📄 যুদ্ধে হযরত খালিদের কবিতা আবৃত্তি
এ কথা বলে হযরত খালিদ তাদের উপর হামলা শুরু করলেন এবং এ কবিতা আবৃত্তি করতে থাকেনঃ
لك الحمد مولانا على كل نعمة مننت علينا بعد كفر وظلمة
وأكرمتنا بالهاشمي محمد فتمم اله العرش ما قد ترومه
وألقهم ربي سريعا ببغيهم وعجل لأهل الشرك بالبؤس والنقم
وشكر لما أوليت من سابغ النعم وأنقذتنا من حندس الظلم والظلم
وكشفت عنا ما نلاقي من الغم بحق نبي سيد العرب والعجم
# হে আমাদের অভিভাবক সকল নেয়ামতের জন্য আপনার প্রশংসা এবং আপনি আমাদের যে প্রচুর নেয়ামত দ্বারা অনুগ্রহ করেছেন, তার জন্য কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
# কুফর ও অন্ধকারে ডুবে থাকার পর আমাদের উপর করুণা করেছেন এবং আমাদেরকে অন্যায় ও অবিচারের অপকার থেকে রক্ষা করেছেন।
# আমাদেরকে হাশেমী বংশের মুহাম্মদ সা. দ্বারা সম্মানিত করেছেন এবং আমরা যে দুঃখের শিকার হতাম, তা দূর করেছেন।
# অতএব, হে আরশের মালিক! আপনি যা চাচ্ছেন তা সম্পন্ন করুন এবং মুশরিকদেরকে শাস্তি দ্বারা দ্রুত পাকড়াও করুন।
# আরব ও অনারবদের নেতা নবীর ওসিলায় তাদের অন্যায়ের কারণে তাদেরকে শীঘ্রই আযাবে নিক্ষেপ করুন।
📄 বাকযোদ্ধার পলায়ন
জারজিস হযরত খালিদের সম্মুখ থেকে তার লোকদের কাছে পালিয়ে গেল। লোকজন তাকে ভয়ে কম্পমান অবস্থায় দেখতে পায়। তাই তারা তার কাছে জানতে চাইল, আপনার পেছনে কী? জারজিস বলল, আমার পেছনে মৃত্যু, যার সাথে লড়াই করা সম্ভব নয় এবং সেই বাঘ যার সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া দুরূহ। তিনি শত্রুদের সেনাপতি। তিনি প্রতিজ্ঞা করেছেন, যেখান থেকে হোক আমাদেরকে খুঁজে বের করবেন। আমি অনেক কষ্টে প্রাণে বেঁচে এসেছি। অতএব, তিনি তার সৈন্যদের নিয়ে আপনাদেরকে সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করার পূর্বে তার সাথে সন্ধি করুন। তারা বলল, তোমার জন্য তোমার পরাজয়ই যথেষ্ট নয়? এ কথা বলে তারা তাকে হত্যা করতে চাইল।
📄 আরেক রোমান নেতার যুদ্ধে গমন
দামেস্কের অধিবাসীরা জারজিসকে নিয়ে এ কথাগুলো বলার সময় হঠাৎ কালুসের সৈন্যরা আযাযীরের কাছে গিয়ে তাকে বলল, আপনি সম্রাটের কাছে আমাদের নেতা কালুসের চেয়ে অধিক সম্মানিত নন। আমরা ও আপনাদের মধ্যে লটারীর মাধ্যমে কথা হয়েছিল যে, আগে কালুস লড়বেন তারপর আপনি যাবেন। অতএব, এখন আপনি খালিদের কাছে গিয়ে তাকে হত্যা করে কিংবা বন্দী করে আমাদের নেতাকে মুক্ত করে আনুন। আর যদি আপনি তা না করেন তাহলে আমরা মসীহের সত্যতার কসম খেয়ে বলছি, আমরা আপনার সাথে লড়াই করব। তখন আযাযীর নিজের খোড়া গর্তে নিজেই পতিত হয়েছে টের পেয়ে বলল, তোমরা ধ্বংস হও! তোমরা কি মনে করেছ যে, আমি এই বেদুঈনের মুকাবেলায় প্রথমে