📄 হযরত দিরারের খোঁজ সৈন্য প্রেরণ
হযরত খালিদ তাদেরকে বললেন, আমাদের যে লোক তোমাদের নেতার ছেলেকে হত্যা করেছে, তার ব্যাপারে তোমরা কোন কিছু জান? তারা বলল, উনি মনে হয় সে নাঙ্গা শরীরের লোক। যিনি আমাদের সাথে তীব্র যুদ্ধ করেছেন এবং ছেলেকে হত্যা করে আমাদের নেতাকে ব্যথিত করেছেন। হযরত খালিদ বললেন, তার কথাই জিজ্ঞেস করছি। তারা বলল, ওয়ারদান তাকে একটি খচ্চরের উপর সওয়ার করিয়ে একশত অশ্বারোহী সহকারে হিমসের দিকে পাঠিয়ে দিয়েছেন। যেন হিমসের লোকেরা তাকে সম্রাটের কাছে নিয়ে যায় এবং তার অপরাধের জন্য সম্রাট বিচার করেন।
একথা শোনে হযরত খালিদ খুশী হলেন এবং হযরত রাফে' বিন উমাইরা আততাঈকে ডেকে বললেন, ওহে রাফে! আমার জানা মতে তোমার মত পথ-ঘাট চিনে এরকম লোক আর নেই। তুমিই আমাদেরকে নিয়ে সামাওয়াত থেকে আসার পথে মরুভূমির পথ অতিক্রম করেছ এবং উটদের কে পিপাসার্ত করে সেগুলোকে পানি পান করিয়ে আমাদেরকে রক্ষা করেছিলে আর আমাদেরকে 'আরাকা' পার করিয়েছিলে। আমাদের পূর্বে এ উঁচু মরুভূমি আর কোন বাহিনী অতিক্রম করেনি। তোমার মত কৌশলী আমাদের মাঝে আর কেউ নেই। অতএব, তুমি যাকে পছন্দ কর তাকে নিয়ে যাদের মাধ্যমে তাকে পাঠানো হয়েছে তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে দ্রুত রওয়ানা হয়ে যাও। হতে পারে তাদেরকে তুমি পথে পেয়ে যাবে এবং এটা যদি করতে পার তাহলে তা আমাদের জন্য মহা আনন্দের কারণ হবে।
রাফে বললেন, ঠিক আছে। অতঃপর তিনি একশজন দক্ষ অশ্বারোহী বাছাই করে রওয়ানা হওয়ার জন্য প্রস্তুত হলেন। দিরারের খোঁজে রাফে বিন উমাইরার নেতৃত্বে একদল মুসলমান রওয়ানা হওয়ার এ সুসংবাদ খাওলার কাছে পৌঁছলে আনন্দে তার চেহারা উজ্জ্বল হয়ে যায়। তিনি দ্রুত অস্ত্র নিয়ে বাহনে সওয়ার হয়ে হযরত খালিদের নিকট চলে আসলেন। এসে তাকে বললেন, আমি মুহাম্মদ সা.- এর দোহাই দিয়ে আপনার কাছে আবেদন করছি, রাফে'র সাথে আমাকেও পাঠানো হোক। তখন হযরত খালিদ রাফে'কে বললেন, তুমি এর বীরত্বের ব্যাপারে অবগত আছ। অতএব, তোমার সাথে তাকেও নাও। রাফে' বললেন ঠিক আছে।
📄 মুক্ত হলেন বীর দিরার
খাওলা রাফে'র সাথে রওয়ানা হওয়া দলটির পিছনে পৃথক ভাবে চলছিলেন। হযরত রাফে' যখন সুলাইমা নামক স্থানের কাছাকাছি এসে পৌঁছলেন, তখন ওদের গমনের নিদর্শন দেখা যায় কিনা তা পরখ করার জন্য সেদিকে তাকালেন। অতঃপর তার সাথীদেরকে বললেন, সুসংবাদ গ্রহণ করুন। ওরা এখনও এ পর্যন্ত এসে পৌঁছেনি। অতঃপর তিনি সাথীদেরকে নিয়ে ওয়াদিউল হায়াতে আত্মগোপন করলেন। তারা আত্মগোপন করতে যাচ্ছে- এমন সময় দেখা গেল, ওদের আগমনের ফলে পথে ধুলো উড়ছে। তখন রাফে তার সাথীদেরকে বললেন, হিম্মতের সাথে সবাই প্রস্তুত থাকুন। তারা হিম্মত নিয়ে শত্রুদের আগমনের অপেক্ষায় ওঁৎ পেতে রইলো। কিছুক্ষণের মধ্যে শত্রুরা এসে পৌঁছল। দেখা গেল, হযরত দিরারকে তারা সবাই ঘিরে রেখেছে। এ অবস্থা দেখে হযরত রাফে মুসলমানদের নিয়ে আল্লাহু আকবার বলে তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই দিরারকে মুক্ত করেন। শত্রুদের সবাইকে খতম করে তাদের মাল সামানা তুলে আনা হয়।
