📄 ষড়যন্ত্রের শুরুতেই বিরোধ
অতঃপর ওয়ারদান দাউদ নামের একজন আরব খ্রীষ্টানকে ডেকে বলল, আমি জানি, তুমি স্পষ্টভাষী। আমি চাচ্ছি, তুমি আমাদের পক্ষ থেকে আরবদের কাছে গিয়ে যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাব দেবে এবং বলবে, আমি একাকী তাদের কাছে যাওয়ার পূর্বে তারা যেন কেউ আমাদের দিকে না আসে। এতে করে হয়তো আমরা আরবদের সাথে সন্ধি করতে সক্ষম হব। তখন দাউদ বলল, এটা কী বলছেন? আপনি কি সম্রাটের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ অমান্য করে আরবদের সাথে সন্ধি করতে যাচ্ছেন? এরকম করলে সম্রাট আপনাকে কাপুরুষ বলে অভিহিত করবেন। আর এ ব্যাপারে আরবদের কাছে গিয়ে ওকালতি করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আপনার ও আরবদের মাঝে সন্ধি করার ক্ষেত্রে যদি আমার মধ্যস্থতার খবর সম্রাট শুনেন, তাহলে তিনি আমাকে হত্যা করবেন।
তখন ওয়ারদান বলল, আরে নির্বোধ! এটা আরবদের আমীরকে হত্যা করার একটা কৌশল মাত্র। যেন আরবরা বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং আমাদের সাথে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত ত্যাগ করে। এর সাথে সাথে ওয়ারদান পূর্বোক্ত সেনা কর্মকর্তার পেশ করা কৌশলটা দাউদের সামনে পরিপূর্ণ রূপে তুলে ধরল। তখন দাউদ বলল, এ রকম কাজ প্রায়ই ব্যর্থ হয়। অতএব, আপনার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে সরাসরি যুদ্ধে অবতীর্ণ হোন। তখন ওয়ারদান ক্রুদ্ধ হয়ে বলল, তুমি ধ্বংস হবে। তুমি আমার নির্দেশের বিরোধিতা করছো! তুমি আমার সাথে তর্ক বন্ধ কর। তখন দাউদ বলল, আচ্ছা ঠিক আছে, আপনার নির্দেশ মেনে নিলাম।
দাউদ মনে মনে বলল, ওয়ারদান তার ছেলের সাথে গিয়ে মিলিত হওয়ার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছে। অতঃপর সে মুসলমানদের কাছে গিয়ে জোর গলায় বলল—
يا معشر العرب حسبكم من القتل وسفك الدماء, فإن الله تعالى يسألكم عن سفكها, وأريد أن يخرج إلى أمير العرب حتى أخاطبه بما أرسلت به
"ওহে আরব সম্প্রদায়! আপনাদের আর মারামারি ও রক্তপাত করা উচিত হবে না। কারণ, আল্লাহ আপনাদেরকে এ রক্তপাতের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করবেন। আমি এখন রোম সেনাপতির পাঠানো বার্তা নিয়ে আরবদের আমীরের সাথে আলোচনা করতে চাই"।
📄 হযরত খালিদের উত্তর
দাউদের কথা শেষ হতে না হতেই হযরত খালিদ অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মত তার দিকে দৌড়ে আসলেন। দাউদ হযরত খালিদকে দেখে বলল, ওহে আরব থামুন, আমি যুদ্ধ করতে আসিনি এবং আমি যোদ্ধাও নই। আমি কেবল একজন দূত। হযরত খালিদ তার কথা শুনে তার নিকটবর্তী হলেন এবং বললেন, তুমি সত্য করে বল, কী উদ্দেশ্যে এসেছ। যে সত্য বলেছে সে নিরাপদ আছে। আর যে মিথ্যা বলেছে সে ধ্বংস হয়েছে।
সে বলল, আমি সত্য করে বলছি, আমাদের আমীর ওয়ারদান রক্তপাতকে ঘৃণা করেন, তিনি আপনাদের বীরত্ব দেখেছেন। তিনি আপনাদের সাথে যুদ্ধ করতে চান না। তিনি অর্থের বিনিময়ে আপনাদের সাথে শান্তি স্থাপন করতে চান। আর তা হবে ওয়ারদান ও আপনার মাঝে একটি লিখিত চুক্তির মাধ্যমে। এতে আমাদের বড় বড় লোকেরা সাক্ষী থাকবে যে, আপনি ও আপনার লোকেরা যুদ্ধ বন্ধের ব্যাপারে চুক্তি করতে আগ্রহী। যদি এ শর্ত মেনে নেন, তাহলে আপনি ভোরে একাকী মাঠের দিকে আসবেন আর আমাদের আমীর ওয়ারদানও সেখানে আসবেন, হতে পারে আপনারা আমাদের ও আপনাদের রক্তপাত বন্ধের ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছবেন।
