📄 ৬. খেলাধুলা ও ক্রীড়া
খেলাধুলা ও ক্রীড়া গাফলতির বড় বড় কারণসমূহের অন্যতম। এজন্যই নবীজী ﷺ তাঁর যামানায় বিদ্যমান খেলাধুলার কোনো কোনোটিতে লিপ্ত হতে নিষেধ করেছেন এবং তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন—এগুলো গাফলতের অন্যতম কারণ। যেমন, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—
মَنْ سَكَنَ الْبَادِيَةَ جَفَا وَمَنْ اتَّبَعَ الصَّيْدَ غَفَلَ وَمَنْ أَتَى السُّلْطَانَ افْتَتَنَ
যে মরুভূমিতে বসবাস করে, তার অন্তর কঠিন হয়ে যায়। যে শিকারের পিছনে ছুটে, সে গাফেল হয়ে যায়। আর যে রাজা-বাদশাহর কাছে আসা-যাওয়া করে, সে ফেতনায় পতিত হয়। [সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ২৮৫৬]
ইবনে হাজার আসকালানী বলেন, বর্ণিত হাদীসটি ওই ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যে এ সকল কাজে সর্বদা লিপ্ত থাকে। ফলে এগুলো তাকে দ্বীনি ও অন্যান্য কল্যাণকর যাবতীয় বিষয় থেকে গাফেল ও উদাসীন করে দেয়। [ফাতহুল বারী : ৯/১৮২]
অতএব, যে ব্যক্তি এ সকল কাজে সর্বতোভাবে লিপ্ত হয়ে পড়বে এবং এগুলোই তার ধ্যান-ধারণায় পরিণত হবে, অচিরেই তার অন্তর পরিপূর্ণরূপে গাফেল হয়ে যাবে। সে নামাযের কথা ভুলে যাবে; আল্লাহ -র স্মরণের কথা ভুলে যাবে; আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করা, নামাযের জামাতে শরিক হওয়া ইত্যাদি সকল ভালো ও পূণ্যকর্মের কথা বিস্মৃত হয়ে যাবে।
এখানে লক্ষণীয়, শিকারের বহু স্বাস্থ্যগত ও শারীরিক বিভিন্ন উপকার রয়েছে। যেমন, শরীর শক্ত সুগঠিত ও মজবুত হয়, যা জিহাদের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতে কাজে লাগে। তা সত্ত্বেও যদি শিকার করা বা শিকারের পিছনে ছোটা গাফলতের কারণ হয়, তা হলে বর্তমান যামানায় প্রচলিত ইলেকট্রনিক গেমসের ব্যাপারে কী বলা যেতে পারে? আমাদের বর্তমান যামানায় প্রচলিত ইলেকট্রনিক গেমগুলো সব দিক দিয়েই অত্যন্ত ক্ষতিকর; গাফলতের অনেক বড় কারণ ও উপকরণ। একেকটি গেমসের একের পর এক স্টেজ বা পর্ব অনবরত তৈরি হতে থাকা তা একজন মানুষকে পরিপূর্ণরূপে আসক্তি ও গাফলতিতে ডুবিয়ে রাখার জন্য একাই যথেষ্ট। অন্য কিছুর দরকার নেই। এ গেমগুলোর কারণে মানুষের বহু মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। মানুষকে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ সময় দ্বীনী-দুনিয়াবী যাবতীয় বিষয়ে একেবারেই গাফেল করে রাখে। এককথায়, জীবনের অপূরণীয় ক্ষতি করে থাকে। গেমস নির্মাতারা কোম্পানিগুলো সর্বদা নিজেদের মধ্যে এই প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকে, যেন তাদের গেমসগুলোই বাজার দখল করে রাখতে পারে; তাদের গেমসগুলোই যেন সর্বাধিক বিক্রির শীর্ষে থাকে। তা হলে একবার ভেবে দেখুন, কী হতে পারে এ গেমগুলোর প্রকৃতি?
আর এ গেমগুলো আমাদের শিশু-কিশোর ও যুবকদের কী পরিমাণ সময় নষ্ট করে দিচ্ছে?!
বর্তমানে প্রচলিত গেমসমূহের অনেকগুলোই এক-দুই ঘন্টায় শেষ হয় না। বরং কোনো কোনোটি এক-দুই দিনেও শেষ হয় না। আবার কোনো কোনোটি পুরো সপ্তাহ বা তার চেয়েও বেশি সময় নিয়ে নেয়। আর কোনো কোনোটি শেষ করতে সময় লেগে যায় পুরো এক মাস বা তারও অধিক!
