📄 হযরত মুআযের জ্বালাময়ী ভাষণ
এ সময় হযরত মুআজ বিন জাবাল চিৎকার দিয়ে বললেন- يا معشر الناس إن الجنة قد زخرفت لكم والنار قد فتحت لأعدائكم والملائكة عليكم قد أقبلت والحور العين قد تزينت للقائكم فأبشروا بالجنة السرمدية (( إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَى مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنْفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ )) بارك الله فيكم الحملة.
"ওহে লোকজন! জান্নাত আপনাদের জন্য সজ্জিত করা হয়েছে। জাহান্নাম আপনাদের শত্রুদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। ফেরেশতারা আপনাদের দিকে এগিয়ে এসেছে। ডাগর চক্ষুবিশিষ্ট রমণীরা আপনাদের সাক্ষাতের জন্য সজ্জিত হয়ে আছে। অতএব, চিরস্থায়ী জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ করুন। আল্লাহ মুমিনদের কাছ থেকে তাদের জান ও মাল জান্নাতের বিনিময়ে খরিদ করে নিয়েছেন। আপনাদের হামলায় আল্লাহ বরকত নাজিল করুন"।
📄 যুদ্ধের সূচনা ও হযরত দিরারের সাহসিকতা
হযরত খালিদ বললেন, মুআয! আপনি থামুন, লোকজনকে আমি ওসীয়ত করি। এ বলে হযরত খালিদ কাতারগুলো ঠিক করতে লাগলেন এবং বললেন-
اعلموا أن هؤلاء أضعافكم فقاتلوهم إنها ساعة نرزق فيها النصر, وإياكم أن تولوا الأدبار فيراكم الله منهزمنين, از حفوا على بركة الله.
"জেনে রাখুন! শত্রুরা আমাদের দ্বিগুণ। অতএব, তাদের সাথে যুদ্ধ আসর পর্যন্ত দীর্ঘায়িত করুন। কারণ, আসরের সময়ই আমাদের বিজয় লাভ হবে। সাবধান কেউ পালিয়ে যাবেন না, আল্লাহ আপনাদেরকে পালিয়ে যাওয়ার জন্য শাস্তি দেবেন। আল্লাহর নামে যুদ্ধ শুরু করুন"।
অতঃপর রোম সৈন্যরা মুসলমানদের দিকে এগিয়ে এসে তীরের আঘাতে কিছু লোককে হত্যা করল, কিছু লোককে আহত করল। হযরত খালিদ লোকজনকে হামলা করা থেকে বিরত রাখলেন। তখন দিরার বিন আযূর বললেন, আমরা কেন অপেক্ষা করব? আল্লাহ তাআলার ওয়াদা যে সত্য, তাতো আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়েছে। শত্রুরা এখন নিশ্চিত হবে যে, আমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছি। অতএব, আমাদেরকে হামলা করার অনুমতি দিন। হযরত খালিদ বললেন, তা হলে তুমি গিয়ে হামলা কর। তখন হযরত দিরার একথা বলে শত্রুদের দিকে এগিয়ে গেলেন যে, আমার কাছে যুদ্ধের চেয়ে অধিক প্রিয় বিষয় আর কিছুই নেই।
হযরত দিরারের গায়ে তখন পলের ভাই বুট্টোসের কাছ থেকে পাওয়া বর্মটি শোভা পাচ্ছিল। হযরত দিরারের গায়ে বুট্টোস থেকে পাওয়া দুটি চামড়ার জুব্বাও ছিল। অতঃপর তিনি ঘোড়া চালিয়ে শত্রুদের কাছে পৌঁছে গেলেন। তার লেবাস দেখে শত্রুরা তাকে চিনতে পারছিল না। তিনি শত্রুদের কাতারে প্রবেশ করে তাদের উপর বর্শা দ্বারা আঘাত হানছিলেন। শত্রুরা তার প্রতি তীর বৃষ্টি বর্ষণ করছিল। কিন্তু তিনি এতে মোটেও আহত হচ্ছিলেন না। কিছুক্ষণ শত্রুদের উপর অবিরাম হামলা চালিয়ে তিনি তাদের অনেক লোককে হত্যা করলেন। আনান বিন আউফ বলেন, আমি দিরারের হত্যা করা লোকদের সংখ্যা গণনা করছিলাম। তার হত্যা করা পদাতিক ও অশ্বারোহীদের সংখ্যা ত্রিশ। অতঃপর হযরত দিরার মাথা থেকে শিরস্ত্রাণ ও চেহারা থেকে মুখোশ খুলে ফেললেন এবং বললেন-
أنا الموت الأصفر, أنا ضرار بن الأزور, أنا قاتل همدان بن وردان أنا البلاء المسلط عليكم و على من اشرك بالرحمن.
