📄 বীর দিরার কর্তৃক ইস্তফানের ছেলে হত্যা
হযরত দিরার কথাগুলো বুঝতে পারছিলেন না। তবে তিনি ঢালটি ছিনিয়ে নিলে ওই সময় ইস্তফান একটি স্বর্ণের ক্রুশ বের করল এবং ওটাকে চুম্বন করল এবং মাথায় উঠানামা করল। তখন হযরত দিরার বুঝতে পারলেন যে, সে ওই ক্রুশ দ্বারা তার উপর বিজয় কামনা করছে। হযরত দিরার বললেন, তুমি যদি ওটা দ্বারা আমার উপর বিজয় কামনা কর, তা হলে আমি নিকটবর্তী ও সাড়াদানকারী আল্লাহর কাছে তোমার উপর বিজয় কামনা করছি। অতঃপর তিনি ইস্তফানের উপর হামলা করলেন এবং অনেকক্ষণ ধরে উভয়ের যুদ্ধ চলল। লোকজন তাদের যুদ্ধ দেখে হৈচৈ শুরু করে দিল। তখন হযরত খালিদ ডাক দিয়ে বললেন, ওহে আযূর পুত্র! এটা কোন ধরণের অলসতা ও উদাসীনতা! জান্নাত তো তোমার জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে, আর তোমার শত্রুদের জন্য জাহান্নাম উন্মুক্ত করা হয়েছে। তোমার অলসতা থেকে বেঁচে থাকা উচিত। কারণ, তোমাকে আল্লাহ সাহায্য করবেন।
তখন হযরত দিরার আরো অধিক উৎসাহের সাথে যুদ্ধ করা শুরু করে দিলেন। রোমানরাও তাদের নেতাকে উৎসাহিত করল। উভয়ের মধ্যে প্রচন্ড যুদ্ধ চলছিল। সূর্যের তাপ বৃদ্ধি পেল ও ঘোড়া ক্লান্ত হয়ে গেল। ফলে ইস্তফান হযরত দিরারকে ঘোড়া থেকে নেমে যুদ্ধ করার কথা বলল। হযরত দিরার ঘোড়ার ক্লান্তি দেখে ঘোড়া থেকে নেমেই যুদ্ধ করার জন্য এগিয়ে যেতে চাইলেন। তখন দেখা গেল, রোমান সৈন্যরা যুদ্ধ করার জন্য এগিয়ে আসছে। একজন লোক তাদের দিকে আসছে এবং সে একটি ঘোড়া হাতে ধরে নিয়ে আসছে। সে ঘোড়ার উপর ছিল ইস্তফানের ছেলে। হযরত দিরার তাকে দেখে চিৎকার দিলেন এবং বললেন, আমার সাথে কিছুক্ষণ যুদ্ধ কর। এ বলে হযরত দিরার তার ঘোড়া দ্রুত চালিয়ে ইস্তফানের ছেলের দিকে গিয়ে তাকে এমন এক আঘাত দ্বারা স্বাগতম জানালেন, যার ফলে সে লুটিয়ে পড়ে এবং কিছুক্ষণ পর মৃত্যুবরণ করে। তখন হযরত দিরার নিজের ঘোড়াটিকে মুসলমানদের দিকে হাকিয়ে নিহতের ঘোড়ায় আরোহণ করলেন। মুসলমানরা তার ঘোড়াটিকে গ্রহণ করলেন।
📄 দিরারের সাহায্যে হযরত খালিদ ও তার সাথীরা
অতঃপর তিনি ইস্তফানের দিকে এগিয়ে গেলেন। ইস্তফান যখন দেখল, দিরার তার ছেলেকে হত্যা করে তার দিকে এগিয়ে আসছেন, তখন সে নিশ্চিত হয়ে গেল যে, সে যদি পালায় তাহলে তিনি (দিরার) তাকে ধাওয়া করে হত্যা করবেন। আর যদি না পালায় তা হলেও হত্যা করবে। হযরত দিরার আল্লাহর দুশমন ইস্তফানের কাছে গিয়ে তার উপর হামলা করলেন। তখন তিনি দেখলেন, রোম সৈন্যদের মাঝ থেকে একটা লোক বের হয়ে আসছে। তার নাম ছিল গারদুস।
ওয়ারদান ইস্তফানের ছেলের হত্যাকাণ্ড দেখে বুঝতে পারল যে, ইস্তফানও মৃত্যুর নিকটবর্তী। তখন সৈন্যদের বলল, ওহে লোকজন! এ শয়তান আমার কলিজার টুকরা খেয়ে ফেলেছে। আমি যদি তাকে ধ্বংস না করি, তাহলে আমি নিজেকেই ধ্বংস করবো। অতএব, আমাকে তাকে মারার জন্য বের হতেই হবে। এ বলে সে দশজন বাছাই করা সৈন্য নিয়ে যখন অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মত রণক্ষেত্রে এগিয়ে আসল, তখন ইস্তফান আনন্দে দিরারের প্রতি হুংকার ছাড়ল।
অন্যদিকে হযরত খালিদ ঝলমলে তাজ পরিহিত ওয়ারদানের নেতৃত্বে দিরারের দিকে শত্রুদের আগমন দেখে বললেন, প্রধান সেনাপতি ছাড়া কারো মাথায় তাজ থাকে না। সন্দেহ নেই যে, শত্রুদের প্রধান সেনাপতি আমাদের সাথীর দিকে এগিয়ে আসছে। অতএব এমন কে কে আছেন যারা আমাদের পক্ষ থেকে দিরারের সাহায্যে এগিয়ে যেতে প্রস্তুত? আর বললেন, আমাদের পক্ষ থেকে শুধু দিরারের সাহায্যে দশজন যাবে, যাতে আমাদের সংখ্যা শত্রুদের সংখ্যা থেকে বেশী না হয়। এ বলে হযরত খালিদ দশজনকে সাথে নিয়ে হযরত দিরারের সাহায্যে এগিয়ে গেলেন। দিরারের কাছে হযরত খালিদ তার সাথীদের নিয়ে পৌঁছার আগেই শত্রুরা এসে পৌঁছে। শত্রুদের দেখে হযরত দিরার পাথর এর চেয়ে শক্ত হৃদয় নিয়ে লড়তে লাগলেন। এ দেখে হযরত খালিদ দূর থেকে ডাক দিয়ে বললেন-
أبشر يا ضرار, فقد أسعدك الجبار ولا تجزع من الكفار.