তা ছাড়া একবার দুইবার বা স্বাভাবিক চেষ্টা-প্রচেষ্টায় এ গেমসমূহের শেষ পর্যন্ত যাওয়া যায় না। এগুলোর শেষ পর্যন্ত যেতে হলে, একজন খেলোয়াড়কে গেমসে বিজয়ী হতে হলে অনবরত অনুশীলন ও চেষ্টা চালিয়ে যেতে হয়। বরং বলা ভালো, খেলোয়াড়দের জন্য পরিপূর্ণ অধ্যাবসায় ও একাগ্রতার প্রয়োজন হয়। তারপরেই কেবল শেষ পর্যন্ত যাওয়া যায়।
এখানেই শেষ নয়। কোনো খেলোয়াড় যদি উপরোক্ত সকল বিষয়ে মনোযোগী হয়ে এবং জীবনের বহু মূল্যবান সময় নষ্ট করে কোনোভাবে শেষ পর্যন্ত পৌঁছেই যায়, তা হলে গেমস নির্মাতা কোম্পানিগুলো তার দ্বিতীয় পর্ব বাজারে ছাড়ে! তারপর তৃতীয় পর্ব! তারপর পরবর্তী পর্ব... এভাবে চলতেই থাকে। এক পর্বের পর আরেক পর্ব! আমাদের সন্তানরা পুরনো খেলার পর নতুন আরেক খেলার নেশায় মেতে ওঠে! এভাবে তারা সময় নষ্ট ও জীবন ধ্বংসের অন্তহীন এক পথে এগিয়ে চলছে!!
গেমসের প্রতি মানুষের এ দুর্নিবার আগ্রহ ও নেশা দেখে তার সুবিধা ভোগ করছে কিছু কিছু স্যাটেলাইট চ্যানেল। বিশেষ কিছু চ্যানেল তৈরি হয়েছে ইলেকট্রনিক গেমসগুলোকে কেন্দ্র করে। তারা সেখানে নিয়মিত গেমসের সর্বশেষ ভার্সন ও গেম হারাবার প্রচার করে। সেগুলো কীভাবে খেলতে হয় তার টিপস ও অন্যান্য খুঁটিনাটি বিষয়েও সকলকে তালিম দিয়ে থাকে!!
প্রশ্ন : এ গেমগুলো থেকে আমাদের সন্তানরা কী ফায়দা পাচ্ছে?
উত্তর : এই গেমগুলো থেকে আমাদের সন্তানদের স্নায়ুচাপ বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যের অবনতি, দৃষ্টিশক্তি-হ্রাস, চিন্তার অক্ষমতা ইত্যাদি মারাত্মক ক্ষতির বিষয়গুলি ছাড়া আর কিছুই পাচ্ছে না। তা ছাড়া একটানা দীর্ঘক্ষণ নিশ্চিন্তচিত্তে স্ক্রিনের সামনে বসে থাকার ফলে আরও বহু ধরনের উদাসীনতা ও চিন্তার দুর্বলতা সৃষ্টি হয়।
হায়! যদি এগুলোর ক্ষতি এ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকত! কিন্তু আরও ভয়ংকর কথা হচ্ছে, এ গেমগুলো আমাদের কোমলমতি সন্তানদের মনে শিরক ও কাফের-মুশরিকদের প্রতি ভালোবাসার বীজ বপন করে দিচ্ছে!!
- কীভাবে?
একবার এক মা তার ছোট বাচ্চাকে গেমস খেলতে নিষেধ করছিল। কিন্তু ছেলেটি চিৎকার করে বলে উঠল— আমাকে ছেড়ে দাও! আমাকে খেলতে দাও! আমি আর কখনো গির্জায় প্রবেশ করব না!
- মা তো অবাক! গেমসের সাথে গির্জার কী সম্পর্ক?!
ঘটনা হচ্ছে— গেমটিতে খেলোয়াড় যদি কোনো পর্বের কোথাও গিয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে বা লেভেল নিচে নেমে আসে, তা হলে সে নিজের আত্মশক্তি বৃদ্ধি ও সজীবতা লাভের জন্য গির্জায় প্রবেশ করে। গির্জায় প্রবেশ করলে সে সুস্থ ও সবল হয়ে ওঠে। অতঃপর নতুন উদ্যমে বাকি অংশ বা পর্ব চালিয়ে যেতে পারে!
প্রিয় পাঠক!
এরপরও কি আমরা অবহেলা করব?! আমাদের সন্তানদের এ মারাত্মক ক্ষতির ব্যাপারে উদাসীন থাকব?? এরপরও কি আমরা প্রশ্ন করব— এ গেমগুলো থেকে আমাদের সন্তানদের কী ফায়দা হচ্ছে?!
- শুধু তাই নয়, এ প্রশ্ন করারও তো আর কোনো সুযোগ নেই— এ গেমগুলো কি আমাদের সন্তানদের কোনো ক্ষতি করছে?!!
এ গেমগুলো আমাদের সন্তানদের কত নামায নষ্ট করেছে, জীবনের কত সময়, কত দীর্ঘ সময় আল্লাহ ﷻ-র যিকির ও স্মরণ থেকে এবং তাঁর আনুগত্য থেকে গাফেল রেখেছে, তার কোনো হিসাব নেই; কোনো ইয়ত্তা নেই।
- এ গেমগুলো কি আমাদের সন্তানদের কুরআন হিফজ করা থেকে গাফেল রাখছে না?!
- পিতামাতার আনুগত্য থেকে বিমুখ রাখছে না!
