📄 অনুবাদকের কথা
সকল সৃষ্টির সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা মানুষকে সর্বশ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। তাকে সৃষ্টি করার পেছনে তাঁর উদ্দেশ্য কী তা তিনি পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন। আমাদের দেশের আলেমরা জনসাধারণকে মানুষ সৃষ্টি করার পেছনে আল্লাহর উদ্দেশ্য কী তা বুঝাতে কুরআনের শুধু একটি আয়াতের উদ্ধৃতি দান করে থাকেন। তা হচ্ছে সূরা যারিয়াতের ৫৬ নং আয়াত- (( وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونَ)) “আমি মানুষকে শুধু আমার ইবাদত করার জন্যেই সৃষ্টি করেছি।” দুঃখের বিষয় তারা আল্লাহর মানুষকে সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য বর্ণনাকারী অন্যান্য যে আয়াত সমূহ রয়েছে, ভুলেও সেগুলোর ব্যাখ্যা করতে যান না। আমি বলছি না যে আয়াত গুলোয় তাদের দৃষ্টি পড়ে না বা তারা সেগুলোর অর্থ জানেন না। আমার যা বিশ্বাস, তাদের যথাযথ তাদাবব্বুরের অভাবে আয়াতগুলোর মমার্থ চলমান স্রোতের চাপ থেকে মুক্ত করে তাদের অন্তর্জগতকে যথাযথ ভাবে আন্দোলিত করতে পারছে না। শুধু মানুষ সৃষ্টির কারণ বিষয়ক আয়াতগুলো নয়, মানুষের জীবন বিধানের ব্যাখ্যা সম্বলিত অনেক আয়াতের ব্যাপারেও তাদের এ দায়িত্বহীনতা প্রতিভাত হচ্ছে। অন্তর সাক্ষ্য দেয় যে, পৃথিবীতে মুসলমানদের যন্ত্রণাদায়ক দুরাবস্থার জন্য কুরআন উপলব্দির ব্যাপারে এসব ধর্মগুরুদের এ ব্যর্থতাই মূল দায়ী। উপরোক্ত আয়াত ছাড়া মানুষ সৃষ্টির কারণ বর্ণনাকারী যে প্রচুর সংখ্যক আয়াত রয়েছে, তা থেকে সংক্ষিপ্ত কথায় তিনটি আয়াত উল্লেখ করতে চাই। আয়াত গুলো যথাক্রমে এই-
((وَهُوَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ وَكَانَ عَرْشُهُ عَلَى الْمَاءِ لِيَبْلُوكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا )) “আল্লাহ তিনিই, যিনি ছয়দিনে আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন। এর পূর্বে তার আরশ পানির উপর ছিল। যাতে তিনি তোমাদের মধ্য থেকে কে ভাল কাজ করে তা পরীক্ষা করেন" {হুদ: ৭}।
إِنَّا جَعَلْنَا مَا عَلَى الْأَرْضِ زِينَةً لَّهَا لِنَبْلُوَهُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا “পৃথিবীতে যা কিছু রয়েছে তাকে আমি তার জন্য শোভা স্বরূপ সৃষ্টি করেছি যাতে তাদের (মানুষের) কে ভাল কাজ করে তা পরীক্ষা করি” (কাহাফঃ ৭)।
تَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ الْمُلْكُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْ قَدِيرُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَوتِ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا)) “পবিত্র সে সত্তা যার হাতে সবকিছুর কর্তৃত্ব এবং তিনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান। যিনি মৃত্যু ও জীবনকে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের কে ভাল কাজ করে তা পরীক্ষা করার জন্য” (মুল্কঃ ১-২}
সুখের বিষয় হচ্ছে কোন্ কোন কাজ আল্লাহর দৃষ্টিতে ভাল ও কী করলে তার পরীক্ষায় মানুষ উত্তীর্ন হবে, তা কুরআন অবতীর্ণ করে ও নবী প্রেরণ করে মানুষের সামনে তিনি বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। কিন্তু মানুষের এ সব শোনা ও মানার ঝামেলায় পড়ার সময় কোথায়? তাই তাদের উপর আক্ষেপ করে আল্লাহ বলছেন-
((يَا حَسْرَةً عَلَى الْعِبَادِ مَا يَأْتِيهِمْ مِنْ رَسُولٍ إِلَّا كَانُوا بِهِ يَسْتَهْزِعُوْনَ)) “বান্দাদের জন্য আক্ষেপ! তাদের কাছে যে রাসূলই এসেছেন, তাঁর সাথে তারা বিদ্রুপ করেছে। (ইয়াসীনঃ ৩০}।
((وَلَقَدْ صَرَّفْنَا لِلনَّاسِ فِي هَذَا الْقُرْآنِ مِنْ كُلِّ مَثَلٍ فَأَبَى أَكْثَرُ النَّاسِ إِلَّا كَفُورًا)) "আমি এ কুরআনে মানুষের বুঝার (সুবিধার) জন্য সকল প্রকার দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছি। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ আমার অবাধ্যতা করেই চলছে”। {বনী ইসরাঈলঃ ৮৯}
যত প্রকার মানুষ যত ভাবে আল্লাহর অবাধ্যতা করে তার পরীক্ষায় হেরে যাাওয়ার আত্মঘাতি প্রচেষ্টায় লিপ্ত, তাদেরকে তিনি তত ভাবে সতর্ক করেছেন। যারা বলে 'দুনিয়াটা মস্ত বড়, খাও দাও ফুর্তি কর', তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেছেন-
((أَفَحَسِبْتُمْ أَنَّمَا خَلَقْنَاكُمْ عَبَثًا وَأَنَّكُمْ إِلَيْنَا لَا تُرْجَعُونَ)) "তোমরা কি মনে করেছ যে আমি তোমাদের খেলা করার জন্য সৃষ্টি করেছি এবং তোমরা আমার কাছে ফিরে আসবে না।" (আল মু'মিনূনঃ ১১৫)।
((لَوْ أَرَدْنَا أَنْ نَتَّخِذَ لَهُوًا لَّا تَخَذْنَاهُ مِنْ لَّদُنَّا إِنْ كُنَّا فَاعِلِينَ)) "যদি আকাশ ও পৃথিবীকে আমি খেলার জন্য সৃষ্টি করতাম। তাহলে নিজেরই কাছ থেকে তার ব্যবস্থা করে নিতাম।” (এ পৃথিবী ও তার অধিবাসীদের নিয়ে খেলা উপভোগ করতাম না) {আম্বিয়াঃ ১৭}।
অনুরূপ যারা অহংকার, অন্ধ অনুসরণ, লোক লজ্জা, লোকভীতি ও দুনিয়া প্রীতি কিংবা অন্য কোন কারণে আল্লাহর প্রদর্শিত জীবন ব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করে, তাদেরকেও তিনি কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ভাবে সতর্ক করেছেন। এ সংক্ষিপ্ত কথায় সে গুলোর উল্লেখের অবকাশ নেই। যারা তাদাব্বুর সহকারে নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করেন, আয়াত গুলো তাদের জানা থাকার কথা।