হযরত রাফে ও তার সাথীরা যখন দিরারকে নিয়ে চলে আসছিল, তখন পথে দেখতে পায় যে, রোমানরা জীবন নিয়ে পালিয়ে আসছে। তারা একজন আরেকজনের দিকে তাকাচ্ছেও না। হযরত খালিদ দিরারের খোঁজে রাফে বিন উমাইরের নেতৃত্বে একশ অশ্বারোহী পাঠানোর খবর শোনে ওয়ারদান খুব চিন্তিত হল। অন্যদিকে রোমান সৈন্যরা মুসলমানদের হামলার মুখে টিকতে না পেরে পলায়ন শুরু করল। সবার আগে যে পলায়ন করল সে হল ওয়ারদান। মুসলমানরা তাদের ধাওয়া করে তাদের মাল সামানা ও অস্ত্র নিয়ে নেয় এবং তাদেরকে ওয়াদিউল হায়াত পর্যন্ত তাড়িয়ে দেয়। পথিমধ্যে হযরত রাফে বিন উমাইরা ও দিরার বিন আযূরের সাথে তাদের সাক্ষাৎ হলো। তারা তাদেরকে সালাম দেয় এবং দিরারকে দেখে আনন্দ প্রকাশ করে ও তাকে অভিনন্দন জানায়। হযরত খালিদ রাফে'র প্রশংসা করেন। অতঃপর সকলকে নিয়ে দামেস্কে ফিরে আসেন। তারা বিজয় অর্জন করায় ওখানে অবস্থানকারী মুসলমানরা আনন্দিত হল।
📄 রোম সম্রাটের আরেকটি ব্যর্থ চেষ্টা
আজনাদীনে রোম সৈন্যদের পরাজয় ও ওয়ারদানের ছেলে হামদান নিহত হওয়ার খবর রোম সম্রাটের কাছে পৌঁছলে তিনি সিরিয়ার কর্তৃত্ব তার হাতছাড়া হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে গেলেন। অতঃপর ওয়ারদানের নিকট এ পত্রটি লিখেন-
পরকথা, আমার কাছে খবর পৌঁছেছে যে, ক্ষুধার্ত ও নাঙ্গা শরীরওয়ালারা তোমাকে পরাজিত করেছে এবং তোমার ছেলেকে হত্যা করেছে। মসীহ তাকে ও তোমাকে রহম করুন। আমি যদি তোমাকে বীর ও আক্রমনে দক্ষ বলে না জানতাম, তাহলে তোমার উপর আমি অসন্তুষ্ট হতাম। যা হয়েছে হয়ে গেছে। এখন আমি আজনাদীনে নব্বই হাজার সৈন্য পাঠিয়েছি এবং তোমাকে তাদের সেনাপতি মনোনীত করেছি। অতএব, তুমি তাদেরকে নিয়ে দামেস্কবাসীকে রক্ষা কর এবং তোমার সৈন্যদেরকে ফিলিস্তিনে থাকা আরবদেরকে তাদের লোকদের সাহায্যে এগিয়ে আসতে বাধা দেওয়ার জন্য পাঠাও এবং তোমার দ্বীন ও নেতাকে সাহায্য কর।
সম্রাট পত্রটা অশ্বারোহীর মাধ্যমে পাঠিয়ে দেন। ওয়ারদানের নিকট পত্র পৌঁছার পর সে তা পড়ে দেখল। এতে তার অস্থিরতা দূর হল এবং আজনাদীনে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করল। আজনাদীনে পৌঁছলে দেখতে পায়, রোম সৈন্যরা বর্ম ও শিরস্ত্রাণ পরে প্রস্তুত হয়ে আছে। তারা তাকে আসতে দেখে তার দিকে অগ্রসর হয়ে সালাম দেয় এবং তার সন্তানের ব্যাপারে সান্ত্বনা প্রকাশ করে। অতঃপর সে স্থির হয়ে বসার পর তাদের সামনে সম্রাটের বাণী পড়ে শোনায়। তা শোনে তারা আনুগত্যের শপথ করে।
📄 শত্রুদের আগমনের সংবাদ প্রাপ্তি ও পরামর্শ
রওহ বিন তুরাইফ বলেন, আমরা ওয়ারদানকে পরাজিত করে ফিরে আসার পর হযরত খালিদ বিন ওয়ালীদের সাথে দামেস্কের পূর্ব গেইটে অবস্থান করছিলাম। হঠাৎ দেখতে পেলাম, আমাদের মাঝে আব্বাদ বিন সাদ আল হাদরামী এসে উপস্থিত। বলল, আজনাদীন থেকে নব্বই হাজার রোম সৈন্য আপনাদের মোকাবেলা করার জন্য আসছে। এ খবর পৌঁছে দেয়ার জন্য আমাকে কাতিবে ওয়াহী হযরত শুরাহবীল বিন হাসানা বসরা থেকে পাঠিয়েছেন আর রোমানদের মোকাবেলায় প্রস্তুতি গ্রহণ করার জন্য বলেছেন। হযরত খালিদ এ খবর পেয়ে হযরত আবু উবাইদার কাছে চলে গেলেন এবং বললেন- "ওহে আমীনুল উম্মাহ! আব্বাদ বিন সাদকে শুরাহবীল বিন হাসানা এখবর দিয়ে পাঠিয়েছেন যে রোমানদের মহা-তাগুত হিরোক্লিয়াস ওয়ারদানকে আজনাদীনে উপস্থিত রোম সৈন্যদের উপর সেনাপতি বানিয়েছেন। তাদের সংখ্যা নব্বই হাজার। অতএব হে আল্লাহর রাসূলের সাহাবী! এদের মোকাবেলার ব্যাপারে আপনার মতামত কী?"
