📄 রোমানদের দূত প্রেরণ
সৈন্যরা তার একথা শোনে একত্রিত হলো এবং যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হল। অতঃপর তারা তাদের ক্যাম্পে অবস্থান প্রহণ করল এবং কাদ্দাহ নামের এক আরব খ্রিস্টানকে মুসলমানদের নিকট এ বার্তা দিয়ে পাঠাল যে, মুসলমানদের পক্ষ থেকে তাদের একজন বুদ্ধিমান নেতাকে পাঠানো হোক, যাতে আমাদের কাছে তারা কী চায়, সে নিয়ে ভাবতে পারি।
📄 শত্রুদের কাছে গমন
কাদ্দাহ তার ঘোড়া নিয়ে মুসলমানদের দিকে অগ্রসর হল। মুসলমানগণ তাকে তাদের দিকে আসতে দেখে আউস গোত্রের কিছু লোক তাকে স্বাগতম জানাল এবং বলল, তুমি কী চাও? সে বলল, রোমানরা উভয়পক্ষের বিরোধ মীমাংসার জন্য আল্লাহর বিধান নিয়ে আলাপ করার জন্য আপনাদের একজন বিচক্ষণ লোককে চাচ্ছেন। খ্রিস্টান দূতের বার্তাটি হযরত রবীআর কাছে পৌঁছানো হলে তিনি বললেন, তাহলে তাদের নিকট আমি যাচ্ছি। হযরত ইয়াযীদ বললেন, আপনার যাওয়াতে আমি আশংকা বোধ করছি। কারণ, গতকাল আপনি তাদের নেতাকে হত্যা করেছেন। তখন রবীআ বললেন-
(( قُلْ لَنْ يُصِيبَنَا إِلَّا مَا كَتَبَ اللهُ لَنَا هُوَ مَوْلَانَا وَعَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُونَ ))
“আপনি বলে দিন আমাদের উপর কেবল তাই আপতিত হবে, যা আল্লাহ তা'আলা আমাদের ভাগ্যে লিখে রেখেছেন। তিনিই আমাদের অভিভাবক। আর মুমিনদের উচিত, তার উপরই ভরসা করা [তাওবাহ: ৫১]। আর আমি আপনাকে ও এখানকার সকল মুসলমানকে আহবান করছি যেন সবাই আমার ব্যাপারে আশংকা মুক্ত থাকে। শত্রুরা যদি আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে, তাহলে তাদের উপর অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিড়ে পড়বে।”
একথা বলে তিনি তার ঘোড়ায় আরোহণ করে রোমানদের দিকে চললেন। রোমানদের নিকট এসে তিনি তাদের নেতার তাঁবুর কাছে গেলেন। কাদ্দাহ বলল, সম্রাটের সৈন্যদের সম্মানার্থে আপনি ঘোড়া থেকে নামুন। রবীআ রা. বললেন, আমি সম্মানিত অবস্থায় থেকে লাঞ্চনাকর অবস্থায় ফিরে যেতে পারি না এবং আমি আমার ঘোড়ার লাগাম অন্য কারো হাতে দিতে পারি না। আমি এ রোমানদের নেতার তাঁবুর দরজার কাছে গিয়েই ঘোড়া থেকে অবতরণ করব। আর তা না হলে আমি যেখান থেকে এসেছি সেখানে ফিরে যাব। তোমরাইতো আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছ। কাদ্দাহ রবীআ রা. এর এ কথা রোমানদের জানাল। তখন রোমানরা একে অপরকে বলল, আরব রবীআ সত্য কথা বলেছে। তাকে যেখানে ইচ্ছা সেখানে নামতে দাও।