কুরআনে উল্লেখ না থাকলেও মানুষের অধিকাংশ যে আদিকাল থেকে আল্লাহর পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে আসছে, সেটা ইতিহাস সম্পর্কে ওয়াকিবহাল প্রত্যেক কৃতকার্য মানুষের জানা থাকার কথা। কুরআনও এ সত্যটা মানুষের সামনে সুস্পষ্ট করে দিয়েছে। বলছে- ((وَمَا أَكْثَرُ النَّاسِ وَلَوْ حَرَصْتَ بِمُؤْمِنِينَ)) "আপনি কামনা করলেও অধিকাংশ মানুষ ঈমান আনবে না।” {ইউসুফ: ১০৩}।
উল্লেখ্য যে, আল্লাহ তাআলা তার পরীক্ষায় কৃতকার্যদের নাম দিয়েছেন মুমিন এবং মুসলমান। পরীক্ষায় কৃতকার্যদের উপর আল্লাহর এ এক বড় অনুগ্রহ যে, অকৃতকার্যদের আধিক্য ও প্রাবল্য দেখে যাতে তারা হতাশ কিংবা পথচ্যুত না হয়, সেজন্য তিনি কুরআনে বিভিন্ন ভাবে তাদেরকে সতর্ক করেছেন ও শান্তনা দিয়েছেন। বলেছেন- ((لَا يَغُرَّنَّكَ تَقَلُّبُ الَّذِينَ كَفَرُوا فِي الْبِلَادِ مَتَاعٌ قَلِيلٌ ثُمَّ مَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ)) "যারা দেশে দাপটের সাথে চলাফেরা করছে, তাদের দাপট যেন তোমাকে বিভ্রান্তিতে না ফেলে। এটা শুধু কয়েক দিনের জীবনের সামান্য মজা। তার পর এদের স্থান হবে জাহান্নাম। আর তা কতই নিকৃষ্ট জায়গা।” { আলে ইমরানঃ ১৯৬-১৯৭}।
এরপর কৃতকার্য তথা মুমিনদের পরিণতি সম্পর্কে ইরশাদ হচ্ছে- ((لَكِنِ الَّذِينَ اتَّقَوْا رَبَّهُمْ لَهُمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا نُزُلاً مِّنْ عِنْدِ اللهِ وَمَا عِنْدَ اللَّهِ خَيْرٌ لِلْأَبْرَارِ )) "কিন্তু যারা তাদের পালনকর্তাকে ভয় করেছে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত সমূহ, যার তলদেশে প্রবাহিত রয়েছে নদী সমূহ। তথায় তারা চিরকাল থাকবে। এটা তাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে মেহমানদারী। আর যা কিছু আল্লাহর কাছে রয়েছে, তাই ভাল লোকদের জন্য সর্বোত্তম” (আলে ইমরানঃ ১৯৮}।
কৃতকার্যরা যাতে অকৃতকার্যদের স্বচ্ছলতা অন্য কথায় মুসলমানরা যাতে কাফিরদের পার্থিব উন্নতি দেখে সফলতার পথ থেকে বিচ্যুত না হয় তার প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন- ((وَلَوْلَا أَنْ يَكُونَ النَّاسُ أُمَّةً وَاحِدَةً لَجَعَلْنَا لِمَنْ يَكْفُرُ بِالرَّحْمَنِ لِبُيُوتِهِمْ সَقْفًا مِنْ فِضَّةٍ وَمَعَارِجَ عَلَيْهَا يَظْهَرُونَ وَلِبُيُوتِهِمْ أَبْوَابًا وَسُرُرًا عَلَيْهَا يَتَّكِنُوْنَ، وَزُخْرُفًا وَإِنَّ كُلَّ ذَلِكَ لَمَا مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ عِنْدَ رَبِّكَ لِلْمُتَّقِينَ)) "যদি মানুষ সবাই একই দলের (কাফির) অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আশংকা না থাকত তা হলে আমি যারা দয়াময়ের অবাধ্যতা করে রৌপ্য দিয়ে তাদের ঘরের ছাদ ও সিঁড়ি তৈরীর সামর্থ দিতাম যেখানে তারা পদাচরণা করত এবং তাদের ঘরের দরজা ও শয়নের খাটও রৌপ্য দিয়ে তৈরী করার সামর্থ দিতাম। আর তাদেরকে দান করতাম প্রচুর স্বর্ণ। এগুলো পার্থিব জীবনের ভোগ সামগ্রী। আর তোমার প্রভুর নিকট আখিরাতের চিরস্থায়ী ভোগ সামগ্রী রয়েছে শুধু মুত্তাকীদের জন্য"।
ঈমান ও কুফরের দন্দ্ব যে চিরকাল বাকী থাকবে এবং কারো ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে যে আল্লাহ কাউকে তার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করবেন না, সে ব্যাপারে তিনি বলেন- وَلَوْ شَاءَ رَبُّكَ لَجَعَلَ النَّاسَ أُمَّةً وَاحِدَةً وَلَا يَزَالُوْنَ مُخْتَلِفِينَ إِلَّا مَنْ رَّحِمَ رَبُّكَ، وَلِذَلِكَ خَلَقَهُمْ وَتَمَّتْ كَلِمَةُ رَبِّكَ لَأَمْلَتَنَّ جَهَنَّمَ مِنَ الْجِنَّةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ . "তোমার পালনকর্তা চাইলে সকল মানুষকে একই দলের (অর্থাৎ মুসলমান ) অন্তর্ভূক্ত করতে পারবেন। (তিনি যেহেতু জোর করে তা করতে চান না, সেহেতু) তোমার প্রভুর অনুগ্রহ প্রাপ্তরা ছাড়া বাকীরা তার (ভাল মন্দের এ পরীক্ষায়) বিভক্তই থাকবে। এ পরীক্ষার জন্যই তিনি তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। তোমার প্রভুর নিকট এ বিষয়টি সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে যে, জাহান্নামকে আমি শুধু জিন ও মানুষ দ্বারা পূর্ণ করবো” (হুদঃ ১১৮-১১৯}।
এরপর তিনি অকৃতকার্য বান্দাদের প্রতি কৃতকার্যদের দায়িত্ব কি এবং উভয়ের সম্পর্ক কোন ধরণের হবে সে ব্যাপারে বলছেন- اُدْعُ اِلٰى سَبِيْلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلُهُمْ بِالَّتِيْ هِيَ اَحْسَنُ
"তুমি তোমার প্রভুর পথে (জায়িয) কৌশল ও সদুপদেশের দ্বারা আহবান কর। আর তাদের সাথে উত্তম উপায়ে বিতর্ক কর" [নাহল: ১২৫]
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ اُسْوَةٌ حَسَنَةٌ فِيْ اِبْرَاهِيْمَ وَالَّذِيْنَ مَعَهٗ اِذْ قَالُوْا لِقَوْمِهِمْ اِنَّا بُرَءٰٓؤُا مِنْكُمْ وَمِمَّا تَعْبُدُوْনَ مِنْ دُوْنِ اللّٰهِ كَفَرْنَا بِكُمْ وَبَدَا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةُ وَالْبَغْضَاءُ حَتّٰى تُؤْمِنُوْا بِاللّٰهِ وَحْدَهٗ
