📘 ফুতুহুশ শাম 📄 হযরত দিরারের সূক্ষ্ম কৌশল

📄 হযরত দিরারের সূক্ষ্ম কৌশল


তখন হযরত দিরার বললেন, আমীর সাহেব! আমায় ভয় হচ্ছে, আপনাকে হত্যার জন্য হয়তো আরো শত্রু লুকিয়ে থাকবে। আমরা তাদের অন্য কোন ষড়যন্ত্র থেকেও আপনাকে নিরাপদ মনে করছি না। আমার পরামর্শ হচ্ছে, আমরা এখনই শত্রুদের গোপন আস্তানায় চলে যাব। গিয়ে যদি তাদেরকে ঘুমন্ত পাই, তাহলে তাদেরকে হত্যা করবো এবং আমরাই তাদের স্থানে লুকিয়ে থাকবো। অতঃপর ভোরে যখন আপনি আল্লাহর দুশমনের সাথে একাকী মিলিত হবেন, তখন আমরা কোন কথাবার্তা ছাড়াই আপনার কাছে গিয়ে উপস্থিত হব। একথা শুনে হযরত খালিদ বললেন, ইবনে আযূর! তুমি যা বললে, তা যদি করতে সক্ষম হও, তা হলে করতে পার। আর এরা যাদেরকে বাছাই করেছি, তাদেরকে সঙ্গে নাও। আমি তোমাকে তাদের আমীর বানালাম। আল্লাহ তোমার উদ্দেশ্য পূর্ণ করুন— এ কামনাই করছি।

📘 ফুতুহুশ শাম 📄 হযরত দিরারের সফল অপারেশন

📄 হযরত দিরারের সফল অপারেশন


অতঃপর হযরত দিরার তার সাথীদের নিয়ে হাতে অস্ত্র ধারণ করে পদব্রজে বের হলেন। তারা যখন বের হয়েছিলেন, তখন রাত্রের এক তৃতীয়াংশ অতিক্রান্ত হয়েছে।

শত্রুদের কাছাকাছি পৌঁছার পর হযরত দিরার তার সাথীদেরকে বললেন, আপনারা দাঁড়ান, আমি শত্রুদের অবস্থার খোঁজ-খবর নিয়ে আসি। তিনি তাদের নিকটবর্তী হলে তাদের নাক ডাকার আওয়াজ শুনতে পেলেন। দিনভর যুদ্ধ করে ক্লান্ত থাকায় তারা ঘুমে বিভোর ছিল। তখন হযরত দিরার মনে মনে বললেন, যদি আমি তাদের কাউকে হত্যা করি, তাহলে বাকীরা সাথে সাথে জেগে যাবে। তাই তিনি সাথীদের কাছে ফিরে গিয়ে বললেন, সুসংবাদ গ্রহণ করুন। আপনারা যাদের চাচ্ছেন তাদেরকে আল্লাহ নিয়ে এসেছেন। এখন সর্ব প্রকার ভয় ঝেড়ে ফেলুন এবং তরবারী কোশমুক্ত করুন। শত্রুদের কাছে গিয়ে তাদেরকে যেভাবে ইচ্ছা সে ভাবে হত্যা করুন।

অতঃপর সবাই হযরত দিরারের সাথে শত্রুদের কাছে চলে আসেন। দেখলেন, ঘুমন্ত শত্রুদের মাথার পাশেই অস্ত্র। তাদের প্রত্যেকে ওদের একজন একজনকে জবাই করল। যবাই করার পর তারা তাদের অস্ত্র ও রসদ নিয়ে নিলেন। তারা বাকী রাত না ঘুমিয়ে শত্রুদের উপর আল্লাহর কাছে বিজয় কামনা করার মধ্য দিয়ে কাটিয়ে দেন। ফজরের নামাযের সময় না হওয়া পর্যন্ত সবাই নিজ নিজ জায়নামাযে বসে আল্লাহর নিকট বিজয়ের জন্য ফরিয়াদ জানাচ্ছিলেন। ফজরের সময় হলে সবাই নামায আদায় করলেন। নামায শেষে প্রত্যেকে যার যার হত্যাকৃত শত্রুসেনার পোশাক পরে নিলেন এবং ওয়ারদানের লুকিয়ে রাখা লোকদের খবর জানার জন্য লোক পাঠানোর আশংকায় লাশ লুকিয়ে ফেললেন।