তখন রবীআ রা. তাদের নেতার তাঁবুর দরজায় এসে নামলেন ও হাটু গেড়ে বসলেন এবং ঘোড়ার লাগাম ও অস্ত্র নিজের হাতে রাখলেন। জারজীস তাকে বললেন, হে আমার আরব ভাই! আপনাদের চেয়ে দুর্বল কোন জাতি আমাদের জানা মতে ছিল না। আর আপনারা যে আমাদের সাথে যুদ্ধ করবেন তার কল্পনাও আমাদের অন্তরে সৃষ্টি হয়নি। তো আপনারা আমাদের নিকট কী চাচ্ছেন? রবীআ রা. বললেন, আমরা চাচ্ছি, আপনারা আমাদের দ্বীনে প্রবেশ করুন এবং আমরা যা করি তা পালন করুন। আর যদি আপনারা তা করতে অস্বীকৃতি জানান, তাহলে জিয়া প্রদান করবেন। আর যদি তাতেও অসম্মতি জানান, তাহলে তরবারীই আপনাদের ও আমাদের মাঝে ফয়সালা করবে।
জারজীস এ কথা শুনে বলল, তাহলে আপনারা পারসীদের সাথে কেন এ আচরণ করছেন না এবং তাদের বিরুদ্ধে আমাদেরকে কেন মিত্র হিসেবে গ্রহণ করেননি? রবীআ রা. বললেন, প্রথমে আপনাদের বিরুদ্ধে লড়তে এসেছি এ জন্য, যেহেতু তাদের চেয়ে আপনারা আমাদের নিকটবর্তী। আর আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তার কিতাবে একথার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন- يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قَاتِلُوا الَّذِينَ يَلُونَكُمْ مِنَ الْكُفَّارِ وَلِيَجِدُوا فِيكُمْ غِلْظَةً . “হে মুমিনগণ! তোমরা তোমাদের নিকটবর্তী কাফেরদের সাথে লড়াই কর। আর তারা যেন তোমাদের মাঝে কঠোরতা অনুভব করে। আর জেনে রেখো! আল্লাহ তাআলা মুত্তাকীদের সাথেই রয়েছেন” [তাওবাহ: ১২৩]। জারজীস বলল, তাহলে আপনি কি এ মর্মে আমাদের সাথে সন্ধি স্থাপন করতে চান যে, আমরা আপনাদের প্রত্যেককে একটি করে স্বর্ণ মুদ্রা এবং দশ ওয়াসক্ করে খাদ্য শস্য দিব। আর সন্ধি পত্রে লিখবেন যে, আর আপনারা আমাদের সাথে যুদ্ধ করতে আসবেন না এবং আমরাও আপনাদের সাথে যুদ্ধ করতে যাব না। রবীআ রা. বললেন, এটা হতে পারে না। যুদ্ধ, জিয়া প্রদান ও ইসলাম গ্রহণ এ তিনটির কোন একটিই আপনাদের গ্রহণ করতে হবে। জারজীস বলল, আপনাদের দ্বীনে আমাদের প্রবেশ করার কোন অবকাশ নেই। এমনকি সবাই নিহত হলেও এব্যাপারে আমরা অটল থাকতে বদ্ধপরিকর। আর জিয়া প্রদানের চেয়ে আমরা মৃত্যুকে অধিক শ্রেয় মনে করি। আর যুদ্ধ-বিগ্রহের প্রতি আপনারা আমাদের চেয়ে অধিক উৎসাহপ্রবণ নন। কারণ, আমাদের রয়েছে অনেক সেনাপতি, রাজপুত্র ও যুদ্ধাভিজ্ঞ সৈনিক।
📄 পাদ্রীর সাথে রবীআ রা-এর বিতর্ক
অতঃপর জারজীস তার লোকদের বলল, এ বেদুঈনের সাথে বিতর্ক করার জন্য সাকালাবাকে ডেকে নিয়ে আস। সম্রাট হিরোক্লিয়াস তাদের ধর্ম সম্পর্কে অভিজ্ঞ একজন বড় আলেমকে সৈন্যদের সাথে পাঠিয়েছিলেন, যাতে তিনি তাদের ধর্মের পক্ষে মুসলমানদের সাথে বিতর্ক করতে পারেন। তাকে নিয়ে আসা হল। অতঃপর যখন তিনি স্থির হয়ে বসলেন, তখন জারজীস তাকে বলল, মুরুব্বী! আপনি এ লোকের নিকট তার দ্বীন সম্পর্কে প্রশ্ন করুন। তখন ওই আলেম বললেন, হে আমার আরব ভাই! আমরা আমাদের ধর্মগ্রন্থে পেয়েছি, আল্লাহ তাআলা হেজাযের কুরাইশ বংশের হাশেম গোত্র থেকে একজন নবী প্রেরণ করবেন। আর তাঁর নবুওয়াতের নিদর্শন হবে তাকে আল্লাহ তাআলা আসমানে নিয়ে যাবেন। তো তাঁর জীবনে কি এ ঘটনা ঘটেছে?
