📄 আবু দারদা রা.-এর পরামর্শ
অতঃপর মুসলমানগণ আমর ইবনুল আস রা. এর নিকট গিয়ে তাকে যুদ্ধের বিবরণ ও তাতে বিজয়ের সুসংবাদ জানায়। শুনে তিনি খুব খুশী হলেন এবং আল্লাহর প্রশংসা করলেন। অতঃপর বন্দীদের সাথে আরবীতে জেরা করা হল। বন্দীদের মাঝে কেবল তিনজন সিরিয়ার অধিবাসী ছিল। তাদের নিকট তাদের ও তাদের অনাগত সাথীদের অবস্থা কেমন জিজ্ঞেস করা হল। তারা বলল, ওহে আরব সম্প্রদায়! রোবীস এক লক্ষ্য সৈন্য নিয়ে আসছে। বাদশা তাকে ঈলিয়ায় পাওয়া কোন আরবকে ক্ষমা না করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি এ সেনাপতির নেতৃত্বে কিছু সৈন্যদের মসুলমানদের অবস্থার খোঁজ নেয়ার জন্য প্রেরণ করেছেন। আর তাকে তো আপনারা হত্যা করেছেন এবং এখন মনে হয় আপনারা রোবীসের কবলে পড়েছেন। তখন আমর বললেন, আল্লাহ তার মত রোবীসকেও হত্যা করবেন। অতঃপর তাদের সামনে ইসলাম গ্রহনের দাওয়াত পেশ করা হল। কিন্তু তাদের কেউ ইসলাম গ্রহণ করল না। তখন আমর মুসলমানদের বললেন, মনে হয় শীঘ্রই আপনারা এদের প্রধান সেনাপতির মুখোমুখি হচ্ছেন। সে নিহতদের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য আসছে। আর এরা তো (বন্দীরা) আমাদের জন্য বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতঃপর তাদের হত্যা করার আদেশ দিলেন এবং মুসলমানগণ নারায়ে তাকবীর বললেন। তিনি আরো বললেন যে, আপনারা প্রস্তুত হোন। আমার ধারণা, শত্রুরা শীঘ্রই এসে যাবে। যদি তারা আমাদের কাছে এসে পৌঁছে, তাহলে তারা খুব শৌর্য-বীর্যের সাথে লড়াই করবে এবং আমরা যুদ্ধে দুর্বলতা ও ক্লান্তির শিকার হব। আর যদি আমরা তাদের নিকট চলে যাই, তাহলে আশা রাখি আল্লাহর রহমতে আমরা বিজয় ও সফলতা লাভে ধন্য হব। যেমন তাদের পূর্ববর্তীদের সাথে যুদ্ধে আমরা সফল হয়েছি। আর আল্লাহ তাআলা তো আমাদের সাথে কেবল কল্যাণের অঙ্গীকারই করেছেন।
আবু দরদা রা. বললেন, আমরা এখানেই রাত কাটাই। ইনশাআল্লাহ সকালেই আমরা শত্রুর দিকে যাত্রা করব। একথা বলার কিছুক্ষণ পরই দশজন সেনাপতির নেতৃত্বে খৃষ্টানরা চলে আসে। প্রত্যেক সেনাপতির অধীনে দশ হাজার করে ঘোড় সওয়ার সৈন্য। শত্রুদের আগমন দেখে আমর রা. অগ্রসর হয়ে সৈন্যদের বিন্যস্ত করলেন। ডান পার্শ্বের কমান্ডার নিযুক্ত করলেন হযরত যাহহাক রা.-কে এবং বাম পার্শ্বের কমান্ডার নিযুক্ত করলেন হযরত সাঈদ বিন খালেদকে। হযরত আবু দরদা রা.-কে নিযুক্ত করলেন পিছনের অংশের কমান্ডার আর হযরত আমর মক্কাবাসীকে নিয়ে দাড়াঁলেন মাঝখানে। তিনি মুসলামানদেরকে কুরআন তেলাওয়াতের নির্দেশ দিলেন এবং বললেন, আল্লাহর সিদ্ধান্তের উপর ধৈর্য ধারণ করুন ও আল্লাহর প্রতিদান ও জান্নাতের প্রতি আগ্রহী হোন। অতঃপর তিনি সৈন্যদের সারি ঠিক ও তাদেরকে যুদ্ধের জন্য চুড়ান্ত প্রস্তুত করতে লাগলেন। দূর থেকে রোমানদের সেনা প্রধান রোবীস মুসলমানদের এ অবস্থা অবলোকন করে। আমর ইবনুল আস রা. তাদের এমন ভাবে কাতারবদ্ধ করলেন যে, কোন তরবারী, কোন লাগাম ও কোন সওয়ারীকে সারি থেকে সামান্যও এদিক-সেদিক দেখা যাচ্ছে না। যেন তারা সীসা ঢালা একটি প্রাচীর। তারা সবাই কুরআন তেলাওয়াতরত এবং তাদের ঘোড়া সম্মুখে আলো ঝলমল করছে। রোবীস তাদের এ অবস্থা দেখে মুসলমানদের বিজয়ের ঘ্রান পেল এবং তার অন্তরে অস্থিরতা শুরু হল। মনে করল, মুসলমানদের সকলেই খুব সাহসী ও দৃঢ়পদ। তাই সে মুসলমানদের পক্ষ থেকে যুদ্ধ শুরু করার অপেক্ষা করতে লাগল এবং তাদের মধ্যে যে একটা উত্তেজনা ছিল তা নিঃশেষ হয়ে গেল।
📄 শুরু হল যুদ্ধ
