📘 ফুরকান রহমানের আউলিয়া ও শয়তানের আউলিয়া চিহ্নিতকরনের বিবরণ > 📄 সাহাবিদের কারামাত

📄 সাহাবিদের কারামাত


সাহাবি, তাবিঈ এবং সালাফদের জীবনের সংঘটিত কারামাতের সংখ্যাও প্রচুর।
উসাইদ ইবনু হুদাইর যখন কুরআনের দ্বিতীয় সূরা (সূরা বাকারাহ) পড়তেন তখন তার সামনে অনেকগুলো প্রদীপে পরিপূর্ণ একটি মেঘখণ্ড ভেসে বেড়াতে দেখতেন। মূলত তারা ছিলেন ফেরেশতা, যারা তিলাওয়াত শুনতে এসেছিলেন। [৪৩৪]
ইমরান ইবনু হুসাইন -কে ফেরেশতারা সালাম জানাতেন। [৪৩৫]
সালমান ফারসি ও আবূদ দারদা যে পাত্রে আহার করতেন, সেই পাত্র ও খাদ্য থেকে আল্লাহর প্রশংসা শুনতে পেতেন।[৪৩৬]
একবার এক অন্ধকার রাতে আব্বাদ ইবন বিশর ও উসাইদ ইবনু হুদাইর পথ চলছিলেন। তারা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মজলিস থেকে ফিরছিলেন। অন্ধকার রাতে পথ দেখানোর জন্য তাদের সাথে সাথে একটি নূর চলতে লাগল, যখন দুজন দুদিকে পৃথক হলেন তখন আলোটিও দুই ভাগ হয়ে দুজনের সাথে চলতে লাগল। [৪৩৭]
সহীহ মুসলিম ও বুখারিতে আরেকটি সুপরিচিত কারামাতের ঘটনা রয়েছে। একবার আবূ বকর তিন জন মেহমানসহ বাড়িতে আসলেন। প্রত্যেকে এক লোকমা খাবার তুলে নেওয়ার পর আরেকটি বড় লোকমা আবির্ভূত হচ্ছিল। সকলে পেটভরে আহার করার পরেও সেখানে পূর্বের থেকেও বেশি খাবার রয়ে গেল। আবু বকর ও তার স্ত্রী এই দৃশ্য দেখে সেই খাদ্যের কিছু অংশ রাসূলুল্লাহ -এর খেদমতে হাজির করলেন। তখন দলে দলে লোক এসে সকলেই পেটপুরে আহার করল।[৪৩৮]
খুবাইব ইবনু আদি যখন মক্কার মুশরিকদের হাতে বন্দী হয়েছিলেন, তখন তাকে আঙুর খেতে দেখা যেত, অথচ মক্কায় তখন কোনো আঙুর পাওয়া যেত না।[৪৩৯]
আমির ইবনু ফুহাইরা শাহাদাতবরণ করেছিলেন। তার মৃতদেহ অনুসন্ধান করে পাওয়া গেল না। দেখা গেল মৃত্যুর পর তাঁর দেহ শূন্যে ভাসছে। আমির ইবনু তুফাইল তার দেহকে শূন্যে উত্তোলিত হতে দেখলেন। উরওয়া বললেন, তারা ফেরেশতাদেরকে তাঁর দেহ উত্তোলিত করতে দেখেছেন।[৪৪০]
উম্মু আইমান যখন মদীনার উদ্দেশে হিজরত করলেন, তখন তার সাথে কোনো খাদ্য-পানীয় ছিল না। তৃষ্ণায় তিনি ছিলেন মৃতপ্রায়। তিনি সিয়াম পালনরত ছিলেন, যখন ইফতারের সময় এল তিনি মাথার কাছে একটি শব্দ শুনতে পেলেন। মাথা উত্তোলন করে একটি পানির ঘড়া শূন্যে ভেসে থাকতে দেখলেন। সেটি পান করে তৃষ্ণা নিবারণ করলেন, এরপর জীবনে কখনো তিনি তৃষ্ণার্ত হননি।[৪৪১]
রাসূলুল্লাহ -এর আযাদকৃত গোলাম সাফিনা একবার পথে একটি সিংহের মুখোমুখি হলেন। তিনি সিংহটিকে বললেন, তিনি রাসূলুল্লাহ -এর আযাদকৃত গোলাম। এ কথা শুনে সিংহটি তার সাথে সাথে পথ চলতে লাগল যতক্ষণ না তাকে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দিলো![৪৪২]
বারা ইবনু মালিক বিভিন্ন বিষয়ে আল্লাহর নামে কসম করতেন, আর সেগুলো পূরণ হতো। যখন যুদ্ধের ময়দানে লড়াই তীব্রতর হতো, মুসলিমরা তাকে বলতেন, 'হে বারা, তোমার রবের নামে কসম করো!' তখন তিনি বলতেন, 'ইয়া রব, আপনি যে বিজয়ের ওয়াদা করেছেন আমি সেটা পাওয়ার জন্য আপনার নামে কসম করছি!' এরপর শত্রুপক্ষ পরাজিত হতো। কিন্তু কাদিসিয়ার যুদ্ধে তিনি বললেন, আমি আপনার নামে কসম করছি সেই বিজয়ের জন্য যার ওয়াদা আপনি করেছেন, আরও কসম করছি যেন আমি এই যুদ্ধে প্রথম শহীদ হই! পরে মুসলিমরা বিজয় লাভ করলেন এবং বারা -ও শহীদ হিসেবে মৃত্যুবরণ করলেন। [৪৪৩]
খালিদ ইবনু ওয়ালিদ একবার একটি দুর্ভেদ্য দুর্গ ঘেরাও করলেন। দুর্গের ভেতরে লোকেরা বলল, তুমি যতক্ষণ না বিষ পান করবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা বের হব না। খালিদ বিসমিল্লাহ বলে বিষ পান করলেন, কিন্তু সেটা তার কোনো ক্ষতি করল না।[৪৪১]
সা'দ ইবনু আবী ওয়াক্কাস -এর দুআ কবুল হতো (তার দুআ কবুলের জন্য রাসূলুল্লাহ আল্লাহর কাছে আবেদন করেছিলেন)। তিনি যে দুআই করতেন তা কবুল হতো। তিনি পারস্য সম্রাট কিসরাকে পরাজিতকারী বাহিনীর আমির ছিলেন এবং ইরাক জয় করেছিলেন। [৪৪২]
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার একটি বাহিনী পাঠালেন। সারিয়াহ নামক ব্যক্তিকে আমির বানালেন। উমর যখন খুতবা দিচ্ছিলেন, তখন মিম্বরে থাকা অবস্থায় হঠাৎ বলে উঠলেন, 'হে সারিয়াহ, পাহাড়ের দিকে দেখো! হে সারিয়াহ, পাহাড়ের দিকে দেখো!
পরবর্তী সময় ওই বাহিনী থেকে মদীনাতে একজন সংবাদবাহক এল। উমর বাহিনীর খবর জানতে চাইলে সে বলল, 'হে আমীরুল মুমিনীন, শত্রুর মোকাবেলায় আমরা পরাজিত হয়েছিলাম। হঠাৎ আমরা একটি আওয়াজ শুনতে পেলাম, 'হে সারিয়াহ, পাহাড়ের দিকে দেখো! হে সারিয়াহ, পাহাড়ের দিকে দেখো!' তখন আমরা পাহাড়কে পেছনে রেখে যুদ্ধ করতে থাকলাম, অবশেষে আল্লাহ শত্রুদের পরাজিত করে দিলেন।' [৪৪৩]
যিন্নীরা নামক জনৈক দাসী ইসলাম গ্রহণের কারণে নির্যাতিত হতো, কিন্তু সে ইসলাম ত্যাগ করত না। নির্যাতনের একপর্যায়ে সে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলে। জনৈক মুশরিক কটাক্ষ করে বলল, লাত ও উযযা (জাহিলিয়াতের দুটি মূর্তি) তার দৃষ্টিশক্তি ছিনিয়ে নিয়েছে। এ কথা শুনে তিনি বললেন, না, আল্লাহর কসম (অর্থাৎ আল্লাহর ইচ্ছাতেই এটি হয়েছে)। এ কথা বলার পর আল্লাহ তার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিলেন।[৪৪৪]
সাঈদ ইবনু যাইদ দুআ করেছিলেন যেন আরওয়া বিনতে হাকিমের দৃষ্টিশক্তি ছিনিয়ে নেয়া হয়, কেননা সেই মহিলা তার বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করেছিল (এবং মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ে তার কিছু জমি দখল করেছিল)। সাইদ দুআ করে বলেছিলেন, ইয়া আল্লাহ, যদি সে মিথ্যা বলে তাহলে তাকে অন্ধ বানিয়ে দিন এবং তার ভূমিতেই তাকে হত্যা করুন! এরপর সেই নারী অন্ধ হয়ে যায় এবং অল্পদিন পরেই তার ওই জমির একটি গর্তে পড়ে মৃত্যুবরণ করে। [৪৪৮]
আলা ইবনু হাদরামি -কে রাসূলুল্লাহ বাহরাইনের গভর্নর বানিয়েছিলেন। তিনি প্রায়ই দুআ করে বলতেন, ইয়া আলীম! ইয়া হালীম! (হে সর্বজ্ঞানী, হে মহাবিজ্ঞ) ইয়া আযীম! (হে মহান), এরপর তার দুআ কবুল হতো। একবার অনাবৃষ্টির সময় তিনি আল্লাহর কাছে পানির জন্য দুআ করলেন যেন পান করতে পারেন ও ওজু করতে পারেন, সেটা কবুল হলো। আরেকবার তিনি একটি জলাশয়ের সামনে আসলেন যেটা সৈন্যবাহিনী ও তাদের ঘোড়সওয়ার অতিক্রম করতে পারছিলেন না। আল্লাহর নামে তারা পানির ওপর দিয়ে ঘোড়া চালিয়ে দিলেন, কিন্তু পানি কোনো ঘোড়ার গদি স্পর্শ করল না। তিনি আরও দুআ করেছিলেন যেন মৃত্যুর পর তার মৃতদেহ কেউ না দেখে। মৃত্যুর পর দেখা গেল কবরে তার মৃতদেহ পাওয়া যাচ্ছে না। [৪৪৯]

টিকাঃ
[৪৩৪] বুখারি, ৫০১৮; মুসলিম, ৭৯৬।
[৪৩৫] ইবনুল আসীর, উসদুল গবাহ, ৪/১৩৮।
[৪৩৬] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ১/২২৪।
[৪৩৭] বুখারি, ৪৬৫।
[৪৩৮] বুখারি, ৬০২; মুসলিম, ২০৫৭।
[৪৩৯] বুখারি, ৩৯৮৯।
[৪৪০] বুখারি, ৩৮৬৭।
[৪৪১] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ২/৬৭।
[৪৪২] আবূ নুআইম, দালাইলুন নুবুওয়াহ, ২১২; হাইসামি, মাজমাউয যাওয়াইদ, ৯/৩৬৬, বর্ণনাকারীগণ বিশ্বস্ত।
[৪৪৩] ইবনু হাজার আসকালানি, আল-ইসাবাহ, ৩/৪, হাসান。
[৪৪১] হাইসামি, মাজমাউয যাওয়াইদ, ৯/৩৫০。
[৪৪২] ইবনু কাসীর, আল-বিদায়া, ৭/৩৩。
[৪৪৩] ইবনু হাজার আসকালানি, আল-ইসাবাহ, ৩/৪, হাসান。
[৪৪৪] ইবনু হাজার আসকালানি, আল-ইসাবাহ, ৭/৬৬৪。
[৪৪৮] মুসলিম, ১৬১০; বুখারি, ৩১৯৫。
[৪৪৯] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ১/৭; ইবনুল জাওযি, সিফাতুস সাফওয়া, ১/৬৯৪。

📘 ফুরকান রহমানের আউলিয়া ও শয়তানের আউলিয়া চিহ্নিতকরনের বিবরণ > 📄 তাবিয়িদের কারামাত

📄 তাবিয়িদের কারামাত


একই রকম কারামাতের ঘটনা তাবিয়িদের জীবনেও ঘটেছে।
আবূ মুসলিম খাওলানি -কে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়েছিল, কিন্তু তিনি অক্ষত বের হয়ে আসেন।
আরেকবার তিনি সৈন্যবাহিনীসহ টাইগ্রিস নদীর তীরে তাঁবু স্থাপন করেছিলেন, জোয়ারের পানিতে কাঠের টুকরো ভেসে আসছিল। সাথিদের উদ্দেশে তিনি বললেন, তোমরা যদি কেউ কোনো কিছু হারিয়ে ফেলো তাহলে আমাকে বলো, আমি আল্লাহর কাছে তা ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য দুআ করব। একজন বলল, আমার একটি থলে হারিয়ে গেছে। তিনি লোকটিকে তার সাথে চলতে বললেন। এরপর তারা এক স্থানে সেটি ঝুলতে দেখলেন এবং ব্যাগটি ফিরে পেলেন। [৪৫০]
আসওয়াদ আনাসি যখন নিজেকে নবি হিসেবে দাবি করল তখন সে আবূ মুসলিম -কে বন্দী করে জিজ্ঞাসাবাদ করল, তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে, আমি আল্লাহর রাসূল?