রবীআ রা. বললেন, হ্যাঁ, তাঁকে আসমানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আর আমাদের রব তার মহান কিতাবে একথার আলোচনা করে বলেছেন- سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلاً مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا "পবিত্র সে সত্তা, যিনি তার বান্দা (মুহাম্মদ সা.)-কে রাত্রে মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত ভ্রমন করিয়েছেন, যার চর্তুপার্শ্বকে আমি সমৃদ্ধ করেছি। আর তা এজন্য যে, যাতে আমি তাকে আমার নিদর্শন প্রত্যক্ষ করাই।"
আলেম আবার বললেন, আমরা আমাদের কিতাবে দেখতে পাই যে, আমাদের রব এ নবী ও তাঁর উম্মতের জন্য এক মাস রোযা রাখা ফরয করবেন। আর ঐ মাসকে বলা হবে রমাদান। রবীআ রা. বললেন জি! আর আমাদের মহান কুরআনে এ ব্যাপারে বলা আছে- شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنزِلَ فِيْهِ الْقُرْ أَن هَدَى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِّنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانَ "রমাদান সে মাস, যে মাসে অবতীর্ণ করা হয়েছে কুরআন, যা মানুষের জন্য হিদায়াত ও সুস্পষ্ট পথ নির্দেশ এবং ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী” [বাকারাহ: ১৮৫]।
আলেম বললেন, আমরা আমাদের কিতাবে পেয়েছি যে, তাদের কেউ একটি ভাল কাজ করলে দশটি সওয়াব লেখা হবে। রবীআ রা. বললেন হ্যাঁ! আল্লাহ তা'আলা বলেছেন- مَنْ جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ عَشَرَ أَمْثَالِهَا ۖ وَمَنْ جَاءَ بِالسَّيِّئَةِ فَلَا يُجْزَىٰ إِلَّا مِثْلَهَا وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ "যে কোন ভাল কাজ করবে তার জন্য রয়েছে এর দশগুণ (ভাল কাজের) প্রতিদান। আর যে কোন খারাপ কাজ করবে, তাকে কেবল ঐ পরিমাণই শাস্তি দেয়া হবে। তাদের প্রতি অবিচার করা হবে না।"
আলেম বললেন, আমরা আমাদের কিতাবে পেয়েছি যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর উম্মতকে তাঁর উপর দরুদ পড়ার নির্দেশ দিবেন। রবীআ রা. বললেন, হ্যাঁ! আল্লাহ তা'আলা তার সম্মানিত কিতাবে বলেছেন- إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا "আল্লাহ ও তাঁর ফিরিশতারা নবীর প্রতি দরুদ প্রেরণ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরা নবীর জন্যে রহমতের তরে দুআ কর এবং তাঁর প্রতি সালাম প্রেরণ কর” [আহযাব : ৫৬]।
বর্ণনাকারী বলেন যে, নাসারাদের আলেম হযরত রবীআ রা. এর উত্তরে বিস্মিত হলেন এবং সৈন্যদের বললেন যে, এরাই সত্যের উপর রয়েছে।
📄 নিহত হল আরেক সেনাপতি
তখন দরবারের একজন বলে উঠল যে, এ লোকটিই আপনার ভাইকে হত্যা করেছে। জারজীস এ কথা শোনার পর তার চোখ দিয়ে অশ্রুঝরা আরম্ভ করল এবং প্রচন্ড ভাবে রাগান্বিত হয়ে রবীআ রা.-এর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার ইচ্ছা করল। তখন হযরত রবীআ রা. বিদ্যুৎ বেগে তার স্থান থেকে উঠে এসে জারজীসের হাতের তরবারীটা কেড়ে নিয়ে দ্রুত তার উপর আঘাত করলেন। ফলে জারজীস মাটিতে লুটিয়ে পড়ল ও মারা গেল। অতঃপর তিনি তাঁর ঘোড়ার দিকে দৌড়ে এসে তাতে আরোহণ পূর্বক চলে আসতে লাগলেন। এদৃশ্য দেখে রোমান সৈন্যরা তাঁর দিকে দৌড়িয়ে আসল। তখন তিনি তাদের উপরও তরবারী চালালেন।