📄 সেনাপতি হলেন হযরত আমর রা.
হযরত আবুবকর রা.-কে হযরত উমর রা.-এর একথা ভাবিয়ে তোলে। কিন্তু তবুও তিনি খালেদ বিন সাঈদ থেকে পতাকা নিয়ে নেওয়া অপছন্দ করলেন না। আর অন্য দিকে তাঁর প্রতি উমর রা.- এর ভালবাসা, কল্যাণকামিতা ও তিনি রাসূলুল্লাহ সা.-এর একজন বড় সাহাবী হওয়ায় তার বিরোধীতা করাও ভাল মনে করলেন না। তাই তিনি চিন্তিত অবস্থায় হযরত আয়েশা রা.-এর কক্ষে প্রবেশ করেন এবং উমর রা.-এর বিষয়টি তাকে অবহিত করলেন। তখন আয়েশা রা. বললেন, আমি জানি যে, হযরত উমর রা. দ্বীনের অকৃত্রিম সাহায্যকারী এবং তাঁর অন্তরে মুসলমানদের প্রতি কোন বিদ্বেষ নেই। আবু বকর রা. হযরত আয়েশা রা.- এর একথাটি গ্রহণ করলেন এবং আযদ-আল-দাওসীকে ডেকে বললেন, যান সাঈদ বিন খালেদের নিকট এবং তাকে বলুন পতাকা ফিরিয়ে দিতে। তিনি পতাকা ফিরিয়ে দিলেন এবং বললেন, আল্লাহর কসম, তবুও আমি আবু বকরের রা. পতাকা তলে যুদ্ধ করব। কারণ, আমি নিজেকে আল্লাহর পথে উৎসর্গ করেছি।
আবু বকর রা. কাদেরকে রণাঙ্গনে আগে পাঠাবেন সে ব্যাপারে ভাবছিলেন। এ সময় সাহল বিন আমর, ইকরামা বিন আবু জাহল ও হিশাম ইবনুল হারেস রা. তাঁর নিকট আসলেন এবং বললেন, আপনারা সাক্ষী থাকুন যে, আমরা নিজেদেরকে আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গ করেছি। অতএব, আমরা যুদ্ধ না করে কখনো ফিরে যাব না। তখন আবুবকর রা. বললেন- اللهم بلغهم أفضل ما يأملون
"হে আল্লাহ! তাদেরকে তারা যার আশা করছে, তার চেয়ে আরো উচ্চ স্তরে পৌঁছে দিন"।
অতঃপর আবু বকর রা. আমর ইবনুল আস রা.-কে ডেকে আনলেন এবং তার কাছে পতাকা হস্তান্তর করে বললেন, আমি আপনাকে এ বাহিনী তথা মক্কাবাসী, তায়েফবাসী, হওয়াযেন ও বনী কিলাবের লোকদের উপর সেনাপতির দায়িত্ব অর্পণ করলাম। এখন আপনি ফিলিস্তিনের দিকে যাত্রা শুরু করুন। আর আপনার প্রতি নসিহত হল আবু উবাইদা রা.-এর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলবেন ও তিনি কোন ব্যাপারে সাহায্য কামনা করলে সাহায্য করবেন এবং তার পরামর্শ গ্রহণ করা ছাড়া কোন ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন না। চলুন, আল্লাহ আপনার ও তাদের সবার কল্যাণ করুন।
📄 আবু বকর রা.-এর ওসীয়ত
একথা শোনার পর হযরত আমর ইবনুল আস রা. হযরত উমর রা.-এর নিকট গেলেন এবং বললেন, আপনি যদি খলীফার সাথে কথা বলে আমাকে আবু উবায়দার আমীর নির্দ্ধারণের আবেদন জানাতেন, তাহলে ভাল হত। হে আবু হাফস! আপনি শত্রুর প্রতি আমার কঠোরতা ও যুদ্ধের উপর আমার ধৈর্য সম্পর্কে অবগত আছেন। আর আপনি তো রাসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে আমার সম্মানজনক অবস্থা দেখেছেন। আমি আশা করি, আল্লাহ তাআলা আমার হাতে দেশ জয় করাবেন ও শত্রুদের ধ্বংস করাবেন। উমর রা. বললেন, আমি আপনার কথা অবিশ্বাস করছি না। তবে এ ব্যাপারে খলীফার নিকট গিয়ে কিছু বলতে আমি অপারগ। কারণ, আবু উবায়দার উপর কেউ আমীর হওয়ার যোগ্যতা রাখে না। আর আবু উবায়দার সম্মান আমাদের নিকট আপনার চেয়ে বেশী এবং