📄 সন্ত্রস্ত রোম সেনাপতির কথা
তখন কালুস তার সৈন্যদের বলল, আমি তোমাদের উপর সাহস করে যাচ্ছি। যখন তোমরা আমাকে পরাজিত হতে দেখবে, তখন আমাকে মুক্ত করে আনবে। তার সৈন্যরা বলল, এটা দুর্বল লোকের কথা। এ রকম লোক সফলকাম হতে পারে না। কালুস বলল, আরবদের সেনাপতি একজন বেদুঈন এবং তার ভাষা ও আমার ভাষা ভিন্ন। তখন জারজিস নামীয় এক লোক বলল, আমি আপনার জন্য তার ভাষা অনুবাদ করে দেব। তখন কালুস লোকটিকে নিয়ে ময়দানে গেল। যাওয়ার সময় কালুস জারজিসকে বলল, লোকটি খুব সাহসী। তাই যখন তুমি আমাকে পরাজিত হতে দেখবে, তখন তার উপর হামলা করবে। আর এতে করে আজকের মত আমাদের যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে। আর আগামীকাল আযাযীর তার সাথে মোকাবেলা করতে গেলে নিহত হবে এবং আমরা তার থেকে নিস্কৃতি পাব অতঃপর আমি তোমাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করব। জারজিস বলল, আমি যোদ্ধা নই, তবে আমি তাকে কথা বার্তার মাধ্যমে ভয় দেখাতে পারি। এ কথা বলার পর কালুস আর কিছু বলল না এবং উভয়ে চলতে লাগল। চলতে চলতে তারা যখন হযরত খালিদের নিকটবর্তী হল, তখন তিনি তাদের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেন। এ সময় হযরত রাফে বিন উমাইরা তাদের সাথে মোকাবেলা করার জন্য যেতে চাইলেন। হযরত খালিদ তাকে ডেকে বললেন, তুমি তোমার জায়গায় থাক। এদের জন্য আমিই যথেষ্ট। কালুস ও জারজিস যখন হযরত খালিদের কাছে এসে পৌঁছল, তখন কালুস জারজিসকে বলল, তুমি তাকে তোমার পরিচয় দেবে ও যা বলতে চাও তা বলবে এবং আমাদের শক্তি সামর্থের কথা বলে তাকে ভয় দেখাবে।
📄 রোমানদের বাকযুদ্ধের আশ্রয় গ্রহণ
এরপর জারজিস হযরত খালিদের কাছে এসে বলল, ওহে আমার আরব ভাই! আমি আপনার কাছে একটি দৃষ্টান্ত পেশ করতে চাই। আমরা ও আপনাদের দৃষ্টান্ত হচ্ছে সে লোকের ন্যায় যার কিছু ছাগল আছে এবং সেগুলোকে তিনি একজন রাখালকে চরাতে দিলেন। রাখাল হিংস্র প্রাণীদের ভয় করত। এদিকে একটি বিরাট হিংস্র প্রাণী এসে প্রতি রাতে একটি করে ছাগল নিয়ে যেত। এক সময় যখন সব ছাগল শেষ হয়ে গেল, তখন হিংস্র প্রাণীটি রাখালের উপর হানা দিল। রাখাল নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম হল না। ছাগলের মালিক যখন তার ছাগলের অবস্থা জানলেন, তখন বুঝতে পারলেন তার ছাগল রাখালের কারণেই খোয়া গেছে। তখন তিনি একজন চালাক বালককে তার ছাগল চরানোর জন্য নিয়োগ করলেন এবং ছাগল দিয়ে তাকে চরানোর জন্য পাঠালেন। প্রতি রাত্রে ছাগলের চতুস্পার্শে খুব তুফান বয়ে যেত। এ রকম অবস্থায় বালকটি হঠাৎ দেখতে পেল, হিংস্র প্রাণীটি তার পূর্বের অভ্যাস মত এসে ছাগলের উপর হানা দেয়। তখন বালকটি হিংস্র প্রাণীটির উপর আঘাত হানল এবং তার হাতের কাস্তে দিয়ে আঘাত করে প্রাণীটিকে হত্যা করে ফেলল। এরপর কোন হিংস্র প্রাণী আর ছাগলের কাছে আসেনি। অনুরূপ আপনারা (আরবরা)ও। আমরা আপনাদেরকে তুচ্ছ মনে করতাম। কারণ, আপনাদের মত দুর্বল জনগোষ্ঠী পৃথিবীতে আর ছিল না। আপনারা ভুখা, অসহায় ও দুর্বল ছিলেন এবং ভুট্টা ও যব খাওয়া ও খেজুরের বীচি চোষনে অভ্যস্ত ছিলেন। অতঃপর আপনারা ঐ বাঘের ন্যায় আমাদের দেশে আগমন করলেন এবং যা করার তা করলেন। এখন সম্রাট এমন কিছু সৈন্য পাঠিয়েছেন, যাদের তুলনা হয় না এবং বীরত্বে তাদের কোন জুড়ি নেই। বিশেষ করে আমার পাশে যে লোকটি রয়েছেন, তিনি। অতএব বালক যেমন হিংস্র বাঘের উপর হামলা করে হত্যা করেছেন, ইনিও আপনাকে সে রকম হত্যা করার ভয় করুন। ইনি আমার কাছে আবেদন করেছেন, যাতে আমি এসে আপনার সাথে কথা বলে আপনাকে সতর্ক করি। অতএব, এ বীর আপনার উপর হামলা করার আগে আমাকে বলুন আপনি কী চাচ্ছেন?
📄 হযরত খালিদের সাহসী উত্তর
হযরত খালিদ তার কথা শুনে বললেন, ওহে আল্লাহর শত্রু! আল্লাহর কসম! আমরা তোমাদেরকে কেবল জাল দিয়ে শিকার করা পাখির মতই মনে করি। আর তুমি আমাদের দেশকে দুর্ভিক্ষ ও ক্ষুধার দেশ বলে যে অভিযোগ করেছ, তা ঠিক। তবে আল্লাহ তায়ালা ভুট্টার পরিবর্তে আমাদেরকে গম, ফল-মূল, ঘি ও মধু দান করেছেন। এসব কিছুকে আল্লাহ তা'আলা আমাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং তাঁর নবীর জবানে আমাদেরকে তা দান করার ওয়াদা করেছেন। আর তুমি যে বললে আমরা তোমাদের কাছে কী চাচ্ছি, তার জবাবে বলতে চাই, আমরা তোমাদের কাছে তিন বিষয়ের যে কোন একটি কামনা করি। তা হচ্ছে, (১) ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা বা (২) আমাদেরকে জিযয়া প্রদান করা (৩) নতুবা যুদ্ধ। আর তুমি যে বলেছ এ লোকটি তোমাদের অনেক বড় নেতা ও বীর। ও আমাদের কাছে অনুল্লেখযোগ্য। সে যদি তোমাদের রাজ্যের একটি খুঁটি হয়, তবে আমি ইসলামের খুঁটি এবং তার মহান বীর ও রাসূলুল্লাহ সা. এর সাহাবী।
📄 দামেস্কের কাছে রোমানদের লাঞ্ছনাকর পরাজয়
