📄 ভূমিকা
الْحَمْدُ لِلّٰهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ، وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلٰى أَشْرَفِ الْمُرْسَلِيْنَ، نَبِيِّنَا مُحَمَّدٍ وَعَلٰى آلِهِ وَأَصْحَابِهِ أَجْمَعِيْنَ.
হামদ ও সালাতের পর!
গাফলতি এমন এক মারাত্মক রোগ, এ রোগে যখন কেউ আক্রান্ত হয়, তার দুনিয়া-আখিরাত উভয়ই বরবাদ হয়ে যায়। যেমন, আল্লাহ ﷻ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন—
وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ نَسُوا اللَّهَ فَأَنْسَاهُمْ أَنْفُسَهُمْ أُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যারা আল্লাহকে ভুলে গেছে; ফলে আল্লাহও তাদেরকে আত্মবিস্মৃত [গাফলত] করে দিয়েছেন। তারাই তো ফাসেক-পাপাচারী। [সূরা হাশর : ১৯]
তা হলে—
– গাফলতি কী?
– গাফলতির ব্যাপারে শরীয়তের অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি কী?
– গাফলতির প্রকার ও ধরন কী?
– গাফলতির কারণ ও চিকিৎসা কী?
প্রিয় পাঠক! এ সকল প্রশ্নের উত্তর ও এতদসংশ্লিষ্ট আরও কিছু আলোচনা পাবেন আপনি আপনার হাতের এ বইটিতে। বইটি রচনা ও প্রকাশের ক্ষেত্রে যারা সহযোগিতা করেছেন, আমি তাদের সকলের কৃতজ্ঞতা আদায় করছি।
আল্লাহ্ ﷻ-র দরবারে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের সকলকে গাফলতি থেকে জাগ্রত করেন এবং আমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করেন।
– মুহাম্মাদ সালেহ আল মুনাজ্জিদ
📄 গাফলতির ব্যাপারে শরীয়তের দৃষ্টিভঙ্গি ও অবস্থান
আল্লাহ্ ﷻ পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে গাফলতির নিন্দা করেছেন এবং গাফেলদের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। তাঁর নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-কে গাফেলদের সঙ্গ ওঠাবসা ও তাদের দলভুক্ত হওয়া থেকে সাবধান করেছেন। যেমন, তিনি ইরশাদ করেছেন-
وَاذْكُرْ رَّبَّكَ فِيْ নَفْسِكَ تَضَرُّعًا وَّخِيْفَةً وَّدُوْনَ الْجَهْرِ مِنَ الْقَوْلِ بِالْغُدُوِّ وَالْآصَالِ وَلَا تَكُنْ مِّنَ الْغَافِلِينَ
আর স্মরণ করতে থাকুন স্বীয় পালনকর্তাকে আপন মনে ক্রন্দনরত ও ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় এবং এমন সুরে যা চিৎকার করে বলা অপেক্ষা কম; সকালে ও সন্ধ্যায়। আর আপনি গাফেল-উদাসীনদের অন্তর্ভুক্ত হবেন না। [সূরা আ‘রাফ : ২০৫]
আল্লাহ্ ﷻ গাফেলদের সাহায্যগ্রহণ, তাদের সঙ্গে চলাফেরা ও ওঠাবসা করতে নিষেধ করেছেন। যেমন, তিনি ইরশাদ করেছেন-
وَاَصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِيْنَ يَدْعُوْنَ رَبَّهُمْ بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيْدُوْنَ وَجْهَهُ وَلَا تَعْدُ عَيْنَاكَ عَنْهُمْ تُرِيْدُ زِيْنَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَلَا تُطِعْ مَنْ اَغْفَلْنَا قَلْبَهُ عَنْ ذِكْرِنَا وَاتَّبَعَ هَوٰهُ وَكَানَ اَمْرُهُ فُرُطًا
আপনি নিজেকে তাদের সংস্পর্শে আবদ্ধ রাখুন, যারা সকাল-সন্ধ্যায় তাদের পালনকর্তাকে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে আহ্বান করে এবং আপনি পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য কামনা করে তাদের থেকে নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে নিবেন না। আপনি তার আনুগত্য করবেন না, যার মনকে আমার স্মরণ থেকে গাফেল করে দিয়েছি; যে নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং যার কার্যকলাপ হচ্ছে সীমা অতিক্রম করা। [সূরা কাহ্ফ : ২৮]
