📄 ৩. যিকিরে গাফলতি
আল্লাহর যিকির মুত্তাকীদের পাথেয়। নেককার-বুযুর্গগণ এ ব্যাপারে খুবই সচেতন। আল্লাহর যিকির অন্তরকে শক্তি, ধৈর্য ও দৃঢ়তা দান করে। এ যিকিরের মাধ্যমেই ঘটে পেরেশানি ও বিপদমুক্তি। যিকিরকারীগণ জান্নাতের বাগানে বিচরণকারী। যিকির অন্তর ও জবানের ইবাদত, ইবাদতকারীর ভূষণ, আল্লাহ্ ও তাঁর বান্দার মাঝে উন্মুক্ত এক রাজতোরণ!
বহু মানুষ সাধারণ ও বিশেষ উভয় প্রকার যিকিরের ব্যাপারেই চরম উদাসীন। রাত শেষে ভোর আসে, কিন্তু কেউ সকালের যিকির করে না। দিনের পর সন্ধ্যা নামে, কিন্তু কেউ কেউ সন্ধ্যার যিকির করে না। মসজিদে প্রবেশ করে, মসজিদ থেকে বের হয়, কিন্তু কিছু বলে না; কোনো দোয়া পাঠ করে না, যিকির করে না। নিজ ঘরে প্রবেশ করে এবং বের হয়, কিন্তু যিকিরে তার ঠোঁট নড়ে না। অনেকেই গাধার ডাক ও মুরগীর আওয়াজ শুনে, কিন্তু এ ডাক শুনলে পাঠ করার যে নির্ধারিত দোয়া আছে, তা পাঠ করে না। সুতরাং, এই যার অবস্থা, সে ওই সময় কীভাবে আল্লাহর যিকির করবে, যখন বৈধ চাহিদার বিষয় তার সামনে আসবে। যেমন, খাবারের চাহিদা কিংবা বিবাহ ও জৈবিক চাহিদা!! যে ব্যক্তি ইবাদতের ক্ষেত্রে যিকির থেকে গাফেল, সে তো চাহিদার ক্ষেত্রে—নিশ্চিত করে বলা যায়— গাফেল থাকবে।
যিকিরের ব্যাপারে উদাসীনতা ও গাফলতি অনেক বড় ক্ষতির কারণ। যেমন, আল্লাহ্ ﷺ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন—
فَوَيْلٌ لِّلْقَاسِيَةِ قُلُوبُهُم مِّن ذِكْرِ اللَّهِ أُوْلَئِكَ فِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ.
দুর্ভোগ তাদের জন্য, যাদের অন্তর আল্লাহর যিকির দ্বারা বিগলিত হয় না। তারা সুস্পষ্ট গোমরাহীতে রয়েছে। [সূরা যুমার : ২২]
অপর এক আয়াতে আল্লাহ্ ﷺ ইরশাদ করেছেন—
وَمَن يَعْشُ عَن ذِكْرِ الرَّحْمَنِ نُقَيِّضْ لَهُ شَيْطَانًا فَهُوَ لَهُ قَرِينٌ.
যে ব্যক্তি দয়াময় আল্লাহর যিকির থেকে চোখ ফিরিয়ে নেয়, আমি তার জন্য এক শয়তান নিয়োজিত করে দিই। অতঃপর সে-ই তার সঙ্গী হয়। [সূরা যুখরুফ : ৩৬]
অপর এক স্থানে তিনি ইরশাদ করেছেন—
وَمَن يُعْرِضْ عَن ذِكْرِ رَبِّهِ يَسْلُكْهُ عَذَابًا صَعَدًا.
আর যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার যিকির থেকে বিমুখ হয়, তিনি তাকে দুঃসহ শাস্তিতে প্রবেশ করাবেন। [সূরা জ্বিন : ১৭]
অপরদিকে যিকিরের আদেশ ও যিকিরের ফযীলত বর্ণনা করে বহু আয়াত নাযিল হয়েছে। যেমন, ইরশাদ করেছেন—
وَاذْكُرْ رَبَّكَ كَثِيرًا وَسَبِّحْ بِالْعَشِيِّ وَالْإِبْكَارِ.
বেশি বেশি আপন প্রভুর যিকির করো এবং সকাল-বিকাল তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা করো। [সূরা আলে ইমরান : ৪১]
অন্যত্র ইরশাদ করেছেন—
وَلِلَّهِ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى فَادْعُوهُ بِهَا.