আবূ মুসলিম বললেন, আমি তোমার কথা শুনতে পাচ্ছি না। আসওয়াদ বলল, তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেন, হ্যাঁ! এরপর আসওয়াদ একটি অগ্নিকুণ্ড প্রজ্বালনের নির্দেশ দিলো এবং তাকে সেখানে নিক্ষেপ করল। এরপর দেখা গেল আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার পর তিনি সেখানে অক্ষত আছেন এবং দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করছেন—উত্তপ্ত অগ্নিকে তার জন্য আরামদায়ক ও শীতল করে দেওয়া হয়েছিল! [৪৫১]
রাসূলুল্লাহ -এর ওফাতের পর তিনি মদীনায় আগমন করলে উমর তাকে আবূ বকর -এর কাছে নিয়ে গেলেন এবং বললেন, ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি আমাকে এই উম্মাতের মধ্য থেকে এমন ব্যক্তির সাক্ষাৎ করিয়েছেন যাকে ইবরাহীম খলীলুল্লাহর অনুরূপ সাহায্য করা হয়েছে।’ [৪৫২]
আবূ মুসলিমের দাসি একবার খাদ্যে বিষ মিশিয়ে দিলো, কিন্তু সেটা তার কোনো ক্ষতি করেনি। [৪৫৩]
আরেকবার, জনৈক মহিলা আবূ মুসলিমের স্ত্রীকে তার বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে দিলো। আবূ মুসলিম ওই মহিলার বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে বদদুআ করলেন ফলে সে অন্ধ হয়ে গেল। এরপর মহিলাটি নিজের ভুল বুঝতে পারে এবং তার কাছে এসে ক্ষমা প্রার্থনা করে ও তাওবা করে। তখন আবূ মুসলিম আল্লাহর কাছে সেই মহিলার জন্য আবার দুআ করলেন। ফলে সে পুনরায় দৃষ্টিশক্তি ফিরে পায়। [৪৫৪]
আমির ইবনু আবদি কাইস দুই হাজার দিরহাম ভাতা পেতেন এবং সেগুলো আস্তিনে রাখতেন। পথে কেউ সাহায্য চাইলে গণনা ছাড়াই দান করতেন। এভাবে দান করতে করতে বাড়ি ফিরে যেতেন, কিন্তু দিরহাম কমত না। সেগুলোর ওজনও একই থাকত। [৪৫৫]
একবার তিনি দেখলেন একটি সিংহ একটি কাফেলার গতিরোধ করেছে। তিনি তার কাছে গেলেন, এমনকি তার জামা দ্বারা সিংহের মুখ পর্যন্ত স্পর্শ করলেন। এরপর তিনি সিংহের ঘাড়ে পা দিয়ে বললেন, তুমি রহমানের সৃষ্ট একটি কুকুর ছাড়া আর কিছুই নও, আর আমি আল্লাহর সামনে আল্লাহ বাদে অন্য কিছুকে ভয় করতে লজ্জাবোধ করি।
এরপর কাফেলাটি নিজেদের গন্তব্যে রওনা হলো। [৪৫৬]
তিনি আল্লাহর কাছে দুআ করতেন যেন শীতকালে ওজু করা তার জন্য সহজ করে দেওয়া হয়। এরপর যখন তার কাছে ওজুর পানি আনা হতো দেখা যেত সেখান থেকে বাষ্প নির্গত হচ্ছে। [৪৫৭]
তিনি আল্লাহর কাছে দুআ করতেন যেন সালাত আদায়কালে শয়তান তার অন্তরে কুমন্ত্রণা দিতে না পারে, এরপর শয়তান তার নিকটবর্তী হতে পারত না। [৪৫৮]
হাজ্জাজ বিন ইউসুফ হাসান বাসরি -কে খুঁজে পাচ্ছিল না। তাকে ধরে আনার জন্য হাজ্জাজ বিন ইউসুফ তার বাড়িতে একাধিকবার লোক পাঠিয়েছিল, কিন্তু তিনি আল্লাহর কাছে দুআ করছিলেন তারা যেন তাকে দেখতে না পায়, ফলে তারা ছয়বার আসা-যাওয়াতেও তাকে দেখতে পায়নি।
একবার তিনি একজন খারেজিদের বিরুদ্ধে বদদুআ করলেন—যে তাকে কষ্ট দিত। পরে দেখা গেল সে মরে পড়ে আছে। [৪৫৯]
একবার একটি যুদ্ধে ওয়াসিলা ইবনু আসিম -এর একটি ঘোড়া মৃত্যুবরণ করল। তিনি বললেন, ইয়া আল্লাহ, আমাকে আপনি কোনো সৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল করবেন না! তিনি আল্লাহর কাছে দুআ করলেন এবং আল্লাহ তার মৃত ঘোড়াকে জীবিত করে দিলেন। তিনি বাড়ি ফিরে পুত্রদেরকে বললেন, হে আমার ছেলেরা, এই ঘোড়ার জিনটি নাও, আমি এটা ধার করেছিলাম। যখন ঘোড়া থেকে লাগাম পৃথক করা হলো, ঘোড়াটি মৃত্যুবরণ করল। [৪৬০]
আরেকবার তিনি আহওয়াজ এলাকায় থাকাকালে ক্ষুধার্ত হলে খাদ্যের জন্য দুআ করলেন। তখন রেশমি কাপড়ে মোড়ানো কিছু তরতাজা খেজুর তার সামনে এসে পড়ল। ফলে তিনি সেখান থেকে খেজুর খেলেন আর রেশমি কাপড়টি অনেক দিন পর্যন্ত তার স্ত্রীর নিকট ছিল। [৪৬১]
এক রাতে একটি ঝোপের কাছে সালাত আদায়কালে তার সামনে একটি সিংহ এসে উপস্থিত হলো। সালাত শেষ করে তিনি সিংহটিকে বললেন, এখানে নয়, অন্য কোথাও রিযক তালাশ করো। এরপর সিংহটি কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল। [৪৬২]
হাররার যুদ্ধ চলাকালে সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব প্রতি ওয়াক্তে রাসূলুল্লাহ -এর কবর থেকে আযান শুনতে পেতেন। তখন মাসজিদগুলো ছিল জনশূন্য এবং তিনি একাকী অবস্থান করছিলেন। [৪৬৩]
নাখা' গোত্রের জনৈক ব্যক্তির একটি গাধা ছিল। সফরকালে পথে গাধাটি মারা গেল। সাথিরা তাকে বলল, তোমার মালামালের বোঝা আমাদের পশুগুলোর মধ্যে বণ্টন করে দাও। তাহলে তোমার জন্য সহজ হবে। তিনি তাদেরকে বললেন, আমাকে কিছুটা সময় দাও। এরপর তিনি খুব ধীরে ধীরে সুন্দরভাবে ওজু করে দুই রাকাত সালাত আদায় করলেন, এরপর আল্লাহর কাছে দুআ করলেন। আল্লাহ তার মৃত গাধাকে জীবিত করে দিলেন। এরপর তিনি নিজের গাধার ওপর পরিপূর্ণ মালামালের বোঝা চাপিয়ে বাকি পথ সফর করলেন। [৪৬৪]
যখন ওয়াইস কারনি মৃত্যুবরণ করলেন, লোকেরা তার কাপড়ের মধ্যে কাফনের কাপড় দেখতে পেল। এটা আগে তার কাছে ছিল না। এরপর কবর খুঁড়তে গিয়ে দেখল, আগেই একটি পাথুরে জমিতে 'বগলী কবর' (লাহদ) খোঁড়া আছে। এরপর সেই কাফনের কাপড়ে মুড়িয়ে তাকে ওই কবরে দাফন করা হলো। [৪৬৫]
আমর ইবনু উতবা ইবনি ফারকাদ একবার প্রচণ্ড গরমের মধ্যে সালাত আদায় করছিলেন। তখন তাকে ছায়া দেওয়ার জন্য একখণ্ড মেঘ এসে হাজির হলো। তিনি যখন বনে-জঙ্গলে তার সাথিদের পশুগুলোকে চরাতে নিয়ে যেতেন তখন বন্য পশুরা তাকে পাহারা দিত। তিনি সাথিদের সাথে একটি চুক্তি করেছিলেন, যখন তারা যুদ্ধে যাবে তখন ফিরে আসা না পর্যন্ত তিনি তাদের পশুগুলোর দেখাশোনা করবেন। [৪৬৬]
মুতাররিফ ইবনু আবদিল্লাহ ইবনিশ শিখখীর যখন বাড়িতে প্রবেশ করতেন, ঘরের জিনিসপত্রগুলোও তার সাথে আল্লাহর তাসবীহ পাঠ করত। [৪৬৭]
একবার তিনি এক বন্ধুর সাথে ঘোর অন্ধকার রাতে হাঁটছিলেন, তখন চাবুকের অগ্রভাগ আলোচিত হয়ে তাদেরকে পথ দেখাচ্ছিল। [৮৮৮]
আহনাফ ইবনু কায়েস (রহ.) যখন মৃত্যুবরণ করলেন, তাকে সমাহিত করা হলো। তখন তাঁর কবরে জনৈক লোকের টুপি পড়ে গেল। টুপি উঠিয়ে আনার জন্য লোকটি কবরের নামল এবং দেখতে পেল তার কবরকে দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত প্রসারিত করে দেয়া হয়েছে।[৮৮৯]
ইবরাহীম আত-তাইয়িমী (রহ.) কোনো কিছু না খেয়ে এক বা দুই মাস পর্যন্ত কাটিয়ে দিতে পারতেন। একবার তিনি তাঁর পরিবারের জন্য খাদ্যের সন্ধানে বের হলেন, কিন্তু কিছুই পেলেন না। তিনি এক স্থানে লাল রঙের কিছু ধুলোরাশি দেখতে পেলেন, সেগুলোর কিছুটা ব্যাগে ভরলেন। বাড়ি ফিরে ব্যাগ খুলে দেখলেন সেগুলো উন্নতমানের মিহি খাদ্যশস্যে পরিণত হয়েছে। যখনই সেখান থেকে কিছু খাদ্যশস্য রোপণ করতেন, দেখা যেত শেকড় থেকে মাথা পর্যন্ত দানায় ভরপুর গাছ জন্মেছে।[৮৯০]
উতবা ইবনু আবান গোলাম (রহ.) আল্লাহ তাআলার কাছে তিনটি জিনিস চেয়েছিলেন— সুন্দর কন্ঠস্বর, অশ্রুসিক্ত নয়ন ও বিনা কষ্টে পরিমাণমতো খাবার। এরপর যখনই তিনি কুরআন পড়তেন, অশ্রুপাত করতেন এবং অন্যরাও অশ্রুপাত করত। তবে সব সময় তিনি বাড়িতে যেতেন এবং সেখানে খাদ্য দেখতে পেতেন, কিন্তু জানতে না কোত্থেকে সেই খাদ্য এসে হাজির হলো![৮৯৫]
আবদুল ওয়াহিদ ইবনু যায়িদ (রহ.) অসুস্থ হয়ে প্রায় পঙ্গু হয়ে গেলেন। তিনি দুআ করলেন যেন ওজু করার সময় তাঁর শরীর ঠিক হয়ে যায়। এরপর দেখা যেত যখন তিনি ওজু করতেন তখন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য শরীর ঠিক হয়ে যেত, এরপর আগের অবস্থায় ফিরে যেত।[৮৯২]
উল্লেখিত বর্ণনাগুলো সাহাবি এবং তাবিঈদের সাথে সংঘটিত কিছু কারামত বিষয়ক ওপর আলোচনা অতি দীর্ঘ, আমি রহমানের আউলিয়াদের সাথে সংঘটিত কারামত নিয়ে অন্যত্র বিস্তারিত আলোচনা করেছি। আর আমি বর্তমান যুগে (ইবনু তাইমিয়া হিজরী সপ্তম শতাব্দীর মানুষ) যেসব ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও সরাসরি শুনেছি, সেগুলোর সংখ্যাও প্রচুর।
জেনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ, দুটি মৌলিক কারণে এসব কারামত সংঘটিত হয়—যাকে কারামাত দেওয়া হয়েছে তার কোনো প্রয়োজন পূরণের জন্য অথবা তার মাধ্যমে অন্যান্যদেরকে হিদায়াতের পথে আহ্বানের কাজে সাহায্যের জন্য। ঈমানের দুর্বলতার কারণে যদি কোনো মুমিনের বিশেষ সাহায্য দরকার হয় বা কোনো দুনিয়াবী প্রয়োজন পূরণের জন্য সাহায্য প্রয়োজন হয়, তখন তার ঈমানকে মজবুত করার জন্য ও প্রয়োজন পূরণের জন্য কারামাত দেওয়া হতে পারে। অপরদিকে, আল্লাহর কাছে যে ব্যক্তির ওলায়াত (নৈকট্য, মিত্রতা) পূর্বোক্ত ব্যক্তির থেকে উচ্চ স্তরের, তার ক্ষেত্রে এসব কারামাতের প্রয়োজন নেই। সুতরাং উচ্চস্তরের ওলায়াতের অধিকারী হওয়া এবং বিশেষ সাহায্যের প্রয়োজনমুক্ত হওয়ার কারণে তার জন্য এসব কারামাতের প্রয়োজন নেই, আল্লাহর নৈকট্যে কোনো ঘাটতি থাকার কারণে নয়।
এ জন্যই আমরা দেখতে পাই, তাবিয়িদের সাথে সংঘটিত কারামাতের পরিমাণ সাহাবিদের সাথে সংঘটিত কারামাতের চেয়ে বেশি। এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়, যখন কোনো বিশেষ প্রয়োজন পূরণ ব্যতিরেকে মানুষকে হিদায়াত করার জন্য এবং অন্যান্যদের প্রয়োজন পূরণের জন্য কারও ওপর কারামাত সংঘটিত হয়, তখন দ্বিতীয় প্রকারের কারামাতের অবস্থা প্রথম অবস্থার থেকে উচ্চস্তরের।

টিকাঃ
[৪৫০] ইবনু কাসীর, আল-বিদায়া, ৬/২৯৫।
[৪৫১] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ২/১২৮।
