📘 ফুতুহুশ শাম 📄 মহিলাদের দুঃসাহসী আক্রমণ

📄 মহিলাদের দুঃসাহসী আক্রমণ


তখন হযরত খাওলা বললেন, ওহে তাবাবিআ ও আমালিকা বংশের মেয়েরা! তোমরা তাঁবুর খুঁটি ও কাঠগুলো হাতে নাও। আমরা এসব নিকৃষ্ট লোকদের উপর আক্রমণ করব। হয়তো আল্লাহ আমাদেরকে বিজয় দান করবেন নতুবা আমরা (শহীদ হয়ে) আরবদের লজ্জা নিবারণ করব। তখন আফরা বিনতে গিফার বলল, আমি যা বলেছিলাম তার চেয়ে তোমার প্রস্তাবটি আমার কাছে অধিক প্রিয়। অতঃপর প্রত্যেকেই একটি করে তাঁবুর খুঁটি ও কাঠ হাতে নিল এবং সবাই এক সাথে একটা আওয়াজ তুলল। হযরত খাওলা তার কাঁধে একটা বড় খুঁটি নিল আর তার পিছনে আফরা, উম্মে আবান বিনতে আতবা, সালমা বিনতে যিরা, লুবনা বিনতে হাযেম, মাখরুআ বিনতে আমলুক ও সালমা বিনতে লুমান সহ অন্যান্য মহিলারা চলতে লাগল।

হযরত খাওলা তাদেরকে বললেন, তোমরা একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ো না। তোমরা একটি চলন্ত বৃত্তের মত থাক। যদি বিচ্ছিন্ন হও, তাহলে শত্রুরা আমাদেরকে শেষ করে ফেলবে। অতঃপর হযরত খাওলা সবার আগে গিয়ে শত্রুদের উপর হামলা করলেন। সর্বপ্রথম তাদের একজন লোকের উপর আঘাত করলেন। আঘাতে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। এ অবস্থা দেখে রোমানরা এদিক সেদিকে তাকিয়ে বলল, ব্যাপার কি? দেখল তাদের সামনে কিছু মহিলা। তাদের হাতে রয়েছে খুঁটি। তখন একজন সেনাকর্মকর্তা চিৎকার দিয়ে বলল, তোমরা ধ্বংস হবে। তোমরা এটা কী করছ? তখন হযরত আফরা বললেন, এ আমাদের অপারেশন। ওহে কাফিররা! এ খুঁটিগুলো দ্বারা আমরা তোমাদের প্রাণ কেড়ে নেব। তোমাদের প্রাণ কেড়ে নেওয়া আমাদের জন্য অপরিহার্য।

এ অবস্থায় বুট্টোস বলল, মহিলাদের কাছ থেকে তোমরা সরে যাও। তাদের উপর কেউ তরবারী চালাবে না এবং তাদের কাউকে হত্যা করবে না। তাদেরকে বন্দী করে নাও। আমার পছন্দ করা মহিলাটির সাথে কেউ অন্যায় আচরণ করবে না। তখন সবাই মহিলাদের কাছ থেকে সরে আসল এবং চতুর্দিক থেকে তাদেরকে ঘিরে রাখল। তারা তাদের কাছ থেকে যাওয়ার চেষ্টা করল কিন্তু সক্ষম হলো না। এ মহিলাদের নিকট কেউ যেতে চাইলে সাথে সাথে তারা তার ঘোড়ার পায়ে আঘাত করত। আঘাতের ফলে যখন লোকটি লুটিয়ে পড়ত তখন তারা খুঁটি নিয়ে তার কাছে গিয়ে তাকে হত্যা করত এবং তার অস্ত্র নিয়ে নিত। এভাবে তারা রোমানদের ত্রিশজন অশ্বারোহীকে হত্যা করল। বুট্টোস এ অবস্থা দেখে প্রচন্ড রেগে গেল এবং সৈন্যদের নিয়ে তাদের দিকে পদব্রজে চলল। মহিলারা ওদেরকে কাছে আসতে দেখে একে অপরকে উৎসাহ দিয়ে বলল, সম্মানিত অবস্থায় মরো, লাঞ্ছিত হয়ে মরো না। বুট্টোস মাথা তুলে মহিলাদের কর্মকান্ডের দিকে তাকিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়ে পড়ল। আর হযরত খাওলাকে সিংহের ন্যায় ঘুরতে দেখল। তিনি বলছেন- আমরা হচ্ছি তুব্বা ও হিময়ার বীরঙ্গনা। শত্রুদের উপর আঘাত হানা আমাদের জন্য কঠিন না। কারণ আমরা যুদ্ধে জ্বলন্ত আগুন। আজকে তোমাদের করতে হবে মহাশাস্তি আস্বাদন।

