📘 ফুতুহুশ শাম 📄 ওয়ারদানের ভাষণ ও যুদ্ধের পুনঃপ্রস্তুতি

📄 ওয়ারদানের ভাষণ ও যুদ্ধের পুনঃপ্রস্তুতি


যুদ্ধ শেষে উভয় দল নিজ নিজ তাঁবুতে চলে গেল। মুসলমানদের কঠোর ধৈর্য ও লড়াই দেখে ওয়ারদান ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল। তাই সে সেনাকর্মকর্তাদের ডেকে বলল—

يا أهل دين النصرانية ما تقولون في هؤلاء العرب؟ فإني أراهم غالبين علينا وقد رأيت أسيافهم قاطعة وخيولهم صابرة وسواعدكم جليدة, وإن القوم أطوع منكم لربكم وما خذلتم إلا بالظلم والجور والغدر, وما مرادى منكم إلا أن تتوبوا إلى ربكم, فإن فعلتم ذلك رجوت لكم النصر من عدوكم, وإن لم تفعلوا ذلك فأذنوا بحرب من المسيح وبهلاك أنفسكم, فإن الله عاقبكم أشد عقوبة إذسلط عليكم أقواما لا نفكر بهم ولا نعدهم, لأن أكثرهم جياع وعبيد وعراة ومساكين. أخرجهم إلينا قحط الحجاز وجوعه وشدة الضرر والبلاء, والآن قد أكلوا من خبز بلادنا وفواكه أرضنا وأكلوا العسل والتين والعنب, وأعظم ذلك سبي نسائكم وأموالكم-

“ওহে খৃষ্টবাদের অনুসারীরা! এ আরবদের সম্পর্কে তোমাদের কী ধারণা? আমি তো তাদেরকে বার বার আমাদের উপর বিজয়ী হতে দেখেছি। আমি তাদের তরবারীগুলোকে আমাদের উপর আঘাত হানতে ও তাদের ঘোড়াগুলোকে যুদ্ধক্ষেত্রে সহনশীল দেখেছি। আর তোমাদের বাহুগুলোকে দেখছি দুর্বল। আর দেখছি তোমাদের চেয়ে শত্রুরা প্রভুর অধিক অনুগত। আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি সাহায্য না আসার কারণ হচ্ছে, তোমাদের অন্যায়, অবিচার ও বিশ্বাসঘাতকতা। তোমাদেরকে এখন আমি যে কথা বলতে চাই, তা হচ্ছে, তোমরা তোমাদের প্রভুর কাছে তওবা কর। যদি তোমরা এটা কর, তাহলে আমি শত্রুদের উপর তোমাদের বিজয়ে আশাবাদী। আর যদি তোমরা তওবা না কর, তাহলে মসীহের পক্ষ থেকে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা ও তোমাদের ধ্বংস হওয়ার দুঃসংবাদ গ্রহণ কর। আল্লাহ তোমাদেরকে এমন কিছু লোক দ্বারা কঠোর শাস্তি দিয়েছেন, যাদের ব্যাপারে আমাদের কোন দুর্ভাবনা ছিল না। তাদেরকে আমরা উল্লেখযোগ্য মানুষের মধ্যে গণনা করতাম না। কারণ, তাদের অধিকাংশই ক্ষুধার্ত, ক্রীতদাস, নিঃস্ব ও মিসকীন। হিজাযের দুর্ভিক্ষ, ক্ষুধা ও বালা-মুসিবতের কঠোরতা তাদেরকে আমাদের দেশে নিয়ে এসেছে। এখন তারা আমাদের দেশের রুটি, ফল, মধু, ডুমুর ও আঙ্গুর খাচ্ছে। সবচেয়ে যেটি বেশী দুঃখজনক বিষয়, তা হচ্ছে, তারা আমাদের নারীদের বন্দী করে নিচ্ছে এবং আমাদের ধনসম্পদ ছিনিয়ে নিয়েছে"।

ওয়ারদানের এ ভাষণ শুনে সৈন্যরা কাঁদল এবং জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যেতে প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করল এবং বলল, আরবরা আমাদের উপর আর বিজয় লাভ করতে পারবে না। আমাদের পরামর্শ হচ্ছে তাদের সাথে বর্শা দ্বারা যুদ্ধ করা।

📘 ফুতুহুশ শাম 📄 হযরত খালিদকে গুপ্তভাবে হত্যার চেষ্টা

📄 হযরত খালিদকে গুপ্তভাবে হত্যার চেষ্টা


সৈন্যদের পক্ষ থেকে এ কথা শুনে ওয়ারদান সেনা কর্মকর্তাদের ডাক দিয়ে বলল, আপনাদের কী মতামত?