[৪৫২] ইবনুল জাওযি, সিফাতুস সাফওয়া, ৪/৪০৮।
[৪৫৩] ইবনুয যাইয়্যাত, আত-তাশাওউফ ইলা রিজালিত তাসাওউফ, ৪২।
[৪৫৪] ইবনু রজব, জামিউল উলূমি ওয়াল হিকাম, ৩২২।
[৪৫৫] আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক, আয-যুহদ, ২৯৫।
[৪৫৬] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ২/৯২।
[৪৫৭] আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক, আয-যুহদ ২৯৫।
[৪৫৮] আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক, আয-যুহদ ২৯৫।
[৪৫৯] ইবনু রজব, জামিউল উলূমি ওয়াল হিকাম, ৩২২।
[৪৬০] ইবনুল মুবারক, আয-যুহদ, ২৯৫।
[৪৬১] ইবনুল মুবারক, আয-যুহদ, ২৯৫。
[৪৬২] ইবনুল মুবারক, আয-যুহদ, ২৯৫; আবূ নুআইম, হিলইয়া, ২/২৪০。
[৪৬৩] ইবনু সা'দ, আত-তবাকাতুল কুবরা, ৫/১৩২。
[৪৬৪] ইবনু কাসীর, আল-বিদায়া, ৬/১৭৫। ব্যক্তিটির নাম ছিল নাবাতা ইবনু ইয়াযীদ。
[৪৬৫] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ২/৮৩。
[৪৬৬] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ২/১৫৭; ইবনুল মুবারক, আয-যুহদ, ৩০১。
[৪৬৭] আহমাদ, আয-যুহদ, ২৪১。
[৮৮৮] আহমাদ, আয়-মুয়ুদ্দ, ২৪১。
[৮৮৯] শাওকানি, কুতরুল ওলি আলা হাদীসিল ওলি, ২৫১。
[৮৯০] শাওকানি, কুতরুল ওলি আলা হাদীসিল ওলি, ২৫১。
[৮৯৫] আবু নুআইম, হিলইয়া, ২/২৩৬。
[৮৯২] আবু নুআইম, হিলইয়া, ২/৭০৬。

📘 ফুরকান রহমানের আউলিয়া ও শয়তানের আউলিয়া চিহ্নিতকরনের বিবরণ > 📄 কারামাতের নামে শয়তানের কারসাজি

📄 কারামাতের নামে শয়তানের কারসাজি


এই অধ্যায়ে এ পর্যন্ত আলোচ্য অলৌকিক ঘটনার সবগুলো শয়তানের প্রভাবে সংঘটিত কারসাজি ও ভেলকি থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। এবার শয়তানের প্রভাবে সংঘটিত কিছু অলৌকিক ঘটনার বিবরণ জানা যাক। যেমন: রাসূল -এর সময়ে আবদুল্লাহ ইবনু সাইয়‍্যাদের ঘটনা স্মরণ করা যেতে পারে। কিছু সাহাবি ওই লোকটিকে দাজ্জাল মনে করতেন। তার ব্যাপারে প্রথমদিকে রাসূলুল্লাহ কোনো সিদ্ধান্ত নেননি; কিন্তু পরবর্তীকালে এটা স্পষ্ট হয় যে, লোকটি দাজ্জাল নয়। আসলে সে গণক শ্রেণির।
রাসূলুল্লাহ তাকে বললেন, 'আমি একটি বিষয়কে তোমার থেকে (আমার মনের মধ্যে) গোপন রেখেছি।' ইবনু সাইয়্যাদ বলল, তা হচ্ছে 'আদ-দুখ'। আসলে রাসূলুল্লাহ অন্তরে সূরা আদ-দুখান গোপন রেখেছিলেন। তখন তিনি ইরশাদ করলেন, 'তুমি লাঞ্ছিত হও! তুমি কখনো তোমার (জন্য নির্ধারিত) সীমা অতিক্রম করতে পারবে না।' [৪৭৩]
অর্থাৎ তিনি বোঝালেন, তুমি একজন গণক ছাড়া আর কিছুই নও। গণকদের সাথে কিছু শয়তানের ওঠাবসা থাকে, যারা তাদেরকে বিভিন্ন গোপন খবর জানিয়ে দেয়। এগুলো তারা আসমান থেকে চুরি করে শোনে। এরপর সত্যের সাথে মিথ্যা মিশ্রিত করে প্রচার করে।
রাসূলুল্লাহ বলেছেন, 'ফেরেশতারা আল্লাহর নির্দেশ নিয়ে আসমান থেকে মেঘের আড়ালে অবতরণ করেন। আসমানে যেসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়, তারা সেসব বিষয়ে আলোচনা করেন। শয়তান এসব বিষয় গোপনে চুরি করে শোনে এবং এগুলো গণকদের পর্যন্ত শুনিয়ে দেয়। এরপর গণকরা নিজেদের পক্ষ থেকে এর সাথে এক শ'টি (অসংখ্য) মিথ্যা যুক্ত করে (প্রচার করতে থাকে)।'[৪৭৪]
ইবনু আব্বাস হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'একদিন নবি তাঁর কয়েকজন সাহাবি নিয়ে বসা ছিলেন। এমন সময় হঠাৎ একটি নক্ষত্র ছিটকে পড়ল। এতে চতুর্দিক আলোকিত হয়ে উঠল। তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, 'জাহিলি যুগে যখন এমন হতে দেখতে তখন তোমরা কী বলতে?' তারা বললেন, 'আমরা বলতাম, বিরাট কোনো ব্যক্তি মারা যাবেন কিংবা বিরাট কেউ জন্মগ্রহণ করবেন।'
রাসূলুল্লাহ বললেন, 'কারও মৃত্যুতে কিংবা কারও জন্মগ্রহণে নক্ষত্র ছুড়ে মারা হয় না। বস্তুত প্রকৃত বিষয় হলো বরকতময় নামসম্পন্ন আমাদের মহান রব যখন কিছুর ফায়সালা দেন তখন আরশ বহনকারী ফেরেশতাগণ তাসবীহ পাঠ করতে থাকেন। এরপর তাদের নিকটস্থ আসমানের ফেরেশতাগণ তাসবীহ পাঠ করেন। এরপর তাদের নিকটস্থ যারা তারা তাসবীহ পাঠ করেন। এভাবে (দুনিয়ার) এই আসমানে এসে তা শেষ হয় তারপর ষষ্ঠ আসমানের ফেরেশতাগণ সপ্তম আসমানবাসীদের জিজ্ঞাসা করেন, আপনাদের রব কী বলেছেন? তারা তাদেরকে এ বিষয়ে অবহিত করেন।
এভাবে প্রত্যেক আসমানবাসীগণ তাদের নিকটস্থ আসমানবাসীগণের নিকট জিজ্ঞাসা করে এই বিষয়ে অবহিত হন। শেষে দুনিয়ার এই আসমানে এসে ওই খবর পৌঁছে। শয়তানরা সে খবর চুরি করে শোনার তৎপরতা চালায়। তখন তাদের বিরুদ্ধে উল্কাপিণ্ড ছুড়ে মারা হয়। তারা তা তাদের বন্ধুদের (গণক, জ্যোতিষী, জাদুকর ইত্যাদি) কাছে দ্রুত নিক্ষেপ করে। এর ঠিক ঠিক যা নিয়ে আসতে পারে তা হয় সত্য। কিন্তু এর সাথে তারা বিকৃতি ঘটায় এবং অনেক কিছু (নিজেদের থেকে) বাড়িয়ে দেয়।'[৪৭৫]
আরেকটি বর্ণনানুসারে, মা'মার ইবনু রাশিদ, ইবনু শিহাব যুহরির কাছে জানতে চাইলেন, জাহিলিয়াতের যুগেও কি তাদের প্রতি (উল্কাপিণ্ড) নিক্ষেপ করা হতো? তিনি বললেন, হ্যাঁ, কিন্তু মুহাম্মাদ -এর নুবুওয়াতের পর এর পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে।[৪৭৬]
আসওয়াদ আনাসি নিজেকে নবি দাবি করেছিল। তার কাছে কিছু শয়তান এসে নানাবিধ গোপন খবর জানিয়ে যেত। যখন মুসলিমরা তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলেন, তারা আশঙ্কা করলেন, শয়তান আসওয়াদ আনাসিকে তাদের কথাবার্তা জানিয়ে দেবে। এভাবে মুসলিমদের পরিকল্পনা আসওয়াদের কাছে ফাঁস হয়ে যেতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার স্ত্রী মুসলিমদেরকে সাহায্য করল, কারণ তার কাছে আসওয়াদ আনাসির কুফর সুস্পষ্ট হয়েছিল। এভাবে মুসলিমরা তাকে হত্যা করল।[৪৭৭]
মুসাইলামাতুল কাযযাবের (আরেকজন নবি-দাবিদার ভণ্ড ও পথভ্রষ্ট) সাথে শয়তানদের ওঠাবসা ছিল, যারা তাকে বিভিন্ন গোপন কথাবার্তা জানিয়ে দিত এবং নানাভাবে সাহায্য করত।
ইতিহাসে এ ধরনের অনেক ঘটনার বিবরণ রয়েছে। যেমন: আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ানের সময়ে সিরিয়া-জর্ডানে হারিস আদ-দিমাশকির ফিতনা আবির্ভূত হয়েছিল। সে নিজেকে নবি দাবি করেছিল। তার কাছে যে শয়তানরা আসত, তারা লোহার শিকল থেকে তার পা মুক্ত করে দিত এবং তার দেহে অস্ত্র বিদ্ধ হতে দিত না। সে যখন পাথরের ওপর হাত বুলাত তখন সেগুলো আল্লাহর প্রশংসা করত। সে শূন্যে মানুষকে হাঁটতে ও ঘোড়ায় চড়তে দেখাত এবং বলত, এরা ফেরেশতা। বাস্তবে সেগুলো জিন ছাড়া অন্য কিছুই ছিল নয়। তখন মুসলিমরা তাকে গ্রেফতার করে হত্যার প্রস্তুতি নিল, জল্লাদ তার বুকে বর্শা বিদ্ধ করার চেষ্টা করল কিন্তু সেটা তার দেহে প্রবেশ করাতে পারছিল না। আবদুল মালিক জল্লাদকে বললেন, তুমি বিসমিল্লাহ বলতে ভুলে গেছ! তখন জল্লাদ বিসমিল্লাহ বলে আঘাত করল এবং তাকে হত্যা করল।
এতক্ষণ পর্যন্ত শয়তানের প্রভাবে প্রভাবিত মানুষদের অবস্থা জানলাম। যখন তাদের নিকট আয়াতুল কুরসি ও অন্যান্য দুআ পাঠ করা হয় তখন শয়তান তাদেরকে পরিত্যাগ করে পলায়ন করে। সহীহ মুসলিম ও বুখারিতে এসেছে, আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ আমাকে রমাদানের যাকাত হিফাজত করার দায়িত্বে নিযুক্ত করলেন। এক ব্যক্তি এসে অঞ্জলি ভর্তি করে খাদ্যসামগ্রী নিতে লাগল।
আমি তাকে পাকড়াও করলাম এবং বললাম, আল্লাহর কসম, আমি তোমাকে রাসূলুল্লাহর কাছে উপস্থিত করব। সে বলল, আমাকে ছেড়ে দিন। আমি খুবই অভাবগ্রস্ত, আমার যিম্মায় পরিবারের দায়িত্ব রয়েছে এবং আমার প্রয়োজন খুব বেশি ও তীব্র। তিনি বললেন, আমি ছেড়ে দিলাম। যখন সকাল হলো, তখন নবি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'হে আবূ হুরায়রা, তোমার রাতের বন্দি কী করল?' আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ, সে তার তীব্র অভাব ও পরিবার-পরিজনের কথা বলায় তার প্রতি আমার দয়া হয়, তাই তাকে আমি ছেড়ে দিয়েছি। তিনি বললেন, 'সাবধান! সে তোমার কাছে মিথ্যা বলেছে এবং সে আবার আসবে।' 'সে আবার আসবে' রাসূলুল্লাহর এই উক্তির কারণে আমি বুঝতে পারলাম যে, সে পুনরায় আসবে। (এভাবে পরপর তিনবার একই ঘটনা ঘটল ও লোকটি একই ওজুহাত দিলো।)... এই হলো তিনবারের শেষবার। তুমি প্রত্যেকবার বলো যে আর আসবে না, কিন্তু আবার আসো।
সে বলল, আমাকে ছেড়ে দিন। আমি আপনাকে কয়েকটি কথা শিখিয়ে দেবো। যা দিয়ে আল্লাহ আপনাকে উপকৃত করবেন। আমি বললাম, সেটা কী? সে বলল, আপনি যখন রাতে শয্যায় যাবেন তখন আয়াতুল কুরসি পড়বেন। তখন আল্লাহর তরফ থেকে আপনার জন্য একজন রক্ষক নিযুক্ত হবে এবং ভোর পর্যন্ত শয়তান আপনার কাছে আসতে পারবে না। কাজেই তাকে আমি ছেড়ে দিলাম। ভোর হলে রাসূলুল্লাহ আমাকে বললেন, 'গত রাতে তোমার বন্দি কী বলল?' আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ, সে আমাকে বলল যে, সে আমাকে কয়েকটি বাক্য শিক্ষা দেবে যা দিয়ে আল্লাহ আমাকে লাভবান করবেন। তাই আমি তাকে ছেড়ে দিয়েছি। তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'বাক্যগুলো কী?' আমি বললাম, সে আমাকে বলল, যখন তুমি রাতে শয্যায় যাবে তখন আয়াতুল কুরসী