বের হতে ভয় পেয়েছি? আমিতো প্রথমে গিয়ে লড়াই করিনি এজন্য, যাতে তোমাদের নেতার দুর্বলতা প্রকাশ হয়ে যায়। শীঘ্রই উভয় দল দেখতে পাবে কে বড় বীর যোদ্ধা ও কে রণাঙ্গনে অধিক দৃঢ়পদ। অতঃপর সে তার ঘোড়া থেকে নেমে বর্ম পরিধান করল এবং আগের চেয়ে একটি ভাল ঘোড়ায় আরোহণ করল। তারপর ইসলামের মহান বীর খালিদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য বের হল।
📄 রোমান নেতার সাথে হযরত খালিদের কথোপকথন
যখন সে হযরত খালিদের নিকটবর্তী হল, তখন বলল, ওহে আরব ভাই! আমার কাছে আস আমি তোমার সাথে কথা বলব। এ লোক আরবী ভাষা বলতে পারত। তার কথা শুনে হযরত খালিদ বললেন, হে আল্লাহর শত্রু, তুমি মাথা নিচু করে আমার কাছে আস। হযরত খালিদ তার উপর হামলা করার ইচ্ছা করলেন। অবস্থা বুঝে সে নত হয়ে বলল, আরব ভাই! আমি তোমার কাছে আসছি। তখন হযরত খালিদ বুঝতে পারলেন, সে ভীত। ফলে তিনি নিজেকে সংবরণ করলেন। সে হযরত খালিদের কাছে এসে বলল, তুমি কেন আমার উপর হামলা করতে চাইলে, তোমার কি মৃত্যুর ভয় নেই? যদি তুমি নিহত হও তাহলে তোমার সাথীরা নেতাহারা হয়ে যাবে।
হযরত খালিদ বললেন, হে আল্লাহর শত্রু তুমি তো আমার দুই সাথীকে দেখেছ। যদি আমি তাদেরকে অনুমতি দিতাম, তাহলে তারা আল্লাহর সাহায্যে তোমার সৈন্যদের পরাজিত করে ছাড়ত। আমার সাথে অনেক পুরুষ রয়েছে। তাদের প্রত্যেকেই মৃত্যুকে গনীমত ও বেঁচে যাওয়াকে লোকসান মনে করে। অতঃপর হযরত খালিদ তাকে বললেন, তুমি কে? সে বলল, তুমি আমার নাম শোননি? আমি সিরিয়ার বীর, রোমানদের যোদ্ধা ও তুর্কী সৈন্যদের উচিত শিক্ষা প্রদানকারী। হযরত খালিদ বললেন তোমার নাম কী? বলল আমিতো সে ব্যক্তি, যে মৃত্যুর ফেরেশতার নামে নাম ধারণ করেছে। আমার নাম আযাযীর। হযরত খালিদ তার কথা শুনে হেসে উঠলেন এবং বললেন, আল্লাহর শত্রু! তুমি কি আমাকে ভয় দেখাচ্ছ? তুমি যার নামে নাম ধারণ করেছ তিনি তোমাকে জাহান্নামে পৌছে দেয়ার জন্য খোঁজ করছেন। আযাযীর বলল, তোমার কয়েদি কালুসের সাথে কী ব্যবহার করেছ? হযরত খালিদ বললেন, সে শিকল ও বেড়ী দিয়ে বাঁধা।
আযাযীর বলল, তাকে হত্যা করতে তোমাকে কে বাধা দিয়েছে। অথচ সে রোমানদের একজন বড় বীর। হযরত খালিদ বললেন, আমি তোমাদের সবাইকে হত্যা করতে চাই। সে জন্য এখন তাকে হত্যা করিনি। আযাযীর বলল, একহাজার রৌপ্য মুদ্রা, দশ জোড়া রেশমী পোষাক ও পাঁচটি ঘোড়ার বিনিময়ে তুমি কি তাকে হত্যা করে আমার কাছে তার মাথা নিয়ে আসতে পারবে? ইসলামের বীর হযরত খালিদ বললেন, এটাতো তার জন্য দিচ্ছ, কিন্তু তোমার নিজের মুক্তির জন্য কী দিবে? এ কথা শুনে আযাযীর খুব রাগান্বিত হল এবং বলল, তুমি আমার কাছে কী চাও? হযরত খালিদ বললেন, তুমি লাঞ্ছিত ও অপদস্ত হয়ে জিযয়া দাও!