আর আল্লাহর জন্য রয়েছে উত্তম নামসমূহ। কাজেই ওইসব নাম ধরেই তোমরা তাঁকে ডাকতে থাকো। [সূরা আরাফ : ১৮০]
আরেক আয়াতে ইরশাদ করেছেন—
وَلَذِكْرُ اللَّهِ أَكْبَرُ.
আর আল্লাহর যিকিরই সর্বশ্রেষ্ঠ। [সূরা আনকাবুত : ৪৫]
এ ধরনের আরও বহু আয়াতে আল্লাহ্ ﷺ তাঁর যিকিরের আদেশ ও ফযীলত বর্ণনা করেছেন। একইভাবে অসংখ্য হাদীসেও যিকিরের গুরুত্ব ও ফযীলত বর্ণিত হয়েছে। যেমন, আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ ইরশাদ করেছেন—
আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, আমি সেই রকমই, যে রকম বান্দা আমার প্রতি ধারণা করে। সে আমাকে স্মরণ করলে আমিও তাকে স্মরণ করি। আর যদি সে জনসমাবেশে আমাকে স্মরণ করে, তবে আমিও তাদের চেয়ে উত্তম সমাবেশে তাকে স্মরণ করি। যদি সে আমার দিকে এক বিঘত এগিয়ে আসে, তবে আমি তার দিকে এক হাত এগিয়ে যাই। যদি সে আমার দিকে এক হাত অগ্রসর হয়, আমি তার দিকে দুই হাত অগ্রসর হই। আর যদি সে আমার দিকে হেঁটে আসে, আমি তার দিকে দৌড়ে যাই। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৭৪০৫, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৬৭৫]
📄 ৪. সুরক্ষা দানকারী যিকিরের ব্যাপারে গাফলতি
আল্লাহ ﷺ কখনও কখনও গাফেলদেরকে কিছু বিপদ-আপদ ও বালা-মুসিবতের মাধ্যমে যিকির-আযকার ও মাসনূন দোয়া সম্পর্কে সতর্ক করেন। এর ফলে তখন তাদের যিকিরের কথা স্মরণ হয়। এমনকি তাদের কেউ কেউ বলে— হায়! যদি আমি অমুক অমুক যিকির ও দোয়া করতাম!
খাওলা বিনতে হাকীম আস-সুলামিয়াহ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছেন—
إِذَا نَزَلَ أَحَدُكُمْ مَنْزِلًا فَلْيَقُلْ أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ.
তোমাদের কেউ যখন কোনো ঘাঁটিতে [বা মঞ্জিলে] অবতরণ করে, তখন সে যেন এই দোয়া পড়ে—
‘আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ কালিমাসমূহের উসিলায় তাঁর সৃষ্টির অনিষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।’
তা হলে সে ওই স্থান ত্যাগ করা পর্যন্ত কোনো কিছুই তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৭০৮]
আবুল আব্বাস আহমাদ ইবনে উমর আল কুরতুবী রহ. বলেন, এটি সহীহ হাদীস, সত্য কথা। দলীল-প্রমাণ ও অভিজ্ঞতার আলোকে এটিকে আমরা সত্যই পেয়েছি। যখন থেকে এ হাদীসটি আমি জেনেছি, তখন থেকেই এর উপর আমল করেছি। অতঃপর কোনো কিছুই আমার কোনো ক্ষতি করতে পারেনি। এক রাতে বিছানায় একটি বিচ্ছু আমাকে দংশন করল। আমি আমাকে নিয়ে গভীরভাবে ভাবলাম। হঠাৎ মনে পড়ল, আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ কালিমাসমূহের উসিলায় প্রার্থনা করতে [অর্থাৎ এ দোয়া পাঠ করতে] ভুলে গেছি।
এমনি একটি ঘটনা আমি এক মদীনাবাসীর কাছেও শুনেছিলাম। ঘটনার সারাংশ এমন— ওই ব্যক্তি সফর থেকে ফেরার পথে নিজ শহরে যাওয়ার পূর্বে ৭০ কিলোমিটার দূরত্বে এই দোয়াটি পাঠ করেছিলেন। অতঃপর যখন তিনি নিজ শহরে পৌঁছলেন এবং মাথা থেকে মস্তকবন্ধনীটি খুললেন, তখন তাঁর ছেলে তাকে বলে, আব্বা! আপনার মাথায় কালো ও এই জিনিসটি কী? পিতা মাথা ঝাঁকালেন। দেখা গেল, ৭০ কিলোমিটার পর্যন্ত তিনি একটি বিচ্ছুকে মাথায় বহন করে এসেছেন। কিন্তু আশ্চর্য, এ দীর্ঘ সময়ে বিচ্ছুটি তাকে একটি কামড়ও দেয়নি বা তার কোনো ক্ষতি করেনি। তিনি বলেন, আমি মনে করি, নিজ শহর রওয়ানা দেওয়ার প্রাক্কালে আমি অমুক অমুক যে দোয়া পাঠ করেছিলাম, আল্লাহ ﷺ ওই দোয়ার বরকতে আমাকে হেফাজত করেছেন।
টিকাঃ
প্রাল মুফহিম লিমা আশকালা মিন তালখীসুল কিতাবি মুসলিম : ৭/৭৯, আর এটি তাঁর থেকে যুরকানী (রহ) বর্ণনা করেছেন ফায়যুল কদীর : ৫/৭৭৯২।
📄 ৫. নিয়তের আমল সম্পর্কে গাফলতি
উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি—
إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى.