তিনি আপনার পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। আর রাসূলুল্লাহ সা. তার ব্যাপারে বলেছেন- ((أبو عبيدة أمين هذه الأمة)) "আবু উবাইদা রা. এ উম্মতের বিশেষ আমানতদার ব্যক্তি"। আমর বললেন, আমি তার উপর সেনাপতি হলে তাঁর মর্যাদায় আঘাত আসবে না। উমর রা. বললেন, হে আমর! ধিক আপনার প্রতি। আপনার কথাবার্তার উদ্দেশ্য হচ্ছে নেতৃত্ব ও মর্যাদা লাভ। অতএব, আপনি আল্লাহকে ভয় করুন এবং কেবল আখেরাতের সম্মান ও আল্লাহর সন্তুষ্টি তলব করুন। তখন আমর ইবনুল আস রা. বললেন, ঠিক আছে আপনি যা বলেন, তাই মেনে নিলাম।
অতঃপর তিনি লোকজনকে তার নির্দেশ মত ফিলিস্তিনের দিকে যাত্রা শুরু করার হুকুম করলেন। ফলে লোকজন চলা আরম্ভ করলেন। মক্কাবাসীরা সবার অগ্রে চলল। আর বনী কিলাব, তাঈ, হওয়াযেন ও সাকীফ গোত্রের লোকজন তাদের পেছনে চলল। আনসার ও মুজাহিদগন আবু উবাইদা রা-এর সাথে যাওয়ার জন্য থেকে যান।
যাওয়ার সময় হযরত আবু বকর রা. হযরত আমর ইবনুল আস রা.-কে অসীয়ত করে বলেন- اتق الله في سرك وعلانيتك واستحيه في خلواتك فأنه يراك و عملك وقد رأيت تقدمتى لك على من هو أقدم منك سابقة وأقدم حرمة فكن من عمال الآخرة وأرد بعملك وجه الله وكن والدا لمن معك وارفق بهم في السير فإن فيهم أهل ضعف . والله ناصر دينه ليظهره على الدين كله ولو كره المشركون، وإذا سرت بجيشك فلا تسر في الطريق التي سار فيها يزيد وربيعة وشرحبيل، بل اسلك طريق إيليا حتى تنتهى إلى أرض فلسطين، وابعث عيونك ياتونك بأخبار أبي عبيدة فإن كان ظافرا بعده فكن أنت لقتال من في فلسطين، وإن كان يريد عسكرا فأنفذ إليه جيشا في أثرجيش وقدم سهل بن عمرو وعكرمة بن ابي جهل والحرথ بن هشام وسعيد بن خالد، وإياك أن تكون وانيا عما ندبتك إليه، وإياك والوهن أن تقول جعلني ابن أبي قحافة في نحر العدو ولا قوة لي به الخ.
"প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সর্বাবস্থায় আল্লাহকে ভয় করবে। একাকী অবস্থায় তাঁকে লজ্জা করবে, কারণ তিনি তুমি কী কাজ করছো তা দেখছেন। তুমি জান, আমি তোমার চেয়ে আগে ইসলাম গ্রহণকারী ও তোমার চেয়ে সম্মানিত ব্যক্তিদের উপর তোমাকে আমীর নিযুক্ত করেছি। অতএব, তুমি আখিরাতের কর্মী হও। আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যেই কাজ করবে। তোমার সাথে যারা রয়েছে, তাদের সাথে পিতৃসুলভ আচরণ করবে ও তাদেরকে নিয়ে আস্তে চলবে। কারণ তাদের মাঝে অনেক দুর্বল লোকও আছে। আল্লাহ তাঁর দ্বীনকে সকল দ্বীনের উপর বিজয়ী করার জন্য তাঁর দ্বীনের অবশ্যই সাহায্য করবেন, যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে। আর তুমি তোমার বাহিনী নিয়ে যাওয়ার সময় সে পথ দিয়ে যাবে না, যে পথ দিয়ে ইয়াযীদ, রবীআ ও শূরাহবীল গেছে, বরং ঈলিয়ার পথ ধরেই ফিলিস্তিনে গিয়ে পৌঁছবে। আর তোমার গোয়েন্দাদের আবু উবাইদার সংবাদ নিয়ে আসার জন্য পাঠাবে। যদি তিনি শত্রুর উপর বিজয় লাভ করেন, তাহলে তুমি ফিলিস্তিনে থেকেই শত্রুর সাথে লড়াই