📄 ১. দৈহিক আরাম-আয়েশের পিছনে পড়ে থাকা
বহু মানুষ তাদের সারাদিনের অধিকাংশ সময়ই ব্যয় করে ফেলে দৈহিক আরাম-আয়েশ ও সুখ জোগানের পিছনে। অথচ তারা জানে না, যে আরাম-আয়েশ ও সুখের পিছনে তারা হন্য হয়ে ছুটেছে, তা প্রকৃতপক্ষে তাদের কষ্ট ও ক্ষতিরই কারণ। প্রকৃত আরাম-আয়েশ ও সুখ তো লাভ হয় নফসকে ঈমানী ফযীলতপূর্ণ কাজে লিপ্ত রাখলে এবং ইসলামী আখলাক অর্জনে সচেষ্ট থাকলে।
কবি বলেছেন-
يَا مُتْعِبَ الْجِسْمِ كَمْ تَسْعَى لِرَاحَتِهِ * أَفْنَيْتَ جِسْمَكَ فِيمَا فِيهِ خُسْرَانُ
أَقْبِلْ عَلَى الرُّوحِ وَاسْتَكْمِلْ فَضَائِلَهَا * فَأَنْتَ بِالرُّوحِ لَا بِالْجِسْمِ إِنْسَانُ
ওহে দেহ ক্লান্তকারী! তুমি এ দেহের আরাম-আয়েশের জন্য কতই না কষ্ট করছ! তুমি তোমার দেহকে এমন জিনিসের জন্য শ্রান্ত করছ, যাতে রয়েছে তোমার ক্ষতি। এবার তুমি রুহের দিকে মনোনিবেশ কর এবং তার সৌন্দর্যগুলো পূর্ণ কর; কেননা, রুহের কারণেই তুমি মানুষ; দেহের কারণে নয়।
📄 ২. পার্থিব ভোগ-বিলাসের প্রতি লোভ
পার্থিব আরাম-আয়েশ ও ভোগ-বিলাসের প্রতি লোভ মানুষকে আল্লাহ ও আখিরাত থেকে গাফেল করে দেয়। এর কারণেই ফরয-ওয়াজিব অবশ্যকর্তব্য কর্ম ছুটে যায় এবং মানুষ হারাম ও নিষিদ্ধ বিষয়ে নিপতিত হয়।
نَهَارُكَ يَا مَغْرُورُ سَهْوٌ وَغَفْلَةٌ * وَلَيْلُكَ فِيمَا تَقَضَّى الْعُمْرُ تَقْضِي الْأَيَّامُ
وَتَذْهَبُ فِيمَا سَوْفَ تَصْغُرُ هِمَّتُهُ * كَمَا ذَهَبَتْ فِي الدُّنْيَا لَذَّاتُهُ لِلنَّائِمِ
ওহে প্রতারিত! তোমার দিন কাটে ভুলে ও গাফলতিতে! তোমার রাত কেটে যায় ঘুমে, অথচ মৃত্যু তোমার জন্য অবধারিত। তুমি পরিশ্রম কর এমন জিনিসের জন্য, যার পরিণতি অচিরেই তুমি অপছন্দ করবে। আরো এভাবে তো জীবন যাপন করে চতুষ্পদ জন্তু।
এ শ্রেণির লোকেরা দুনিয়ার সব রকমের ও সব ধরনের ভোগ-উপভোগের প্রতি আসক্ত ও লালায়িত থাকে। সেসব থেকে যা তাদের সাধ্যি কুলায় এবং যা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়, তাতে সর্বদা ডুবে থাকে। এভাবে এক পর্যায় তাদের আত্মাই মরে যায়। ফলে আল্লাহ (সুব.)-র সরল পথ ও তাঁর সাক্ষাৎ থেকে গাফেল হয়ে যায়।
ওলীদ ইবনে মুগীরা, উমাইয়া ইবনে খালাফ এবং আস ইবনে ওয়াইল ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদের ধন-সম্পদ অকাতরে খরচ করেছিল।
فَلَا تُعْجِبْكَ أَمْوَالُهُمْ وَلَا أَوْلَادُهُمْ ۚ إِنَّمَا يُرِيدُ ٱللَّهُ لِيُعَذِّبَهُم بِهَا فِى ٱلْحَيَوٰةِ ٱلدُّنْيَا
অতএব, তারা ধন-সম্পদ ব্যয় করতেই থাকবে। অতঃপর তা তাদের মনতাপের কারণ হবে। তারপর তারা পরাজিত হবে। [সুরা আনফাল : ৩৬]
অথচ বহু মুসলমান কৃপণতা করে তাদের ধন-সম্পদ সঞ্চয় করছে এবং সেগুলোকে কল্যাণকর কাজে ব্যয় করে না।