"ইব্রাহীম ও তার সাথে যারা ছিল, তাদের মাঝে তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ রয়েছে। তারা যখন তাদের সগোত্রীয় কাফিরদেরকে বলল, তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে পূজা কর, তাদের কাছ থেকে আমরা মুক্ত। তোমাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলাম এবং যতক্ষণ না তোমরা ঈমান আনবে, তোমাদের ও আমাদের মাঝে শত্রুতা ও ঘৃণা স্পষ্ট হয়ে থাকবে।” [ মুমতাহিনাঃ ৪]
وَقَاتِلُوْهُمْ حَتّٰى لَا تَكُوْনَ فِتْنَةٌ وَّيَكُوْনَ الدِّيْنُ كُلُّهٗ لِلّٰهِ
"ইসলাম বিরোধীদের সাথে ততক্ষণ লড়াই কর, যতক্ষণ না কোন অবিচার থাকে ও আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়” [আনফল: ৩৯]।
قَاتِلُوا الَّذِيْنَ لَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَلَا بِالْيَوْمِ الْآخِرِ وَلَا يَدِينُونَ دِينَ الْحَقِّ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ حَتَّى يُعْطُوا الْجِزْيَةَ عَنْ يَدٍوَّهُمْ صَاغِرُونَ
"যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে, তাদের যারা আল্লাহ ও পরকালের উপর বিশ্বাস স্থাপন এবং সত্য দ্বীনের (ইসলাম) আনুগত্য স্বীকার করবে না, তাদের সাথে লড়াই করতে থাক যে পর্যন্ত না তারা লঞ্চিত হয়ে স্বহস্তে তোমাদেরকে জিযয়া (জান মালের নিরাপত্তা পণ) না দিবে।" [তাওবাঃ ২৯]
উপরোক্ত আয়াত চতুষ্টয়ের একটিও রহিত হয়নি। ভুলেও এ আয়াত গুলো রহিত হয়ে যাওয়ার কথা কোন মুসলমান আলিম এ পর্যন্ত বলেননি। এ আয়াত গুলোতে কাফিরদের সাথে মুসলমানদের আচরণ কেমন হবে তার ধারণা পাওয়া যায় এভাবে:
১. যারা ইসলামের অনুসারী তাদেরকে অবশ্যই যারা ইসলামের অনুসরণ করে না, তাদেরকে ইসলাম গ্রহণের আহবান জানাতে হবে। আর তা হবে রাসূলুল্লাহ সা. ও তাঁর সাহাবীদের আদর্শের আলোকে। কারণ, তারাই কুরআনের বাস্তব প্রতিচ্ছবি।
২. যারা ইসলামের অনুসরণ করে না, তারা যদি ইসলাম গ্রহণের আহবানকে প্রত্যাখান করে, তাহলে তারা যত কাছের লোক হোকনা কেন, তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে, তাদের প্রতি ঘৃণা এবং শত্রুতা পোষণ করতে হবে।
৩. ইসলামের অনুসারীদের হাতে ইসলাম প্রত্যাখ্যানকারী ওই নির্বোধেরা অপদস্ত হয়ে জিযয়া প্রদান না করা পর্যন্ত যুদ্ধ করে যেতে হবে।
উল্লেখ্য যে, অমুসলিমদের উপর ইসলামের জিযয়া ও যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া কোন বাড়াবাড়ির বিষয় নয়। বরং একান্তই তাদের প্রতি অনুগ্রহ। কারণ, দেখা গেছে, অমুসলিম তথা আল্লাহর পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার আত্মঘাতী চেষ্টায় লিপ্ত দলের সাথে মুসলমান তথা সাফল্যের পথের পথিকরা যুদ্ধ করে যখনই বিজয় লাভ করেছে, তখনই মানুষ দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করেছে। কারণ মানুষ প্রাকৃতিক ভাবে সত্যের চেয়ে শক্তির প্রতি অধিক বিনীত। শক্তির প্রভাবে মানুষের মানসিকতা ও কর্ম উভয় ক্ষেত্রে পরিবর্তন চলে আসে। ইসলামের সোনালী যুগের গোটা ইতিহাসই এ কথার সত্যতা প্রকাশ করে। রাসুলুল্লাহ সা. মক্কায় তের বছর নিরলস ভাবে মানুষকে সত্যের পথে ডেকেছিলেন। এ তের বছরে সত্যের আহবানে কয়েকশ'র অধিক মানুষ সাড়া দেয়নি। তিনি কিছু মানুষের সাড়া ও সহযোগিতা পেয়ে যখন মদীনায় হিজরত করলেন তখনও মদীনার অধিকাংশ লোক ইসলাম গ্রহণ করেনি। অতঃপর বদর, উহুদ ও খন্দকে কাফিরদের উপর বিজয় লাভ করলে কিছু কিছু মানুষ ইসলামের সত্যতা বুঝতে পেরে মুসলমান হয়। কিন্তু যেদিন তিনি অস্ত্র নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করলেন এবং আরবদের হৃদপিন্ড 'কা'বা' মুসলমানদের দখলে চলে আসল, তখন কাফির নেতারা কেউ পালালো, কেউ আত্মসমর্পন করল। আর তখন হিজায ও ইয়মানের বিভিন্ন আরব গোত্র দলে দলে এসে ইসলাম গ্রহণ করে। তখন আল্লাহ তাআলা এ প্রসঙ্গে সূরা নসর অবতীর্ণ করেন। দেখা গেল, মক্কা বিজয়ের সময় মুসলমানের সংখ্যা ছিল যেখানে দশ হাজার, সেখানে মাত্র চৌদ্দ মাসের ব্যবধানে বিদায় হজ্জের সময় মুসলমানদের সংখ্যা দাঁড়াল এক লক্ষ চৌদ্দ হাজারে। বর্তমানের সৌদি আরব ও ইয়ামানের কিছু অঞ্চল ছাড়া মধ্য প্রাচ্যের সকল অঞ্চল তখন খ্রীস্টান ও অগ্নিপূজারী অধ্যুষিত ও তাদের দ্বারা শাসিত ছিল।
ঐ সময় আফ্রিকা ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ এলাকা খ্রীষ্টানদের দ্বারা শাসিত ছিল। তাদের শাসিত অঞ্চলকে বলা হয় রোম সাম্রাজ্য। ইরান, ইরাক ও মধ্য এশিয়ার এলাকাগুলো অগ্নিপূজারীদের শাসনাধীন ছিল। তাদের শাসিত অঞ্চলকে বলা হয় পারস্য সাম্রাজ্য। রাসূলুল্লাহ সা. তার ইন্তিকালের কয়েকদিন পূর্বে তার প্রিয় পালিত সন্তান যাইদ বিন হারেছার ছেলে ১৮ বছর বয়সী উসামার নেতৃত্বে হযরত আবু বকর ও হযরত উমরের মত বড় বড় সাহাবীসহ সাহাবায়ে কেরামের এক বিশাল বাহিনীকে রোম সাম্রাজ্যের অন্যতম সমৃদ্ধ অঞ্চল শাম বিজয়ের জন্য অভিযানে প্রেরণ করেন। শাম বলতে আমরা এখন সিরিয়া বুঝলেও শাম বলতে তৎকালে ফিলিস্তিন, বসরা ও জর্দানকেও বুঝানো হত। তাই এক্ষেত্রে শাম বলতে বৃহত্তর সিরিয়াকে বুঝতে হবে। পূর্বের কথায় আবার ফিরে আসছি। শামের দিকে অভিযানে বের হওয়া সাহাবায়ে কেরামের ঐ কাফেলা কিছু দূর যাওয়ার পর প্রিয় নবী সা. এর ইন্তিকালের খবর পৌঁছলে সবাই পরামর্শ করে মদিনায় ফিরে আসেন। অতঃপর আবু বকর রা. খলীফা নির্বাচিত হওয়ার পর অনতিবিলম্বে তিনি প্রিয় নবী সা. এর মনোবাঞ্চা পূর্ণ করার উদ্দ্যেগ গ্রহণ করেন, যার বিবরণ এ বইয়ের শুরুতে রয়েছে। এ বইতে সাহাবায়ে কেরামগণ কীভাবে অপরিনামদর্শী ও আত্মঘাতী মানবজাতিকে সত্যের তরবারী দ্বারা জান্নাতের পথে নিয়ে এসেছেন, তার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।
