📄 হযরত খাওলা কর্তৃক বুট্টোসের লোভনীয় প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান
বুট্টোস যখন হযরত খাওলার একথা শুনল এবং তার রূপ ও সৌন্দর্য্য দেখল, তখন বলল, ওহে আরবী রমণী! তুমি তোমার কাজ থেকে বিরত হও। কারণ, আমি তোমাকে তোমার পছন্দনীয় সব কিছু দিয়ে সম্মানিত করব। তুমি চাওনা আমি তোমার স্বামী হই? আমাকে খ্রীষ্টানরা অনেক ভক্তি করে। আমার রয়েছে অনেক ভূমি, অনেক সম্পদ ও অনেক পশু। আর সম্রাট হিরোক্লিয়াসের নিকটও আমার বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। আমার সবকিছু তোমার জন্য উৎসর্গ করলাম। তুমি কি দামেস্কবাসীর নেত্রী হতে চাও না? অনুরোধ করছি, তুমি নিজেকে ধ্বংস করো না। তার কথার উত্তরে হযরত খাওলা বললেন, অভিশপ্তের ছেলে অভিশপ্ত। আমি সুযোগ পেলে তোমার গর্দান উড়িয়ে ছাড়ব। আল্লাহর কসম! আমি তোমাকে আমার উটের রাখাল হিসেবে পছন্দ করবো না। অতএব, আমি তোমাকে কীভাবে সঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করব?
📄 মহিলাদের বীরত্ব
হযরত খাওলার এ কথা শুনে বুট্টোস তার সৈন্যদেরকে তাদের সাথে লড়ে যাওয়ার নির্দেশ দিল এবং বলল, সিরিয়ায় অনুপ্রবেশ করে মহিলারা তোমাদের উপর বিজয় অর্জন করবে- এর চেয়ে বড় লজ্জাকর ব্যাপার তোমাদের জন্য আর কি হতে পারে। তোমরা সম্রাটের ক্রোধকে ভয় কর। তার কথা শোনে সৈন্যরা চতুর্দিক থেকে মহিলাদের উপর তীব্রভাবে আক্রমণ করতে শুরু করে। মহিলারা অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে তাদের হামলা প্রতিরোধ করছিল। এ অবস্থায় হঠাৎ দেখা গেল, হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ মুসলমানদের নিয়ে তাদের দিকে এগিয়ে আসছেন। দূর থেকে তিনি ধুলো বালি ও তরবারীর ঝলকানি দেখে সাথীদের বললেন, রোমানদের অবস্থা কে জেনে আসতে পারবে? হযরত রাফে বিন উমাইরা আততাঈ বললেন, তাদের অবস্থা জেনে আসার জন্য আমি প্রস্তুত। হযরত খালিদের অনুমতিক্রমে তিনি ঘোড়া নিয়ে তাদের দিকে ছুটলেন। গিয়ে তিনি মহিলাদের কাছাকাছি পৌঁছলে দেখতে পান যে, তারা মরণপণ যুদ্ধে লিপ্ত। তখন তিনি দ্রুত চলে এসে হযরত খালিদকে যা দেখেছেন, তা বললেন।
হযরত খালিদ বললেন, ওদের যুদ্ধ নিয়ে আমি বিস্ময় বোধ করি না। কারণ, তারা আমালিকা ও তাবাবিআ বংশের মহিলা। তুব্বা ও তাদের মাঝে সময়ের ব্যবধান মাত্র এক শতাব্দী। তুব্বা বিন বকর বিন হাসান রাসূলুল্লাহ সা.- এর জন্ম লাভের পূর্বে তার আলোচনা ও আগমনের সুসংবাদ দিয়ে গেছেন। বলেছেন- আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আহমাদ সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূল। তার উম্মতকে যবূরে সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মত বলে অভিহিত করা হয়েছে। আমার বয়স যদি তার যুগ পর্যন্ত দীর্ঘ হয়, তা হলে আমি তাঁর কার্যনির্বাহী ও চাচাতো ভাই হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলব। হযরত খালিদ রাফে'কে বললেন, তুমি বিস্মিত হয়ো না। মনে রাখবে, তোমার কথা যদি সত্য হয়, তাহলে তা তাদের উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ ও সাহসী ভূমিকা বলে বিবেচিত হবে। তারা কেয়ামত পর্যন্ত আগমনকারী আরব মহিলাদের একটি শূন্যতা পূরণ করেছে এবং তাদের অসঙ্গত লজ্জাবোধ দূর করেছে। তার কথা শোনে আনন্দে লোকজনের চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। আর হযরত দিরার রাফে'র মুখ থেকে মহিলাদের যুদ্ধের খবর শোনার সাথে সাথে লাফ দিয়ে তাদের সাহায্যের জন্য দৌড়ে যান। তাকে যেতে দেখে হযরত খালিদ বললেন- "দিরার একটু অপেক্ষা কর। তাড়াহুড়ো