📄 রাফে বিন উমাইরার ভাষণ
দিরারের কথা শেষ হলে রাফে বিন উমাইরা আততাঈ দাঁড়িয়ে বললেন- "ওহে লোকজন! এ বন্য মোটা গাধাদের কেন ভয় করছেন? আল্লাহ কি আপনাদেরকে অনেক রণাঙ্গনে সাহায্য করেননি? সাহায্য ধৈর্যের উপর নির্ভরশীল। আমাদের বাহিনীতো বড় ছোট অনেক দলের সাথে যুদ্ধ করে আসছে। অতএব, মুমিন পুরুষদের অনুসরণ করুন এবং আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করুন। জালুতের সাথে যুদ্ধের সময় তালুতের বাহিনী যে কথা বলেছিল, আপনারা সে কথার পুনরাবৃত্তি করুন। তারা বলেছিল, হে আল্লাহ! আমাদেরকে ধৈর্য ধরার শক্তি দিন ও দৃঢ়পদ রাখুন। আর আমাদেরকে কাফিরের দলের উপর বিজয় দান করুন"।
হযরত দিরার তাদের একথা শুনলেন এবং জানতে পারলেন যে তারা দুনিয়ার বিনিময়ে আখেরাতকে ক্রয় করে নিয়েছে। তখন তিনি তার লোকজনকে বাইত লাহয়ায় লুকিয়ে যেতে বললেন এবং নিজে পাজামা পরে খোলা গায়ে ও অস্ত্র ছাড়া একটি আরবী ঘোড়ায় সওয়ার হলেন। হাতে ছিল একটি লাঠি। এ অবস্থায় তিনি তার সাথীদের উপদেশ দিচ্ছিলেন।
📄 যুদ্ধের সূচনা ও হযরত দিরারের বীরত্ব
আমর বিন দারিম বলেন, আমি বাইত লাহয়ার দিন দিরার বিন আযুরের সৈন্যদের একজন ছিলাম। শত্রুরা যখন নিকটবর্তী হল, তখন দিরার তাদের মোকাবেলায় সবার আগে বের হয়ে পড়েন। তাঁর বের হওয়ার সাথে সাথে মুসলমানরাও সবাই তাকবীর ধ্বনি সহকারে তার অনুসরণ করে। তাকবীর ধ্বনিতে মুশরিকরা ভীত হয়ে পড়ে। তারা গিয়ে দ্রুত শত্রুদের উপর হামলা শুরু করে।
হযরত দিরার সবার আগে থেকে যুদ্ধ করছিলেন। তার যুদ্ধের তীব্রতা দেখে শত্রুরা ভীত বিহবল হয়ে পড়ে। ওয়ারদানও যুদ্ধের প্রথম কাতারে ছিল এবং তার মাথায় তাদের ক্রুশ লাগানো ছিল। হযরত দিরার তাকে দেখে যখন বুঝলেন, সে শত্রুদের সেনাপতি, তখন তিনি তার দিকে গিয়ে তার উপর বেপরোয়া হামলা চালালেন। হামলায় তার ক্রুশ মাটিতে পড়ে যায়। ক্রুশ মাটিতে পড়ে গেলে তখন সে মনে করল, পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। তাই সে তা তুলে নেওয়ার জন্য চেষ্টা করল। কিন্তু সুযোগ পেল না। তবে একদল মুসলমান তা তুলে নেওয়ার জন্য বাহন থেকে নেমে গেল। হযরত দিরার তাদেরকে দেখে বললেন, ওহে মুসলমানরা! ক্রুশের মালিক আমি। তোমরা ওটার লোভ করো না। রোমানদের সাথে যুদ্ধ শেষ হলে সেটা আমি তুলে নিব। তোমরা এখন যুদ্ধ চালিয়ে যাও।
ওয়ারদান একথা শুনল। সে আরবী বুঝত। তাই সে পলায়ন করার ইচ্ছা করল। তখন সেনা কর্মকর্তারা বলল, ওহে নেতা! আপনি কি শয়তানের ভয়ে পালিয়ে যাচ্ছেন? দিরার ওয়ারদানের অবস্থা দেখে যখন বুঝতে পারলেন, সে পালিয়ে যাচ্ছে, তখন তিনি হুংকার ছেড়ে তার দিকে যেতে লাগলেন এবং তার বর্শা সামনের দিকে লম্বা করে রাখলেন। রোম সৈন্যরা তাকে এ অবস্থায় দেখে চিৎকার দিয়ে বললো, সবাই তাকে চতুর্দিক থেকে ঘেরাও করে ফেলো। তখন তিনি এ পংক্তি আবৃত্তি করছিলেন-
মৃত্যু তো একটি অনিবার্য সত্য ব্যাপার। তা থেকে আমার পালিয়ে যাওয়ার কোন স্থান নেই। আর জান্নাতুল ফিরদাউসই হচ্ছে সর্বোত্তম আবাসস্থল। এটা আমার যুদ্ধ। অতএব, হে উপস্থিত লোকজন! তোমরা সাক্ষী থাক যে, আমার এসব কাজ একমাত্র মানুষের প্রভুর সন্তুষ্টি লাভের জন্য।
এ পংক্তি আবৃত্তি করতে করতে তিনি রোমানদের মাঝে গিয়ে তাদের উপর হামলা শুরু করেন। তার অনুসরণে মুসলমানরাও রোমদের উপর হামলা করে। রোমানরা তাদেরকে ঘিরে ফেলে। হিমসের শাসক ওয়ারদান হযরত দিরারের উপর বর্শা তাক করে এবং রোম সেনা কর্মকর্তারা তাকে ঘিরে ফেলে। হযরত দিরার চতুর্দিক থেকে শত্রুদের আক্রমণ প্রতিহত করে চলছেন এবং তিনি যাদের উপর আঘাত করেছেন, তারা প্রায় সকলেই নিহত হচ্ছে। তার আঘাতে শত্রুদের অনেক লোক নিহত হয়। তিনি এসময় কুরআনের এ আয়াত- "আল্লাহ নিশ্চয় তাদেরকে ভালবাসেন, যারা তার পথে সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় শক্তভাবে কাতারবদ্ধ হয়ে লড়াই করে"-পড়ে পড়ে মুসলমানদেরকে উৎসাহ দিচ্ছিলেন। এক পর্যায়ে রোমানরা সকলে মিলে চতুর্দিক থেকে হযরত দিরারের উপর আক্রমণ করা শুরু করে।
📄 সেনাপতি ওয়ারদানের পুত্র হামদান নিহত
যুদ্ধ প্রচন্ড রূপ নেয়। ওয়ারদানের পুত্র হামদান গিয়ে হযরত দিরারের উপর তীর নিক্ষেপ করে। তীর হযরত দিরারের ডান বাহুতে বিদ্ধ হয়। তিনি ব্যথা অনুভব করা সত্ত্বেও হামদানকে তার বর্শা দ্বারা আঘাত করেন। বর্শা তার বুকে বিদ্ধ হয়ে পিঠের হাড়ে আঘাত হানে। চেষ্টা করা সত্ত্বেও তা বের করা সম্ভব হলো না।
📄 বন্দী হলেন বীর দিরার
তারা হযরত দিরারের উপর আক্রমণ করে তাকে বন্দী করে ফেলে। সাহাবীরা তার বন্দী হওয়া দেখে তাকে মুক্ত করার জন্য শত্রুদের উপর আরো তীব্রভাবে আঘাত হানতে শুরু করে। কিন্তু তারা তাকে মুক্ত করতে সক্ষম হলো না। ফলে তারা যুদ্ধ না করে চলে যেতে চাইল।