করবে। আর যদি তার সাহায্যের প্রয়োজন হয়, তাহলে তার সাহায্যের জন্য সাহল বিন আমর, ইকরামা বিন আবু জাহল, হারছ বিন হিশাম ও সাঈদ বিন খালেদের নেতৃত্বে পর্যায়ক্রমে সৈন্য পাঠাবে। যে কাজের জন্য তোমাকে পাঠানো হয়েছে, সে কাজে মোটেও অলসতা করবে না। আর তুমি এ বলে হীনমন্যতায় ভুগবে না যে, আমাকে আবু কুহাফার ছেলে (আবু বকর) এমন দুশমনদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য পাঠিয়েছেন যাদের মোকাবেলা করার শক্তি আমার নেই।
আর হে আমর! তুমি অবশ্যই আমাদেরকে বিভিন্ন যুদ্ধ ক্ষেত্রে দেখতে পেয়েছো, আমরা কত মুশরিকদের মুখোমুখি হয়েছি। অথচ আমরা আমাদের শত্রুদের চেয়ে সংখ্যায় কম ছিলাম। অতঃপর হুনাইনের যুদ্ধের দিন আল্লাহ আমাদের কীভাবে সাহায্য করেছিলেন তাও দেখেছ। হে আমর! তুমি স্মরণ রাখবে, তোমার সাথে রয়েছে বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী আনসার ও মুহাজিরগণ। অতএব, তাদের সম্মান করবে, তাদের অধিকারের প্রতি লক্ষ রাখবে এবং তোমার ক্ষমতা আছে বলে তাদের প্রতি কোন ধরণের অন্যায় আচরণ করবে না। আর শয়তান যেন কুমন্ত্রণা দিয়ে তোমার মুখ থেকে একথা বের না করে যে, আমি সবার শ্রেষ্ঠ হওয়ার কারনেই আবু বকর আমাকে তাদের উপর আমীর নিযুক্ত করেছেন। আর তোমাকে যেন তোমার মন ধোকায় ফেলতে না পারে সে ব্যাপারে সচেতন থাকবে। আর তুমি নিজেকে তাদের একজন মনে করবে এবং তুমি যে কাজটি ভাল মনে কর, সে ব্যাপারে তাদের কাছে পরামর্শ চাইবে। আর নামাযের ব্যাপারে খুব সতর্ক থাকবে। নামাযের সময় হলে আযান দিবে। সৈন্যরা সবাই শুনে মত আযান দেওয়া ছাড়া কোন নামায পড়বে না।
অতঃপর তোমার সাথে যারা নামায পড়তে আগ্রহী তাদেরকে নিয়ে নামায পড়বে। তোমার সাথে যে নামায পড়তে চায়, তার জন্য তোমার সাথে নামায পড়াই উত্তম। আর যে কেউ একাকী নামায পড়তে চাইলে তাও তার জন্য যথেষ্ট। আর তোমার শত্রুদের ব্যাপারে সাবধান থাকবে এবং তোমার সাথীদেরকে পাহারাদারীর নির্দেশ দিবে। এরপর তুমি সে ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিবে। আর রাতে মোর সাথীদের নিয়ে দীর্ঘক্ষণ তাদের সাথে কুশল বিনিময় করবে এবং কারও গোপন দোষ প্রকাশ করবে না। শত্রুর যখন মুখোমুখি হবে, তখন আল্লাহকে ভয় করবে। আর যখন তুমি তোমার সাথীদেরকে উপদেশ দিবে, তখন সংক্ষেপে করবে এবং নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখবে, তাহলে তোমার কর্মীরাও নিয়ন্ত্রণে থাকবে। আর নেতা তার অনুসারীদের সাথে যে আচরণ করবে, সে ব্যাপারে আল্লাহর নিকট তাকেই একমাত্র জবাবদিহি করতে হবে। আর আমি তোমাদেরকে এমন আরবদের উপর আমির নিযুক্ত করেছি যাদেরকে তুমি জান। অতএব, তুমি প্রত্যেক গোত্রকে তাদের প্রাপ্য অনুযায়ী সম্মান করবে। আর তুমি তাদের সাথে সহানুভূতিশীল পিতার ন্যায় আচরণ করবে এবং সময় তোমার সৈন্যদের খোঁজখবর রাখবে। আর তোমার সৈন্যদের অগ্রবর্তী দলকে সামনে রাখবে, যাতে তারা তোমার গাইড হতে পারে। যাদেরকে ভাল মনে করবে, পিছনে রাখবে। যখন