الله لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ لَا تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلَا نَوْمٌ لَهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الأَرْضِ مَنْ ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلا بِإِذْنِهِ يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَلَا يُحِيطُونَ بِشَيْءٍ مِنْ عِلْمِهِ إِلا بِمَا شَاءَ وَسِعَ كُرْسِيُّهُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَلَا يَئُودُهُ حِفْظُهُمَا وَهُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيمُ
প্রথম থেকে আয়াতের শেষ পর্যন্ত পড়বে এবং সে আমাকে বলল, এতে আল্লাহর তরফ থেকে তোমার জন্য একজন রক্ষক নিযুক্ত থাকবেন এবং ভোর পর্যন্ত তোমার নিকট কোনো শয়তান আসতে পারবে না। সাহাবায়ে কেরাম কল্যাণের জন্য বিশেষ লালায়িত ছিলেন। নবি বললেন, 'হ্যাঁ, এ কথাটি তো সে তোমাকে সত্য বলেছে। কিন্তু হুঁশিয়ার, সে মিথ্যুক। হে আবূ হুরায়রা, তুমি কি জানো, তিন রাত ধরে তুমি কার সাথে কথাবার্তা বলেছিলে? আবূ হুরায়রা বললেন, না। নবি বললেন, 'সে ছিল শয়তান।” [৪৭৮]
সুতরাং শয়তানের প্রভাব ও ভেলকিবাজির সময়ে যদি কোনো ব্যক্তি সহীহ নিয়তে উক্ত আয়াত পাঠ করে, তবে শয়তানের প্রভাব নির্মূল হয়ে যাবে। যেমন: কেউ শয়তানের ভেলকিবাজির সাহায্যে আগুনে প্রবেশ করল অথবা শিস-তালি বাজিয়ে গানবাজনা করতে থাকল যতক্ষণ না তাদের ওপর শয়তান ভর করে এবং ভরকৃত ব্যক্তির জবানে এমনসব কথা বলে যা ওই ব্যক্তি জানতে পারে না, এমনকি কিছু বুঝতেও পারে না। মানুষকে চমকে দেওয়ার জন্য শয়তান তাদের অন্তরের থাকা কথা বলে দিতে পারে অথবা ভিন্ন ভাষায় কথা বলতে পারে, যেমনটা সাধারণত জিনে আছরকৃত ব্যক্তির জবানে বলতে দেখা যায়। যেসব ব্যক্তির সাথে এসব ঘটনা ঘটে তারা এগুলো বুঝতে পারে না। অনুরূপভাবে, শয়তান যাদের ওপর আছর করে, স্পর্শ করে এবং যাদের জবানে কথা বলে তারাও কিছু বুঝতে পারে না। যখন শয়তান তাদেরকে ছেড়ে চলে যায় তারা সেসবের কিছুই স্মরণ করতে পারে না।
এ কারণে জিনে আছরকৃত মানুষদেরকে কখনো কখনো এমনভাবে প্রহার করা হয় যাতে সাধারণ কোনো ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে যেত, কিন্তু আছরকৃত ব্যক্তির ওপর কোনো প্রভাব দেখা যায় না। যখন জিনের প্রভাব কেটে যায় তখন ওই ব্যক্তি বলে সে প্রহারের কোনো ব্যথা-বেদনা অনুভব করেনি। কেননা এসব আঘাত তার ওপরে পড়েনি; বরং আছরকৃত জিনের ওপর পড়েছে।
এসব ব্যক্তিদের অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায় শয়তান তাদের কাছে নানা রকম খাদ্য, ফলমূল এবং মিষ্টান্ন নিয়ে আসে যেগুলো ওই এলাকাতে পাওয়া যায় না। আবার কাউকে জিনেরা উড়িয়ে নিয়ে মক্কা, জেরুজালেম বা অন্যান্য স্থান সফর করিয়ে আনে। আবার কাউকে বহন করে আরাফাতের ময়দানে পৌঁছে দেয়, হাজ্জের সময় আরাফাতের দিনে সফর করিয়ে আবার সেই রাতেই ফিরিয়ে আনে। এই ব্যক্তির হাজ্জ বৈধ হবে না।
কেননা সে সাধারণ পোশাকে সফর করল-ইহরাম বাঁধল না, হাজ্জের তালবিয়া পড়ল না, মুজদালিফায় অবস্থান করল না, মক্কাতে কা'বার চারপাশে তওয়াফ করল না, সাফা-মারওয়ার মাঝখানে দৌড়াল না এবং শয়তানের প্রতীকরূপী পাথরের উদ্দেশে ঢিল নিক্ষেপ করল না। বরং সে শুধু সাধারণ পোশাকে আরাফাতে গমন করল এবং সেই রাতেই ফেরত এল। সমস্ত মুসলিমের ঐকমত্য অনুসারে এটি বৈধ হাজ্জ নয়। এটি ওই ব্যক্তির মতো, যে জুমার দিনে ওজু ছাড়া কেবলামুখী না হয়ে সালাত আদায় করল!
এভাবে জিনের প্রভাবে আরাফাতের ময়দানের সফরকারী জনৈক ব্যক্তি রাতে ফিরে আসার পর স্বপ্নে দেখল যে, ফেরেশতারা হাজীদের আমল লিপিবদ্ধ করেছেন। লোকটি তাদেরকে প্রশ্ন করল, আপনারা কি আমার আমল লিপিবদ্ধ করবেন না? তারা জবাব দিলেন, তুমি হাজীদের অন্তর্ভুক্ত নও; অর্থাৎ তুমি ইসলামি শারীআতে নির্ধারিত পদ্ধতিতে হাজ্জ পালন করোনি।
আল্লাহ তাআলা তার আউলিয়াদের কারামাতের মাধ্যমে সম্মানিত করেন। আউলিয়াদের কারামাত এবং শয়তানের নকলকৃত কারসাজির মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বিশুদ্ধ ঈমান ও তাকওয়ার ফলে আল্লাহ তাআলা তাঁর আউলিয়াদের কারামাত দান করেন, অপরদিকে শয়তানের প্রভাবে সংঘটিত ঘটনাগুলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণের ফলাফলে ঘটে। আল্লাহ বলেন,
قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَن تُشْرِكُوا بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ سُلْطَانًا وَأَن تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ *
'আপনি বলে দিন, আমার পালনকর্তা কেবল অশ্লীল বিষয়সমূহ হারাম করেছেন যা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য এবং হারাম করেছেন গুনাহ, অন্যায়-অত্যাচার আল্লাহর সাথে এমন বস্তুকে অংশীদার করা, তিনি যার কোনো সনদ অবতীর্ণ করেননি এবং আল্লাহর প্রতি এমন কথা আরোপ করা, যা তোমরা জানো না।' [৪৭৯]
সুতরাং মূর্খতার ভিত্তিতে আল্লাহর ব্যাপারে কথা বলা, শিরক, যুলুম এবং অন্যান্য সকল নিন্দনীয় কাজকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল নিষিদ্ধ করেছেন। এসব কাজ কখনো আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর প্রিয় বান্দাদের প্রতি কারামাত লাভের মাধ্যম হতে পারে না। কাজেই যদি দেখা যায়, সালাত, যিকর কিংবা কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে কোনো অলৌকিক ঘটনা ঘটছে না; বরং শয়তানের পছন্দনীয় কাজ এবং শিরক মিশ্রিত কাজের মাধ্যমে (আল্লাহ বাদে কোনো সৃষ্টির কাছে সাহায্য ও বিপদে উদ্ধার কামনা), যুলুম ও গুনাহের কাজের মাধ্যমে কোনো অলৌকিক ঘটনা ঘটছে, তাহলে বুঝতে হবে এগুলো সব শয়তানের প্রভাবে ঘটছে। এগুলো কিছুতেই রহমানের কারামাত নয়!
এ ধরনের ব্যক্তিরা যখন শিস-তালি বাজিয়ে গান-বাজনায় অংশ নেয় তখন শয়তান তাদের ওপর ভর করে এবং তাদেরকে তাদের ঘরবাড়ি থেকে উড়িয়ে শূন্যে বহন করে। যদি সেই স্থানে আল্লাহর কোনো সত্যিকার ওলি এসে উপস্থিত হয়, তখন শয়তান পলায়ন করে এবং লোকটি মাটিতে পড়ে যায়। এ ধরনের ঘটনা অনেক ঘটেছে। আবার কিছু মানুষ আছে যারা বিপদে পড়লে মাখলুকের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে—হোক সে জীবিত বা মৃত; যার কাছে সাহায্য চাওয়া হয় সে মুসলিম, খ্রিষ্টান, মুশরিক যা-ই হোক না কেন। তখন সাহায্যপ্রার্থী ব্যক্তির সামনে শয়তান ওই ব্যক্তির রূপে হাজির হয় এবং সাহায্যপ্রার্থীর কিছু প্রয়োজন পূরণ করে দেয়।
তখন মূর্খ লোকটি ভাবে, যার কাছে সাহায্য চাওয়া হয়েছিল সে এসে সাহায্য করেছে অথবা তার রূপে কোনো ফেরেশতা পাঠিয়ে দিয়েছে! কিন্তু বাস্তবে, সে শয়তান ছাড়া আর কাউকে দেখেনি। এভাবে শয়তান মূর্খ লোকটিকে মারাত্মক শিরকে লিপ্ত করল, কেননা সে আল্লাহ বাদে অন্যের কাছে দুআ করেছে। জাহিলি যুগে মক্কার মূর্তিগুলোর ভেতরে শয়তান প্রবেশ করত এবং মূর্তিপূজারিদের উদ্দেশে কথা বলত। আবার কখনো-বা শয়তান মানুষের রূপ ধরে এসে হাজির হয়ে বলে, আমি হাজির! এরপর সে কিছু অদৃশ্য জগতের খবর জানিয়ে দিত এবং কারও কিছু প্রয়োজন পূরণ করে দিত।
মুসলিম, ইয়াহুদী, খ্রিষ্টান, কাফির নির্বিশেষে অনেকেই শয়তানের এই ধরনের কিছু ভেলকিবাজির সাক্ষী হয়েছেন, যেমন: অনেকের মৃত্যুর পর শয়তান তাদের কাছে মৃত ব্যক্তির রূপ ধরে আসে। ফলে লোকেরা মনে করে ওই ব্যক্তির আত্মা ফিরে এসেছে! এভাবে ওইদিন মৃত ব্যক্তির পক্ষে কিছু ঋণ পরিশোধ করে দেয়, আমানত পরিশোধ করে এবং মৃত ব্যক্তির সাথে সম্পর্কিত নানা রকম কাজ করে। এরপর সেই ব্যক্তি তার স্ত্রীর কাছে যায়। অতঃপর ফিরে যায়। ভারতের মুশরিকদের মতো অনেকে আছে যারা মৃত ব্যক্তির দেহ আগুনে পুড়িয়ে দিয়ে ভাবে মৃত্যুর পর সে চিরঞ্জীব হলো। মিশরের জনৈক বৃদ্ধ ব্যক্তি এ রকম একটি শয়তানি ধোঁকার শিকার হয়েছিল। সে তার খাদেমদের অসিয়ত করে গিয়েছিল যেন মৃত্যুর পর তার দেহ গোসল দেয়া না হয়।
সে বলে গেল, নিজেই ফিরে এসে নিজের দেহ গোসল দেবে! মৃত্যুর পর খাদেমরা দেখল ওই ব্যক্তির রূপে জনৈক ব্যক্তি এসে হাজির হয়েছে। সবাই ভাবল সে ফিরে এসেছে এবং আগত লোকটি নিজের মৃতদেহ গোসল করালো! এরপর সে কোনো নমুনা না রেখে অদৃশ্য হয়ে গেল। আসলে এটি শয়তান ছাড়া আর কেউ ছিল না। সে বৃদ্ধ লোকটিকে ধোঁকা দিয়ে বলেছিল, মৃত্যুর পর সে নিজেই ফিরে এসে তার মৃতদেহ গোসল করাবে। এ জন্য অন্য কেউ যেন তাকে গোসল না দেয়। মৃত্যুর পর তার রূপ ধরে শয়তান এসে হাজির হলো এবং অন্যান্য মানুষদেরকে বিভ্রান্ত করল, যেভাবে সে এর আগে মৃতব্যক্তিকে বিভ্রান্ত করেছে।
অনেকে শূন্যে একটি মেঘ ভেসে থাকতে দেখে, যেখান থেকে আলো ও গায়েবি আওয়াজ ভেসে এসে বলতে থাকে, আমি তোমার রব! যদি তারা আহলুল ইলম হয়, তবে বুঝতে পারে এটি শয়তানের কারসাজি। তখন তারা শয়তানের প্রতারণা থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করেন, ফলে ওই দৃশ্য ও গায়েবি আওয়াজ মিলিয়ে যায়।
আবার অনেকে জাগ্রত অবস্থায় প্রকাশ্য দিবালোকে মানুষের রূপ ধরে আসা কিছু ব্যক্তিকে দেখতে পান, যারা নিজেদেরকে নবি, সালিহীন বা বুজুর্গ বলে দাবি করে।
এ ধরনের ঘটনা অনেকের সাথে ঘটতে দেখা যায়। অনেকে মৃত ব্যক্তির কবর যিয়ারত করে দেখতে পায় কবর উন্মুক্ত হয়ে গেছে এবং সেখান থেকে একটি প্রতিচ্ছবি উঠে এসেছে। লোকেরা সেই প্রতিমূর্তিকে মৃত ব্যক্তি বলে ধরে নেয়। কিন্তু এটি আসলে জিন ছাড়া কিছুই নয়—যে মৃত ব্যক্তির রূপ ধারণ করেছে। আবার অনেকে কবর থেকে ঘোড়সওয়ার উঠে আসতে বা প্রবেশ করতে দেখে। এটিও শয়তান ছাড়া কিছুই নয়। যদি কেউ দাবি করে সে নিজের চোখে কোনো নবিকে দেখেছে, তাহলে এটি তার কল্পনা ছাড়া আর কিছু নয়।
