📘 ফুতুহুশ শাম 📄 শুরু হল যুদ্ধ

📄 শুরু হল যুদ্ধ


সেনাপতি আবদুল্লাহ বিন উমর রা. তার সাথীদের বললেন, তাদের আর সুযোগ দিয়ো না। কারণ, তারা আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এসেছে। আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে তাদের বিরুদ্ধে সাহায্য করবেন। আর জেনে রেখো! তরবারীর ছায়াতলে জান্নাত। তখন লোকেরা এমন জোর গলায় লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ বলা শুরু করল যে, আকাশ-বাতাস মুখরিত হল। শত্রুদের উপর সর্ব প্রথম যিনি হামলা করলেন, তিনি হচ্ছেন ইকরামা বিন আবু জাহাল। অতঃপর সাহল বিন আমর ও যাহহাক। অতঃপর মুহাজির ও আনসারগণ। উভয় দল সমান তালে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে ও একদলের তরবারী আরেক দলের উপর দ্রুত চালিত হচ্ছে।

📘 ফুতুহুশ শাম 📄 নিহত হল শত্রুদের সেনাপতি

📄 নিহত হল শত্রুদের সেনাপতি


আব্দুল্লাহ বিন উমর রা. বলেন, আমি যুদ্ধের ময়দানে অবস্থান করছিলাম। এমন সময় একজন রোমান সেনাপতি দেখা গেল। সে মোটা ও দেখতে নির্বোধের মত মনে হচ্ছিল। সে ডানে বামে দৌড়াদৌড়ি করছিল। আমি মনে মনে বললাম, যদি রোমানদের কোন গুপ্তচর থাকে তাহলে এ হচ্ছে সে গুপ্তচর। কারণ সে যুদ্ধবিমুখ। যখন আমি গিয়ে তার প্রতি বর্শা তাক করলাম, তখন তার ঘোড়াটি ভীত বিহ্বল অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকল। তখন আমি তার নিকটবর্তী হলাম এবং এমন ভাব দেখালাম যে আমি পরাজিত হতে যাচ্ছি। অতঃপর তার উপর আঘাত করে বসলাম। আল্লাহর কসম আমার কাছে মনে হল, যেন আমি কোন পাথরের উপর তরবারী দিয়ে আঘাত করলাম এবং আমার তরবারী ভেঙ্গে গেছে। সাথে সাথে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। অতঃপর তার উপর আবার আঘাত করে তার সাজ সরঞ্জাম নিয়ে নিলাম। রোমানরা যখন তাদের নেতাকে এ অবস্থায় দেখতে পেল, তখন তাদের সবাই ভীত বিহ্বল হয়ে পড়ল। ফলে মুসলমানরা তাদেরকে ইচ্ছামত হত্যা করতে লাগল। এ ক্ষেত্রে হযরত যাহহাক ও হারেছ বিন হিশাম বিশেষ ভাবে প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। তারা যেমন সাহসিকতা ও বীরচিত্তে যুদ্ধ করা উচিত, তেমনভাবেই যুদ্ধ করেছেন। এভাবে কিছুক্ষণ যেতে না যেতে কাফিররা পরাজিত হয়ে পলায়ন করা শুরু করল। অতঃপর মুসলমানগণ সবাই একত্রিত হল এবং গনীমত কুড়িয়ে নিল। তখন সাহাবীরা একে অপরকে বলতে লাগল, আদুল্লাহ বিন উমরকে আল্লাহ কী অবস্থায় রেখেছেন কে জানে। একজন বলল, তার দুনিয়াবিমুখতা ও ইবাদত সম্পর্কে আল্লাহ অবগত আছেন। তখন অন্য কয়েক জন বলল, আমরা তাকে দেখেছিলাম। এ বিজয়ে তার চুল পরিমাণ অবদান আছে কিনা আমরা জানি না। আবদুল্লাহ বিন উমর বলেন, আমি পতাকার পশ্চাতে তাদের কথাগুলো শুনছিলাম। তাই আমি আওয়াজ করে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার ও নবী সা. এর উপর দরুদ পড়া শুরু করলাম এবং পতাকা নাড়লাম। মুসলামানগণ যখন পতাকার দিকে তাকাল তখন তারা আমার দিকে দৌড়ে আসল এবং বলল, আপনি কোথায় ছিলেন। তখন আমি বললাম, আমি তাদের নেতার সাথে যুদ্ধ করছিলাম। তখন তারা বলল, আপনি সফলকাম হয়েছেন। আপনার বরকতে আল্লাহ পাক আমাদেরকে এ বিজয় দান করেছেন। তখন আবদুল্লাহ বিন উমর বললেন, সামনের দিকে যাও। অতঃপর তারা শত্রুদের সম্পদ, অস্ত্র, ঘোড়া ও ছয়শত বন্দীকে তার কাছে নিয়ে এলো। এ যুদ্ধে সাতজন মুসলমান শাহাদাত বরণ করেন। মুসলমানগন তাদের কাফন পরিয়ে হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর রা. এর কাছে নিয়ে আসলেন। তিনি তাদের জানাযার নামায পড়ালেন।