তখন তাদের একজন বলল, ওহে ওয়ারদান! মনে রাখবেন আপনি এমন একদল লোকের সাথে যুদ্ধের সম্মুখীন হয়েছেন, যাদের মোকাবেলা করার শক্তি আপনার নেই। আমি তাদের একজন লোককে আমাদের অনেক সৈন্যদের মাঝে এসে নির্ভীক চিত্তে হামলা করতে দেখেছি। তারা আমাদের সৈন্যদের মাঝে এসে কাউকে হত্যা না করে ফিরে যায় না। তাদের নবী তাদেরকে বলেছেন, তোমাদের যারা নিহত হবে তারা জান্নাতে যাবে আর রোমানদের যারা নিহত হবে, তারা জাহান্নামে যাবে। তাদের নিকট বাঁচা ও মরা উভয়ই মর্যাদার। তাদের নেতাকে কৌশলে হত্যা করা ব্যতীত তাদের উপর আমাদের বিজয় লাভ করার কোন পথ আমি দেখছি না।

ওয়ারদান বলল, কোন্ কৌশল অবলম্বন করে আমরা তাকে হত্যা করতে পারি?

সেনা কর্মকর্তাটি বলল, আমি আপনাকে একটি পরামর্শ দিচ্ছি, সে মতে যদি আপনি কাজ করেন, তাহলে তাদের নেতাকে আপনি কোন ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া ছাড়া হত্যা করতে পারবেন। পরামর্শটা হচ্ছে, আপনি তার সাথে যুদ্ধ করতে যাওয়ার আগে দশজন চতুর ও বীর অশ্বারোহীকে রণাঙ্গনের কাছাকাছি একটি জায়গায় লুকিয়ে রাখবেন। এরপর আপনি রণাঙ্গনে গিয়ে তার সাথে আলোচনায় লিপ্ত হবেন, অতঃপর তার উপর হামলা করবেন এবং লুকিয়ে রাখা দশজনকে ডাক দিবেন। তারা এসে তাকে টুকরো টুকরো করবে। অতঃপর আপনি নিরাপদে আমাদের দিকে ফিরে আসবেন। দেখবেন, তখন আরবরা বিভক্ত হয়ে পড়বে।

ওয়ারদান একথা শুনে খুব খুশী হল। বলল, তুমি সঠিক ও সুন্দর পরামর্শ দিয়েছ। তবে একাজটা রাত্রেই করতে হবে এবং সকাল হওয়ার পূর্বেই যে কোন ভাবে আমাদের একাজ সেরে ফেলতে হবে।

📘 ফুতুহুশ শাম 📄 ষড়যন্ত্রের শুরুতেই বিরোধ

📄 ষড়যন্ত্রের শুরুতেই বিরোধ


অতঃপর ওয়ারদান দাউদ নামের একজন আরব খ্রীষ্টানকে ডেকে বলল, আমি জানি, তুমি স্পষ্টভাষী। আমি চাচ্ছি, তুমি আমাদের পক্ষ থেকে আরবদের কাছে গিয়ে যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাব দেবে এবং বলবে, আমি একাকী তাদের কাছে যাওয়ার পূর্বে তারা যেন কেউ আমাদের দিকে না আসে। এতে করে হয়তো আমরা আরবদের সাথে সন্ধি করতে সক্ষম হব। তখন দাউদ বলল, এটা কী বলছেন? আপনি কি সম্রাটের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ অমান্য করে আরবদের সাথে সন্ধি করতে যাচ্ছেন? এরকম করলে সম্রাট আপনাকে কাপুরুষ বলে অভিহিত করবেন। আর এ ব্যাপারে আরবদের কাছে গিয়ে ওকালতি করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আপনার ও আরবদের মাঝে সন্ধি করার ক্ষেত্রে যদি আমার মধ্যস্থতার খবর সম্রাট শুনেন, তাহলে তিনি আমাকে হত্যা করবেন।

তখন ওয়ারদান বলল, আরে নির্বোধ! এটা আরবদের আমীরকে হত্যা করার একটা কৌশল মাত্র। যেন আরবরা বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং আমাদের সাথে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত ত্যাগ করে। এর সাথে সাথে ওয়ারদান পূর্বোক্ত সেনা কর্মকর্তার পেশ করা কৌশলটা দাউদের সামনে পরিপূর্ণ রূপে তুলে ধরল। তখন দাউদ বলল, এ রকম কাজ প্রায়ই ব্যর্থ হয়। অতএব, আপনার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে সরাসরি যুদ্ধে অবতীর্ণ হোন। তখন ওয়ারদান ক্রুদ্ধ হয়ে বলল, তুমি ধ্বংস হবে। তুমি আমার নির্দেশের বিরোধিতা করছো! তুমি আমার সাথে তর্ক বন্ধ কর। তখন দাউদ বলল, আচ্ছা ঠিক আছে, আপনার নির্দেশ মেনে নিলাম।

