📘 ফুতুহুশ শাম 📄 বনু আবাস ও কিনানা গোত্রের সৈন্যবর্গ

📄 বনু আবাস ও কিনানা গোত্রের সৈন্যবর্গ


এরপর মায়সারা বিন মাসরূক আল-আবাসীর নেতৃত্বে বানু আবাস গোত্রের লোকেরা আগমন করে। তাদের পিছনে কিনানা গোত্রের লোকজন আগমন করে। তাদের নেতা ছিলেন গাইছাম বিন আসলাম আল্ কিনানী। ইয়ামান থেকে আগত সকল গোত্রের সাথে তাদের পরিবার-পরিজন, টাকা- পয়সা, ঘোড়া, উট ইত্যাদিও ছিল। হযরত আবু বকর রা. তাদের আগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা দেখে অত্যন্ত খুশী হলেন এবং আল্লাহর প্রশংসা করলেন।

মদীনা মুনাওয়ারার আশে-পাশে প্রত্যেক গোত্র আলাদা আলাদা ছাউনী তৈরী করে। যেহেতু তারা একটি বিশাল বাহিনী ছিল, তাই খাদ্য-দ্রব্য ও স্থানের কিছুটা স্বল্পতা দেখা দেয়। এ অবস্থা দেখে গোত্রের সরদারগণ একত্রিত হয়ে পরামর্শ করলেন যে, হযরত আবু বকর রা.-এর খেদমতে উপস্থিত হয়ে একথা জানানো উচিত যে, যেহেতু এখানে প্রচন্ড ভীড়ের কারণে কষ্ট হচ্ছে, সেহেতু আমাদেরকে সিরিয়ার দিকে পাঠানো হোক। পরামর্শ শেষে তারা আবু বকর রা.-এর নিকট উপস্থিত হয়ে তাঁকে সালাম করলেন এবং সবাই তাঁর সামনে বসলেন। আর একে অপরের দিকে কে প্রথমে কথা শুরু করবে সে প্রশ্নে তাকাতে লাগলেন। পরে কাইস বিন হুবাইরা আল মুরাদী কথা শুরু করলেন, বললেন, ওহে আল্লাহর রাসূলের খলীফা! আপনি আমাদেরকে যে কাজের নির্দেশ দিয়েছেন, সে কাজ আমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য ও জিহাদের আগ্রহ নিয়ে পূর্ণ করেছি। এখন আল্লাহর রহমতে আমাদের সৈন্যরা পূর্ণরূপে প্রস্তুত এবং সাজ সরঞ্জামও সব নিয়ে আসা হয়েছে। আর আপনার এ শহর ঘোড়া, খচ্চর ও উটের জন্য অপ্রশস্ত এবং সৈন্যদের প্রয়োজন পূরণে যথেষ্ট নয়। যার ফলে সৈন্যদের কষ্ট হচ্ছে। তাই সৈন্যদের যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি দিন। আর যদি আপনি যুদ্ধের সিদ্ধান্ত পাল্টে ফেলেন, তাহলে আমাদেরকে স্বীয় দেশে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দিন। এভাবে প্রত্যেক গোত্রের সরদার একের পর এক কথাটি আরয করলেন।

আবুবকর রা. যখন সকলের কথা শোনা শেষ করলেন, তখন বললেন, হে ইয়ামান ও অন্যান্য এলাকার বাসিন্দারা! আমি তোমাদেরকে কষ্ট দিতে চাই না। আমার ইচ্ছা কেবল তোমাদের বাহিনী পরিপূর্ণ করা। তখন বলা হল, জনাব এখন আর কারো আসার বাকী নেই। সবাই এসে গেছে। এখন আপনি আল্লাহর উপর ভরসা করে আমাদের পাঠিয়ে দেন।

📘 ফুতুহুশ শাম 📄 ইসলামের সৈন্যদের আধিক্য

📄 ইসলামের সৈন্যদের আধিক্য


আবু বকর রা. একথা শোনার সাথে সাথে উঠে দাঁড়ালেন এবং অন্যান্য সাহাবী যেমন হযরত উমর ফারুক, হযরত উসমান, হযরত আলী, হযরত সাঈদ বিন যাইদ বিন আমর বিন নুফাইল এবং আউস ও খাযরায গোত্রের লোকদেরকে সাথে নিয়ে মদীনার বাইরে জমায়েত হওয়া মুজাহিদদের নিকট গেলেন। লোকজন তাঁকে দেখে আনন্দে নারায়ে তাকবীর দিয়ে স্বাগতম জানায়। নারায়ে তাকবীরের আওয়াজে পাহাড়-পর্বত মুখরিত হল। হযরত আবু বকর রা. এমন এক স্থানে দাঁড়িয়ে ছিলেন যেখানে সবাই তাকে দেখতে পাচ্ছিল। তিনি সৈন্যদের স্রোতের মাঝে দৃষ্টিপাত করে দেখতে পেলেন যে, স্থানটি কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেছে। তিনি এ দৃশ্য দেখে খুব আনন্দিত হলেন এবং তাঁর মুখ থেকে এ দুআটি বের হল- اللَّهُمَّ أُنْزِلْ عَلَيْهِمُ الصَّبْرَ وَأَيْدِهُمْ وَلَا تَسْلِمُهُمْ إِلَى عَدُوِّهِمْ إِنَّكَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرُ
"হে আল্লাহ এদেরকে ধৈর্য ধারণের শক্তি দান করুন, এদেরকে সাহায্য করুন এবং এদেরকে কাফেরের খাঁচায় বন্দী হওয়া থেকে হেফাযত করুন। নিঃসন্দেহে আপনি সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাবান"।