📘 ফুতুহুশ শাম 📄 আবু দারদা রা.-এর পরামর্শ

📄 আবু দারদা রা.-এর পরামর্শ


অতঃপর মুসলমানগণ আমর ইবনুল আস রা. এর নিকট গিয়ে তাকে যুদ্ধের বিবরণ ও তাতে বিজয়ের সুসংবাদ জানায়। শুনে তিনি খুব খুশী হলেন এবং আল্লাহর প্রশংসা করলেন। অতঃপর বন্দীদের সাথে আরবীতে জেরা করা হল। বন্দীদের মাঝে কেবল তিনজন সিরিয়ার অধিবাসী ছিল। তাদের নিকট তাদের ও তাদের অনাগত সাথীদের অবস্থা কেমন জিজ্ঞেস করা হল। তারা বলল, ওহে আরব সম্প্রদায়! রোবীস এক লক্ষ্য সৈন্য নিয়ে আসছে। বাদশা তাকে ঈলিয়ায় পাওয়া কোন আরবকে ক্ষমা না করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি এ সেনাপতির নেতৃত্বে কিছু সৈন্যদের মসুলমানদের অবস্থার খোঁজ নেয়ার জন্য প্রেরণ করেছেন। আর তাকে তো আপনারা হত্যা করেছেন এবং এখন মনে হয় আপনারা রোবীসের কবলে পড়েছেন। তখন আমর বললেন, আল্লাহ তার মত রোবীসকেও হত্যা করবেন। অতঃপর তাদের সামনে ইসলাম গ্রহনের দাওয়াত পেশ করা হল। কিন্তু তাদের কেউ ইসলাম গ্রহণ করল না। তখন আমর মুসলমানদের বললেন, মনে হয় শীঘ্রই আপনারা এদের প্রধান সেনাপতির মুখোমুখি হচ্ছেন। সে নিহতদের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য আসছে। আর এরা তো (বন্দীরা) আমাদের জন্য বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতঃপর তাদের হত্যা করার আদেশ দিলেন এবং মুসলমানগণ নারায়ে তাকবীর বললেন। তিনি আরো বললেন যে, আপনারা প্রস্তুত হোন। আমার ধারণা, শত্রুরা শীঘ্রই এসে যাবে। যদি তারা আমাদের কাছে এসে পৌঁছে, তাহলে তারা খুব শৌর্য-বীর্যের সাথে লড়াই করবে এবং আমরা যুদ্ধে দুর্বলতা ও ক্লান্তির শিকার হব। আর যদি আমরা তাদের নিকট চলে যাই, তাহলে আশা রাখি আল্লাহর রহমতে আমরা বিজয় ও সফলতা লাভে ধন্য হব। যেমন তাদের পূর্ববর্তীদের সাথে যুদ্ধে আমরা সফল হয়েছি। আর আল্লাহ তাআলা তো আমাদের সাথে কেবল কল্যাণের অঙ্গীকারই করেছেন।

