📘 ফুতুহুশ শাম 📄 রোম সম্রাটের ভীতি

📄 রোম সম্রাটের ভীতি


জাহেলিয়াত ও ইসলামের যুগে কিছু নিম্নবর্ণের লোক সিরিয়া থেকে গম, যব, তেল, কাপড় ও সিরিয়ার অন্যান্য পন্য এনে মদীনায় বিক্রি করত। এ ধরণের কিছু লোক মদীনায় ছিল। খলীফাতুল মুসলিমীন হযরত আবু বকর রা. তাঁর সৈন্যদের মদীনায় উপস্থিত করে আমর ইবনুল আসের নেতৃত্বে ফিলিস্তিন ও ঈলিয়া পদানত করার জন্য প্রেরণের আয়োজন এবং আমর ইবনুল আসের প্রতি আবু বকর রা. এর অসিয়তের বিষয়টা ঐ লোক গুলো জানতে পারে। ফলে তারা এ বিষয়টা অবহিত করার জন্য রোম সম্রাট হিরোক্লিয়াসের নিকট চলে যায়। সম্রাট তাদের কথা শোনার পর তার সভাসদ ও সেনাপতিদের উপস্থিত করে তাদেরকে বিষয়টা অবহিত করলেন এবং বললেন, হে রোমবাসী! আমি তোমাদেরকে পূর্বেই সতর্ক করেছিলাম। এ নবীর অনুসারীরা আমার এ সিংহাসন ও রাজমুকুট ছিনিয়ে নেবে এবং খুব শীঘ্রই তারা তোমাদের এ রাজ্যের মালিক হয়ে যাবে। তাবুকে তোমাদের যে সৈন্য পাঠানো হয়েছিলো তারা সবাই নিহত হয়েছে। মোহাম্মদের খলীফা তাঁর সৈন্যদের রওনা করে দিয়েছেন। তারা শীঘ্রই এসে পৌঁছবে। এ দুর্যোগের সময় তোমাদের উচিত হবে নিজেদের ব্যাপারে সতর্ক হওয়া এবং তোমাদের দ্বীন, পরিবার-পরিজন ও জানমনের রক্ষাকল্পে অন্তর খুলে যুদ্ধ করা। এ সময় যদি তোমরা অলসতা কর, তাহলে জেনে রেখ, আরবরা তোমাদের রাজ্য ও ধন-সম্পদের অধিকর্তা হয়ে বসবে। সম্রাটের এ কথা শুনে তারা কান্না-কাটি শুরু করে। হিরোক্লিয়াস তাদের কান্না দেখে বললেন, পুরুষ হয়ে কাঁদছো! কাঁন্না তো মেয়েদের কাজ, এ কান্না ছেড়ে দাও। হিরোক্লিয়াসের প্রধানমন্ত্রী বললেন, যে লোক গুলো আপনার কাছে মসুলমানদের আগমনের খবর নিয়ে এসেছেন তাদেরকে ডেকে আরো কিছু জিজ্ঞেস করা দরকার। সম্রাটের নির্দেশে এক সৈন্য গিয়ে লাখম গোত্রের এক খ্রীষ্টানকে নিয়ে এলো। সম্রাট তার কাছে জানতে চাইলেন, তোমরা মদিনা ছেড়ে এসেছো কতদিন হয়েছে? বললো, পঁচিশ দিন। সম্রাট বললেন, মুসলমানদের বর্তমান নেতা কে? লোকটি বললো, তাদের বর্তমান নেতা হচ্ছে আবু বকর। তিনি একদল চতুর, চালাক ও জানবাজ সৈন্য সংগঠিত করে আপনার দেশের দিকে প্রেরণ করেছেন।