করো না। কারণ, যে ধীরতা অবলম্বন করছে, সে তার প্রত্যাশা প্রাপ্ত হয়েছে।" দিরার বললেন- "আমীর সাহেব! আমার বোনদের সাহায্যের ব্যাপারে আমি ধীরতা অবলম্বন করতে পারি না।" হযরত খালিদ বললেন, ইনশাআল্লাহ বিজয় নিকটবর্তী। অতঃপর তিনি সাথীদের নিয়ে দামেস্কের পথের ঐ জায়গাটির দিকে চলতে লাগলেন। যাত্রা পূর্বে সংক্ষিপ্ত ওসীয়তে তিনি বললেন- "হে লোকজন! শত্রুদের কাছে পৌঁছে চতুর্দিক থেকে তাদের ঘিরে ফেলবে। এতে হয়তো আমাদের নারীদের মুক্ত করা যাবে।" তারা বলল ঠিক আছে। এরপর হযরত খালিদ সবার সামনে চলে গেলেন।
📄 মুসলিম বাহিনীকে দেখে বুট্টোসের হৃদকম্পন
ঐদিকে মহিলাদের সাথে রোমানদের প্রচন্ড যুদ্ধ চলছে। এমন সময় হঠাৎ তারা দেখতে পেল যে, ইসলামের ঝান্ডা নিয়ে মুসলমানরা তাদের দিকে দলে দলে এগিয়ে আসছে। তখন হযরত খাওলা চিৎকার দিয়ে বললেন- "ওহে তাবাবিআ বংশের নারীরা! কা'বার মালিকের কসম! তোমাদের জন্য সাহায্য চলে এসেছে।" মুসলিম বাহিনীকে দেখে বুট্টোসের হৃদয়ে কম্পন শুরু হয়ে যায়। আর রোমান সৈন্যরা একে অপরের দিকে তাকাতে শুরু করে। তখন বুট্টোস ডাক দিয়ে বলল, ওহে মহিলারা! আমাদের অন্তরে তোমাদের প্রতি দয়া ও সহানুভূতি চলে এসেছে। কারণ, তোমাদের ন্যায় আমাদের মা-বোন-কন্যা রয়েছে। আমি তোমাদেরকে এখন ক্ষমা করে দিলাম। তোমাদের প্রতি আমাদের কোন কামনা নেই। তোমাদের পুরুষেরা আসলে এ কথা তাদের জানিয়ে দেবে।
📄 খাওলার সাথে বুট্টোসের বাক্য বিনিময়
অতঃপর সে পালানোর প্রস্তুতি নিল। এ সময় তার দৃষ্টি একদল অশ্বারোহীর উপর পড়ল। তারা সৈন্যদের ভিতর থেকে বের হয়েছে। তাদের একজন তার অস্ত্র দ্বারা শরীর আবৃত করে রাখা ও আরেক জন নাঙ্গা শরীরে। তারা তাদের ঘোড়ার লাগাম ছেড়ে দেয়। তাদের দেখে মনে হচ্ছিল উভয়ে শিকারী সিংহ। তারা হলেন হযরত খালিদ ও হযরত দিরার। হযরত খাওলা তার ভাইকে দেখে বললেন, ভাই! তুমি সামনে অগ্রসর হও। তখন বুট্টোস তাকে ডাক দিয়ে বলল, তুমি তোমার ভাইয়ের দিকে চলে যাও। আমি তোমাকে তাকে দান করে দিলাম। এ বলে সে পালিয়ে যাচ্ছিল। তখন হযরত খাওলা তাকে বিদ্রূপ করে বললেন, এটাতো ভদ্রলোকের কাজ নয়। তুমি আমাকে ভালবাসা ও কাছে পাওয়ার কথা বলেছ। অতঃপর পালিয়ে দূরে চলে যাচ্ছ!
একথা বলে তিনি তার কাছে ছুটে যাচ্ছিলেন। বুট্টোস তার কথা শুনে বলল, তোমার প্রতি আমার যে আসক্তি ছিল, তা দূর হয়ে গেছে। হযরত খাওলা বললেন, আমাকে যে ভাবেই হোক তোমাকে পেতে হবে। অতঃপর তিনি তার দিকে দৌড়ে গেলেন। সাথে সাথে দিরারও তার দিকে দৌড়ে আসেন। বুট্টোস বলল, আমার কাছ থেকে তোমার বোনকে নিয়ে যাও। সে তোমার কাছে বরকতপূর্ণ হবে এবং তাকে আমি তোমাকে হাদিয়া দিলাম। হযরত দিরার বললেন, আমি তোমার হাদিয়া কৃতজ্ঞতার সাথে গ্রহণ করলাম। তবে আমি তোমাকে দান করার মতো বর্শার ফলা ব্যতীত আর কিছু খুঁজে পাচ্ছি না। অতএব, আমার কাছ থেকে তা সাদরে গ্রহণ কর। অতঃপর তার উপর চড়াও হলেন এবং এ আয়াত তিলাওয়াত করছিলেন, "যখন তোমাদের কেউ কোন শুভেচ্ছা প্রাপ্ত হবে, তখন যে শুভেচ্ছা জানিয়েছে তাকে তার চেয়ে আরো ভালভাবে শুভেচ্ছা জানাবে"। অতঃপর তিনি তার উপর আঘাত করলেন। অন্য দিকে হযরত খাওলা এসে বুট্টোসের ঘোড়ার পায়ে আঘাত করেন। তখন ঘোড়া তাকেসহ মাটিতে বসে পড়ে। ফলে আল্লাহর দুশমন মাটিতে পড়ে যায়। সে পড়ার আগেই দিরার গিয়ে তার কোমরে আঘাত করে বসেন। ফলে বর্শা তার কোমর কুঁড়ে বের হয়ে যায়। সাথে সাথে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। এ অবস্থা দেখে হযরত খালিদ বললেন, ওহে দিরার! তোমাকে আল্লাহ সম্মানিত করুন। তুমি এমন আঘাত কর, যা ব্যর্থ হয় না।