📘 ফুতুহুশ শাম 📄 হযরত খাওলা কর্তৃক বুট্টোসের লোভনীয় প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান

📄 হযরত খাওলা কর্তৃক বুট্টোসের লোভনীয় প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান


বুট্টোস যখন হযরত খাওলার একথা শুনল এবং তার রূপ ও সৌন্দর্য্য দেখল, তখন বলল, ওহে আরবী রমণী! তুমি তোমার কাজ থেকে বিরত হও। কারণ, আমি তোমাকে তোমার পছন্দনীয় সব কিছু দিয়ে সম্মানিত করব। তুমি চাওনা আমি তোমার স্বামী হই? আমাকে খ্রীষ্টানরা অনেক ভক্তি করে। আমার রয়েছে অনেক ভূমি, অনেক সম্পদ ও অনেক পশু। আর সম্রাট হিরোক্লিয়াসের নিকটও আমার বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। আমার সবকিছু তোমার জন্য উৎসর্গ করলাম। তুমি কি দামেস্কবাসীর নেত্রী হতে চাও না? অনুরোধ করছি, তুমি নিজেকে ধ্বংস করো না। তার কথার উত্তরে হযরত খাওলা বললেন, অভিশপ্তের ছেলে অভিশপ্ত। আমি সুযোগ পেলে তোমার গর্দান উড়িয়ে ছাড়ব। আল্লাহর কসম! আমি তোমাকে আমার উটের রাখাল হিসেবে পছন্দ করবো না। অতএব, আমি তোমাকে কীভাবে সঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করব?

📘 ফুতুহুশ শাম 📄 মহিলাদের বীরত্ব

📄 মহিলাদের বীরত্ব


হযরত খাওলার এ কথা শুনে বুট্টোস তার সৈন্যদেরকে তাদের সাথে লড়ে যাওয়ার নির্দেশ দিল এবং বলল, সিরিয়ায় অনুপ্রবেশ করে মহিলারা তোমাদের উপর বিজয় অর্জন করবে- এর চেয়ে বড় লজ্জাকর ব্যাপার তোমাদের জন্য আর কি হতে পারে। তোমরা সম্রাটের ক্রোধকে ভয় কর। তার কথা শোনে সৈন্যরা চতুর্দিক থেকে মহিলাদের উপর তীব্রভাবে আক্রমণ করতে শুরু করে। মহিলারা অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে তাদের হামলা প্রতিরোধ করছিল। এ অবস্থায় হঠাৎ দেখা গেল, হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ মুসলমানদের নিয়ে তাদের দিকে এগিয়ে আসছেন। দূর থেকে তিনি ধুলো বালি ও তরবারীর ঝলকানি দেখে সাথীদের বললেন, রোমানদের অবস্থা কে জেনে আসতে পারবে? হযরত রাফে বিন উমাইরা আততাঈ বললেন, তাদের অবস্থা জেনে আসার জন্য আমি প্রস্তুত। হযরত খালিদের অনুমতিক্রমে তিনি ঘোড়া নিয়ে তাদের দিকে ছুটলেন। গিয়ে তিনি মহিলাদের কাছাকাছি পৌঁছলে দেখতে পান যে, তারা মরণপণ যুদ্ধে লিপ্ত। তখন তিনি দ্রুত চলে এসে হযরত খালিদকে যা দেখেছেন, তা বললেন।