সম্রাট বললেন, তুমি কি আবু বকর কে দেখেছো? বললো, দেখেছি। তিনি তো নিজেই আমার নিকট থেকে চার দিরহাম দিয়ে একটি চাদর ক্রয় করেছেন এবং সেটি তার নিজের কাঁধের উপর রেখেছেন। তিনি সাধারণ মানুষের মতো দুটি কাপড় পরিধান করেই বাজারে আসেন। মানুষের অধিকারের প্রতি লক্ষ্য রেখে দুর্বলদের অধিকার শক্তিমানদের কাছ থেকে নিয়ে দেন। প্রত্যেক ব্যাপারে ধনী ও দরিদ্র উভয়কে সমান দৃষ্টিতে দেখেন। এর পর সম্রাট হিরোক্লিয়াস বললেন, ঠিক আছে। এবার তাঁর শারীরিক গঠনের বর্ণনা দাও। লোকটি বললো, তিনি লম্বা ও গোধুলী বর্ণের, তাঁর মুখমন্ডল হালকা পাতলা এবং তাঁর সামনের দাঁতগুলো খুব সুন্দর। এ বর্ণনা শুনে হিরোক্লিয়াস হেসে উঠলেন এবং বললেন, তিনি মুহাম্মদের সে খলিফা, যার পরিচিতি আমরা আমাদের কিতাব ইঞ্জিলে পেয়েছি। আর আমাদের কিতাবে এও উল্লেখ আছে, এ ব্যক্তির পর যাকে খলীফা নির্বাচিত করা হবে তিনি লম্বা ও দ্রুতগামী সিংহের মত হবেন এবং তাঁর হাতে ব্যাপক বিজয় ও শত্রুদের দেশান্তর ঘটবে। সম্রাটের মুখে এ কথা শুনে খ্রিষ্টান লোকটির নিঃশ্বাস আটকে যাবার উপক্রম হলো এবং বললো, এ ধরণের এক লোককেও তাঁর সাথে দেখেছি। তিনি সব সময় তাঁর সাথে থাকেন। সম্রাট হিরোক্লিয়াস বললেন, তাদের ব্যাপারে এখন আমি নিশ্চিত হলাম। আমি রোমানদের হিদায়াত ও সৎপথে ডেকেছি, কিন্তু তারা আমার কথায় কান দেয়নি। শীঘ্রই আমার সাম্রাজ্যের পতন ঘটবে। এর পর সম্রাট হিরোক্লিয়াস স্বর্ণের একটি ক্রুশ বানিয়ে সেনাপতি রোবীসকে দিয়ে বললেন, আমি তোমাকে সকল সৈন্যের অধিনায়ক নিযুক্ত করলাম। তুমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব গিয়ে মুসলিম বাহিনীর দখল থেকে ফিলিস্তিনকে মুক্ত রাখার ব্যবস্থা কর। কারণ, তা একটি উর্বর ও সমৃদ্ধ ভূখন্ড এবং তা আমাদের সম্মান ও সাম্রাজ্যের উৎস ভুমি। রোবীস সেদিনই সৈন্যদের সংগঠিত করে ক্রুশ নিয়ে আজনাদীনের দিকে রওয়ানা হয়।

📘 ফুতুহুশ শাম 📄 আমর ইবনুল আস রা-এর সৈন্যদের অবস্থা

📄 আমর ইবনুল আস রা-এর সৈন্যদের অবস্থা


আমর ইবনুল আস রা. তাঁর সৈন্যদের নিয়ে ঈলিয়া হয়ে ফিলিস্তিনে পৌঁছেন। দেখা গেল তাদের বাহনগুলো দুর্বল ও ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। আমর ইবনুল আস একটি সবুজ স্থানে গিয়ে তাঁবু গাড়েন এবং উট গুলোকে চরে খাওয়ার জন্য ছেড়ে দেন। যার ফলে পশুগুলোর ক্লান্তি ও দুর্বলতা দূর হয়ে যায়।

📘 ফুতুহুশ শাম 📄 শত্রু বাহিনীর সংখ্যা

📄 শত্রু বাহিনীর সংখ্যা


একদিন মুহাজির ও আনসারগণ একত্রিত হয়ে লড়াই সম্পর্কে পরামর্শে বসেন। হঠাৎ আমের বিন আদী রা. এসে উপস্থিত হন। তাঁর অধিকাংশ আত্মীয়-স্বজন সিরিয়া থাকত। তিনি তাদের কাছে প্রায় সময় আসা যাওয়া করতেন। এ কারণে তাঁর নিকট সিরিয়ার রাস্তা ঘাট পরিচিত ছিল। এসময়ও তিনি সিরিয়া যাচ্ছিলেন। মুসলমানগন তাকে দেখে হযরত আমর ইবনুল আস রা. এর নিকট নিয়ে যান। হযরত আমর ইবনুল আস রা. তার চেহারা বিবর্ণ দেখে জানতে চাইলেন, কি ব্যাপার আমের! আপনি ঘাবড়ে গেছেন কেন? তিনি বললেন, আমার পিছনে রোমান সৈন্যরা পিঁপড়ার মত দল বেধে আসছে। আমর ইবনুল আস রা. বললেন, আপনি মুসলমানদের অন্তরে কাফেরদের ভয় ঢুকিয়ে দিলেন। আমরা আল্লাহর নিকট তাদের বিরুদ্ধে সাহায্য কামনা করছি। বলুন, তাদের সৈন্য সংখ্যা কত বলে অনুভব করলেন। তিনি বললেন আমি একটি উঁচু পাহাড়ে উঠে তাদের সৈন্য সংখ্যা অনুমান করতে চাইলাম। ওয়াদিউল আহমার নামক একটি বড় জায়গা রয়েছে। সে জায়গাটি তাদের তীর বর্শা ও ক্রুশে ভরে গেছে। আমার ধারণা তাদের সৈন্য সংখ্যা এক লাখের কম নয়। আমি তাদের ব্যাপারে এ টুকুই বলতে পারি।