ইতিহাস অধ্যয়ন ও তা থেকে শিক্ষা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা শুধু ইসলাম কর্তৃক স্বীকৃত বিষয় নয়, বর্তমান যুগের কাফিররাও তার প্রয়োজনীয়তা প্রচার করে বেড়াচ্ছে। সত্য কথা, ইসলামের অনুসারীদের জন্য রাসূলুল্লাহ সা. এর জীবনাদর্শকে যেমন আকড়ে ধরার বিকল্প নেই, তেমনি তাঁর নির্দেশের কারণে তার সাহাবীদের জীবনাদর্শকে আকড়ে ধরাও অপরিহার্য। কারণ, রাসূলুল্লাহ সা. এর সাহচর্য পাওয়ার কারণে ইসলামকে তারা যতটুকু সঠিক ভাবে উপলদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন, তা অন্য কারো পক্ষে কখনো সম্ভব নয়। যারা সাহাবীদের জীবনার্শকে অগ্রহনযোগ্য ও তাদের অবিশ্বস্ত বলে প্রচার করে, তাদেরকে আমরা শিয়া, রাফেজী, খারেজী, মু'তাযিলা প্রভৃতি বলে চিহ্নিত করি। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ বাক্যটির অর্থ যারা উপলদ্ধি করেন তারা আমাদের দাবিকে অবশ্যই আত্মপ্রবঞ্চনা বলে আখ্যা দেওয়ার অধিকার রাখেন। এ বাক্যটির অর্থ হচ্ছে রাসূলুল্লাহ সা. এর সুন্নত ও সাহাবায়ে কেরামের আদর্শকে অনুসরণকারী লোক সমষ্টি। কারণ, আমরা রসূলুল্লাহ সা. ও তার সাহাবীদের আদর্শকে না পূর্ণাঙ্গ রূপে জানছি, না যথাযথ ভাবে বাস্তবায়ন করছি। তারপরও কাফির ও কুফর দ্বারা শাসিত বিশ্বের প্রধান দুর্নীতিপরায়ণ এ দেশে নায়েবে রাসূল মনে করে নিজেদের ও জাতিকে ধোকায় ফেলে কাল্পনিক সুখানুভূতিতে আমরা বিভোর হয়ে রয়েছি। এমন পরিস্থিতিতে সকল দুঃখ ও অভিযোগ একমাত্র আল্লাহকে জানিয়ে মনকে প্রবোধ দেওয়া ছাড়া কিছু করার পথ দেখছি না।
যে সব দৃষ্টি সম্পন্ন মুসলমানদের অন্তর স্বজাতির ঈমান ও আমলের চরম দুর্ভিক্ষ দেখে পৃথিবীতে ইসলামকে বিজয়ী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার আস্ফালনকে অরণ্যে রোদন বলে ধরে নিয়েছে, তারা সাহাবায়ে কেরামের বিশ্ব জয়ের ইতিহাসে মুনাফিক বেষ্টিত এ সমাজে বাস্তবায়ন যোগ্য কোন দৃষ্টান্ত অবশ্যই খুঁজে পাবেন না। এসব হতাশাগ্রস্থ মুসলমানদের স্বস্তির জন্য (যাদের অন্তর্ভুক্ত আমি নিজেও) নিম্নের দু'টি হাদীস খুঁজে পেয়েছি। আশা করি এ হাদীসদ্বয়ের বাস্তবায়নে তারা সাহাবীদের ন্যায় পার্থিব সাফল্য অর্জন না করলেও আখিরাতে তারা সাহাবীদের সাহচর্য লাভে ধন্য হবেন। এ হাদীসদ্বয়ের প্রথমটি সিহাহ সিত্তার অন্যতম কিতাব তিরমিযীতে উল্লেখিত হয়েছে। হাদীসটি ইমাম হাকিমের মুস্তাদরাক এ স্থান পেয়েছে এবং তা হাদীসের প্রখ্যাত ইমাম আল্লামা যাহাবী ও এযুগের প্রখ্যাত হাদীস বিশারদ আল্লামা মুহাম্মদ নাসিরুদ্দীন আলবানী সহীহ বলে আখ্য করেছেন। দ্বিতীয় হাদীসটি ইমাম বায়হাকীর কিতাব 'দালা-ইলুন নুবুওয়াহ'তে রয়েছে। এ যুগের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা আশিকে ইলাহী তার ক্ষুদ্র হাদীসের সংকলন 'যাদুত তালিবীন' এ হাদীসটি উল্লেখ করেছেন। হাদীস দু'টি যথাক্রমে এইঃ
(১) عَنْ أُمِّ مَالِكٍ الْبَهْزِيَّةِ - رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ : ذَكَر رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِتْنَةٌ فَقَرَبَهَا. قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ مَنْ خَيْرُ النَّاسِ فِيْهَا؟ قَالَ : رَجُلٌ فِي مَاشِيَتِهِ يُؤَدِّى حَقَّهَا وَيَعْبُدُ رَبَّهُ وَرَجُلٌ آخِذُ بِرَأْسِ فَرَسِهِ يُخِيفُ الْعَدُوَّ وَيُخِيفُوْنَهُ
১. উম্মে মালেক আল বাহযিয়াহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সা. শীঘ্র প্রকাশিতব্য ফিতনা সম্পর্কে আলোচনা করেন। বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! তখন কোন্ ব্যক্তিকে ভাল মানুষ বলে ধরতে হবে? বললেন, এক সে ব্যক্তি, যে তার পালিত পশুর রক্ষণাবেক্ষন করে এবং তার প্রভুর ইবাদত করে। আরেক ব্যক্তি সে, যে তার ঘোড়ার মাথায় ধরে শত্রুকে সন্ত্রস্ত করে রাখছে এবং শত্রুরাও তাকে ভীতি প্রদর্শন করছে।
(২) سَيَكُونُ فِي آخِرِ هُذِهِ الْأُمَّةِ قَوْمٌ لَّهُمْ مِثْلُ أَجْرٍ أَوَّلِهِمْ يَامُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُقَاتِلُونَ أَهْلَ الْفِتَنِ
২. এ উম্মতের শেষের দিকে এমন কিছু লোকের আবির্ভাব ঘটবে, যারা তাদের পূর্ববর্তীদের (অর্থাৎ সাহাবায়ে কেরাম) ন্যায় সওয়াব প্রাপ্ত হবে। তারা সৎ কাজের আদেশ করবে ও অসৎ কাজে বারণ করবে এবং ফিতনাবাজদের সাথে লড়াই করবে।
এ যুগের ফিতনা তালিবান-উসামার ইসলামী শাসন ও জিহাদ, না বুশ-ব্লেয়ার ও তাদের দোসরদের গরুতন্ত্র ও সেক্যুলারিজম? বিষয়টা কোন মুসলমানকে ব্যাখ্যা করে বুঝানোর প্রয়োজন আছে বলে মনে করছি না। সত্য বড়ই কঠিন। গলাবাজি ও কলমবাজির প্রয়োজন নেই, এ কথা বলা হচ্ছে না। কিন্তু সাথে সাথে যে...। বায়োজীদ খান পন্নী নামে এক খারেজী বের হয়ে ইতোমধ্যে অনেক সরল মানুষকে পথ ভ্রষ্ট করে ফেলেছে। নারীর দেহভোগ এক উপায়ে (যিনা) যেমন হারাম ও মারাত্মক অপরাধ, তেমনি অন্য উপায়ে (বিবাহ) ইসলাম কর্তৃক আদেশকৃত ও উৎসাহিত। অনুরূপ রক্তপাতও। যার কুরআন অধ্যয়ন একপেশে ও নিজের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট, সে কীভাবে এসহজ সত্যটা উপলব্দি করতে সক্ষম হবে?