আযাযীর বলল, আমরা তোমাদেরকে যত সম্মান করতে চাচ্ছি তোমরা আমাদেরকে তত অসম্মান করতে চাচ্ছ। অতএব, তুমি প্রস্তুতি গ্রহণ কর। আমি এখনই তোমাকে নিঃসঙ্কোচে হত্যা করব। হযরত খালিদ কথিত আযাযীরের কথা শুনে তার উপর এমন ভাবে হামলে পড়লেন যেন হঠাৎ বিজলী চমকে উঠল। তিনি তার একটি অস্ত্রও ছিনিয়ে নিলেন। গোটা সিরিয়ায় আযাযীরের বীরত্বের খ্যাতি ছিল। হযরত খালিদ যখন তার দিকে তাকালেন, সে তখন তার বীরত্ব প্রকাশ করতে চাইল। হযরত খালিদ তার অবস্থা দেখে মৃদু হাসলেন। তখন আযাযীর বলল, আমি চাইলে তোমার উপর হামলা করতে পারি। কিন্তু আমি তোমাকে কিছু করছি না শুধুমাত্র তোমাকে বন্দী করার জন্য। বন্দী করার পর তোমাকে একটি শর্তে ছেড়ে দেয়া হবে, তা হচ্ছে তুমি আমাদের যে এলাকাগুলো দখল করেছ সেগুলো ছেড়ে দিয়ে চলে যাবে। আযাযীরের এ কথা শুনে হযরত খালিদ বললেন, ওহে আল্লাহর শত্রু! তোমার তো লোভ বেড়ে গেছে দেখছি। আমাদের ক্ষুদ্র এ দলটি তাদাম্মুর, হাওরান ও বসরা পদানত করেছে। এরা জান্নাতের বিনিময়ে নিজেদের প্রাণকে বিক্রি করে দিয়েছে এবং ক্ষণস্থায়ী জগতের পরিবর্তে চিরস্থায়ী জগতকে বেছে নিয়েছে। শীঘ্রই তুমি দেখতে পাবে, আমাদের কে কাকে পরাজিত করে। অতঃপর হযরত খালিদ তাকে যুদ্ধের কিছু মহড়া দেখালেন। তা দেখে আযাযীর তার পূর্বের কথাগুলোর জন্য অনুতপ্ত হল এবং বলল, ওহে আরব ভাই! তুমি খেলাধুলা করতে জান না? হযরত খালিদ বললেন, আমার খেলাধুলা হচ্ছে আল্লাহর কথা মেনে শত্রুকে ঘায়েল করা।
অভিশপ্ত আযাযীর এরই মাঝে হযরত খালিদের উপর হামলা করল এবং তাকে তরবারী দ্বারা আঘাত করল। কিন্তু তরবারীর আঘাতে খালিদের কোন ক্ষতি হয়নি। হযরত খালিদের তৎপরতা ও দৃঢ়তা দেখে আযাযীর দিশেহারা হয়ে গেল এবং বুঝে নিল যে, তার পক্ষে হযরত খালিদের মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। তখন সে পালিয়ে গেল। তার ঘোড়া হযরত খালিদের ঘোড়ার চেয়ে দ্রুতগামী ছিল।
হযরত আমের বিন তুফাইল বলেন, আমি দামেস্কের যুদ্ধের দিন সৈন্যদের মাঝখানে ছিলাম এবং হযরত খালিদ ও আযাযীরের মাঝে যে ঘটনা ঘটে ছিল, তা প্রত্যক্ষ করছিলাম। আযাযীর যখন পালিয়ে গেল এবং হযরত খালিদের ঘোড়া তার ঘোড়াকে অতিক্রম করতে সক্ষম হল না, তখন তার অন্তরে লোভ জাগলো ও মনে মনে বলল যে বেদুঈন আমাকে ভয় করেছে। অতএব, সে আমার কাছে আসা পর্যন্ত দাঁড়াই এবং সে আসলে তাকে গ্রেফতার করে নেব। হয়তো মসীহ আমাকে তার উপর সাহায্য করবেন অতএব সে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ পর হযরত খালিদ তার নিকট গিয়ে পৌঁছেন। হযরত খালিদের ঘোড়া ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। হযরত খালিদ তার নিকট গিয়ে পৌঁছলে সে চিৎকার দেয় এবং বলল, ওহে আরব! তুমি মনে করো না যে, আমি তোমার ভয়ে পলায়ন করছি। আমি তোমাকে হত্যা করিনি তোমার যুবক সৈন্যদের প্রতি করুণা করে। অতএব, তুমি তোমার প্রতি অনুগ্রহ কর। আর যদি তুমি মৃত্যু কামনা কর, তাহলে আমি মৃত্যু নিয়ে তোমার কাছে আসছি। আমি হচ্ছি প্রাণ কবজকারী ও মৃত্যুর ফেরেশতা।
তার কথা শুনে হযরত খালিদ তার ঘোড়া থেকে নেমে তরবারী কোশমুক্ত করে তার দিকে শিকারী সিংহের মত দৌড়ে গেলেন। আযাযীর হযরত খালিদকে ঘোড়া থেকে নেমে আসতে দেখে তাঁকে হত্যার জন্য প্রস্তুত হয়ে থাকে। হযরত খালিদ গিয়ে কৌশলে তার ঘোড়ার পায়ে আঘাত করেন। সে হযরত খালিদের উপর আঘাত করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়। হযরত খালিদের তরবারীর আঘাতে ঘোড়ার পা কেটে যায়। ফলে আল্লাহর দুশমন মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। মাটিতে পড়ার সাথে সাথে সে উঠে তার দলের দিকে পালিয়ে যেতে উদ্যত হয়। কিন্তু হযরত খালিদ দৌড়ে গিয়ে তাকে ধরে ফেললেন এবং বললেন, ওহে আল্লাহর শত্রু! তুমি যে রূহ কবজকারী ফেরেশতার নামে নাম ধারণ করেছ, তিনি তোমার উপর রাগ করেছেন এবং তোমাকে তালাশ করছেন। এখন তিনি তোমার রূহ কবজ করে তোমাকে জাহান্নামে পৌঁছে দেয়ার জন্য এখানে এসে উপস্থিত হয়েছেন। এ কথা বলে তিনি তার উপর আঘাত করলেন এবং তাকে মাটিতে বিছিয়ে দেয়ার ইচ্ছা করলেন।