বরং এগুলো তো তাদেরকে দৈনন্দিন আহার-বিহার থেকেও গাফেল রাখছে! যা তাদের সুস্থতা ও সুষম বুদ্ধির জন্য অন্যতম শর্ত।
📄 ৭. বিনোদন ও বিলাসিতা
বর্তমানে আমোদ-প্রমোদ, আনন্দ-বিনোদন ও শৌখিনতা একটি শিল্পে পরিণত হয়েছে। এর ফলে মানুষ যারপরনাই গাফলত ও উদাসীনতায় জীবন যাপন করছে।
এ সকল বিনোদনের তালিকায় আছে— আনন্দভ্রমণ, বড় বড় হোটেল, উন্নত ও বৈচিত্র্যপূর্ণ রিসোর্ট, নানা রকম খাবার, যা প্রস্তুত করতে এবং খেতে আজ মানুষ বহু মূল্যবান সময় অকাতরে নষ্ট করে চলছে!
আপনি বাজারগুলোর দিকে তাকান। তা হলে দৈনন্দিন খাবার-দাবার ক্রয় ও তার ব্যবস্থাপনার জন্য মানুষের ব্যস্ততার পরিধি অনুমান করতে পারবেন।
📄 ৮. দুনিয়ার প্রতি ঝোঁক
কোনো সন্দেহ নেই—দুনিয়ার ভালোবাসা ও দুনিয়ার প্রতি ঝুঁকে পড়া গাফলতির অন্যতম কারণ। কেননা, এ ভালোবাসা ও ঝুঁকে পড়া মানুষকে তার নিজের নফসের হিসাব নিতে দেয় না। বরং মানুষের আশাকে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ ও অন্তহীন করে তোলে এবং তাকে মিথ্যা আশায় আশান্বিত করে থাকে; তার জীবনধারা বিলাস থেকে আরও বিলাসী করতে থাকে।
সে যদি তার অন্তর থেকে দুনিয়ার মোহ ও ভালোবাসা বের করে দিতে পারত, তা হলে সে আল্লাহ্ ও আখিরাত থেকে কখনোই গাফেল হতো না। এভাবে তার আশা-আকাঙ্ক্ষা ও প্রবৃত্তির চাহিদাকে লাগামহীন ছেড়ে দিত না। পাশাপাশি সে এ-ও বুঝতে পারত, দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী, এটা থাকার জায়গা নয়; বরং অতিক্রমের একটি মাধ্যম মাত্র।
📄 ৯. বাতিল ও গাফেলদের সঙ্গে মেলামেশা
বাতিলদের সাথে ওঠাবসা, চলাফেরা, মেলামেশা গাফলতির অন্যতম কারণ। যেমন, আল্লাহ্ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন—
وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُم بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ وَلَا تَعْدُ عَيْنَاكَ عَنْهُمْ تُرِيدُ زِينَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَلَا تُطِعْ مَنْ أَغْفَلْنَا قَلْبَهُ عَن ذِكْرِنَا وَاتَّبَعَ هَوَاهُ وَكَانَ أَمْرُهُ فُرُطًا
আপনি নিজেকে তাদের সংসর্গে আবদ্ধ রাখুন, যারা সকাল-সন্ধ্যায় তাদের পালনকর্তাকে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে আহ্বান করে এবং আপনি পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য কামনা করে তাদের থেকে নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে নিবেন না। আপনি তার আনুগত্য করবেন না, যার অন্তরকে আমার স্মরণ থেকে গাফেল করে দিয়েছি, যে নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং যার কার্যকলাপ হচ্ছে সীমা অতিক্রম করা। [সুরা কাহাফ : ২৮]
অপর এক আয়াতে তিনি ইরশাদ করেছেন—
وَلَا تَكُونُوا۟ كَالَّذِينَ نَسُوا۟ ٱللَّهَ فَأَنَسَىٰهُمْ أَنفُسَهُمْ ۚ أُو۟لَٰٓئِكَ هُمُ ٱلْفَٰসِقُونَ
তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যারা আল্লাহকে ভুলে গেছে! ফলে আল্লাহও তাদেরকে আত্মবিস্মৃত [গাফেল] করে দিয়েছেন। তারাই ফাসেক-অবৈধ। [সুরা হাশর : ১৯]
অর্থাৎ তোমরা আল্লাহ্ কে ভুলে যেও না! অন্যথায় কেয়ামত দিবসে যে আমলে সালেহ তোমাদের উপকারে আসবে, তা তোমাদের ভুলিয়ে দেওয়া হবে। অর্থাৎ তোমাদেরকে নেক আমলের তাওফীক দেওয়া হবে না।
তাই আল্লাহ্ বলেন, ‘তারাই ফাসেক-অবৈধ’ অর্থাৎ যারা আল্লাহ্ -র কথা ভুলে যায়, তারা ফাসেক তথা আল্লাহ্ -র না-ফরমান। কেয়ামতের দিন তাদের ধ্বংস অনিবার্য। যেমন, অপর এক আয়াতে আল্লাহ্ বলেন—
হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহ্ স্মরণ থেকে গাফেল না করে। যারা এমন করবে, তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত। [সুরা মুনাফিকুন : ৯]