📘 ফুতুহুশ শাম 📄 ইয়াযিদ বিন আবু সুফয়ান ও রবিআ বিন আমেরের নেতৃত্ব

📄 ইয়াযিদ বিন আবু সুফয়ান ও রবিআ বিন আমেরের নেতৃত্ব


দুআর পর তিনি সর্বপ্রথম ইয়াযীদ বিন আবু সুফ্যানকে ডেকে পতাকা দিয়ে এক হাজার সৈন্যের কমান্ডারের দায়িত্ব অর্পন করেন। তারপর হিজাযের প্রসিদ্ধ যোদ্ধা বনী আমের গোত্রের হযরত রবীআ বিন আমের রা.-কে ডাকেন এবং তাঁকেও এক হাজার সৈন্যের উপর কমান্ডারের দায়িত্ব দিয়ে পতাকা অর্পণ করেন। অতঃপর তিনি হযরত ইয়াযীদের কাছে গিয়ে তাকে বললেন, এ উচ্চ বংশের পুরুষ রবীআ বিন আমের। তুমি তার যুদ্ধপটুতা সম্পর্কে জ্ঞাত আছ। আমি তাকে তোমার সাথে পাঠাচ্ছি ও তোমাকে তার আমীর বানিয়েছি। অতঃএব তাকে তোমার বাহিনীর অগ্রে রাখবে এবং তার সাথে পরামর্শ করবে। তার বিরোধিতা করবে না। ইয়াযীদ বললেন, ঠিক আছে। অশ্বারোহী সৈন্যরা দ্রুত অস্ত্র সজ্জিত হতে শুরু করে। ইয়াযীদ বিন আবু সুফ্যান ও রবীআ বিন আমের সওয়ার হয়ে সৈন্যদের নিয়ে আবু বকর রা.- এর দিকে এগিয়ে আসলেন। আবু বকর রা. সৈন্যদের সাথে চলতে লাগলেন। তখন ইয়াযীদ বললেন, ওহে আল্লাহর রাসুলের খলীফা! আপনি যার উপর সন্তুষ্ট, সেই আল্লাহর ক্রোধ থেকে রক্ষা পেতে পারে। আপনি হাঁটলে আমরা ঘোড়ায় সওয়ার হতে পারি না। হয়তো আপনি সওয়ার হোন নতুবা আমরা নেমে যাই। তিনি বললেন, আমিও সওয়ার হব না, তোমরাও নামবে না। তিনি হাঁটতে হাঁটতে 'ছানিয়াতুল বিদা' পর্যন্ত এলেন। সেখানে গিয়ে তিনি দাঁড়ালেন।

📘 ফুতুহুশ শাম 📄 পথ নির্দেশ

📄 পথ নির্দেশ


তখন ইয়াযিদ বিন আবু সুফয়ান হযরত আবু বকর রা.-এর কাছে গিয়ে তাদেরকে কিছু দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্য আরয করলেন। আবু বকর রা. বললেন-
إِذَا سِرْتَ فَلَا تَضِيقُ عَلَى أَصْحَابِكَ فِي مَسِيرِكَ وَلَا تَغْضَبْ عَلَى قَوْمِكَ وَأَصْحَابِكَ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ وَاسْتَعْمِلِ الْعَدْلَ وَبَاعِدُ عَنْكَ الظُّلْمَ وَالْجُوْরَ فَإِنَّهُ لَا أَفْلَحَ قَوْمٌ ظَلَمُوا وَلَا نَصَرُوا عَلَى عَدُوِّهِمْ، وَإِذَا لَقِيتُمُ الْقَوْمَ فَلَا تُوَلُّوهُمُ الْأَدْبَارَ وَمَنْ يُوَلِّهِمْ يَوْمَئِذٍ دُبُرَهُ إِلَّا مُتَحَرِّفًا لِقِتَالِ أَوْ مُتَحَيِّزًا إِلَى فِئَةٍ فَقَدْ بَاءَ بِغَضَبٍ مِنَ اللَّهِ وَمَأْوَاهُ جَهَنَّمُ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ وَإِذَا نَصَرَتُمْ عَلَى عَدُوِّكُمْ فَلَا تَقْتُلُوا وَلَدًا وَلَا شَيْخًا وَلَا أَمْرَعَةً وَلَا طِفْلاً وَلَا تَقْتُلُوا بَهِيمَةَ الْمَاكُولِ وَلَا تَغْدِرُوا إِذَا عَاهَدْتُمْ وَلَا تَنْقُضُوا إِذَا صَالَحْتُمْ، وَسَتَمُرُّونَ عَلَى قَوْمٍ فِي الصَّوَامِعِ رُهْبَانًا يَزْعَمُونَ أَنَّهُمْ تَرَهَبُوا فِي اللَّهِ فَدَعَوْهُمْ وَلَا تَهْدِمُوا صَوَامِعَهُمْ . وَسَتَجِدُونَ قَوْمًا آخَرِيْنَ مِنْ حِزْبِ الشَّيْطَانِ وَعَبَدَةِ الصَّلْبَانِ قَدْ حَلَقُوا أَوْسَاطَ رُؤُوسِهِمْ كَأَنَّهَا مَنَاحِيْضُ الْعِظَامِ فَاعْلَوْهُمْ بِسُيُوْفِكُمْ حَتَّى يَرْجُوا إِلَى الْإِسْلَامِ أَوْ يُعْطُوا الْجِজْيَةَ عَنْ يَدوَهُمْ صَاغِرُونَ، وَقَدِ اسْتَوْدَعْتُكُمُ اللَّهُ ، ثُمَّ عَائِقَهُ وَصَافَحْةً وَصَافَحَ رَبِيعَةَ بْنِ عَامِرٍ ، وَقَالَ يَارَبِيْعَةً بَنْ عَامِرٍ أَظْهِرْ شُجَاعَتَكَ عَلَى بَنِي الْأَصْفَرِ بَلَغَكُمُ اللَّهُ أَمَالَكُمْ، وَغَفَرَ لَنَا وَلَكُمْ.