অনেক কথা বলা হয়েছে। এখন অন্য বিষয়ে বলছি। সাহাবায়ে কেরামের দিগ্বিজয়ের ইতিহাস সংরক্ষনকারী কিতাব সমূহের মধ্যে ইমাম ওয়াকেদীর ফুতুহুশ শাম-ই একমাত্র বিস্তারিত তথ্য সম্বলিত। এতে সাহাবায়ে কেরামের ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, ফিলিস্তিন ও মিশর থেকে শুরু করে গোটা বিশ্ব জয় করার ইতিহাস বিস্তারিত ও বিন্যস্ত ভাবে আলোচিত হয়েছে। অন্য আরো অনেক কিতাব অনুবাদ হলেও কিতাবটি দুর্লভ ও আরবী হওয়ায় মনে হয় আজ পর্যন্ত এর বাংলা অনুবাদ হয়নি।
দয়াময়ের অনেক বড় অনুগ্রহ যে, তিনি আমার মত একজন দুর্বলকে কিতাবটির অনুবাদে হাত দেওয়ার তাওফীক দিয়েছেন। লেবাননের রাজধানী বৈরুত থেকে প্রকাশিত ছয়শতাধিক পৃষ্ঠার এ কিতাবটি অনুবাদের ক্ষেত্রে মীর পাবলিকেশন্স, বাইতুল মোকাররম, ঢাকা- এর স্বত্বাধিকারী মীর মোঃ ইউনুস সাহেবের উৎসাহ ভুলবার মত নয়। সাথে সাথে ঢাকার ৩২ তোপখানা রোডস্থ চট্টগ্রাম ভবনে অবস্থিত আল আরাফা ইসলামী ব্যাংকের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরীর প্রতিও আমি কৃতজ্ঞ। তাদের সংগৃহিত এ কিতাবটির অনুবাদ অনেকটা তাদের লাইব্রেরীর নির্মল পরিবেশে বসেই হয়েছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে আল্লাহ তাআলা ইসলামের আরো বেশী খেদমত করার তাওফীক দান করুন। বইটির অনুবাদে যা কিছু সুন্দর হয়েছে, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে এবং যা কিছু অসুন্দর রয়েছে, তা আমার নিজের। প্রশংসা, ত্রুটিমুক্ততা ও পূর্ণতার অধিকারী একমাত্র আল্লাহই। সবার অন্তরে একমাত্র তারই ভয় জাগ্রত থাকুক।
অনুবাদক
আবুল হুসাইন আলে গাজী
ঢাকা, ১৪.৪.১৪২৪ হিজরী
📄 ইমাম ওয়াকেদীর জীবনী
আল্লামা ওয়াকেদীর সংক্ষিপ্ত জীবনী
নাম: নাম মুহাম্মদ। পিতার নাম উমর। দাদার নাম ওয়াকেদ। দাদার নামের সাথে সম্পৃক্ত করে ওয়াকেদী বলা হয়। উপনাম আবু আবদুল্লাহ।
জন্ম: প্রখ্যাত ইতিহাস গ্রন্থ আততাবাকাতুল কুবরার লেখক ও আল্লামা ওয়াকেদীর ছাত্র ও অনুলেখক মুহাম্মদ বিন সাদ-এর বর্ণনা অনুযায়ী আল্লামা ওয়াকেদী মারওয়ানের খেলাফতের শেষের দিকে ১৩০ হিজরী সনে মদীনায় জন্ম লাভ করেন।
উস্তাদবৃন্দ: আল্লামা ওয়াকেদী যাদের কাছ থেকে হাদীস ও ইতিহাস বর্ণনা করেছেন, তাদের অন্যতম হচ্ছেন, ইমাম মালিক, ইমাম আওযাঈ, ইমাম সুফয়ান, ইমাম ইবনে জুরাইজ, ইমাম ইবনে আবি যি'ব, ইমাম মা'মার বিন রাশেদ ও ইমাম মুহাম্মদ বিন আজলান।
ছাত্রবৃন্দ: ইমাম ওয়াকেদীর কাছ থেকে যারা রেওয়ায়েত করেছেন, তাদের অন্যতম হচ্ছেন ইমাম শাফেঈ, ইমাম আবু বকর বিন আবু শাইবা, ইমাম মুহাম্মদ বিন ইয়াহইয়া বিন আবু হাতিম, আর অনুলেখক ইমাম মুহাম্মদ বিন সাআদ বিন মানী' ও আহমদ বিন রজা আল ফিরয়াবী। এ ছাড়া তার কাছ থেকে আরো অগনিত সংখ্যক লোক রেওয়ায়েত করেছেন (লেখা পড়া করে গেছেন)।
সমালোচকদের চোখে আল্লামা ওয়াকেদী: ইমাম আহমদ, ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিম, ইমাম নাসায়ী, ইমাম হাকেম, ইমাম ইয়াহয়া বিন মাঈন, ও আলী ইবনুল মদীনীর মতে ইমাম ওয়াকেদীর হাদীস গ্রহণ যোগ্য নয়। ইমাম ইবরাহীম আল হারদি, ইমাম ইবরাহীম বিন সাঈদ আল জওহারী, ইমাম মুসআ'ব আয যুবাইরী, ইমাম দারাওয়ারদী ও ইমাম আবু আমের আল আকাদীর মতে ইমাম ওয়াকেদীর হাদীস গ্রহণযোগ্য। বরং কেউ কেউ তাকে ইমামুল মুসলিমীন ফিল হাদীস বলে অভিহিত করেছেন।
বাস্তবতা: ইমাম ওয়াকেদী হাদীসের ক্ষেত্রে দুর্বল হওয়ার কারণ হচ্ছে তিনি ইতিহাস পাগল ছিলেন। ইসলামের নবী সা. ও তার সাহাবীদের বিজয় গাঁথা সংগ্রহ করা তার প্রিয় সখ ছিল। এ ব্যাপারে ঐতিহাসিক ইবনে আসাকির, খতীবে বাগদাদী ও ইবনে সাইয়িদিন্নাসের বর্ণনাকৃত ইমাম ওয়াকেদীর এ কথাটি প্রমাণের জন্য যথেষ্ঠঃ
"আমি সাহাবা, শহীদ ও তাদের আযাদকৃত গোলামদের যাকেই পেয়েছি, তাকে জিজ্ঞেস করেছি, আপনি কি আপনার পরিবারের কাউকে তার জিহাদ করার স্থান সম্পর্কে বলতে শুনেছেন? যদি তিনি আমাকে এব্যাপারে তথ্য দিতেন, তাহলে আমি স্বচক্ষে দেখার জন্য ঐ স্থানে চলে যেতাম। মুরাইসীর রণাঙ্গনে গিয়ে আমি তা স্বচক্ষে দেখেছি। কোন মুজাহিদের খবর শুনলে আমি তার জিহাদ করার স্থান প্রত্যক্ষ করার জন্য চলে যেতাম।”
ইবনে সা'দের দৃষ্টিতে ওয়াকেদী: ইমাম ওয়াকেদীর ছাত্র ও অনুলেখক ইমাম মুহাম্মদ বিন সাদ যিনি হাদীসের ক্ষেত্রে তার উস্তাদ ইমাম ওয়াকেদীর মত সমালোচিত নন, তার মূল্যায়ন হচ্ছেঃ
