলে লাগিয়ে রাখে।
অনেক সময় শয়তান বনী আদমকে একটিমাত্র মন্দ কর্মে লিপ্ত করার জন্য সত্তরটি ভালো কাজের আদেশ দেয়। অথবা সে সত্তরটি ভালো কাজে লিপ্ত করার মাধ্যমে বনী আদমকে অধিক উত্তম আমল ও মহান কাজ থেকে বিরত রাখে। এমনটাই বলেছেন আল্লামা ইবনুল কায়্যিম রহ.। [বাদায়িফুল ফাওয়াইদ : ২/৪৫২]
ইবনুল জাওযী রহ. বলেন, কোনো কোনো উলামায়ে কেরাম নফল নামায ও নফল রোযার তুলনায় দ্বীনী কিতাবাদি রচনা কিংবা উপকারী ইলম শিক্ষাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। কেননা, এগুলো এমন বীজ রোপণের নামান্তর, যার ফল ও উপকার অধিক হবে এবং যার উপকারিতার সময় ও ব্যাপ্তিও দীর্ঘ হবে। [হুক্কুল খাতির : ৪২]
এক রাতে ইবনে উসাইমীন রহ. এর দরসে মাগরিবের পর হঠাৎ থেমে গেলেন। তিনি তাঁর অভ্যাস মোতাবেক মাগরিবের পর দরস দিচ্ছিলেন। ছাত্ররা মাথা নীচু করে চুপ হয়ে বসে থাকল। অতঃপর তিনি বললেন, আমি আমার হাতে আলকাতরা পেলাম। অথচ ইতিপূর্বে আমি তা লক্ষ না করেই ওযু করেছি এবং নামায পড়ে দরস দিতে বসেছি। বিষয়টি আমি এখন লক্ষ করলাম। এরপর তিনি ছাত্রদের অনুমতি নিয়ে দরস থেকে উঠে চলে গেলেন। আলকাতরা পরিষ্কার করে পুনরায় ওযু করলেন। অতঃপর মাগরিবের নামায পুনরায় আদায় করলেন। কিন্তু তিনি মাগরিব-পরবর্তী নফল আদায় করলেন না। বরং দরসে এলেন এবং দরস সম্পন্ন করলেন।
এক ছাত্র তাঁকে প্রশ্ন করে জানতে চাইল— কেন তিনি মাগরিবের নফল পুনরায় আদায় করলেন না? ইবনে উসাইমীন রহ. জওয়াবে বললেন, বিবেচনা করলে [নফল নামাযের চেয়ে] ইলম চর্চাই উত্তম। ছাত্ররা জমা হয়ে বসে আছে; সময় বয়ে যাচ্ছে; তা ছাড়া এটি দরস দানেরই সময়। পক্ষান্তরে নফল [নামায বা ইবাদত]-এর ফায়দা কেবল তার আমলকারীর সাথেই সীমাবদ্ধ। তবে যদি উভয়টির মাঝে সমন্বয় করা সম্ভব হয়, তা হলে তা অতি উত্তম। কিন্তু তিনি দরস দানকে নফল থেকে উত্তম মনে করেছেন।
গাফলতি কেবল এগুলোর মাঝেই সীমাবদ্ধ নয় মানুষের উদাসীনতা ও গাফলতি কেবল বর্ণিত এ বিষয়গুলোর মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং মানুষ আরও বহু ক্ষেত্রে উদাসীনতা প্রদর্শন করে। যেমন, নিয়ত সহীহ করা, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করা, মানুষকে দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া, তারবিয়াত ও সংশোধন করা, বিভিন্ন নফল ইবাদত করা; যেমন, চাশত-ইশরাকের নামায, অন্যান্য সুন্নাত ও বিতর নামায, ফজরের নামাযের পর থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত মসজিদে বসে থাকা, ইলমী মজলিস ও ওয়া'যের মাহফিলে উপস্থিত হওয়া— ইত্যাকার আরও বহু ইবাদত-বন্দেগী ও নেক কাজে মানুষ গাফেল থাকে; উদাসীনতা প্রদর্শন করে।