অপর দিকে হাজারো মুসলমান এমন আছে, যারা দিনে এক ঘণ্টাও কাজ করে না। তাদের একমাত্র কাজ হচ্ছে খেল-তামাশা, হাসি-মজাক আর খেয়ে-দেয়ে ঘুমিয়ে সময় নষ্ট করা।
তোমাদের কী হলো, তোমাদেরকে যখন বলা হয় যে, তোমরা আল্লাহর রাস্তায় অভিযানে বের হও, তখন তোমরা ভারাক্রান্ত হয়ে মাটিতে ঝুঁকে পড়? [সূরা তাওবা : ৩৮]
উমর (রা) দিন-রাত কাজ করতেন। খুব সামান্য পরিমাণই ঘুমাতেন। একবার তাঁর পরিবারের লোকেরা তাঁকে জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি ঘুমান না কেন?’ তিনি উত্তর দিলেন, ‘আমি যদি [ইবাদত বাদ দিয়ে] রাতে ঘুমিয়ে থাকি, তা হলে আমার আত্মা ধ্বংস হয়ে যাবে, আর যদি দিনে [প্রজাদের খোঁজ-খবর না নিয়ে] ঘুমিয়ে থাকি, তা হলে আমার প্রজারা ধ্বংস হয়ে যাবে।’
ইহুদী গুপ্ত ঘাতক মুরদাইয়ানের মারাত্মক গ্রন্থ ‘তলোয়ার ও শাসন’ থেকে জানা যায়, সে সর্বদাই চলাফেরায় ও কর্মব্যস্ত থাকত। আজ এ দেশে তো কাল আর এক দেশে; আজ এ শহরে তো কাল অপর শহরে ছুটে বেড়াত। বিভিন্ন সভা ও সেমিনারে যোগ দিত। কনফারেন্সে অংশগ্রহণ করত। সর্বদা চুক্তি ও সন্ধি করে বেড়াত। এরই মাঝে সে আবার তার ডায়েরিও লিখত।
আমি মনে মনে বললাম, হায় আফসোস! এক অভিশপ্ত ইহুদী কী পরিশ্রমটাই না করে গেছে! আর মুসলমান কতটা অপারগ ও অকর্মণ্য হয়ে বসে আছে! এ-ও পাপীদের চেষ্টা-মেহনত ও ঈমানদারদের দুর্বলতা ও অপারগতার একটি উদাহরণ।
গাফলতি, অলসতা, অকর্মণ্যতা ও বেকার থাকাকে উমর (রা) এত বেশি ঘৃণা করতেন যে, যেসব যুবক মসজিদে বসে অলস সময় পার করত, তিনি তাদেরকে মসজিদ থেকে বের করে দিয়েছিলেন। তিনি তাদেরকে শাস্তি দিয়ে বলেছিলেন, ‘যাও! বাইরে গিয়ে রিজিক তালাশ কর। কারণ, আকাশ থেকে সোনা-রূপার বৃষ্টি বর্ষিত হবে না।’
অলসতা, অকর্মণ্যতা ও বেকারত্ব—হতাশা, দুশ্চিন্তা ও বিভিন্ন মানসিক রোগের জন্ম দেয়। পক্ষান্তরে কাজকর্ম তৃপ্তি ও সুখ বয়ে আনে। সমস্ত মানুষই যদি আপন আপন জীবনের দায়িত্ব ও কাজকর্ম আঞ্জাম দিতে থাকে, তা হলে উপরোল্লিখিত যাবতীয় রোগ সমূলে বিনাশ হয়ে যাবে। সমাজ উন্নত, উৎপাদনশীল ও সমৃদ্ধ হবে।
وَعَلَى اللَّهِ فَتَوَكَّلُوا
আর তুমি বলে দাও, তোমরা কাজ করে যাও। [সূরা তাওবা : ১০৫]
فَانْتَشِرُوا فِي الْأَرْضِ
তোমরা [রিজিক তালাশের জন্য] জমিনে ছড়িয়ে পড়। [সূরা জুমুআ : ১০]
وَسَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِنْ رَبِّكُمْ وَجَنَّةٍ
তোমরা তোমাদের প্রভুর ক্ষমা ও জান্নাতের জন্য একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা কর। [সূরা হাদীদ : ২১]
রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন— ‘আল্লাহর নবী দাউদ আলাইহিস সালাম নিজ হাতের উপার্জন খেতেন।’