“তিনি (ওয়াকেদী) যুদ্ধ, ইতিহাস, দেশবিজয় হাদীসের ব্যাপারে মানুষের মতপার্থক্য ও যে কোন ব্যাপারে তাদের ঐকমত্য সম্পর্কে জ্ঞান রাখতেন। এ বিষয় গুলো তিনি তার বিভিন্ন কিতাবে ব্যাখ্যা ও পাঠ দানের মাধ্যমে বণর্না করেছেন"।
খতীবে বাগদাদীর দৃষ্টিতে: প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ইমাম আবুবকর খতীবে বাগদাদী হাদীসের ক্ষেত্রে তার ব্যাপারে যা বলা হয়েছে, তাতে ইমাম ওয়াকেদী মযলূম বলে মন্তব্য করেন। ইমাম ওয়াকেদীর জীবনী আলোচনা করে তিনি বলেন, "ওয়াকেদী মদীনা থেকে বাগদাদে চলে আসেন এবং বাগদাদের পূর্বাংশের বিচারকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি এমন ব্যক্তিত্ব যার সুনাম তার জীবদ্দশায় পূর্ব ও পশ্চিমে ছড়িয়ে পড়ে। মানুষের জীবনিতিহাস সম্পর্কে যাদের ধারণা রয়েছে, তাদের অবশ্যই ইমাম ওয়াকেদীর ব্যাপারে জানা থাকার কথা। যুদ্ধ ইতিহাস, নবী সা. এর জীবনী তার জীবদ্দশায় ও ইনতিকালের পর সংঘটিত ঘটনাবলী, সাহাবীদের জীবনী, হাদীস নিয়ে মানুষের মত পার্থক্য ও ফিকাহ সম্পর্কে রচিত কিতাবের জ্ঞান আহরণ করার জন্য মানুষ তার নিকট দূর দূরান্ত থেকে আগমন করত। দান ও বদান্যতার ক্ষেত্রে তার সুখ্যাতি ছিল। মুহাম্মদ বিন সাললাম আল জুমাহী বলেন, ওয়াকেদী তার যুগের সবচেয়ে বড় আলিম ছিলেন"।
বিচারকের পদে: ইমাম ওয়াকেদী আর্থিক অনটনের কারণে খলীফা হারুনুর রশীদের প্রধান কার্যনিবাহী ইয়াহইয়া বিন খালিদ আল বরমাকীর আহবানে সাড়া দিয়ে ইমাম ওয়াকেদী ১৮০ হিজরী সনে মদীনা ছেড়ে বাগদাদে চলে আসেন। সেখান থেকে সিরিয়া ও রাক্কায় গমন করেন। সেখানে সফর শেষে বাগদাদে ফিরে আসেন। অতঃপর খলীফার ছেলে মামুন খোরাসান থেকে বাগদাদে আগমন করার পর তাকে বাগদাদের পূর্বাংশের বিচারকের পদে নিয়োগ করেন।
রচনাবলী: বিভিন্ন বিষয়ে ইমাম ওয়াকেদীর রচিত কিতাব সংখ্যা প্রায় ২৮টি। তা হচ্ছে- কিতাবুল মাগাযী (৩ খন্ড), কিতাবুত তাবাকাত, ফতুহুশ শাম, (২ খন্ড), ফুতুহুল ইরাক, কিতাবুল জামাল, মাকতালুল হুসাইন, কিতাবুস সীরাহ , আযওয়াজুন্নবী সা., কিতাবুর রদ্দিাহ ওয়াদ্দার, কিতাবু সিফফীন, ওয়াফাতুন্নবী সা., হারবুল আউস ওয়াল খাযরাজ, আমুরুল হাবশা ওয়ালফীল, কিতাবুল মানাকিহ, আসসাকীফাতু ওয়াবাইআতু আবি বকর রা., যিকরুল কোরআন, সীরাতু আবি বকর ও ওয়াফাতুহু, তারীখুল ফুসাহা, কিতাবুল আদাব, যারবুদ দানানীর ওয়াদ দারাহিম, আত তারীখুল কবীর, গালাতুল হাদীস, আসসুন্নাহ ওয়াল জামাআহ, যাম্মুল হাওয়া ও তুরকুল খাওয়ারিজ ফিল ফিতান, আল ইখতিলাফ, মাওলিদুল হাসান ওয়াল হুসাইন, আর রগীব ফি ইলমিল কুরআন ওয়াল গালাতুর রিজাল, মারাই কুরাইশ ওয়াল আনসার।
ইন্তিকাল: নির্ভরযোগ্য মত তথা ইমাম ওয়াকেদীর ছাত্র ও অনুলেখক ইতিহাসবিদ ইবনে সা'দের মতে ইমাম ওয়াকেদী ২০৭ হিজরী সনে ইন্তিকাল করেন। তার মতটি সবচেয়ে বেশী গ্রহণ যোগ্য হওয়ার কারণ হচ্ছে, তিনি ইমাম ওয়াকেদীর ইন্তিকালের সময়, দিন, তারিখ, স্থান ও সমাধির কথাও উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ইমাম ওয়াকেদী ২০৭ হিজরী সনের জিলহজ্ব মাসের ১১ তারিখ মঙ্গলবার রাত্রে তথা সোমবার দিবাগত রাত্রে বাগদাদে ইন্তিকাল করেন। মঙ্গলবার দিন তাকে হাইযারান গোরস্তানে দাফন করা হয়। ইন্তিকালের সময় তার বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর। ইন্তিকালের পূর্ব পর্যন্ত মোট চার বছর তিনি বিচারকের পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
প্রাচ্যবিদদের ষড়যন্ত্র: বিগত কয়েক শতাব্দী ধরে প্রাচ্যবিদরা (Orientalist) ইসলাম নিয়ে ব্যাপক হারে লেখালেখি করে আসছে। খ্রীষ্টান ধর্মের অনুসারী পাশ্চাত্যের প্রাচ্যবিদরা কুরআন, হাদীস, সীরাতুন্নবী সা. ও ইসলামের ইতিহাস থেকে শুরু করে সবখানেই তাদের ক্ষুরধার কলম চালিয়েছে ও চালাচ্ছে। মুসলমানদের কাছে তাদের এসব রচনাবলী গ্রহনযোগ্য হওয়ার জন্য তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে সত্যের অনুসরণ করেছে। ইসলাম নিয়ে তাদের গবেষণার উদ্দেশ্য যেহেতু সুক্ষ্ণভাবে ইসলামকে চরম আঘাত হানা, সেহেতু তারা যেখানে সুযোগ পেয়েছে সেখানে বিশ্বাসযোগ্য ভঙ্গিতে ইসলামের উপর আঘাত হেনেছে। মার্সডেন জন্স (Marsden Jons) নামের এক প্রাচ্যবিদ ইমাম ওয়াকেদীর অন্যতম কিতাব 'কিতাবুল মাগাযী' সম্পাদনা করেছেন। এটি ১৯৬৫ সালে অক্সফোর্ড ইউনির্ভাসিটি প্রেস, লন্ডন থেকে প্রকাশিত হয়। এ মার্সডেন জন্স কিতাবটির শুরুতে ইমাম ওয়াকেদীর জীবনী আলোচনা করতে গিয়ে এক জায়গায় আরেক জন প্রাচ্যবিদের বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন যে, বর্তমান বাজারে বিদ্যমান 'ফুতুহুশ শাম' ইমাম ওয়াকেদীর লিখিত 'ফুতুহুশ শাম' নয়। তার এ মন্তব্য যে একটি সুপরিকল্পিত খৃষ্ঠবাদী ষড়যন্ত্র, তা দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট। কারণ 'ফুতুহুশ শাম'-এ ইসলামের সৈনিকদের তরবারীর সামনে খৃষ্ঠবাদী রোম সাম্রাজ্যের অতি লাঞ্চনাদায়ক পতনের বিবরণ বিস্তারিত ভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