হযরত খালিদ বললেন, ওদের যুদ্ধ নিয়ে আমি বিস্ময় বোধ করি না। কারণ, তারা আমালিকা ও তাবাবিআ বংশের মহিলা। তুব্বা ও তাদের মাঝে সময়ের ব্যবধান মাত্র এক শতাব্দী। তুব্বা বিন বকর বিন হাসান রাসূলুল্লাহ সা.- এর জন্ম লাভের পূর্বে তার আলোচনা ও আগমনের সুসংবাদ দিয়ে গেছেন। বলেছেন- আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আহমাদ সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূল। তার উম্মতকে যবূরে সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মত বলে অভিহিত করা হয়েছে। আমার বয়স যদি তার যুগ পর্যন্ত দীর্ঘ হয়, তা হলে আমি তাঁর কার্যনির্বাহী ও চাচাতো ভাই হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলব। হযরত খালিদ রাফে'কে বললেন, তুমি বিস্মিত হয়ো না। মনে রাখবে, তোমার কথা যদি সত্য হয়, তাহলে তা তাদের উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ ও সাহসী ভূমিকা বলে বিবেচিত হবে। তারা কেয়ামত পর্যন্ত আগমনকারী আরব মহিলাদের একটি শূন্যতা পূরণ করেছে এবং তাদের অসঙ্গত লজ্জাবোধ দূর করেছে। তার কথা শোনে আনন্দে লোকজনের চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। আর হযরত দিরার রাফে'র মুখ থেকে মহিলাদের যুদ্ধের খবর শোনার সাথে সাথে লাফ দিয়ে তাদের সাহায্যের জন্য দৌড়ে যান। তাকে যেতে দেখে হযরত খালিদ বললেন- "দিরার একটু অপেক্ষা কর। তাড়াহুড়ো করো না। কারণ, যে ধীরতা অবলম্বন করছে, সে তার প্রত্যাশা প্রাপ্ত হয়েছে।" দিরার বললেন- "আমীর সাহেব! আমার বোনদের সাহায্যের ব্যাপারে আমি ধীরতা অবলম্বন করতে পারি না।" হযরত খালিদ বললেন, ইনশাআল্লাহ বিজয় নিকটবর্তী। অতঃপর তিনি সাথীদের নিয়ে দামেস্কের পথের ঐ জায়গাটির দিকে চলতে লাগলেন। যাত্রা পূর্বে সংক্ষিপ্ত ওসীয়তে তিনি বললেন- "হে লোকজন! শত্রুদের কাছে পৌঁছে চতুর্দিক থেকে তাদের ঘিরে ফেলবে। এতে হয়তো আমাদের নারীদের মুক্ত করা যাবে।" তারা বলল ঠিক আছে। এরপর হযরত খালিদ সবার সামনে চলে গেলেন।

📘 ফুতুহুশ শাম 📄 মুসলিম বাহিনীকে দেখে বুট্টোসের হৃদকম্পন

📄 মুসলিম বাহিনীকে দেখে বুট্টোসের হৃদকম্পন


ঐদিকে মহিলাদের সাথে রোমানদের প্রচন্ড যুদ্ধ চলছে। এমন সময় হঠাৎ তারা দেখতে পেল যে, ইসলামের ঝান্ডা নিয়ে মুসলমানরা তাদের দিকে দলে দলে এগিয়ে আসছে। তখন হযরত খাওলা চিৎকার দিয়ে বললেন- "ওহে তাবাবিআ বংশের নারীরা! কা'বার মালিকের কসম! তোমাদের জন্য সাহায্য চলে এসেছে।" মুসলিম বাহিনীকে দেখে বুট্টোসের হৃদয়ে কম্পন শুরু হয়ে যায়। আর রোমান সৈন্যরা একে অপরের দিকে তাকাতে শুরু করে। তখন বুট্টোস ডাক দিয়ে বলল, ওহে মহিলারা! আমাদের অন্তরে তোমাদের প্রতি দয়া ও সহানুভূতি চলে এসেছে। কারণ, তোমাদের ন্যায় আমাদের মা-বোন-কন্যা রয়েছে। আমি তোমাদেরকে এখন ক্ষমা করে দিলাম। তোমাদের প্রতি আমাদের কোন কামনা নেই। তোমাদের পুরুষেরা আসলে এ কথা তাদের জানিয়ে দেবে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px