📄 শহীদ হলো একশত ত্রিশজন মুসলমান
আবদুল্লাহ বিন রাফে বলেন, যখন রোমরা ঘরে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে, তখন আমরা আর তাদের ধাওয়া করলাম না। আমরা আমাদের সাথীদের খুঁজতে লাগলাম। দেখা গেল, আমাদের একশত ত্রিশজন সাথী শাহাদাতের সৌভাগ্য অর্জন করেছে। তাদের মধ্যে দু'জন বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবীও ছিলেন। মুসলমানরা অনেক গনীমত প্রাপ্ত হল। হযরত খালিদ শহীদদের জানাযার নামাজ পড়ালেন এবং তাদেরকে দাফন করার নির্দেশ দিলেন।
📄 ইসলাম গ্রহণকারী রোমান নেতার দুঃসাহস
রাত হলে হযরত আবদুর রহমান বিন আবু বকর, মা'মার বিন রাশেদ ও আরো একশত জন সাহাবীকে পাহারাদারীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। তারা ক্যাম্পের চতুস্পার্শ্বে টহল দিচ্ছিল। হঠাৎ দেখা গেল বসরার শাসক তাদের দিকে এগিয়ে আসছেন। তিনি এসে বললেন, খালিদ বিন ওয়ালিদ কোথায়? তারা তাকে হযরত খালিদের নিকট নিয়ে আসলেন। হযরত খালিদ তাকে শুভেচ্ছা জানালেন। তিনি বললেন, আমীর সাহেব, আমি আপনার কাছ থেকে ফিরে যাবার পর আমার লোকেরা আমাকে তাড়িয়ে দিয়ে বলল, তুমি তোমার প্রাসাদে চলে যাও, না হলে তোমাকে হত্যা করা হবে। ফলে আমি আমার প্রাসাদে অন্তরীণ থাকলাম। আর আমার প্রাসাদটা শহরের দেয়ালের সাথে লাগানো। তারা যুদ্ধে পরাজিত হয়ে পর নিজ নিজ বাড়ীতে আশ্রয় নিয়েছে। রাত যখন হলো, তখন আমি আমার ছেলেদের দেয়ালে ছিদ্র করার নির্দেশ দিলাম। তারা দেয়াল ভেঙ্গে একটি প্রবেশ পথ তৈরী করল। আমি ওটা দিয়ে বের হয়ে আপনার কাছে আসলাম।
📄 পুনরায় অভিযান ও রোম সেনাপতিকে হত্যা
হযরত খালিদ রুমাসের একথা শুনার পর আবদুর রহমান বিন আবু বকরকে একশত সৈন্য নিয়ে রুমাসের সাথে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। হযরত দিরার বিন আযূর বলেন, আমি ঐ একশত সৈন্যের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম। যখন আমরা শহরে ঢুকে রুমাসের প্রাসাদে প্রবেশ করলাম, তখন তিনি আমাদের জন্য অস্ত্রাগার খুলে দেন। আমরা ঐ অস্ত্রগুলো নিয়ে চার ভাগে বিভক্ত হয়ে গেলাম। প্রত্যেক ভাগে আমরা পঁচিশজন করে ছিলাম। হযরত আবদুর রহমান বিন আবু বকর বললেন, যখন তোমরা আমাদের তরবারীর ধ্বনি শুনতে পাবে, তখন তোমরাও তাকবীর বলবে। আমরা আবদুর রহমানের নির্দেশ মত ওদের উপর হামলা শুরু করলাম।
হযরত আবদুর রহমান তার সাথীদের অভিযানের নির্দেশ দেওয়ার পর রুমাস এবং তিনি অস্ত্রসজ্জিত হয়ে দীরজানের খোঁজে বের হন। তাদের সাথে দিরার, রাফে ও শুরাহবীল বিন হাসানাও যান। রুমাস দীরজানের কক্ষে পৌঁছার পর দীরজান বলল, তোমাকে স্বাগতম ও শুভেচ্ছা জানানো নয়, কে এসেছে তোমার সাথে? রুমাস বললেন, আমার সাথে তোমার একজন বন্ধু এসেছে। সে তোমার সাক্ষাতে আগ্রহী। বলল, তুমি ধ্বংস হও, কে এসেছে বল তোমার সাথে? রুমাস বললেন, আবু বকরের ছেলে। দীরজান একথা শুনে তাকে হত্যা করতে চাইল। যখন দেখা গেল সে হত্যার প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন হযরত আবদুর রহমান তার ঘাড়ে তরবারী