📘 ফুতুহুশ শাম 📄 নিজের খোড়া গর্তে পতিত হল ওয়ারদান

📄 নিজের খোড়া গর্তে পতিত হল ওয়ারদান


ফজরের নামাযের সময় হলে হযরত খালিদ লোকজনকে নিয়ে নামায আদায় করলেন এবং তাদেরকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে বললেন। এ সময় হঠাৎ দেখা গেল রোম সৈন্যদের দিক থেকে একজন লোক এসে বলল, ওহে আরবের লোকজন! আমাদের ও তোমাদের মধ্যকার রক্তপাত বন্ধের ব্যাপারে আমাদের ও তোমাদের আমীরের মধ্যে চুক্তি পত্র হওয়ার কথা ছিল। এজন্য আমাদের আমীর তোমাদের আমীরের অপেক্ষায় রয়েছেন।

তার কথা শুনে হযরত খালিদ বের হয়ে দেখলেন, লোকটি মূল্যবান কণ্ঠহার পরিহিত এবং তার মাথায় তাজ শোভিত। তাকে দেখে হযরত খালিদ বললেন, ইনশাআল্লাহ এগুলো মুসলমানদের গনীমত। আল্লাহর দুশমন ওয়ারদান হযরত খালিদকে দেখে ঘোড়া থেকে নেমে গেল। তখন হযরত খালিদও ঘোড়া থেকে নেমে গেলেন। অতঃপর উভয়ে বসলেন। ওয়ারদান তার তরবারী রানের উপর রাখলে হযরত খালিদ বললেন, তুমি কী বলতে চাও বল এবং সত্যকে আঁকড়ে ধর। আর মনে রাখবে, তুমি এখন এমন একজন লোকের সামনে বসা, যে কৌশল বলতে কিছুই জানে না।

ওয়ারদান বলল, বল খালিদ! তোমরা আমাদের কাছে কী চাও? আমাদের ও তোমাদের মাঝে যে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে তা দূর হওয়ার এখনই সময়। যদি তুমি আমাদের কাছে কিছু চাও, তাহলে তা দান করতে আমরা কৃপণতা করব না। কারণ আমাদের জানা মতে তোমাদের ন্যায় দুর্বল কোন সম্প্রদায় পৃথিবীতে আর নেই। আমরা শুনেছি, তোমরা তোমাদের দেশে দুর্ভিক্ষ ও ক্ষুধার জ্বালায় মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছ। তাই আমাদের কাছ থেকে কিছু নিয়ে তোমরা দেশে চলে যাও।

তার কথা শুনে হযরত খালিদ বললেন, ওহে রোমীয় কুকুর! আল্লাহ আমাদেরকে তোমাদের দানের মুখাপেক্ষী করেননি। তোমরা ইসলাম গ্রহণ না করা পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা আমাদের জন্য তোমাদের ধন-সম্পদ নারী ও শিশুদের ভাগাভাগি করে নেয়া বৈধ করেছেন। তোমরা যদি ইসলাম গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানাও, তাহলে তোমাদেরকে হয়তো জিযয়া (নিরাপত্তা পণ) দিতে হবে। নতুবা তোমাদের সাথে আমাদের যুদ্ধ অনিবার্য। আর আল্লাহর কসম করে বলতে চাই যে, আমাদের কাছে সন্ধির চেয়ে যুদ্ধ অধিক প্রিয়। আর তুমি যে বললে, তোমাদের নিকট আমাদের চেয়ে দুর্বল আর কোন জাতি নেই। তার উত্তরে বলতে চাই, তোমরা আমাদের কাছে নিকৃষ্ট জীব কুকুরের চেয়ে মূল্যবান নও। আল্লাহর রহমতে আমাদের একজন তোমাদের এক হাজার জনের মোকাবেলা করার সাহস রাখে। তুমি বুঝতেই পারছ, আমার কথা গুলো কোন সন্ধিকামী লোকের কথা নয়। এখন যদি তুমি আমার সাথে একাকী মোকাবেলা করতে চাও, তাহলে করতে পার।