তখন হযরত আবু উবাইদা বললেন- "ওহে আবু সুলাইমান! রাসুলুল্লাহ সা.-এর সাহাবীরা বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে। যেমন শুরাহবীল বিন হাসানা বসরায়, মুআয বিন জাবাল হাওরানে, ইয়াযীদ বিন আবু সুফ্যান বালাকায়, নু'মান বিন মুগীরা তাদাম্মুর ও আরাকায় ও আমর ইবনুল আস ফিলিস্তিনে। আমার মতে আমাদের এখন করণীয় হচ্ছে, আমাদের দিকে চলে আসার জন্য তাদের নিকট খবর পাঠানো। যাতে আমরা তাদের নিয়ে শত্রুদের মোকাবেলা করতে পারি। আর আমরা সাহায্য ও বিজয় তো কামনা করব আল্লাহর কাছেই।"
তখন হযরত খালিদ আমর ইবনুল আস রা.- এর নিকট এ পত্রটি লিখলেন-
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। পরকথা আপনাদের মুসলমান ভাইয়েরা আজনাদীনের দিকে অভিযানে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। কারণ ওখানে আমাদের দিকে আসার জন্য নব্বই হাজার সৈন্য অবস্থান করছে। তারা চাচ্ছে আল্লাহর আলোকে ফুঁৎকারে নিভিয়ে দিতে, কিন্তু কাফিররা অপছন্দ করলেও আল্লাহ তার আলোকে পূর্ণ করবেন। অতএব, আপনার নিকট যখন আমার এ পত্রটা পৌঁছবে তখনই আপনি আপনার সাথে থাকা মুসলমানদেরকে নিয়ে আজনাদীনের দিকে চলে আসুন। ইনশাআল্লাহ আপনি আমাদেরকে সেখানে দেখতে পাবেন। আপনি ও আপনাদের সাথে থাকা সকল মুসলমানের প্রতি সালাম, আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক।
এছাড়া উপরোল্লেখিত সকল গভর্ণরের প্রতিও সসৈন্য আজনাদীনের দিকে চলে আসার আহ্বান জানিয়ে পত্র পাঠানো হয়। অতঃপর হযরত খালিদ সকল মুসলমানদেরকে মাল-সামানা ও গনীমত নিয়ে আজনাদীনের দিকে রওয়ানা হওয়ার নির্দেশ দিলেন এবং হযরত আবু উবাইদাকে বললেন, আমার রায় হচ্ছে আপনি আল্লাহর রাসূলের বিশিষ্ট সাহাবীদের নিয়ে সামনে থাকবেন আর আমি মাল সামানা গনীমত ও নারী- শিশুদের নিয়ে পিছনে থাকবো।
হযরত আবু উবাইদা বললেন, পিছনে আমি থাকবো আর সৈন্যদের নিয়ে সামনে থাকবেন আপনি। ফলে যখন রোম সৈন্যরা ওয়ারদানের নেতৃত্বে আপনার কাছে এসে পৌঁছবে, তখন তারা আপনাকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত দেখতে পাবে এবং আপনি তাদেরকে নারী ও শিশুদের কাছে পৌঁছতে বাধা দিবেন। তাহলে তারা আমাদের দিকে আসতে ব্যর্থ হবে। হ্যাঁ, আপনি তাদের হাতে নিহত হলে অন্য কথা। নতুবা আমি যদি সাথে থাকি, তাহলে আমি ও আমার সাথে যারা থাকবে তারা শত্রুদের গনীমত হয়ে পড়ব। হযরত খালিদ বললেন, ঠিক আছে আমি আপনার কথা মেনে নিলাম। অতঃপর হযরত খালিদ লোকজনকে উদ্দেশ্য করে বললেন- "ওহে লোকজন! আপনারা এক বিশাল বাহিনীর দিকে যাচ্ছেন। অতএব, আপনারা আপনাদের দৃঢ় সংকল্প ও সদিচ্ছাকে জাগ্রত রাখুন। আর মনে রাখবেন, আল্লাহ আপনাদেরকে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং বলেছেন, আল্লাহর হুকুমে কত ছোট দল কত বড় দলের উপর বিজয় লাভ করে। আর আল্লাহ রয়েছেন ধৈর্যশীলদের সাথে।" অতঃপর হযরত খালিদ সৈন্যদের নিয়ে আগে চললেন। আর হযরত আবু উবাইদা এক হাজার লোককে নিয়ে পরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রয়ে গেলেন।