মুসলমানদের ঐক্য ও সশস্ত্র জিহাদের মুখে মিথ্যার অনুসারী ও প্রবৃত্তিপূজারী পাশ্চাত্যের খ্রীষ্টান ও তাদের দোসর ইহুদীরা মুলমানদেরকে পরাজিত করার সর্বশেষ ও সবচেয়ে কার্যকর যে অস্ত্রটি খুঁজে পেয়েছে, সেটা হচ্ছে প্রচার মাধ্যম। একবিংশ শতাব্দীতে এসে সাদাকে কালো, তীলকে তাল সাজিয়ে প্রচারের ধারাবাহিকতায় ও জিহাদকে সন্ত্রাস বলে প্রচার করার ক্ষেত্রে তাদের অভিজ্ঞতার মাত্রা মনে হয় অনেক অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই সত্যের অনুসারীদের অনেক লোক আজ 'গুয়েন্তেনামো বে' নামক দ্বীপে সন্ত্রাসীদের হাতে বন্দী হয়ে আছে। শয়তানী স্বার্থ সিদ্ধির জন্য এরা যেমন প্রচারের সাথে সাথে সি আই এ ও মোসাদ প্রভৃতির মাধ্যমে যেখানে প্রয়োজন সেখানে গুপ্ত হত্যা চালিয়ে যাচ্ছে, তেমনি মুসলমানদেরকেও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য প্রচার যুদ্ধ ও মিথ্যাকে মিথ্যা দিয়ে মোকাবেলা করার সাথে সাথে ইসলামের শত্রুদেরকে তাদের ব্যবহৃত অস্ত্র দিয়ে পরাজিত করার অঙ্গিকার গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে প্রকৃত মুমিন হওয়া আদৌ সম্ভব হবেনা।
ইমাম ওয়াকেদীর এ সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখতে যে দুটি কিতাবের সাহায্য নিয়েছি সে দুটো হচ্ছে, যথাক্রমে আল্লামা জামালুদ্দীন মিযযীর 'তাহযীবুল কামাল ফি আসমা-ইররিজাল' ও ড মার্সডেন জন্স সম্পাদিত ইমাম ওয়াকেদীর 'কিতাবুল মাগাযী'।
আবুল হুসাইন আলে গাজী
ঢাকা, ১৪.৪.১৪২৪ হিজরী
📄 সূচনা
ইমাম আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ বিন উমর আল ওয়াকিদী রহ. বলেন, আমাকে আবু বকর ইবনুল হাসান বিন সুফইয়ান বিন নওফল বিন মুহাম্মদ বিন ইব্রাহীম আত-তাইমী, মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ আল আনসারী, হিসামের আযাদকৃত গোলাম আবু সাঈদ, মালিক বিন আবুল হাছান, যুবাইরের আযাদকৃত গোলাম ইসমাঈল ও বনু নাজ্জারের মাযিন বিন আউফ প্রমুখ সিরিয়া বিজয়ের ঘটনা বর্ণনা করেছেন।
তারা বলেছেন, রাসুলুল্লাহ সা.-এর ইন্তেকালের পর হযরত আবু বকর রা. তার খলীফা হলেন। তাঁর খেলাফতকালে নবুওয়াতের দাবীদার মুসায়লামা কায্যাবকে হত্যা করা হয়েছে এবং তিনি বনু হানিফা ও মুরতাদদের সাথে যুদ্ধ করেছেন। আরবের লোকেরা তাঁর অনুগত হলেন। তখন তিনি রোম সাম্রাজ্যের অধীন শাম বিজয়ের লক্ষ্যে সৈন্য পাঠানোর ইচ্ছা করলেন এবং এ উদ্দেশ্যে সাহাবায়ে কেরামকে মজিদে ডাকেন এবং আল্লাহর প্রশংসা করে তাদের উদ্দেশ্যে বলেন,
يا أيها الناس رحمكم الله تعالى : اعلموا أن الله فضلكم بالإسلام وجعلكم من أمة محمد عليه الصلاة والسلام وزادكم إيمانا ويقينا ونصركم نصرا مبينا. وقال فيكم اليوم أكملت لكم دينكم وأتممت عليكم نعمتي ورضيت لكم الاسلام دينا واعلموا أن رسول الله صلى الله عليه وسلم كان عول أن يصرف همته إلى الشام فقبضه الله إليه واختار له ما لديه ألا وإنى عازم أن أوجه أبطال المسلمين إلى الشام بأهليهم ومالهم فإن رسول الله صلى الله أنبأني بذلك قبل موته وقال (( زويت لي الأرض فرأيت مشارقها ومغاربها وسيبلغ ملك أمتى مازوى لى منها))- فما قولكم في ذلك ؟ فقالوا ياخليفة رسول الله مرنا بأمرك ووجهنا حيث شئত ، فإن الله تعالى فرض علينا طاعتك، فقال تعالى (( يا أيها الذين آمنوا أطيعوا الله وأطيعوا الرسول وأولى الأمر منكم))، ففرح أبوبكر رضى الله عنه ونزل عن عن المنبر وكتب الكتب إلى ملوك اليمن وأهل مكة وكانت الكتب فيها نسخة واحدة وهي بسم الله الرحمن الرحيم سلام عليكم أما بعد فإني أحمد الله الذي لا إله إلا هو وأصلى على نبيه محمد. وقد عزمت أن وجهكم إلى بلاد الشام لتأخذوها من أيدى الكفار والطغاة، فمن عول منكم على الجهاد والصدام فليبادر إلى طاعة الملك العلام، ثم كتب : ((انفروا خفافا و ثقالا وجاهدوا بأموالكم وأنفسكم في سبيل الله) الآية. ثم بعث الكتب إليهم وأقام ينتظر جوابهم وقدومهم. وكان الذي بعثه بالكتب إلى اليمن أنس بن مالক خادم رسول الله صلى الله عليه وسلم.