তাদের কেউ কেউ স্বপ্নে আবু বকরের মতো মহান ব্যক্তিদের দেখতে পারেন। তারা এসে তার মাথা মুণ্ডন করে দেয়, চুল কেটে দেয় বা কোনো পোশাক পরিয়ে দেয় (যেমন: আলখাল্লা, টুপি), এরপর ঘুম থেকে জেগে উঠে তারা নিজেদের মাথা মুণ্ডনকৃত, চুল কর্তনকৃত অথবা বিশেষ টুপি বা আলখাল্লা পরিহিত দেখতে পায়। শয়তান ঘুমের মধ্যে এসব স্বপ্ন দেখায় ও এমনটা করে। কুরআন ও সুন্নাহ থেকে বিচ্যুত লোকেদের অনেকে এই ধরনের শয়তানি কারসাজির শিকার হয়। এসব বিচ্যুতির বিভিন্ন মাত্রা রয়েছে, যেসব জিন তাদের সাথে সংযুক্ত হয় তাদের মধ্যেও বিভিন্ন রকমফের আছে। কিছু জিন কাফির, কিছু ফাসিক (পাপী), আবার কিছু বিভ্রান্ত।
যদি কোনো ব্যক্তি কাফির, ফাসিক বা জাহিল হয়, তাহলে জিন ওই ব্যক্তির কুফর, গুনাহ ও পথভ্রষ্টতার কাজে যোগদান করে। কুফরির কাজে একমত হওয়ার পর জিনেরা তাকে কিছু সাহায্য করতে পারে, যেমন: জিনের নামে কসম খাওয়া (আল্লাহ বাদে অন্য কারও নামে কসম খাওয়া শিরক), নাপাক বস্তু দিয়ে আল্লাহর নাম বা কুরআনের আয়াত লেখা; সূরা ফাতিহা, সূরা ইখলাস বা আয়াতুল কুরসি উলটো করে লেখা কিংবা নাপাক বস্তু দিয়ে লেখা ইত্যাদি। এরপর কুফরিতে সন্তুষ্ট হয়ে জিন ওই ব্যক্তিকে পানির ওপরে ভাসিয়ে রাখতে পারে কিংবা শূন্যে উত্তোলন করতে পারে। এমনকি তারা তার কাছে সুন্দরী নারী বা অল্পবয়স্ক বালক নিয়ে উপস্থিত হতে পারে। তাদেরকে সেখানে এনে হাজির করতে পারে অথবা তাকেই তাদের কাছে নিয়ে যেতে পারে। এ ধরনের অনেক উদাহরণ রয়েছে যার সংখ্যা নির্ণয় করা দুঃসাধ্য।
এসব বিষয়ে বিশ্বাস করার নাম আল-জিবত ও আত-তাগুতে বিশ্বাস করা। এ সম্পর্কে সূরা নিসায় (আয়াত ৭১) আলোচনা করা হয়েছে। আল-জিবত হলো জাদুবিদ্যা, আর আত-তাগুত হলো জিন, শয়তান ও মূর্তি। যদি কোনো ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে তবে দুষ্ট জিনেরা তার সাথে যোগদান করতে পারে না কিংবা তার সাথে সন্ধি করতে পারে না।
এ জন্যেই মুসলিমরা মাসজিদে সালাত আদায় করতে আদিষ্ট। মাসজিদ আল্লাহর ঘর। যারা নিয়মিত মাসজিদে যায় তারা শয়তানের ভেলকিবাজি ও কারসাজির শিকার হওয়া থেকে অনেক দূরে অবস্থান করে। অপরদিকে, মুশরিক ও বিদআতি লোকেরা কবর, মাযার ও মৃত ব্যক্তিদের সমাধিস্থলের বড়ত্ব ঘোষণা করে। তারা মৃত ব্যক্তির কাছে দুআ করে (মৃত নেককার বুজুর্গ ব্যক্তি) অথবা আল্লাহর নামে দুআ করে কিন্তু অন্তরে বিশ্বাস করে যে বুজুর্গের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে দুআ করলে সেটা কবুল হয়। এসব লোকেরা শয়তানের ভেলকিবাজির নিকটে অবস্থান করে।
আয়িশা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ বলেছেন, 'আল্লাহ তাআলা ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের অভিশপ্ত করেছেন, তারা তাদের নবিদের কবরকে ইবাদাতের স্থানে পরিণত করেছে।” [৪৮০]
রাসূলুল্লাহ তার মৃত্যুর কয়েক দিন আগে বলেছেন, 'তোমাদের কেউ আমার খলীল (অন্তরঙ্গ বন্ধু) হওয়া থেকে আমি আল্লাহর কাছে নিষ্কৃতি চাইছি। কেননা, আল্লাহ তাআলা আমাকে তার খলীলরূপে গ্রহণ করেছেন-যেমনিভাবে খলীলরূপে গ্রহণ করেছিলেন ইবরাহীমকে। আমি যদি আমার উম্মাতের মধ্যে কাউকে খলীলরূপে গ্রহণ করতাম তবে আবূ বকরকেই খলীলরূপে গ্রহণ করতাম। সাবধান! তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা তাদের নবি ও নেককারদের কবরগুলোকে মাসজিদ বানিয়েছিল। সাবধান! তোমরাও কবরকে মাসজিদ বানিয়ো না। আমি তোমাদের তা থেকে নিষেধ করছি।' [৪৮১]
মুসলিম ও বুখারির বর্ণনায় এসেছে, যখন রাসূলুল্লাহ মৃত্যুকালীন অসুস্থতায় ছিলেন তখন সাহাবিদের কয়েকজন আবিসিনিয়ার একটি গির্জার নির্মাণ-সৌন্দর্য ও মর্যাদার আলোচনা করলেন; অন্য বর্ণনায়, আয়িশা থেকে বর্ণিত, উম্মু হাবীবা ও উন্মু সালামা রাসূলুল্লাহ-এর কাছে একটি গির্জার কথা উল্লেখ করলেন, যা তারা আবিসিনিয়ায় দেখেছিলেন। তাতে অনেক নবি-রাসূলের ছবি ছিল। রাসূলুল্লাহ বললেন, 'তাদের মধ্যে যখন কোনো নেক লোক মারা যেত, তখন তার কবরের ওপর তারা মাসজিদ নির্মাণ করত এবং তারা সেখানে এদের ছবি তৈরি করত। এইসব লোক কিয়ামাতের দিন আল্লাহর কাছে অত্যন্ত নিকৃষ্ট বলে গণ্য হবে।' [৪৮২]
রাসূলুল্লাহ বলেছেন, 'আল্লাহর সৃষ্টি জগতের মধ্যে সর্ব নিকৃষ্ট হলো তারা, যারা জীবিত থাকাকালে কিয়ামাত ঘটবে এবং যারা কবরকে ইবাদাতের স্থান বানায়।” [৪৮৩]
আরেকটি হাদীসে এসেছে, নবি বলেছেন, 'তোমরা কবরের ওপর বসবে না এবং সেই দিকে ফিরে সালাতও আদায় করবে না।' [৪৮৪]
রাসূলুল্লাহ বলেছেন, 'হে আল্লাহ, আমার কবরকে পূজ্য মূর্তি বানিয়ো না। সেই সম্প্রদায়ের ওপর আল্লাহর ক্ষোভ প্রবল হয়েছে, যারা তাদের নবিদের কবরকে মাসজিদ বা সাজদার জায়গা বানিয়েছে।' [৪৮৫]
রাসূলুল্লাহ বলেছেন, 'তোমরা আমার কবরকে ঈদ তথা সম্মিলনস্থলে পরিণত করবে না, আর তোমরা যেখানেই থাকো না কেন আমার ওপর দরূদ পাঠ কোরো; কেননা তোমাদের দরূদ আমার কাছে পৌঁছে যায়।' [৪৮৬]
'তোমাদের যে কেউ আমার ওপর সালাম দেয়, মহান আল্লাহ তখনই আমার রূহ আমাকে ফেরত দেন; ফলে আমি তার সালামের জবাব দিই।'[৪৮৭]
'নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলার পৃথিবীতে পরিভ্রমণকারী কিছু ফেরেশতা রয়েছে যারা আমার উম্মাতের সালাম আমার কাছে পৌঁছে দেয়।' [৪৮৮]
'তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠতম দিনটি হচ্ছে জুমু'আর দিন। অতএব তোমরা ওই দিন আমার ওপর বেশি বেশি করে দরূদ পড়ো। কারণ তোমাদের দরূদগুলো আমার নিকট পেশ করা হয়। সাহাবায়ে কেরাম আরয করেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমাদের দরূদ কীভাবে আপনার নিকট পেশ করা হবে; আপনি তো তখন জমিনের সাথে মিশে যাবেন?' তিনি বললেন, 'নিশ্চয়ই নবিদের দেহকে আল্লাহ জমিনের জন্য হারাম করে দিয়েছেন।' [৪৮৯]
আল্লাহ তাআলা কুরআনে কওমে নূহের মুশরিকদের সম্পর্কে বলেছেন,
وَقَالُوا لَا تَذَرُنَّ آلِهَتَكُمْ وَلَا تَذَرُنَّ وَدًّا وَلَا سُوَاعًا وَلَا يَغُوثَ وَيَعُوقَ وَنَسْرًا
'তারা বলছে, তোমরা তোমাদের উপাস্যদের ত্যাগ কোরো না এবং ত্যাগ কোরো না ওয়াদ্দ, সুওয়াআ, ইয়াগূস, ইয়াউক ও নাসরকে।'[৪৯০]
ইবনু আব্বাস ও অন্যান্যরা উক্ত আয়াত সম্পর্কে বলেছেন, এগুলো নূহ-এর জাতির কতিপয় নেক লোকের নাম ছিল। তারা মারা গেলে, শয়তান তাদের জাতির লোকদের হৃদয়ে এই কথা ঢুকিয়ে দিলো, তারা যেখানে বসে মজলিস করত, সেখানে তোমরা কিছু মূর্তি স্থাপন করো এবং ওইসকল নেক লোকের নামানুসারেই এগুলোর নামকরণ করো। সুতরাং তারা তা-ই করল, কিন্তু তখনো ওইসব মূর্তির পূজা করা হতো না। তবে মূর্তি স্থাপনকারী লোকগুলো মারা গেলে এবং মূর্তিগুলো সম্পর্কে সত্যিকারের জ্ঞান বিলুপ্ত হলে লোকজন তাদের পূজা করতে শুরু করে দেয়। এটিই হলো মূর্তিপূজার গোড়ার কথা। [৪৯১]
এভাবে রাসূলুল্লাহ কবরকে ইবাদাতের স্থানে পরিণত করার থেকে নিষেধ করেছেন। এর মাধ্যমে শিরকের দরজা বন্ধ করেছেন, ঠিক যেভাবে তিনি সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় সালাত আদায়ে নিষেধ করেছেন, কেননা মুশরিকরা সেই সময়ে সূর্যকে সাজদা করে এবং শয়তান তখন নিজের উদ্দেশ্যে সাজদা করিয়ে নেয়। উক্ত দুই সময়ে সালাত আদায় করা মুশরিকদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ, তাই আল্লাহর রাসূল এটি নিষেধ করেছেন। শয়তান আদমসন্তানকে পথভ্রষ্ট করতে সাধ্যমতো সর্বোচ্চ চেষ্টা করে।
কাজেই যারা চন্দ্র-সূর্য ও গ্রহ-নক্ষত্রের পূজা করে ও এসবের কাছে দুআ করে, তাদের উদ্দেশ্যে শয়তান সেসব রূপে হাজির হয় ও বিভিন্ন বিষয়ে অবগত করে। তখন তারা বলে, এটি ওই গ্রহের আত্মা! অথচ এটি শয়তান ছাড়া আর কিছু নয়! জেনে রাখা ভালো, যদিও শয়তান কখনো কোনো ব্যক্তির কিছু প্রয়োজন ও লক্ষ্য পূরণ করে দেয়, কিন্তু তার উপকারের থেকে ক্ষতির পরিমাণ অনেক গুণ বেশি! যে শয়তানের আনুগত্য করে, তার চূড়ান্ত পরিণতি নিঃসন্দেহে অশুভ—তবে যারা তাওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে তাদের কথা ভিন্ন।
একইভাবে, মূর্তিপূজারিদের উদ্দেশে শয়তান কথা বলতে পারে এবং যারা অনুপস্থিত বা মৃত ব্যক্তিদের কাছে দুআ করে ও সাহায্যের আবেদন জানায় কিংবা মৃত ব্যক্তির নামে বা তার কাছে প্রার্থনা করে অথবা মনে করে বাড়িতে বা মাসজিদে সালাত আদায়ের থেকে অমুক কবর বা মাযারে সালাত আদায় করা উত্তম—এদের সকলকে বিভ্রান্ত করার জন্য শয়তান হাজির হতে পারে। উল্লেখিত লোকদের অনেকেই একটি জাল হাদীস বিশ্বাস করে। হাদীস-বিশেষজ্ঞদের সর্বসম্মতিক্রমে এটি জাল ও মিথ্যা হাদীস, যেখানে বলা হয়েছে, 'যখন ইলম তোমার প্রয়োজন পূরণ করতে পারবে না, তখন তুমি অবশ্যই কবরবাসীদের কাছে গিয়ে হাজির হবে!' [৪৯২]
যারা শিরকের দরজা উন্মুক্ত করতে চায় তারাই এই জাল বর্ণনা তৈরি করেছে। মূর্তিপূজারি ও খ্রিষ্টানদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বিদআতি, মুশরিক এবং পথভ্রষ্ট মুসলিমরা বিভিন্ন সমাধি ও মাযারে গিয়ে নানা রকম চমকপ্রদ ঘটনা দেখতে পায় এবং সেগুলোকে কারামাত মনে করে! বাস্তবে এগুলো শয়তানের কারসাজি।