হযরত খালিদ তার কথা শুনে বললেন, এ কথা দ্বারা যদি তোমাদের আমীর আমাদের সাথে প্রতারণা করতে চায় তাহলে জেনে রাখ আমরা প্রতারণায় দক্ষ এবং আমাদের ন্যায় কেউ প্রতিপক্ষকে প্রতারিত করায় কৌশলী নয়। সে যদি সত্যি আমাদের সাথে প্রতারণা করতে চায় তা হলে বুঝতে হবে, তার মৃত্যু ও তোমাদের ধ্বংস অতি নিকটবর্তী। আর যদি সে সত্যি রক্তপাত বন্ধে আগ্রহী হয়, তাহলে আমরা তার সাথে সন্ধি করতে পারি। তবে তা তখনই হবে, যখন সে তার সকল লোকদের পক্ষ থেকে আমাদের জিযয়া প্রদান করবে। আর তুমি যে অর্থের কথা বলছ, তা আমরা তখনই গ্রহণ করতে পারি যখন তা আমাদের দাবী অনুযায়ী জিযয়া হিসেবে প্রদান করবে। শীঘ্রই আমরা তোমাদের ধন সম্পদ ও দেশের অধিকর্তা হতে যাচ্ছি।
হযরত খালিদের একথা শুনে দাউদ বলল, ঠিক আছে, আপনার কথা মতই চুক্তি হবে। এখন আমি চলে যাচ্ছি। আমি গিয়ে আমাদের আমীরকে আপনার কথা জানাব। এ বলে সে খুব ভীত হয়ে চলে গেল।
📄 ষড়যন্ত্রের কথা ফাঁস করে দিল দূত
যাওয়ার পথে সে মনে মনে বলল, আল্লাহর কসম! আরবদের আমীর সত্য বলেছেন। আমাদের মধ্য থেকে সর্বপ্রথম ওয়ারদানই নিহত হবে। অতএব, আমার উচিত হবে, আরব নেতার কাছে নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা চাওয়া। এ বলে সে কিছু দূর যাওয়ার পর হযরত খালিদের কাছে আবার ফিরে আসে। এসে বলল, আমীর সাহেব! আমার মনে একটা কথা লুকানো আছে। এখন আমি তা আপনার কাছে প্রকাশ করতে চাই। কারণ, আমি জানি এ দেশ আপনাদেরই। কথাটি হচ্ছে, আপনার বিরুদ্ধে ওয়ারদান একটি ষড়যন্ত্র পাকিয়েছে। অতঃপর সে ওয়ারদানের ষড়যন্ত্রের বিবরণ হযরত খালিদের কাছে বিস্তারিত প্রকাশ করে। অতঃপর সে বলল, খুব সতর্ক থাকুন। আমি আমার ও আমার পরিবারের জন্য আপনাদের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা কামনা করছি।
হযরত খালিদ বললেন, তুমি যদি বিশ্বাস ঘাতকতা না কর, তাহলে তুমি ও তোমার পরিবার আমাদের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা পাবে। সে বলল, আমার বিশ্বাসঘাতকতার ইচ্ছা থাকলে ওয়ারদানের ষড়যন্ত্রের কথা আপনার কাছে বলতাম না। হযরত খালিদ বললেন, তাদের লোকেরা কোথায় লুকিয়ে থাকবে? দাউদ বলল, তাদের সেনা ক্যাম্পের ডান দিকে একটি মাটি ঘেরা স্থানে।
📄 হযরত খালিদের আনন্দ
অতঃপর দাউদ হযরত খালিদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ওয়ারদানের কাছে চলে গেল। গিয়ে ওয়ারদানকে হযরত খালিদের চুক্তির জন্য প্রস্তুত থাকতে বলল। এ কথা শুনে ওয়ারদান খুশী হল এবং বলল, আশা করছি ক্রুশ আমাদের বিজয়ী করবে। অতঃপর দশজন বীর সৈন্যকে পদব্রজে চলে নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে লুকিয়ে থাকার নির্দেশ দিল এবং তাদের দ্বারা যে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার কথা ছিল, সে ব্যাপারে তাদেরকে অবহিত করল।
অন্যদিকে হযরত খালিদ সহাস্য বদনে আমীনুল উম্মাহ হযরত আবু উবাইদার নিকট এলেন। হযরত খালিদকে আনন্দিত অবস্থায় দেখে তিনি বললেন, ওহে আবু সুলাইমান! আপনার হাসি শুভ হোক। কী খবর? হযরত খালিদ রোম সেনাপ্রধানের ষড়যন্ত্রের ঘটনাটি তাকে খুলে বললেন। হযরত আবু উবাইদা বললেন, আপনি কি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন? হযরত খালিদ বললেন, আমি একাই তাদের মোকাবেলায় যেতে ইচ্ছা করছি।