দ্বারা আঘাত করলেন। আঘাতে সে লুটিয়ে পড়ে এবং রক্ত প্রবাহিত হতে থাকে। কিচ্ছুক্ষণের মধ্যে সে নিথর হয়ে যায়। তরবারী দ্বারা দীরজানের উপর আঘাত করার পর হযরত আবদুর রহমান আল্লাহু আকবার ধ্বনি দিলেন। তার তাকবীর ধ্বনির সাথে সাথে রুমাসও তাকবীর ধ্বনি দিলেন। বসরা নগরীর বিভিন্ন জায়গায় অভিযানে যাওয়া মুসলমানরাও এ তাকবীর ধ্বনি শুনতে পেয়ে তারাও তাকবীর ধ্বনি দেওয়া শুরু করে। তাদের তাকবীর ধ্বনিতে নগরীর আকাশ বাতাস মুখরিত হয় এবং রোমানদের উপর তীব্র ভাবে আক্রমণ শুরু হয়ে যায়। হযরত খালিদ দূর থেকে তাকবীর ধ্বনি শুনতে পেয়ে গর্জে উঠেন। তখন রুমাসের ছেলেরা তার জন্য নগরীর দরজা সমূহ খুলে দেন। হযরত খালিদ মুসলমানদের নিয়ে নগরীতে প্রবেশ করলেন।
📄 রোমানদের আত্মসমর্পণ
বসরাবাসী যখন দেখতে পেল তাদের দূর্গের দরজা সমূহ দিয়ে মুসলমানরা তরবারী নিয়ে প্রবেশ করছে, তখন সবাই চিৎকার দিয়ে বলল, আল আমান, আল আমান, নিরাপত্তা, নিরাপত্তা। তখন হযরত খালিদ বললেন, এদের উপর তরবারীর আঘাত বন্ধ কর। সকাল হলে বসরাবাসী হযরত খালিদের কাছে এসে বলল, আমরা যদি আপনার সাথে সন্ধি করতাম তাহলে এ ঘটনা ঘটত না। তবে আমরা আপনাকে যে সত্তা সাহায্য করছেন, তার ওসীলায় আপনার কাছে জানতে চাচ্ছি আমাদের নগরীর দরজা সমূহ আপনাকে কে খুলে দিয়েছে? হযরত খালিদ বলতে লজ্জাবোধ করলেন। রুমাস দৌড়ে এসে বললেন - “ওহে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের শত্রুরা! দরজা আমি খুলে দিয়েছি। আর আমি তা করেছি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ ও তোমাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার জন্য"। তারা বলল, আপনি আমাদের লোক না? তখন রুমাস বলল - اللَّهُمَّ لَا تَجْعَلْنِي مِنْهُمْ, رَضِيتُ بِالله رَبَّا وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا وَبِالْكَعْبَةِ ..... “হে আল্লাহ! তুমি আমাকে এদের অন্তর্ভুক্ত করো না। আমি আল্লাহকে রব হিসাবে, ইসলামকে দ্বীন হিসাবে, কাবাকে কিবলা হিসাবে ও কুরআনকে পথ প্রদর্শক হিসাবে গ্রহণ করে সন্তুষ্ট এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই ও মুহাম্মদ সা. আল্লাহর রাসুল"।
তার প্রকাশ্য ইসলামের ঘোষণা শুনে হযরত খালিদ খুশি হলেন। বসরাবাসী তার একথা শুনে ক্ষুদ্ধ হল এবং মনে মনে তাকে হত্যা করার সংকল্প করল। রুমাস এটা টের পান। তাই তিনি হযরত খালিদকে বললেন, আমি এদের সাথে থাকতে চাই না। আপনি যেখানে যাবেন, আমি সেখানে চলে যেতে চাই। পরে যখন আপনি সিরিয়া বিজয় করবেন এবং সেখানে আপনাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে, তখন আমাকে বসরার শাসন ক্ষমতা ফিরিয়ে দিবেন।
মা'মার বিন সালিম তার দাদা থেকে বর্ণনা করেন যে, রুমাস আমাদের সাথে খুব আন্তরিকতার সাথে যুদ্ধ করেন। অতঃপর যখন আমরা সিরিয়া বিজয় করলাম, তখন হযরত আবু উবাইদা হযরত উমর রা. এর নিকট তাঁর ব্যাপারে পত্র যোগাযোগ করেন। ফলে উমর রা. তাকে বসরার শাসক হিসেবে নিয়োগ দেন। কিন্তু অল্প দিন পরই তাঁর ইন্তিকাল হয়।