উদাহরণস্বরূপ, তারা কবরের ওপর একজোড়া পায়জামা রেখে আসে এবং ফিরে এসে সেগুলো গিঁটবদ্ধ দেখতে পায়, অথবা জিনগ্রস্ত কাউকে কোনো কবরের কাছে নিয়ে যায় এরপর দেখে জিনের আছর কেটে গেছে। মূলত আরও মারাত্মক পথভ্রষ্টতায় লিপ্ত করার জন্য শয়তান এগুলো করে। যদি খাঁটি ঈমান ও বিশুদ্ধ নিয়তে আয়াতুল কুরসি পড়া হয়, তাহলে এসবের কোনোটিই ঘটবে না। তাওহীদ শয়তানকে তাড়িয়ে দেয়। এ কারণে যখন কাউকে জিনেরা শূন্যে ভাসিয়ে বেড়ায়, তখন 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বললে তারা মাটিতে পড়ে যায়। যখন কেউ কবরকে উন্মুক্ত হতে দেখে এবং সেখান থেকে মৃত ব্যক্তির অনুরূপ কাউকে বেরিয়ে আসতে থাকে তখন বুঝতে হবে এটি শয়তান। এ ধরনের বহু উদাহরণ রয়েছে যা এই ছোট পুস্তকে আলোচনার উপযুক্ত নয়।
গুহা বা মরুভূমিতে নির্জনতা অবলম্বন করা একটি বিদআত। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এ ধরনের আমলের নির্দেশনা প্রদান করেননি। জিন শয়তানরা প্রায়ই বিভিন্ন পর্বতের গুহায় আশ্রয় গ্রহণ করে। উদাহরণস্বরূপ, কাসিয়ূন পর্বতের 'রক্তাক্ত গুহা', লেবানন, আসওয়ানের পর্বত, মিশর আফগানিস্তানের রোম পর্বত, আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন পর্বতমালা, লুকাম পর্বত, আহইয়াশ পর্বত, আরদাবিলের নিকটস্থ সাবালান পর্বত, তাবরীযের শাহাংক পর্বত, আতশাওয়ানের মাশকো পর্বত, নাহাওয়ান্দ পর্বত এবং অন্যান্য আরও অনেক পর্বত ও স্থান রয়েছে যেসব সম্পর্কে লোকেরা মনে করে সেখানে বিভিন্ন সাধুপুরুষ অবস্থান করে। তারা বলে, এরা 'অদৃশ্য জগতের বাসিন্দা', বাস্তবে এরা জিনে আছরগ্রস্ত মানুষ।
মানুষের মধ্যে যেভাবে কিছু লোক আখিরাত অস্বীকার করে, সেভাবে জিনদের মধ্যেও আছে। আল্লাহ বলেন,
وَأَنَّهُمْ ظَنُّوا كَمَا ظَنَنتُمْ أَن لَّن يَبْعَثَ اللَّهَ أَحَدًا )
'তারা ধারণা করত, যেমন তোমরা মানবরা ধারণা করো যে, মৃত্যুর পর আল্লাহ তাআলা কখনো কাউকে পুনরুত্থিত করবেন না।' [৪৯৩]
অনেক সময় জিনেরা চুল-দাড়িতে আচ্ছাদিত মানুষের বেশে উপস্থিত হয়, তাদের গায়ের চামড়া ছাগলের মতো, অজ্ঞ লোকেরা তাদেরকে মানুষ মনে করে কিন্তু বাস্তবে এরা জিন। অনেকে বলে, ‘চল্লিশজন আবদাল আছেন যারা বিভিন্ন পর্বতে অবস্থান করেন।’ লোকেরা যাদেরকে আবদাল মনে করে, এরা মূলত বিভিন্ন পর্বতে অবস্থানকারী জিন। বিষয়টি বিভিন্নভাবে সুপরিচিত ও প্রমাণিত।
আবারও বলছি, বিষয়টি অনেক বিস্তারিত আলোচনার দাবি রাখে যা এই ছোট্ট পুস্তকে শেষ করা সম্ভব নয়। উল্লেখিত বর্ণনাগুলো ছাড়াও আমি (লেখক) ব্যক্তিগতভাবে আরও অনেক ঘটনা দেখেছি ও শুনেছি। সবকিছু এখানে উল্লেখ করা সম্ভব নয়। রহমানের আউলিয়াদের কিছু শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জনৈক ব্যক্তির আবেদনের ভিত্তিতে আমি এই পুস্তকটি রচনা করি।
অলৌকিক ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে লোকেরা তিনভাগে বিভক্ত
(১) কিছু লোক আম্বিয়া ব্যতীত অন্যদের ক্ষেত্রে এসব অলৌকিক ঘটনার অস্তিত্ব অস্বীকার করে। অথবা তারা এসবের অস্তিত্ব সাধারণভাবে স্বীকার করে, কিন্তু কারামাতের বর্ণনাগুলোকে অস্বীকার করে। কারণ ওইসব ব্যক্তিদেরকে তারা রহমানের আউলিয়া মনে করে না।
(২) আবার কিছু মানুষ মনে করে, কারও মাধ্যমে কোনো অলৌকিক ঘটনা প্রকাশ পেলেই সে রহমানের আউলিয়া! উভয় শ্রেণিই ত্রুটিপূর্ণ। এ কারণে আপনি দেখতে পাবেন, দ্বিতীয় দলের লোকেরা ইয়াহুদী, খ্রিষ্টান, মুশরিক ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে লড়াইকারীদেরও আল্লাহর আউলিয়া মনে করে। আর প্রথম দলের লোকেরা সকল অলৌকিক ঘটনার সম্ভাব্যতা সরাসরি নাকচ করে দেয়।
(৩) তৃতীয় অবস্থানটি সঠিক। (অর্থাৎ অলৌকিক ঘটনা ঘটতে পারে, তবে অলৌকিক কিছু ঘটলেই কেউ আল্লাহর আউলিয়া হয়ে যায় না)।
নিশ্চয়ই তাদের সাথে সাহায্যকারী আছে, তবে ওই সাহায্যকারীরাও তাদের মতোই পথভ্রষ্ট। তারা আল্লাহর আউলিয়া নয়। আল্লাহ বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى أَوْلِيَاءَ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ وَمَن يَتَوَلَّهُم مِّنكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ *
‘হে মুমিনগণ, তোমরা ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ কোরো না। তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ যালিমদের পথ প্রদর্শন করেন না।'[৪৯৪]
যারা কুরআন-সুন্নাহর অনুসারী মুত্তাকী নয়, কিংবা আল্লাহর আউলিয়া নয়, সেসব বৈরাগী ও সাধু পুরুষের সাথে শয়তান যোগ দেয়। তারা অনেক সময় বিভিন্ন রকমের আশ্চর্যজনক ঘটনা দেখায়। কিন্তু এসব ‘অলৌকিক!’ ঘটনাগুলো একটি আরেকটির সাথে সংঘাতপূর্ণ। যদি সেখানে কোনো উচ্চস্তরের আল্লাহর ওলি হাজির হন, তিনি তাদের সকল ‘অলৌকিক’ ঘটনা নির্মূল ও নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারেন। আরেকটি জরুরি বিষয় হলো, এসব কার্যকলাপে লিপ্ত ব্যক্তিরা প্রচুর মিথ্যাচার করে—হোক সেটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা অজ্ঞতাপ্রসূত। এ ছাড়া বিভিন্ন গুনাহের কাজে লিপ্ত হয় যা উক্ত লোকের সাথে যুক্ত শয়তানের সাথে সংগতিপূর্ণ। এ জন্যই আল্লাহ তাআলা তাঁর মুত্তাকী আউলিয়া ও তাদের আচরণ নকলকারী শয়তানের আউলিয়াদের মধ্যে পার্থক্য সুস্পষ্ট করে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
هَلْ أُنَبِّئُكُمْ عَلَى مَن تَنَزَّلُ الشَّيَاطِينُ تَنَزَّلُ عَلَى كُلِّ أَفَّاكٍ أَثِيمٍ *
‘আমি আপনাকে বলব কি, কার নিকট শয়তানরা অবতরণ করে? তারা অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক মিথ্যাবাদী, গুনাহগারের ওপর।' [৪৯৫]
উক্ত আয়াতে উল্লেখিত ‘মিথ্যাবাদী’ (أَفَّاكِ) অর্থাৎ যে ক্রমাগত মিথ্যাচার করে এবং ‘গুনাহগার’ (أَثِيمٍ) হলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘনকারী পাপী ব্যক্তি।
শয়তানের কারসাজিতে সহায়তামূলক অন্যতম প্রধান কর্মকাণ্ড হলো বাদ্যযন্ত্র ও গানবাজনা শ্রবণ করা। এটি মুশরিকদের ইবাদাতের একটি পদ্ধতি। আল্লাহ বলেন,
وَمَا كَانَ صَلَاتُهُمْ عِندَ الْبَيْتِ إِلَّا مُكَاءً وَتَصْدِيَةً فَذُوقُوا الْعَذَابَ بِمَا كُنتُمْ تَكْفُرُونَ *
‘আর কা’বার নিকট তাদের সালাত বলতে শিস দেওয়া আর তালি বাজানো ছাড়া অন্য কোনো কিছুই ছিল না।...' [৪৯৬]
ইবনু আব্বাস, ইবনু উমর ও অন্যান্য সালাফগণ বলেন, 'দ্বিতীয় শব্দ 'আত-তাসদিয়া' (التَّصْدِيَةُ) অর্থ হাতে তালি দেওয়া এবং প্রথম শব্দ 'আল-মুকা' (الْمُكَاءُ) অর্থ শিস বাজানো। এগুলোকে মুশরিকরা নিজেদের ইবাদাত বানিয়ে নিয়েছিল।' [৪৯৭]
রাসূলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবায়ে কেরামের ইবাদাতের পদ্ধতি সেটাই ছিল যা আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য আদেশ করেছেন— কুরআন তিলাওয়াত, আল্লাহর যিকর, দুআ, শারীআতে নির্দেশিত সমাবেশ ইত্যাদি। রাসূল ﷺ ও তার সাহাবায়ে কেরাম কখনো গানবাজনা, হাতে তালি বাজানো, ঢোল পেটানো ইত্যাদির জন্য সমবেত হননি। এমনকি এগুলোর প্রতি কোনো আগ্রহবোধ করেননি বা বিশেষভাবেও আচ্ছন্ন হননি এবং তাঁর চাদরও পড়ে যায়নি। বরং এর সবগুলোই সমস্ত মুহাদ্দিস ও হাদীস-বিশেষজ্ঞ আলিমদের ঐকমত্যে রাসূলের নামে মিথ্যাচার ও বানোয়াট।
যখন সাহাবায়ে কেরাম একত্র হতেন, তখন তাদের মধ্যে যেকোনো একজনকে কুরআন তিলাওয়াত করতে বলতেন এবং বাকিরা শ্রবণ করতেন। উমর ইবনুল খাত্তাব আবূ মূসা আশআরি-কে বলতেন, 'আপনি আমাদেরকে আমাদের রবের কথা স্মরণ করিয়ে দিন।' তখন আবূ মূসা কুরআন তিলাওয়াত করতেন এবং উপস্থিত সকলে তা শুনতেন।
রাসূলুল্লাহ ﷺ একবার আবূ মূসা -কে অতিক্রম করে গেলেন, যখন তিনি কুরআন পড়ছিলেন। নবি ﷺ তাকে বললেন, 'আমি গতরাতে তোমাকে অতিক্রম করেছি যখন তুমি কুরআন পড়ছিলে, আমি কিছুটা থেমে তোমার তিলাওয়াত শুনেছি।' আবূ মূসা বললেন, 'যদি আমি বুঝতে পারতাম আপনি আমার তিলাওয়াত শুনছেন, তবে আমি আরও সুন্দর করে পড়তাম।'[৪৯৮]
অর্থাৎ, তিনি আরও সুন্দর কণ্ঠে পড়তেন। কেননা রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, 'তোমাদের কণ্ঠস্বর দিয়ে কুরআনকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করো।' [৪৯৯]
'গায়িকার গানের প্রতি তার মনিব যতটা একাগ্র থাকে, আল্লাহ তাআলা সুকণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াতকারীর তিলাওয়াতের প্রতি তার চেয়ে অধিক কান লাগিয়ে শোনেন।' [৫০০]
ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবি ﷺ আমাকে বললেন, 'আমাকে কুরআন তিলাওয়াত শোনাও।' আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি আপনাকে কুরআন তিলাওয়াত করে শোনাব, অথচ আপনার ওপরই তা নাযিল হয়েছে? তিনি বললেন, আমি অপরের তিলাওয়াত শুনতে ভালোবাসি। তখন আমি তাঁর সামনে সূরা নিসা পড়তে শুরু করলাম। আমি যখন এই আয়াতে পৌঁছলাম,
فَكَيْفَ إِذَا جِئْنَا مِن كُلِّ أُمَّةٍ بِشَهِيدٍ وَجِئْنَا بِكَ عَلَى هَؤُلَاءِ شَهِيدًا )
'তখন কি অবস্থা হবে যখন আমি প্রত্যেক উম্মাত থেকে একজন করে সাক্ষী উপস্থিত করব?'[৫০১]
তিনি বললেন, এখন যথেষ্ট হয়েছে। আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে দেখলাম, তাঁর দুচোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।[৫০২]
এ রকম শ্রবণ (السَّمَاعُ)-ই হলো নবি ও তাদের অনুসারীদের সামা' বা 'শ্রবণ'। যেমন আল্লাহ জাল্লা শানুহু বলেন,
أُولَبِكَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِم مِّنَ النَّبِيِّينَ مِن ذُرِّيَّةِ آدَمَ وَمِمَّنْ حَمَلْنَا مَعَ نُوحٍ وَمِن ذُرِّيَّةِ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْرَابِيلَ وَمِمَّنْ هَدَيْنَا وَاجْتَبَيْنَا إِذَا تُتْلَى عَلَيْهِمْ آيَاتُ الرَّحْمَنِ خَرُّوا سُجَّدًا وَبُكِيًّا **
'এরাই তারা, নবিগণের মধ্য থেকে যাদেরকে আল্লাহ তাআলা নিয়ামাত দান করেছেন। এরা আদমের বংশধর এবং যাদেরকে আমি নূহের সাথে নৌকায় আরোহণ করিয়েছিলাম, তাদের বংশধর, এবং ইবরাহীম ও ইসরাঈলের বংশধর এবং যাদেরকে আমি পথ প্রদর্শন করেছি ও মনোনীত করেছি, তাদের বংশোদ্ভূত। তাদের কাছে যখন দয়াময় আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করা হতো, তখন তারা সাজদায় লুটিয়ে পড়ত এবং ক্রন্দন করত।[৫০৩]
অন্যত্র আল্লাহ তাআলা আলিমদের সম্পর্কে বলেছেন,
وَإِذَا سَمِعُوا مَا أُنزِلَ إِلَى الرَّسُولِ تَرَى أَعْيُنَهُمْ تَفِيضُ مِنَ الدَّمْعِ مِمَّا عَرَفُوا مِنَ الْحَقِّ
'আর তারা রাসূলের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে, তা যখন শ্রবণ করে, তখন আপনি তাদের চোখ অশ্রুসজল দেখতে পাবেন; এ কারণে যে, তারা সত্যকে চিনে নিয়েছে।'[৫০৪]
আল্লাহ তাআলা এই ধরনের শ্রোতাদের প্রশংসা করেছেন। কারণ এতে তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায়, তনুমন শিহরিত হয় এবং চক্ষু অশ্রুসিক্ত হয়। আল্লাহ বলেন,
اللَّهُ نَزَّلَ أَحْسَنَ الْحَدِيثِ كِتَابًا مُّتَشَابِهًا مَّثَانِيَ تَقْشَعِرُّ مِنْهُ جُلُودُ الَّذِينَ يَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ ثُمَّ تَلِينُ جُلُودُهُمْ وَقُلُوبُهُمْ إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ
'আল্লাহ উত্তম বাণী তথা কিতাব নাযিল করেছেন, যা সামঞ্জস্যপূর্ণ, পুনঃপুন পঠিত। এতে তাদের লোম কাঁটা দিয়ে উঠে চামড়ার ওপর, যারা তাদের পালনকর্তাকে ভয় করে, এরপর তাদের চামড়া ও অন্তর আল্লাহর স্মরণে বিনম্র হয়...'[৫০৫]
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ * أُولَئِكَ هُمُ الْمُؤْمِنُونَ حَقًّا لَّهُمْ دَرَجَاتٌ عِندَ رَبِّهِمْ وَمَغْفِرَةٌ وَرِزْقٌ كَرِيمٌ )
'যারা ঈমানদার, তারা এমন যে, যখন আল্লাহর নাম নেওয়া হয় তখন ভীত হয়ে পড়ে তাদের অন্তর। আর যখন তাদের সামনে পাঠ করা হয় কালাম, তখন তাদের ঈমান বেড়ে যায় এবং তারা স্বীয় রবের প্রতি ভরসা পোষণ করে। সেসমস্ত লোক যারা সালাত প্রতিষ্ঠা করে এবং আমি তাদেরকে যে রুযী দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে। তারাই হলো সত্যিকার ঈমানদার! তাদের জন্য রয়েছে স্বীয় রবের নিকট মর্যাদা, ক্ষমা এবং সম্মানজনক রুযী।'[৫০৬]
আর যে ধরনের 'শ্রবণ' (সামা') বিদআতের অন্তর্ভুক্ত তার মধ্যে আছে হাতে তালি দেওয়া, ঢোল-তবলা-বাঁশি বাজানো ইত্যাদি। সাহাবায়ে কেরাম, সালাফগণ বা ইমামদের কেউই এগুলোকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপায় বা আনুগত্যের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেননি। বরং তারা সকলেই একে নিন্দনীয় বিদআত গণ্য করেছেন।
ইমাম শাফিঈ বলেন, 'আমি বাগদাদ পরিত্যাগকালে দেখেছি সেখানকার যিন্দিকরা আত-তাগবীর [৫০৭] (التَّغْبِيرُ) নামে একটি বিদআত সৃষ্টি করেছে। এর মাধ্যমে তারা মানুষকে কুরআন হতে বিরত রাখে। [৫০৮]
আল্লাহর আউলিয়াদের মধ্যে যারা আলিম তারা এই বিদআতকে সনাক্ত করতে পারেন এবং বুঝতে পারেন এসব কাজের শয়তানের বিরাট অংশীদারত্ব আছে। এ জন্যে এসব অনুষ্ঠানের প্রচলনের পর, অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে যারা সর্বোত্তম তারা সেসব থেকে তাওবা করেছেন। একজন ব্যক্তি ইলম ও আল্লাহর ওলায়াত অর্জন থেকে যত দূরে থাকে, সে তত বেশি শয়তানের অংশীদারিতে থাকে।
এসব গানবাজনা মদের মতো; বরং মানবাত্মার ওপর এসবের প্রভাব মদ্যপানের চেয়েও মারাত্মক। এ কারণেই দেখা যায় যখন গানবাজনার প্রভাব শক্তিশালী হয়, তখন অংশগ্রহণকারীদের ওপর শয়তান ভর করে, তারা তাদের জবানে কথা বলে এবং কাউকে শূন্যে ভাসিয়ে দেয়। পরস্পরের মধ্যে শত্রুতাও সৃষ্টি করতে পারে, যেভাবে মদ পানকারীদের মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টি হয়। কারও ওপরে ভরকৃত শয়তান অন্যজন থেকে শক্তিশালী হলে প্রতিপক্ষকে হত্যা করে। মূর্খ ব্যক্তিরা এসব ঘটনাকে আল্লাহর আউলিয়াদের কারামাত মনে করে। অথচ এগুলো একজন ব্যক্তিকে আল্লাহ থেকে আরও দূরে নিয়ে যায়, এগুলো হলো শয়তানের কারসাজি।
আল্লাহ তাআলা যেসব শর্তের বৈধতা দিয়েছেন সেগুলো বাদে একজন মুসলিমকে হত্যা করা কিছুতেই বৈধ নয়। তাহলে একজন নিরীহ মুসলিমকে হত্যার মাধ্যমে কীভাবে আল্লাহ তার আউলিয়ার সম্মান বৃদ্ধি করতে পারেন? আল্লাহ যখন তাঁর বান্দাকে সরল পথের ওপর দৃঢ় থাকতে সাহায্য করেন এবং নিজের পছন্দনীয় ও সন্তুষ্টির কাজে বান্দাকে ব্যস্ত রাখেন, তখন বান্দা ক্রমাগত আল্লাহর অধিকতর নৈকট্য অর্জন করতে থাকে ও নিজের মর্যাদা বৃদ্ধি করতে পারে। এটাই সর্বোচ্চ সম্মান।
কিছু অলৌকিক ঘটনা ইলমের সাথে সম্পর্কিত, যেমন: গায়েবের খবর প্রকাশ করা, মনের কথা বলে দেওয়া ইত্যাদি। কিছু ঘটনা শক্তি ও ক্ষমতার সাথে সম্পর্কিত, যেমন: দৈহিকভাবে অলৌকিক কিছু কাজ করা। আবার কিছু ঘটনা সম্পদের সাথে সম্পর্কিত যা দৃশ্যত জ্ঞান, রাজনৈতিক ক্ষমতা, সম্পদ এবং প্রাচুর্যের মাধ্যমে প্রদান করা হয়। এভাবে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদেরকে যেসব নিয়ামাত প্রদান করেন যদি সেগুলোকে সে আল্লাহর ভালোবাসা ও সন্তুষ্টির কাজে ব্যবহার করে তবে বান্দা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে ও নিজের মর্যাদা বৃদ্ধি করে। অর্থাৎ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আদেশকৃত কাজের মাধ্যমে ব্যক্তির মর্যাদা ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জিত হয়। অপরদিকে, এসব নিয়ামাতকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নিষেধকৃত কাজে ব্যবহার করে, তবে সে শান্তি ও নিন্দার যোগ্য হয় যেমন: শিরক, যুলুম, অশ্লীলতা, পাপাচার ইত্যাদি।
যদি এই ব্যক্তিকে আল্লাহ তাওবার তাওফীক দিয়ে ধন্য না করেন, অথবা গুনাহের কাজ মুছে দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত নেক আমল করতে না পারে, তবে সে অন্যান্য গুনাহগারের মতোই একজন গুনাহগার। এ জন্য দেখা যায়, নানাবিধ অলৌকিক ঘটনা সংঘটনকারী ব্যক্তিরা দুনিয়ার জীবনে শাস্তিপ্রাপ্ত হয়। যেসব নিয়ামাত ব্যবহার করে, সেগুলো ছিনিয়ে নেওয়া হয়। যেমন: বাদশাহর বাদশাহী চলে যায়, আলিমের ইলম চলে যায় অথবা সে আগের মতো নফল আমল করতে পারে না।
এভাবে আল্লাহর বিশেষ ওলায়াত (মিত্রতা) থেকে অবনমিত হয়ে তারা সাধারণ ওলিদের স্তরে নেমে আসে। প্রত্যেক মুমিন সাধারণ স্তরের ওলি, আর মুত্তাকীরা উচ্চস্তরের ওলি। কখনো-বা এত অবনতি ঘটে যে তারা পথভ্রষ্ট ফাসিকদের স্তরে নেমে আসে, এমনকি কখনো একেবারেই দ্বীন ত্যাগ করে। এগুলো তাদের সাথেই ঘটে যাদের অলৌকিক ঘটনাগুলো শয়তানের প্রভাবে ঘটেছে। ফলে এ ধরনের অধিকাংশ লোক ইসলাম ত্যাগ করে। তাদের অধিকাংশই কখনো বুঝতেই পারে না যে, সেসব ঘটনা শয়তানের প্রভাব ঘটেছিল। বরং তারা সে ঘটনাগুলোকে আল্লাহর আউলিয়াদের কারামাত মনে করে। তারা অনেক সময় মনে করে, যদি আল্লাহ তাআলা কাউকে কোনো কারামাত দান করেন তবে সেজন্য তার কোনো হিসাব নেওয়া হবে না; যেভাবে অনেকে বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ মানুষকে যে শক্তি, ক্ষমতা বা সম্পদ দিয়েছেন সেসবের জন্য জিজ্ঞাসাবাদ করবেন না!
কেউ কেউ এসব অলৌকিক ঘটনাকে বৈধ (মুবাহ) কাজে ব্যবহার করে, যা করা বাধ্যতামূলক নয় আবার নিষিদ্ধও নয়। তারা আল্লাহ তাআলার সাধারণ ওলিদের অন্তর্ভুক্ত, অর্থাৎ যারা নেককার এবং আমলে মধ্যপন্থা অনুসরণকারী। আর যারা অগ্রবর্তী ও নৈকট্যপ্রাপ্ত, তারা পূর্বোক্ত দলের থেকে উচ্চ স্তরে অবস্থান করেন—ঠিক যেভাবে একজন বান্দা-রাসূলের মর্যাদা একজন বাদশাহ-নবির থেকে উচ্চ।
এসব অলৌকিক ঘটনার কারণে অনেক সময় বান্দার মর্যাদা হ্রাসও বোঝাতে পারে! এ কারণে, নেককার ব্যক্তিদের অনেকেই এসব থেকে তাওবা করেন ও আল্লাহর কাছে এমনভাবে ইসতিগফার করেন যেন তারা যিনা বা চুরির মতো গুনাহ করেছেন। যাদের সাথে এসে অলৌকিক ঘটনা ঘটে তারা আল্লাহর কাছে দুআ করেন যেন সেগুলো ফিরিয়ে নেওয়া হয়। তারা সকলেই তাদের ছাত্র ও ভক্তদেরকে এসব বিষয়ে ব্যস্ত হয়ে যাওয়া থেকে নিষেধ করেন, যেন সেগুলোকে লক্ষ্য বানানো না হয় এবং এগুলো নিয়ে গর্ব করা না হয়। যেসব কারামাতের মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে সম্মানিত করে থাকেন, সে ক্ষেত্রেই যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে যেসব ঘটনা শয়তানের প্রভাবে ঘটে এবং যার মাধ্যমে শয়তান তাদেরকে পথভ্রষ্ট করতে চায় সে ক্ষেত্রে অবস্থান কেমন হওয়া উচিত?
আমি (লেখক) ব্যক্তিগতভাবে এমন মানুষদেরকে চিনি যাদের সাথে গাছপালা কথা বলে, তাদেরকে বিভিন্ন উপকারী কথা বলে; অথচ এগুলো গাছের ভেতরে প্রবেশকারী জিন শয়তান ছাড়া আর কিছু নয়। আমি এমন মানুষদেরকেও চিনি যাদের সাথে গাছ ও পাথর কথা বলে, 'অভিনন্দন, হে আল্লাহর ওলি!' কিন্তু যখন আয়াতুল কুরসি পাঠ করা হয় তখন সেগুলো হারিয়ে যায়। আমি এমন ব্যক্তিকেও চিনি, যিনি পাখি শিকার করতে গেলে চড়ুই পাখি বলে ওঠে, আমাকে শিকার করো যেন দরিদ্ররা আমাকে ভক্ষণ করতে পারে!
