📄 আবার শুরু হল যুদ্ধ
এদিকে হযরত ইয়াযীদ বিন আবু সুফ্যান যখন এ অবস্থা দেখতে পান, তখন তিনি মুসলমানদেরকে বললেন, শত্রুরা রাসূলুল্লাহ সা.-এর সাহাবীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। অতএব, তাদেরকে ধর। তিনি একথা বলার সাথে সাথে মুসলমানরা তাদের উপর বীর বিক্রমে ঝাঁপিড়ে পড়ে এবং উভয় দল যুদ্ধে লিপ্ত হয়। রোমরা ধৈর্যের সাথে যুদ্ধ করে যাচ্ছিল। এমন সময় দেখা গেল যে, মুসলমানদের আরো একটি বাহিনী কাতিবে ওহী হযরত শুরাহবীল বিন হাসানা রা.-এর নেতৃত্বে তাদের দিকে আসছে। মুসলমানগণ যখন তাদের ভাইদেরকে যুদ্ধে আসতে দেখল, তখন তারা রোমানদের উপর আরো তীব্র ভাবে তরবারী চালাতে শুরু করে আর রোমানদের মাথা তাদের ঘাড় থেকে বিচ্ছিন্ন হতে থাকে।
📄 প্রাণে রক্ষা পায়নি কোন শত্রু
বর্ণনাকারী বলেন যে, উল্লেখিত আট হাজার রোমান সৈন্যের কেউই প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারেনি। কারণ সিরিয়া তাবুক থেকে দূরে থাকায় মুসলমানরা তাদের দ্রুতগামী ঘোড়া নিয়ে তাদেরকে ধরে ফেলতে সক্ষম হয়। অতঃপর মুসলমানরা শত্রুদের সম্পদ ও তাদের তাঁবুগুলো তুলে হযরত শুরাহবীল বিন হাসান রা. ও তাঁর সাথীদের কাছে নিয়ে আসে এবং তাদের সবাইকে সালাম দিয়ে স্বাগতম জানায়। তারা বলল, আমরা এ সকল গনীমত হযরত আবুবকর রা.-এর নিকট পাঠিয়ে দেব। এতে সবাই সম্মতি জানায় এবং অস্ত্র ও যুদ্ধের প্রয়োজনীয় জিনিস গুলো ছাড়া বাকী সকল সম্পদ হযরত শাদ্দাদ বিন আউসের নেতৃত্বে পাঁচশত অশ্বারোহী দিয়ে খলীফার নিকট পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তারা যখন এ সম্পদ নিয়ে মদীনার উপকন্ঠে পৌঁছে এবং মুসলমানগণ মুশরিকদের এ সম্পদ গুলো দেখতে পায়, তখন তারা বড় গলায় লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার ও রাসূলুল্লাহ সা.- এর উপর দরূদ পড়তে থাকে। হযরত আবুবকর রা. শাদ্দাদ বিন আউস রা. তার সাথীদের নিয়ে মদীনায় এসেছে শুনে অত্যন্ত আনন্দিত হলেন। তারা সবাই হযরত আবুবকর রা.-এর নিকট গিয়ে তাঁকে সালাম জানায় এবং মুসলমানদের বিজয়ের সুসংবাদ প্রদান করে। তখন আবুবকর রা. আল্লাহর দরবারে সিজদায় লুটিয়ে পড়েন।
📄 আরো সৈন্য তলব
অতঃপর মক্কাবাসীর নিকট জিহাদের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে একটি চিঠি লেখেন-
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
আবু বকরের পক্ষ থেকে মক্কাবাসী ও সকল মুসলমানের প্রতি। আসসালামু আলাইকুম।
আমি সর্বপ্রথম সে মহান আল্লাহর প্রশংসা করছি, যিনি ব্যতীত আর কোন ইলাহ নেই এবং তাঁর নবী মুহাম্মদের জন্য আল্লাহর রহমত কামনা করছি। পরকথা, আমি মুসলমানদেরকে জিহাদ ও শামদেশ (সিরিয়া) বিজয় করার আহবান জানাচ্ছি এবং আপনাদের ও অন্যান্য মুসলমানদের নিকট এ মর্মে পত্র লিখছি যে, আপনারা আপনাদের পালনকর্তার নির্দেশ পালন করার জন্য দ্রুত চলে আসুন। কারণ, আল্লাহ তা'আলা বলছেন, "তোমরা হাল্কা ও ভারী যুদ্ধোপকরণ নিয়ে বের হয়ে পড় এবং নিজেদের জান ও মাল দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ কর। বস্তুতঃ তোমাদের একাজটাই তোমাদের জন্য অধিক কল্যাণকর যদি তোমরা বুঝ।" এ আয়াতটি আপনাদের ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়েছে এবং আপনারাই এ আয়াতের নির্দেশ পালনের অধিক যোগ্য এবং আপনারাই সর্বপ্রথম একে সত্য বলে মেনে নিয়েছেন এবং