যাবতীয় আমল নিয়তের উপর নির্ভরশীল। প্রত্যেক ব্যক্তি তা-ই পাবে, যা সে নিয়ত করবে। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১]
বহু মানুষ ওয়াজিব আদায়ের ক্ষেত্রেও নিয়তের কথা ভুলে যায়। এভাবে তাদের অনেক আমল বাতিল হয়ে যায়। কেননা, আমলের শুদ্ধি ও প্রতিদানপ্রাপ্তি নিয়তের উপর নির্ভরশীল। অনেক সময় মানুষ প্রতিদানপ্রাপ্তির নিয়তের ব্যাপারে উদাসীন থাকে। ফলে এ উদাসীনতা তাদেরকে বহু সাওয়াব ও প্রতিদান থেকে বঞ্চিত করে। কেননা, বান্দা যখন কোনো মুবাহ কাজের প্রতিদানের আশা রাখে, সেটি তখন তার রবের নৈকট্য লাভের সুন্দর মাধ্যমে পরিণত হয়।
অতএব, মানুষ যদি নিজ ঘরের প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র ক্রয়ের সময় নেকী অর্জনের নিয়ত রাখে, তা হলেও সে বহু প্রতিদান লাভে ধন্য হবে। তদুপরি যখন সে তার পরিবার-পরিজনের জন্য আবশ্যক বা অনাবশ্যক ব্যয় করার সময় সাওয়াবের নিয়ত করবে, তখনও সে বহু পুণ্যার্জনে সক্ষম হবে।
আবু মাসউদ আনসারী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—
إِذَا أَنْفَقَ الْمُسْلِمُ نَفَقَةً عَلَى أَهْلِهِ وَهُوَ يَحْتَسِبُهَا كَانَتْ لَهُ صَدَقَةً.
কোনো মুসলমান যখন তার পরিবার-পরিজনের জন্য খরচ করে এবং সাওয়াবের আশা রাখে, তখন সেটা তার জন্য সদকা হিসেবে পরিগণিত হয়। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫৫]
অনেক সময় মানুষ তার ভাই-বন্ধু বা পরিচিত জনের সঙ্গে বেশ হাস্য-রসিকতা ও কৌতুক করে। এতে হয়তো তার ভাইয়ের অন্তরে আনন্দ দেওয়ার নিয়ত থাকে অথবা আনন্দ বা বেদনা—কোনোটাই নিয়ত থাকে না। [এ কাজগুলি যদি সে করে তার ভাইয়ের অন্তরে আনন্দ দেওয়ার উদ্দেশ্যে সাওয়াব লাভের আশা নিয়ে, তা হলে এর বিনিময়েও সে প্রতিদান পাবে।]
বরং একজন মানুষ তার সঙ্গীর সঙ্গে আমোদ-প্রমোদের বিনিময়েও সাওয়াব লাভ করবে, যদি তার নিয়ত সঠিক থাকে। আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী কারীম ﷺ ইরশাদ করেছেন— তোমাদের সঙ্গীদের সাথে মিলনেও রয়েছে সদকা। সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাদের কেউ তার জৈবিক চাহিদা পূরণ করবে আর এ জন্য সে সাওয়াবের হকদার হবে? তখন নবীজী ﷺ বললেন, তোমরা কি মনে করো—যদি সে তা সম্পাদন করে হারাম পথে, তা হলে কি তার পাপ হবে? অনুরূপভাবে যদি সে তা সম্পাদন করে হালাল পথে, তা হলে সে সাওয়াবের হকদার হবে। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০০৬]