অনেক সম্প্রদায়কে আল্লাহ্ ﷻ তাদের উদাসীনতা ও গাফলতির কারণে নিন্দা করেছেন। যেমন, তিনি ইরশাদ করেছেন-
يَعْلَمُونَ ظَاهِرًا مِّنَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ عَنِ الْآخِرَةِ هُمْ غَافِلُونَ
তারা পার্থিব জীবনের বাহ্যিক দিক সম্পর্কে অবগত, আর আখিরাত সম্পর্কে তারা গাফেল-উদাসীন। [সূরা রূম : ৭]
গাফেলদের এক শ্রেণি হচ্ছে কাফের। যেমন, আল্লাহ্ ﷻ তাঁর পবিত্র কিতাবে ইরশাদ করেছেন-
مَنْ كَفَرَ بِاللَّهِ مِنْ بَعْدِ إِيمَانِهِ إِلَّا مَنْ أُكْرِهَ وَقَلْبُهُ مُطْمَئِنٌّ بِالْإِيمَانِ وَلَكিনْ مَنْ شَرَحَ بِالْكُفْرِ صَدْرًا فَعَلَيْهِمْ غَضَبٌ مِنَ اللَّهِ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ * ذَلِكَ بِأَنَّهُمُ اسْتَحَبُّوا الْحَيَاةَ الدُّنْيَا عَلَى الْآخِرَةِ وَأَنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْكَافِرِينَ * أُولَئِكَ الَّذِينَ طَبَعَ اللَّهُ عَلَى قُلُوبِهِمْ وَسَمْعِهِمْ وَأَبْصَارِهِمْ وَأُولَئِكَ هُمُ الْغَافِلُونَ
যে কেউ বিশ্বাসী হওয়ার পর আল্লাহকে অস্বীকার করে—সে ব্যক্তি ব্যতীত যাকে বাধ্য করা হয়েছে অথচ তার অন্তর ঈমানে অটল রয়েছে। কিন্তু যারা কুফুরির জন্য হৃদয় উন্মুক্ত করে দেয়, তাদের উপর আপতিত হবে আল্লাহর ক্রোধ এবং তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি। এটা এজন্য যে, তারা পার্থিব জীবনকে পরকালের চাইতে প্রিয় মনে করেছে; আর আল্লাহ্ অবিশ্বাসীদের পথ প্রদর্শন করেন না। এরাই হলো তারা, আল্লাহ যাদের অন্তর, কর্ণ ও চক্ষুর উপর মোহর মেরে দিয়েছেন এবং এরাই হলো গাফেল। [সূরা নাহল: ১০৬-১০৮]
ধ্বংস, পরিপূর্ণ ধ্বংস ওই ব্যক্তির জন্য, যে ফায়সালা ও চূড়ান্ত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত গাফলতিতে ডুবে থাকে। যেমন, আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন–
وَأَنْذِرْهُمْ يَوْمَ الْحَسْرَةِ إِذْ قُضِيَ الْأَمْرُ وَهُمْ فِي غَفْلَةٍ وَهُمْ لَا يُؤْمِنُونَ
আপনি তাদেরকে পরিতাপের দিবস সম্পর্কে হুঁশিয়ার করে দিন, যখন সব ব্যাপারে ফায়সালা হয়ে যাবে। এখন তারা গাফেল এবং তারা বিশ্বাস স্থাপন করছে না। [সূরা মারইয়াম: ৩৯]
রাসূলুল্লাহ্ যখন সাহাবায়ে কেরামের সামনে [কেয়ামতের দিন] ‘মৃত্যু’কে জবাই করে দেওয়া প্রসঙ্গে আলোচনা করছিলেন, তখন তিনি এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেছেন। আবূ সাঈদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন-
يُجَاءُ بِالْمَوْتِ يَوْমَ الْقِيَامَةِ كَأَنَّهُ كَبْشٌ أَمْلَحُ فَيُوقَفُ بَيْنَ الْجَنَّةِ وَالنَّارِ، فَيُقَالُ يَا أَهْلَ الْجَنَّةِ هَلْ تَعْرِفُونَ হَذَا ؟ فَيُشْرِقُونَ وَيَنْظُرُونَ وَيَقُولُونَ نَعَمْ ، هَذَا الْمَوْتُ . قَالَ وَيُقَالُ يَا أَهْلَ النَّارِ هَلْ تَعْرِفُونَ হَذَا ؟ فَيُشْرِقُونَ وَيَنْظُرُونَ وَيَقُولُونَ نَعَمْ ، هَذَا الْمَوْتُ . قَالَ فَيُؤْمَرُ بِهِ فَيُذْبَحُ . قَالَ ثُمَّ يُقَالُ يَا أَهْلَ الْجَنَّةِ خُلُودٌ فَلَا مَوْتَ ، وَيَا أَهْلَ النَّارِ خُلُودٌ فَلَا مَوْتَ .
