📄 মুসলমানদের অবস্থা
আমর বিন গিয়াস বলেন, এ সময় আমি হযরত আমর ইবনুল আসকে দেখলাম তার হাতে ঝান্ডা এবং তার বর্শা পাশে পড়ে আছে। তিনি আওয়াজ করে বললেন, 'যারা লোকদের আমার কাছে নিয়ে আসবে, আল্লাহ তার হারানো বস্তু তাকে ফিরিয়ে দিক। এসব চেহারা গুলোর কল্যাণ হোক, যেগুলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। আপনাদের জন্য কি এটাই যথেষ্ট নয়, আল্লাহ আপনাদের শত্রুদের উপর বিজয় দান করেছেন'। তারা বললেন, আমরা গনীমত চাই না আমরা জিহাদ করতেই এসেছি।
📄 শহীদ হলেন যারা
যুদ্ধ শেষে একে অপরের খোঁজ নেয়া ছিল মুসলমানদের কাজ। খোঁজ করে দেখা গেল, তারা একশত ত্রিশজন সাথীকে চির তরে হারিয়ে ফেলেছেন। এ একশত ত্রিশ জন শহীদেরা হলেন- সাইফ বিন উবাদা, নওফল বিন দারিম, উহুব বিন শাদ্দাদ। আর বাকীরা কিছু ইয়ামনের ও কিছু মদীনার পাহাড়ী এলাকার। আমর ইবনুল আস তাদের হারানোর কারণে দুঃখিত হলেন। অতঃপর নিজেকে নিজে বললেন, তাদের প্রতি কল্যাণ অবতীর্ণ হয়েছে। তা সত্ত্বেও হে আমর! তুমি তা কামনা করনি। অতঃপর তিনি আবু বকর রা. এর নির্দেশ মত লোকদের নিয়ে নামায পড়লেন এবং যে নামাযগুলো কাযা হয়ে গিয়েছিল, তার সবটাই পৃথক পৃথক আযান ও ইকামতের সাথে আদায় করা হল। আবদুল্লাহ বিন উমর রা. বলেন, আমর ইবনুল আসের সাথে কম সংখ্যক লোকই নামায পড়লেন। তিনি লোকজন নিয়ে নামায পড়েন। অতঃপর গনীমত একত্রিতকরণ ও শহীদ ভাইদের লাশ তুলে আনার নির্দেশ দেন। তাদের মধ্যে সাঈদ বিন খালেদের লাশও পাওয়া গেল। আমর ইবনুল আস রা. তার প্রতি তাকিয়ে কেঁদে ফেললেন এবং বললেন, رَحِمَكَ اللَّهُ فَقَدْ نَصَحُتَ لِدِينِ اللَّهِ وَأَدَّيْتَ النَّصِيحَةَ. "আল্লাহ তোমাকে রহম করুন। তুমি আল্লাহর দ্বীনের সাহায্য ও হিতাকাংখা করেছ।” অতঃপর শহীদদের জানাযা পড়ে তাদের লাশ দাফন করার নির্দেশ দেন এবং আবু উবাইদা রা. এর কাছে একটি পত্র লেখেন।
📄 হযরত আবু উবাইদার কাছে প্রেরিত পত্র
আল্লাহর নামে শুরু করছি, যিনি করুণাময় ও মহান দয়ালু। আমর ইবনুল আসের পক্ষ থেকে আমীনুল উম্মাহের প্রতি।
“প্রথমে আমি সেই মহান আল্লাহর প্রশংসা করছি, যিনি ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। আর তাঁর নবী মুহাম্মদের জন্য আল্লাহর রহমত কামনা করি। আমি ফিলিস্তিনে পৌঁছে গেছি। রোবীস নামের এক রোমান সেনাপতির নেতৃত্বে একলক্ষ রোমীয় সৈন্যের মুখোমুখি হয়েছি। এতে আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বিজয় দান করেছেন। পনের হাজার রোমান সৈন্য নিহত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা একশত ত্রিশজন মুসলমানের প্রাণের বিনিময়ে আমার হাতে ফিলিস্তিনকে বিজয় দান করেছেন। আপনি যদি আমাকে আপনার কাছে চলে আসতে বলেন, তাহলে আমি আপনার নিকট চলে আসছি। আপনার প্রতি শান্তি আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক”।