দাউদ মনে মনে বলল, ওয়ারদান তার ছেলের সাথে গিয়ে মিলিত হওয়ার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছে। অতঃপর সে মুসলমানদের কাছে গিয়ে জোর গলায় বলল—

يا معشر العرب حسبكم من القتل وسفك الدماء, فإن الله تعالى يسألكم عن سفكها, وأريد أن يخرج إلى أمير العرب حتى أخاطبه بما أرسلت به

"ওহে আরব সম্প্রদায়! আপনাদের আর মারামারি ও রক্তপাত করা উচিত হবে না। কারণ, আল্লাহ আপনাদেরকে এ রক্তপাতের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করবেন। আমি এখন রোম সেনাপতির পাঠানো বার্তা নিয়ে আরবদের আমীরের সাথে আলোচনা করতে চাই"।

📘 ফুতুহুশ শাম 📄 হযরত খালিদের উত্তর

📄 হযরত খালিদের উত্তর


দাউদের কথা শেষ হতে না হতেই হযরত খালিদ অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মত তার দিকে দৌড়ে আসলেন। দাউদ হযরত খালিদকে দেখে বলল, ওহে আরব থামুন, আমি যুদ্ধ করতে আসিনি এবং আমি যোদ্ধাও নই। আমি কেবল একজন দূত। হযরত খালিদ তার কথা শুনে তার নিকটবর্তী হলেন এবং বললেন, তুমি সত্য করে বল, কী উদ্দেশ্যে এসেছ। যে সত্য বলেছে সে নিরাপদ আছে। আর যে মিথ্যা বলেছে সে ধ্বংস হয়েছে।

সে বলল, আমি সত্য করে বলছি, আমাদের আমীর ওয়ারদান রক্তপাতকে ঘৃণা করেন, তিনি আপনাদের বীরত্ব দেখেছেন। তিনি আপনাদের সাথে যুদ্ধ করতে চান না। তিনি অর্থের বিনিময়ে আপনাদের সাথে শান্তি স্থাপন করতে চান। আর তা হবে ওয়ারদান ও আপনার মাঝে একটি লিখিত চুক্তির মাধ্যমে। এতে আমাদের বড় বড় লোকেরা সাক্ষী থাকবে যে, আপনি ও আপনার লোকেরা যুদ্ধ বন্ধের ব্যাপারে চুক্তি করতে আগ্রহী। যদি এ শর্ত মেনে নেন, তাহলে আপনি ভোরে একাকী মাঠের দিকে আসবেন আর আমাদের আমীর ওয়ারদানও সেখানে আসবেন, হতে পারে আপনারা আমাদের ও আপনাদের রক্তপাত বন্ধের ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছবেন।

হযরত খালিদ তার কথা শুনে বললেন, এ কথা দ্বারা যদি তোমাদের আমীর আমাদের সাথে প্রতারণা করতে চায় তাহলে জেনে রাখ আমরা প্রতারণায় দক্ষ এবং আমাদের ন্যায় কেউ প্রতিপক্ষকে প্রতারিত করায় কৌশলী নয়। সে যদি সত্যি আমাদের সাথে প্রতারণা করতে চায় তা হলে বুঝতে হবে, তার মৃত্যু ও তোমাদের ধ্বংস অতি নিকটবর্তী। আর যদি সে সত্যি রক্তপাত বন্ধে আগ্রহী হয়, তাহলে আমরা তার সাথে সন্ধি করতে পারি। তবে তা তখনই হবে, যখন সে তার সকল লোকদের পক্ষ থেকে আমাদের জিযয়া প্রদান করবে। আর তুমি যে অর্থের কথা বলছ, তা আমরা তখনই গ্রহণ করতে পারি যখন তা আমাদের দাবী অনুযায়ী জিযয়া হিসেবে প্রদান করবে। শীঘ্রই আমরা তোমাদের ধন সম্পদ ও দেশের অধিকর্তা হতে যাচ্ছি।

হযরত খালিদের একথা শুনে দাউদ বলল, ঠিক আছে, আপনার কথা মতই চুক্তি হবে। এখন আমি চলে যাচ্ছি। আমি গিয়ে আমাদের আমীরকে আপনার কথা জানাব। এ বলে সে খুব ভীত হয়ে চলে গেল।

ফন্ট সাইজ
15px
17px