কেয়ামতের দিন মৃত্যুকে একটি ধূসর রঙের মেষের আকারে আনা হবে। অতঃপর তাকে জান্নাত-জাহান্নামের মাঝখানে রাখা হবে। তখন একজন সম্বোধনকারী ডাক দিয়ে বলবেন, হে জান্নাতীগণ! তোমরা কি একে চিন? এ কথা শুনে তারা ঘাড়-মাথা উঁচু করে দেখতে থাকবে এবং বলবে, হ্যাঁ, এ তো মৃত্যু। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর বলা হবে, হে জাহান্নামীগণ! তোমরা কি একে চিন? তখন তারা ঘাড়-মাথা উঁচু করে দেখতে থাকবে এবং বলবে, হ্যাঁ, এ তো মৃত্যু। এরপর নির্দেশ দেওয়া হবে এবং তাকে জবাই করে দেওয়া হবে। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর বলা হবে, হে জান্নাতীগণ! মৃত্যু নেই। তোমরা অনন্ত কাল এখানে থাকবে। হে জাহান্নামীগণ! মৃত্যু নেই। তোমরা অনন্ত কাল এখানে থাকবে। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর রাসূলুল্লাহ্ এই আয়াত পাঠ করলেন-
وَأَنْذِرْهُمْ يَوْمَ الْحَسْرَةِ إِذْ قُضِيَ الْأَمْرُ وَهُمْ فِي غَفْلَةٍ وَهُمْ لَا يُؤْمِنُونَ
[হে নবী!] আপনি তাদেরকে পরিতাপের দিবস সম্পর্কে হুঁশিয়ার করে দিন, যখন সব ব্যাপারে ফায়সালা হয়ে যাবে। এখন তারা গাফেল এবং তারা বিশ্বাস স্থাপন করছে না। [সূরা মারইয়াম: ৩৯]
এ সময় রাসূলুল্লাহ্ স্বীয় হাত দ্বারা দুনিয়ার দিকে ইশারা করেছেন। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৭৩০, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৮৮৯]
📄 পরিশিষ্ট
ইবনুল কাইয়িম রহ. বলেন, যিকিরের মজলিস ফেরেশতাদের মজলিস। অনর্থক ও গাফলতির মজলিস শয়তানের মজলিস। সুতরাং, বান্দাকে এ দু’টির পছন্দনীয় ও উত্তমটিকে বেছে নিতে হবে। সে দুনিয়া-আখেরাতে তার সাথিদের সাথে থাকবে। [আল ওয়াবিলুস সয়্যিব : ৫৯]
বর্তমান যামানা গাফলতির যামানা। যদি এ ব্যাপারে আপনি আরও নিশ্চিত ও সন্দেহমুক্ত হতে চান, তা হলে আপনি আল্লাহ ﷻ-র জমিনে ভ্রমণ করুন এবং দুনিয়া ও দুনিয়াবাসীদের নিয়ে চিন্তা-ফিকির করুন। দেখুন, কী দেখতে পান!