আবু দরদা রা. বললেন, আমরা এখানেই রাত কাটাই। ইনশাআল্লাহ সকালেই আমরা শত্রুর দিকে যাত্রা করব। একথা বলার কিছুক্ষণ পরই দশজন সেনাপতির নেতৃত্বে খৃষ্টানরা চলে আসে। প্রত্যেক সেনাপতির অধীনে দশ হাজার করে ঘোড় সওয়ার সৈন্য। শত্রুদের আগমন দেখে আমর রা. অগ্রসর হয়ে সৈন্যদের বিন্যস্ত করলেন। ডান পার্শ্বের কমান্ডার নিযুক্ত করলেন হযরত যাহহাক রা.-কে এবং বাম পার্শ্বের কমান্ডার নিযুক্ত করলেন হযরত সাঈদ বিন খালেদকে। হযরত আবু দরদা রা.-কে নিযুক্ত করলেন পিছনের অংশের কমান্ডার আর হযরত আমর মক্কাবাসীকে নিয়ে দাড়াঁলেন মাঝখানে। তিনি মুসলামানদেরকে কুরআন তেলাওয়াতের নির্দেশ দিলেন এবং বললেন, আল্লাহর সিদ্ধান্তের উপর ধৈর্য ধারণ করুন ও আল্লাহর প্রতিদান ও জান্নাতের প্রতি আগ্রহী হোন। অতঃপর তিনি সৈন্যদের সারি ঠিক ও তাদেরকে যুদ্ধের জন্য চুড়ান্ত প্রস্তুত করতে লাগলেন। দূর থেকে রোমানদের সেনা প্রধান রোবীস মুসলমানদের এ অবস্থা অবলোকন করে। আমর ইবনুল আস রা. তাদের এমন ভাবে কাতারবদ্ধ করলেন যে, কোন তরবারী, কোন লাগাম ও কোন সওয়ারীকে সারি থেকে সামান্যও এদিক-সেদিক দেখা যাচ্ছে না। যেন তারা সীসা ঢালা একটি প্রাচীর। তারা সবাই কুরআন তেলাওয়াতরত এবং তাদের ঘোড়া সম্মুখে আলো ঝলমল করছে। রোবীস তাদের এ অবস্থা দেখে মুসলমানদের বিজয়ের ঘ্রান পেল এবং তার অন্তরে অস্থিরতা শুরু হল। মনে করল, মুসলমানদের সকলেই খুব সাহসী ও দৃঢ়পদ। তাই সে মুসলমানদের পক্ষ থেকে যুদ্ধ শুরু করার অপেক্ষা করতে লাগল এবং তাদের মধ্যে যে একটা উত্তেজনা ছিল তা নিঃশেষ হয়ে গেল।

📘 ফুতুহুশ শাম 📄 শুরু হল যুদ্ধ

📄 শুরু হল যুদ্ধ


মুলমানদের পক্ষ থেকে সর্বপ্রথম যিনি মোকবেলার জন্য অগ্রসর হন তিনি হলেন সাঈদ বিন খালেদ। তার পিতা আমর ইবনুল আস রা.-এর মায়ের ছেলে ছিলেন। তিনি অগ্রসর হয়ে জোরে ডাক দিয়ে বললেন, ওহে অংশীবাদীরা আস! অতঃপর তিনি ডান পার্শের শত্রুদের উপর হামলা করে তাদের বামপার্শ্বে ঠেলে দিলেন এবং অনেক বীর শত্রুদের হত্যা ও জখম করলেন। অতঃপর শত্রুদের মাঝে ঢুকে পড়লেন এবং তাদের সন্ত্রস্ত করে তুললেন। পরে শত্রুরা একত্রিত হয়ে তাকে হত্যা করে ফেলল। তার প্রতি আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক। তিনি নিহত হওয়ায় মুসলমানরা অত্যন্ত দুঃখিত হলেন। সবচেয়ে বেশী যিনি দুঃখিত হলেন তিনি হলেন হযরত আমর ইবনুল আস রা.। তিনি বললেন, হায় সাঈদ! তুমি তো নিজের প্রাণ আল্লাহর কাছে বিক্রি করে দিলে। অতঃপর বললেন, হে যুবকরা! কে যাবে আমার সাথে শত্রুদের উপর হামলা করতে যাতে আমরা যুদ্ধের মোড় কোন দিকে ঘুরে তা এবং সাঈদ বিন খালেদের অবস্থার খোঁজ নিতে পারি। একথা বলার সাথে সাথে হযরত যুলকিলা আল হিময়ারী, ইকরামা বিন আবু জাহল, যাহহাক, হারেছ বিন হিশাম, মাআয বিন জাবাল, আবু দরদা ও আবদুল্লাহ উমর রা. দৌড়ে আসেন। হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর বললেন, শত্রুদের উপর হামলা করতে আমর ইবনুল আসের নেতৃত্বে আমরা সত্তর জন গিয়েছিলাম। শত্রুদের দেখলাম, আমরা যে তাদের উপর হামলা করব তার জন্য তাদের মাঝে কোন উৎকণ্ঠার ছাপ নেই। কারণ, তারা ছিল (সৈন্য ও অস্ত্রের আধিক্যের কারণে) একটা লোহার পাহাড়ের মত।

ফন্ট সাইজ
15px
17px