শায়ের রাশেদ তাঁর اِخْزَاعَةُ صَنَاعَةٌ নামক কিতাবে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, বহু মানুষ তাদের জীবনের যিম্মাদারী ও দায়িত্বসমূহ আদায় করে না। কত মানুষ জীবিত থাকা সত্ত্বেও মৃত। তারা জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে সম্পূর্ণরূপে অজ্ঞ। না তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে না জাতির জন্য কল্যাণকর কোনো কাজ করে। বরং—
তারা পেছনে রয়ে যাওয়া লোকদের সঙ্গে থেকে যেতে পেরে আনন্দিত হয়েছে। [সূরা তাওবা : ৮৭]
لَا يَسْتَوِي الْقَاعِدُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ غَيْرُ أُولِي الضَّرَرِ وَالْمُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ
যেসব মুমিন অক্ষম নয় অথচ ঘরে বসে থাকে এবং যারা আল্লাহর পথে নিজেদের জান-মাল নিয়ে জিহাদ করে, তারা সমান নয়। [সূরা নিসা : ৯৫]
যে কুরাইজা নারী মসজিদে নববী পরিষ্কার করত, সে তার জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবগত ছিল এবং সাহায্যকারী হিসেবে সে নিজের কর্তব্য আঞ্জাম দিয়েছিল। বিনিময়ে জান্নাত লাভ করেছিল।
অবশ্যই একজন মুমিন দাসী একজন মুশরিক নারী থেকে উত্তম, যদিও মুশরিক নারীর রূপ তোমাদেরকে বিমোহিত করে। [সূরা বাকারাহ : ২২১]
অনুরূপভাবে যে ছেলেটি নবীজী (সা)-র মিম্বার বানিয়ে দিয়েছিল, সে-ও তার সাধ্যানুসারে অবদান রেখেছিল। কেননা, সে কাঠমিস্ত্রির কাজ করত। সে-ও তার কর্মের প্রতিদান পেয়েছিল।
আর যারা তাদের শ্রম ছাড়া অন্য কিছু [আল্লাহর পথে ব্যয় করার মতো] পায় না। [সূরা তাওবা : ৭৯]
যে ব্যক্তি মৃত ছিল [অর্থাৎ আধ্যাত্মিকভাবে মৃত ছিল] পরে আমি তাকে জীবিত করেছি এবং আমি তার জন্য আলো সৃষ্টি করেছি, যার সাহায্যে সে মানুষের মাঝে চলাফেরা করে, সে কি তার মতো যে [কুফরী] অন্ধকারে নিমজ্জিত? [সূরা আনআম : ১২২]
বিপদ-আপদে, বালা-মুসিবতে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা ও নিজের যাবতীয় কাজ সুষ্ঠুভাবে আঞ্জাম দেওয়া সংক্রান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উপকারী দু'টি দোয়া পবিত্র হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। যার একটি হচ্ছে আলী (রা) থেকে বর্ণিত, যেখানে রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন—
اللَّهُمَّ اهْدِنِي وَسَدِّدْنِي
হে আল্লাহ! আমাকে হেদায়েত দান করুন এবং সঠিক পথ প্রদর্শন করুন। [সহিহ জামেউস সগীর]
দ্বিতীয়টি ইমাম আবূ দাউদ (র) বর্ণনা করেছেন, সুহাইন ইবনে উবাইদ (রা) থেকে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) তাকে বলেছেন—
قُلْ : اللَّهُمَّ أَلْهِمْنِي رُشْدِي ، وَقِنِي شَرَّ نَفْسِي.