আপনি আপনার সামনে দেখতে পাবেন— খেলাধুলা ও চিত্তবিনোদনের মহল; স্যাটেলাইট চ্যানেলের বিশেষায়িত আসর, ইত্যাদি।
এরপর আপনি তুলনা করুন এসবের মাঝে এবং ইবাদতের স্থানগুলোর মাঝে। আরও তুলনা করুন ইলমের মজলিস ও হাল্কাগুলোর সাথে। আপনি দেখবেন, যা কিছু মানুষকে আল্লাহ ও আখেরাত থেকে গাফেল করে দেয়, তার সংখ্যা অনেক অনেক বেশি এবং খুবই বেশি।
যারা নিজের নফসের সাথে লড়াই করেন, মনের লাগামহীন কামনা-বাসনাকে কুরবানী করেন এবং অবহেলা ও গাফলতির স্থানগুলো পরিত্যাগ করেন, অতঃপর আল্লাহ ﷻ-র ঘরে এবং ইলমের মজলিসগুলোতে নেককার বান্দাদের সাথে বসেন, অচিরেই তাদের রব তাদেরকে মহাপ্রতিদান সম্মাননা করবেন– তাদের এ কুরবানী ও ত্যাগের বিনিময়ে। কেননা, যখনই এসবের প্রতি আগ্রহ ও উৎসাহ দানকারী বিষয় বেড়ে যাবে এবং মানুষ সেগুলোর মোকাবিলা করবে, তখন তার প্রতিদানও অনেক বড় হবে। এ জন্যই শেষ যামানার নেককারদের প্রতিদান বেশি হবে। কেননা, তারা বিভিন্ন ধরনের ও নানা রকমের ফেতনা ও উত্তেজনা সৃষ্টিকারী বিষয়ের মোকাবিলা করে থাকেন।
পরিশেষে আমরা আল্লাহ ﷻ-র দরবারে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদেরকে গাফলতি, গাফলতির কারণ ও মাধ্যম থেকে হেফাজত করেন; এবং জীবনের মন্দ পরিসমাপ্তি থেকে রক্ষা করেন; তাঁর যিকির ও শোকরের তাওফীক দান করেন; তাঁর সুন্দর ইবাদতে সাহায্য করেন। তিনি সর্বশ্রোতা, আহ্বানে সাড়াদানকারী।
وَصَلَّى اللَّهُ وَسَلَّمَ عَلَىٰ نَبِيِّنَا مُحَمَّدٍ وَعَلَىٰ آلِهِ وَصَحْبِهِ أَجْمَعِينَ.
–মুহাম্মাদ সালেহ আল মুনাজিদ
সমাপ্ত
📄 মেধা যাচাই
প্রিয় পাঠক! এখানে আপনার সামনে দু' ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। কিছু প্রশ্নের উত্তর আপনি তাৎক্ষণিকভাবে দিতে সক্ষম। আর কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতে চিন্তা-ভাবনা ও গভীর মনোযোগের প্রয়োজন।
১. তাৎক্ষণিকভাবে উত্তর দেওয়ার মতো প্রশ্ন:
১. গাফলতির আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ বলুন।
২. গাফলতি কত প্রকার ও কী কী?
৩. নিন্দনীয় গাফলতি তিন প্রকার। প্রকারগুলো কী কী?
৪. গাফলতির কারণ কী কী?
২. চিন্তা-ভাবনা করে উত্তর দেওয়ার মতো প্রশ্ন:
১. মানুষ যে সকল বিষয় থেকে গাফেল থাকে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে নিয়তের আমল। এ কথার ব্যাখ্যা করুন।
২. এ বইয়ের কোনও এক স্থানে একটি শিশুর কথা বর্ণিত আছে তার মায়ের উদ্দেশ্যে- ‘আমাকে খেলতে দাও। আমি আর কখনও গির্জায় প্রবেশ করব না’ – খেলার সাথে এর সম্পর্ক কী?
৩. দুনিয়াতে গাফেল কোন কোন শাস্তির সম্মুখীন হয়?
৪. আখেরাতে গাফেল কোন কোন শাস্তির সম্মুখীন হবে?
৫. গাফলতির সবচেয়ে শক্তিশালী ও কার্যকরী চিকিৎসা কী?