"আমি হলুদ মৃত্যু। আমি দিরার বিন আযূর। তোমাদের নেতা ওয়ারদানের ছেলে হামদানের হত্যাকারী। আমি তোমাদের ও আল্লাহর সাথে অংশীদার সাব্যস্তকারীদের উপর আপতিত বিপদ"। রোম সৈন্যরা তার কথা শোনে তাকে চিনে ফেলল এবং পিছনে সরে গেল। তখন হযরত দিরার তাদের ধাওয়া করলেন। তখন রোম সৈন্যরা তাকে ঘিরে ধরল।
📄 হযরত দিরারকে হত্যার ব্যর্থ চেষ্টা
ওয়ারদান এ অবস্থা দেখে বলল, কে এই বেদুঈন? তারা বলল, এ সেই লোক, যে সব সময় খোলা শরীরে যুদ্ধ করছে। ওয়ারদান এ কথা শোনে বলল, এই তো আমার ছেলেকে হত্যা করেছে। আমি একজন লোক চাই, যে আমার পুত্র হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করতে পারবে। কেউ যদি তাকে মেরে আমার ছেলের প্রতিশোধ গ্রহণ করতে পারে, তাহলে আমি তাকে সে যা চাইবে তা দ্বারা পুরষ্কৃত করবো। তখন তাবরিআর গভর্নর বলল, আমি আপনার ছেলে হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করছি।
অতঃপর সে তার ঘোড়ার লাগাম ছেড়ে দিয়ে হযরত দিরারের উপর হামলা করলো। অনেকক্ষণ ধরে তার সাথে হযরত দিরারের যুদ্ধ চলল। অতঃপর হযরত দিরার আল্লাহর শত্রুর উপর খুব জোরে একটি আঘাত করলেন। যার ফলে তার পেট ফেটে গেল এবং সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। তখন ওয়ারদান বলল, একে তো ধরে আনা গেল না। এর সাথে তো যুদ্ধ করে কোন মানুষ পেরে উঠবে না। অতঃপর সে ঘোড়া থেকে নেমে পোশাক পরিবর্তন করলো এবং বর্ম পরিধান করলো। আর মাথায় একটি তাজ রেখে একটি ভাল আরবী ঘোড়ায় চড়ে হযরত দিরারের দিকে যাওয়ার ইচ্ছা করল। তখন আম্মানের গভর্ণর ইস্তফান তার দিকে এগিয়ে গেল এবং তার বাহনের সামনে দাড়িয়ে বলল জনাব! আমি যদি এ ঘৃণ্য লোকটিকে হত্যা করি বা গ্রেফতার করে নিয়ে আসি, তা হলে আপনি কি আপনার মেয়েকে আমার সাথে বিয়ে দিবেন?
ওয়ারদান বলল, হ্যাঁ দিব। আমার মেয়ে তোমার জন্যই এবং এ ব্যাপারে আমি সিরিয়ার উপস্থিত সকল গভর্ণরকে সাক্ষী রাখছি। ইস্তফান এ কথা শুনে অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মত দৌড়ে গিয়ে হযরত দিরারের উপর হামলা করল এবং বলল, তুমি ধ্বংস হতে। তোমার উপর এমন বিপদ এসেছে যার মোকাবেলা করার শক্তি তোমার নেই।
📄 বীর দিরার কর্তৃক ইস্তফানের ছেলে হত্যা
হযরত দিরার কথাগুলো বুঝতে পারছিলেন না। তবে তিনি ঢালটি ছিনিয়ে নিলে ওই সময় ইস্তফান একটি স্বর্ণের ক্রুশ বের করল এবং ওটাকে চুম্বন করল এবং মাথায় উঠানামা করল। তখন হযরত দিরার বুঝতে পারলেন যে, সে ওই ক্রুশ দ্বারা তার উপর বিজয় কামনা করছে। হযরত দিরার বললেন, তুমি যদি ওটা দ্বারা আমার উপর বিজয় কামনা কর, তা হলে আমি নিকটবর্তী ও সাড়াদানকারী আল্লাহর কাছে তোমার উপর বিজয় কামনা করছি। অতঃপর তিনি ইস্তফানের উপর হামলা করলেন এবং অনেকক্ষণ ধরে উভয়ের যুদ্ধ চলল। লোকজন তাদের যুদ্ধ দেখে হৈচৈ শুরু করে দিল। তখন হযরত খালিদ ডাক দিয়ে বললেন, ওহে আযূর পুত্র! এটা কোন ধরণের অলসতা ও উদাসীনতা! জান্নাত তো তোমার জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে, আর তোমার শত্রুদের জন্য জাহান্নাম উন্মুক্ত করা হয়েছে। তোমার অলসতা থেকে বেঁচে থাকা উচিত। কারণ, তোমাকে আল্লাহ সাহায্য করবেন।
তখন হযরত দিরার আরো অধিক উৎসাহের সাথে যুদ্ধ করা শুরু করে দিলেন। রোমানরাও তাদের নেতাকে উৎসাহিত করল। উভয়ের মধ্যে প্রচন্ড যুদ্ধ চলছিল। সূর্যের তাপ বৃদ্ধি পেল ও ঘোড়া ক্লান্ত হয়ে গেল। ফলে ইস্তফান হযরত দিরারকে ঘোড়া থেকে নেমে যুদ্ধ করার কথা বলল। হযরত দিরার ঘোড়ার ক্লান্তি দেখে ঘোড়া থেকে নেমেই যুদ্ধ করার জন্য এগিয়ে যেতে চাইলেন। তখন দেখা গেল, রোমান সৈন্যরা যুদ্ধ করার জন্য এগিয়ে আসছে। একজন লোক তাদের দিকে আসছে এবং সে একটি ঘোড়া হাতে ধরে নিয়ে আসছে। সে ঘোড়ার উপর ছিল ইস্তফানের ছেলে। হযরত দিরার তাকে দেখে চিৎকার দিলেন এবং বললেন, আমার সাথে কিছুক্ষণ যুদ্ধ কর। এ বলে হযরত দিরার তার ঘোড়া দ্রুত চালিয়ে ইস্তফানের ছেলের দিকে গিয়ে তাকে এমন এক আঘাত দ্বারা স্বাগতম জানালেন, যার ফলে সে লুটিয়ে পড়ে এবং কিছুক্ষণ পর মৃত্যুবরণ করে। তখন হযরত দিরার নিজের ঘোড়াটিকে মুসলমানদের দিকে হাকিয়ে নিহতের ঘোড়ায় আরোহণ করলেন। মুসলমানরা তার ঘোড়াটিকে গ্রহণ করলেন।