তুমি বলো, হে আল্লাহ! আপনি আমাকে আমার হেদায়েতের দিশা দান করুন এবং আমাকে আমার প্রবৃত্তির অনিষ্ট থেকে রক্ষা করুন। [জামেউল আদিয়াহ : ৪৭০২৪]
দুনিয়ার জীবনের প্রতি আসক্তি, দীর্ঘ জীবনের আকাঙ্ক্ষা এবং মৃত্যুর ভয়—এগুলি এমন বিষয়, ফলে দুশ্চিন্তা, উদ্বিগ্নতা, নিরাপত্তাহীনতা, হতাশা, অস্থিরতাসহ বিভিন্ন ধরনের মানসিক রোগের জন্ম হয়।
পার্থিব জীবনের প্রতি ইহুদীদের চরম আসক্তির কারণে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) তাদের নিন্দা করেছেন। যেমন, পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে—
তুমি অবশ্যই তাদেরকে [অর্থাৎ ইহুদীদেরকে] জীবনের প্রতি সকল মানুষের চেয়ে বেশি এমনকি মুশরিকদের চেয়েও বেশি লোভী দেখতে পাবে। তাদের প্রত্যেককে আকাঙ্ক্ষা করে যে, যদি তাকে হাজার বছরের দীর্ঘ জীবন দান করা হতো! [তবে কতই না ভালো হতো] কিন্তু দীর্ঘ জীবন তো তাদেরকে শাস্তি থেকে রেহাই দিতে পারবে না। আর তারা যা করছে আল্লাহ তাআলা তার সবকিছুই দেখেন। [সূরা বাকারাহ : ৯৬]
এ আয়াতের কয়েকটি বিষয় গুরুত্বের সাথে লক্ষ্যণীয়। যেমন,
প্রথমত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) এ আয়াতে কারীমায় حَيَاةٍ [হায়াত] শব্দটিকে تَنكِير [অনির্দিষ্ট বিশেষ্য] রূপে উল্লেখ করেছেন। যা এ কথা বোঝায় যে, সাধারণ থেকে অতি সাধারণ জীবন, তুচ্ছ থেকে অতি তুচ্ছ এমনকি হীন জীবন হলেও সে জীবন ইহুদীদের কাছে খুব প্রিয়।
দ্বিতীয়ত, ‘হাজার বছর’ কথাটিকে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) এজন্য নির্বাচন করেছেন যে, ইহুদীরা একে অপরের সঙ্গে সাক্ষাৎকারকালে ‘হাজার বছর বেঁচে থেকো’ বলে অভিবাদন জানাত। এখানে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) তাদের সে কথাই উল্লেখ করে বুঝিয়ে দিচ্ছেন যে, তারা এমন দীর্ঘ জীবন কামনা করে! আচ্ছা! যদি তারা হাজার বছরের দীর্ঘ জীবন পেয়েও যায়, তারপর কী হবে? পরিণতি তো সেই জাহান্নামই।
আখেরাতের শাস্তি অবশ্যই সবচেয়ে বেশি অপমানের। আর তাদেরকে কোনো রূপ সাহায্য করা হবে না। [সূরা হা-মীম-সাজদা : ১৬]
নিচের এই আরবী প্রবাদটি কতই না সুন্দর—
لَا هَمَّ وَاللَّهُ يُدْعَى
যখন আল্লাহকে আহ্বান করা হয়, তখন দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই।
এর অর্থ হচ্ছে আসমানে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আছেন, যিনি বান্দার দোয়া শোনেন; যিনি আহ্বানকারীর আহ্বানে সাড়া দেন। তা হলে কেন আর দুশ্চিন্তা? কেন এত পেরেশানী?