জারজিস হযরত খালিদের কথা শুনে পিছনে হটল এবং তার চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। তখন কালুস তাকে বলল, ওহে ধ্বংস হও। কী অবস্থা? প্রথমে তার কাছে সিংহের ন্যায় কথা বলেছিলে আর এখন পিছনে সরে যাচ্ছ কেন? বলল, আমি জানতাম না তিনি এত সাহসী অশ্বারোহী ও হিংস্র বীর। ও-ই তাদের সে নেতা যে গোটা সিরিয়ায় ফাসাদ সৃষ্টি করেছে। কালুস বলল তাকে বলে আগামী কাল পর্যন্ত যুদ্ধ মুলতবী রাখা যায় কিনা দেখ। তখন সে হযরত খালিদের কাছে গিয়ে বলল, আমীর সাহেব! আমাদের নেতা তার সৈন্যদের সাথে গিয়ে পরামর্শ করতে চান। হযরত খালিদ তাকে বললেন ধ্বংস হও। তুমি কি আমাকে ধোকা দিতে চাচ্ছ। এ বলে তিনি তাঁর বর্শা জারজিসের দিকে তাক করলেন। জারজিস এ অবস্থা দেখে মুখ বন্ধ করে পালিয়ে যায়। হযরত খালিদ যখন দেখলেন, জারজিস পালিয়ে যাচ্ছে, তখন তিনি কালুসের উপর হামলা করলেন। কিন্তু কালুস হযরত খালিদের আঘাত থেকে বেঁচে যায়। হযরত খালিদ যখন দেখলেন, কালুস আঘাত থেকে বেঁচে গেছে, তখন তিনি তার চুল ধরে টান দিলেন। এবং তাকে তার ঘোড়ার জিন থেকে নামিয়ে ফেললেন। মুসলমানরা যখন হযরত খালিদের এ অবস্থা দেখলে, তখন সবাই তাকবীর ধ্বনি দিল এবং অশ্বারোহীরা তাঁর দিকে দৌড়ে গেল। যখন তারা কালুসের কাছে গিয়ে পৌঁছলো, তখন সে তাদের দিকে তীর নিক্ষেপ করতে চাইলো। হযরত খালিদ বললেন একে বেঁধে ফেল। তখন সে রাগে ফুসে উঠে চিৎকার শুরু করে। অতঃপর মুসলমানরা বসরার শাসক রুমাসকে নিয়ে আসল এবং বলল, এ কী বলতে চায় শুনুন। রুমাস বললেন, সে বলছে আমাকে হত্যা করবেন না। আমি আপনাদের আমীরের কথা মত জিযয়া দিতে প্রস্তুত।
তখন হযরত খালিদ বললেন, তার সাথে এ ব্যাপারে চুক্তি কর। অতঃপর তিনি তার ঘোড়া থেকে নেমে তাদাম্মুরের শাসকের হাদিয়া দেওয়া ঘোড়ায় আরোহণ করলেন এবং রোমানদের উপর হামলা করার ইঙ্গিত করলেন। তখন দিরার বিন আযূর বললেন, আপনি আরাম করুন। রোমানদের উপর হামলা আমাকে করতে দিন। তার জবাবে খালিদ বললেন, আরাম তো জান্নাতে আগামীতে করব। এ বলে তিনি হামলা করতে প্রস্তুত হলেন। তখন কালুস চিৎকার দিয়ে বলল, আপনার দ্বীন ও নবীর দোহাই! আমার কথা শুনুন। তখন খালিদ হামলা না করে ফিরে আসলেন এবং রুমাসকে বললেন, এ কী বলতে চায় শুনুন। কালুস বলল, তাকে জানান যে, সম্রাট আমাকে আপনাদের উদ্দেশ্যে পাঁচ হাজার সৈন্য দিয়ে পাঠিয়েছেন, যাতে আমি আপনাদেরকে তার রাজ্য থেকে তাড়িয়ে দেই। আমি এসে দেমেস্কের গভর্ণর আযাযীরের সাথে অনেক ঝগড়া-ঝাটি করলাম এবং তার সাথে আমার এমন এমন ঘটনা ঘটেছে। আমি আপনার দ্বীনের সত্যতার দোহাই দিয়ে বলতে চাই যে, সে যখন বের হবে, তখন আপনি তাকে হত্যা করুন। আর যদি সে যুদ্ধ করতে বের না হয়, তাহলে তাকে ডেকে এনে হত্যা করুন। কারণ, সেই হচ্ছে দামেস্কবাসীর আসল নেতা। আপনি তাকে হত্যা করতে পারলে দামেস্ক আপনার হাতে চলে আসবে। তখন হযরত খালিদ রুমাসকে বললেন, বলুন, তাকে ও একেসহ কোন মুশরিককে রেহাই দেবনা।