"হে লোক সকল! আপনাদেরকে আল্লাহ রহম করুন। জেনে রাখুন, আল্লাহ তাআলা আপনাদেরকে ইসলাম দ্বারা সম্মানিত করেছেন এবং মুহাম্মদ সা.-এর উম্মতের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। আর তিনি আপনাদেরকে ঈমান ও এক্বীন দ্বারা ভূষিত করেছেন ও ব্যাপক সাহায্য করেছেন এবং আপনাদের ব্যাপারে বলেছেন, 'আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম ও আমার নেয়ামত তোমাদের ওপর সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য ইসলামকে দ্বীন হিসাবে পছন্দ করলাম।'
আর জেনে রাখুন, রাসুলুল্লাহ সা. শাম (সিরিয়া) বিজয়ের সংকল্প করেছিলেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাঁকে তাঁর কাছে নিয়ে গেছেন। এখন আমি মুসলিম বীরদেরকে তাদের পরিবার ও ধন সম্পদ সহ সিরিয়ার দিকে পাঠানোর ইচ্ছা করেছি। কারণ, রাসুলুল্লাহ সা. আমাকে তাঁর ইন্তেকালের পূর্বে এ ব্যাপারে সংবাদ দিয়ে গেছেন এবং বলেছেন, 'আমার জন্য পৃথিবীকে গুটিয়ে ফেলা হয়েছে। ফলে আমি পৃথিবীর পূর্ব ও পশ্চিম দিগন্ত দেখতে পেলাম। শীঘ্রই আমার উম্মত ঐ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে, যে পর্যন্ত আমার জন্য গুটানো হয়েছে'। অতএব, এ ব্যাপারে আপনাদের মতামত কি? উত্তরে সবাই বললেন, ওহে আল্লাহর রাসূলের খলীফা! আপনার যা ইচ্ছা আমাদের সে নির্দেশ দিন। এবং যে দিকে ইচ্ছা সেদিকে প্রেরণ করুন। কারণ, আল্লাহ তাআলা আমাদের জন্য আপনার নির্দেশ পালন করা ফরজ করে দিয়েছেন এবং এ ব্যাপারে তিনি বলেছেন, 'হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ, রাসুল এবং তোমাদের কর্তাব্যক্তিদের আনুগত্য করো'। তখন আবু বক্কর রা. মিম্বর থেকে নেমে গেলেন এবং ইয়ামান ও মক্কাবাসীদের কাছে পত্র লিখলেন। সবার কাছে একই পত্র লেখা হয়েছে। পত্রটি নিম্নরূপ-
আল্লাহর বান্দা আতিক বিন আবু কুহাফার পক্ষ থেকে মুসলমানদের প্রতি। আসসালামু আলাইকুম।
আমি সে আল্লাহর প্রশংসা করছি, যিনি ব্যতীত কোন ইলাহ নেই এবং তাঁর নবী মুহাম্মদের জন্য রহমত কামনা করছি। আমি আপনাদেরকে শামে পাঠানোর ইচ্ছা করছি, যাতে শাম কাফিরদের দখলদারিত্ব থেকে মুক্ত করা যায়। আপনাদের মধ্য থেকে যেই জিহাদ ও কাফিরদের মোকাবেলা করতে ইচ্ছুক, তার উচিত আল্লাহর আনুগত্যের জন্য যথা সম্ভব তাড়াতাড়ি প্রস্তুতি গ্রহণ করা। এর পর তিনি এ আয়াত লিখেন,
"তোমরা অল্প অথবা অধিক যুদ্ধসামগ্রী নিয়ে যুদ্ধে বের হয়ে পড় এবং আল্লাহর পথে তোমাদের জান ও মাল দ্বারা জিহাদ কর।"
এ সব চিঠি তিনি বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলমানদের কাছে পাঠিয়ে দিয়ে তাদের উত্তর ও আগমনের অপেক্ষায় থাকেন। ইয়ামানবাসীর নিকট পত্রটি রাসুলুল্লাহ সা.এর খাদেম আনাস বিন মালিক রা. এর মাধ্যমে প্রেরণ করেন। আর তার উত্তর এবং সৈন্যদের উপস্থিতির অপেক্ষায় থাকেন।
📄 ইয়ামানের সৈন্য
হযরত জাবির বিন আবদুল্লাহ্ রা. বলেন, কিছুদিন যেতে না যেতেই আনাস বিন মালেক রা. এসে ইয়ামানবাসীদের আগমনের সুসংবাদ শুনান। আর হযরত আবুবকর রা.-এর কাছে গিয়ে বলেন যে, আমি যাকেই আপনার নির্দেশ শুনালাম, সেই সাথে সাথে আল্লাহর আনুগত্য এবং আপনার নির্দেশ মেনে নেয়। ঐ সব লোকেরা যুদ্ধের সাজ-সজ্জা ও প্রস্তুতি সহকারে আপনার খেদমতে উপস্থিত হতে যাচ্ছে। হে আল্লাহর রাসূলের খলিফা! তাদের পূর্বেই আমি আপনার নিকট সুসংবাদ নিয়ে উপস্থিত হয়েছি। যে সব লোক (আল্লাহর পথে জিহাদ করার লক্ষ্যে) আপনার নির্দেশ মেনে নিয়েছে, তারা খুবই সাহসী, ভাল যোদ্ধা এবং ইয়ামানের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। তারা পরিবার-পরিজনসহ রওয়ানা হয়েছেন এবং শীঘ্রই এসে পৌঁছাচ্ছেন। আপনি তাদের সাক্ষাতের জন্য প্রস্তুত থাকুন। তিনি, (আবুবকর রা.) এ কথা শুনে খুব আনন্দ বোধ করলেন। এ দিন তো এভাবেই চলে গেল। দ্বিতীয় দিন সকালেই মুজাহিদদের আগমনের ধুম পড়ে যায়। মদীনাবাসী এ দৃশ্য দেখে হযরত আবুবকর রা.-এর নিকট উপস্থিত হয়ে তাঁকে এ ব্যাপারে অবহিত করে। তিনি মদীনাবাসী ও অন্যান্য লোকজনকে নিজ নিজ বাহনে সওয়ার হওয়ার নির্দেশ দেন এবং ইসলামের ঝান্ডা নিয়ে তাদের সাথে মুজাহিদদের অভিবাদন জানানোর জন্য অগ্রসর হন। কিছুক্ষণ পর মুজাহিদগণের দলবদ্ধ আগমন শুরু হয়ে যায়। প্রত্যেক গোত্র তখন ঝান্ডা উঁচু করে একে অপরের পিছনে সানন্দে অগ্রসর হচ্ছিল।
আগত সৈন্যদের মধ্যে যে দল দাউদী বর্ম, ভারতীয় তরবারী ও শিরস্ত্রান নিয়ে সবার আগে এসে পৌঁছল, তা হচ্ছে হিময়ার গোত্রের লোকেরা। এ গোত্রের নেতা ছিলেন যুলকিলা আল হিময়ারী রা.। তাঁর মাথায় পাগড়ী ছিল। তিনি আবুবকর রা.-এর নিকট পৌঁছে তাকে সালাম করলেন এবং নিজেদের অবস্থা জানালেন! আর নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করলেন:
"আমি হিময়ার গোত্রের লোক। আর যে লোকদেরকে আপনি আমার সাথে দেখছেন, তারা যুদ্ধের প্রথম সারিতে থাকে। তারা উচ্চ বংশের, সাহসিকতা তাদের স্বভাবজাত বিষয় এবং তারা বীরদের নেতা। এরা যুদ্ধের সময় বড় বড় সশস্ত্র বীরদের তরবারী ভেঙ্গে ফেলে। যুদ্ধ করা আমাদের শখ এবং এতে আমরা মারা ও মরা উভয়ের হিম্মত রাখি। যুলকিলা এ সব প্রতিশ্রুতিবদ্ধ লোকদের নেতা। আমাদের সৈন্যরা এসে পৌঁছেছে। সিরিয়া আমাদের লক্ষ্যস্থল, আর দেমেস্ক তো আমাদেরই। ওখানকার অধিবাসীদের আমরা ধ্বংস করে ছাড়ব"