আপনি যদি আপনার যাবতীয় বিষয়াদি আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা)-র কাছে সোপর্দ করে দেন, তা হলে তিনি তার সমাধান করে দিবেন। আপনার দুশ্চিন্তা ও পেরেশানী দূর করে দিবেন।
[তোমাদের খেতাবগান ভালো] না কি তিনি ভালো, যিনি বিপদগ্রস্তের ডাকে সাড়া দেন এবং বিপদ দূর করেন? [সূরা নামল : ৬২]
আর আমার বান্দারা যখন তোমার কাছে জিজ্ঞাসা করে আমার ব্যাপারে, বস্তুত আমি রয়েছি সন্নিকটে। যারা প্রার্থনা করে তাদের প্রার্থনা কবুল করি, যখন তারা আমার কাছে প্রার্থনা করে। [সূরা বাকারাহ : ১৮৬]
একজন আরব কবি বলেছেন—
‘যেই ব্যক্তি কতই না উত্তমরূপে তার উদ্দেশ্য লাভ করতে পারে। আর যে অনবরত দরজায় কড়া নাড়ে, সে কতই না উত্তমরূপে ভিতরে প্রবেশ করতে পারে।’
📄 ৩. গুনাহের কারণে অনুভূতির মৃত্যু
গুনাহ্ করতে করতে বহু গাফেল ও উদাসীন লোকের অনুভূতিরাই মৃত্যু ঘটে। তাদের বোধ-বুদ্ধি ও বিবেচনাশক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়। এমনকি এক পর্যায়ে পৌঁছে তারা মনে করে—তারা অনেক বড় কল্যাণের উপরই প্রতিষ্ঠিত আছে। অতঃপর কোনো এক সময় যদি তাদের গুনাহ-খাতা ও কৃতকর্মের প্রকৃত রূপ নিজেদের সামনে পরিষ্কার হয়ে যায়, তখন বিস্ময়ের শেষ থাকে না।
শুনে রাখ! আল্লাহর কসম! যদি মানুষ জানত তাদেরকে কী উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে, তা হলে তারা কখনও গাফেল হতো না, ঘুমাতে পারত না। তাদেরকে যে জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, যদি তারা তা অন্তর চোখ দিয়ে দেখতে পেত, [উপলব্ধি করতে সক্ষম হতো], তা হলে তারা দিশেহারা ও উন্মত্ত হয়ে যেত! [কারণ, তাদের সামনে রয়েছে] মৃত্যু, কবর, তারপর হাশর, অতঃপর নিন্দা-ভৎসনা ও কঠিন শাস্তির ভয়। [আল-মুরদিশ শি ইবনিল জাওযী : ১২২]
📄 ৪. প্রবৃত্তির অনুসরণ
প্রবৃত্তির অনুসরণ মানুষকে আল্লাহ ও আখেরাত থেকে গাফেল করে দেয়। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন—
পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সামনে দণ্ডায়মান হওয়াকে ভয় করেছে এবং প্রবৃত্তি থেকে নিজেকে নিবৃত্ত রেখেছে; তার ঠিকানা হবে জান্নাত। [সূরা নাযিআত : ৪০-৪২]
আল্লাহ প্রবৃত্তির অনুসরণকে হকপরিপন্থী বলে সাব্যস্ত করেছেন এবং তাকে গোমরাহির একটি প্রকার বলে আখ্যায়িত করেছেন। যেমন, পবিত্র কুরআনে তিনি ইরশাদ করেছেন—
হে দাউদ! আমি তোমাকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছি। অতএব, তুমি মানুষের মাঝে সুবিচার কর এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না। কেননা, তা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে দিবে। নিশ্চয় যারা আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত হয়, তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি—এ কারণে যে, তারা হিসাবদিবসকে ভুলে যায়। [সূরা ছু-দ : ২৬]
এ আয়াত থেকে আমরা বুঝতে পারলাম, যারা প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, তারা মূলত আল্লাহ ও আখেরাত থেকে বিচ্যুতি ও গাফলতের পথে চলে। অতএব, মানুষকে তার প্রবৃত্তির অনুসরণ করা থেকে সম্পূর্ণরূপে বেঁচে থাকতে হবে, যাতে সে গাফেলদের অন্তর্ভুক্ত হতে না যায়।