📘 ফুতুহুশ শাম 📄 হযরত আমর ইবনুল আসের পরামর্শ ও সৈন্যদের প্রতি আহবান

📄 হযরত আমর ইবনুল আসের পরামর্শ ও সৈন্যদের প্রতি আহবান


এ কথা শুনার পর হযরত আমর ইবনুল আস রা. বললেন, আমরা আল্লাহর কাছেই সাহায্য কামনা করি। কারণ, সকল শক্তি ও ক্ষমতা তাঁর হাতেই। অতঃপর সৈন্যদের উদ্দেশ্য করে বললেন, يَا أَيُّهَا النَّاسُ أَنَا وَإِيَّاكُمْ فِي هَذَا الْأَمْرِ بِالسَّوَاءِ فَاسْتَعِينُوا بِاللَّهِ عَلَى الْأَعْدَاءِ وَقَاتِلُوْا عَنْ دِينِكُمْ وَشَرْعِكُمْ فَمَنْ قُتِلَ كَانَ شَهِيدًا وَمَنْ عَاشَ كَانَ سَعِيدًا . فَمَاذَا أَنتُمْ قَائِلُونَ ؟ “হে লোক সকল! জিহাদের ব্যাপারে আমি ও আপনারা সকলেই সমান। আল্লাহর শত্রুদের মোকাবেলায় যুদ্ধ জয়ে তাঁরই নিকট সাহায্য কামনা করুন এবং নিজেদের দ্বীনের বিজয়ের জন্য অন্তর খুলে লড়াই করুন। আমাদের মধ্য থেকে যাঁরা নিহত হবেন, তাঁরা শহীদ হবেন এবং যাঁরা বেঁচে যাবেন, তাঁরা ভাগ্যবান হবেন। এ ব্যাপারে আপনাদের কোন মতামত থাকলে আমাকে জানান”। এ কথা শুনে সাহাবীরা তাঁদের মতামত জানান। একদল বললেন, আমীর সাহেব আপনি আমাদের নিয়ে 'বারয়া' হয়ে 'বাইদায়' চলে যান। কারণ, শত্রুরা গ্রাম ও দুর্গম এলাকা অতিক্রম করে আমাদের কাছে এসে পৌছাতে পারবে না। তারা যখন জানতে পারবে আমরা বারয়ায় ঢুকে পড়েছি, তখন তারা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। অতঃপর আমরা তাদের উপর হামলা করে তাদেরকে পরাজিত করব ইনশাআল্লাহ। সাহল বিন আমর বললেন, এটা দুর্বল লোকের পরামর্শ। তখন মুহাজিরদের একজন বললেন- لَقَدْ كُنَّا مَعَ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَসَلَّمْ نُهْزَمُ الْجَمْعَ الْكَثِيْرَ بِالْجَمْعِ الْقَلِيْلِ وَقَدْ وَعَدَكُمُ اللهُ النَّصْرَ وَمَا وَعَدَ الصَّابِرِيْنَ إِلاَّ خَيْرًا وَقَدْ قَالَ اللهُ تَعَالَى: يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوا قَاتِلُوا الَّذِيْنَ يَلُوْنَكُمُ مِنَ الْكُفَّارِ وَلْيَজِدُوا فِيْكُمْ غِلْظَةً “আমরা রাসূলুল্লাহ সা. এর সময় কম লোক নিয়ে অধিক সংখ্যক লোকদের পরাজিত করতাম। আল্লাহ তো আপনাদেরকে সাহায্যের ও যারা ধৈর্য ধারণ করবে তাদের কল্যাণের ওয়াদা করেছেন। আর আল্লাহ তাআলা বলেছেন, হে মুমিনগণ! তোমরা তোমাদের নিকটস্থ কাফেরদের সাথে যুদ্ধ কর ও তাদের সাথে কঠোর আচরণ কর”। সাহল বিন আমর বললেন, আমি কাফেরদের সাথে যুদ্ধ না করে ফিরে যাব না। অতএব, যার মন চায় যুদ্ধ করুক, আর যার মন চায় ফিরে যাক। তবে যে যুদ্ধ না করে ফিরে যাবে, আমি তাকে দেখে নেব। আবদুল্লাহ বিন উমর রা. তার এ কথার সাথে এক মত হলেন এবং মুসলমানগণ তাকে বললেন, ওহে আবুল ফারুক, আপনি উত্তম কাজ করেছেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px