মুলমানদের পক্ষ থেকে সর্বপ্রথম যিনি মোকবেলার জন্য অগ্রসর হন তিনি হলেন সাঈদ বিন খালেদ। তার পিতা আমর ইবনুল আস রা.-এর মায়ের ছেলে ছিলেন। তিনি অগ্রসর হয়ে জোরে ডাক দিয়ে বললেন, ওহে অংশীবাদীরা আস! অতঃপর তিনি ডান পার্শের শত্রুদের উপর হামলা করে তাদের বামপার্শ্বে ঠেলে দিলেন এবং অনেক বীর শত্রুদের হত্যা ও জখম করলেন। অতঃপর শত্রুদের মাঝে ঢুকে পড়লেন এবং তাদের সন্ত্রস্ত করে তুললেন। পরে শত্রুরা একত্রিত হয়ে তাকে হত্যা করে ফেলল। তার প্রতি আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক। তিনি নিহত হওয়ায় মুসলমানরা অত্যন্ত দুঃখিত হলেন। সবচেয়ে বেশী যিনি দুঃখিত হলেন তিনি হলেন হযরত আমর ইবনুল আস রা.। তিনি বললেন, হায় সাঈদ! তুমি তো নিজের প্রাণ আল্লাহর কাছে বিক্রি করে দিলে। অতঃপর বললেন, হে যুবকরা! কে যাবে আমার সাথে শত্রুদের উপর হামলা করতে যাতে আমরা যুদ্ধের মোড় কোন দিকে ঘুরে তা এবং সাঈদ বিন খালেদের অবস্থার খোঁজ নিতে পারি। একথা বলার সাথে সাথে হযরত যুলকিলা আল হিময়ারী, ইকরামা বিন আবু জাহল, যাহহাক, হারেছ বিন হিশাম, মাআয বিন জাবাল, আবু দরদা ও আবদুল্লাহ উমর রা. দৌড়ে আসেন। হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর বললেন, শত্রুদের উপর হামলা করতে আমর ইবনুল আসের নেতৃত্বে আমরা সত্তর জন গিয়েছিলাম। শত্রুদের দেখলাম, আমরা যে তাদের উপর হামলা করব তার জন্য তাদের মাঝে কোন উৎকণ্ঠার ছাপ নেই। কারণ, তারা ছিল (সৈন্য ও অস্ত্রের আধিক্যের কারণে) একটা লোহার পাহাড়ের মত।
📄 পালিয়ে গেল শত্রু দল
মুসলমানগণ যখন রোমানদের এ দৃঢ়তা দেখতে পেল, তখন একে অপরকে ডাক দিয়ে বলল, তাদের বাহনের পেটে আঘাত কর। এ ছাড়া তাদের ধ্বংস করার কোন উপায় নেই। তখন মুসলমানগণ তাদের বাহনের পেটে আঘত করা শুরু করে। ফলে শত্রুরা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। তারা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে মুসলমানদের উপর হামলা করা শুরু করল এবং মসুলমানরাও তাদের উপর হামলা আরম্ভ করল। সাহাবীরা বলেন, আমরা রোম সৈন্যদের মাঝে কাল উটের চামড়ার উপর সাদা রেখার মত ছিলাম। আর ফিলিস্তিনের এ যুদ্ধের দিন আমাদের পরিচিতি ছিল 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ও হে আল্লাহ মুহাম্মদ সা.-এর উম্মতকে সাহায্য করুন'-কথাটি। আবু দরদা রা. বলেন, যুদ্ধের প্রচন্ডতার কারণে আমি সঙ্গীত আবৃত্তি করারও সুযোগ পাইনি। যুদ্ধের প্রচন্ডতা এত বেশী ছিল যে, আমরা শত্রুদের হত্যা করছি না নিজেদের ভাইদের হত্যা করছি তা পর্যন্ত আঁচ করতে পারিনি। মুসলমানগণ আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ ভরসা করে দৃঢ়তার সাথে যুদ্ধ করতে লাগল। সকল মুসলিম যোদ্ধা এ দুআ করছিল اللَّهُمَّ انْصُرْنَا عَلَى مَنْ يَتَّخِذُ مَعَكَ شَرِيكًا “হে আল্লাহ আমাদেরকে আপনার সাথে অংশীদার সাব্যস্তকারীদের উপর সাহায্য করুন।”
📄 আসমানী সাহায্য
আবদুল্লাহ বিন উমর রা. বলেন, সূর্য পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়া পর্যন্ত এ যুদ্ধ চলতে থাকে। এ সময় বাতাস প্রবাহিত হচ্ছিল। কিন্তু তারপরও যুদ্ধ থামেনি। হঠাৎ আমি আকাশের দিকে তাকালে দেখতে পেলাম, আসমানে একটি ছিদ্র যা দিয়ে উল্কাপিন্ডের মত কতগুলো অশ্বারোহী সবুজ পতাকা নিয়ে বের হয়ে আসছে। যাদের তরবারী ঝলমল করছে এবং তারা সাহায্যের কথা ঘোষণা করে বলছে, 'হে মুহাম্মদ সা. এর উম্মতরা! সুসংবাদ গ্রহণ কর। আল্লাহ তোমাদের জন্য সাহায্য নিয়ে এসেছেন'। দেখলাম, কিছুক্ষণ পরপরই রোমানরা পরাজিত হয়ে পালিয়ে চলে যাচ্ছে এবং মুসলমানগণ তাদের ঘোড়া নিয়ে ওদের ধাওয়া করে হত্যা করছে। মুসলমানদের ঘোড়া গুলো রোমানদের ঘোড়ার চেয়ে দ্রুতগামী ছিল।