ইমাম নববী রহ. বলেন, এ হাদীস প্রমাণ করে— সাধারণ বৈধ ও মুবাহ কাজগুলো ইবাদতে পরিণত হবে সঠিক নিয়তের ফলে। অতএব, স্ত্রীর সাথে মিলনও ইবাদতে পরিণত হবে, যদি তাতে স্ত্রীর হক আদায় করা, আল্লাহ ﷺ-র আদেশ মোতাবেক তার সাথে উত্তম আচরণ করা, নেক সন্তান তালাশ করা ইত্যাদি নিয়ত থাকে; কিংবা নিজেকে ও সঙ্গীকে হারাম কর্ম থেকে পুত-পবিত্র রাখা, উভয়ের দৃষ্টি হারাম থেকে বাঁচানো ইত্যাদি উত্তম কোনো নিয়ত থাকে। [শরহুন নববী আলা মুসলিম : ৭/৭২]
সাঈদ ইবনু জুবাইর বলেন— ছোট আমলকে সঠিক নিয়ত অনেক বড় বানিয়ে দেয়। আবার বড় বড় আমলকে নিয়তের ত্রুটি অতি তুচ্ছ বানিয়ে দেয়। এমনটাই বলেছেন ইবনুল মোবারক রহ.। [আল-ইখলাস ওয়া আন-নিয়্যাহ: ৭০]
আবু মুসা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন— নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু মুসাকে ইয়ামানে পাঠালেন।... তারা উভয়ে রওয়ানা হয়ে গেলেন [একত্র পথ চলছিলেন; পথিমধ্যে] মুয়ায আবু মুসাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কীভাবে কুরআন তিলাওয়াত করেন? আবু মুসা জওয়াব দিলেন, দাঁড়িয়ে, বসে, সওয়ারীর পিঠে সওয়ার অবস্থায় এবং কিছুক্ষণ পরপরই তিলাওয়াত করি। [জওয়াব শুনে] মুয়ায বললেন, আর আমি [রাতের প্রথম দিকে] ঘুমিয়ে পড়ি, তারপর উঠি [রাতের শেষ ভাগে তিলাওয়াতের জন্য নামাযে দাঁড়াই]। আমি মনে করি, আমার ঘুমও আমার দাঁড়ানো কালের ইবাদতের মতো বলে পরিগণিত হবে। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪০৪৫]
মুয়ায রাদিয়াল্লাহু আনহু-র উক্তি— ‘আমি মনে করি, আমার ঘুমও আমার দাঁড়ানো কালের ইবাদতের মতো বলে পরিগণিত হবে’ এ ব্যাপারে ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বলেন, তিনি আরাম ও বিশ্রামের মধ্যেও সাওয়াবের প্রত্যাশা করেন, যেমন সাওয়াবের প্রত্যাশা করেন কষ্টের মাঝে। কেননা, আরাম ও বিশ্রামের দ্বারা যদি উদ্দেশ্য হয় ইবাদতের জন্য শক্তি সঞ্চয় করা ও প্রফুল্লতা অর্জন করা, তা হলে সেই বিশ্রাম ও আরামের বিনিময়েও সাওয়াব লাভ হবে। [ফাতহুল বারী : ৮/৬২]
ইমাম নববী রহ. বলেন, এর অর্থ হচ্ছে— আমি ঘুমাই ইবাদতের জন্য শক্তি সঞ্চয়ের উদ্দেশ্যে; আল্লাহকে ইবাদতের জন্য প্রাণবন্ত করার মানসে; নফসকে ইবাদতের জন্য প্রফুল্ল করার নিয়তে। অতএব, আমি এ বিশ্রাম ও আরামের মাঝেও তেমনই সাওয়াবের প্রত্যাশা করি, যেমন সাওয়াবের প্রত্যাশা করি আমার দাঁড়ানোতে। [শরহুন নববী আলা মুসলিম : ১৯/২০৯]
যার ধ্যান-জ্ঞান ও সার্বক্ষণিক ফিকির হয় আল্লাহ্ তাআ'লা ও আখেরাতের জন্য, এমন ব্যক্তির অবস্থা সম্পর্কে আল্লামা ইবনুল কায়্যিম রহ. বলেন, তার অবস্থার পরিবর্তন হয় এই ভিত্তিতে যে, কোনটির মধ্যে তার রবের সন্তুষ্টি রয়েছে। এমন ব্যক্তি যেকোনো বৈধ কাজকে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে ইবাদতে পরিণত করে থাকে; যদিও তা স্বাভাবিক ও স্বভাবসুলভ কোনো কাজ হয়। তার মাধ্যমে সে তার রবের সন্তুষ্টি লাভের চেষ্টা ও প্রার্থনা করে। এককথায়, প্রথমে সে যেকোনো কাজের প্রতি উৎসাহ দানকারী বিষয়ের সামনে দাঁড়ায়; তারপর বিষয়টি নিয়ে ভাবে ও নিরীক্ষণ করে। অতঃপর সে তাতে এমন একটি পন্থা ও পদ্ধতি বের করে, যার মাধ্যমে সে তার রবের দিকে চলতে পারে। ফলে এই কাজটিই তার জন্য ইবাদত ও আনুগত্যে পরিণত হয়। [তরীকুল হিজরাতাইন : ৩৩২]