"যখন তুমি কোন পথ দিয়ে যাবে, তখন যাওয়ার পথে তোমার নিজের ও তোমাদের সাথীদের উপর কঠোরতা প্রয়োগ করবে না। স্বীয় সম্প্রদায় ও লোকদের উপর রাগ করবে না। প্রত্যেক বিষয়ে সাথীদের সাথে পরামর্শ করবে। ন্যায়পরায়নতাকে আকড়ে ধরবে। অন্যায়-অবিচার থেকে দূরে থাকবে। অন্যায়-অবিচারী সম্প্রদায় সফলকাম ও শত্রুর উপর বিজয় লাভ করতে পারে না। যখন শত্রুর মুখোমুখি হবে, তখন পিছনে ফিরে যেয়ো না। কারণ, যে ব্যক্তি সে সময় যুদ্ধের কৌশল পরিবর্তন কিংবা অন্য কোন গ্রুপের সাথে একত্রিত হওয়া ছাড়া পিছনে ফিরে যাবে, সে আল্লাহর ক্রোধের পাত্র হল। আর তার স্থান হবে জাহান্নাম। আর তা কতই না নিকৃষ্ঠ প্রত্যাবর্তনস্থল। আর যখন তোমরা শত্রুর উপর বিজয় লাভ করবে, তখন তাদের কিশোর, বৃদ্ধ, মহিলা ও শিশুদের হত্যা করবে না। তাদের ক্ষেতকে পুড়ে ফেলবে না, ফলবান বৃক্ষ কাটবে না, হালাল পশু ব্যতীত অন্য কোন পশু যবেহ করবে না, শত্রুর সাথে কোন চুক্তি করলে তা থেকে সরে আসবে না, সন্ধি করলে সন্ধির বিপরীত করবে না। আর তোমরা সেখানে এমন কিছু দরবেশদের দেখতে পাবে, যারা তাদের এবাদত খানায় নির্জন বাস করছে এবং মনে করছে যে, তাদের এ নির্জনবাস আল্লাহর জন্য। অতএব, তাদের কোন ক্ষতি করবে না এবং তাদের এবাদত খানা ধ্বংস করবে না। আর তোমরা অবশ্যই এমন কিছু লোকদের দেখতে পাবে, যারা শয়তানের দলের অন্তর্ভুক্ত ও ক্রুশের অনুসারী। তারা মাঝখানে মাথা মুন্ডিয়ে রাখে যেন তা হাড়ের উপরের মোটা গোস্ত। ইসলাম গ্রহণ কিংবা অপদস্ত হয়ে জিযয়া না দিলে তাদের উপর তরবারী নিয়ে চড়াও হবে। এখন আমি তোমাদেরকে আল্লাহর নিকট সোপর্দ করছি”।

এ কথা বলে তিনি ইয়াযীদ বিন আবু সুফ্যানের সাথে কোলাকুলি ও মোসাফেহা করলেন। অতঃপর রবীআ বিন আমেরের সাথে মোসাফেহা করলেন এবং বললেন হে রবীআ! আশা করি বনী আসফার (রোমানদের)- এর মোকাবিলায় তুমি তোমার বীরত্ব প্রকাশ করবে। আল্লাহ তোমাদের আশা-আকাঙ্খা পূর্ণ করুন এবং আমাদের ও তোমাদের সকলকে ক্ষমা করুন".

ফন্ট সাইজ
15px
17px