"ওহে দিরার! সুসংবাদ গ্রহণ কর! পরাক্রমশালী আল্লাহ তোমাকে ভাগ্যবান বানিয়েছেন। তুমি কাফিরদের ব্যাপারে দুর্বল হয়ো না"। তখন দিরার বললেন, আল্লাহর সাহায্য অতি নিকটবর্তী।
📄 বীর দিরারে রোম নেতা ইস্তফানকে হত্যা
হযরত খালিদ তার সাথীদের নিয়ে শত্রুদের কাছে এসে পৌঁছলে প্রত্যেকেই একজন করে শত্রুদের মোকাবেলায় ব্যস্ত হয়ে যায়। হযরত খালিদ ওয়ারদানকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। আর হযরত দিরার তো আগে থেকেই ইস্তফানের সাথে লড়াই করে আসছিলেন।
ইস্তফান হযরত খালিদ ও তার সাথীদের দেখে ভয়ে কম্পমান হয়ে যায় এবং পালানোর উদ্দেশ্যে ডানদিকে ও বামদিকে তাকাতে থাকে। তার পালানোর ইচ্ছে টের পেয়ে হযরত দিরার তার উপর জোরে বর্শা দ্বারা আঘাত করলেন। তখন সে ঘোড়া থেকে নেমে দৌড়ে পালাচ্ছিল। হযরত দিরারও ঘোড়া থেকে নেমে গিয়ে তাকে ধাওয়া করতে লাগলেন। কিছুদূর যেতে না যেতেই দিরার তাকে জড়িয়ে ধরে কৌশলে মাটিতে ফেলে দিলেন। আল্লাহর এ দুশমন ছিল বিরাট শক্ত পাথরের ন্যায়। হযরত দিরার ছিলেন হালকা-পাতলা, কিন্তু আল্লাহ তাকে দান করেছেন ঈমানী শক্তি। অনেক দস্তাদস্তির পর হযরত দিরার হাত দ্বারা তার পেটে আঘাত করলেন এবং তাকে মাটিতে চেপে ধরলেন। তখন আল্লাহর দুশমন চিৎকার দিয়ে ওয়ারদানের নিকট রোমীয় ভাষায় সাহায্য চেয়ে বলল, জনাব! আমাকে আমার এ দুরাবস্থা থেকে রক্ষা করুন। আমি তো ধ্বংস হলাম। তখন ওয়ারদান তার দিকে চেয়ে বলল, তুমি ধ্বংস হও, এ নৃশংস ও হিংস্র প্রাণীদের কবল থেকে আমাকে কে রক্ষা করবে।
হযরত খালিদ ওয়ারদানের একথা শোনে তার দুর্বলতা টের পেয়ে আরো তীব্রভাবে তার উপর হামলা করলেন। এ সময় হযরত দিরার ইস্তফানের বক্ষে চেপে বসে তাকে উটের ন্যায় যবেহ করে দিলেন। তখন সবাই নিজ নিজ প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করে চলেছিল। হযরত দিরার আল্লাহর দুশমনের রক্তাক্ত মাথাটি নিয়ে ঘোড়ায় গিয়ে বসলেন।
📄 যুদ্ধের সূচনা ও সাঈদ বিন যাইদের ভাষণ
ইস্তফানের বক্ষে চেপে বসে তাকে উটের ন্যায় যবেহ করে দিলেন। তখন সবাই নিজ নিজ প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করে চলেছিল। হযরত দিরার আল্লাহর দুশমনের রক্তাক্ত মাথাটি নিয়ে ঘোড়ায় গিয়ে বসলেন।
এ সময় রোমান সৈন্যরা মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য এগিয়ে আসতে শুরু করে। শত্রুদের আগমন দেখে হযরত সাঈদ বিন যাইদ মুসলমানদের উদ্দেশ্যে বললেন—
يا معشر الناس اذكروا الوقوف بين يدى الله الملك الجبار, وإياكم أن تولوا الأدبار فتستوجبوا دخول النار يا أهل القرآن يا حملة القرآن اصبروا.
"ওহে লোকজন! পরাক্রমশালী সম্রাট আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়াকে ভয় করুন। অতএব, কেউ পালিয়ে যাবেন না। যার ফলে জাহান্নামে প্রবেশ অনিবার্য। ওহে ঈমানদার ও কুরআনের বাহকগণ ধৈর্য ধারণ করুন"।
হযরত সাঈদ বিন যাইদের এ কথায় লোকজনের উৎসাহ আরো বৃদ্ধি পেল। অতঃপর উভয় দল যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। যুদ্ধ আছরের সময় পর্যন্ত স্থায়ী হয়।