সারকথা : মানুষ প্রতিদিন বিভিন্ন কাজে বের হয়; বহু কাজে লিপ্ত হয়। পানাহার করে, ঘুমায়, হাসি-তামাশা করে, কথাবার্তা বলে, বেচাকেনা ও লেনদেন করে— ইত্যাদি। কিন্তু এ কাজগুলো করার ক্ষেত্রে গাফেলদের অন্তরে একবারও এই খেয়াল আসে না যে, এ কাজগুলোর শুরুতে সঠিক নিয়ত করে নিই। পক্ষান্তরে যারা ইবাদতগুজার, তারা যেকোনো কাজ শুরু করার পূর্বে অন্তরে সে বিষয়ের সঠিক নিয়ত তালাশ করে; যা তাদের কাজগুলোকে সঠিক করে দেয় এবং স্বাভাবিক ও সাধারণ কাজগুলোকেই ইবাদতে পরিণত করে দেয়।
📄 ৬. আমলের তারতীব, ক্রমবিন্যাস ও স্তর নিরূপণে গাফলতি কেবল এগুলোর মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়
শরয়ী ইবাদতসমূহের সাওয়াব ও প্রতিদান বিভিন্ন দিক ও প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। সেগুলোর কোনো কোনোটি সাধারণভাবে উত্তম। কোনো কোনোটি সময় বিবেচনায় উত্তম। আবার কোনো কোনোটি স্থানের বিবেচনায় উত্তম। পবিত্র কুরআনের তিলাওয়াত সাধারণভাবে একটি উত্তম ইবাদত। তবে মসজিদে প্রবেশের সময় ‘মসজিদে প্রবেশের দো’য়া’ কুরআন তিলাওয়াতের উপর প্রাধান্য পাবে। তদ্রুপ মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় তার নির্ধারিত দো'য়া কুরআন তিলাওয়াতের উপর প্রাধান্য পাবে। তেমনিভাবে সকাল-সন্ধ্যায় পাঠ করার সুন্নাত ও মা'ছুর দো'য়া-যিকির নির্দিষ্ট স্থানে কুরআন তিলাওয়াতের উপর প্রাধান্য পাবে।
ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু [নফল] রোযা তেমন রাখতেন না। তিনি বলতেন, 'আমি রোযা রাখলে নামাযে দুর্বলতা চলে আসে। আমার কাছে [নফল] রোযার তুলনায় [নফল] নামায অধিক প্রিয়।' তিনি প্রতি মাসে তিনটি রোযা রাখতেন। [আল মু'জামুল কাবীর লিত্-তবারানী : ৮৮৬৯]
সাধারণত যে সকল আমলের উপকার নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তার উপকার অতিক্রমকারী ও সর্বব্যাপী হয়, তা ওই সকল আমলের চেয়ে উত্তম, যার উপকার কেবল আমলকারীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। সুতরাং, উপকারী ইলম শিক্ষা দেওয়া নফল নামায-রোযা থেকে উত্তম হবে— যদি নফল নামায-রোযা ইলম শিক্ষা দেওয়া থেকে বিরত রাখে। খুব কম মানুষই এ ব্যাপারে সতর্ক হয়। ফলে শয়তান এ সুযোগটাকে লুফে নেয়। অতঃপর বনী আদমকে উত্তম আমল থেকে বিমুখ করে অনুত্তম আমল বা সাধারণ কোনো আমলে লাগিয়ে রাখে।