তার নির্দেশ বাস্তবায়ন করেছেন। যে আল্লাহর দ্বীনের সাহায্য করে, আল্লাহ তাআলা তার সাহায্য করেন। আর যে কার্পণ্য করে, তার প্রতি আল্লাহ মুখাপেক্ষী নন। আর আল্লাহ তাআলা প্রশংসিত ও অমুখাপেক্ষী। অতএব, সে উন্নত জান্নাতের প্রতি ধাবমান হোন, যার ফলসমূহ থাকবে সবার নাগালে, যা আল্লাহ তা'আলা তার পথে হিজরতকারী ও তার দ্বীনকে সাহায্যকারীদের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছেন। আর যারা তাদের পথের অনুসরণ করবে, তাদেরকেও (আল্লাহর) প্রিয় বান্দাদের অর্ন্তভুক্ত করা হবে। আর আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনি সর্বোত্তম কার্যনির্বাহী।
বর্ণনাকারী বলেন, চিঠি এটুকু লিখে তার উপর মোহর মেরে আবদুল্লাহ বিন হুযাফা রা. এর কাছে হস্তান্তর করা হয়। তিনি চিঠি নিয়ে রওয়ানা দেন। মক্কায় পৌঁছে তিনি সবাইকে উচ্চ কন্ঠে ডাক দেন। তারা সবাই তাঁর নিকট আসলে তিনি তাদের নিকট চিঠি হস্তান্তর করেন। তাদের সামনে চিঠিটি পড়া হয়। চিঠির বক্তব্য শুনে সাহল বিন আমর, হারছ বিন হিশাম ও ইকরামা বিন আবু জাহল রা. বলে উঠল, আমরা আল্লাহর দিকে আহবানকারীর ডাকে সাড়া দিলাম এবং তাঁর নবী মুহাম্মদ সা.-এর কথা মেনে নিলাম। আর ইকরামা রা. এ কথাও বলেন যে, আমরা এখানে এভাবে আর কতদিন কাটাব, অথচ অন্যান্য লোকেরা পূর্বেই যুদ্ধে চলে গেছে। যে সফলকাম হয়েছে সে সত্য বলেই সফলকাম হয়েছে। আমরা দেরী করলেও, যারা পূর্বে চলে গেছে তাদের সাথে যদি গিয়ে মিলিত হতে পারি, তাহলে আমরাও সফলকাম হব। অতঃপর তিনি মাখযুম বংশের লোকদের নিকট গেলেন এবং তাদেরসহ মক্কা থেকে মোট পাঁচশত জনের একটি বাহিনী নিয়ে বের হন।
আর আবুবকর রা. এ ধরণের চিঠি তায়েফবাসীর নিকটও প্রেরণ করেন। তারাও চারশজনের একটি বাহিনী নিয়ে চলে আসে। মক্কা থেকে যারা আগমন করেছেন, তাদের সাথে হযরত সাঈদ বিন খালিদ বিন সাঈদ ইবনুল আস ও বের হন। তিনি একজন ভদ্র ও বুদ্ধিমান যুবক ছিলেন। তিনি আবুবকর রা.-এর নিকট এসে আরয করলেন, ওহে আল্লাহর রাসূলের সম্মানীত খলীফা! আপনি আবু খালেদের হাতে পতাকা দিতে চাচ্ছেন এবং এর ফলে তিনি আপনার সৈন্যবাহিনীর অধিনায়কের একজন হবেন। কিন্তু লোকেরা তার সমালোচনা করায় আপনি যুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পর তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন। কিন্তু এরপরও তিনি আল্লাহর রাস্তা থেকে চলে আসেন নি। আর আমি আপনার বাহিনীতে থেকে সব সময় আপনার ডাকে সাড়া দিয়ে চলেছি। অতএব, আপনি আমাকে এ বাহিনীর উপর আমীর বানালে ভাল হয়। আল্লাহর কসম! আল্লাহ আমাকে কোন সময় শত্রুর হত্যা ও যুদ্ধের ব্যাপারে অলস দেখেননি।
বর্ণনাকারী বলেন, সাঈদ বিন খালেদ তার আব্বা (আবু খালেদ) থেকে অধিক বুদ্ধিমান ও সাহসী ছিলেন। তাই আবু বকর রা. তাকে পতাকা অর্পণ করেন এবং দুই হাজার সৈন্যের আমীরের দায়িত্ব দান করেন। হযরত উমর রা. যখন সাঈদ বিন খালেদের এ কথা শুনলেন, তখন তিনি অসন্তুষ্ট হলেন এবং হযরত আবু বকর রা.-এর নিকট চলে আসেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসূলের খলীফা! আপনি সাঈদ বিন খালেদকে তার চেয়ে শ্রেষ্ট ব্যক্তির উপর সেনাপতির দায়িত্ব দিয়েছেন। আপনি জানেন সে আপনার কাছে গিয়ে তার আব্বার সমালোচনার জন্য আমার প্রতিই ইঙ্গিত করেছে। আল্লাহর কসম! আমি তার বাপের ব্যাপারে কোন কথা বলিনি।
📄 সেনাপতি হলেন হযরত আমর রা.