পত্রটি আবু আমের আদদৌসিকে দিয়ে আবু উবাইদা রা.-এর নিকট পাঠানো হল। আবু আমের পত্র নিয়ে খুব দ্রুত চলে গেলেন। তিনি গিয়ে দেখলেন, আবু উবাইদা রা. সরবে সিরিয়ায় প্রবেশ করছেন। আবু আমের তার নিকট গিয়ে পৌঁছলে তিনি বললেন, কী খবর? তিনি বললেন, ভাল। এটা আমর ইবনুল আসের পত্র। এতে তিনি আপনাকে তাঁর বিজয়ের সংবাদ জানিয়েছেন। অতঃপর তিনি পত্রটা তার হাতে অর্পন করলেন। তিনি পত্র পড়ে আল্লাহর সাহায্যের জন্য আনন্দিত হয়ে সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন। অতঃপর বললেন, আল্লাহর কসম! মুসলমানদের অনেক বিশেষ ব্যক্তিবর্গ নিহত হয়েছেন। তন্মধ্যে সাঈদ বিন খালেদ অন্যতম। আবু আমের বললেন, সাঈদের পিতা খালেদ বিন সাঈদ আবু উবাইদা রা.- এর পাশে বসা ছিলেন। যখন তিনি শুনলেন যে, তার ছেলে নিহত হয়েছেন, তখন তিনি বলে উঠলেন হায় পুত্র! এবং কাঁদতে আরম্ভ করলেন। তার কান্না দেখে সবাই কেঁদে ফেলল। অতঃপর খালেদ রা. তাঁর ঘোড়ায় সওয়ার হলেন এবং পুত্রের কবর দেখার জন্য ফিলিস্তিনে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলেন। তখন আবু উবাইদা রা. বলেন, আপনি আমাদের ছেড়ে কীভাবে চলে যাচ্ছেন! তিনি বললেন, আমি শুধু কবরটা দেখতে যাচ্ছি। আশা করি আল্লাহ আমাকে তাঁর সাথে মিলিত করবেন।
📄 হযরত আবু উবাইদার উত্তর
তখন হযরত আবু উবাইদা আমর ইবনুল আস রা:এর নিকট একটি পত্র লিখলেন। পত্রটি নিম্নরুপ-
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
“আপনিতো নির্দেশ প্রাপ্ত। আবু বকর রা. যদি আপনাকে আমাদের সাথে থাকার নির্দেশ দিয়ে থাকেন, তাহলে আমাদের নিকট চলে আসুন। আর যদি আপনাকে স্বীয় স্থানে দৃঢ়পদ থাকার নির্দেশ দেন, তাহলে আপনি স্বীয় স্থানে দৃঢ়পদ থাকুন। ওয়াস্সালাম”।
পত্রটি ভাজ করে হযরত খালেদ এর হাতে তুলে দেন। অতঃপর তিনি আবু আমেরের সাথে চললেন। যখন তারা হযরত আমর ইবনুল আস রা. এর নিকট এসে পৌঁছলেন, তখন হযরত খালেদ কাদঁতে শুরু করলেন। আমর ইবনুল আস রা. দ্রুতবেগে তাঁর দিকে এসে তাঁর সাথে মোসাফাহা (করমর্দন) করলেন এবং তাঁর সাথে সম্মানজনক আচরণ করেন এবং সাঈদের ব্যপারে তাঁকে শান্তনা দিলেন। অন্যান্য মুসলমানরাও তাঁকে তাঁর ছেলের ব্যাপারে সান্তনা দিলেন। অতঃপর শহীদের পিতা বললেন, يا أيها الناس هل أروى سعيد رمحه وسيفه في الكفار ؟ قالوا : نعم ! فلقد قاتل وما قصر ولقد جاهد في الدين ونصر. فقال أروني قبره فأروه إياه فقام على القبر وقال : ياولدى رزقني الله الصبر عليك وألحقني بك وانا لله وإنا إليه راجعون ووالله إن مكنني لأخذن بثأرك يا ولدى عند الله احتسبتك. "হে সকল লোক! সাঈদ কি তার বর্শা ও তরবারী দিয়ে কাফেরদের উপর হামলা করেছে? সবাই বলল হ্যাঁ, সে লড়াই করেছে এবং এতে কোন ত্রুটি করেনি এবং দ্বীনের জন্য জিহাদ করেছে ও দ্বীনের সাহায্য করেছে। তিনি বললেন, আমাকে তার কবর দেখিয়ে দাও। তার কবর দেখিয়ে দিলেন। তিনি কবরের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন এবং বললেন, হে আমার পুত্র! তোমার জন্য আল্লাহ আমাকে ধৈর্য ধারণ করার তওফীক দান করুন। এবং আমাকেও তোমার সাথে মিলিত করুন। আমরা সবাই আল্লাহর এবং আমরা সকলেই তাঁর কাছে ফিরে যাব। আল্লাহর কসম! যদি আল্লাহ আমাকে সুযোগ দান করেন, তাহলে আমি তোমার হত্যার প্রতিশোধ নেব। হে আমার পুত্র! আমি তোমাকে আল্লাহর কাছে আমার পূণ্য হিসেবে রাখছি”।