অনেক সময় শয়তান বনী আদমকে একটিমাত্র মন্দ কর্মে লিপ্ত করার জন্য সত্তরটি ভালো কাজের আদেশ দেয়। অথবা সে সত্তরটি ভালো কাজে লিপ্ত করার মাধ্যমে বনী আদমকে অধিক উত্তম আমল ও মহান কাজ থেকে বিরত রাখে। এমনটাই বলেছেন আল্লামা ইবনুল কায়্যিম রহ.। [বাদায়িফুল ফাওয়াইদ : ২/৪৫২]
ইবনুল জাওযী রহ. বলেন, কোনো কোনো উলামায়ে কেরাম নফল নামায ও নফল রোযার তুলনায় দ্বীনী কিতাবাদি রচনা কিংবা উপকারী ইলম শিক্ষাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। কেননা, এগুলো এমন বীজ রোপণের নামান্তর, যার ফল ও উপকার অধিক হবে এবং যার উপকারিতার সময় ও ব্যাপ্তিও দীর্ঘ হবে। [হুক্কুল খাতির : ৪২]
এক রাতে ইবনে উসাইমীন রহ. এর দরসে মাগরিবের পর হঠাৎ থেমে গেলেন। তিনি তাঁর অভ্যাস মোতাবেক মাগরিবের পর দরস দিচ্ছিলেন। ছাত্ররা মাথা নীচু করে চুপ হয়ে বসে থাকল। অতঃপর তিনি বললেন, আমি আমার হাতে আলকাতরা পেলাম। অথচ ইতিপূর্বে আমি তা লক্ষ না করেই ওযু করেছি এবং নামায পড়ে দরস দিতে বসেছি। বিষয়টি আমি এখন লক্ষ করলাম। এরপর তিনি ছাত্রদের অনুমতি নিয়ে দরস থেকে উঠে চলে গেলেন। আলকাতরা পরিষ্কার করে পুনরায় ওযু করলেন। অতঃপর মাগরিবের নামায পুনরায় আদায় করলেন। কিন্তু তিনি মাগরিব-পরবর্তী নফল আদায় করলেন না। বরং দরসে এলেন এবং দরস সম্পন্ন করলেন।
এক ছাত্র তাঁকে প্রশ্ন করে জানতে চাইল— কেন তিনি মাগরিবের নফল পুনরায় আদায় করলেন না? ইবনে উসাইমীন রহ. জওয়াবে বললেন, বিবেচনা করলে [নফল নামাযের চেয়ে] ইলম চর্চাই উত্তম। ছাত্ররা জমা হয়ে বসে আছে; সময় বয়ে যাচ্ছে; তা ছাড়া এটি দরস দানেরই সময়। পক্ষান্তরে নফল [নামায বা ইবাদত]-এর ফায়দা কেবল তার আমলকারীর সাথেই সীমাবদ্ধ। তবে যদি উভয়টির মাঝে সমন্বয় করা সম্ভব হয়, তা হলে তা অতি উত্তম। কিন্তু তিনি দরস দানকে নফল থেকে উত্তম মনে করেছেন।
গাফলতি কেবল এগুলোর মাঝেই সীমাবদ্ধ নয় মানুষের উদাসীনতা ও গাফলতি কেবল বর্ণিত এ বিষয়গুলোর মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং মানুষ আরও বহু ক্ষেত্রে উদাসীনতা প্রদর্শন করে। যেমন, নিয়ত সহীহ করা, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করা, মানুষকে দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া, তারবিয়াত ও সংশোধন করা, বিভিন্ন নফল ইবাদত করা; যেমন, চাশত-ইশরাকের নামায, অন্যান্য সুন্নাত ও বিতর নামায, ফজরের নামাযের পর থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত মসজিদে বসে থাকা, ইলমী মজলিস ও ওয়া'যের মাহফিলে উপস্থিত হওয়া— ইত্যাকার আরও বহু ইবাদত-বন্দেগী ও নেক কাজে মানুষ গাফেল থাকে; উদাসীনতা প্রদর্শন করে।