ওয়ারদান হযরত খালিদের এ নির্ভীক বক্তব্য শুনে তরবারী কোশমুক্ত না করে বসার জায়গা থেকে উঠে একটু সরে দাঁড়াল এবং হযরত খালিদকে জড়িয়ে ধরল। এ সময় সে তার লুকিয়ে থাকা লোকদের ডাক দিয়ে বলল, তোমরা দ্রুত এগিয়ে আস। ক্রুশ আমাকে আরবদের আমীরকে ধরে রাখার শক্তি দিয়েছে।

📘 ফুতুহুশ শাম 📄 নিজের খোড়া ষড়যন্ত্রের গর্তেই হারিয়ে গেল ওয়ারদান

📄 নিজের খোড়া ষড়যন্ত্রের গর্তেই হারিয়ে গেল ওয়ারদান


ওয়ারদানের এ কথা শেষ না হতেই হযরত দিরার বিন আযূরের নেতৃত্বে আল্লাহর রাসূলের সাহাবীরা তীর বেগে দৌড়ে এলেন।

ওয়ারদান তাদেরকে আসতে দেখে প্রথমে মনে করছিল তার লুকিয়ে রাখা বীর সৈন্যরা আসছে। যখন তারা একেবারে নিকটবর্তী হলেন এবং সে তাদের সবার আগে হযরত দিরারকে নাঙ্গা শরীরে দেখতে পেল, তখন হযরত খালিদকে বলল, তোমার কাছে আমি তোমার মা'বুদের সত্যতার দোহাই দিয়ে কামনা করছি, এ শয়তানের হাতে আমাকে ছেড়ে দিবে না, আমাকে তুমি নিজেই হত্যা কর।

হযরত খালিদ বললেন, আমি নয়, সেই তোমাকে হত্যা করবে। তখন হযরত দিরার তরবারী ঘুরিয়ে বললেন, ওহে আল্লাহর শত্রু! আল্লাহর রাসূলের সাহাবীদের বিরুদ্ধে পাকানো তোমার ষড়যন্ত্র ও ধোকাবাজি কোথায়?

হযরত খালিদ বললেন, দিরার আমি হত্যার আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা কর। অতঃপর অন্যান্য সাহাবীরা তরবারী নিয়ে তার কাছে ধোকাবাজ কোথায় জিজ্ঞেস করল। তখন সে দিশেহারা হয়ে মাটিতে শুয়ে পড়ল এবং আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করে বলল, আল আমান, আল আমান।

হযরত খালিদ বললেন, ওহে আল্লাহর শত্রু! আমরা কেবল ভাল লোকদেরকেই নিরাপত্তা দিয়ে থাকি। তুমি যেহেতু আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছ, সেহেতু তোমার কোন নিরাপত্তা নেই।

হযরত খালিদের একথা শোনার সাথে সাথে হযরত দিরার গিয়ে তার ঘাড়ে তরবারী শানালেন। অতঃপর তার মাথা থেকে তাজ ছিনিয়ে নিলেন এবং বললেন, যে গিয়ে তার কাছ থেকে যেটা ছিনিয়ে নিতে পারবে সেটা তার। তখন বাকী সাহাবীরা এসে তাকে টুকরো টুকরো করলেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px