হযরত আবুবকর রা.-কে হযরত উমর রা.-এর একথা ভাবিয়ে তোলে। কিন্তু তবুও তিনি খালেদ বিন সাঈদ থেকে পতাকা নিয়ে নেওয়া অপছন্দ করলেন না। আর অন্য দিকে তাঁর প্রতি উমর রা.- এর ভালবাসা, কল্যাণকামিতা ও তিনি রাসূলুল্লাহ সা.-এর একজন বড় সাহাবী হওয়ায় তার বিরোধীতা করাও ভাল মনে করলেন না। তাই তিনি চিন্তিত অবস্থায় হযরত আয়েশা রা.-এর কক্ষে প্রবেশ করেন এবং উমর রা.-এর বিষয়টি তাকে অবহিত করলেন। তখন আয়েশা রা. বললেন, আমি জানি যে, হযরত উমর রা. দ্বীনের অকৃত্রিম সাহায্যকারী এবং তাঁর অন্তরে মুসলমানদের প্রতি কোন বিদ্বেষ নেই। আবু বকর রা. হযরত আয়েশা রা.- এর একথাটি গ্রহণ করলেন এবং আযদ-আল-দাওসীকে ডেকে বললেন, যান সাঈদ বিন খালেদের নিকট এবং তাকে বলুন পতাকা ফিরিয়ে দিতে। তিনি পতাকা ফিরিয়ে দিলেন এবং বললেন, আল্লাহর কসম, তবুও আমি আবু বকরের রা. পতাকা তলে যুদ্ধ করব। কারণ, আমি নিজেকে আল্লাহর পথে উৎসর্গ করেছি।
আবু বকর রা. কাদেরকে রণাঙ্গনে আগে পাঠাবেন সে ব্যাপারে ভাবছিলেন। এ সময় সাহল বিন আমর, ইকরামা বিন আবু জাহল ও হিশাম ইবনুল হারেস রা. তাঁর নিকট আসলেন এবং বললেন, আপনারা সাক্ষী থাকুন যে, আমরা নিজেদেরকে আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গ করেছি। অতএব, আমরা যুদ্ধ না করে কখনো ফিরে যাব না। তখন আবুবকর রা. বললেন- اللهم بلغهم أفضل ما يأملون
"হে আল্লাহ! তাদেরকে তারা যার আশা করছে, তার চেয়ে আরো উচ্চ স্তরে পৌঁছে দিন"।
অতঃপর আবু বকর রা. আমর ইবনুল আস রা.-কে ডেকে আনলেন এবং তার কাছে পতাকা হস্তান্তর করে বললেন, আমি আপনাকে এ বাহিনী তথা মক্কাবাসী, তায়েফবাসী, হওয়াযেন ও বনী কিলাবের লোকদের উপর সেনাপতির দায়িত্ব অর্পণ করলাম। এখন আপনি ফিলিস্তিনের দিকে যাত্রা শুরু করুন। আর আপনার প্রতি নসিহত হল আবু উবাইদা রা.-এর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলবেন ও তিনি কোন ব্যাপারে সাহায্য কামনা করলে সাহায্য করবেন এবং তার পরামর্শ গ্রহণ করা ছাড়া কোন ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন না। চলুন, আল্লাহ আপনার ও তাদের সবার কল্যাণ করুন।