এটি আসলে পাখির অভ্যন্তরে প্রবেশকারী জিন শয়তানের কণ্ঠ। শয়তান যেভাবে মানুষের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারে, সেভাবে অন্যান্য প্রাণীদের অভ্যন্তরেও প্রবেশ করে কথা বলতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায় তারা বাড়ির ভেতরে তালাবদ্ধ ছিল, হঠাৎ করে তালা না খুলেই বাড়ির বাইরে চলে আসে; অথবা বাড়ির বাইরে ছিল, এরপর হঠাৎ করে বাড়ির ভেতরে চলে আসে। এটি শহরে প্রবেশকারী প্রধান ফটকের ক্ষেত্রেও হতে পারে। জিনেরা তাকে দ্রুতগতিতে ভিতর-বাহির প্রবেশ করায়। কখনো তাদেরকে আলো দেখায়, অথবা এমন ব্যক্তির প্রতিরূপ দেখায় যার কাছে তারা সাহায্যের জন্য দুআ করে। (আগেই বলেছি) এগুলো উক্ত ব্যক্তির রূপ ধারণকারী শয়তান এবং জিন। যখন বারবার আয়াতুল কুরসি পড়া হয় তখন এসব কারসাজি মুহূর্তের মধ্যে মিলিয়ে যায়।
আমি এমন ব্যক্তিকেও চিনি, যার কাছে শয়তান এসে বলে, 'তোমার প্রতি আমি আল্লাহর আদেশ বহনকারী!' তার কাছে প্রতিশ্রুতি জানানো হয়, তুমিই সেই 'মাহদি' যার ব্যাপারে রাসূলের ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে। জিন তার অন্তরে কিছু আশ্চর্য রকমের ভাবনা জাগিয়ে দিতে পারে। যেমন কয়েকটি পাখি বা পঙ্গপাল দেখে সে ভাবল এরা হয়তো ডানদিকে উড়ে যাবে কিংবা বামে ঘুরে যাবে এরপর দেখা গেল সে যা ভেবেছে পাখি বা পঙ্গপালগুলো সেদিকেই উড়ে গেল। অথবা কোনো পশু দেখে তার অন্তরে মনে হতে পারে এটি এখনই উঠে দাঁড়াবে অথবা শুয়ে পড়বে কিংবা চলে যাবে; এরপর দেখা গেল সে যা ভেবেছে সেটাই ঘটেছে। জিনেরা তাকে বহন করে নিয়ে যেতে পারে আবার ফিরিয়ে আনতে পারে। অথবা অনিন্দ্যসুন্দর কারও রূপ ধারণ করে সামনে হাজির হয়ে বলতে পারে, এই ফেরেশতারা তোমার সাক্ষাতে এসেছে! এতে ওই ব্যক্তির মনে ধারণা জন্মায়, এরা অল্পবয়স্ক বালকের বেশে কেন এল? এরপর মাথা তুলে দেখে, বালকের মুখে দাড়ি গজিয়ে গেছে! তখন আগত দর্শনার্থী বলে ওঠে, তুমি মাহদি! এর নিদর্শন হলো তোমার শরীরের অমুক স্থানে একটি তিল বা জন্মদাগ আছে! এরপর সেটি সৃষ্টি হয় এবং সে সেই দাগ দেখতে পায়। এ ধরনের সবকিছু শয়তানের কারসাজি ও ভেলকিবাজি।
এ বিষয়ে আরও অনেক কিছু বলার আছে, যদি শুধু আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বর্ণনা করি, বিশাল ভলিয়মের গ্রন্থ প্রয়োজন হবে।
আল্লাহ বলেন,
فَأَمَّا الْإِنسَانُ إِذَا مَا ابْتَلَاهُ رَبُّهُ فَأَكْرَمَهُ وَنَعَمَهُ فَيَقُولُ رَبِّي أَكْرَمَنِ وَأَمَّا إِذَا مَا ابْتَلَاهُ فَقَدَرَ عَلَيْهِ رِزْقَهُ فَيَقُولُ رَبِّي أَهَانَنِ *
'মানুষ এরূপ যে, যখন তার পালনকর্তা তাকে পরীক্ষা করেন, অতঃপর সম্মান ও অনুগ্রহ দান করেন, তখন বলে, আমার পালনকর্তা আমাকে সম্মান দান করেছেন। এবং যখন তাকে পরীক্ষা করেন, অতঃপর রিযক সংকুচিত করে দেন, তখন বলে, আমার পালনকর্তা আমাকে হেয় করেছেন।' [৫০১]
এরপর আল্লাহ বলেন,
كَلَّا না!
এই শব্দের মাধ্যমে কঠিন ভাষায় তিরস্কার ও সতর্কতা প্রদান করা হয়েছে। আয়াতে উল্লেখিত বক্তব্য প্রদানের বিরুদ্ধে কঠোর তিরস্কার করা হয়েছে। এই আয়াতের পরে যেসব তথ্য ও আদেশ উল্লেখ করা হয়েছে, তার মাধ্যমে মনোযোগ আকর্ষণ করে সতর্ক করা হয়েছে এবং আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন দুনিয়ার জীবনে কিছু কল্যাণপ্রাপ্ত হলেই সে আল্লাহর পক্ষ থেকে কারামাহ (সম্মান) পেয়েছে এমনটা বলা যায় না। আবার দুনিয়ার জীবনে কারও সম্পদ সংকুচিত হলেই আল্লাহ তাকে পরিত্যাগ করেছেন এমনটা ভাবাও ভুল। বরং আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদেরকে যেভাবে সচ্ছলতা ও প্রাচুর্যের মাধ্যমে পরীক্ষা করেন তেমনিভাবে দুঃখ-দুর্দশা ও দরিদ্রতার মাধ্যমেও পরীক্ষা করেন। তিনি যাদেরকে ভালোবাসেন না তাদেরকেও দুনিয়ার জীবনে প্রচুর ধন-সম্পদ দিতে পারেন। এর মাধ্যমে আল্লাহর নিকট কারও সম্মানিত হওয়া প্রমাণিত হয় না; বরং তিনি তাদের আসল চেহারা প্রকাশিত করার জন্য সম্পদ দিয়ে পরীক্ষা করতে পারেন। একে বলা হয় ইসতিদ্রাজ। অপরদিকে, তিনি যাকে ভালোবাসেন তাকেও দুনিয়াবী ধন-সম্পদ থেকে বিরত রাখতে পারেন। এর মাধ্যমে ওই বান্দর সম্মান কমে না; বরং সে প্রাচুর্যের ফিতনা থেকে বেঁচে থাকে।
রহমানের আউলিয়াদের কারামাতের পেছনে অবশ্যই ঈমান ও তাকওয়া থাকে। কাজেই কুফরি, অবাধ্যতা, পাপাচারের মাধ্যমে যেসব 'অলৌকিক' ঘটনা ঘটে সেগুলো আল্লাহর দুশমনদের বৈশিষ্ট্য, এগুলো রহমানের আউলিয়াদের কারামাত নয়। তাদের আশ্চর্যজনক ঘটনার পেছনে সালাত, কুরআন তিলাওয়াত, আল্লাহর যিকর, তাহাজ্জুদ, দোয়া ইত্যাদি দেখা যায় না; বরং এগুলোর পেছনে থাকে শিরক, পাপাচার, অবাধ্যতা ও হারাম বস্তু ভক্ষণ করার মতো ঘটনা।
যেমন: মৃত বা অনুপস্থিত ব্যক্তির কাছে দুআ করা, গোবর, মাসিকের রক্ত ও অন্যান্য নোংরা নাপাক বস্তু ভক্ষণ করা কিংবা বেগানা নারী ও কিশোর বালকদের সাথে গানবাজনা ও নৃত্যে অংশগ্রহণ করা ইত্যাদি। কুরআন তিলাওয়াতের উপস্থিতিতে এসব ঘটনার তীব্রতা হ্রাস পায়, কিন্তু শয়তানের শিংগার (গানবাজনা) উপস্থিতিতে সেগুলো বৃদ্ধি পায়। ফলে তারা রাতভর নৃত্যগীত করতে পারলেও যখন সালাতের সময় আসে তখন বসে সালাত আদায় করে অথবা মুরগির ঠোকর খাওয়ার মতো দ্রুত সালাত আদায় করে। সে কুরআন শুনতে অপছন্দ করে এবং সেখান থেকে পলায়ন করে। এটি তার জন্য কষ্টকর, ফলে সে কুরআন তিলাওয়াত পছন্দ করে না কিংবা এর মিষ্টতা অনুভব করে না। কিন্তু হাতে তালি বাজিয়ে গানবাজনা শুনতে পছন্দ করে; এর প্রতি তীব্র আকর্ষণ ও আবেগ অনুভব করে। এগুলো সব শয়তানের ধোঁকাবাজি।
আর এই ধরনের ব্যক্তিদের অবস্থা বর্ণনা করে আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَن يَعْشُ عَن ذِكْرِ الرَّحْمَنِ نُقَيِّضْ لَهُ شَيْطَانًا فَهُوَ لَهُ قَرِينٌ
'যে ব্যক্তি দয়াময় আল্লাহর স্মরণ থেকে চোখ ফিরিয়ে নেয়, আমি তার জন্যে এক শয়তান নিয়োজিত করে দিই, অতঃপর সে-ই হয় তার সঙ্গী। [৫১০]
'রহমানের স্মরণ' (যিকরুর রহমান) অর্থ হলো কুরআন। অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَنْ أَعْرَضَ عَن ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَى قَالَ رَبِّ لِمَ حَشَرْتَنِي أَعْمَى وَقَدْ كُنتُ بَصِيرًا قَالَ كَذَلِكَ أَتَتْكَ آيَاتُنَا فَنَسِيتَهَا وَكَذَلِكَ الْيَوْمَ تُنسَى
'এবং যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবিকা সংকীর্ণ হবে এবং আমি তাকে কিয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করব। সে বলবে, হে আমার পালনকর্তা, আমাকে কেন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করলেন? আমি তো চক্ষুষ্মান ছিলাম। আল্লাহ বলবেন, এমনিভাবে তোমার কাছে আমার আয়াতসমূহ এসেছিল, অতঃপর তুমি সেগুলো ভুলে গিয়েছিলে। তেমনিভাবে আজ তোমাকে ভুলে যাব।' [৫১১]
আল্লাহর আয়াত ভুলে যাওয়ার অর্থ সেগুলোর প্রয়োগ উপেক্ষা করা।
ইবনু আব্বাস বলেন, 'যারা তাঁর কিতাব (কুরআন) পাঠ করে ও সে অনুযায়ী আমল করে, তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন যে, দুনিয়ার জীবনে তারা পথহারা হবে না এবং আখিরাতের জীবনে কোনো দুঃখ-দুর্দশা ভোগ করবে না...' এরপর তিনি উক্ত আয়াত তিলাওয়াত করেন। [৫১২]

টিকাঃ
[৪৭৩] বুখারি, ৬১৭৩; মুসলিম, ২৯২৪।
[৪৭৪] বুখারি, ৩২১০।
[৪৭৫] মুসলিম, ২২২৯。
[৪৭৬] মুসলিম, ২২২৯。
[৪৭৭] আসওয়াদ আনাসির হত্যার ঘটনা জানার জন্য পড়ুন: ইবনু কাসীর, আল-বিদায়া, ৬/৩৪৭。
[৪৭৮] বুখারি, ২৩১১。
[৪৭৯] সূরা আ'রাফ, ৭: ৩৩。
[৪৮০] বুখারি, ৩৪৫৩; মুসলিম, ৫২৯。
[৪৮১] মুসলিম, ৫৩২。
[৪৮২] বুখারি, ৪৩৪, ১৩৪১。
[৪৮৩] আহমাদ, আল-মুসনাদ, ৬/৯০, সহীহ。
[৪৮৪] মুসলিম, ৯৭২。
[৪৮৫] মালিক ইবনু আনাস, আল-মুওয়াত্তা, ১/১৭২, সহীহ。
[৪৮৬] আবূ দাউদ, ২০৪২, আহমাদ, ৮৭৯০, সহীহ。
[৪৮৭] আবূ দাউদ, ২০৪১, আহমাদ, ১০৮১৫, সহীহ。
[৪৮৮] নাসাঈ, ১২৮১, সহীহ。
[৪৮৯] আবূ দাউদ, ১০৪৭, সহীহ。
[৪৯০] সূরা নূহ, ৭১: ২৩。
[৪৯১] কুরতুবি, তাফসীর, ১৮/৩০৭, ইবনু কাসীর, তাফসীর, ৪/৩৭২。
[৪৯২] ইবনুল কাইয়িম, ইগাসাতুল লাহফান, ১/৩৩২; ইবনু তাইমিয়্যা, মাজমুউল ফাতাওয়া, ১/৩৫৬。
[৪৯৩] সূরা জিন, ৭২ : ৭。
[৪৯৪] সূরা মাইদা, ৫: ৫১。
[৪৯৫] সূরা শুআরা, ২৬: ২২১-২২২。
[৪৯৬] সূরা আনফাল, ৮: ৩৫。
[৪৯৭] তাবারি, তাফসীর, ১৩/৫২৩。
[৪৯৮] ইবনু হিব্বান, ৭১৯৭; মুসলিম, ৭৯৩。
[৪৯৯] আবূ দাউদ, ১৪৬৮; হাকিম, আল-মুসতাদরাক, ১/৫৭১。
[৫০০] ইবনু মাজাহ, ১৩৪০; হাকিম, আল-মুসতাদরাক, ১/৫৭১。
[৫০১] সূরা নিসা, ৪:৪১。
[৫০২] বুখারি, ৪৭৬২; মুসলিম, ৮০০。
[৫০৩] সূরা মারইয়াম, ১৯:৫৮。
[৫০৪] সূরা মাইদা, ৫: ৮৩。
[৫০৫] সূরা যুমার, ৩৯: ২৩。
[৫০৬] সূরা আনফাল, ৮: ২-৪。
[৫০৭] ধাতব বাদ্যযন্ত্র ও নৃত্য সহকারে একটি বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠান。
[৫০৮] ইবনুল কাইয়িম, ইগাসাতুল লাহফান, ১/৪০৮。
[৫০৯] সূরা ফাজর, ৮৯ : ১৫-১৬。
[৫১০] সূরা যুখরুফ, ৪৩: ৩৬。
[৫১১] সূরা ত্বহা, ২০: ১২৪-১২৬。
[৫১২] ইবনু কাসীর, তাফসীর, ৩/১৪৭。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00