শত্রুকে দেখবে তখন ধৈর্যধারণ করবে এবং পশ্চাদপসারণ করবে না। তোমার সাথীদের কোরআন তেলওয়াতের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করবে এবং তাদেরকে জাহিলিয়াত যুগের কথাবার্তা থেকে বিরত রাখবে। কারণ, তা পরস্পরের শত্রুতা সৃষ্টি করবে। আর তুমি দুনিয়ার চাকচিক্যের প্রতি বিমুখ থাকবে, যাতে তুমি তোমার পূর্বসুরিদের ন্যায় হতে সক্ষম হও এবং তুমি কোরআনে প্রশংসিত নেতাদের মত হওয়ার চেষ্টা করবে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
وَجَعَلْنَا مِنْهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا وَأَوْحَيْنَا إِلَيْهِمْ فِعْلَ الْخَيْرَاتِ وَإِقَامَ الصَّلُوةِ وَايْتَاءَ الزَّকُوةِ وَكَانُوا لَنَا عَابِدِينَ
আর আমি তাদের মধ্যে থেকে কিছুনেতা ঠিক করলাম, যারা আমার নির্দেশ মতে পথ চলে এবং তাদের নিকট ভাল কাজ সমুহ করার, নামাজ প্রতিষ্ঠা করার এবং যাকাত প্রদানের প্রত্যাদেশ পাঠিয়েছি। আর তারা আমার এবাদতকারী ছিল"।
হযরত আবু বকর রা. যখন আমর ইবনুল আস রা. কে এ অসিয়ত করেছিলেন, তখন হযরত আবু বকর রা. উপস্থিত ছিলেন। অতঃপর তিনি বললেন, তোমরা আল্লাহর রহমতে যাত্রা শুরু করো এবং গিয়ে আল্লাহর দুশমনদের সাথে লড়াই শুরু করো। আর আমি তোমাদেরকে আল্লহ-ভীতির অসিয়ত করছি। আল্লাহ তাআলাকে যারা সাহায্য করে তিনি তাদেরকে সাহায্য করেন। মসুলমানরা সবাই আবু বকর রা. কে সালাম করে তার কাছ থেকে বিদায় গ্রহণ করেন এবং ফিলিস্তিনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। তাদের সংখ্যা ছিল নয় হাজার।
📄 হযরত আবু উবাইদার নেতৃত্বে আরেক অভিযান
এর পরদিন হযরত আবু উবাইদা রা. পতাকা নিয়ে তার সাথে যাওয়ার জন্য যারা রয়ে গিয়েছিল, তিনি তাদেরকে জাবিয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়ার নির্দেশ দিলেন এবং বললেন, ওহে আমীনুল উম্মাহ! আমি আমর ইবনুল আসকে যে অসিয়ত গুলো করিছি, তাতো আপনি শুনেছেন। এর পর সবাই তার কাছ থেকে বিদায় গ্রহণ করলেন।
📄 হযরত খালিদের নেতৃত্বে ইরাক ও পারস্য অভিযান
হযরত আবু উবাইদা রা.-কে বিদায় দিয়ে হযরত আবু বকর রা. ও তাঁর সাথে যাওয়া মুসলমানরা ঘরে ফিরে আসার পর হযরত আবু বকর রা. খালিদ বিন ওয়ালিদ রা.কে ডেকে আনলেন এবং তাঁকে একটি পতাকা দিলেন। ঐ পতাকাটি রাসুলুল্লাহ সা.-এর পতাকা ছিল। আর তাকে লাখম ও জুযাম গোত্র এবং এমন কিছু যুদ্ধাভিজ্ঞ লোকদের উপর আমীর নিযুক্ত করলেন, যাদের সকলেই রাসূলুল্লাহ সা. এর সাথে বিভিন্ন যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছেন। আর তাকে অসিয়ত করতে গিয়ে বললেন, ওহে আবু সুলাইমান, আমি তোমাকে এ বাহিনীর উপর আমীর নিযুক্ত করলাম। অতএব, তুমি তাদেরকে নিয়ে ইরাক ও পারস্যের উদ্দেশ্যে বের হয়ে পড়। আল্লাহর নিকট কামনা করি যেন তিনি তোমাদেরকে সাহায্য করেন।
অতঃপর তিনি তাদেরকে বিদায় দিলেন। আর হযরত খালেদ রা. তাঁর সাথীদের নিয়ে ইরাকের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেলেন।